একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ: ওরা কারা

রুখসানা কাজল | ২৬ মার্চ ২০১৭ ১০:০১ পূর্বাহ্ন

তালিয়া
গার্লস ইশকুলের রাস্তা দিয়ে যতবার গাড়ি যায়, তালিয়া ততবার ইশকুলের গেটটা দেখে শিউরে ওঠে। পাশে বসা সহকর্মী বা অন্য কাউকে অবশ্য বুঝতে দেয় না। এমনিতে পাথরের মত মুখ করে থাকে। দরকারের বাইরে বাড়তি কথা খরচ করে না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত হাসে না। স্থানীয় কেউ কথা বলতে গেলে দূরত্বের কঠিন গন্ধ পায়। ফলে স্থানীয় কারো সাথেই কাজের বাইরে কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি তালিয়ার। স্বামী রায়হান ইউএনডিবির চাকুরে। আজ এদেশ কাল ওদেশ। একমাত্র ছেলে স্বাগত সিডনি। কম্যুনিকেশন এবং জার্ণালিজমে পড়াশুনা করছে। ছেলের খুব ইচ্ছে এদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে পরিবর্তনশীল সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে লেখালেখি এবং ফিল্ম বানানোর।
মুক্তিযুদ্ধে রায়হানের বাবাকে মেরে ফেলেছে স্থানীয় রাজাকাররা। রায়হান বাবাকে পেয়েছিল মাত্র আট মাস। বাবার সাথে কিছু ছবি ছাড়া আর কোনো স্মৃতি নেই ওর। মামারা অল্পবয়সি মাকে বেশিদিন একা থাকতে দেয়নি। দ্বিতীয় বিয়ের ফলে মা হয়ে যায় প্রবাসি। একলা পড়ে যায় রায়হান। একবার দাদাবাড়ি একবার মামাবাড়ি। শেষ পর্যন্ত ক্যাডেট ইশকুল এন্ড কলেজ পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং। কি যে নেশা রায়হানের যেখানেই একাত্তরের কিছু হয় ও পাগলের মত ছুটে যায়। ছেলে স্বাগতের তখনো কথা ফোটেনি ভাল করে সেও বাবার সাথে মাথা দোলায়, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসিইইইই –
রায়হান কতবার ডেকেছে, হাত ধরে টেনে নিয়েছে, তালিয়া একবার গলা মেলাও, প্লিজ! ছেলে চোখে, মুখে, চিবুকে চুমু খেয়ে বলেছে, গাও মা গাও—তালিয়া কখনো গায় নি। ওর মা জেলা শহরের গার্লস ইশকুলের হেডমিস্ট্রেস ছিল। মার কাছে গল্প শুনেছে সদ্যস্বাধীন দেশে নাকি নিয়ম করে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হত। এসেম্বলীতে সব ধর্মের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে ধর্মপাঠও করানো হত। এমনকি এক ধর্মের ছাত্রি অন্য ধর্মের আয়াত, শ্লোক, বাণী পাঠ করলেও কেউ কিছু মনে করত না। সম্প্রীতির সহবস্থান ছিল, মায়া মমতা ছিল, ভালোবাসা ছিল। তালিয়ার সময় এগুলো আর হয়নি। এসেম্বলিই হত না নিয়মিত। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার সাথে সাথে সম্প্রীতি, সদ্ভাব উবে গিয়ে দেখা গেলো নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে বাঙালীরা দ্রুত খাঁটি মুসলিম হতে উঠে পড়ে লেগে গেছে। এমনকি কেউ কেউ বলেও ফেলেছে, হিন্দুর লেখা গান কেনো বাঙালি মুসলিমদের জাতীয় সংগীত হবে?
