মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৬)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ২ : শাস্তি

১ম অধ্যায়: সাধারণীকৃত শাস্তি

‘শাস্তিকে নিয়ন্ত্রিত এবং অপরাধের সাথে সমানুপাতিক হতে দাও, শুধুমাত্র খুনের আসামীদেরই মৃত্যুদণ্ড পেতে দাও এবং মানবতাবিরোধী নির্যাতনগুলো লুপ্ত হতে দাও।’ এভাবেই, ১৭৮৯ সালের ফরাসী আদালত কর্তৃপক্ষের কাছে প্রদত্ত নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত আবেদনপত্রগুলোর সাধারণ অবস্থানটির সারসংক্ষেপ করে (সেলিগম্যান এবং দেসজাহদা, ১৩-২০)। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সংখ্যা ব্যাপকতর হারে বেড়ে যায়।আইনের দার্শনিক এবং তাত্ত্বিকদের ভেতর, foucault.jpg
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

আইনজীবী এবং সাংসদদের ভেতর, জনপ্রিয় আবেদনপত্র এবং সংসদের আইনপ্রণেতাদের ভেতর মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। এক নতুন ধরনের শাস্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। সার্বভৌম সম্রাট এবং অভিযুক্তের মধ্যকার শারীরিক দ্বন্দ্ব সমাপ্ত হতে হবে; রাজার প্রতিশোধস্পৃহা এবং জনতার মনে সঞ্চিত ক্রোধের ভেতরকার এই হাতাহাতি যুদ্ধ শেষ হতে হবে। হত্যাদণ্ড পাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং জল্লাদের ভেতরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে এই হাতাহাতি যুদ্ধ শেষ হতে হবে। খুব দ্রুতই প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুষ্ঠান মানুষের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠলো। ক্ষমতার দিক থেকে দেখলে, যেখানেই ক্ষমতা প্রতারণা করেছে স্বৈরাচার, ক্ষমতার অতিরেক, প্রতিশোধস্পৃহা এবং ‘শাস্তি প্রদানে পাওয়া নিষ্ঠুর আনন্দ’ (পিশন দ্যু ভিলেন্যোভ, ৬৪১)-র সাথে, সেখানেই বিপ্লব ঘটেছে। অথচ, হতাশায় ডুবে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর সম্পর্কে আশা করা হতো যে সে ‘তাকে (ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে) পরিত্যাগকারী স্বর্গ এবং বিচারকদের জন্য আশীর্বাদ করবে।’ (ব্যুশেহ দ্য’অর্গিস, ১৭৮১,১২৫)। এটা ছিল রীতিমতো লজ্জাজনক। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান একদিক থেকে বিপজ্জনকও ছিল। যেহেতু এই দণ্ড প্রদান অনুষ্ঠান সম্রাটের সন্ত্রাস এবং সাধারণ জনতার সন্ত্রাসের ভেতরে সংঘাত সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করে দিত। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের মাধ্যমে নিষ্ঠুরতায় অপরাধীর সমকক্ষ হবার মহড়ায় সম্রাট যেন দেখতে পেতেন না যে তিনি নিজেই একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের দিকে যে চ্যালেঞ্জ যে কেউ একদিন গ্রহণ করতে পারে। ‘রক্তপ্রবাহের দৃশ্য দেখতে অভ্যস্ত জনতা’ দ্রুতই শিখলো যে এই রক্তপ্রবাহের শুধুমাত্র ‘রক্তের মাধ্যমেই বদলা নেওয়া যেতে পারে।’ (লাশেরে)। মৃত্যুদণ্ড প্রদানের এসব অনুষ্ঠানে একদিকে সশস্ত্র বিচার ব্যবস্থা আর অন্যদিকে ভয়ার্ত জনতার ক্রোধ কোনো এক বিন্দুতে পরষ্পর ছেদ করতো। বলাবাহুল্য, মৃত্যুদণ্ড প্রদানের এ অনুষ্ঠান ছিল বৈরী বিনিয়োগের লক্ষ্য। জোসেফ দ্যু মেইস্ত্রে (Joseph de Maistre) এ বিষয়েই চূড়ান্ত ক্ষমতার অন্যতম মৌলিক কৃৎকৌশল স্বীকার করতে সমর্থ হয়েছেন। জল্লাদ রাজা এবং সাধারণ মানুষের ভেতর একটি খাঁজকাটা চাকা হিসেবে বিরাজ করত। যে মৃত্যুর সাথে জল্লাদ বোঝাপড়া করে, তা যেন সেইসব ভূমিদাসদের মতো যারা জলাভূমি ও মড়কের উপর সেন্ট পিটাসবুর্গ শহরের প্রতিষ্ঠা করে। এ যেন শাশ্বত এক নিয়ম। স্বৈরাচারীর ব্যক্তিগত ইচ্ছা সবার জন্য আইন তৈরি করে। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া প্রতিটি শরীর যেন রাষ্ট্রের ভিত গড়ে তোলা এক/একটি পাথর। এমনকি নিষ্পাপ ব্যক্তিরা মারা গেলেও কিছু যায় আসে না! আঠারো শতকের সংস্কারকরা এই বিপজ্জনক এবং আনুষ্ঠানিক সন্ত্রাসের বিরোধিতা করেন যা দু’দিক হতেই (সার্বভৌম সম্রাট এবং জনতা–উভয় পক্ষ হতে) ক্ষমতার বৈধ অনুশীলনকে ছাপিয়ে যায়। মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুষ্ঠানের এ সন্ত্রাসে স্বৈরাচার জনতার বিদ্রোহের সাথে সংঘাতে অবতীর্ণ হয়। একজন অপরকে দ্বৈরথে ডাকে। এ তো দ্বিগুণ বিপদ। প্রতিশোধ নেবার বদলে, অপরাধ বিচার ব্যবস্থার উচিত শুধুমাত্র শাস্তি দেওয়া।

নির্যাতনবিহীন শাস্তির জন্য এই দাবি-দাওয়া উত্থাপিত হয়েছিল মূলতঃ মানুষের অন্তরের কান্না অথবা তার অবমানিত সত্ত্বা হতে। সবচেয়ে খারাপ খুনীকে শাস্তি দেবার সময়েও একটি বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন প্রয়োজন। আর, তা হলো: তার ‘মানবতা।’ উনিশ শতকে সেই দিন যেন আসবে যখন অপরাধীর ভেতরের ‘মানুষ’টা আবি®কৃৃত হবে। বিভিন্ন শাস্তিমূলক পদক্ষেপের লক্ষ্যবস্তু হবে এই ভেতরের ‘মানুষ।’ সেই লক্ষ্যবস্তু যাকে শাস্তিব্যবস্থা সংশোধন এবং পরিবর্তন করতে চায়। সে তখন অপরাধ বিজ্ঞান এবং অদ্ভুত নানা ‘শাস্তিমূলক অনুশীলনে’র উদ্দিষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। তবে, আলোকন পর্বের সময়, ইতিবাচক জ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবেই মানুষ যে প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছে তা নয়। তারা বিরোধিতা করেছে একটি আইনী সীমা হিসেবে। দণ্ডপ্রদান ক্ষমতার বৈধ সীমান্ত হিসেবে। নতুন যুগের বিধান অনুযায়ী, শাস্তি সেই মাত্রায় দেওয়া হবে না যা অপরাধীকে বদলাবে। বরং অপরাধীকে সম্মান করার জন্য দণ্ডের কিছু তীব্রতা বাদ দিয়ে যাওয়া হবে। নোলি মে ত্যাঙ্গেরে (Noli me tangere)। সার্বভৌম সম্রাটের প্রতিহিংসার তা অবসান ঘটায়। বধ্যমঞ্চের স্বৈরাচারের প্রতিপক্ষ হিসেবে নতুন যুগের সংস্কারকরা ‘মানবে’র যে সত্ত্বাকে স্থাপন করলেন, তা এক ‘মানুষ পরিমাপক’ হয়ে দাঁড়ালো। হয়ে দাঁড়ালো বস্তু নয়, বরং ক্ষমতার পরিমাপক।

