পার্থ চট্টোপাধ্যায়: বাংলাতে হিন্দু নেতারাই চাইলেন যে, ভারতবর্ষ ভাগ হলে বাংলাকেও ভাগ করতে হবে

সাব্বির আজম | ২২ মার্চ ২০১৭ ২:৩৮ অপরাহ্ন

Partha Chatterjeeপার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এই সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিলাম ২০১৫ সালের ৬ই অগাস্ট । সেদিনই তার সাথে সরাসরি প্রথম দেখা । এর আগে ই-মেইলে যোগাযোগ হয় । ই-মেইলে যখন বললাম কলকাতা এসে তার সাক্ষাৎকার নিতে চাই তখন তার স্বভাবগত আন্তরিকতায় দিনক্ষণ ঠিক করলেন । সাক্ষাৎকারের স্থান সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা ( সিএসএসআর) । বহু বছর ধরে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়ান । কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানই তার ধ্যান ও জ্ঞান । জাতীয়তাবাদ, দেশভাগ, পাকিস্তান থেইকা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম, বাঙালি জাতীয়তাবাদের বড়াই ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গে আলাপ হয়। আমি ট্রান্সক্রাইব করার পরে তিনি লিখিত রূপটি চূড়ান্ত করে পাঠান। – সাব্বির আজম

সাব্বির আজম: আপনার লেখালেখিতে জাতীয়তাবাদ যেহেতু প্রধান বিষয়, জাতীয়তাবাদ দিয়েই আলাপ শুরু করতে চাই। যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব এবং পরবর্তীতে জাতিরাষ্ট্র হিশেবে ভারতের পত্তন, সেই প্রেক্ষাপটে এর প্রধান চারিত্র্য কী?

পার্থ চট্টোপাধ্যায়
: জাতীয়তাবাদ বলতে আমি রাজনৈতিক বিরোধিতা অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিরোধিতাকে বুঝি যার পেছনে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র তৈরি করার একটা ইচ্ছা ছিল। এইটাকেই আমি জাতীয়তাবাদ ধরছি। একারণে, যেমন ধর ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ নিশ্চয়ই ব্রিটিশবিরোধী, তাতে ভারতবর্ষের বিশেষ করে উত্তর অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সমর্থনও ছিল। কিন্তু আমার মতে, একে জাতীয়তাবাদ বলা উচিত না। কারণ সেটার পেছনে ইংরেজকে সরিয়ে ফের মুঘল সম্রাটকে সামনে রেখে,বিশেষ করে রাজা-রাজড়ারা অনেক বেশি ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবে–এরকম একটা ধারণা ছিল। একটা নতুন জাতিরাষ্ট্র বলতে আমরা এখন যা বুঝি সেরকম ধারণা এই বিদ্রোহে ছিল না। সুতরাং আমার মতে, মোটামুটি ১৮৭০-৮০-র আগে ঠিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলতে যা বোঝায় সেটা ছিল না। কিন্তু ১৮৭০-৮০ থেকে কী ধরনের জাতীয়তাবাদ এল এবং এর উদ্ভব হওয়ার কারণগুলো কী এবং এর মধ্যে কী কী বিশেষ চরিত্র আছে?

উদ্ভব হওয়ার কারণ প্রথম দিকে তুমি যদি দেখ, এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম যুগের নেতা কারা? প্রথম যুগের নেতারা সকলেই বলতে পারা যায় কোনো না কোনোভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ফসল। কারণ এরা অনেকেই, স্বভাবতই, সম্পত্তিবান ও ধনী ছিলেন। সকলেই আবার কোনো না কোনোভাবে ইংরেজি শিক্ষা, ঔপনিবেশিক শিক্ষা-ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গেছেন। অনেকেরই কলেজের ডিগ্রি-টিগ্রি আছে। ইউনিভার্সিটিতে গেছেন। এর মধ্যে একটা বড় অংশ ওকালতি করেন। ওকালতি করেন এটা শুনে অনেকে হয়ত হাসেন, যে উকিলরা হঠাৎ রাজনীতিতে আসে কেন? কিন্তু একটা জিনিস দেখতে হবে, সেসময়ে যারা ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে পাশ করত তাদের কর্মসংস্থানের কী ব্যবস্থা ছিল? তখন যেকোনো রকমের পেশার ক্ষেত্রে, শিক্ষকতা হোক অথবা বৈজ্ঞানিক হোক, সরকারি চাকরি ছাড়া আর কোনো সুযোগই ছিল না। ওকালতিটা একমাত্র স্বাধীন পেশা। তখন ডাক্তারিও খুব কম ছিল। মানে আধুনিক ডাক্তার বলতে যা বোঝায়। কারণ ডাক্তাররা তখন আর্মিতে চাকরি করত এবং গোড়ার দিকে ভারতবর্ষের সব জায়গাতে প্রথম যারা ভারতীয় ডাক্তার সকলেই প্রায় আর্মি থেকে ডাক্তারির ট্রেনিং নিয়ে পরবর্তীকালে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে এসেছেন। ফলে সরকারি চাকরির বাইরে অন্য কোনো স্বাধীন আধুনিক পেশা যাকে বলে সেগুলোতে প্রায় কোনো সুযোগ ছিল না। সরকারি চাকরি করে তো আর রাজনীতি করা সম্ভব না। সে কারণে ওকালতি পেশাতে যারা ছিলেন তারাই প্রধানত প্রথম যুগে বাংলায় বা বম্বেতে বা মাদ্রাজে যেসব প্রাদেশিক এসোসিয়েশনগুলি হল সেগুলো জুড়ে ছিলেন। ১৮৮৫ তে ভারতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন হয়, বছর বছর একটা অধিবেশন হতে শুরু করল।

প্রথম যুগের নেতারা যে দাবি নিয়ে জাতীয়তাবাদ শুরু করেন সে দাবিগুলো হচ্ছে প্রধানত ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় কিছু কিছু ভারতীয়র জন্য একটা জায়গা খুলে দেয়ার ধারণা। অর্থাৎ আমাদের মতামত নেয়ার ব্যবস্থা হোক। এইটুকুই। এর বেশি কোনো দাবি তাদের ছিল না। আস্তে আস্তে গভর্নরের কাউন্সিলে দুজন-একজন করে ভারতীয় নেয়া শুরু হল। এভাবে সেন্ট্রাল ভাইসরয়ের যে কাউন্সিল সেখানেও কিছু ভারতীয়কে নেয়া হল। পরবর্তীকালে আমরা রেপ্রেজেন্টেটিভ যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলি সেগুলো শুরু হল। মনে রাখতে হবে, এই রেপ্রেজেন্টেশনে কিন্তু খুবই সামান্য ভাগ মানুষ ছিল। অর্থাৎ গোড়ার দিকে আমি বলব বাংলার স্বদেশি আন্দোলনে ব্যাপারটা খানিকটা ব্যাপকতা পেয়েছিল। খুব বেশি কিন্তু নয়। মোটামুটি গান্ধি আন্দোলন অর্থাৎ উনিশশো কুড়ি সালে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের আগে পর্যন্ত এটা অল্পসংখ্যক ইংরেজি শিক্ষিত, ধনী সম্পত্তিবান মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই ধরনের মানুষের মধ্যেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রথম উদ্ভব।

সাব্বির আজম: এই জাতীয়তাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো কী ছিল যেগুলো পরে জাতিরাষ্ট্র হতে সাহায্য করে?

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: একটা খুব বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নতুন জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তিটা বা কাঠামোটা হবে প্রতিনিধিত্বমূলক। গণতন্ত্রের ধারণা তখনও হয়ত এতটা স্পষ্ট হয়নি কিন্তু সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে একটি রাষ্ট্র তৈরি হবে–এই ধারণাটা ছিল। একে বলা যেতে পারে লিবেরাল বা উদারনৈতিক এক ধরনের প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার মতো একটা ধারণা। কিন্তু এমন কথা ওই সময়ের নেতারা ভাবতেন না যে আমজনতা সকলেরই ভোট থাকবে, সকলের ভোট নিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। এতটা তারা ভাবতেন না। গোড়ার দিকে তারা ভাবতেন শিক্ষিত মানুষই ভোট দিবে, কারণ সাধারণ মানুষ আর কী জানে? মানে রাষ্ট্র কী, তার পলিসি কী, তার আইন কী হবে সাধারণ মানুষ তার কী বোঝে। কিন্তু তাদের ভালোর কথা ভেবে যারা একটা সাধারণ প্রতিনিধিত্বমূলক নীতি তৈরি করতে পারে এমন মানুষকেই রেপ্রেজেন্টেটিভ করা উচিত–এই ধারণাটা গোড়ার দিকে ছিল। কিন্তু মূল তফাতটা হচ্ছে পুরোনো ধরনের যে রাষ্ট্র-ব্যবস্থা অর্থাৎ রাজা-বাদশা থাকবে এই ধরনের যে ব্যাপার, সেখান থেকে কিন্তু তারা সরে গেছে।

সাব্বির আজম: রবীন্দ্রনাথ থেকে আপনার লেখা কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের লেখালেখিতে ন্যাশনালিজমের একটা ক্রিটিক দেখি। এই ক্রিটিকটা কি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের যেটা ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ থেকে একদমই আলাদা…

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: সব ক্রিটিক কিন্তু একরকম নয়। বিভিন্ন অবস্থান থেকে এই সমালোচনাগুলো এসেছে। ধর রবীন্দ্রনাথের এক ধরনের সমালোচনা ছিল। সেই সমালোচনাটা একটু খোঁজ করলে বোঝা যাবে যে, স্বদেশি আন্দোলনের সময় উনি প্রথমে খুব উৎসাহের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। তারপর তাঁর মোহভঙ্গ হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে খানিকটা হিংস্রভাব, শত্রুর সঙ্গে কোনোরকম সমঝোতা না করার মানসিকতা–উনি এসবের প্রবল বিরোধী ছিলেন। স্বদেশি আন্দোলনের সময় যারা এই আন্দোলনকে সমর্থনে রাজি ছিল না তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা বেশি রকম চালু হয়েছিল। তাদের বাড়িতে কেউ যাবে না, তাদের বাজারে আসতে দেয়া হবে না, তাদের বাড়িতে কেউ কাজ করতে পারবে না–উনি এগুলোর ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। এবং এর ফলে ওনার এই ধারণাটা শুরু হয়, যে জাতীয়তাবাদ আমাদের দেশে আসছে এর মডেলটাতো ইয়োরোপের জাতীয়তাবাদ। ওনার সমালোচনার মূল কথাটা হল, ইয়োরোপের জাতি, অর্থাৎ এক জাতির সঙ্গে রাষ্ট্রের যে সম্পর্ক সেখানে রাষ্ট্রই প্রধান। অর্থাৎ সবকিছুকেই গ্রাস করে নেয় রাষ্ট্র। এই জাতিরাষ্ট্র তৈরি হবে, সে ইস্কুল বল, সংস্কৃতি বল জাতিরাষ্ট্রের ধারণা সবকিছুকে গ্রাস করছে এবং এইটাকেই উনি মনে করছেন ইয়োরোপের ন্যাশনালিজম। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকটায় যে একের পর এক যুদ্ধ হচ্ছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হচ্ছে। তখন পর্যন্ত এত বড় যুদ্ধ হয়নি। ইয়োরোপের দেশগুলোর মধ্যেই যুদ্ধ। এমন যুদ্ধ যেখানে শত্রুর সঙ্গে প্রায় কোনোরকম সমঝোতা হবে না, টোটাল ওয়ার যাকে বলে। লক্ষ লক্ষ কোটি লোক মারা যাচ্ছে।