three-girlsমা ছিল জয়বাংলার কট্টর সমর্থক। বাবা নামের লোকটা যুদ্ধের পর পর পালিয়ে চলে যায় ইংল্যান্ড। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর একবার এসেছিল। পাকিস্তানের সমর্থনে আর বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ছেলেমেয়েদের আজেবাজে কথা শেখানোর পাশে পাক সার জমিন নামে একটা গানও শেখাতে শুরু করে। মা প্রচুর আপত্তি করে। আপত্তি থেকে ঝগড়া আর ঝগড়া থেকে ছেলেকে নিয়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিলে মা কি সব কাগজপত্র বের করে বলে, এক্ষুণি বেরিয়ে না গেলে পুলিশের কাছে যাবে। আর আসেনি লোকটা। শুনেছে পাকিস্তানী কোন মহিলাকে বিয়ে করে ইংল্যান্ডে ভালই আছে। বাবা চলে যাওয়ায় মা বা ওরা কেউ দুঃখ পায়নি। বরং যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। তালিয়া বেশি খুশি হয়েছিল কারণ বাবাটা সুযোগ পেলেই তালিয়ার পিঠ খামচে দিয়ে বলত, তোর জন্যে পাক সার জমিন। তু তো হাফ পাকিস্তানি হ্যায়।

অবসর নেওয়ার পর আড়িয়াল খাঁ নদীপারে মা এক গোপন সত্যকে খুলে দিয়েছিলো ওদের ভাইবোনকে। অন্য তিন সন্তানকে তিনি বলেছিলেন, তালিয়াকে ঘিরে থেকো। তালিয়া আমার অহংকার। মুক্তিযুদ্ধর সময় তিনি একটি ছোট শহরে ইশকুলের হেডমিস্ট্রেস ছিলেন। যুদ্ধ শুরুর প্রথমে বামধারার একজন সচেতন নেতা এসে বলেছিলেন, ম্যাম, প্রতিরোধযুদ্ধে মেয়েদের তৈরি করা দরকার। মেয়েদের ট্রেনিং এর জন্যে ইশকুলের মাঠটা কি পেতে পারি? গেলো তিন বছর ধরে এই মানুষটাকে জানেন তিনি। তালিয়ার মার কাছে শ্রদ্ধায় সন্মানে অনেক উঁচুতে ছিলেন মানুষটা। সাথে সাথেই সম্মতি দিয়ে দেন । অই ইশকুলে ডামি রাইফেল নিয়ে মেয়েদের ট্রেনিং করাতেন সেই কমরেড। অনেক সময় তিনি নিজেও নেমে পড়তেন ট্রেনিংরত মেয়েদের সাথে। একটু চা, সামান্য মুড়িমাখা, কোনোদিন সব্জী লুচি । সবার মধ্যেই এক কমরেডসুলভ সম্প্রীতি।
তখনো পাকিস্তানী আর্মি অই শহর দখল করে নেয়নি। জুনের এক সকালে পাকিস্তানী আর্মি প্রতিরোধ ভেঙে শহরে ঢুকে পড়ে। কি আশ্চর্য তালিয়ার মা সুলতানা শাহরিয়ার গার্লস ইশকুলের হেডমিস্ট্রেস, মুক্তিপিয়াসি মেয়েদের নতুন কমরেড অবাক বিস্ময়ে দেখে পাকিস্তানীদের পথপ্রদর্শক হিসেবে তার স্বামী মাথায় জিন্না টুপি পরণে পেশোয়ারী কুর্তা কামিজে এক নতুন অবতার !