সুতরাং, এখানে একটি সমস্যা থেকে যাচ্ছে। শাস্তির সনাতনী অনুশীলনের বিপরীতে কীভাবে এই ‘মানুষ পরিমাপক’ দাঁড়িয়েছে? কীভাবে সে সংস্কার আন্দোলনের মহৎ নৈতিক বৈধতা হয়ে দাঁড়াল? কেন নির্যাতনের এই চিরন্তন ভীতি এবং কাব্যিক জোর প্রদান যে শাস্তিকে অবশ্যই ‘মানবিক’ হতে হবে? অথবা, ঘুরে ফিরে একই যে প্রশ্ন দাঁড়ায় তা হলো কীভাবে ‘মানুষ’ এবং ‘মাপনী’ এই দুটো উপকরণ একই কৃৎকৌশলে একটির উপর আর একটি চাপিয়ে দেয়া যায়? অথচ একটি কোমলতর শাস্তি ব্যবস্থার দাবিতে এই দুই উপকরণের কথাই জোরেশোরে উঠছে? এই উপকরণগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ এবং এখনো এত অনিশ্চিত যে এটা চিরদিনের মতোই উদ্বেগকর ব্যাপার রয়ে গেল। একই সাথে এটা সেই একই সন্ধিগ্ধতার সম্পর্কে সম্পর্কযুক্ত রয়ে গেল যা আজো কেউ শাস্তির অর্থনীতির কোনো সমস্যা উত্থাপন করলেই খুঁজে পাবেন। যেন বা আঠারো শতক খুলে দিয়েছে অর্থনীতির সঙ্কট এবং সঙ্কটের নিরসনে চিরায়ত আইনকে প্রস্তাব দিয়েছে যে শাস্তির ‘মানবতা’ থাকতে হবে এর পরিমাপক হিসেবে। আবার, শাস্তির নীতিকে কোনো নির্দিষ্ট অর্থ না দেওয়া সত্ত্বেও এই নীতি যেন কোনো অনতিক্রম্য বা দুর্লঙ্ঘ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং শাস্তির এই বিভ্রান্তিকর ‘কোমলতা’র জন্ম এবং জন্ম-পরবর্তী শুরুর দিনগুলো আমাদের পুনর্গণনা করা উচিত।

‘বড় সংস্কারক’দের উদ্দেশ্যে প্রায়ই সম্মান প্রদর্শন করা হয়–যেমন, বেক্কারিয়া (Beccaria), সেরভান (Servan), দুপাটি (Dupaty), লাক্রেতেল্লে (Lacretelle), দ্যুপোর্ট (Duport), পাস্তোরেত (Pastoret), টার্গেট (Target), বার্জাসে (Bergasse), খাতা বা কাইয়ে (Cahier) এবং আবেদনপত্রগুলোর রচয়িতা এবং সংসদের সদস্যদের উদ্দেশ্যে। তাদের সম্মান প্রদর্শন করা হয় আইনী কাঠামোয় কোমলতা আরোপনের জন্য। সেই সাথে ধ্রুপদী তাত্ত্বিকদেরও সম্মান করা হয় যারা, আঠারো শতকের শেষে, চমৎকার যুক্তি-তর্কের সাহায্যে এই কোমলতা আরোপণের বিরোধিতা করছিলেন (বিশেষতঃ বেক্কারিয়ার বিপক্ষে ম্যুয়ার্ট দ্যু ভোগলান্সের (Muart de Vouglans) বিতর্ক এপ্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য–ম্যুয়ার্ট, ১৭৬৬)।

তবু, এহেন সংস্কার এমন কোনো প্রক্রিয়ায় অবস্থিত হবে যা ইতিহাসবিদগণ সাম্প্রতিক সময়ে আইনী মহাফেজখানার পঠনের মাধ্যমে উন্মোচন করেছেন। আঠারো শতকে শাস্তির কঠোরতা কিছুটা শিথিল হয়ে আসে। আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে, উনিশ শতকে আইনী সংস্কারের ক্ষেত্রে দু ধরনের আন্দোলন দেখা যায় যার মাধ্যমে এসময়ে অপরাধ তার সন্ত্রাসী চেহারা এবং অপরদিকে শাস্তিও তার তীব্রতা কিছুটা হারিয়ে ফেলে। এই বদলগুলো হয়েছে বৃহত্তর হস্তক্ষেপের মূল্যে।

