অনুবাদ সাহিত্য: বৈচিত্র্য ও বৈভব, আদর্শ ও বিতর্ক

আবদুস সেলিম | ৫ মার্চ ২০১৭ ৪:০১ অপরাহ্ন

translation-1১.অনুবাদ সাহিত্য
জ্যাক দেরিদা, ওয়াল্টার বেনজামিন-এর একটি বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেছিলেন, অনুবাদ কোনো গ্রন্থ বা মুদ্রিত পাঠ্যবস্তুর টিকে থাকা নিশ্চিত করে। ইংরেজিতে বক্তব্যটি এমন, ‘Translation, . . . ensures the survival of a text.’। তিনি এও বলেছেন অনুবাদ আসলে সাহিত্যকর্মের অন্যজীবন দেয়–এক নতুন মৌলিক অস্তিত্ব সৃষ্টি করে অপরাপর ভাষায়। প্রসঙ্গত এও বলা হয়েছে–বলেছেন জোসেফিন পামার–অনুবাদ ছাড়া কি আমরা পড়তে পারতাম খৃস্টপূর্ব সাত দশকের গ্রিক মহিলা কবি স্যাফোর কবিতা বা পাঁচ দশকের গ্রিক নাট্যকার ইস্কিলাসের নাটক?
অনুবাদকর্মের আলোচনায় সনাতনভাবে দুটি বিতর্কিত বিষয় উত্থাপিত হয়–আনুগত্য ও স্বাধীনতা (fidelity and license)। অর্থাৎ বিশ্বাসযোগ্য ভাষান্তরের স্বাধীনতা এবং তা করতে গিয়ে মূলের প্রতি অনুগত থাকা। মানতেই হবে, অনুগত থাকার অর্থ উৎস ভাষার অর্থটিকেই বিশ্বস্তরূপে অনুকরণ করা নয় আক্ষরিকভাবে। কারণ শব্দ বা word কখনই কোনো সাহিত্যকর্মের অন্তর্নিহিত অর্থকে চিহ্নিত করে না কারণ যেকোনো শব্দের দুটি অবস্থান রয়েছে–বিশেষ করে সাহিত্যকর্মে–একটি আভিধানিক এবং অন্যটি দ্যোতনিক বা গূঢ়ার্থিক। বিরোধ বাধে ঐ দ্যোতনিক বা গূঢ়ার্থিক শব্দের ভাষান্তর কালে। যদিও নীগিতভাবে অনুপযোগী (politically inappropriate) তবুও বর্তমান প্রসঙ্গে উপযোগী, আমি এই উদ্ধৃতিটি বিনয়ের সাথে উত্থাপন করতে চাই: Translation is like a woman: if she is faithful, she is not beautiful; if she is beautiful, she is not faithful. গূঢ়ার্থটি হলো, অনুবাদক কখনই একাধারে মূলের প্রতি অনুগত থেকে নান্দনিক অনুবাদকর্ম করতে পারে না। নান্দনিক বা সুন্দর হতে হলে স্বাধীনতা অপরিহার্য।