জোর করে ইশকুল কলেজ খুলে রেখেছিল পাকিস্তানী আর্মিরা। ছোট ক্লাশের মেয়েরা কেউ কেউ ইশকুলে আসে। হিন্দুশিক্ষক শিক্ষিকারা কেউ নেই। শহরে বাসা এরকম কিছু শিক্ষক শিক্ষিকা এসে সিগনেচার করে কিছুক্ষণ থেকে আবার তাড়াতাড়ি চলে যায়। একদিন ইশকুল ছুটির পর কি এক কাজে চারজন নিম্নপদস্থ পাকিস্তানী আর্মি ইশকুলে আসে। তিনি তখন একজন শিক্ষিকাসহ অন্য একজন বান্ধবীকে নিয়ে গল্প করছিলেন। সিনিয়র পাকিস্তানী সৈন্যটি বান্ধবীকে টেনে নিতে প্রতিবাদ করে উঠেন তালিয়ার মা। কি আশ্চর্য তার স্বামীর কাছে বহুবার এসেছে নাজিম সালিম নামের যে সৈন্যটি, সেই তাকে ধর্ষণে উদ্যত হয়। শত প্রতিরোধেও তিনি ধর্ষিত হয়েছিলেন সেদিন। তালিয়া সেই ধর্ষণের সন্তান।
সব শুনে তালিয়া কাঁদেনি। ইনফ্যাক্ট কান্নার সুযোগ পায়নি। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মত তিন ভাইবোন তালিয়াকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। যেনো তালিয়া এক বদ্বীপ। ব্রম্মপুত্রের জল প্রতিদিন নৈবেদ্য দিচ্ছে পলিমাটির শুদ্ধতায়। বুড়ো আড়িয়াল খাঁ পুণ্য জলে ধুয়ে নিয়েছে তালিয়ার জন্মকথা। বিসিএস ট্রেনিং-এ রায়হানের সাথে পরিচয়। সব শুনে শক্ত হাতে তালিয়ার হাত ধরে বলেছিল, ঈগলের চোখে অই পতাকাকে দেখবে আর মন্ত্রের মত গেয়ে যাবে, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি — তালিয়া অবশ্য সুর তোলেনি গলায় কিন্তু রায়হানকে জড়িয়ে নিয়েছিল জীবনচলার পথে।
এই সেই শহর। চাকরী জীবনে তালিয়া কেবল অপেক্ষা করেছে এই শহরে আসার। এখানেই পাশবিক সঙ্গমে তার ভ্রুণ স্থাপিত হয়েছিল একটি অনিচ্ছুক গর্ভে। তাকে ভেসে যেতে দেয়নি সে গর্ভফুল। এই গার্লস ইশকুলের কোয়ার্টারেই জন্ম হয়েছিল তালিয়ার। নুন নয় মধু মুখে দিয়ে প্রথম চীৎকার করে কেঁদে উঠেছিল যুদ্ধশিশু তালিয়া। ধাত্রী কির্তন গায়িকা ললিতা খুশিতে বলে উঠেছিল, ঝামা গলা গো মেয়ের। আহা আহা শ্রীকৃষ্ণের চরণফুল ঝরে পড়বে এই গলার গান শুনে।
ছাব্বিশ মার্চ, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে নিমু বাউড়ি নামের মেয়েটি লাঠি খেলায় ওস্তাদ জব্বার শেখকে হারিয়ে দেয়। হাত তালিতে ভেসে যায় স্টেডিয়াম। জব্বার শেখ স্নেহ আশীর্বাদে হাত রাখে নিমুর মাথায়। পুরস্কার হাতে নিয়ে জব্বার শেখ এক অদ্ভুত অনুমতি চেয়ে বসে ডিসি সাহেবা তালিয়া শাহরিয়ারের কাছে। বাধ্য হয়েই বিকেলে নিজ বাংলোয় আসতে অনুমতি দেয় তালিয়া। চৈত্রের গুম বিকেলে নিমুকে নিয়ে ডিসি সাহেবার বাংলোয় আসে জব্বার শেখ, মাগো একাত্তরে ওর ঠাকুরদাকে নারকেল গাছের সাথে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রেখেছিল পাকিস্তানি মিলিটারিরা। রক্তের গন্ধ পেয়ে অসংখ্য পিঁপড়ে খুবলে খেয়েছিল জ্যান্ত মানুষটাকে। সে দৃশ্য কথায় বলা যায় না মা। আর ওর ঠাকুমা বর্শা দিয়ে কুপিয়ে দুজন রাজাকার মেরেও নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে পারেনি। নিমু আমাদের অহংকার । কিছু কি করা যায় না ওর জন্যে?