বস্তুতঃ সতেরো শতকের শেষ হতে যে কেউ দেখতে পাবেন যে অপরাধের ক্ষেত্রে খুনের সংখ্যা কমে এসেছে এবং ব্যাপকতর ভাবে শারীরিক আক্রমণের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। খুন এবং আঘাত করার মতো সন্ত্রাসী তৎপরতার বিপরীতে সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধের সংখ্যা এ সময় বেড়ে যায়। বেড়ে যায় চুরি এবং প্রতারণার সংখ্যা। দরিদ্রতম শ্রেণীর মানুষদের করা অদক্ষ, আকস্মিক এবং ঘন ঘন অপরাধের পরিবর্তে সীমিত কিন্তু ‘দক্ষ’ অপরাধের দেখা মেলে। সতেরো শতকের অপরাধীরা ছিল ‘অপমানিত মানুষ, যারা ঠিকমতো খেতে পেত না, অল্পেই রেগে যাওয়া বা কোনো কাজে নেমে পড়া, মৌসুমি অপরাধী।’ অন্যদিকে, আঠারো শতকের অপরাধীরা ছিল ‘কৌশলী, ধূর্ত, গোপনীয়তাপূর্ণ ও হিসেবি অপরাধী’ যারা সমাজের নানা প্রান্তে বসবাস করতো (শোওনু ১৯৭২, ২৩৬ এবং ১৯৬৬, ১০৭-৮)। শেষতঃ অপরাধের অন্তর্গত প্রতিষ্ঠান বদলে গেছে। অপরাধীদের বড় বড় চক্রগুলো (ক্ষুদে ও সশস্ত্র ইউনিটে কাজ করা লুটতরাজকারী, কর আদায়কারী কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের গুলি করা চোরাচালানকারী, ছত্রভঙ্গ সৈন্য অথবা সেনাবাহিনী থেকে পলায়নকারীরা দেশের প্রত্যন্ত যত অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতো) ভেঙে যাবার লক্ষণ দেখা গেল। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আরো দক্ষতার সাথে অপরাধকর্ম করা শুরু হলো। এই ছোট ছোট দলে ছ’জনের বেশি মানুষ কখনো থাকতো না। ধরা পড়া এড়াতে, তারা নিজেদের নানা চোরা-গোপ্তা কাজে জড়িয়ে ফেলে যাতে কম মানুষ লাগে এবং অল্প রক্তপাতের প্রয়োজন হয়: ‘বড় বড় অপরাধী চক্রগুলোর শারীরিক অর্থেই ধবংস করা অথবা প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নকরণ গোটা অপরাধের ক্ষেত্রটিকেই সম্পত্তি-বিরোধী অপরাধগুলো অবাধে সংঘটিত হতে পারার জন্য ছেড়ে দেয়। সম্পত্তি-বিরোধী এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ে একক ব্যক্তি অথবা ডাকাত ও পকেটমারদের ছোট ছোট দল, যাদের সংখ্যা কখনোই চারের বেশি হতো না।’ (লো রয়-লদুরি)। মানবশরীরকে আক্রমণকারী অপরাধ হতে অপরাধের লক্ষ্যবস্তু এ সময় ঘুরে যায় সম্পত্তির বিরুদ্ধে সঙ্ঘটিত অপরাধের দিকে। ‘গণ অপরাধ’ পরিণত হয় ‘প্রান্তিক অপরাধে।’ পেশাদার অপরাধীদের তাঁবে চলে যায় অপরাধ। যেন বা অপরাধের মাত্রা ধীরে ধীরে নমিত হচ্ছে। ‘মানবীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আধিপত্য করে যেসব উত্তেজনা তা যেন কমে এসেছে এসময়…তীব্র আবেগগুলোর উপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হচ্ছে। যেনবা মন্দ কাজগুলো শরীরের উপর তাদের মুঠো আলগা করেছে এবং অন্য লক্ষ্যবস্তুর প্রতি মনোযোগী হয়েছে। শাস্তি কোমল হবার বহু আগেই অপরাধ হয়ে উঠেছিল তুলনামূলক মৃদু প্রকৃতির। তবে, এই রূপান্তর নিম্নোক্ত কিছু প্রক্রিয়া থেকে আলাদা করা যায় না। পি,শোওনু-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়াগুলোর প্রথমটি হলো নানা অর্থনৈতিক চাপের ক্ষেত্রে বদল আনা, জীবনযাত্রার মানের গড়পরতা বৃদ্ধি, একটি বৃহৎ জনমিতিক সম্প্রসারণ, সম্পদ ও সম্পত্তির বৃদ্ধি এবং ‘নিরাপত্তার সার্বক্ষণিক চাহিদা।’ (শোওনু, ১৯৭১,৫০)। এছাড়াও, গোটা আঠারো শতক জুড়েই যে কেউ আইনের কঠোরতার মাত্রার বৃদ্ধি দেখতে পাবেন। ইংল্যাণ্ডে, আঠারো শতকের শুরুতে প্রচলিত ২২৩টি প্রধান অপরাধের ১৫৬টিই তার আগের এক শতকে চালু হয়েছে (বাক্সটন, ৩৯)। সতেরো শতকের ফ্রান্সে ভবঘুরেপনার উপর আইন সংশোধন করা হয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিকে কঠোরতর করার উদ্দেশ্যে। ছোট ছোট অপরাধের ক্ষেত্রেও আইনশাস্ত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কঠোর শাস্তি আরোপের প্রবণতা সূচনা হলো যা আগে অনায়াসেই ছেড়ে দেওয়া হতো। ‘আঠারো শতকে চুরির প্রতি আইন ছিল অধিকতর মন্থর, গুরুতর এবং কঠোরতর। বর্তমানে অবশ্য চুরির সংখ্যা বেড়েছে এবং যাকে এখন বুর্জোয়া চৈতন্যে এক ধরণের শ্রেণিবিচার হিসেবে দেখা হয়।’ ফ্রান্সে এবং বিশেষতঃ প্যারিস নগরে পুলিশী অবকাঠামোর বৃদ্ধি সংগঠিত ও মুক্ত অপরাধকে গোপনীয় আঙ্গিক পরিগ্রহ করার দিকে মোড় ফেরায়। অপরাধের ধারাবাহিক এবং বিপজ্জনক বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের ভেতর ব্যাপক ভীতি তৈরি হয় যা পুলিশী অবকাঠামো ও অন্যান্য সাবধানতামূলক ব্যবস্থার প্রসারে ভূমিকা রাখে। আজকের ইতিহাসবেত্তাগণ যখন অপরাধীদের বড় বড় চক্রের হ্রাস দেখতে পান, লো ট্রসনে এই অপরাধীদের দেখেছেন পঙ্গপালের মত ফ্রান্সের পল্লী এলাকায় ঘুরে বেড়াতে। ‘এই ক্ষুধার্ত পোকারা কৃষকদের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেয়। আক্ষরিক অর্থেই শত্র“বাহিনীর মতো আমাদের দেশের ভূখণ্ডের উপরিভাগে তারা ঘুরে বেড়ায়। যেন বা কোনো বিজিত দেশে তারা বাস করে। ভিক্ষার নামে সবার কাছ থেকে কর আদায় করে।’ দরিদ্রতম চাষীদের তারা খাজনার থেকেও বেশি কোনো কিছু পরিশোধ করতে বাধ্য করতো। ধনী কৃষকদের তাদের আয়ের এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় করতে হতো (লো ট্রসনে, ১৭৬৪,৪)। অধিকাংশ পর্যবেক্ষকই এই মত প্রকাশ করেছেন যে অপরাধের মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছিল। অবশ্য এই পর্যবেক্ষকদের ভেতর তারাই ছিলেন যারা কঠোরতর শাস্তির প্রবক্তা। আরো ছিলেন তারা যারা মনে করেন যে সন্ত্রাসকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইন হবে আরো সংযমী। যাতে সন্ত্রাস ব্যবহারের দরুন সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার দায়ভার ঘাড়ে কিছুটা কম নিয়েই আইন তার নিজের জায়গায় ফিরে আসতে পারে। (উদাহরণস্বরূপ, দ্যুপাটি, ২৪৭)। সেইসাথে আরো ছিলেন সেইসব ম্যাজিস্ট্রেটরা, যারা মামলার চাপে নিমজ্জিত ছিলেন। ‘মানুষের দুর্দশা এবং নৈতিক দুর্নীতি অপরাধ এবং অভিযুক্ত অপরাধীর সংখ্যা বাড়িয়েছে’ (সম্রাটের নিকট প্রদত্ত এক বক্তৃতায় শম্ব্র দো লা ত্যুর্নেল্ল্যে-র জনৈক বিচারক বলেন, যা ফার্জ উদ্ধৃত করেন, ৬৬ পৃষ্ঠা)। আদালতের বাস্তব অনুশীলন হতেই বোঝা যায় যে অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ‘প্রাচীন যুগের শেষ বছরগুলোয় বিপ্লবী এবং রাজকীয় যুগ অনুভব করা যাচ্ছিল। ১৭৮২-৯ সালের মামলাগুলোয় উত্তেজনার বৃদ্ধিতে যে কেউ আক্রান্ত হবেন। গরীবদের প্রতি এ সময় আইনের কঠোরতা বেড়েছে, সাক্ষ্যের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রত্যাখ্যান শুরু হয়েছে, এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস, ঘৃণা ও ভীতিবোধের বৃদ্ধি ঘটে’ (শোওনু ১৯৬৬, ১০৮)।

