জীবন্ত মানুষ এবং আটপৌরে ঘ্রাণের আখ্যান

অলভী সরকার | ২৯ মার্চ ২০১৭ ৮:০৭ পূর্বাহ্ন

ঠাকুমা মারা গেছেন!!!
যার শরীর জুড়ে ‘রতন’ জর্দার মাতাল করা ঘ্রাণ, সেই ঠাকুমা মারা গেছেন।

দিব্যি সুস্থ মানুষ। লোকে বলে, অকারণে ছটফট করে, অবশেষে ততোধিক শান্ত হয়ে মারা গেছেন। সকালবেলা খালি পেটে খুব করে রতন জর্দা দিয়ে পান খেয়েছিলেন। যাতে প্রেম, তাতেই মৃত্যু। যে, মানুষের সবচেয়ে আপনজন, তারই তো সুযোগ থাকে ঘাতক হবার!

ঠাকুমা কেন ‘রতন’ জর্দা খেতেন, আমি ঠিক জানি না; এখন জানার কোনো উপায়ও নেই। অবশ্য নৃ-তাত্ত্বিক গবেষণার পথ বেছে নিলে ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু, গবেষণায় সবসময় সত্যিকারের তথ্য পাওয়া যায় কি? সে যাই হোক, শুধু মনে পড়ে, গ্রামের বাড়িতে গেলে খুব ঘটা করে বাবা ‘রতন জর্দা’ কিনতেন। কোনো ব্র্যান্ডিং- এর ব্যাপারস্যাপার ছিল বোধহয়; এখনকার আরো অনেক কিছুর মতোই। মানুষ ভোগ্যদ্রব্যের দাসত্ব কত আগে থেকেই করতো, কে জানে!

old-womanপূর্বপুরুষের ভূমি থেকে আড়াইশো কিলোমিটার দূরে, যে জায়গাটিতে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে, তাকে আমি বলি স্বয়ংসম্পূর্ণ জেলখানা। এর উঁচু প্রাচীরের ঘের দেয়া আওতার ভেতর সব ছিল- স্কুল, কলেজ, কিন্ডারগার্টেন, হাসপাতাল, বাজার, আবর্জনা, নর্দমা- সবকিছু। যা ছিল না, তা হল,বাইরে যাবার সুযোগ এবং মানসিকতা। আর, প্রয়োজনই বা কী? মানুষ স্বভাবতই আরামপ্রিয়। ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে?’- বস্তুত, হৃদয়-শরীর- কোনোটা খুঁড়েই মানুষ বেদনা জাগাতে চায় না। আমার কৈশোরও সীমাবদ্ধ ছিল কিছু নির্দিষ্ট মানুষের চেনা চাহনি, হাসি, কথা, খেলাধুলা, হাঁটার ভেতর।

নিজের একটা জগৎ তৈরি করেছিলাম আমি। স্কুল থেকে ঠিকঠাকমতো হেঁটে এলে বাসায় পৌঁছতে সময় লাগতো পাঁচ মিনিট। আমি রাস্তার বাম-ডান এবং ডান-বামে কোনাকোনি হেঁটে আসতাম, যাতে সময় বেশি লাগে। চেনা মানুষের গণ্ডির বাইরেও দু’একটি মানুষ আমার জীবনে জায়গা করে নিল। ওরা আসতো আশে পাশের গ্রাম থেকে- কেউ ভিক্ষা করতে, কেউ দুধ বিক্রি করতো, ছিল ছাই-বিক্রেতা, এলাকার শাক নিয়ে আসতে অনেকে।