ফ্যানের বাতাসে ভারি পর্দাগুলো দুলে উঠছে। বড় হলরুমে গড়িয়ে যাচ্ছে অস্বস্তির কয়েকটি মূহূর্ত। তালিয়া বৃদ্ধ জব্বার শেখের দিকে অনিমিখে তাকিয়ে আছে। অনেকটা মায়ের মত দৃষ্টি, উজ্জ্বল দরদী, ভালোবাসা আর অণুপ্রেরণায় ঋদ্ধ। নিমু নামের মেয়েটি পরম আশ্রয়ের ছুঁয়ে আছে একটি হাত। উপস্থিত সবাইকে অবাক করে দিয়ে অতিশয় গম্ভির অসামাজিক ডিসি সাহেবা নিমুকে কাছে ডেকে নেয়। কোথায় যেনো আত্মীয়তা বাজে। রক্তের ভেতর মার্চ করে যায় একাত্তর। কথা দেয় নিমুর জন্যে কিছু সে করবেই।
পলাশ ফোটা সন্ধ্যায় তালিয়ার মনের ভেতর গুণগুণিয়ে ওঠে সুর, খেলাধূলা সকল ফেলে তোমার কোলে, ওমা তোমার কোলে ফিরে আসি, সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসিইই—

রুহি
দ্রুত খাতা কাটছিল রুহি। যত শিঘ্রি সম্ভব বাসায় ফিরতে হবে। মার শরীর ভাল যাচ্ছে না কদিন ধরে। বড় দুই বোন ঢাকায় আর ভাইয়া বিদেশে থাকে । মার কাছে একমাত্র সে আর জোলেখা খালা থাকে। বাবা মারা গেছে অনেক আগে।
রুহির ঠিক মনে নেই বাবার চেহারা। তবে এটুকু মনে আছে বাবা ওকে কখনো কাছে ডেকে নেয়নি আদর করেনি এমনকি কোনোদিন কথাও বলেনি। ছোট বেলায় বাবার কাছে ছুটে গেলে তনু আপু তাড়াতাড়ি ওকে সরিয়ে নিয়ে যেত। একটু বড় হতে রুহি দেখেছে বাবা আর ভেতর বাড়িতে আসত না। সারা দিন সামনের অফিস ঘরে মক্কেল সামলে রাতে ঘুমুতো অফিস ঘরের ছাদের ছোট্ট রুমে। আস্তে আস্তে সবার থেকে দূরে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছিল বাবা। কোনো কোনো দিন ইশকুলে যাওয়ার পথে রুহি দেখতে পেতো, কালো মাফলারে মাথা ঢেকে অফিসের চেয়ারে বসে বাবা দোকান থেকে আনা নাস্তা খাচ্ছে আর পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছে আমানত মুহুরি। আমানত মুন্সি বাবার মুহুরি। বাবার খুব কাছের লোক। এই আমানত মুহুরিকে রুহি দুচোখে দেখতে পারত না।
ক্লাশ সেভেনে নতুন ক্লাশে ভর্তি হয়ে বাসায় ফিরছে রুহি। অফিস ঘরের দরোজায় দাঁড়িয়ে আমানত মুহুরি ডাক দেয়, অ রুইই দেখি ভরতির কাগজখান দেও ত। ভর্তির কাগজ, বেতনের রশিদ হাতে নিয়ে সেকি হাসি শয়তানটার। রুহির ইচ্ছা করছিল দেয় একটা লাত্থি মেরে। এমনিতে রাস্তা ঘাটে কোথাও দেখা হলেই রুই রুই করে ডাকে। অসহ্য লাগে রুহির। কাগজগুলো ফেরত দিয়ে পচা চোখে বলেছিল, গরিবের ছেলে বলে সংসার ছাড়ি যাতি পারতেছে না নাহিদ মিয়া। তাইতে তোর মত মিলিটারির মাইয়ের বাপ হতি হচ্ছে তারে! কথাটা তখন বোঝেনি রুহি। কিন্তু নাইন টেনে উঠে বুঝে গেছিল সে একজন যুদ্ধশিশু। তার জন্মদাতা এই নিরীহ বেচারা উকিল নয়। কোন এক পাকিস্তানী সৈন্য। সেই থেকে রুহি নিজেকে গুটিয়ে নেয়। পড়াশুনা, ইশকুল, বাসা আর বই।
প্রতি বছর বাবা তার নিজের তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে গ্রামে বেড়াতে যেত। কখনো রুহি আর ওর আম্মুকে নিয়ে যেতো না। মাঝে মাঝে রুহি আম্মুর সাথে মামাবাড়ি যেত। সেখানেই সে নানুবুজির কাছ থেকে জেনে নেয় সব ঘটনা। কোনো এক গরমের দুপুরে যুদ্ধের জন্যে বন্ধ ইশকুলে তার মা, ইশকুলের বড় আপা আর অন্য একজন শিক্ষিকা মিলে গল্প করছিল। এমন সময় একটা মিলিটারি জীপে করে চারজন সৈন্য এসে ইশকুলের বড় আপার সাথে দেখা করতে চায়। চারজন সৈন্যই ছিল অল্প বয়সি। টগবগ ফুটছে। বড় আপার সাথে কথা বলে কি একটা কাগজ দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল। এসময় দেখে ফেলে রুহির মাকে। বান্ধবীদের ভেতর সব চে সুন্দরী, মোম রঙএর শরীর ছিল ওর মা নার্গিস আক্তারের। তিন ছেলেমেয়ের সাথে গাইড বুক দেখে ইংরেজিতে কথা বলত নার্গিস আক্তার, তানু ডোন্ট টাচ বালি। রেইন নামছে, ওয়েট হয়ো না। কিপ ড্রাই। ভুল ইংরেজি বলা খুব স্মার্ট আর সুখী মহিলা।