বস্তুতঃ রক্তের অপরাধীতা থেকে প্রতারণার অপরাধীতায় অপরাধের এই পালাবদল একটি গোটা জটিল কৃৎকৌশলের অংশ বিশেষ। এই পালাবদল আলিঙ্গন করে উৎপাদনের উন্নতি, সম্পদের বৃদ্ধি, সম্পত্তি সম্পর্কের উপর অধিকতর বিচারগত ও নৈতিক মূল্যবোধ আরোপন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিবর্গের উপর পাহারাদারি বাড়ানোর কঠোরতর নিয়মকানুন, জনসংখ্যার কঠিনতর বিভাজন, তথ্য নির্দেশ ও প্রাপ্তির দক্ষতর নানা কৌশল। বেআইনী নানা অনুশীলনের এই পালাবদল দণ্ডমূলক অনুশীলনের সম্প্রসারণ ও পরিমার্জনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

এই পালাবদল কি সামগ্রিকভাবে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন? একটি ‘পরিবর্তন যা আত্মা ও অবচেতনের রাজ্যের সত্তাধীন’ (মগেনসনের প্রকাশভঙ্গি অনুসারে)? সম্ভবতঃ তেমনটাই হবে। তবে, আরো নিশ্চিত ও প্রত্যক্ষভাবে বলতে গেলে এই পালাবদল ছিল ক্ষমতার কৃৎকৌশলের সাথে বোঝাপড়ার একটি প্রচেষ্টা যা ব্যক্তিমানুষের প্রতিদিনকার জীবনকে ছকবন্দি করে। এ যেন ক্ষমতার কৃৎকৌশলের সেই অভিযোজন এবং পরিমার্জনা যা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনকার ব্যবহার, তাদের অস্তিত্ব, কর্মকাণ্ড এবং আপাতঃ অগুরুত্বপূর্ণ নানা অঙ্গভঙ্গিকেও পাহারাধীন রাখার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। এ যেন সেইসব শরীর এবং শক্তিসমূহের প্রাচুর্যের জন্য গৃহীত এক নীতি যেসব শরীর এবং শক্তিসমূহ জনসংখ্যা গঠন করে। আইনী ব্যবস্থায় নতুন যা কিছুর উদ্ভাস দেখা যাচ্ছিল, তা যে অভিযুক্তের মানবতার জন্য খুব নতুন কোনো শ্রদ্ধাবোধ এমন কিন্তু নয়। এমনকি ক্ষুদ্র অপরাধে অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রেও নির্যাতন ছিল বহুল প্রচলিত। অধিকতর পরিশীলিত এক বিচার-ব্যবস্থা এবং সামাজিক শরীরের এক নিকটতর দণ্ডমূলক পরিকল্পনার প্রবণতা হিসেবে নির্যাতনের এই বহুল প্রচলন ছিল। একটি বৃত্তাকার প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে, ভয়াবহ সব অপরাধের জগতে পা রাখার সীমান্তে প্রবেশের ঘটনা বাড়ে। বাড়ে অর্থনৈতিক অপরাধের প্রতি অসহনশীলতা। বৃদ্ধি পায় নিয়ন্ত্রণ এবং দণ্ডমূলক হস্তক্ষেপগুলো অপরিণত অবস্থায়ই সংখ্যায় বিস্তার লাভ করে।