প্রথমদিকে জাপান সম্বন্ধে খুব ভালো ধারণা ছিল তাঁর। কিন্তু জাপান ক্রমশ ‘আমি সামরিক শক্তি হব, ইয়োরোপের সঙ্গে টক্কর দেব’ করে জাপানি সমাজের যে যুদ্ধমুখী একটা রাষ্ট্র তৈরি হল, জাতীয়তাবাদ তৈরি হল–উনি এটাকেও ভীষণভাবে অপছন্দ করলেন। জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ওনার যে সমালোচনাটা তৈরি হল সেটা কিন্তু এইখানেই যে, রাষ্ট্র বা সরকারের একটা সীমিত জায়গায় থাকা উচিত। রাষ্ট্র সবকিছু গ্রাস করে নেবে এটা আমাদের গ্রহণ করা উচিত নয়। উনি বারবার বলতেন প্রাচ্যে এই জিনিসটা ছিল না। আমরা কেন এখানে নিয়ে আসছি? আমাদের সমাজের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ছিল, সেই সমাজের নিজস্ব রকমের বন্দোবস্ত ছিল। সেগুলোর মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো ঠিক করা হত। অর্থাৎ কোথায় জলের সমস্যা মেটানো যাবে এবং বদলানো যাবে। রাষ্ট্র এসে বলে দিত না,তুমি এই কর, ওই কর।

কিন্তু ইদানিংকালে যে সমস্ত সমালোচনা হচ্ছে তার সঙ্গে সবসময় রবীন্দ্রনাথের এই সমালোচনা মিলবে না। তার কারণ এখন অনেকেই বলবেন রাষ্ট্রের যে ধরনের জিনিস এখন সাধারণ মানুষের চাহিদার মধ্যে চলে এসেছে সেখানে শুধু সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে সেইসব চাহিদা মেটানো সম্ভব না। অর্থাৎ গ্রাম তার নিজের জলের ব্যবস্থা করবে এটা এখনকার দিনে সম্ভব নয়। সম্ভব নয় তার কারণ, প্রথম কথা, যোগাযোগটা এত বেশি হয়ে গেছে যে এক জায়গায় কিছু হলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়। যেমন ধর, নদীতে বাঁধ দেয়া হল কোথাও। নদীতে বাঁধ দেয়া হলে একশ-দুশো-তিনশ মাইল পর্যন্ত তার এফেক্ট পড়বে। ফলে এখানে শুধু ওই গ্রাম সমাজের ওপর নির্ভর করলে তো একটা রাষ্ট্র বা সমাজ ব্যবস্থাই চলতে পারে না। যেমন শিক্ষা-ব্যবস্থা–এটা খুব বড় একটা জিনিস যে শিক্ষা-ব্যবস্থা এখনকার এটাতো পুরোনো কায়দায় যে কেউ মক্তবে যায় বা পাঠশালায় যায় সেখানে মৌলবি সাহেব আছেন কিংবা পণ্ডিত মশাই আছেন তিনি যা পড়ানোর পড়াবেন, এইভাবে চলবে না। তার কারণ শিক্ষার উদ্দেশ্যটাই অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এখন শিক্ষার ফলে চাহিদাটা কী? সাধারণ মানুষেরও চাহিদা তার ছেলে-মেয়ে যদি ইস্কুলে পড়তে যায় তাহলে ইস্কুল পাশ করলে সে এমন একটা কিছু শিখবে, তার ডিগ্রির এমন একটা দাম হবে যে সে শুধু গ্রামে বসে থাকবে না। অন্য জায়গায় যেয়ে কাজ করতে পারবে। এই সুযোগগুলো এখনকার সাধারণ চাহিদার মধ্যে চলে এসছে। ফলে একটা দেশে কোথায় কী পড়ানো হচ্ছে সেই পড়ানোর মধ্যে সামঞ্জস্য না আনলে এই জিনিসটি সম্ভব নয়। এক জায়গার লোক আরেক জায়গায় গিয়ে কী কাজ করতে পারবে? প্রত্যেকটি গ্রামে বা অঞ্চলে যদি আলাদাভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয় তাহলে তো সেটা সম্ভব নয়। তাহলে এত বড় একটা দেশের মধ্যে শিক্ষা-ব্যবস্থায় সামঞ্জস্য কে আনবে? এখানে স্বভাবতই একটা রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় কোনো সংগঠন–যেমন স্কুল বোর্ড হোক–শিক্ষা-ব্যবস্থা নির্ধারণ করে দেবে এবং সেটা সবাই মানবে। সব ইস্কুলে সেভাবে পড়ানো হবে।

শুধু গ্রাম-সমাজের ওপর নির্ভর করে এত বড় একটা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সমাজ-ব্যবস্থা চলতে পারে না–এইটে যদি মেনে নিতে হয় তাহলে জাতীয়তাবাদ বা জাতিরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে সেখানে একটা সম্পূর্ণ অন্য সমালোচনা আছে। এখানে প্রশ্নটা এই নয় যে, রাষ্ট্র বা সরকারকে কিভাবে সীমিত রাখা যায়। বরঞ্চ প্রশ্নটা হচ্ছে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রযন্ত্র বা সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কাজকর্ম, সেই কাজকর্মের মধ্যে কতটা সাধারণ মানুষের মতামতটা কতদূর অব্দি নেয়া হচ্ছে, তাদের চাহিদার প্রতিফলন হচ্ছে কতটা। এইটা অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। সুতরাং এখনকার সমালোচনার মূল জায়গাটা হল রাষ্ট্র প্রতিনিধিত্বমূলক কিনা। যিনি জনপ্রতিনিধি তিনি প্রতিনিধিত্ব করতে পারছেন? কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? সকলের করতে পারছেন কিনা? জনপ্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে কিনা সেই প্রশ্ন উঠছে। বিভিন্ন রকমের দাবি বা কমপ্লেন আসছে। অনেক জনগোষ্ঠী বলছে–আমাদের কথা কেউ শোনে না। অন্যদের কথা বেশি শোনা হয়। এই ধরনের সমস্যাগুলোর কথা কিন্তু পঞ্চাশ-একশ বছর আগে শুনতেই পাওয়া যেত না। তার কারণ আজকে যারা কথাগুলো বলছে তাদের কথা বলার জায়গাই তখন ছিল না। এখন প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির জায়গাটা কিছুটা তো বেড়েছে। তাই এই প্রশ্নগুলো এখন উঠছে। এবং তার ফলে এখন জাতীয়তাবাদের সমালোচনা যেটা হয় সেটা অনেক বেশি এই ধরনের সমালোচনা যে, জাতিরাষ্ট্র কতটা, ইংরেজিতে যাকে বলে, হোমোজেনাস হবে। মানে সবাইকে একরকম করে রাখা হবে কিনা। আমাদের এখানকার তুমি ভারতবর্ষ বল, বাংলাদেশ বল, পাকিস্তান বল, এগুলো তো বড় বড় দেশ। কোটি কোটি লোক থাকে। এই কোটি কোটি মানুষের সবাইকে এক বলে ধরে নিয়ে, আর যদি তারা এক না হয় তাহলে জোর করে এক করার চেষ্টা করা–এখান থেকে মূল সমালোচনাটা হচ্ছে, এখনকার সমালোচনায়। অর্থাৎ সকলকে কি একরকম করার চেষ্টা করছে? অথবা যারা একটু ভিন্ন তাদের কথা শোনা হচ্ছে নাকি শোনা হচ্ছে না।

এইখানে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা প্রশ্ন হল, সেই প্রতিনিধি বাছার নিয়মটা কী এবং তারপর প্রতিনিধিদের যেখানে জড়ো করা হল সেটা সংসদ হোক বা সভাই হোক, সেইখানে সাধারণ যেসব নীতিগুলোর দ্বারা সিদ্ধান্ত নেয়া হবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার নিয়মটা কী। এখনকার দিনে মোটামুটি সাধারণভাবে স্বীকৃত একটা গণতান্ত্রিক নিয়ম হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ যারা তাদের মতটাই থাকবে। অর্থাৎ যারা সংখ্যায় বেশি তাদের কথাটাই শোনা হবে। এইখানেই সমস্যাটা অনেক বেশি তীব্র হচ্ছে। অর্থাৎ যারা একটু ভিন্ন, যারা সংখ্যালঘু তাদের কথাটা কি চিরকাল বাদই থেকে যাবে? কারণ তারা তো কখনো সংখ্যায় পেরে উঠবে না। সংখ্যায় যদি পেরে না ওঠে তাহলে তাদের কথাটা শোনার বা শোনানোর উপায় কী হবে? জাতীয়তাবাদের নতুন ধরনের যে সমালোচনা ইদানিং বেশি শোনা যাচ্ছে সেটা কিন্তু এরকম জায়গা থেকে আসছে। কেউ এই কথাটা বলছে না যে রাষ্ট্র তুলে দাও, জাতিরাষ্ট্রের দরকার নেই। এইটা অনেক বেশি কঠিন এখনকার বাস্তবতায়। জাতিরাষ্ট্র তুলে দিয়ে সম্পূর্ণ অন্য রকম একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা চলে আসবে, আমার মতে, এরকম কল্পনা করাটাই এই মুহূর্তে খুব কঠিন। এখনো যা অবস্থা আছে তাতে আমাদের জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে থেকেই কাজ করতে হবে। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রের মধ্যকার ব্যবস্থাগুলোর ভেতরেই কী করে আরো বেশি প্রতিনিধিত্বমূলক করা যায়, তাতে যেসব জনগোষ্ঠীর কথা শোনা যাচ্ছে না কিংবা শোনা হচ্ছে না তাদের কথাটা কী করে আরো বেশি শোনা যায়, কী রকমের প্রতিষ্ঠান হলে যারা সংখ্যালঘু তাদের কথাটা একটু বেশি শোনা হবে–এই দিকগুলো অনেক বেশি করে এখনকার ভাবনার মধ্যে আসছে।

সাব্বির আজম: এবার বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গে আসি। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আপনি কিভাবে দেখেন?