কালোমত সৈন্যটা যে ছিল চারজনের ভেতর সবচে বড় আর সিনিয়র সে থমকে যায়। তারপর রাইফেল উচিয়ে ফায়ারের ভাব দেখাতেই দারোয়ান জলিল ছুটে পালিয়ে যায় ইশকুলের বাগানের ভেতর। রুহি বোঝে অই কালো সৈন্যটাই হচ্ছে ওর জন্মদাতা। ওকে দেখলে আম্মু কেমন ভয় ভয় চোখে তাকায়। একটা বয়সে রুহির খুব ইচ্ছা করত পাকিস্তান গিয়ে লোকটাকে খুঁজে বের করে খুন করতে। কিন্তু কি করে চিনবে? আম্মু তো কিছুই বলতে পারে না। তাছাড়া আম্মুর মাথাও ঠিক নেই অই ঘটনার পরে। বাবাকে দেখলেই চেঁচিয়ে মারতে আসত, দালাল দালাল, রাজাকার রাজাকার, তুমি না বলেছিলে পাকিস্তানীরা গুড দ্যান বাঙালী? নাউ কি ঘটলো? রুস্তম ফায়ার হিম। হি ইজ দ্যা গ্রেট রাজাকার। রুস্তম আম্মুর ভাইয়ের ছেলে। ফুপির এমন অবস্থা দেখে দাঁত কিড়মিড় করে ফুপাকে বলেছিলো, আমি মুক্তিযোদ্ধা হলে আপনাকে গুলি করে মারতাম।
খাতা দেখা শেষ করে উঠে দাঁড়ায় রুহি। ফাঁকা ইশকুল। আয়া দারোয়ান ছাড়া সবাই চলে গেছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ জোলেখা আয়া এক কাপ চা এনে দাঁড়ায়, কি খালা কিছু বলবা? মনসুর আইছে। দেখা করতি চায়। খুশির তরঙ্গ বয়ে যায় রুহির মনে। এতক্ষণ যে তাড়া ছিল বাসায় যাওয়ার তার বদলে মনসুরের সাথে দেখা করার ইচ্ছাটাই তীব্র হয়ে ওঠে, খালা পাঠায় দেও। আর চা দিও । ইতস্তত করে জোলেখা। কিছু বলতে চায় রুহিকে। সামান্য আয়া সে। কিন্তু রুহির আম্মুর অনেক কাছের। রুহিকে সে কোলে পিঠে করে বড় করেছে। জন্মের পর রুহিকে নিয়ে কি করবে তাই ভাবতে ভাবতে ওর মা কেমন পাগল পাগল হয়ে গেলো। সেই সময় রুহিকে সেই তুলে নিয়েছিল। রুহি বড় ভাল মেয়ে। মনসুরের পাল্লায় পড়ে জীবনটা গেছে মেয়েটার। আজো দুজনের কেউ বিয়ে করেনি। সমাজসেবা করে করে মনসুর পাগল। তার সাথে রুহিও পাগল। তোমরা কি বিয়ে করবা না ?
রুহি এবার জোরে হেসে দেয়, খালা বিয়েটাই কি সব খালা? তয়? মাইয়া মানুষ না তুমি! মাইয়া মানুষ হলেই বিয়ে করতে হবে কে বলেছে? এইই ভাল আছি খালা। অন্তত কিছুটা ত মানুষের উপকারে লাগছি। মনসুর ঢুকে পড়েছে টিচার্স রুমে। আমানত মুহুরির এই ছেলেটা অন্যরকম এক পাগল। লোকে বলে পাজির ঘরের হাজি। রুহির সাথে বিয়েতে আপত্তি করায় আমানত মুহুরিকে ছেড়ে উঠে গেছে অন্যখানে। রাস্তার শিশুদের নিয়ে দিনরাত এক করে দিচ্ছে দুজনে। তাদের লেখাপড়া করানোর সাথে সাথে সঠিক ইতিহাসটাও নাকি জানাতে হবে।
প্রতিবারের মত লাল সবুজ শাড়ি হাতে মনসুর রুহির সামনে বসে গপ করে রুহির চা টা খেয়ে ফেলে। আন্তরিক রাগে গজগজ করে জোলেখা। মনসুরের জন্যে আনা চা ঠক করে রেখে চলে যেতেই জড়িয়ে ধরে মনসুর, খালা, ও খালা, আমার সোনা খালা, তুমিই তো আমার মা, সত্যি কিনা বল! আচ্ছা আজকেই আমরা বিয়ে করব তুমি খুশি? জোলেখার চোখে জল ভাসে। জলে মেশা স্বপ্ন ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ে। কত বছর ধরে সে একটা সোনার চেন আর আংটি লুকিয়ে রেখেছে। মনসুর হোক আমানত মুহুরির ছেলে। সে তো আমার রুহিকে ভালবাসে। আহা সোনা বাচ্চারা আমার!
