অবিশ্বাস্য অভিযান ও ঘটনায় পূর্ণ এক রোমাঞ্চকর আত্মজীবনী

সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ | ৭ মার্চ ২০১৭ ১২:৪৯ অপরাহ্ন

Cover Muhammal Ttakiullah‘যে দেশে গুনীর কদর নাই সেই দেশে গুনী জন্মায় না’, কথাটি বলেছিলেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। কি কাকতালীয় ব্যাপার, উনার ষষ্ঠ সন্তান, চতুর্থ পুত্র, আবুল জামাল মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, যিনি কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ নামে অধিক পরিচিত তার স্মৃতিকথার একটি অনুলিখন পড়তে গিয়ে ঐ কথাগুলাই মনে হচ্ছিল।
উচ্চশিক্ষিত, লেখালেখি আর ছবি তোলার গুনসম্পন্ন, সুদর্শন, বলশালী, প্রথম বাঙালী হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমিশন্ড অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাবার পরেও কেবল ভাষা আন্দোলনের টানে সেটি ছেড়ে আসা এই অসামান্য মানুষটির গল্প নিয়ে কোন ছায়াছবি করলে সেটিকে কাল্পনিক বলে মনে হতে পারে কারণ তার জীবনে রয়েছে অবিশ্বাস্য সব অভিযান ও ঘটনাবলী।
আজীবন মার্ক্সবাদী, পিতার মতোই ধর্মপরায়ন এবং সততার প্রতীক এই মানুষটির জীবন যদি কেবল তার নিজের আলেখ্য হতো তাও তাকে নিয়ে উপেক্ষা মানা যেত, কিন্তু তিনি এক দুর্দান্ত সময়ের প্রতীক। দেশভাগের আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামানোর চেষ্টাকারী কিশোর, ভাষা আন্দোলনের সংগঠক, পাকিস্তানী স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ নাম, শ্রমিক-মেহনতী মানুষের কল্যানে লড়াই করা, দেশের জন্য জেলখাটা রাজবন্দী আর এসবের পরে একটু বেশী বয়সে এসে একজন গুরুত্বপূর্ণ গবেষক, যিনি বাংলার পঞ্জিকা বিনির্মাণ আর সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এতো কিছুর পরেও তিনি আমাদের কাছে অচেনা! অথচ তাঁকে চেনা মানে একটি অবিশ্বাস্য জীবনের স্বাদ পাওয়া নয়, বরং আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল সময়কে চেনা, সেই সময়কে ধারন করা।

তকীয়ূল্লাহর কন্যা শান্তা মারিয়া, যার নামটি পিতা এমনভাবে রেখেছিলেন যাতে তার ধর্ম বা জাতিপরিচয় কোনটিই প্রকট না হয়ে পড়ে এবং মানুষ তাঁকে কেবল মানুষ হিসেবেই দেখে, তিনি পিতার জবানে ছোট্ট একটি স্মৃতিকথা লিখেছেন যার নাম পলাতক জীবনের বাঁকে বাঁকে। বইটি পড়লে মনে হবে এটি হতে পারতো এক দুর্দান্ত চিত্রনাট্য। কল্পনা করা যাক এর শুরুটা কোথা দিয়ে হতো!
বইটির ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখক বলেন যে ‘শান্তিময় পরিবেশে মানুষের শৈশব ও কৈশোর অনেকদিন স্থায়ী হয়। আর যুদ্ধ, রাষ্ট্রবিপ্লবে শিশু দ্রত বড় হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আমাকে বালক থেকে দ্রুত পূর্ণবয়স্ক মানুষে পরিণত করে দিল। দেখলাম তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, একটু ভাতের জন্য মানুষের হাহাকার। পথে পথে মৃত্যুর রাজ্যপাট।’ লাইনগুলো ব্যক্তি তকীয়ূল্লাহর জীবনধারা আর সেই সময়ের একটা ধারণা দেয়।
সত্যি কথা বলতে কি, এই বইয়ের পর্যালোচনা করতে গেলে পুরো বইটাই তুলে দিলেও সেটা পাঠকের ধৈর্য্যচুতি ঘটাবে না, সরলপ্রাণ মানুষটির বিবরণ সরল ভাষাতেই উঠে এসেছে আর তাই একে সংক্ষিপ্ত করাটাও মুশকিলের। সুতরাং একমাত্র উপায় কেবল কিছু পয়েন্ট এর উল্লেখ করা যেগুলো দিয়ে চিত্রনাট্যর ভিন্ন ভিন্ন অঙ্ক হতে পারে।
১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সূচনায় যে চারটিমাত্র আলোকচিত্র পাওয়া যায় সেটি তকীয়ূল্লাহর তোলা। সেই ৪৮ সালেই তার মাথার দাম ৫ হাজার হবার পর ৫১ সালে ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত পালিয়ে বেড়ানো, সেই ফেরারি জীবনে কখনো সুইপার কলোনির একজন হয়ে, কখনো জোব্বাধারী অবাঙালী সেজে, ধূমপানে অনাসক্ত হলেও কেবল ছদ্মবেশের স্বার্থে চরম কষ্টে চুরুট টানার কাহিনী কিংবা শেষ মুহূর্তে পুলিশ বা খোচড়ের খবর পেয়ে পালানোর রোমাঞ্চকর কাহিনীগুলো আমাদের নিঃসন্দেহে উদ্বেলিত করে তুলবে।