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: এটা নিয়ে তো অনেক কথা বলতে হয়। কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে না মিলিয়ে ভাবাটা মুশকিল। বিশেষ করে তো আজকে যেটাকে দুই বাংলা বলা হয় তার পুরোটাই ব্রিটিশ আমলে একসাথে ছিল। তার চেয়েও বড় ছিল। একসময় বাংলা বলতে বিহার, উড়িষ্যা, আসাম সবই একসঙ্গে ছিল। তার ফলে, বাঙালির মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী চিন্তা এইটা ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে জুড়ে গেছে। এখানে আমার মতটা সবসময় সমস্ত ভারতীয় ঐতিহাসিকের সঙ্গে মেলে না (হাসি)। কারণ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সরকারি ভাষ্য হচ্ছে, আজকে ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের যে রূপ চিরকাল ধরে একই আছে। এটা আমার কাছে সঠিক বলে মনে হয় না। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে আজকের ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রটা তৈরি হয়েছে। আদি অনন্তকাল ধরে এটা এভাবে ছিল তা আদৌ সত্যি নয়। কিন্তু এ কথা সত্য যে, জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালীন সময়ে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি বা শেষের দিকটা থেকে, আমাদের মনে রাখা দরকার সাধারণ পাঠ্য-ইতিহাসে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নেতা বা মনীষীদের কথা বেশি বলা হয়, (তারা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ) তাদের লেখা বা বক্তব্য থেকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণা কী ছিল তার আন্দাজটা করা হয়। কিন্তু এখানে আমার নিজের মনে যে খটকাটা লাগে এরা অধিকাংশইতো ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে এসেছে এবং অধিকাংশ সময়ই তাঁরা জাতীয় কংগ্রেসে এসে বক্তৃতা করছেন বা বই লিখছেন বা পত্র-পত্রিকায় লিখেছেন, সেখানে তাদের উদ্দীষ্ট পাঠক কিন্তু আবার ইংরেজ শাসকও। তাদের জন্যও এদের অনেক বক্তব্য আছে। এর ভাষা কিন্তু ইংরেজি। ভারতবর্ষের যারা বড়বড় নেতা, যেমন গান্ধি নিজে বহু জিনিস গুজরাতিতে লিখতেন কিন্তু আমাদের কাছে পরিচিত যত লেখা সেগুলো ইংরেজিতে। অনুবাদ করা হয়েছে। গান্ধির মূল বই হিন্দ স্বরাজ গুজরাতিতে কজন পড়েছে। নেহরু তো সবসময় ইংরেজিতেই লিখতেন। উনি অন্য কোনো ভাষায় কখনো লেখেননি। তো, এইরকম বড় বড় মনীষীদের অধিকাংশ লেখা ইংরেজিতে। ইংরেজিটা পড়ে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা একটা সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণা তৈরি করেছেন।

কিন্তু এবারে যদি দেখা যায়, এই জাতীয়তাবাদের ধারণা সাধারণ মানুষের কাছে কিভাবে পৌঁছতে শুরু করল। তার ভাষা কী? প্রত্যেকটা প্রদেশের আঞ্চলিক ভাষার মাধ্যমেই তো সাধারণ মানুষের কাছে জাতীয়তাবাদের ধারণা পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষতো ইংরেজি পড়েনি। এখন এইবার যদি দেখা যায় মহারাষ্ট্রে কি বাংলায় কি তামিল অঞ্চলে কি অন্ধ্র অঞ্চলে কি পাঞ্জাবে সেখানে জাতীয়তাবাদের যে ধারণা, সেখানে কতটা বাংলা আর কতটা ভারত, কতটা পাঞ্জাব আর কতটা ভারত, কতটা মহারাষ্ট্র আর কতটা ভারত–এত সূক্ষ্ম ভেদাভেদ নিয়ে কিন্তু তখন কেউ ভাবেনি। তখন জাতি বলত, দেশ বলত, অনেক কিছুই বলত। এইটা হলে ভারতীয় জাতীয়তা বলা হয়, অমুকটা হলে বাঙালি জাতীয়তা হয়–এত সূক্ষ্ম ভেদাভেদ তখন ছিল না। কিন্তু ভাষাটাতো বাংলা, বা ভাষাটাতো মারাঠি বা ভাষাটাতো উর্দু। এইটে যখন হচ্ছে, আঞ্চলিক ভাষায় জাতীয়তা সম্বন্ধে যে ধরনের লেখাপত্র এবং শুধু রাজনৈতিক লেখাপত্র বা প্রবন্ধ নয়, এমনকি গল্প-উপন্যাস-নাটক-কবিতা এই ধরনের জিনিস বিংশ শতাব্দীতে বিশেষ করে যখন মুদ্রণ ব্যবসা অনেক বড় হল তখন অনেক বেশি করে প্রচারিত হতে শুরু করল, এই নিয়ে সাম্প্রতিককালে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং তার থেকে আমার নিজের কাছে মনে হয় আসলে জাতীয়তার চরিত্র কিন্তু একেকটা অঞ্চলে একেক রকম। মানে পুরোটাকে আমরা ভারতীয় বলছি বটে কিন্তু এর চরিত্র একেক অঞ্চলে একেক রকম। শুধু তাই নয়, প্রত্যেকটি অঞ্চলে জাতীয়তা, জাতিটা কী, জাতিতে কারা আছে, কারা নেই, জাতির নেতা কারা, এই নিয়েও কিন্তু বিতর্ক আছে।

এবার সরাসরি তোমার প্রশ্নটাতে আসি। আগেই এটা বলে নিলাম, তার কারণ হচ্ছে শেষ অব্দি কতটা ভারতীয়, কতটা বাঙালি জাতীয়তা, আবার যখন পাকিস্তানের দাবি উঠল তখন এটা ভাগ হয়ে গেল। এরকম সাধারণভাবে যে ভাগ করা হয়, উত্তরটা এমনভাবে বলতে হয়: হ্যাঁ বাঙালি জাতীয়তা একটা ছিল, ও বাইরের লোকেরা এসে বাংলাকে ভাগ করে দিল। এরকম একটা ধারণা কিন্তু আমাদের পশ্চিম বাংলাতেও খুব প্রচলিত।

সাব্বির আজম: বাংলাদেশেও এটাই প্রতাপশালী ডিসকোর্স।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: তাইতো বলছি। এটা খুব প্রচলিত। আবার উল্টো দিকে হচ্ছে ও তো চিরকাল আমরা আলাদা ছিলাম। ও নিয়ে চিন্তার কী আছে। বাঙালি-টাঙালি কিছু না। হিন্দু-মুসলমান চিরকালই আলাদা। আমার এ দুটোর কোনোটাই সত্যি মনে হয় না। পশ্চিম বাংলায় বাঙালি জাতীয়তার যে ইতিহাসটা সবচেয়ে প্রচলিত তাতে বলা হয় স্বদেশী আন্দোলন বা বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন একটা ব্যাপক জাতীয়তার ধারণা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম, সেখানকার যারা হিন্দু, তখনকার দিনে, হিন্দুরা সেখানেই সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী সম্পদশালী লোকজন সেখানেই তারা ছিল। পূর্ববাংলার ধনী ও সম্পত্তিবান হিন্দু যারা ছিলেন তারাই বঙ্গভঙ্গের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। স্বদেশী আন্দোলনের প্রধান ভূমিকায় ছিলেন বাঙালি হিন্দুরা, এতে তো কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর চেয়েও বড় ব্যাপক গণআন্দোলন যখন শুরু হচ্ছে উনিশশো কুড়ি থেকে তখন খিলাফত ও গান্ধির অসহযোগ আন্দোলন জুড়ে গেল। এই সময়টা যদি দেখি তখন কিন্তু দেখা যাবে গান্ধির অসহযোগ আন্দোলনের প্রধান ভূমিকা হচ্ছে মুসলিম প্রচারকদের, মুসলিম সংগঠনগুলো। কারণ খিলাফত আন্দোলনের মাধ্যমেই কিন্তু পূর্ববাংলার মুসলিম জনসাধারণ বা সাধারণ মানুষ, তাদের মধ্যে একটা জাতীয় রাজনৈতিক স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব প্রথমবারের মতো গিয়ে পড়ল। এবং পরবর্তীকালে যারা পূর্ব বাংলার মুসলিম নেতা হিসেবে উঠে এলেন, বিশেষ করে গণনেতা হিসেবে, যারা পরবর্তীকালে বাংলাদেশ পর্যন্ত দেখেছেন, তারা প্রায় সবাই কিন্তু খিলাফত আন্দোলন থেকে উঠে আসা। এদের অনেকেই ধর্ম প্রচারক ছিলেন। অনেকেই হয়ত মসজিদের ইমাম ছিলেন। হয়ত ধর্মীয় টান থেকেই তারা খিলাফত আন্দোলনে প্রথম এসেছিলেন। কিন্তু আসার পরে জাতীয় রাজনীতির আধুনিক রাজনৈতিক আবহে তাদের হাতেখড়ি হল। এটা কিন্তু কংগ্রেসি আন্দোলন। খিলাফত আন্দোলনের মাধ্যমেই বলা যেতে পারে গণভিত্তিক রাজনীতিতে তারা প্রবেশ করল। সুতরাং এই সময় যদি জাতীয়তা বলা হয় এখানে কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের ভাগটা ঢুকে পড়েনি। ১৯২০ এর গোড়ার বছরগুলোয়। এইটা ১৯২০ এর শেষের দিকে গিয়ে ভাঙতে শুরু করল। তার নানা কারণ আছে। বিশেষ করে আমার নিজের ধারণা, এই গণভিত্তিক প্রচারের ফলে যেটা হল, পূর্ববাংলার প্রধানত মুসলিম কৃষকদের মধ্যে আন্দোলনটা রাজনৈতিক থেকে জমির আন্দোলন, খাজনাবিরোধী আন্দোলন, জমিদারবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি খাতে চলে গেল। যার থেকে কৃষক-প্রজা পার্টির জন্ম। যার থেকে ফজলুল হকের মতো নেতা উঠে এলেন। শুধু ফজলুল হক নয় তাঁর আশেপাশে যত নেতা ছিলেন, এরা অনেকেই পরে মুসলিম লীগে গেছেন, অনেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মেজর নেতা।