রুহি অবাক, এই তোর মাথামুথো ঠিক আছে ত? একদম ফিট। টেবিলের উপর ঝুঁকে মনসুর নরম হয়ে বলে, চল রুহি বিজয় দিবসকে আমরা গেঁথে নিই আমাদের জীবনের সাথে! রুহির বুক কেঁপে ওঠে, ক্লাশ এইট, ষোলই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাইতে গেলে রুহিকে ফিরিয়ে দিয়েছিল গেম মিস। ভূগোল মিস কেমন হেসেছিল, মিলিটারির মেয়ের সখ কত! জাতীয় সঙ্গীত গাইতে চায়!
ওর বুকের ভেতর সুরে সুরে উড়ে আসে ভ্রমর, পাখনার ভাঁজ খুলে দুলে দুলে তারা গেয়ে ওঠে, অনেক অনেকদিনের অনেক আবেগে জমিয়ে রাখা সেই পূণ্য সঙ্গীত, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি, চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস আমার প্রাণে, ওমা আমার প্রাণে বাজায় বাঁশী—

তান্না
তান্না প্যানপেনে হলুদ আলোয় নিজের পার্স খুঁজছিল । গেল রাতে এখানেই ত রেখে সোজা কিচেনে ঢুকে পড়েছিল সে। কি যে হয় আজকাল মনে থাকে না কিছুই। আসগরের আসার কথা ছিল কাল রাতে–সে কথাও একেবারে ভুলে গেছিল। ভাগ্যিস আসগর নিজেই ফোন করেছিল । নইলে বেচারাকে ঘরের বাইরে টানা দাঁড়িয়ে থাকতে হত। এক বোঝা ছাড়া কাপড়ের নিচ পার্সটা পেয়েই বড় ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে।
খুচরো নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তান্না। আজ সানডে। এখনো তেমন শীত পড়েনি। তবু হালকা একটা শাল জড়িয়ে কাছের বাংলাদেশি স্টোরে আসগারের প্রিয় কিছু খাবার কিনবে। ঘুমুচ্ছে আসগর। একটা ফিলিং স্টেশনে কাজ করে। সেখানেই পরিচয়। ছোটই হবে কয়েক বছরের। তাতে তান্নার কিছু আসে যায় না। সে শুনেছে উনিশ শ একাত্তরে তার মাকে যে সৈন্যটি রেপ করেছিল তার বয়েস ছিল বড় জোর একুশ কি বাইশ। বয়স কম হলে বা বেড়ে গেলে পুরুষের কিছু আসে যায় না। নারীদের কি সমস্যা হয়?