উপরোক্ত প্রক্রিয়াকে কেউ যদি সংস্কারকদের সমালোচনাত্মক মতবাদের সাথে তুলনা করেন, তবে কৌশলগত ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আকস্মিক মিল দেখতে পাওয়া যায়। একটি নতুন শাস্তি ব্যবস্থার নীতি গ্রহণের পূর্বে, সনাতনী বিচার-ব্যবস্থার যে দিকটি এই সংস্কারকরা আক্রমণ করছিলেন তা হলো শাস্তির বাড়াবাড়ি প্রকৃতিকে। শাস্তির এই বাড়াবাড়ি দণ্ডপ্রদান ক্ষমতার অপব্যবহারের চেয়েও বেশি জড়িত ছিল এক ধরনের অনিয়মের সাথে। ১৭৯০ সালের ২৪ মার্চ, থুরেট সংসদে বিচার ক্ষমতার নতুন সংগঠনের প্রশ্নে বিতর্ক সূচনা করেন। তাঁর মতে, বিচার করার ক্ষমতা ফ্রান্সে তিনভাবে ‘নষ্ট’ করা হয়েছে। প্রথমত, ব্যক্তিগত অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে। বিচারকের পদ বিক্রি হতো। এই পদ ছিল বংশানুক্রমিক। এই পদের ছিল বাণিজ্যিক মূল্য এবং সে কারণেই যে বিচার বিতরণ করা হতো, তা হতো গুরুভার। দ্বিতীয়ত, দু ধরনের ক্ষমতার প্রকরণের ভেতর এক ধরনের সংশয় দেখা দিত। যে ক্ষমতার বলে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মামলার রায় দেওয়া হতো আর যে ক্ষমতার বলে খোদ আইনকেই সৃষ্টি করা হতো, এই উভয়বিধ ক্ষমতার ভেতর প্রায়ই সংশয় সৃষ্টি হতো। তৃতীয়তঃ এবং শেষতঃ কিছু সুযোগ-সুবিধার ক্রমপরম্পরার অস্তিত্ব যা আইনের প্রয়োগকে অসঙ্গতিপূর্ণ করে তুলেছিল। কিছু কিছু আদালত, আইনী কার্যবিধি, মামলারত ব্যক্তিবর্গ এবং এমনকি ‘অপরাধ’কেও বিশেষ মর্যাদা বা সুযোগ দেওয়া হতো যা সাধারণ আইনের আওতার বাইরে থাকতো (আর্কাইভস পার্লেমেন্তেয়েরস্ ১২, ৩৪৪)। শেষের বিষয়টি অন্ততপক্ষে গত পঞ্চাশ বছর ধরে আইনী ব্যবস্থার উদ্দেশ্যে যত সমালোচনা নিক্ষেপ করা হয়েছে, সেসব সমালোচনার অন্যতম। একটি অনিয়মিত বিচার ব্যবস্থার নীতিকে ‘নষ্ট’ করতে গিয়ে উপরোক্ত সব সমালোচনাই নিন্দিত হয়েছে। দণ্ডমূলক বিচার ব্যবস্থা বরাবরই অনিয়মিত ছিল। শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করার জন্য প্রচুর সংখ্যক আদালত থাকার কারণেই দণ্ডমূলক বিচার ব্যবস্থার কোন একক এবং ধারাবাহিক পিরামিড গড়ে উঠতে পারেনি (লিঙ্গুয়েত অথবা ব্যুশে দ’অর্গিস, ১৭৮৯)। যাজকীয় এখতিয়ারের বিষয়টি বাদ দিলে, বিভিন্ন আইনী ব্যবস্থার ধারাবাহিকতাহীনতা, যুগপৎ সঙ্ঘটন এবং পারস্পরিক সঙ্ঘর্ষের বিষয়টি আমাদের অবশ্যই হিসাবে আনতে হবে। অভিজাতদের ছিল এক ধরনের আদালত, যে আদালতগুলো ছোট ছোট অপরাধের বিচার করতো। সম্রাটের আদালতগুলো সংখ্যায় ছিল প্রচুর এবং তাদের ভেতর সমন্বয়ের অভাব ছিল। ছিল নাজিরের আদালত এবং সর্বোপরি সরকারী আদালত যা সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যবর্তী দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থাপিত হয়েছে। এই আদালতগুলো কাগজে-কলমেই হোক বা বাস্তবিকই হোক, সরকারী কর্তৃত্বে পরিচালিত হতো। যেমন, intendants বা প্রাদেশিক প্রশাসকগণ, অধ্যক্ষ বা নগরাধ্যক্ষ এবং পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটবর্গ কর্তৃক পরিচালিত হতো। এছাড়াও নিয়মিত আইনী কার্যবিধির বাইরে, সম্রাট অথবা তাঁর প্রতিনিধির মৃত্যুদণ্ড বা নির্বাসন দানের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতার ব্যাপারটিও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। আদালতের এই সংখ্যা প্রাচুর্যের কারণেই এক কর্তৃপক্ষ অপর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নস্যাৎ করতো। ফলে, সমাজদেহকে তার সম্পূর্ণ অখণ্ডতায় এদের কেউই ধারণ করতে পারতো না। আপাতঃদৃষ্টে স্ববিরোধী মনে হলেও এই আদালতগুলোর পাশাপাশি অবস্থানের দরুন গোটা দণ্ডমূলক বিচার ব্যবস্থাই অসংখ্য ভুল-ত্রুটিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৭৬০ সালের সর্বজনীন অধ্যাদেশের উপস্থিতি সত্ত্বেও সমাজদেহকে সামগ্রিক ভাবে ধারণ করার ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণতার সৃষ্টি হয়েছিল প্রথা ও আইনী প্রক্রিয়ার বিভিন্নতার দরুন। দায়িত্বের অভ্যন্তরীন নানা সংঘর্ষ, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রশ্নে ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণেও এই অসম্পূর্ণতার সৃষ্টি হয়েছিল বৈকি। প্রত্যেক আদালতের কর্তৃপক্ষই এসব রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নে নিজের দিকটি রক্ষা করতে চাইতো যা হতে বিরোধের সৃষ্টি হতো। শেষতঃ ও সর্বোপরি রাজশক্তির হস্তক্ষেপ যা ক্ষমা, শাস্তির পরিবর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে রাজকীয় কাউন্সিলের দরবারে একটি মামলার সাধারণ বিবর্তন এড়াতে পারতো। কিম্বা, ম্যাজিস্ট্রেটবর্গ তথা বিচারের নিয়মিত ও কঠোর পরিক্রমায় প্রত্যক্ষ প্রভাব প্রয়োগ করতে পারতো।

এ সময়কার আইনী সংস্কারকদের সমালোচনা যতটা না কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা বা নিষ্ঠুরতাকে উদ্দেশ্য করে বর্ষিত হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বর্ষিত হয়েছে ক্ষমতার মন্দ অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে। নিম্নতর আদালতগুলোর হাতে এত বেশি ক্ষমতা সঞ্চিত ছিল যে বলার নয়। এছাড়াও, এই নিম্নতর আদালতগুলো অভিযুক্তদের আইনী জ্ঞানের অভাব ও দারিদ্র্যের কারণে প্রায়ই তাদের আপিল করবার আবেদন উপেক্ষা করে বিভিন্ন স্বেচ্ছাচারী রায় প্রয়োগ করতো। যথাযথ তত্ত্বাবধান ছাড়াই এই স্বেচ্ছাচারী রায় প্রয়োগ করা হতো। বাদীপক্ষের হাতে ন্যস্ত ছিল অপরিসীম ক্ষমতা যার বলে বাদীপক্ষ মামলার শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়তে সমর্থ হতো। অন্যদিকে, অভিযুক্ত পক্ষ ছিল বাস্তবিক অর্থেই নিরস্ত্র। ফলাফলস্বরূপ, বিচারক কখনো কখনো হতেন অতিরিক্ত কঠোর আবার কখনো কখনো হতেন অত্যধিক কোমল। বিচারকদের হাতে এত বেশি ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছিল যে তারা নিষ্ফলা সাক্ষ্য নিয়েই সন্তুষ্ট হতেন। সেই নিষ্ফলা সাক্ষ্যকেই তারা বলতেন ‘আইনী সাক্ষ্য’ এবং অভিযুক্তের জন্য শাস্তি নির্ধারণেও তাদের ছিল বিশাল ক্ষমতা। রাজকীয় ম্যাজিস্ট্রেটদের হাতেও ন্যস্ত ছিল বিপুল পরিমাণ ক্ষমতা। এবং এই ক্ষমতা শুধুমাত্র অভিযুক্তকে কেন্দ্র করেই ছিল না, ছিল অন্যান্য ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। শেষতঃ সম্রাট নিজেই চর্চা করতেন বিপুল ক্ষমতা। তিনি আদালত স্থগিত করতে পারতেন। পারতেন আদালতের সিদ্ধান্ত বদলাতে, ম্যাজিস্ট্রেটদের পদ থেকে বহিষ্কার করতে, ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাসনে পাঠাতে বা তাদের বদলে রাজকীয় কমিশনের আওতায় বিচারকদের বসাতে। সমগ্র বিচারব্যবস্থার অচলাবস্থা যতটা না তার দুর্বলতা হতে সৃষ্টি হয়েছিল, তারও চেয়ে বেশি সৃষ্টি হয়েছিল মন্দভাবে নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার বিতরণ হতে, কয়েকটি বিশেষ বিন্দুতে ক্ষমতার পুঞ্জিভূত হওয়া এবং এই পুঞ্জিভূতকরণ হতে উদ্ভুত সংঘর্ষ এবং ধারাবাহিকতাহীনতা থেকে।