ড. খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, তাঁর সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে বলেছেন: অনুবাদ আসলে মর্যাদাসম্পন্ন সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি পেতে শুরু করে গত শতাব্দীর ৮০-র দশক থেকে। যথার্থভাবে অনুবাদ কোনো শিল্পকর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ৯০-এর দশকের পর। যতদূর মনে পড়ে বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই, অর্থাৎ ১৯৫৫ থেকেই অনুবাদের একটি বিশিষ্ট স্থান নির্ধারিত ছিল যার জন্য তার নিঃশর্ত প্রশংসা অবশ্য প্রাপ্য যদিও এই প্রতিষ্ঠান থেকে সুপ্রচুর অনুবাদকর্ম প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করা যাবে না।
শিল্পের অনুকরণ-প্রবণতায় অনুবাদের একটি সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে–উপর্যুক্ত প্রবন্ধে খালিকুজ্জামান ইলিয়াস-এর এই মন্তব্যও সমর্থনযোগ্য। এই প্রসঙ্গে আমি ২০১০ সালে লেখা এবং Words Without Borders পত্রিকায় প্রকাশিত Edith Grossman-এর একটি উক্তির শব্দান্তরিত উদ্ধৃতি তুলে ধরতে চাই। Grossman বলছেন প্রায় সব অনুবাদকই একান্তে নিজেদের মৌলিক লেখক রূপেই বিচার করতে চায় কারণ অনুবাদকরা যখন এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় পুনঃলিখন করেন তখন তারা মূল ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্মের অন্তর্নিহিত আবেগানুভূতি, শৈল্পিকতা ও নান্দনিকতাকে সম্যক উপলব্ধি করে অনূদিত ভাষায় পুনঃস্থাপন করার চেষ্টা করেন-যেটিকে সকল সফল অনুবাদকের সর্বোচ্চ ও তীব্র যাচনা বলে চিহ্নিত করা যায়-আর সে অর্থে সকল ভাল ও সফল অনুবাদকই লেখক।
কিন্তু এই ভাল অনুবাদক কারা? সম্ভবত তারা যারা মূল ও অনূদিত উভয় ভাষাতেই রচনাশৈলীর তীক্ষ্ণ অনুভূতিসমূহকে ধারণ করতে সক্ষম। বিষয়টি অবশ্যই আপেক্ষিক কারণ এ ব্যাপারে অনেক বিদগ্ধজনই আরও অনেক-অনেক ভিন্ন-ভিন্ন শর্ত আরোপ করতে পারেন–তবে রচনাশৈলীর নান্দনিকতা অবশ্যই এ পর্যায়ের একটি পূর্বশর্ত।
ড. ইলিয়াস এক পর্যায়ে উল্লেখ করেছেন প্রবন্ধে: “. . . শিল্পকর্মের জন্ম হয় অন্য শিল্পের অনুকরণে এবং অনুপ্রেরণায়”। এ বিষয়ে কিছু উদাহরণ হাতের কাছেই রয়েছে–মাইকেল ইংরেজিতে অনূদিত হোমারের মহাকাব্য পাঠ করেই মেঘনাদবধ কাব্য রচনায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন। সের্বান্তেস-এর দন কিহোতে বইটি অনুবাদ পড়ে ইংরেজি উপন্যাসে হেনরি ফিল্ডিং এবং ফকনার সের্বান্তেসীয় রচনাশৈলির প্রবর্তন করেছেন। ঠিক তেমনিভাবে হিস্পানিতে অনূদিত ফকনারের উপন্যাস পড়ে গার্সিয়া মার্কেস প্রভাবিত হয়েছেন। বলা হয় তার One Hundred Years of Solitude–এ যাকে চিহ্নিত করা হয় গত পঞ্চাশ বছরে রচিত বিশ্বসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ও উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের একটি রূপে–ফকনারের অনেক প্রভাব রয়েছে।
বিশ্বসাহিত্যে শার্ল বোদলেয়ার-এর ফ্লরস্ ডু মল-এর প্রভাব আধুনিক কবিতার উপর কিংবা হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর প্রবন্ধের রচনাশৈলীর প্রভাব আধুনিক প্রবন্ধ রচনায় মূলত তাদের সাহিত্যকর্মের ইংরেজি ও অপরাপর ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমেই। বাংলা কবিতায় এডগার অ্যালান পো এবং বোদলেয়ার-এর প্রভাব জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় অত্যন্ত ঔজ্জ্বল্যের সাথে স্পষ্ট।
অনুবাদের অন্তর্নিহিত শক্তির উদাহরণ আরও অনেক আছে। ফলে একথা সহজেই সমর্থন করা যায়: Translation affects creative artists in another, . . . The impact of the kind of artistic discovery that translation enables is profoundly important to the health and vitality of any language and any literature. (Grossman, 2010).
আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি অনুবাদ শুধুমাত্র মূলকে স্থানচ্যুতই করে না অনেক সময়ই কালচ্যুত ও সংস্কৃতি ও কৃষ্টিচ্যুতও করে। ঠিক এ কারণেই অনুবাদকের কাজ জটিলতর হয়ে ওঠে। মানতেই হবে সময় ও ভাষার প্রবাহমানতা অনুবাদকর্মকে অবশ্যই প্রভাবিত করে অথচ অনুবাদককে সর্বদাই মূলপাঠের রচনশৈলী ও বৈশিষ্ট্যগুলো গ্রাহ্যে এনেই অনুবাদকর্ম সম্পন্ন করতে হয়।