এই পয়তাল্লিশে তান্না অবশ্য তেমন কিছুই বুঝতে পারে না। একটা সত্যি বিয়ে আর একটা চুক্তি বিয়েতে দুজন পুরুষের সাথে দশ আর পাঁচ করে পনেরো বছর সংসার করে এই একাকি জীবনের বছর পাঁচেক সে আসগরের সাথে থাকছে। আসগর গুজরাটি এবং আর কখনো গুজরাটে ফিরে যেতে চায় না। কিন্তু গুজরাটের জন্যে মনের ভেতর অবিরাম কেঁদে যায়। যেমন কাঁদে তান্না। দুজনের ভেতর ভাল সমঝোতা। বিয়ে ফিয়েতে আর আগ্রহ নেই। আসগর উইকএন্ডে চলে আসে তান্নার কাছে। দুজন দুজনের শরীরে ঘর খুঁজে নেয়। কখনোবা স্বদেশ।
তান্নার প্রথম বিয়েটা বেশ লাগসই হয়েছিল। একদিন কি যে হল। ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে মিন্তি মজুর কাজ করছে পুকুর ধারে, উঠোনে শুকনো মরিচ রোদ তাপাচ্ছে, শাশুড়ির সাথে রান্না করছে, এমন সময় প্রথম স্বামী শফিক রাগে গরগর করতে করতে তান্নাকে ডেকে তালাক তালাক তালাক বলে একেবারে বাইন তালাক দিয়ে দিলো। শাশুড়ি, ননদ দেবররা ছুটে এসেও থামাতে পারেনি শফিককে। শফিক তখন উন্মাদ প্রায়, তালাক দিলাম। তুমি এখুনি বেরোয়। যাও আমার বাড়ি থেকে।
তান্না কেঁদে আকুল। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, শফিক আজ বিয়ের দশ বছরের মাথায় হঠাৎ কি কারণে তাকে তালাক দিলো। কিছুই ত অজানা নয় শফিকের কাছে। সে শান্তি কমিটির একজন চেয়ারম্যানের মেয়ে। কেবল সে নয় তার অন্য পাঁচ বোনের বিয়েতেও বাবার পরিচয়ের জন্যে সমালোচনা হয়েছে। তাদের দেখলে ছোট শহরের অনেকেই চোখ ঘোঁচ করে নিচু স্বরে কথা বলে। অনেক মুরুব্বি আছে তারা কাছে ডেকে কি যেন খোঁজে তান্নার মুখে। এসব জেনেই তো তান্নাকে বিয়ে করেছিলো শফিক। তবে?
মাগরিবের নামাজের পর সারিবদ্ধ কাঁঠালগাছ লাগানো রাস্তা দিয়ে তান্না দেখে তার আব্বাজি হেঁটে আসছে। ঝড়ের মত গিয়ে আছড়ে পড়ে। আব্বাজি আমার সংসার বাঁচান। আমি জিয়া রাইসাকে ছেড়ে বাঁচতে পারবো না। আব্বাজি কারো সাথেই কোন কথা না বলে তান্নাকে নিয়ে রিকসায় উঠে পড়ে। তান্না বোঝে কিছু বলে কোন লাভ হবে না বলেই আব্বাজী চুপ থেকে তাকে নিয়ে চলে এসেছে। তান্নার আরো বেশি কান্না পায়। কেন তাকে শফিক তালাক দিলো? তাও বিয়ের এতবছর পরে!
কত সাধের সংসার। মূহূর্তে শফিক ভেঙ্গে চুরচুর করে দিলো। কিন্তু কেন? আব্বাজি তার পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে দিতে মাঝে মাঝে বিশেষ একটা জায়গায় হাত রাখছিল। তান্না তখন কান্নার দমকে আমল দেয়নি। সেখানেই মাঝে মাঝে একটু গভির চাপ দিচ্ছিল আব্বাজি। তান্না ভেবেছিল সান্ত্বনার গভীর প্রকাশ হয়তবা।
কিন্তু মাঝরাতে যখন সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে তান্নাকে অপরিসীম কামনায় জড়িয়ে ধরে কাঁধে গলায় চুমু খায় তখন তান্না অবাক বিস্ময়ে আঁতকে উঠে, আব্বাজি ছাড়েন। কি করছেন আপনি! মিটমিটে আলোয় আব্বাজির কামনা মদির চোখ দেখে চমকে উঠেছিল তান্না, আব্বাজি আমি তান্না। আপনার মেয়ে। শান্তি কমিটির ভূতপূর্ব চেয়াম্যান হিসিয়ে উঠেছিল, আব্বা কিসের আব্বা রে। আমি তোর মত জারজের বাপ না ।লুঙ্গির গিঁট খুলে তান্নাকে ঠেলে দিয়ে লম্পট বুড়ো বলেছিল, শুয়ে পড় কথা না বলি। দু হাতে ধাক্কা দিয়ে জ্বলে উঠেছিল তান্না। উদ্যত লিঙ্গধারী বাবাকে জানোয়ার দেখা চোখে তাকিয়ে একাত্তরে হিন্দু বাড়ি থেকে লুটে আনা কাঁসার জগ তুলে নেয় তান্না, আপনি সত্যিই একটা খবিস জানোয়ার। মিথ্যা কথার মা বাপ। যান এখুনি। ছাড়া লুঙ্গি কোমরে জড়াতে জড়াতে ভূতপূর্ব চেয়ারম্যান অপরিসীম তাচ্ছিল্যে থুথু ফেলে হেসে উঠে, যা তোর আম্মার কাছে যা। শুনে আয় কিভাবে তোর জন্ম হয়েছে হারামজাদি। শফিক কি তোরে এমনি এমনি তালাক দেছে!