ক্ষমতার এই অকার্যকারিত্ব একটি কেন্দ্রীয় অতিরেকের সাথে সম্পর্কিত ছিল। যাকে বলা যেতে পারে সম্রাটের ‘চূড়ান্ত ক্ষমতা।’ এই ‘চূড়ান্ত ক্ষমতা’র বদৌলতেই শাস্তি প্রদানের ক্ষমতাকে সম্রাটের ব্যক্তিগত ক্ষমতা হিসেবে শনাক্ত করা হতো। তাত্ত্বিক এই শনাক্তকরণই সম্রাটকে fons justitiae হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই শনাক্তকরণের বাস্তব ফলাফল খুঁজে পাওয়া যেত সেসব বিষয়েও যা সম্রাটকে বিরোধিতা করতো এবং তার চূড়ান্ত ক্ষমতাকে সীমিত করতো। কিন্তু, সম্রাট যেহেতু অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে তার ‘অধিকারে’ থাকা নানা আইনী পদ বিক্রি করতেন, তাঁকে প্রায়ই ম্যাজিস্ট্রেটদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হতো। কেননা, এই ম্যাজিস্ট্রেটরা শুধু দুর্দমনীয়ই ছিল না। ছিল মূর্খ, আত্মস্বার্থসম্পন্ন এবং ঘন ঘন আপোসকারী। যেহেতু সম্রাট ধারাবাহিকভাবে নানা পদ সৃষ্টি করতেন, তিনি ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সংঘাতকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যেহেতু সম্রাট ম্যাজিস্ট্রেটদের উপর খুবই ঘনিষ্ঠভাবে ক্ষমতা চর্চা করতে পারতেন, আবার তিনিই ম্যাজিস্ট্রেটদের উপর যথেচ্ছ ক্ষমতা অর্পণ করেছেন, কাজেই সম্রাট ম্যাজিস্ট্রেটদের ভেতর সংঘর্ষ কেন্দ্রীভূত করে তুলেছিলেন। সম্রাট আইনকে বিচারব্যবস্থার খুঁটিনাটি নানা কাজের সাথে সংঘর্ষের মুখোমুখি করেছিলেন (যেমন, অধ্যক্ষ বা পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের কর্তৃত্ব বা এখতিয়ার)। আইনকে তিনি প্রশাসনিক নানা পদক্ষেপের সাথেও সংঘর্ষে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। সাধারণ বিচার ব্যবস্থাকে তিনি পঙ্গু করে ফেলেছিলেন। তিনি বিচারকে কখনো অত্যধিক কোমল এবং সঙ্গতিহীন আবার কখনো অতি দ্রুত ও কঠোর করেছেন।

আইনী সংস্কারকরা শুধুই যে বিচার ব্যবস্থার নানা সুবিধাবাদী দিক, এর স্বেচ্ছাচার, পুরাতাত্ত্বিক অহম ও অনিয়ন্ত্রিত অধিকারকেই সমালোচনা করেছে তা নয়। বরং এই ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অতিরেক, এর বাড়াবাড়িপনা ও ফাঁক-ফোকড়কেও সমালোচনা করেছে। সর্বোপরি সমালোচনা করেছে দুর্বলতা ও বাড়াবাড়ির মিশ্রণের নীতিকে, সম্রাটের ‘চূড়ান্ত ক্ষমতা’কে। ব¯ত্ততঃ সবচেয়ে সাধারণ সূত্র অনুসারেও, সংস্কার আন্দোলনের সত্য উদ্দেশ্য ছিল যতটা না অধিকতর কোনো ন্যায়পরতার নীতির উপর ভিত্তি করে দণ্ডদানের নয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, তারও চেয়ে বেশি অভিপ্রায় ছিল দণ্ড প্রদানের জন্য ক্ষমতার ‘নয়া অর্থনীতি’ সৃষ্টি করা। দণ্ডের শ্রেয়োতর বিতরণ নিশ্চিত করা। যাতে করে ক্ষমতা কয়েকটি নির্দিষ্ট বিন্দুতেই কেন্দ্রীভূত না হয় কিম্বা পরস্পরবিরোধী কর্তৃপক্ষসমূহের মাঝে ভাগ না হয়। বরং যেন এই ক্ষমতা সর্বত্র কর্মতৎপরতায় সক্ষম সমধর্মী বৃত্তগুলোয় সমান ভাবে এবং ধারাবাহিক ভাবে বণ্টন হয় যা সমাজদেহের সূক্ষ্মতম উপাদান অবধি পৌঁছবে। ৪ অপরাধ বিষয়ক আইনের সংস্কার শাস্তি প্রদান ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের জন্য একটি কৌশল হিসেবে পাঠ করা প্রয়োজন। এবং যেসব ক্রিয়াপদ্ধতি এই কৌশলকে আরো নিয়মিত, আরো লাগসই, আরো ধারাবাহিক এবং আরো পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে, সেসব ক্রিয়াপদ্ধতি অনুসারেই এই কৌশল পাঠ করতে হবে। সংক্ষেপে, অপরাধ আইনের সংস্কার এমন ভাবে হতে হবে যাতে ক্ষমতার প্রভাব কমে আসে। সেই সাথে যেন কমে আসে ক্ষমতার অর্থনৈতিক ব্যয়ভার। অর্থাৎ, সম্পত্তি ব্যবস্থা বা কেনা-বেচা হতে ক্ষমতাকে দূরে রাখতে হবে এবং বিচার বিভাগের বড় বড় পদ বা খোদ মামলার রায় যেন কেনা-বেচা হবার সুযোগ না পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। ক্ষমতার রাজনৈতিক ব্যয়ভারও কমা প্রয়োজন। সম্রাটের ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারীতা হতে মামলার সিদ্ধান্তকে আলাদা করার মাধ্যমে এই রাজনৈতিক ব্যয়ভার কমা সম্ভব। শাস্তির নতুন আইনী তত্ত্ব বস্তুতঃ দণ্ড প্রদান ক্ষমতার নয়া ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’র সাথে সম্পৃক্ত। এবং এই সম্পৃক্ততাই ব্যাখ্যা করে কেন আইনী ‘সংষ্কারে’র কোনো নির্দিষ্ট একক উৎস ছিল না। জনতার ভেতরকার অধিকতর আলোকপ্রাপ্ত সভ্যরা কিম্বা দার্শনিকরা এই সংস্কারের একক উদ্গাতা ছিলেন না, যারা নিজেদের স্বৈরাচারের শত্র“ ও মানবকল্যাণের বন্ধু মনে করতেন। এমনকি সাংসদদের বিরোধিতাকারী সামাজিক গোষ্ঠিগুলোও যে এককভাবে এই আইনী সংস্কারের দাবি তুলেছেন তা-ও কিšত্ত নয়। কিম্বা, এমনও নয় যে এই গোষ্ঠিগুলো তাদের দাবি তুলে ধরবার ক্ষেত্রে ছিলেন একা। দণ্ডপ্রদান ক্ষমতার নয়া বণ্টনের এই একই সামগ্রিক প্রকল্পে নানা ধরনের স্বার্থ একত্রে মিশেছিল। আইনী যন্ত্রের বাইরে এই সংষ্কার প্র¯ত্তত করা হয় নি বা আইনী ব্যবস্থার সকল প্রতিনিধির বিরুদ্ধেও এটা করা হয়নি। বরং এই সংস্কারের গরিষ্ঠ অংশটুকু প্র¯ত্তত হয়েছিল আইনী ব্যবস্থার ভেতরেই। বিপুল সংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেটরা এই সংস্কার সম্ভব করে তুলেছিলেন মূলতঃ তাদের একই লক্ষ্য এবং ক্ষমতার সঙ্ঘর্ষ হতে যা তাদের পৃথক করে রেখেছিল। নিঃসন্দেহে সংস্কারপন্থীগণ ম্যাজিস্ট্রেটদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের প্রতিনিধিত্ব করতেন না। তবে, সংস্কারের সাধারণ নীতিমালার রূপরেখা প্র¯ত্তত করেছিলেন আইনজীবিদের একটি কমিটি। তারাই নির্দ্ধারণ করেছিলেন যে সম্রাটের ক্ষমতা চর্চা বিচারকের বিচার করবার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে না। আইন প্রণয়নের যে কোন দাবি হতে বিচার বিভাগ মুক্ত থাকবে। সম্পত্তি সম্পর্ক হতে বিচার বিভাগ মুক্ত থাকবে। এবং, বিচার করা ছাড়া অন্য কোনো ধরনের কাজে জড়িত হবে না বলেই বিচার বিভাগ তার ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করবে। সংক্ষেপে, বিচার করবার ক্ষমতা যেন আর কোনোমতেই সম্রাটের অসংখ্য, ধারাবাহিকতাহীন এবং মাঝেমাঝেই পরস্পরবিরোধী ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল না হয়। বরং, জনতার ক্ষমতার ধারাবাহিক ভাবে বণ্টিত প্রভাবের উপর যেন এই বিচার করবার ক্ষমতা নির্ভরশীল হয়। সংস্কারবাদীদের প্রণীত সংস্কারের এই সাধারণ নীতিমালা একটি সামগ্রিক কৌশলের রূপরেখা বিন্যস্ত করে যা ভিন্নধর্মী নানা সংগ্রামকে আত্মস্থ করেছিল। ভলতেয়ারের মতো দার্শনিক বা ব্রিসোত কি মারাতের মতো সাংবাদিকরাই শুধু নয়, সেই সব ম্যাজিস্ট্রেটরাও এই সংগ্রামে ছিলেন যাদের স্বার্থ ছিল বহুমুখী। ছিলেন অর্লিয়ন্সের রাষ্ট্রপতি আদালতে বিচারক লো ট্রসনে, সংসদের এডভোকেট জেনারেল লাক্রাতেল্লে। আরো ছিলেন টার্গেট, যিনি সংসদের সাথে একত্রিত হয়ে মাওপিয়োর সংষ্কারের বিরোধিতা করেছিলেন, জে.এন.মোরে‌্যউ যিনি সংসদের বিরুদ্ধে সম্রাটের ক্ষমতাকে সমর্থন করেছেন, সহকর্মীদের সাথে দ্বন্দ্বে নিরত সার্ভান এবং দ্যুপাটির মতো মানুষেরাও।