এটা কি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিতরকার জিনিস না বাঙালি জাতীয়তাবাদকে তারা ভেঙে দিচ্ছে? সবটাই নির্ভর করে তুমি কিভাবে দেখবে এটাকে। যদি বল এর ঐতিহাসিক পরিণতি কী হল। পরিণতি হল ভাগের দিকে চলে যাওয়া এবং ভাগের দিকে কেন শেষ অব্দি গেল এখানেও ভারতের ঐতিহাসিক এবং বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার ঐতিহাসিকদের সাথে আমার মত খুব একটা মেলে না (হাসি)। কারণ পশ্চিম বাংলায় এই ধারণাটা একেবারে প্রবল যে, মুসলিম লিগ ও ইংরেজরা মিলে ষড়যন্ত্র করে বাঙলাকে ভাগ করেছিল সাতচল্লিশ সালে। কিন্তু এটা একেবারেই সত্যি নয়। কারণ যখন স্থির হল ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হবে তারপরে কিন্তু বাংলাতে হিন্দু নেতারাই চাইলেন যে, ভারতবর্ষ ভাগ হলে বাংলাকেও ভাগ করতে হবে। এটা সম্পূর্ণ হিন্দু নেতাদের দাবি। কারণ হিন্দু নেতারা মনে করলেন পুরো বাংলা যদি পাকিস্তানে যায় তাহলে তাদের যে অবস্থা হবে, সেটা তারা মানতে রাজি ছিলেন না। সব বাঙালি পাকিস্তানে চলে যাবে, হিন্দু নেতারা সেটা মানতে রাজি ছিলেন না। শেষ অব্দি প্রায় সার্বিকভাবে সমস্ত হিন্দু মেনে নিলেন। তারাই বাংলা ভাগ করার দাবি করেছিলেন। তাদের দাবি মেনেই শেষ অব্দি বাংলা ভাগ হল। এর মধ্যে যুক্ত বাংলায় প্রস্তাব (শরৎ বসু-সোহরাওয়ার্দি) ইত্যাদি ছিল। একেবারেই অল্প কয়েকদিন। সেটা শেষ অব্দি কেউই প্রায় গ্রহণ করেননি। বরং হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যুক্তি দেখালেন, আচ্ছা ঠিক আছে আজ যদি গোটা বাংলা স্বাধীন হয়ে যায়, মানে যুক্ত বাংলা স্বাধীন হল। ভারতেও গেল না, পাকিস্তানেও গেল না। কিন্তু এই যুক্ত বাংলা তো মুসলিম-প্রধান বাংলা হবে। পরে যদি সেখানকার মুসলিমরা বলে আমরা পাকিস্তানে যোগ দেব, তখন হিন্দুরা যাবে কোথায়? তাই যা করার আজই কর। এখনই সুযোগ আছে বাংলাকে ভাগ করার। পরে তো এখানে সিভিল ওয়ার হবে। তো এই কারণে বাংলা ভাগ হল।

এখন এবারে যদি দেখা যায় দুই দেশের জাতীয়তার ইতিহাস কী করে লেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে যে সমস্ত ইতিহাস লেখা হয় তার কিছু কিছু আমার পড়া আছে। কিন্তু সেখানে আবার অসুবিধা এই পাকিস্তানের সময়টা, সেই সময়ে তাহলে কী হল? সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর, এই সময়টা নিয়ে বলা যায় মৌনতা আছে। মানে কেউ এ বিষয়ে খুব একটা গভীরে ঢুকতে চান না। এই বিষয়ে অনেক কিছু বলা যায়। খুব স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে পাকিস্তানের ভেতরে বাঙালির অবস্থান কী হবে? গণতন্ত্রের সাধারণ নিয়ম যদি বিবেচনা করা হয় অর্থাৎ সংখ্যাগুরু কারা, সংখ্যালঘু কারা তাহলে যুক্ত পাকিস্তানে বাঙালিদেরই সবচেয়ে বেশি জায়গা হওয়ার কথা ছিল। কারণ তারাইতো সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু তা তো হল না। বরঞ্চ বাংলার ওপর উর্দু চাপিয়ে দেয়া ইত্যাদি ব্যাপার হল। আবার এটাও সত্যি যে পূর্ব পাকিস্তান আমলে নানাভাবে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের একটা ন্যায্য জায়গা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর শাসনকালে সেটা করা অবশ্য খুবই কঠিন ছিল। বিশেষ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যেখানে পাঞ্জাবি অফিসার আর সৈন্যের অমন প্রবল আধিপত্য।

একথা সত্যি একুশের আন্দোলনের পর থেকে নতুন এক বাঙালি জাতীয়তাবাদ শুরু হল। পাকিস্তানের মধ্যেই। ফলে এরপরে ইতিহাস দুটো আলাদা হয়ে গেছে। এর দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক ফলাফল কী সেটা নিয়ে অনেক রকম জিনিস ভাবা যায়। এক হচ্ছে রাজনৈতিক দিক থেকে তো আলাদা হবেই, ধরেই নিতে হবে। অর্থনীতিও সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গিয়েছে। আগে তো জোড়াই ছিল। এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি তার নিজের নিয়মে চলে আর পশ্চিম বাংলা ভারতবর্ষের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে অন্যরকম চেহারা নিয়ে নিয়েছে। আর আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ লাগে সাংস্কৃতিক দিকটা। এখন অব্দি তো আমরা ভাষার মাধ্যমে যুক্ত আছি। তুমি-আমি যে ভাষায় কথা বলছি কারো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না (উভয়ে হাসি)। কিন্তু আমার নিজের মনে হয় ভাষা ও সংস্কৃতির ওপরেও জাতিরাষ্ট্রের প্রভাব পড়ে। এবং তাতে হয়ত পঞ্চাশ-একশ বছর বাদে দেখা যাবে দুই বাংলার ভাষা আলাদা হয়ে গেছে। আমার এটা কিন্তু গভীর সন্দেহ হয়। তার কারণ বাংলাদেশের দিকে দেখলে আমার যেটা মনে হয়, এইটা একদিক থেকে বলতে পার জাতিরাষ্ট্রের একটা গুণ যে, যেহেতু ভাষার ওপর ভিত্তিটা, ওইটাই তার সবচেয়ে প্রধান ভিত্তি। ঐক্যটা কী, ঐক্যটা কোথায়? আপাতত এখন ঐক্যটা হচ্ছে ভাষায়। এবং এই একই ভাষা ইস্কুলে শিক্ষার মাধ্যমে, সংবাদপত্রের মাধ্যমে, বেতার-টেলিভিশনের মাধ্যমে একটাই মান্য বাংলা ভাষা সকলে শিখবে, এইটা যত দিন যাবে তত ব্যাপক হবে। বাংলাদেশের মধ্যেও বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষার কথা বলা হয়। কিন্তু এখন যত ইস্কুল-কলেজ-রেডিও-টেলিভিশনের মধ্য দিয়ে যাবে তত কিন্তু মান্য ভাষাটা লোকে শিখে যাবে। হয়ত বাড়িতে একরকম বলবে, বাইরে আরেক রকম কথা বলবে। এটা আমাদের এখানেও হয়। কিন্তু ওই মান্য ভাষাটা সাধারণভাবে সকলেই মেনে নেবে। এখন যেটা স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, আমি গত ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে যা দেখছি পশ্চিম বাংলায়, এখানকার কথ্য বাংলা ভাষাটা বদলে যাচ্ছে এবং সেখানে হিন্দির প্রভাব অনেক বেশি, ইংরেজির প্রভাব অনেক বেশি এবং এই বাংলার সংস্কৃতি এখন সর্বভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে জুড়ে গেছে। বিশেষ করে টেলিভিশন ও সিনেমার মাধ্যমে–এগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম তো। এর ইনফ্লুয়েন্সটা বাংলাদেশে অতটা পড়বে না। কারণ তাদের নিজস্ব আলাদা একটা ব্যবস্থা আছে। তাই আমার মনে হয় দুই বাংলার ভাষার মধ্যে তফাতটা ক্রমাগত বেড়ে যাবে। আমার নিজের কাছে সেটি দুঃখের বিষয়। কিন্তু ইতিহাসে হয়ত সেটাই ঘটবে।

সাব্বির আজম: সাতচল্লিশের পর পূর্ব পাকিস্তানে ধীরে ধীরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং একাত্তর সালে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়। একাত্তর সাল বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন?

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: একাত্তর সালে না হলেও এটা কোনো না কোনো সময়ে হত। অনিবার্য ছিল। এই যে দুই রাষ্ট্রকে একসাথে রাখার চেষ্টা হল। মূল কথাটা কিন্তু ওইখানে:ঐক্যটা কোথায় থাকবে? পাকিস্তানের ভিতরে পূর্ব-পশ্চিমের যে বিভাজন এটা একাত্তরে না হলেও অন্য কোনো না কোনো সময়ে অনিবার্য ছিল। হত এ কারণে যে, শুধু ধর্মের ভিত্তিতে একটা আধুনিক রাষ্ট্রের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করা অত্যন্ত কঠিন। ধর্ম দিয়ে তো রাষ্ট্র চালানো যায় না। রাষ্ট্রের ব্যবহারিক কাজকর্মের জন্য একটা সর্বজনগ্রাহ্য ভাষার প্রয়োজন হয়। পাকিস্তানের নেতারা ঠিক করল উর্দুই হবে সেই ভাষা। বাঙালি তা মানল না। পাকিস্তানে যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে চলত, তাহলে ক্রমশ বাঙালি প্রভাব বৃদ্ধি পেত। কারণ গণতন্ত্রে সংখ্যার জোরটা একটা বড় জোর আর সংখ্যায় বাঙালিরা বেশি। গণতান্ত্রিক পাকিস্তানে ভাষার প্রশ্নে একটা কার্যকর সমাধান পাওয়া যেত কিনা বলা মুশকিল। কিন্তু পাকিস্তানে গণতন্ত্র টিকল না। তাই ভাষার ভিত্তিতেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠল। ভারতবর্ষে যে জিনিসটা হয়েছে, ভারতবর্ষের এতগুলো ভাষা কী করে চলে? একটা জিনিস অনেকে খেয়াল করে না–তুমি নিজেও হয়ত লক্ষ করবে–আমি নিজে যখন ঢাকা যাই আর কলকাতা ফিরি, একটা জিনিস ভীষণ চোখে পড়ে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সাইনবোর্ড-বিজ্ঞাপন ইত্যাদি, ঢাকাতে গেলে মনে হয় সব বাংলা। কলকাতায় ফিরলেই মনে হয় কোন দেশে এলাম! কারণ এখানে ইংরেজির ব্যাপক প্রচলন। ভারতবর্ষের যেকোনো শহরে এই জিনিসটা আছে। ইংরেজির প্রচলন এত বেশি যেটা কখনও কেউ সরকারিভাবে স্বীকারও করবে না। এটা কিন্তু শুধু রাষ্ট্রের কাজকর্ম চালানোর প্রয়োজনে নয়, যেকোনো ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু চালানোর প্রয়োজনে। একটা সাধারণ ভাষা না হলে শুধু অনুবাদ করে করে তো কাজ চলতে পারে না। সেই জন্যে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটা বেশি। এবং মনে রাখা দরকার মুসলিম লীগের আন্দোলন এবং পাকিস্তান আন্দোলনের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা যেখানে গোড়ার দিকে প্রধানত উত্তর প্রদেশের উর্দুভাষী মুসলমান তারাই এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন। তারাই এর আইডিয়োলোগ ছিলেন। এরাই অনেকে পাকিস্তান হওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে নেতা হলেন। এবং একটা সময়ে এদেরই মনে হয়েছিল উর্দুকেই চাপাতে হবে। তা না হলে আর কোনো ভাষা নেই যা দিয়ে পুরো রাষ্ট্র চালানো যায়।