প্রসঙ্গত অনুবাদ বিষয়ে দেরিদার আরও একটি উক্তি স্মরণে আসে। তিনি বলেছেন-একই সাহিত্যকর্মের একই ভাষায় একাধিক অনুবাদ হওয়া বিশেষ প্রয়োজন প্রধানত সময় ও ভাষার সচলতার সাথে সাযুজ্য রাখার জন্য। আমরা তো জানি জন কীট্স্ সেই সনেটটি লিখেছিলেন On First Looking Into Chapman’s Homer–chapman অনূদিত হোমার পড়ে বিমোহিত হয়ে। Chapman-এর হোমার-এর (১৮৫৭) পর কয়েক শতাব্দী পার করে ’৬০-এর দশকে আমি ছাত্র থাকা কালে E.V. Rieu-এর Odyssey অনুবাদকে (১৯৪৬) পাঠ্য হিসেবে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে তার সহজবোধ্য ভাষা, উপমা ও উৎপ্রেক্ষার সরল ভাষান্তরের কারণে। আমরা তো জানি ইংরেজি ভাষায় হোমারের আরও অনেক অনুবাদ হয়েছে। একই সাহিত্যকর্মের একাধিক অনুবাদের আরও একটি উদাহরণ মনে পড়ছে T S Eliot-এর The Journey of the Magi-এর বাংলা ভাষান্তর–রবীন্দ্রনাথ ও সম্ভবত বিষ্ণু দে-র অনুবাদ। আমি সম্ভবত বলছি কারণ স্মৃতিতে এটি অবশ্যই স্পষ্ট কবিতাটির একাধিক অনুবাদ আমি পড়েছি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছাড়া অন্যান্য অনুবাদকদের নাম স্মরণে তেমন জাগ্রত নয়। এর একটি কারণ-আবার সম্ভবত-আমার একান্ত বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের অনুবাদই শ্রেষ্ঠ মনে হয়েছে। ঠিক এই বিচারেই অনুবাদকর্ম যেকোনো মৌলিক সাহিত্যকর্মের সাথে তূল্য–যেমন সকল সাহিত্যকর্ম মনে স্থায়ী হয় না তেমনি সকল অনুবাদকর্ম মনে দাগ কাটে না। এই পর্যায়ে গায়ত্রি চ্যাটার্জি স্পিভাক-এর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হতে পারে। তিনি The Politics of Translation-এ বলছেন: ‘Language is not everything. It is only a vital clue to where the self loses its boundaries’ মহাশ্বেতা দেবীর স্তন্যদায়িনী উপন্যাসের নামকরণের অনুবাদ বিষয়ে গায়ত্রি উদাহরণ দিচ্ছেন, এক অনুবাদক উপন্যাসের শিরোনামের ভাষান্তর করেছেন ‘Breast-giver’, অন্য একজন করেছেন ‘The Wet-nurse.’ দু’টি অনুবাদকে পাশাপাশি রাখলে স্পষ্ট হবে মূলে যে ভাষিক অলংকরণ অন্তরালে ছিল তা দু’ভাবে এই দু’টি ভাষান্তরে উচ্চকন্ঠ হয়েছে কারণ উপন্যাসের অনূদিত শিরোনাম পার্থক্যই অনুবাদকদের মূলত অনুবাদকর্মে পরিচালিত করেছে। মূল উপন্যাসে যদিও মার্কস এবং ফ্রয়েডিও তত্ত্বের আভাষ পাওয়া যায়, আসল রহস্যটি অন্তর্নিহিত আছে পাঠক এবং অনুবাদকের আপন-আপন উপলব্ধি ও ব্যাখ্যার উপর। এমনটা হওয়াই অনিবার্য। শেক্সপীয়রও অবিরাম অনুবাদ হচ্ছে বাংলাতে তার উদাহরণ সবারই জানা।
অনুবাদের ব্যাপারে অনেক রক্ষণশীল পাঠকই ‘lost in the translation’ বিষয়ের বিতর্কটি উপস্থাপন করেন।
অনুবাদে মূলের বিনষ্টিকে মেনে নিলেও আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি একজন সফল অনুবাদক–আমার পূর্বোক্ত বক্তব্যের জের ধরে বলতে চাই–তিনিই যিনি মৌলিকভাবে লেখক। একজন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার বা প্রাবন্ধিক মৌলিক সাহিত্য রচনার মাধ্যমে তার বিভিন্ন পাঠককে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোড়িত করেন, ঠিক তেমনি একজন সফল অনুবাদক তাঁর অনুবাদকর্ম দিয়ে, তা সাহিত্যের যে শাখাতেই হোক, সমপর্যায়ে তাঁর পাঠকদের আলোড়িত করতে সক্ষম।
প্রতিটি জনরা-র একটি নিজস্ব প্রকাশশৈলী আছে। যেমন নাটক–যেখানে semiotics বা লিখিত ভাষায় ব্যবহৃত প্রতীক ও সাংকেতিক চিহ্নসংক্রান্তের প্রতিফলন ঘটে–মিখাইল বাখতিন যাকে বলেছেন-কার্নিভালেক্স।
বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণীভেদ, পদমর্যাদা, শিক্ষা, চরিত্র, মেধা এবং আবেগ সংলাপের মাধ্যমে উপন্যাস ও নাটককে উদ্ঘাটিত হতে হয়। বলা যায় সাহিত্যের সকল শাখাতেই বিষয়টির উপস্থিতি স্পষ্ট। একজন অনুবাদককে এই সব বিষয়াদি মনে রেখেই ভাষান্তরে নিয়োজিত হতে হয়। একথাও সত্যি এক ভাষার semiotics অন্য ভাষার মানুষদের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। যদিও বলা হয়ে থাকে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের বৈদ্যুতিক যোগাযোগ বা তথ্যপ্রযুক্তি মাধ্যমের অভাবনীয় বিস্ফোরণের কারণে সারা বিশ্বের মানুষ পরস্পরের অনেক কাছাকাছি এসে গেছে–তবুও মানুষের জীবন-যাপনের সদাপরিবর্তমান ধারা অনুবাদকর্মকে সহজ করেছে বলে মনে হয় না। ফলে একথা সত্য হয়ে আছে যে কোনো অনুবাদকর্মই সুন্দর হবে না যদি অনুবাদক শুধুমাত্র মূলের সাথে সাযুজ্য রাখার চেষ্টাতেই তার অনুবাদকর্মকে সীমাবদ্ধ রাখে। অনুবাদককে সচেতনভাবেই অনেক স্বাধীনতা নিতে হয়-তবে অবশ্যই Sir Richard Burton-এর Arabian Nights-এর মতো স্বাধীতনা কোনক্রমেই নয়।
ভাষাবিজ্ঞানিরা বলেন, ভাষাই সংস্কৃতি। ফলে অনুবাদককে সর্বদাই উৎস-ভাষা (SL) থেকে লক্ষ্য ভাষায় (TL) স্থানান্তর করার সময় দুই ভাষারই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পরম্পরা অনুধাবন করেই অনুবাদ করতে হয়। Sir Richard Burton একাজটি তেমনভাবে করেননি বলেই আরব্য উপন্যাস অনুবাদের মতো প্রশংসনীয় কাজটি করেও অনুবাদ জগতে নিন্দিত হয়েছেন এ কারণে যে তিনি আরবি ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিবেচনা করেছেন ‘other culture’ বা নিম্নমানের সংস্কৃতি রূপে এবং ফলে ইংরেজ পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন এক যৌন আবেদনময়ী অনুবাদকর্ম। ব্যাপারটি ঘটেছে মূলত উৎস-ভাষাকে লক্ষ্যভাষা থেকে নিকৃষ্ঠ মনে করার কারণেই। Edward Fitgerald সম্বন্ধেও এমন অভিযোগ পাওয়া যায়।