গোটা আঠারো শতক জুড়েই আইনী অবকাঠামোর ভেতর-বাইরে এবং প্রতিদিনকার দণ্ড অনুশীলনে এবং প্রতিষ্ঠানের সমালোচনায়, শাস্তি প্রদান ক্ষমতার চর্চায় এক নতুন কৌশলের আগমনী যে কেউ দেখতে পাবেন। এবং ‘সংস্কার,’ যথার্থ অর্থেই, আইনের তত্ত্বে বা আরো নানা প্রকল্পে যেভাবে আঁকা হয়েছে, তা মূলতঃ এই নতুন কৌশলের দার্শনিক ও রাজনৈতিক পুনরারম্ভ। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল শাস্তি এবং বেআইনী কার্যক্রমের দমনকে একটি নৈমিত্তিক কাজে পরিণত করা, যা সমাজের সাথে সমব্যপ্তিসম্পন্ন হবে। অর্থাৎ, শাস্তির নতুন কৌশলের লক্ষ্য হলো শাস্তিকে কমানো নয়, বরং উন্নততর করা। শাস্তির নির্মমতা কমানো হবে ঠিকই কিন্তু অধিকতর সর্বজনীনতা এবং প্রয়োজনীয়তার সাথে শাস্তি প্রদান করা হবে। সমাজদেহে শাস্তি প্রদান ক্ষমতাকে আরো নিবিড় ভাবে সন্নিবেশিত করতে হবে।

কাজেই, যে যুগসন্ধিক্ষণ আইনী সংস্কারের জন্ম দেখেছে, সেই সংস্কার কোনো নতুন বোধের কারণে সৃষ্ট হয় নি। বরং বেআইনী কার্যক্রম সম্পর্কে একটি নতুন নীতির কারণেই এই সংস্কার সৃষ্টি হয়েছে।

কড়া ভাবে বললে যে কেউ বলতে পারেন যে প্রাচীন যুগে সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রতিটি স্তরেরই বেআইনী কার্যক্রম সহ্য করবার একটি প্রান্তরেখা ছিল। নিয়মের অব্যবহার, আইনের অসংখ্য অধ্যাদেশ ও ধারার মেনে না চলা সমাজের একধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্রিয়তার একটি বিশেষ অবস্থান নির্দেশ করে। প্রাচীন যুগে আইনের এই দশা খুব উদ্ভট কোনো ব্যপারও ছিল না। তবে, বেআইনী কার্যক্রম সমাজের এত গভীরে প্রোথিত ছিল এবং প্রতিটি সামাজিক স্তরের জীবনেই এত প্রয়োজনীয় ছিল যে এক অর্থে বললে এই বেআইনী কার্যক্রমের নিজস্ব সামঞ্জস্য এবং অর্থনীতি ছিল। কখনো কখনো এই বেআইনী কার্যক্রম রীতিমতো বিধিবদ্ধ চেহারা পেত। যেহেতু সমাজের কিছু বিশেষ ব্যক্তি ও গোষ্ঠিকে নিয়মিত দায়মুক্তির আকারে বেআইনী কার্যক্রমের দায়ভার হতে অব্যাহতি দেওয়া হতো। মাঝে মাঝে এই বেআইনী কার্যক্রম আবার সাধারণভাবে ব্যপক সংখ্যক মানুষের আইন মেনে না চলার আকারে রূপ লাভ করতো। এর অর্থ হলো যে কখনো যুগ যুগ ধরে, আবার কখনো শতাব্দী জুড়ে আইনী অধ্যাদেশ প্রকাশিত এবং ধারাবাহিকভাবে নবায়ন কৃত হতে পারতো কিন্তু কখনোই বাস্তবায়িত হতো না। কখনো কখনো আইনের এই ধারাগুলো একধরনের নিষ্ক্রিয়তায় পড়ে যেত এবং তারপর হয়তো আবার পুনরুজ্জীবিত করা হতো। কখনো আবার কর্তৃপক্ষের তরফ হতে বেআইনী কার্যক্রমের পক্ষে এক ধরনের মৃদু অনুমোদন থাকতো অথবা আইনের প্রতি অবজ্ঞা থাকতো। কিম্বা, স্রেফ আইনের প্রয়োগ এবং অপরাধীদের গ্রেফতার করাটা অসম্ভব প্রতীয়মান হতো কর্তৃপক্ষের কাছে। নীতিগত ভাবেই, জনতার নিম্নতম স্তরবিন্যাসের মানুষদের কোনো বাড়তি সুযোগ-সুবিধা ছিল না সমাজের উচ্চ বা মধ্য কোটির মানুষদের মতো। তবে, আইন ও প্রথার মাধ্যমে তাদের ওপরে চাপানো প্রান্তরেখা হতে কিছু সুবিধা তারাও পেয়েছে। বেআইনী কার্যক্রমের প্রতি কর্তৃপক্ষের সহনশীলতার পরিসর হতে এবং বলপ্রয়োগ বা জেদের মাধ্যমেও এই সুবিধা তারা অর্জন করতে পেরেছে। এবং, সহনশীলতার এই পরিসরটুকু তাদের অস্তিত্বের এমনি অচ্ছেদ্য এক শর্ত ছিল যে তারা এটি রক্ষা করতে সদা প্র¯ত্তত ছিল। কাজেই, ধীরে ধীরে বেআইনী কার্যক্রমের প্রতি কর্তৃপক্ষীয় সহনশীলতার এই পরিসরটুকু কমানোর জন্য পুরনো আইন পুনরুজ্জীবিত করা বা গ্রেপ্তার করার পদ্ধতি উন্নততর করার মতো যেকোনো পদক্ষেপই জনতার ভেতর বিক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। ঠিক যেমন অভিজাত শ্রেণী, বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত এবং যাজক শ্রেণী তাদের সুযোগ সুবিধা কমানোর যে কোনো পদক্ষেপে বিরক্ত হতেন।