একদিক থেকে খুব অদ্ভুত লাগে পশ্চিম পাকিস্তানের কথাও যদি ভাবা হয় ১৯৪৭ সালে কিংবা ১৯৫০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে কয়জন উর্দুভাষী লোক ছিল? মোহাজের ছাড়া কেউ উর্দুভাষী ছিল না। তারা তো হয় পাঞ্জাবি নয় সিন্দি নয় বালুচ ইত্যাদি ভাষায় কথা বলত। কিন্তু শিক্ষা-ব্যবস্থার মাধ্যমে এবং সরকারি প্রচার মাধ্যমের ভেতর দিয়ে উর্দু ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হল। এইটে যখন পূর্ব পাকিস্তানে করার চেষ্টা করে তখন তারা সফল হল না। ব্যাপক বিরোধিতার কারণেই করা সম্ভব হল না। এরপর একটা বিরাট সময় গেছে এখানে সামরিক শাসক ক্ষমতায় ছিল। গণতন্ত্রের অতটা জোর ছিল না। কিন্তু যখনই এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য একটা চাপ আসতে শুরু করল, তখনই তো এটা হতে বাধ্য ছিল যে বাঙালিরা যেখানে দেশে সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী তাদেরকে বাদ দিয়ে কী করে পাকিস্তান চলে? অথচ বাঙালি নেতাদের যদি যথেষ্ট ক্ষমতা দিতে হয় তাহলে পশ্চিম পাকিস্তানের যে সামাজিক অংশ এতদিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল তাদেরকে তো ক্ষমতা ছাড়তে হবে। ফলে বিরোধটা অবধারিত ছিল। তাই আমার মনে হয় ঘটনাটা ঘটনাচক্রে একাত্তর সালে ঘটল, অন্য যেকোনো সময়েও হতে পারত। আমি কিন্তু এদিক থেকে মনে করি যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার পুরো অঞ্চলটাতে যেভাবে জাতীয়তাবাদ এগিয়েছে তাতে বাংলাদেশ অর্থাৎ ভাষাভিত্তিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র অবধারিত ছিল।
সাব্বির আজম: অনেকে বলে থাকেন বা আমাদের প্রভাবশালী ন্যারেটিভ হল একাত্তর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রম সংশোধন। কিন্তু অনেকে আবার, যেমন আহমদ ছফা বলছেন একাত্তর হল ব্রাহ্মণ্যবাদ বা এখানকার আর্যকেন্দ্রিক যে প্রভাব, সেখানে ‘অপরে’র একটা সফল প্রয়াস হল বাংলাদেশ।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: সেটা কিভাবে বলছেন আমি বুঝলাম না। কারণ সেটা যদি বলতে হয় তাহলে সাতচল্লিশ সালেই তো তা হয়েছে। ব্রাহ্মণ্য বা হিন্দু উঁচু জাতির প্রভাব বা ক্ষমতা যেটা পূর্ব বাংলায় বহুদিন ধরে নিশ্চয়ই ছিল, সেইটে তো সাতচল্লিশ সালের আগে-পরের যে সময়টা অর্থাৎ জমিদারবিরোধী আন্দোলন এইখান থেকে শুরু করে যেটা ঘটল, তারপর সাতচল্লিশ সাল, জমিদারি বিলোপ এবং হিন্দু বিশেষ করে সম্পত্তিবান হিন্দুদের পূর্ব বাংলা ছেড়ে পশ্চিম বাংলায় চলে আসা–এতেই তো ব্রাহ্মণ্যবাদের বা উচ্চবর্ণ হিন্দুদের প্রভাব কমে গেছে। কারণ পূর্ব বাংলায় যে হিন্দুরা থেকে গেলেন তারা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র, তারাই এখনো ওখানে আছেন। বড় জমিদার, বড় বড় ব্যবসায়ী তারা কেউই থাকেননি।
FullSizeRender
সাব্বির আজম: বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে পরে আমরা যেটা দেখলাম। একাত্তরের পরে। আপনি একটু আগে হোমোজেনাইজ করার কথা বললেন, সেখানে সংখ্যালঘুদের কী হবে। বাঙালি ছাড়া অপরাপর যে জাতিগুলো আছে–বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী কিংবা বিহারি–আজ ৪৪ বছর হয়ে গেল এরা এখনো একদম প্রান্তিক অবস্থায় পড়ে আছে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: ঠিকই। বাংলাদেশে এই সমস্যাটা আরো কঠিন হয়ে গেছে, কারণটা খুব অদ্ভুত। কারণ অন্য অনেক বড় বড় জাতিরাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশ কিন্তু এমনিতেই অনেক বেশি হোমোজিনিয়াস। মানে ওখানে যাদেরকে মাইনরিটি বলা হয় তাদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। সংখ্যায় কম বলেই তাদের প্রভাবটা অনেক কম। রাজনীতিতে এদের প্রভাব নেই। অন্যান্য দেশে যেরকম মাইনরিটি যদি একটা জনসংখ্যার ১০ শতাংশ, ১২ শতাংশ কিংবা ১৫ শতাংশ হয় তাহলেও কিন্তু তাদের কিছুটা প্রভাব থাকে। বা একেকটা অঞ্চলে যদি প্রভাব বেশি থাকে তাহলেও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা তাদের দাবি-অভিযোগ জানাতে পারে। বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা এতই অল্প যে নিজেদের পক্ষে এটা জানানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেকারণে বাংলাদেশে যারা প্রভাবশালী অংশ তাদের মধ্যে বরঞ্চ এই বিষয় নিয়ে অনেক বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সিভিল সোসাইটি বা বুদ্ধিজীবীরা যদি এই সংখ্যালঘুদের হয়ে তাদের কথাটা না বলে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে তাদের কথাটা নিজেদের পক্ষে জানানো, নিজেদের পক্ষে জোর দিয়ে একটা কিছু আদায় করা, আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব বলে মনে হয়।

সাব্বির আজম: ইভেন আমাদের সংবিধানে পর্যন্ত স্পষ্ট করে লেখা ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি বলে অভিহিত হইবে’ (নজরটান আমার)।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: সেতো বলে দেয়া হল ‘অভিহিত হইবে’। মুশকিলটা এইখানে যে, মাইনরিটি তো অনেক রকম হতে পারে। তারা বাঙালি হতে পারে, কিন্তু তারা অন্যদিক থেকে ভিন্ন। ধর্মের দিক থেকে ভিন্ন। আবার অনেকে যেই অর্থে বাংলাভাষা তাদের নিজস্ব ভাষা নয় তারাও তো হতে পারে। সংখ্যাগুলো খুব কম। এইজন্য আবার ভাষার দিক থেকে যেটা হয়ে থাকে, এটা ভারতবর্ষে কেন অন্যান্য অনেক দেশেই হয়েছে স্বল্পসংখ্যক মাইনরিটি ইস্কুল-কলেজের শিক্ষা-ব্যবস্থা, প্রচার মাধ্যম বা বিভিন্ন রকমের বিনোদন-মাধ্যম যেমন সিনেমা ইত্যাদির মাধ্যমে যে মাইনরিটি গোষ্ঠীর ভাষা আলাদা তারা কিন্তু এই ভাষাটা অনেক বেশি আত্মস্থ করে নিতে পারে, শিখে নিতে পারে এবং শিখে নেয়ার একটা ব্যবহারিক চাপও থাকে। তারা শিখে নিতে রাজিও হয়। যারা বয়োজ্যেষ্ঠ তারা হয়ত পারছে না কিন্তু অল্পবয়সীরা ঠিকই শিখে নেবে। এখন এটা আমাদের ভারতবর্ষেও সত্যি, সাঁওতালরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাদের নিজেদের ভাষা আছে। সাঁওতালি ভাষার ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় এটার চেষ্টা হয়েছে এটাকে একটা লিখিত ভাষা করার, একটা বই লেখা ইত্যাদি ইত্যাদি। বাংলাদেশে বোধহয় চাকমাদের মধ্যে এরকম চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু অন্যান্যদের বেলায় যেমন সাঁওতাল বা গারো তাঁদের বেলায় হয়তো তাদের ভাষা প্রধানত কথ্য ভাষায়ই থেকে গেছে। এখন শুধু একটা কথ্যভাষা নিজেদের সমাজের মধ্যে ধরে রাখতে পারবে। কিন্তু আদিবাসী ছেলেমেয়েরা যদি এবার ইস্কুলে যেতে চায় বা তারা যদি ভাবে আমাদের আগের জেনেরেশনের লোকরা যেসব কাজ করত আমরা সেসব করব না। অন্য রকম সুযোগ চাই। সেজন্য তারা বাংলা শিখে…

সাব্বির আজম: আমাদের আদিবাসী বন্ধুবান্ধবরা স্কুল-কলেজে বাংলা-ইংরেজিই শিখতেছে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্য অনেক রকম দিক থেকে তাঁরা তাদের সাংস্কৃতিক শুধু নয়, নানারকম সামাজিক ও প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে তাদের ‘ভিন্নতা’ ধরে রাখারও একটা তাগিদ থাকবে। এবং তারা তো মনে করতেই পারে যে জোর করে আমাদেরকে সবার মতো করার চেষ্টা চলছে। এইখান থেকেই তাদের মধ্যে একটা ক্ষোভ ইত্যাদি তৈরি হয়। বাংলাদেশে যেহেতু এদের সংখ্যা খুবই অল্প সেইজন্য সমস্যাটা আরেকটু জটিল হয়ে গেছে।

সাব্বির আজম: আরেকটা জিনিস, বাংলাদেশে অনেকের মধ্যে বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্ব নিয়ে ডিলেমা কাজ করে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: চিরকালই বাঙালিত্ব আর মুসলমানিত্ব একরকমভাবে মিলমিশ করে নেয়া হয়েছে। এটাতো আজকের ঘটনা নয়। ইতিহাসে বহু দেখা যায় যে, উত্তর ভারত থেকে বা আরব থেকে এসে প্রচারক বলে তোমরা কী মুসলমান, তোমরা কিছুই জান না। চিরকালই এই জিনিস হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তো বাঙালি মুসলমান সত্তা তৈরি হয়েছিল। এবং সেটাও সারা বাংলায় এক রকম তা নয়। চট্টগ্রামে মুসলমানদের যেরকম রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার তার সঙ্গে হয়ত বর্ধমানের মুসলমানদের বিশেষ মিল পাবে না। এখানে যেটা হয়েছে, আমার মতে এটাও বহুদিক থেকে নতুন, খানিকটা আধুনিকতার প্রভাবেই এই জিনিসটা তৈরি হয়েছে। ধর্মের মধ্যেও ওই যেটা বললাম হোমোজেনাস করার চেষ্টা–এই তাগিদটা এসে গেছে। ফলে এখন বলা হবে আরবের মুসলমানের মতো হচ্ছ না কেন। তার জন্য যথেষ্ট প্রচারকও আছে, প্রতিষ্ঠানও আছে। বাংলাদেশে কেন আমাদের এখানেও একই জিনিস হয়। এটা শুধু বাঙালি আর মুসলমানদের মধ্যে সামঞ্জস্য আনার সমস্যা না। অন্য ভাষাভাষী অঞ্চলেও একই কথা শুনি।