২.সাহিত্যের অনুবাদ (গদ্যানুবাদ)
সাধারণভাবে সাহিত্যের অনুবাদে একাধিক বিবেচনার বিষয় বর্তমান যার কিছু-কিছু পূর্বেই উল্লেখিত হযেছে। ব্যক্তিগতভাবে যে ক’টি উপাদান আরও একটু ব্যাখ্যা করতে চাই সেগুলো হলো–যেমন ইউজিন নিডা বলেছেন: (ক) সাহিত্যকর্মে বিধৃত বাণীর প্রকৃতি; (খ) সাহিত্যকর্মের অভীষ্ট লক্ষ্য; এবং (গ) অনূদিত ভাষার পাঠকদের গ্রহণ ও অনুধাবন ক্ষমতা–এই ত্রিবিধ বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য।
(ক) বাণীর সাথে সাহিত্যকর্মের বিষয়বস্তু ও কাঠামোর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। মানতেই হবে বিষয়বস্তু ও কাঠামোকে ব্যাবচ্ছেদ করা যায় না। কিন্তু অনেক সাহিত্যকর্মেই দেখা যায় বিষয়বস্তু প্রধান আবার অন্য অনেক সাহিত্যকর্মে কাঠামোই মূখ্য। এক ভাষার বিষয়বস্তু বা কাঠামো ভাষান্তরে মূল্যহীন বা তাৎপর্যহীন হয়ে যেতে পারে। যেমন বের্টল্ট ব্রেখ্ট-এর Mother Courage-এ দেখা যায় এক মা তার সব ছেলেমেয়েকে হারিয়েও বাঁচতে চায়। এমন মা বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় তেমন তাৎপর্যপূর্ণ নয় বরং নিন্দনীয়। সেখানে অনুবাদককে যথেষ্ট নান্দনিক শ্রম দিতে হয় মূল বাণীটিকে স্পষ্ট করার জন্য।
(খ) সাহিত্যকর্মের অভিষ্ঠ লক্ষ্য কী তার উপর অনুবাদকর্মের চারিত্র্য নির্ভরশীল অনিবার্যভাবে। এ ব্যাপারে অনুবাদক ও মূল লেখকের অভিষ্ঠ লক্ষ্য সমান্তরাল হওয়াই একান্ত কাম্য, অন্যথায় শিল্পকর্মের ভুল ব্যাখ্যা হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। ফলে একজন অনুবাদককে প্রতিটি অনুবাদকর্মের জন্য অতিরিক্ত অনেক তথ্য সংগ্রহ করতে হয়: ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাময়িক ও স্থানিক, সাংস্কৃতিক এবং এমন আরও প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি। যারা অনুবাদকর্মে লিপ্ত আছেন তারা এ কাজগুলি নিয়মিত করে থাকেন।
প্রসঙ্গত গত শতাব্দীর বিখ্যাত রুশ ভাষাবিদ ও semiotics বিশেষজ্ঞ মিখাইল বাখতিন-এর হেটেরোলজি বা বহুমুখিতা তত্ত্বের অবতারণা আবার করতে চাই। বাখতিন সমাজের বহুমুখিতার দুটি অবস্থান চিহ্নিত করেছেন–হেটেরোগ্লসিয়া বা ভাষিক বহুমুখিতা এবং হেটেরোফোনি বা বক্তব্যের বহুমুখিতা। ভাষা ও বক্তব্যের বহুমুখিতা প্রতিটি জনগোষ্ঠীর আঞ্চলিকতার শ্রেণী-বিন্যাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে বাংলাদেশের নারীবাদীদের ভাষা ও বক্তব্য ইউরোপের নারীবাদীদের থেকে ভিন্নতর যেমন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় কোনো মিল নেই। ফলে সাহিত্যে, বিশেষ করে ফিকশনে–অর্থাৎ গল্প, উপন্যাস, নাটকে–অনুবাদের সময় অনুবাদককে উৎস-ভাষার ভাষাগত ও বক্তব্যগত বিষয়াদি এবং ঐ জনগোষ্ঠির জীবনযাপন, মেলামেশা, চালচলন, আচার-আচরণ, পোশাক ইত্যাদিসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত বিষয়াদি সমন্ধে পর্যাপ্ত পড়াশুনা করতে হয়। বাখতিন বলেন, একটি নাটক বা উপন্যাসে যত চরিত্রের উপস্থিতি তা কোনো কার্নিভালে জড় হওয়া জনগোষ্ঠীর মত। ফলে প্রতিটি মানবচরিত্রের বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটে নাটকে বা উপন্যাসে। সেগুলো সঠিক উপলব্ধি করে অনুবাদকের অনুবাদকর্মে লিপ্ত হতে হয় আর তা না হলে অনুবাদে চরিত্রগুলো সমতল বা flat হয়ে যায়। এ ব্যাপারে অনুবাদের অনুবাদ একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
(গ) পাঠকদের গ্রহণ ও অনুধাবন ক্ষমতা বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যে পাঠকেরা অনুবাদকর্মটি পাঠ করবেন তাঁদের অর্থ ও সংকেত উদ্ঘাটন ক্ষমতা কত সূক্ষ্ম এটি অবশ্যই বিবেচ্য বিষয়। প্রবন্ধ অনুবাদে এই বিষয়টিই প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে। প্রবন্ধে যে ব্যাপারটি উৎস-ভাষায় উপস্থাপিত হচ্ছে তা কতটা লক্ষ্য-ভাষার পাঠকদের বোধগম্য বা অনুধাবনযোগ্য সেটি অনুবাদকের বিবেচনায় এনে তার শব্দ ও ভাষা নির্বাচন একান্ত কাম্য।
গল্প বা উপন্যাসেও বিষয়টি বিবেচ্য- বিশেষ করে জেমস জয়েস বা ভার্জিনিয়া উল্ফ অনুবাদেstream of consciousness-এর ভাষিক ব্যবহার যেটি বাংলাভাষায় প্রাথমিকভাবে সম্ভবত কমলকুমার মজুমদার এবং সম্প্রতি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁদের গল্প-উপন্যাসে ব্যবহারে সচেষ্ট হয়েছেন। বলতেই হবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসই সবচেয়ে সফল এ ব্যাপারে। অনুবাদকের এমন প্রকাশশৈলীর সাথে পরিচয় না থাকলে ভাষান্তর দুর্বোধ্য হতে বাধ্য।
নাটকের ব্যাপারে আমি Mother Courage নিয়ে আগেই বলেছি। এর সাথে রয়েছে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যিক বিসঙ্গতি। বিভিন্ন পাঠক ভিন্ন-ভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভিন্ন-ভিন্ন দৃষ্টিতে বিচার করেন। আমাদের দেশের অনেকেই আছেন যাঁরা ব্রিটিশ বা পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে আফ্রিকি সংস্কৃতি, সভ্যতা ও ঐতিহ্যকে নিকৃষ্টমানের মনে করেন। ফলে তাদের দেশের গল্প, উপন্যাস, সাহিত্যকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন। আমাদের নৃ-গোষ্ঠীদেরকে অনেকেই সভ্য মনে করেন না, ফলে তাদের ভাষা ও সাহিত্যকর্ম সম্বন্ধে আমাদের মধ্যে অনেকেরই একটি নেতিবাচক মনোভাব আছে। বলা হয় আরবি ও ফার্সি থেকে রিচার্ড বার্টন ও ফিটজেরাল্ড যখন ইংরেজিতে যথাক্রমে আরব্য উপন্যাস এবং ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াৎ অনুবাদ করেন তখন তাঁরা এই চিন্তা থেকে অনুবাদকর্মে লিপ্ত হন যে ইংরেজ পাঠকদের ঐ দুটি তাৎপর্যহীন ভাষার সাহিত্যকর্ম বিষয়ে অবগত করা এবং ভাষাদুটিকে মর্যাদা সম্পন্ন অবস্থানে নিয়ে আসা। ফলে দু’জনই অনুবাদকর্মে ইংরেজ পাঠকদের উপযোগী ভাষান্তর করার প্রচেষ্টায় তাদের নিজ-নিজ অনুবাদকর্মে মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতা নিয়েছেন। অনুবাদককে এ ব্যাপারে সাবধান হয়ে উদারপন্থী আচরণ করতে হয়।
তবে সাংস্কৃতিক বিসঙ্গতির অন্যরূপও রয়েছে। পশ্চিমা দেশের খোলামেলা ভাষা ও জীবন-যাপনও আমার মতো অনুবাদকদের বিপদে ফেলে। যেমন নাটকে গালাগাল ও খিস্তি-খেউড় বা প্রকাশ্যে নারী-পুরুষ আলিঙ্গন, দৈহিক স্পর্শ, নৈকট্য ও চুম্বন। আমার নাটক অনুবাদকর্মে একাধিকবার এ সমস্যা হয়েছে–ভাবতে হয়েছে অভিনেতা-অভিনেত্রিদের কথা, দর্শকদের কথা। তবে নাটকের পাঠটি আমি বিশ্বস্তভাবেই অনুবাদ করি–মঞ্চ-ভাষ্যটি থাকে নির্দেশকের তত্ত্বাবধানে।