চলবে

তথ্যনির্দেশ

১. মূল গ্রন্থে এই বাক্যটির কোন ইংরেজি তর্জমা দেওয়া হয়নি। অক্সফোর্ড ফরাসী-ইংরেজি অভিধানে এই বাক্যে ব্যবহৃত শব্দগুলোর অর্থ পাওয়া যায় নি। এটি সম্ভবতঃ কোন ল্যাটিন বাক্য। — বাংলা অনুবাদক।

২. মগেনসেন (Mogensen), ৩২৬। লেখক এখানে দেখিয়েছেন যে ঔজে বিপ্লবের আগে আগে সন্ত্রাসমূলক অপরাধ লুই চতুর্দশের সময়ের চেয়ে চার ভাগ কম ছিল। বৃহত্তরভাবে বলতে গেলে, পিয়েরে শোউনুর নর্ম্যাণ্ডিতে অপরাধ বিষয়ক কাজ প্রতারণার ক্ষেত্রে একই বৃদ্ধি দেখিয়েছে যা সন্ত্রাসের মূল্যে কেনা হয়েছে । আরো দেখুন এ্যানালস্ দ্যু নর্ম্যাণ্ডিতে (Annals de Normandie) বি.ব্যুতেলেত (B.Boutelet), জে.সি. গেগোট (J.C.Gegot) এবং ভি.ব্যুশেরনের (V.Boucheron) প্রবন্ধ (১৯৬২, ৬৬ এবং ১৯৭১)। প্যারিসের জন্য দেখুন পেত্রোভিচ (Petrovitch)। অনুমান করা হয় যে একই ঘটনা ইংল্যাণ্ডেও ঘটেছিল: হিবার্ট (Hibbert) ৭২ এবং তোবিয়াস (Tobias), ৩৭।

৩. লো রয়-লেদুরি (Le Roy-Ladurie), ১৯৭৩। ফার্জও এই একই প্রবণতা সমর্থন করেন। ১৭৫০ হতে ১৭৫৫ সালের ভেতর খাবার চুরির অপরাধে অভিযুক্তদের পাঁচ শতাংশকে ফাঁসিকাঠে পাঠানো হয় এবং এই হার ১৭৭৫-১৭৯০ সালের ভেতর ১৫ শতাংশে দাঁড়ায়: ‘ যত সময় যেতে থাকে, আদালত ততই কঠোর হতে থাকে। সমাজের উপযোগী মূল্যবোধ যা চেয়েছে সম্পত্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে, তা’ হুমকির আওতায় গেল।’ (ফার্জ ১৩০-৪২)।

৪. ফরাসী এ শব্দের অর্থ অভিধানে লেখা হয়েছে paymaster বা quartermaster। বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ইংরেজি-বাংলা অভিধানে paymaster শব্দটির কোন অর্থ দেওয়া হয় নি। তবে, quartermaster শব্দটির অর্থ হলো সেনাবাহিনীর কোন ব্যাটালিয়নের রসদের ভারপ্রাপ্ত অফিসার। — বাংলা অনুবাদক।

৫. ফরাসী-ইংরেজি অভিধানে এই শব্দবন্ধের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় নি। সম্ভবতঃ এই ল্যাটিন শব্দবন্ধের অর্থ ‘fountain of justice’ বা ‘ন্যায়বিচারের ঝর্না/উৎস’ জাতীয় কিছু হবে।

৬. বিচার ব্যবস্থার ক্ষমতা সম্পর্কে বার্গাসে বলেন, ‘রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শাসনপদ্ধতির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের কোনো কাজ করার অধিকার হতে বঞ্চিত হয়ে এবং যে ইচ্ছাগুলো একত্রিত হয়ে এই শাসনপদ্ধতি গড়ে তোলে বা অব্যাহত রাখে সেই ইচ্ছাগুলোর উপরও কোনো প্রভাব না থাকার কারণে বিচার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই এই ক্ষমতা থাকতে হবে যাতে সে সকল ব্যক্তি এবং অধিকার সমূহকে রক্ষা করতে পারে। বিচার ব্যবস্থা যেন এমন এক শক্তি যে এই রাজনৈতিক শাসকপদ্ধতিকে রক্ষা করা ও সমর্থন যোগানোর ক্ষেত্রে সকল শক্তিসম্পন্ন। যে মুহূর্তে না নির্যাতন নিপীড়নের কাজে বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করার জন্য তার গতিপথ বদলানো হয়, সেক্ষেত্রে গোটা বিচার ব্যবস্থার উচিত হলো নাই হয়ে যাওয়া (বার্গাসে, ১১-১২)।

a_falgun@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Saikat Biswas — ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০০৮ @ ১২:৫৯ অপরাহ্ন

      এগুলো গভীর মন দিয়ে পড়তে হয়। অফিসে বসে ফুকো পড়লে চাকরি যাবে আর মজাও লাগবে না। প্রিন্ট করার অপশন দরকার, যাতে ঘুমোনোর আগে পড়া যায়। প্রতিদিন তো কিছু কিছু পড়ি।

      সৈকত বিশ্বাস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইউসুফ বান্না — মে ২৯, ২০১৪ @ ১০:১৫ অপরাহ্ন

      অদিতির এই পরিশ্রমসাধ্য কাজের প্রশংসা জানাই। আরেকটি প্রশ্ন, লেখক কি মোট ৬ কিস্তি পর্যন্তই লিখেছেন?
      পুরো লেখাটা ৯৮ পৃষ্ঠার মতো, প্রিন্ট করে পড়তে হবে–আলসেমি করে শুয়ে বসে। কারণ এমন গুরুভারি লেখা ল্যাপটপের স্ক্রিনে বসে পড়াটা জগদ্দলের মতো।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com