ইসলাম তো এই অঞ্চলে আজকের ধর্ম নয়। শত শত বছর চলছে। প্রত্যেক অঞ্চলে তার নিজস্ব রীতিনীতি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক নানা আচার-ব্যবহার তৈরি হয়ে গিয়েছে এবং সব জাগাতেই মুসলমানের পাশাপাশি অমুসলমানদের সঙ্গে তাদের সামাজিক সম্পর্ক সবসময়ই তৈরি হচ্ছে। ফলে সেসব মিলেমিশেই একেকটা অঞ্চলে একেক রকম লোকাচার, দেশাচার তৈরি হয়েছে। সে ধর্ম বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান এগুলো মিলে। এখন অনেক সময় বলা হচ্ছে আঞ্চলিক বা একেকটা অঞ্চলে যে লোকাচারভিত্তিক আলাদা আলাদা মুসলমান, একেকটা ধর্মের সামাজিক সত্তা এই আলাদা থাকবে কেন? সারা পৃথিবীতে মুসলমান একরকম হওয়া উচিত। এইটা একটা নতুন দাবি। আমার মনে হয় যতই চেষ্টা করা হোক এটা হতে পারে না। কোনো ধর্মের ক্ষেত্রেও হয়নি। সারা পৃথিবীর সব ক্রিশ্চিয়ান একরকম–এটা আদৌ সত্য নয়। সুতরাং এটা কখনোই হওয়া সম্ভব না। এবং যেটা হচ্ছে বা হবে যে এক সময়ে বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের মধ্যে যে একধরনের সামঞ্জস্য তৈরি করা হয়েছিল ঠিক সেইভাবে হবে না। একটা নতুন রকমের ব্যালান্স আসতে পারে। এখন হয়ত আমরা সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এই দুটোর বিরোধ অনন্তকাল চলতে পারে না। বিরোধ চলতে থাকলে তা কারো পক্ষেই ভালো না।

সাব্বির আজম: পার্থ-দা, আপনার বাবা-মা তো বাংলাদেশ থেকে হিজরত করে কলকাতায় আসছেন। সেই সময়ে তাদের যে স্ট্রাগল…

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: আমার জন্ম সাতচল্লিশ সালেই। আমার বাবা-মা দুজনেই পূর্ব বাংলার লোক। আমাদের আদি বাড়ি ছিল ফরিদপুরে। আমরা ছিলাম যাকে বলে একেবারে দরিদ্র ব্রাহ্মণ। জমিজমা ইত্যাদি কোনো কালেই ছিল না। আমার ঠাকুরদা অনেক আগে, যদ্দুর জানি ১৮৯০-এর দিকে ঢাকায় চলে গিয়েছিলেন। ঢাকায় উনি বি.এ. পাশ করেছিলেন। তারপরে রংপুরে সরকারি চাকরি করতেন। রংপুরের কোর্টে। কিন্তু অল্প বয়সে মারা যান। আমার বাবা বা তার ভাইবোনরা তখন রংপুরেই থাকতেন। বাবা পরে কলকাতায় পড়তে আসেন। ১৯৪৭-এ আমাদের বাড়িতে উনিই একমাত্র কলকাতায় চাকরি করতেন। উনি তখন কলকাতার কলেজে পড়ান।

আমি যে বাড়িতে জন্মাই সেটা ভাড়া বাড়ি। সেখানে আমি ছোটবেলায় প্রায়ই ঘুম থেকে উঠে দেখতাম অপরিচিত লোকজন বাক্সপেটরা নিয়ে চলে এসেছে। তাদের আমি চিনি না। শুনলাম তারা অমুক-তমুক ইত্যাদি। তারা এসে কিছুদিন আমাদের বাড়িতে থাকতেন। তারপর অন্যখানে বাসা ঠিক করে চলে যেতেন। এইটা ছোটবেলায় বহুদিন পর্যন্ত আমি দেখেছি। আর আমার মায়ের বাবা-মা কোনোদিন এদিকে আসেনি। তারা ঢাকাতেই ছিলেন, ঢাকাতেই মারা গেছেন। আমার মামাও ঢাকাতেই থাকতেন। তারপরে ওরা মারা যাওয়ার পর মামা ১৯৫৯ কি ৬০ সালে কলকাতায় চলে আসেন। এখনও ঢাকাতে মায়ের দিকের অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে। কিন্তু আমার আত্মীয়-স্বজন প্রায় সকলেই আমাদের এখানে যাকে বলে রিফিউজি। অনেকেরই এখানে প্রথমদিকে সম্বল-টম্বল কিছু ছিল না। তারা অনেকেই এখানে রিফিউজি কলোনি যেগুলো হয়, এই দক্ষিণ কলকাতায়, তারা এসব জায়গায় থাকতেন। ফলে আমার ছোটবেলা থেকেই আমরা যে রিফিউজি, অন্য জায়গা থেকে এসেছি–এই ধারণাটা খুবই ছিল।

সাব্বির আজম: সেটা কি আপনার লেখালেখিতে কোনো প্রভাব ফেলছে?

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: সেটাতো বলা মুশকিল। হয়ত ফেলছে। ফেলছে এই কারণে যে একটা জিনিস আমি বলব, অনেকের ক্ষেত্রে যেটা হয় পূর্ব বাংলার জীবন নিয়ে ভীষণ নস্টালজিয়া আছে। আমি ছোটবেলা থেকে এগুলো শুনে আসছি, আমার সেটা হয় না। এখন এইটা হয়ত খানিকটা আমার লেখাপড়ার জন্যই হবে,আর তো কোনো কারণ নেই, এই নস্টালজিয়াটা কখনোই আমার মধ্যে নেই। আমার মধ্যে পূর্ব বাংলার জীবন নিয়ে রোমান্স ইত্যাদি নেই। বিশেষ করে বাংলার অর্থনীতি নিয়ে যখন কাজ করতে শুরু করি তখন পূর্ব বাংলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে জমিদারি ব্যবস্থার প্রভাব এবং জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে পূর্ব বাংলার উচ্চবর্ণ হিন্দু সমাজের প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং তার যে গভীর সম্পর্ক–তা আমার কাছে অনেক বেশি স্পষ্ট হয়েছে। তার মধ্যে মুসলমান এবং নিচু জাতের হিন্দু–নমঃশূদ্র বা এধরনের জাতির প্রতি অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা এবং বহু ক্ষেত্রেই অত্যাচার… এ বিষয়ে আমি এত পড়েছি যে পূর্ব বাংলা থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ যারা এদিকে এসছেন তাদের মুখে যেসব নস্টালজিয়ার গল্প শুনি আমার কাছে সেটা একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। ফলে খানিকটা এ কারণেই হয়ত আমি যা বলি বা লিখি, সকলের হয়ত পছন্দ হয় না।

সাব্বির আজম: কিন্তু দুই বাংলাতেই পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশে কালচারাল ফ্রন্টে যারা কাজ করে, মানে যারা সংস্কৃতিকর্মী বা বুদ্ধিজীবী তারা বলে যে বাংলা ভাগ অনিবার্য ছিল না বা এপার বাংলা-ওপার বাংলা বইলা কিছু নাই।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: দেখ, ঐতিহাসিক হিসেবে আমার পক্ষে এটা মানা কঠিন। কারণ তাহলে তো বলতে হয় জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশই থাকার কথা না। এই কথা যারা বলে এইবারে তাদেরকে যদি স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করা হয়:আচ্ছা ঠিক আছে দুই বাংলা যদি যোগ হয়ে যায়, আপনি আজকে রাজি হবেন? কারণ তাতে কিন্তু এখানে পশ্চিম বাংলায় উচ্চবর্ণ হিন্দুর আজকে যে প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে সেটা চলে যাবে।

সাব্বির আজম: এখনো তারা রাজি হবেন না।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়: হবে না তো। কিন্তু তারা জানে এই জিনিসটা কখনো সম্ভব নয়। সেই জন্যে এই কথাটা বলা অনেক বেশি সহজ। তাই ঐতিহাসিকভাবে এ ধরনের কথা একেবারেই মানতে পারি না।

সাব্বির আজম
: আমি ওইটাই বলতে চাচ্ছিলাম। কালচারাল ফ্রন্টে তারা…কিন্ত পলিটিকসে যখন আসে তখন ধরেন এত সীমান্ত হত্যা হচ্ছে সেটা নিয়ে কিংবা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে তারা কিছু বলে না।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: ঠিক। আমি তো সেটাই বলছি। এখন এটা নিশ্চয়ই কেউ বলতেই পারেন এই সমস্ত রাজনৈতিক বিবাদে আমি কী করতে পারি, আমি তো শিল্পী। আমি তো কিছু করতে পারি না। শিল্পী-সাহিত্যিক-লেখকদের মধ্যে দুই বাংলায় যদি যোগাযোগ আরো বেশি হয় তাহলে তো ভালোই। আমার তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু তাই বলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যে ফারাক এগুলো তো সত্য। ভুলে গেলে চলবে না আজকে বাংলাদেশে যে ধরনের সাংস্কৃতিক কাজকর্ম হয়, যেগুলো আমরা দেখতে পারি, যেটা এই বাংলার লোকেরাও স্বীকার করেন হ্যাঁ, অনেক ভাল কাজ হয় আজকাল। ওখানে একটা জাতিরাষ্ট্র হয়েছে। নিজস্ব একটা গর্বের ব্যাপার আছে। নিজেদের সংস্কৃতি আরো বেশি করে জোরদার করার তাগিদও আছে। তার ফলেই তো এ জিনিসটা ঘটেছে। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক যোগাযোগ থাকুক এইটা আমি সবসময়ই চাইছি। বলছি না তা হওয়া উচিত না। কিন্তু সেটা এই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সত্যগুলোকে অস্বীকার করে নয়।

সাব্বির আজম: আপনার লেখালেখিতে আপনি যখন পেজেন্ট হিস্ট্রি নিয়ে লিখতেছেন তখন আমরা বাংলার একটা কম্বাইন্ড হিস্ট্রি পাই। কিন্তু তারপরে যখন দুই ইতিহাস আলাদা হয়ে যাইতেছে তখন আর এই বাংলার অর্থাৎ বাংলাদেশের ইতিহাস আপনার লেখায় সেন্ট্রালিটি পাচ্ছে না।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: আমার অনেক সময়ই মনে হয়েছে এটা হয়ত আমি কোনো সময় লিখে উঠতে পারব, গোটা বিংশ শতাব্দী ধরে দুই বাংলা মিলে একটা ইতিহাস লেখা যায় কিনা। সেই ইতিহাসটা লিখতে গেলে এইটাই দেখাতে হবে কী করে সাতচল্লিশের পর থেকে এই দুটো ইতিহাস আলাদা হয়ে গেল। আলাদা হয়ে গেল এবং ক্রমাগত আলাদা হয়ে যাচ্ছে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তার কারণগুলো কী, সেগুলো কী প্রক্রিয়ায় আলাদা হয়ে গেছে এটা নিশ্চয়ই অনেক গবেষণা করে লেখার মতো বিষয়। কিন্তু আলাদা হয়ে যাচ্ছে এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই, উপায়ও নেই।