শরীরের এক পাশ প্যারালাইজড শিক্ষিকা মায়ের পাশে বসে আকুল কাঁদে তান্না, আম্মা আমি কে আম্মা? আব্বাজি ত অমানুষেরও অধম আম্মা। এখন কি করব আমি ? কোথায় যাব ? খাদিজা বেগম নিজেও কেঁদে ভাসান। শুধু মুখটা মনে আছে। অল্প বয়েসি একটা সৈন্য। বত্রিশ বছরের খাদিজা বেগমকে টেনে হিঁচড়ে শুইয়ে ফেলেছিল গার্লস ইশকুলের বারান্দায়। যুদ্ধের জন্যে বন্ধ ইশকুলে খাদিজা বেগম, হেড মিস্ট্রেসসহ তাদের একজন বান্ধবি গল্প করছিল সেদিন। একাধিক সন্তানের মা ছিল তারা। নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ করে অল্প সন্তানের সুখি পরিবার ছিল প্রত্যেকের। প্রত্যেকের স্বামীরাই কৃতবিদ এবং কমবেশি পাকিস্তান ভক্ত।
খাদিজা বেগম ভয় দেখিয়েছিল, আল্লা রাসুলের নয়। নিজের রাজাকার স্বামীর। তাতে সৈন্যটি আরো মজা পেয়ে জাপটে ধরেছিল। বাইশ কি তেইশ মাত্র। সঙ্গমে খুব পারঙ্গম নয় তেমন। অভ্যস্ত খাদিজা বেগমের তেমন কষ্ট হয়নি। কেবল সঙ্গম শেষে জানোয়ারটা যখন তার গায়ে মুখে পেশাব করে ছিটিয়ে দিচ্ছিল খুব ঘেন্না লেগেছিল মনে। তান্না সেই ঘেন্নার ফসল।
বাংলাদেশি দোকানের ভারতীয় সেলসগার্ল জয় বাংলা বলে স্বাগতম জানায়। মার্চের পঁচিশ তারিখ। তান্নার মনেই ছিল না স্বাধীনতার মাস এসে গেছে। ছোট ছোট লাল সবুজ পতাকায় ভরে গেছে দোকান। অনেকগুলো কিনে নেয় সে। সন্ধ্যায় মোমের আলোয় লালসবুজ রঙ খুব মায়াবি দেখায়। মাউথ অর্গানে সুর তোলে আসগর, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি —
দুজনের কারোর কোন স্বদেশ নাই। স্বজন নাই। দুজনের কেউই পাখি নয় অথচ ঘর নাই মাটি নাই বৃক্ষ নাই জল নাই, কেবল উড়াল উড়াল!

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিপ্লব রহমান — মার্চ ২৬, ২০১৭ @ ১০:৩১ অপরাহ্ন

      বেশ ভাল মানের ঝরঝরে লেখা।
      তালিয়া পর্বে “ম্যাম” শব্দের বদলে “আপা” শব্দটিই বোধহয় যুৎসই ও যৌক্তিক হতো। ম্যাম, ম্যাডাম, মম, মাম্মি – ইত্যাদি বোধহয় হাল যুগের।
      রুহি পর্বটি লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য অংশ। খুব ভাল।
      ওই দুই পর্বের দুই স্কুল শিক্ষিকার ধর্ষণ ও যুদ্ধশিশুর জন্মদান, খুব বেশী কি কাকতাল?
      তান্না পর্বটি একটু দুর্বল প্লটের মনে হয়েছে। ১০ বছর বিবাহিত জীবনের পর বাইন তালাক, গুজরাটি লিভ টুগেদার, ইত্যাদি কেমন যেন অবিশ্বাস্য, আরোপিত মনে হয়।
      আর পুরো লেখাটির পার্শ্ব চরিত্রগুলো মূল চরিত্রকে বলিষ্ঠ করেছে। কিছুটা পুনর্লিখনের পর এটি আরো ভালো হতে পারে। চলুক।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com