একজন মহিলা আসতেন, শ্যামলা গায়ের রঙ, জংলা ছাপের শাড়ি পরতেন। তাকে দেখলেই কেন যেন আমার ঠাকুমা’র কথা মনে হতো। শুধু গায়ের রঙের জন্য নয়, উনি ঠিক আমার ঠাকুমা’র মতোই দুটো মাকড়ি পরতেন কানে। আমি দরজা খুলে দাঁড়ালে কেমন অদ্ভুত করে হাসতেন। আমি যেন আমার ঠাকুমাকে দেখতে পেতাম- রঙিন সুতি শাড়ি আটপৌরে ভঙ্গিতে পরা, ঠোঁটের দুই কোণে পানের দাগ।
দরজা খুললেই খুব চেনা সেই ঘ্রাণ পেতাম আমি; জর্দার ঘ্রাণ- রতন জর্দা।

ঠাকুমা এবং আমার যাবতীয় স্মৃতির সাথেই বেশ জর্দা-জর্দা গন্ধ আছে।
খুব ছোটবেলার কথা, যে ঘটনা আমার মনে পর্যন্ত নেই, সেদিনও ঠাকুমা নিশ্চয়ই পান চিবোচ্ছিলেন। শুনেছি, সেই অপরিণত বেলাতেই আমাকে দেখে নাকি ঠাকুমার মনে হয়েছিল, আমি খুব রাগী হব। কোনো এক প্রাচীন প্রথা মেনে তিনি তাই আমাকে নিয়ে যান কচু গাছের গোড়ায় ছাই দিতে। এ সংস্কারের বহু তত্ত্বীয় ব্যাখ্যাই থাকতে পারে; আমার কাছে ঠাকুমার কোলে চড়ে উঠোন পেরোনোর ঘ্রাণময় গল্পটিই প্রধান। নিশ্চয়ই সেদিনও, যেদিন রোদ পোহাতে পোহাতে ঠাকুমা আমার মাথায় বিলি কাটছিলেন; যেদিন নিতান্তই ছোট আমি, বুঝতে না পারা ঘটনার সম্মুখ-পর্দায় কেবল চোখের জলটুকুই দেখেছিলাম। হয়তো সেদিনও, যেদিন সব ফুরিয়ে গেলে পর, শান্ত ঠাকুমা আরও নিথর হয়ে টানটান শুয়ে ছিলেন বারান্দায়; অত লোকের ভিড়েও, একবার নিশ্চয়ই আমি রতন জর্দ্দার ঘ্রাণ পেয়েছিলাম।

সেই ঠাকুমা, আমার এগার বছর বয়সে যখন মারা গেলেন, আমি কিন্তু কাঁদিনি। তার মৃত্যুও আমি দেখিনি; যাকে বলে জীবিত অবস্থা থেকে মৃত অবস্থায় রূপান্তরিত হবার মধ্যবর্তী অংশটুকু- মানুষ থেকে লাশে। গ্রামের বাড়িতে সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ মারা গেলেন ঠাকুমা। সেলফোন বলতে তখন কিছুই ছিল না। বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরের টেলিফোন অফিস থেকে ফোন করে জানানো হল, ঠাকুমা ভীষণ অসুস্থ। আমরা যেন অবশ্যই বাড়ি যাই। বাবা-মা কেমন করে বুঝে গেলেন- গুরুতর কিছু হয়েছে।

আড়াইশো কিলোমিটার দূর থেকে আমরা যখন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলাম, তখন রাত প্রায় সাড়ে এগারটা। সত্যিকার অর্থেই বাংলার আদর্শ গ্রাম- নিশ্চুপ, অন্ধকার। গ্রামে বিদ্যুতের সংযোগ থাকলেও বহু বাড়িতে তখনও হারিকেন আর কেরোসিনের কুপি। বাসস্ট্যান্ড থেকে বাড়ির দূরত্ব প্রায় দেড় কিলেমিটার। গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গিয়েছে রাস্তা। অর্ধেকটা পথ কোনোমতে হেঁটে এলাম; সঙ্গে কেবল একটি টর্চলাইট। এরপরই কুমোরপাড়া শুরু হয়েছে। প্রায় সব পরিবারই আমাদের চেনা। সাড়া পেয়ে বেরিয়ে এলেন একটি পরিবার। তাদের কাছে বাবা সত্যটি জানতে চাইলে তারাও কিছুই খোলসা করলেন না। বললেন, বাড়ি গেলেই জানতে পারবো। মৃত্যুর কথা সরাসরি বলাটা কি নিষিদ্ধ কোনো বাক্যের মতো?