সাব্বির আজম: উনিশ শতক নিয়ে একটা প্রশ্ন। সত্তরের দশকে অশোক সেন, বরুণ দে বা সুমিত সরকার তারা যেভাবে উনিশ শতককে দেখছিলেন, কলোনিয়াল বাস্তবতার ভিতর উনিশ শতককে দেখা, রেনেসাঁকে দেখা। আপনার লেখাতেও সেটার প্রভাব ছিল। আপনার ন্যাশনালিস্ট থট বইয়ের মধ্যে আছে অথবা “মেকলে’স পয়জন ট্রি” প্রবন্ধের মধ্যেও আমরা পাই। পরবর্তীতে আপনার লাস্ট যে বই জনপ্রতিনিধি এখানে ‘আবার রামমোহন’ প্রবন্ধে দেখলাম আপনি আগের অবস্থান থেকে সরে আসতেছেন।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: ঠিক। এইটা আর কিছু না। যেহেতু আমি ওই সময়টা নিয়ে পরে আরেকটু বেশি করে খোঁজ করে, বিশেষ করে রামমোহন রায় সম্বন্ধে অনেকগুলো জিনিস দেখলাম। তিরিশ বছর আগে ওরা যেগুলো বলেছিল তখন আমিও সেই মতটা গ্রহণ করেছিলাম। তখন আমি নতুন করে কিছু বলেছিলাম তা নয়। ওদের মতটাই মেনে নিয়েছিলাম। কারণ ওরা এই বিষয়টা ভালো করে দেখেছিলেন। আমার এখন যেটা মনে হয় উনিশ শতকের গোড়ার দিকটাকে জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে না দেখলেই বরং ওই পর্বটা আসলে কী ছিল সেটা বোঝা অনেক সহজ হয়। কারণ এই প্রশ্নটা তখনও হয়ত খচখচ করত যে রামমোহন রায়কে জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের সঙ্গে মেলাতে গিয়েই তো মূল সমস্যাটা হচ্ছে। অর্থাৎ রামমোহন রায় জাতীয়তাবাদী ছিলেন কিনা। রামমোহন রায় এত ব্রিটিশের কাছে কাছে ছিলেন, তিনি স্পষ্ট করে বলছেন আরো বেশি করে ইংরেজ আসুক এদেশে। আরো বেশি করে ইংরেজ এলেই বরং আমরা আরো সভ্য হব। এই রকমের কথা তাঁরা বলেছেন। অশোক সেন, বরুণ দে, সুমিত সরকার ওদের অস্বস্তিটা ছিল এখানটায়। তাই ওঁরা বলতে চাইছেন ওটা আসলে মেকি রেনেসাঁস, সম্পূর্ণ উপনিবেশকে সমর্থন করার রাজনীতি। ওর মধ্যে আর কিছু খোঁজার নেই।

এইভাবে চিন্তা করার কারণ হচ্ছে বারে বারে কিন্তু তারা এইটেই মনে করছেন যে, রামমোহন রায়ের কাজকর্ম বা কথাবার্তার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ কী করে মেলে? আমার মতে, জাতীয়তাবাদের পর্ব যদি আলাদা করে দেখা হয় এবং এই আগের পর্বটা অর্থাৎ উনিশ শতকের গোড়ার দিকটা জাতীয়তাবাদের পর্ব নয়। এবং এই আগের পর্বটায় আরো কতগুলো জিনিস ছিল যেটা পরবর্তীকালে গরহাজির ছিল বলেই জাতীয়তাবাদ অনেক বেশি প্রবল হয়েছিল। বিশেষ করে আমি এখানে দেখবার চেষ্টা করেছি যে, ওই আঠারশ দশ-বিশ-ত্রিশ পর্যন্ত এই কলকাতা শহরে ইংরেজ এবং ভারতীয়র পার্টনারশিপে ব্যবসা-বাণিজ্য পর্যন্ত হয়, প্রত্যেকটা সভা-সমিতিতে ইংরেজ-ভারতীয়র পার্টনারশিপ হয়, এই জিনিসটা কিন্তু ১৮৪০-৫০ এর পরে ভেঙে গেল। রামমোহন রায় কিংবা দ্বারকানাথ ঠাকুর এরা এই পার্টনারশিপের রাজনীতি এবং পার্টনারশিপের অর্থনীতিকে এতটা বিশ্বাস করতে পেরেছিলেন তার কারণ হচ্ছে এরা কিন্তু লিবেরাল ইংরেজদের কথা ‘তুমি কোন জাতের তাতে এসে যায় না, তুমি কোন ধর্মের তাতে এসে যায় না, আমরা ব্যবসা করব। তোমার একটা অধিকার আছে, আমার অধিকার আছে। এসো আমরা পার্টনারশিপ করি। আমাদের মধ্যে চুক্তি হবে। সেই চুক্তি অনুযায়ী আমরা পার্টনারশিপ করব।’ এখানে তো আর কিছু দেখার দরকার নেই। ওরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিল এইটা হলেই দেশের উন্নতি হবে। এবং ইংরেজ হোক, ভারতীয় হোক তাতে কিছু এসে যায় না। নাগরিক হিসেবে সবাই এক।

কিন্তু এই বিশ্বাসটাতো আসলে ভুল ছিল। কারণ ওনার ইংরেজ বন্ধুরাই এটা মানল না। যখনই এই প্রশ্ন উঠল যে, ভারতীয় এবং ইংরেজদের অধিকার কি এক? তখন ওদের বলতেই হল, না, না ভারতীয় আর ইংরেজদের অধিকার এক নয়। কারণ তাই যদি হবে তাহলে ইংরেজ শাসন কেন? তাহলে তো ইংরেজ শাসনের কোনো অর্থ হয় না। এজন্যেই পরবর্তীকালে যে জাতীয়তাবাদ এল তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একই প্রতিষ্ঠানে ইংরেজ এবং ভারতীয় সমান অধিকার নিয়ে থাকতে পারে এই ধারণাটা ভেঙে গেল। তারপরই আমরা যাকে জাতীয়তাবাদ বলি সেই জাতীয়তাবাদ এসছে। ফলে আমার সাম্প্রতিক যেসব লেখার কথা বললে, সেখানে আমি অনেক বেশি স্পষ্ট করে দেখানোর চেষ্টা করেছি যে রামমোহন রায় বা দ্বারকানাথকে জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের সঙ্গে টেনে না দেখলে বরং ওঁদের কাজকর্মকে আরেকটু স্পষ্ট বোঝা যায়।

সাব্বির আজম: কিন্তু কলোনিয়াল বাস্তবতায় রামমোহন বা দ্বারকানাথরা যে স্বপ্ন দেখছে সেটা তো তাদের ইংরেজ বন্ধুরাই নস্যাৎ করে দেন।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: সেইটে তো আজকে আমরা বুঝতে পারছি যে সম্ভব না। কিন্তু ওদের কাছে ধারণাটা কী ছিল? ওরা কিন্তু ভীষণভাবে আমেরিকাকে দেখতেন। ওদের বক্তব্য হচ্ছে আমেরিকাতে এটা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন জাতির ইয়োরোপের লোকে গিয়েছে। সেখানে রাজা নেই, ইকুয়াল রাইট, সেখানে একটা কন্সটিটিউশন আছে। এইখানেতো এইরকম ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে। তো ভারতবর্ষ আমেরিকা হবে না কেন?

সাব্বির আজম: আমেরিকার বাস্তবতা আর এখানকার বাস্তবতা কি এক?

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: বাস্তবতা যে আলাদা এইটে আমার ধারণা ওরা জীবতকালে বুঝেনি। পরবর্তীকালে যে বুঝল তার মূল কারণ হল: একের পর এক নানা ধরনের ঘটনা। যেমন সিভিল সার্ভিসে ইংরেজ আর ভারতীয়ের বৈষম্য, ইংরেজি শিক্ষিত ভারতীয় যে বিদ্যা-বুদ্ধি সব দিক দিয়ে ইংরেজের সমকক্ষ, শাসনব্যবস্থায় তাকে জায়গা না দেওয়া, তাকে অসম্মান করা। এই সব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে শিক্ষিত ভারতীয়রা বুঝতে পারল যে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় ইংরেজ আর ভারতীয়দের ভেতর পার্টনারশিপ ব্যাপারটা অসম্ভব। যেখান থেকে জাতীয়তাবাদের প্রথম যে আলাপগুলো করছিলাম আমরা যে জাতীয়তাবাদের উদ্ভবটা কোন জায়গা থেকে হচ্ছে এই যে সমস্ত ইংরেজি শিক্ষিত ভারতীয়, ইংরেজদের শাসন ব্যবস্থার মধ্যে তারা কাজ করতে ঢুকছে। তারা হয়ত ওকালতি করছে কি জজ হচ্ছে। ডিসট্রিক্ট জজ। একজন ভারতীয় ডিসট্রিক্ট জজ, সে কি ইংরেজের মামলায় জজ হতে পারবে? এই নিয়ে গোলমাল বেঁধে গেল। কলকাতায় হলে সোজা নিয়ে যেত হাইকোর্টে যেখানে ইংরেজ জজ আছে। কিন্তু মফঃস্বলে যদি হয়? ওখানে তো ইংরেজ জজ নেই। তাহলে কি হবে? ওইখানে বলা হল, না ওকে সোজা কলকাতায় আসতে হবে। জেলাতে হলেও কলকাতাতে এসে মামলা করবে কারণ ইংরেজ জজ পাওয়া যাবে। ইংরেজ জুরি পাওয়া যাবে। ভারতীয় জজ ইংরেজদের কেসে বিচার করবে কিভাবে? এইখানে কিন্তু ডিসক্রিমিনেশনগুলো কত গভীরে এই প্রশ্ন উঠল। সিভিল সার্ভিসে এরা অনেকেই ছিলেন, বিহারীলাল গুপ্ত যিনি সিপাহী বিদ্রোহের ওপর ইতিহাস লিখেছিলেন। তিনি আই.সি.এস। বিহারীলাল গুপ্তকে নিয়েই এই গন্ডগোলটা শুরু হয়। উনি কোনো একটি জেলার জজ তখন। তাঁর এজলাসে ইংরেজের মামলা আসল। সেই ইংরেজ কাউকে মেরেছিল হয়ত। ক্রিমিনাল মামলায় তাঁর কোর্টে এসছে। ইংরেজরা বলল এইটে কী করে হয়! ভারতীয় জজ কী করে এর বিচার করবে? এভাবে হবে না। জেলার মামলা হলেও কলকাতায় নিয়ে আসা হবে। রামমোহন রায় বা দ্বারকানাথের সময় ওরা অতটা বুঝতে পারেনি। সেকারণে ওনাদেরকে জাতীয়তাবাদী বলা বা জাতীয়তাবাদী কিনা এই প্রশ্নটাই আমার কাছে উচিত প্রশ্ন বলে মনে হয় না। কারণ ওটার যে প্রেক্ষিত তার মধ্যে ওঁরা পড়েন না।

সাব্বির আজম: যোগেন মন্ডল প্রসঙ্গে আসি। আপনি লিখছেন ‘সঠিক স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে গণ-সমাবেশের সম্ভাব্য আচরণ সম্বন্ধে সঠিক অনুমান করার ক্ষমতা।’ যোগেন মন্ডল তাঁর নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য সঠিক স্ট্র্যাটেজির হদিস পান নাই। কে কখন কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সঠিক স্ট্র্যাটেজিটা (বা মহাভারতের ভাষায় ‘নীতি’) খুঁজে পাচ্ছে এইটা কিভাবে নির্ধারিত হবে?