Translation৩. কাব্যানুবাদ
জন ড্রাইডেন বলেছেন কবিতা তিনভাবে অনুবাদ করা যায়- প্রথমত কবিতার শাব্দিক অনুবাদ, যাকে উনি সংজ্ঞা দিয়েছেন Metaphrase; দ্বিতীয়ত, ভিন্ন শাব্দিক ও বাক্য অনুক্রমে অনুবাদ, যা আসলে Paraphrase; এবং তৃতীয়, অনকুরণ বা Imitation। তৃতীয় বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন অণুকরণ অর্থ মূলে ব্যবহৃত শব্দ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনুবাদক যখন মূলের ইঙ্গিতটি ব্যবহার করে অনুবাদ করেন তখনই কবিতার যথার্থ ভাষান্তর ঘটে। বিষয়টি সহজ নয়। বলতেই হয় সাহিত্যের অনুবাদে কবিতা অনুবাদই সবচেয়ে কঠিন।
গ্যেটে কবিতা অনুবাদ বিষয়ে বলেছেন কবিতা অনুবাদ সফল হতে পারে যদি অনুবাদক নিজেকেই বিদেশি ভাষায় প্রতিস্থাপন করে ঐ ভাষার ধ্যান-ধারণাকে নিজের ভেতর সংক্রামিত করতে সক্ষম হন। বোঝাই যায় এটি একটি দুঃসাধ্য বিষয় এবং তাই আমার ব্যক্তিগত ধারণা গ্যেটে কবিতার অনুবাদের পক্ষের ব্যক্তিত্ব নন।
এর অনেক পরে ডাডলে ফিট্স্, মার্কিন সমালোচক ও অনুবাদক বলছেন, কবিতা অনুবাদে অনুবাদকের অপেক্ষাকৃত কম উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়া এবং অধিক পরিমাণে প্রগলভ হওয়া বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ উনি অনূদিত ভাষায় আর একটি নতুন কবিতা সৃষ্টির পক্ষপাতি। তাঁর মতে কবিতা হলো একটি ভিন্নতর জনরা যার নিজস্ব ভাষিক সাবলীলতা থাকতে হয়। ফলে ভাষান্তরে নতুন কবিতা সৃষ্টি করা অনুবাদকেরই কর্ম।
সব শেষে এ প্রসঙ্গে ইউজিন নিডার বক্তব্য তুলে ধরি। তিনি বলছেন, কবিতা অনুবাদে তিনটি বিষয় করণীয়: (ক) অনুবাদককে মূল শব্দাবলীকে বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলীর আলোকে অনুধাবন করতে হবে; (খ) অনুবাদককে উৎস ও লক্ষ্য-ভাষার কাঠামোগত বৈষম্য বুঝতে হবে; এবং (গ) অনুবাদককে উৎস ভাষার রচনাশৈলীর ভাষিক কাঠামো লক্ষ্য বা অনূদিত ভাষায় পুনঃনির্মাণ করতে হবে।
উপরোক্ত সকল বিচারেই স্পষ্ট হয় কবিতা অনুবাদ কোনো সহজ কর্ম নয়। আমি টি. এস. এলিয়ট-এর কবিতা The Journey of the Magi-এর উল্লেখ করেছি। এই অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ড্রাইডেন-এর কাব্যিক ইঙ্গিত, গ্যেটে-র ভাষার ধ্যান-ধারণার প্রতিস্থাপন, ডাডলে ফিটস্-এর নতুন কাব্য-সৃষ্টি এবং ইইজিন নিডার বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলীর অনুধাবন, উৎস ও লক্ষ্য-ভাষার কাঠামোগত বৈষম্য এবং উৎস-ভাষার রচনাশৈলীর ভাষিক কাঠামো অনূদিত ভাষায় পুনঃনির্মাণ-এ সবই সফলভাবে করেছেন।