জেলে যাবার পর শাসকগোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচার, পাগলাগারদে রেখে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করার মতো চক্রান্তেও তার কেবল অটল থাকা নয় বরং সে সময় মেহনতী মানুষের কথা ভেবে, সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে কবিতা লেখা, কয়েদীদের চাঙ্গা রাখা তো আছেই সেলের ভেতর তার সাথে একটা কাকের বন্ধুত্বও এই বর্ণময় চরিত্রটির দ্যুতি ছড়িয়ে দেয়।
অসাম্প্রদায়িক, কমিউনিষ্ট এই মানুষটি রাতভর অত্যাচারের পর সকালে যখন তিনি ফজরের নামাজ পড়ার অনুমতি চান তা কেবল স্টেরিওটাইপ ভেঙে দেয় তাই না, জেলের সাধারণ সিপাহীরা পর্যন্ত তার উপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করেন।
শেষতক বলতে হয় তার সাথে বন্ধু শহীদুল্লাহ কায়সারের সম্পর্ক। দুজন মিলে যুবলীগ গঠন করে অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়া, নানা কাহিনী, আর শেষমেশ বধ্যভূমিতে পাগলের মতো বন্ধুর লাশ খুঁজতে গিয়ে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়া।
ছোট্ট এই বইটি পড়ে তাই সেই সময়গুলো জানার থেকে আফসোস হচ্ছে বেশী। অসুস্থ, বৃদ্ধ এই মানুষটির বিস্তারিত কাহিনী, সেই উত্তাল দিনগুলোর ইতিহাস আশা করি আমরা আরো বিস্তারিত জানবো। আমাদের এই মহান বীরদের স্মরণ করে আমরা উজ্জীবিত হবো। অসংখ্য ধন্যবাদ শান্তা মারিয়াকে তার পিতার জীবনীর অনুলিখন করার জন্য।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন tirtha — মার্চ ৭, ২০১৭ @ ৮:১৫ অপরাহ্ন

      how can i collect this book ?? name of the publisher??

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Azizur Rahman — মার্চ ৮, ২০১৭ @ ২:৩৭ পূর্বাহ্ন

      তকীয়ূল্লাহর কন্যা শান্তা মারিয়ার লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশেের অনুরোধ করছি। এই ক্ষণজন্মা বিপ্লবীর অজানা ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরলে অনেকে দেশপ্রমে ও শোষক শ্রেণির সম্পর্কে নতুন করে প্রেরণা পাবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আমিরুল আলম খান — মার্চ ৮, ২০১৭ @ ৯:১৯ পূর্বাহ্ন

      কত মানুষের ত্যাগ, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গের মিলিত স্রোতের বিশাল মোহনায় আমাদের স্বাধীনতা্র সমুদ্রস্নান। কত অজানা কাহিনি শত মিথ্যায় ঢাকা পড়ে আছে। গলাবাজির বিশ্বে নিরালোকে থাকা মানুষগুলোর প্রতি অবহেলা, অপমান আমাদের নিত্য অভিজ্ঞতা।
      নিভৃতচারী এই পরম মানবতাবাদী তকীয়ূল্লাহকে লাখো সালাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shamsul Alam — মার্চ ৯, ২০১৭ @ ১১:৫২ অপরাহ্ন

      লাখো সালাম এই খাঁটি মানুষটিকে। ওনার বিষয়ে আরো জানতে চাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md.Feroz Shah — মার্চ ১২, ২০১৭ @ ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

      বইটি সংগ্রহ করে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অজানা অধ্যায় জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করছি। বইটির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও প্রাপ্তিস্থান জানালে কৃতার্থ হব।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com