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: এটাতো আমাদের পক্ষে বিচার করার… ঐতিহাসিকভাবে তাদের উদ্দেশ্যটা সফল হল কি হল না সেখানে। এবারে যদি বিশ্লেষণ করা যায় কেন সফল হল না। যেমন যোগেন মন্ডলের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় উনি যে স্ট্র্যাটেজিটা ভেবেছিলেন, এক অর্থে মুসলমান ও নমঃশূদ্র প্রজা এরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কারণ এদের আসল শত্রু হচ্ছে উচ্চবর্ণ হিন্দু জমিদার। তার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই। সেখানে আমরা হাত মেলাতে পারব না কেন? কিন্তু সারা বাংলাতে কি এই স্ট্র্যাটেজিটা চলে? চলে না। তার কারণ নমঃশূদ্র ও মুসলমান মোটামুটি একই সংখ্যায় আছে এরকম দুটো তিনটে জেলা। দুই তিনটা জেলায় ওই স্ট্র্যাটেজিটা সম্ভব। যেখানে পশ্চিম বাংলার জেলায় মুসলিমদের সংখ্যা নগণ্য, এই ধরনের তথাকথিত অস্পৃশ্য জাতির সংখ্যা অনেক। কিন্তু তাদের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। নমঃশূদ্রের মধ্যে সেই সময় একটা অংশ অন্তত খানিকটা জমিজমার মালিক, তাদের খানিকটা আর্থিক সংগতি এসছে, তাদের বাড়িতে যোগেন মন্ডলের মতো একজন জন্মেছেন, এরকম আরো বেশ কয়েকজন ছিল যারা ইস্কুল পাশ করে গ্রাজুয়েট হচ্ছে, তারা স্বাধীন পেশা যেমন ওকালতির মধ্যে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র হলেও মিডিল ক্লাসের মতো তৈরি হচ্ছে। এরকম কিন্তু পশ্চিম বাংলার তথাকথিত অস্পৃশ্য জাতির মধ্যে নেই। তাহলে পশ্চিম বাংলার তথাকথিত অস্পৃশ্য জাতি মুসলিমদের সঙ্গে হাত বেঁধে কী লড়াই করবে? বরিশাল, ঢাকা, ফরিদপুর এই অঞ্চলের জন্য যেটি সঠিক স্ট্র্যাটেজি হতে পারত, সেইটা উনি সারা বাংলা বা সারা ভারতের জন্য এই স্ট্র্যাটেজি বেছে নিলেন।

শেষ অব্দি উনি ব্যর্থ হলেন কারণ অন্য শেডিউলড কাস্ট নেতাদের কেউই তেমন একটা তার সঙ্গে ছিলেন না। যখন পার্টিশান হল তখন বাংলার এসেম্বলিতে মোট ত্রিশ জন শেডিউলড কাস্ট মেম্বার ছিলেন। তার মধ্যে মাত্র পাঁচ জন যোগেন মন্ডলের সাথে ছিলেন। বাকিরা পার্টিশানের পক্ষেই ছিলেন।

সাব্বির আজম: শেষ প্রশ্ন। সাম্প্রতিককালে কি নিয়ে লেখালেখি করতেছেন জানতে চাই।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: (হাসি) সাম্প্রতিককালে, যে কথাটা আগে হচ্ছিল, আমি একটা নতুন কাজে হাত দেব বলে মনে করছি। সাতচল্লিশের পার্টিশান এবং পূর্ব বাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তুদের পশ্চিম বাংলার সমাজ রাজনীতি অর্থনীতির ওপরে প্রভাব–এইটা নিয়েই আমি খানিকটা লিখতে চাই। এক অর্থে এটা খানিকটা আত্মজীবনীর মতোই হবে। কিন্তু বিষয়টা আরেকটু তলিয়ে দেখতে চাই। কারণ এইখানে বহু জিনিস ইচ্ছে করে ভুলে যাওয়া হচ্ছে। মানে মনে করতে চাই না বলে মনে পড়ছে না। কিন্তু এখনো এই ইতিহাসটা খুঁজলে পাওয়া যাবে। এরপরে হয়ত অনেক কিছুই পাওয়া যাবে না। এটা নিয়েই ভাবছি। কাজটা এখনো খুবই প্রস্তুতির পর্যায়ে আছে। আমি যেটা করতে শুরু করেছি সেটি হল ১৯৪৭ সাল থেকে খবরের কাগজ পড়ছি। উনপঞ্চাশ সাল পর্যন্ত এসছি। প্রতিদিনই অল্প অল্প করে পড়ছি।

সাব্বির আজম: ধন্যবাদ পার্থ-দা।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়: তোমাকেও ধন্যবাদ।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (12) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md.ataur rahman — মার্চ ২২, ২০১৭ @ ৩:৩৭ অপরাহ্ন

      what happened in 1947?
      British were very clever because they wanted to keep all kind of problem in this subcontinent.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোঃ কামরুল হাসান — মার্চ ২২, ২০১৭ @ ৪:৪৭ অপরাহ্ন

      বহু বছর পর এর রকম একটা অতি ভালমানের সাক্ষাতকার পড়লাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পলিয়ার ওয়াহিদ — মার্চ ২২, ২০১৭ @ ৯:০৯ অপরাহ্ন

      পড়ে ফেললাম। বঙ্গভঙ্গের কাহিনি হালকা-পাতলা সবারই জানা কিন্তু সেখানে ছিল ইতিহাসের কুয়াশা! আজ পুরোপুরি ক্লিয়ার হলাম। এমন সত্যকথন ও সাহসী উচ্চারণের জন্য পার্থ দাকে স্যালুট। ভালোবাসা সাব্বির আজম এতো তথ্য আর তত্ত্ববহুল সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে পাঠকের সামনে উপস্থাপনের জন্য। ধন্যবাদ বিডি নিউজকে। লেখাটা ফেসবুকে শেয়ার করলাম। একটা কথা এখানে না বললেই নয়; আমার মনে হয় বাংলাদেশের ভেতরগত এখনো যত দ্বন্দ্ব আছে তার জন্যও হিন্দু বাউনরা কম দায়ী নয়!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শামীম খান — মার্চ ২৩, ২০১৭ @ ১:২৬ পূর্বাহ্ন

      অনেক সত্য জানলাম। অনেক কিছু নতুন করে শিখলাম। ধন্যবাদ সাব্বির ভাইকে। শ্রদ্ধা পার্থদা’র জন্য। ওপারে যারা চলে গিয়েছেন তাদের জন্য আজো মাঝে মাঝে আবেগপ্রবন হয়ে পড়ি। জানি আর এক হবে না, তবু যোগাযোগ থাকুক, ভালবাসা থাকুক। যতদিন আকাশ নীল থাকবে, গাছে গাছে পাখীরা গান গাইবে, নদী বইবে কূলকুল সুরে স্বাধীন বাংলাদেশ তার ভাষা আর সংস্কৃতি নিয়ে আপন গতিতে চলতে থাকবে সমুখপানে। আগ্রাসনের এই যুগে যদি কোনদিন মন কাঁদে, এপারের দরজা চিরদিন খোলা রইবে জেনো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শামস আরেফিন — মার্চ ২৩, ২০১৭ @ ১২:০৮ অপরাহ্ন

      পার্থ দা ও সাব্বির আজমকে অনেক ধন্যবাদ ইতিহাসের সত্যটা আমাদের জানানোর জন্য। ধন্যবাদ বিডি নিউজ আর্টসকে যারা এ সাক্ষাৎকারটা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাজ — মার্চ ২৫, ২০১৭ @ ১২:০৬ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ! অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক সাক্ষাৎকার, তবে বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় রবিঠাকুরসহ সেসময়ের হিন্দু বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকদের মুসলিম বিদ্বেষী ভুমিকার ইতিহাস তুলে আনতে পারলে আরো সমৃদ্ধ হতো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সৌমিত্র গুহ — মার্চ ২৬, ২০১৭ @ ১২:১৯ অপরাহ্ন

      ওপারের সংখ্যালঘুর ক্রাইসিসটা এসেছে ৷ দুপারেই সংখ্যালঘুর ক্রাইসিস আরো বিশদে চর্চা হওয়া দরকার…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Hafizur Rahim — মার্চ ২৬, ২০১৭ @ ৮:১১ অপরাহ্ন

      Changes are taking place imperceptibly. It is difficult to predict the future, but it is certain that powerful human thoughts and culture will overtake everything and a harmonized and homogeneous culture will prevail and overtake others.

      WRONG OBSERVATION

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Soumitra Sekhar — মার্চ ২৬, ২০১৭ @ ৯:৫০ অপরাহ্ন

      গুহ সাহেবের উচিত ছিল পাকিস্তানে চলে আসা। কিন্তু তিনি ‘নিরাপদ’ থাকবেন ভেবে থেকে গেলেন ভারতেই। তিনি পাকিস্তানে এলে প্রকৃত অবস্থা আরো বুঝতে পারতেন। আর পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু বলতে মুসলিমদের বোঝানো কি ঠিক? তারা তো দ্বিতীয় সঙখ্যগুরু– ৩৫%। হিন্দুরা ৫০%।বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসীসহ বাকিরা ১৫৫ বা সংখ্যালঘু। একথা কি গুহসা’বরা ভেবেছেন?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জিয়াউর রহমান — এপ্রিল ১২, ২০১৭ @ ৩:২৬ অপরাহ্ন

      সমস্তটা ধ্রুব না হলেও একটা ব্যতিক্রমী ভাবনার, চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। thought provoking.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shibaprasad Gorai — জুন ৬, ২০১৭ @ ১১:২৭ পূর্বাহ্ন

      অনেক নতুন তথ্য পেলাম ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রলয় চক্রবর্তী — জুন ১২, ২০১৭ @ ৩:৩৭ অপরাহ্ন

      একটা বিষয় খোলাখুলি বলা ভাল
      সে সময়টা ছিল লড়কে লেঙ্গের। বাঙালি এক উন্মাদনায় মেতেছিল। শুধু নেতাদের দোষ দিয়ে কি হবে! আর এখন যারা নিরাপদ দূরত্বে বসে নানা কথা বলেন তারা বাস্তব সত্যের থেকে মুখ লুকিয়ে থাকেন। বলুন তো বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের সব শ্রেণীর মানুষের ছিল অথচ কেবল এক কোটির মত হিন্দুকেই দেশত্যাগ করতে হল কেন ? নিরাপদ দূরত্ব থেকে ইতিহাসের ব্যখ্যা আর বাস্তব অবস্থা নাও মিলতে পারে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com