৪.নাট্যানুবাদ
সবশেষে নাট্যানুবাদ বিষয়টি উপস্থাপন করব। যেহেতু এই বিষয়টিই আমার নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র, আমার একান্ত ধারণাগুলো লিপিবদ্ধ করছি।
নাট্যানুবাদ অন্যান্য সাহিত্যকর্মের অনুবাদ থেকে ভিন্নতর। এর প্রধান কারণ নাটকের দ্বৈতসত্তা–নাটক যেমন পাঠ করার জন্য তেমনি মঞ্চে অভিনীত হবার জন্যও বটে। অনেক নাট্যকার এবং কৃত্যশিল্পবোদ্ধা ও সমীক্ষকই মনে করেন নাটকের চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গতা প্রাপ্তি ঘটে মঞ্চে। ফলে ভাষান্তরের সময় অনুবাদককে অবশ্যই মঞ্চের কথা ভুললে চলবে না।
মঞ্চের বিষয়টি বিভিন্ন আনুষঙ্গিক প্রয়োগসিদ্ধতার সাথে জড়িত। যেমন প্রথমত–মূলভাষা এবং অনূদিত ভাষার সাথে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ ঘটান। কারণ ভাষা তো আমরা সবাই জানি–একটি গোষ্ঠীর জীবনের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত; দ্বিতীয়, অনূদিত ভাষায় এমন স্বাচ্ছন্দ্য থাকতে হবে যাতে দর্শক-শ্রোতার সংযোগ স্থাপনে কোন সংকটাবস্থা সৃষ্টি না হয়; তৃতীয়ত, সংলাপের পরম্পরা রক্ষা এবং সংযুক্তি যেন স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাসঙ্গিক হয়; চতুর্থত, অভিনেতারা সংলাপ উচ্চারণে অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব না করে।
ভিন্ন-ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভিন্ন-ভিন্ন সাংস্কৃতিক জীবনযাপন যার সাথে সেই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস-ঐতিহ্য আনুপূর্বিক জড়িত। সম্ভবত এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন কোন জাতির ইতিহাস সঠিক জানতে হলে সেই জাতির নিজ ভাষায় রচিত সাহিত্য ও শিল্পকর্ম মনোযোগ সহকারে পাঠ করা উচিত। সত্যি অর্থে, ইতিহাস বিকৃত হয় তার প্রমাণ আমাদের হাতে আছে, কিন্তু সাহিত্য ও শিল্পকর্ম কখনও বিকৃত হয় না। যদি এমনটা হয়ও, সেইসব শিল্পকর্মের কালের বিচারে বিলুপ্তি ঘটে। মুনীর চৌধুরীর নাটক ‘কবর’ লেখা হয়েছে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। এ নাটকটি যত সহজে, যত স্পষ্টভাবে ভাষা আন্দোলনের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তিকে নিবিড় ও ঘনবিন্যাসে তুলে ধরেছে, ইতিহাস তা করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হয় না। এই নাটক অনূদিত হলে অন্য ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠী অবশ্যই সহজেই বুঝতে পারবে বায়ান্নতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ছিল।
কিন্তু মানতেই হবে ইতিহাস ও সংস্কৃতির এটিই একমাত্র রূপ নয়–বিশেষ করে সংস্কৃতির। সংস্কৃতি বহুমাত্রিক যাকে সম্যক উপলব্ধি করা সুকঠিন, বিশেষ করে অপরাপর জনগোষ্ঠীর। পৃথিবীতে যা কিছু ভুল বোঝাবুঝি তা এই সংস্কৃতির সংজ্ঞার মতানৈক্যের কারণে; যার ফলশ্রুতিতে পঞ্চদশ শতাব্দিতে উপনিবেশবাদের শুরু ও প্রসার। উপনিবেশবাদের পক্ষে একটি জোরালো যুক্তি ছিল, যে দেশকে দখল করা হলো সে দেশকে সভ্য করা। এশিয়া এবং বিশেষ করে আফ্রিকার জনগোষ্ঠীকে সভ্যতার স্বাদ দেবার জন্য পশ্চিমা দেশগুলো বহু বছর ধরে উঠে পড়ে লেগেছিল এবং আজ কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পেরেছে তাদের দেয়া সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সভ্যতার সংজ্ঞাটি আসলে একপেশে এবং অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্টতই ভ্রান্ত ছিল। বিশ্বের সকল মানবগোষ্ঠীই তাদের আপন-আপন অবস্থানে ও ব্যাখ্যায় সভ্য। এই উপলব্ধির পেছনে অবশ্যই পারস্পরিক সমঝোতার, বোঝাপড়ার ব্যাপার আছে, আর সেই সমঝোতা ও বোঝাপড়ার অধিকাংশ সেতুবন্ধক হলো কৃত্যশিল্প, বিশেষত নৃত্য ও নাটক। ফলে অনুবাদ শিল্পকর্মের একটি বিশাল ভূমিকা অনিবার্যভাবে স্বীকৃত। যেমন বের্টল্ট ব্রেখট-এর ‘মাদার কারেজ’, সিঙ্গ-এর ‘রাইডার্স টু দ্য সি’ কিংবা ওয়ালিউল্লাহর ‘বহীপীর’ অথবা চিনুয়া অ্যাচিবির যে কোন উপন্যাস। প্রসঙ্গত মানতেই হবে পৃথিবীর যে কোন ভাষার অনূদিত নাট্যকর্ম উপলব্ধি করা এবং তার নান্দনিক রস আস্বাদনের পূর্বশর্ত প্রাথমিকভাবে দুটি–উদার মানসিকতা এবং অনুসন্ধিৎসা। ‘মাদার কারেজ’-এর মাতৃহৃদয় ও বাঙালি মাতৃহৃদয় ও মাতৃস্নেহের প্রকাশে ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু হৃদয়গ্রাহ্যে যে দুজনই মাতা সেটি মেনে নিয়ে নাটকের মূলবাণীকে মানসিকতায় আনা তার পক্ষেই সম্ভব যে খোলা মনে বুঝতে সক্ষম মায়ের একাধিক রূপ-বৈশিষ্ট্য এই জগতে বর্তমান।