বড় ঘরের বারান্দায় শুয়ে আছেন ঠাকুমা। আমরা বাড়ির উঠোনে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে কান্নার রোল যেন বেড়ে উঠলো কয়েকগুণ। ঠাকু’মা মারা গেছেন!

তাকে ঘিরে বাড়ির সমস্ত মানুষ। বাবা, মা, কাকা, কাকীমনি, পিসি, শরিককুল- সবাই কাঁদছে। আর আমি, তখনও সবকিছুই দেখছিলাম- আমার স্কুল থেকে বাসায় ফেরার মতোই। যেন কোন দৃশ্য ঘটছে আমার সামনে। কেবল আমিই এর মধ্যকার কোন চরিত্র নই; নেহাত দর্শক। মাটির বারান্দার কালশিটে পড়ে যাওয়া বাঁশের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছি। সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে। কান্নাজড়িত গলায় মা বললেন, ‘ঠাকুমাকে একবার ছুঁয়ে নাও’; আমি এগিয়ে গেলাম, শুইয়ে রাখা শরীরের পাশে বসে কপালে হাত রাখলাম।

বরফের মতো ঠাণ্ডা। বোধহয়, বরফের চেয়েও শীতল! জীবনে এই আমার প্রথম কোনো মৃত মানুষের শরীর ছুঁয়ে দেখা। আমার এগার বছর বয়সে মৃত মানুষের শরীর ছুঁয়ে দেখা!

আমি অবশ্য শ্মশানে যাইনি; মানে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। শ্রাবণ মাসের অন্ধকার রাত; ভোররাতের দিকে বোধহয় ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। ঘুম যখন ভাঙলো, আলাদা কোনো অনুভূতি হয়নি আমার। সবকিছু যেন আগের মতোই আছে; মৃত্যু কেবল মানুষের কথার ভেতর। শুনেছিলাম, চিতায় দেবার সময়, জংলা ছাপের হলুদ শাড়ি জড়ানো ছিল ঠাকুমার শরীরে!

তীব্র বেদনাও মানুষ হজম করে নেয়, সময়ের এ-ই নিয়ম। জীবনের এ-ই চলন। মানুষের চোখের জল ফুরিয়ে যায়। দীর্ঘশ্বাসের গতি কমে আসে; একদিন থেমেও যায়। জীবনযাপনের সমস্ত বস্তুবাদী কর্তব্যের ভার মানুষের বিমূর্ত বেদনার উপর বোঝার মতো চেপে বসে। ঠাকুমাও তাই ‘মানুষ’ নয়, নিতান্তই ‘লাশ’ হয়ে শ্মশানঘাটে পৌঁছে গেলেন। সৎকার, সংস্কার, সাংগীতিক ধ্বনি- সব মিলিয়ে মৃত্যুও যেন মানুষের জীবনে উৎসবের নামান্তর।

আমাদের বাসায় টাকা অথবা চাল চাইতে আসা, সেই সোনালী মাকড়ি পরা শ্যামবর্ণ নারী- ঠিক ঠাকুমার মতোই! আরো বহু নারী, সেই এগার বছর বয়সের পর, আরো দেড়খানা এগার বছর কেটে গেছে! বাসে, ট্রেনে, স্টেশনে, ফুটপাতে- অসংখ্য নারী পান চিবোচ্ছে, আমি দেখছি। পার্শ্ববর্তিনীর সাথে গল্প করতে করতে হাতের তেলোর উল্টোপিঠ দিয়ে ঠোঁটের দুই কোনা মুছে নিচ্ছে।
কী দেখছি আমি? আজ, এই এত বছর পর?

