জুয়্যো কাবরাল ডি মেলো নেয়েতোর কবিতা

মাজুল হাসান | ১৫ মার্চ ২০১৭ ১১:০৬ পূর্বাহ্ন

João Cabral de Melo Neto(1)জুয়্যো কাবরাল ডি মেলো নেয়েতো’ ব্রাজিলের আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সম্ভাব্য নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য বারবার উচ্চারিত হয়েছে তাঁর নাম। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কার পেলেও শেষ পর্যন্ত নোবেল থেকে গেছে অধরা। জন্ম ১৯২০ সালের ৯ জানুয়ারি ব্রাজিলের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় পুর্নামবুকো’র রেসিফি শহরে। কৈশোর যৌবনের বড় অংশই কেটেছে সেখানে। ছিল পৈত্রিক গেন্ডারি খামার আর চিনির কল। ১৯৪০ সালে সপরিবারে চলে আসেন রিও ডি জেনিরোতে। দু’বছর পর বের হয় প্রথম কবিতার বই পেদ্রা ডি সনো (ঘুমন্ত পাথর), সর্বসাকুল্যে বিক্রি হয়েছিল ৩শ’ ৪০ কপি। ১৯৪৫ সালে কূটনৈতিক হিসেবে কর্মজীবনের সূত্রপাত; নানা দেশ ভ্রমন ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা। বেশ লম্বা সময় কাটিয়েছেন স্পেনে। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মোর্তে ই ভিদা সেভেরিনা (একজন সেভেরিনার জীবন-মৃত্যু)। সব মিলিয়ে ১৮টি কবিতার বই আর ২টি নাটক। যার একটি মোর্তে ই ভিদা সেভেরিনা’র নাট্যরূপ। অন্যটি অটো দো ফ্রাদে

স্যুরিয়েল ধাঁচের লেখা হলেও মেলো নেয়েতো’র কবিতার বিশেষ বৈশিষ্ট আধ্যাত্মিকতা, ন্যায়নিষ্ঠতা, যা তাঁকে আলাদা করেছে ব্রাজিলের অন্য কবিদের থেকে। ব্রাজিলের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় এলাকার আদিম কবিতা ফর্ম করডেলের সংমিশ্রনে গড়ে ওঠে তার কাব্যভাষা। যেখানে ঘুরেফিরে উঠে এসেছে পুর্নামবুকো’র পরিবেশ-প্রতিবেশ, রূঢ় জীবনধারা।

১৯৬৮ সালে ব্রাজিলিয়ান একাডেমি অফ লেটার্স-এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন মেলো নেয়েতো। ১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর রিও ডি জেনিরোতে মৃত্য হয় ব্রাজিলের আধুনিক কবিতার অন্যতম এই পুরোধা ব্যক্তির। তাঁর লেখা ইংরেজি, ফরাসী, স্প্যানিশসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

পৃথিবীর পরিসমাপ্তি

দুঃখগাঁথাপূর্ণ পৃথিবীর শেষে
খবরের কাগজ পড়ে মানুষ
নির্বিকারভাবে কমলা খায়
সূর্যের মতো জ্বলজ্বলে কমলা

ওরা আমাকে একটা আপেল দিলো
যাতে ভুলে না যাই মৃত্যুর কথা। আমি জানি
শহরের টেলিগ্রাফগুলোর কেরোসিন প্রয়োজন
যে পর্দা উড়ছিল বাতাসে
তাকে পতিত হতে দেখলাম ঊষরপ্রান্তে।

এই বারো ঘটিকার পৃথিবী সম্পর্কে
শেষ কবিতাটি লেখার সাধ্য নেই কারো
শেষ বিচারের ভয় নয়, আমাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে
স্বপ্নের সমাপ্তি

কবিতা

হে গর্জনশীল বাগান
ভাবনা কথা মায়া
ধ্যানস্থ চন্দ্রতলে
হে অসীমতার বাগান আমার
সবজিশূন্য,
জাদুময় বাগান
মোহগ্রস্ত আকাশ:
কোথায় বিরাজ করে বৃহত্তর হেঁয়ালি
আলোক সূর্য সুস্বাস্থ্য?

জানালা

লোকটা স্বপ্ন দেখছিল
সৈকতে, আরেকজন
কখনোই মনে রাখতে পারে না দিনক্ষণ
একটা লোক দৌড়ে পালাচ্ছে
গাছ থেকে নেমে, হারিয়েছে অন্যজন
তার নৌকা অথবা হ্যাট
ওখানে কেউবা সৈন্য
অ্যারোপ্লেনের মতো ভাব দেখাচ্ছে আরেকজন
আর যিনি বারংবার ভুলে যাচ্ছেন
সময় ও রহস্য
যার ভয় শব্দের ঘোমটা
এবং ওখানে আছেন আরও একজন
জাহাজের মতো সটান, ঘুমিয়ে পড়েছেন।