আমার উপস্থাপিত দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ভাষান্তরিত সংলাপসমূহ এমন হতে হবে যা সহজেই দর্শক-শ্রোতা বুঝতে পারে। নাটক শুধু দর্শনেন্দ্রিয়ের চর্চা নয়। শেক্সপিয়র নাটক শুনতে বলেছেন তাঁর ‘হ্যামলেট’-এ। একথা অনস্বীকার্য নাটক একাধারে শ্রবণেন্দ্রিয় ও দর্শনেন্দ্রিয়ের স্বাচ্ছন্দ্য চর্চা ছাড়া উপভোগ সম্ভব নয় যদিও অনেক ক্ষেত্রেই বলা হয়ে থাকে নাটকের ভাষা বিশ্বজুড়ে একই। এ মতবাদ সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে হ্যামলেট-এর সেই গভীর স্বগতোক্তিগুলোর ভাষাবিন্যাস থেকে আমরা চিরতরেই বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতাম। কিংবা গ্যালিলিওর সেই চিরসত্য উক্তি: ‘অভাগা সে দেশ যার বীরপুত্রের প্রয়োজন, অভাগা সে দেশ যার বীরপুত্র নেই’ আমাদের কোনদিন জানাই হতো না। কিন্তু এসব কিছুর পূর্বশর্ত হলো সংলাপ অনুবাদে এমন ভাষা সচেতনতা থাকা উচিত যার ফলে মূল নাটকের সাথে বিশ্বস্ত থেকেও অনূদিত ভাষা সংস্কৃতিতে তা স্পষ্ট করা। এখানেই সেই semiotics-এর প্রসঙ্গ উপস্থাপন করতে চাই। প্রতিটি মানবগোষ্ঠীর জীবনধারণের একটি একান্ত ধারা আছে যা তার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করে, যার আওতায় জীবনের সবকিছুই সংযুক্ত। নাটক এমন একটি শিল্পকর্ম যাতে জীবনের এই বৃহত্তম ইঙ্গিতকে সংঘবদ্ধ করা হয় আর তা বোঝার জন্য অভিনীত নাটকের সংলাপ ও তার লব-কুশদের জীবনযাত্রা একাধারে প্রত্যক্ষ ও উপলব্ধি করতে হয়। একটি সফল অনুবাদ এইদিকে অবশ্যই দৃষ্টি দেয়। কারণ অনূদিত নাটকে অন্যান্য অনূদিত সাহিত্যকর্মের মতো টীকা-টিপ্পনী সংযোজন অসম্ভব।
আমার তৃতীয় প্রস্তাবটি হলো অনূদিত নাটকে সংলাপের পরম্পরা রক্ষা ও সংযুক্তিতে স্বতঃস্ফূর্ততা সৃষ্টি করা। অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায় আক্ষরিক সাহিত্যানুবাদ বিড়ম্বিত করলেও আনুষঙ্গিক তথ্য পাঠকের বোঝার জন্য সহায়ক হয়-যদিও এমন অনুবাদকর্মকে মানসম্মত বলে গ্রহণ করা যায় না। কিন্তু নাটকে সংলাপের আক্ষরিক অনুবাদ দুর্বোধ্যতার জন্ম দেয়, বিশেষ করে বাকধারা ও প্রচলিত অর্থবহ বাক্যবিন্যাসের ক্ষেত্রে যার সাথে ভাষা সংস্কৃতির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতম। ফলে অনুবাদককে একাধিক তথ্য-উপাত্ত ঘাটতে এবং ঐ সংলাপসমূহ বারংবার পাঠ করতে হয়। শুধু তাই নয়, অনুবাদকর্ম শেষে পরম্পরা ও সংযুক্তির ঘাটতি অনুধাবন করতে তারই ভাষান্তরিত সংলাপগুলোকে নৈর্ব্যক্তিক পাঠ করে অসংলগ্নতাগুলোতে সমাধান আনতে হয়। তবে একটি বিষয় উল্লেখ্য, ‘অ্যাবসার্ড’ চিহ্নিত নাটকসমূহে অনেক ক্ষেত্রেই এমনকি মূল রচনায় এই পরম্পরা ও সংযুক্তি আপাতদৃষ্টে খুঁজে পাওয়া যায় না, ফলে এইসব অনুবাদে অনুবাদককে আরও বিশেষ মনোযোগী হতে হয়। বেকেট বা পিনটার-এর নাটকসমূহ এমন সমস্যা অহরহ সৃষ্টি করে। যেমন বেকেট-এর ‘এন্ডগেম’-এ একাধিকবার সময়কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ‘শূন্য’ রূপে।
সংলাপ উচ্চারণের অস্বাচ্ছন্দ্য অভিনয়ে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে–তা মৌলিক বা অনূদিতই হোক। এ প্রসঙ্গে পাশ্চাত্যের অনেক নাট্যানুবাদক ‘speakability’ বলে অভিধানবহির্ভূত শব্দ উদ্ভাবন করেছে। বিষয়টি ভাষান্তরিত সংলাপেই অধিক প্রযোজ্য। কঠিন শব্দ ব্যবহার যদিও এর উৎসমূলে, এটিই একমাত্র সমস্যা নয়। এর সাথে রয়েছে বাক্যবিন্যাস, স্বরাঘাত ও বাক্যের জটিলতা। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অনুবাদককে বাক্য ও স্বরাঘাতের মূল বিন্যাসকে ভেঙে পুনর্বিন্যাস করতে হয়। বিষয়টি কমবেশি সকল প্রকার অনুবাদকর্মের জন্যই প্রযোজ্য, তবুও নাটকের ঐ ‘speakability’র বিষয়টিকে দৃশ্যমান করেই অনুবাদকর্মে ব্যাপৃত হওয়া অতি প্রয়োজনীয়। সাম্প্রতি আমি নিজে এই ‘speakability’ নিয়ে বিড়ম্বিত হয়ে বেশ কয়েকটি নাটক অনুবাদে ইংরেজি শব্দ বা শব্দসমষ্টি ব্যবহার করেছি এই যুক্তিতে যে, বাংলা ও ইংরেজি ভাষা দুটি দু’শ’ বছরের অধিক সহাবস্থান করে (বলা বাহুল্য এ দুটি ভাষা পারিবারিকভাবে দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ও বটে) পরস্পরকে নিবিড়ভাবে গ্রহণ করেছে সন্দেহ নেই–ফলে একজন নিরক্ষর মানুষও ‘মিসট্কল, ‘মাইন্ড করবেন না’ ইত্যকার শব্দাবলী সততই ব্যবহার করে। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই শব্দের প্রতিশব্দ বাংলা ভাষায় বরং ‘speakability’র গুণাগুণ হারায়।