ঠাকুমা বসে আছেন, মাটিতে দুই পা ছড়িয়ে; সত্যজিতের ‘অপরাজিত’ সিনেমায় অসুস্থ সর্বজয়া সন্তানের প্রতীক্ষায় ঠিক যে ভঙ্গিতে বসে ছিলেন।
পানের ডিবে, যাতি, চুন-সুপারি, খয়ের, আর সেই রতন জর্দা। বেশিরভাগ সময় তার মেলে রাখা পায়ের কাছ বসে থাকতাম। চুপচাপ ঘ্রাণ নিতাম সেই পান মেশানো জর্দার। গুনগুন করে গান গাইতেন তিনি। একটি গান খুব বেশি গাইতেন- ‘এ পৃথিবী যেমন আছে তেমনই রবে, সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।’
পৃথিবী সত্যিই তেমনি আছে; নইলে, আরো বহু মানুষের ভেতর, আরো বহু নারীর ভেতর তাকে আমি কী করে দেখছি? মাথার ভেতর ঝনঝন করে ওঠে রতন জর্দার ঘ্রাণ! আমি তার মৃত্যু দেখিনি, শরীরের ভস্ম হয়ে যাবার প্রক্রিয়াটুকুও নয়; কেবল একটি শীতল শরীর। সে তো আমার কাছে সদ্য ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে যাওয়া ঘুমন্ত মানুষের মতোই!
ঠাকুমা আমার কাছে জীবিত হয়েই রইলেন; শেষবার যাকে আমি ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছি।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (9) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাজ্জাদ রাহমান — মার্চ ২৯, ২০১৭ @ ২:০৫ অপরাহ্ন

      খুব ভালো লাগলো লেখাটি পড়ে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন abedin quader — মার্চ ২৯, ২০১৭ @ ৬:২৯ অপরাহ্ন

      A beautiful piece!!!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অলভী সরকার — মার্চ ২৯, ২০১৭ @ ৮:১৮ অপরাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ সাজ্জাদ রাহমান। ভালো থাকবেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অলভী সরকার — মার্চ ২৯, ২০১৭ @ ৮:২০ অপরাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ Abedin Quader.
      ভালো থাকবেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পলিয়ার ওয়াহিদ — মার্চ ২৯, ২০১৭ @ ৮:৪৬ অপরাহ্ন

      পৃথিবী সত্যিই তেমনি আছে; নইলে, আরো বহু মানুষের ভেতর, আরো বহু নারীর ভেতর তাকে আমি কী করে দেখছি? মাথার ভেতর ঝনঝন করে ওঠে রতন জর্দার ঘ্রাণ!

      যেন পর্দায় দেখলাম দৃশ্যের পর দৃশ্য! ঠাকুমার ভেতর আমার দাদিমাকেও!! কতো মিল জীবনের সাথে জীবনের। আহারে মায়া। ধন্যবাদ অলভী সরকার। আপনার লেখা পড়তে পড়তে বৃষ্টি শেষ করে রোদ ওঠা গোধুলীর রাস্তায় আমাদেরও একদিন রাত নামবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অলভী সরকার — মার্চ ৩০, ২০১৭ @ ১২:৩৩ অপরাহ্ন

      আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ পলিয়ার ওয়াহিদ। খুব ভালো লাগলো আপনার প্রতিক্রিয়া পাঠ করে। ভালো থাকবেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md. Zahidul Islam — মার্চ ৩০, ২০১৭ @ ১২:৫১ অপরাহ্ন

      Didi: Simply Nice. First time go through your write up. Congratulations. Just remember a song of Lopa Mudra Mitra “Thamma” on similar topic. Thanks.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Alamgeer F Haque — মার্চ ৩১, ২০১৭ @ ১১:৩১ পূর্বাহ্ন

      Battle nut and jarda could have been a real anthropological study and it swayed that way, a sweet and melancholic interpretation

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন SSC Exam Result 2017 — এপ্রিল ১২, ২০১৭ @ ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন

      চমৎকার উপলব্ধি। লেখককে ধন্যবাদ সুন্দর লেখাটি প্রকাশ করার জন্য।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com