জল ও কবিতা

কবিতার তরল স্বর
আমায় প্রলুব্ধ করে অপরাধে
নিয়ে যায় রিভলভারের কাছে

ওরা আমাকে সেসব দ্বীপের কথা বলে
কোনো স্বপ্নের সাধ্য নেই
সেখানে পৌঁছায়

হাঁটুতে খোলা বই
চুলে বাতাসের দোল
আমি চেয়ে থাকি সমুদ্রপানে।

জলে যা ঘটে
তার পুনরাবৃত্তি হয়
স্মৃতির সরণীতে

ব্যালেরিনা

রাবার ও পাখি থেকে জন্ম
ব্যালেরিনার
মেঝের ’পরে নৃত্যু
স্বপ্নের পূর্বগামী

তিন ঘণ্টার ঘুম
সমস্ত স্বপ্নাতীত
রাস্তা অলি-গলি
যেথায় মৃত্যুর সাক্ষাত

লেখার কালিতে জন্ম
দৈত্য-দানবের
রাবার ও পাখি থেকে জন্ম
ব্যালেরিনার

ধীরে ও প্রাত্যহিক
সেসব পতঙ্গ অথবা পাখি
ধরতে পারিনি
তাতে রাবার ঘোঁষে চলি

কবিতাগিরি

দৃশ্যমান সব বস্তুকে বলতে দাও
সময়ের বিদ্যমান উপরিতলগুলোকে বলতে দাও
অনুমতি দাও: ওদের মাটিচাপা স্বর
রহস্যময়তায় ঘুমিয়ে থাকা প্রকাণ্ড স্বর
ছাপিয়ে যাবে অন্য সব কিছু
অনুমতি দাও, সবই হবে ফলবান
কবিতার এই অতিপ্রাকৃত পারিপার্শিকতায়।

পিরানডেলো ১

এই ল্যান্ডস্কেপ নাটমঞ্চ-মতো
এটা সুসজ্জিত ল্যান্ডস্কেপ
ধীর পদক্ষেপে মানুষ চলে যায়
সচেতনতাই ওদের অভিনয়
সবই চলে যায় একই ভঙ্গিমায়
যেন জীবন নিজেই হচ্ছে মঞ্চস্থ
যে কুকুর পার হচ্ছে রাস্তা
হয়তো ক্ষুধার্ত ও
সুস্থির, তন্দ্রালু তার চাহনি
মনে হয় জীবন অভিনয়যোগ্য নয়:
আকাশে দৌড়ে বেড়াচ্ছে মেঘ
কিন্তু আমি নিশ্চিত এই ল্যান্ডস্কেপ বানানো
যেহেতু আমার জানা আছে পরিচালকের নির্দেশ:
– ক্যামেরার দিকে তাকিও না!
এবং আমি জানি মানুষ মাত্রই সুঅভিনেতা
তুখোড় অভিনেতা কুকুরও।

পিরানডেলো ২

আমি জানি লাখ লাখ মানুষ
নিজেকে একাত্ম করেছে এই আন্দোলনে
পরিচালক আটকে রেখেছেন সমস্ত চৈতন্য
আর ওদের ঢুকিয়ে দিয়েছেন ভিমরুলের ব্যাগে।
অতঃপর বিভাজিত করেছেন তিনি
ঠিক ওভাবে নয়, যেভাবে ভাগ করা হয়েছিল রুটি
উনার ভঙ্গি ছিল ফুল বিতরণের মতো
আমার চৈতন্য ভাগে পড়েছিল একজন পিয়ানোবাদক ও ওয়াগন চালকের
আমি এক ব্যর্থ শিল্পী
মঞ্চপশ্চাতে আমাকে ঘিরে রাখে বিষণ্নতা
নিজেকে ক্লান্ত ঘোড়ার মতো মনে হয়
বুদ্ধভিক্ষু হব আমি
একজন ওয়াগন চালক এবং পিয়ানোবাদক
আর আমাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে তিনবার।

প্রাত্যহিকতা

প্রাত্যহিকতার ভেতর
ছায়ারা খেয়ে ফ্যালে কমলালেবু
কমলালেবু নিক্ষিপ্ত হয় নদীগর্ভে
নদী নয়, এটা চোখ উপচানো
সমুদ্দুর।

প্রাত্যহিকতার ভেতর
ঘড়ির জন্ম
শব্দ নয়, আমি দেখি হাত
দেররাতে স্বপ্নে দেখি নারী
আমার আছে নারী এবং মাছ

প্রাত্যহিকতার ভেতর
আমি ভুলে গেছি ঘর, সমুদ্দুর
ভুলেছি ক্ষুধার ইতিহাস
নিজেকেই খুন করি আমি
প্রাত্যহিকতার ভেতর

সকালের দোল
১.
একটা গৃহপালিত মোরগ সকালকে দোলাতে পারে না
সবসময় ওর অন্য মোরগের সাহায্য প্রয়োজন
প্রথমে কাউকে উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠতে হয়
আর অন্যদের দিতে হয় ঝাঁকুনি; আগের মোরগের
চিৎকার অনুসরণ করে গলা উঁচাতে হয় আরেকটা মোরগকে
এভাবে অনেক মোরগকে ক্রিসক্রসের মতো
বলে উঠতে হয় কুককুরুকু
মোরগের সমস্বর চিৎকারে টান পড়ে সূর্যের সুতায়
সুতরাং, সেই সকাল, ভঙ্গুর মাকড়শার জাল থেকে যার প্রারম্ভ
বুনে দিতে পারে সব গৃহপালিত মোরগের কণ্ঠস্বর
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন matin bairagi — মার্চ ২০, ২০১৭ @ ৭:৫০ অপরাহ্ন

      ভাল অনুবাদের জন্য মাজুলকে ধন্যবাদ। আর কবিতাগুলো পড়লাম মন দিয়ে। ভালো লাগলো। এবং নতুন কিছু আমার মধ্যেও ঘুরপাক খাচ্ছে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com