সবশেষে রূপান্তরের প্রসঙ্গ উত্থাপন করব। এমন এক সময় ছিল আমি ব্যক্তিগতভাবে নাটকের রূপান্তরে বিশ্বাসী ছিলাম না কারণ অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো আমিও ভাবতাম এতে মূল নাটকের নান্দনিকতার গুণাগুণ ক্ষুণ্ণ হয়। একথা এখনও বিশ্বাস করি যখন অনেক মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্রের অক্ষম, অপ্রাসঙ্গিক ও কষ্টার্জিত রূপান্তর প্রত্যক্ষ করি। আমার বর্তমান অবস্থান: রূপান্তর তখনই করা উচিত যখন রূপান্তরকারী নিশ্চিত হবেন নাটকটির রূপান্তরিত রূপ স্থান-কাল-পাত্রই শুধু নয়, যে ভাষায় রূপান্তরিত হচ্ছে সেই ভাষা-সংস্কৃতির সাথে প্রাসঙ্গিকতার ব্যাঘাত ঘটাবে না এবং কষ্টার্জিত বা আরোপিত হবে না।

৫.বাংলাদেশের সাহিত্যানুবাদকর্ম
আমি এই প্রবন্ধে সাধারণভাবে অনুবাদ সাহিত্য ও সাহিত্যের অনুবাদ নিয়ে একটি সাধারণীকৃত প্রস্তাবনা রাখতে চেয়েছি যেখানে বাংলাদেশের সাহিত্যানুবাদকর্ম আলোচনায় আসে নি। আমরা জানি শ্রোতাদের বা পাঠকদের বিবিধ প্রত্যাশা থাকে কোনো প্রবন্ধ উপস্থাপনা শোনা বা পাঠের আগে এবং সবাই যে তাদের প্রত্যাশিত বিষয়াদি শুনে বা পড়ে সন্তুষ্ট হবেন তা কখনও সম্ভব নয়। যেমন বাংলাদেশের অনুবাদকর্ম বিষয়ে আলোচনা শোনার প্রত্যাশা যাঁদের ছিল তাঁরা হতাশ হয়েছেন নিঃসন্দেহে। শুধু এটুকু বলতে পারি, যদিও সাম্প্রতিক বাংলাদেশের অনুবাদ কর্মে দু’টি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, এদেশে অনুবাদকে তেমন গুরুত্ব দেয়া এখনও হয় না।
দু’টি বিষয় হলো, আগের চেয়ে অনুবাদকর্মে অনেকেই উদ্যোগী হয়েছেন, যার অর্থ এই নয় প্রয়োজন অনুযায়ী যথেষ্ট অনুবাদকর্ম হচ্ছে। হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা। যা কিছু হচ্ছে তার সিংহভাগই ব্যক্তিক উদ্যোগে। এই ব্যক্তিক উদ্যোগগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক আওতায় আনা জরুরী–যেমন বাংলা একাডেমি, আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিট্যুট এবং একাধিক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি, সরকারি উদ্যোগে অনুবাদ কেন্দ্র সৃষ্টি করা এবং নিযুক্তিক (commissioned) পদ্ধতিতে অনুবাদকর্ম সম্পন্ন করানো।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ অনুবাদ কর্ম–বিশেষত সাহিত্যানুবাদ–অন্য ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনূদিত গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ। এমন অনুবাদের অন্তর্গত সমস্যা আমি বিস্তৃতভাবে না হলেও, উল্লেখ করেছি। অনুবাদের অনুবাদে ‘lost in the translation’ বিষয়টি সর্বাধিক সক্রিয় হয়। তবে একটি ভাল দিক হলো অতি সম্প্রতি মূল ভাষা থেকেও কিছু অনুবাদ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। বিষয়টি প্রশংসার্হ।
আমাদের অনুবাদের অপর দিকটি হলো বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের ইংরেজিতে বা অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ নিতান্তই অপ্রতুল। এই বিষয়টি অতি প্রয়োজনীয় বিশেষ করে অন্য ভাষা-ভাষিদের কাছে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে পরিচয় করাবার জন্য।

৬.শেষ কথা
এখনও অনেকে মনে করেন, বিশেষ করে একাডেমিক জগত ধারণা করে, অনুবাদ সে অর্থে কোন মৌলিক শিল্পকর্ম নয়। এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে–বিশেষ করে বাংলাদেশে–অন্যান্য গবেষণা ও মৌলিক রচনার চেয়ে অনুবাদকর্মকে নিম্নস্তরের বলে চিহ্নিত করা হয়।
সব শেষে বলতে চাই, নোবেল পুরষ্কারের দু’মুখো ভ্রান্ত নীতি হলো এ পর্যন্ত কোনো লেখককে এই পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়নি যার সাহিত্যকর্ম ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়নি। এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যাঁকে চিহ্নিত করা যায় বাংলাভাষা থেকে ইংরেজি ভাষান্তরের সবচেয়ে সফল ব্যক্তিত্ব–যদিও অনেকেই মনে করেন–যেমন নীরোদচন্দ্র চৌধুরী মনে করতেন তাঁর অনুবাদ তাঁর জন্য আত্মঘাতীই হয়েছে। প্রসঙ্গত স্ববিরোধিতাটা হলো, ইংরেজি ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্ম ছাড়া অন্যান্য সকল ভাষার সাহিত্যকর্মের নোবেল পুরষ্কার প্রদানের যোগ্যতা বিচার করা হয় অনুবাদকর্মের মাধ্যমেই যদিও এ বিষয়ে অনুবাদকের কোনো স্বীকৃতি মেলে না।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইফ বরকতুল্লাহ — মার্চ ৫, ২০১৭ @ ৫:০২ অপরাহ্ন

      ভালো প্রবন্ধ, ধন্যবাদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল — মার্চ ৫, ২০১৭ @ ৯:৪৪ অপরাহ্ন

      খুবই চমৎকার দেখা! ধন্যবাদ আবদুস সেলিম। ধন্যবাদ বিডি আর্টস!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shafia — মার্চ ৬, ২০১৭ @ ১০:১৯ পূর্বাহ্ন

      Very much informative and a timely write up. Thanks to Mr. Abdus Selim and bdnews24.com

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shafia — মার্চ ৬, ২০১৭ @ ১১:০২ পূর্বাহ্ন

      as a researcher in the field of Translation studies, I am very much intrigued. Is there any way I can contact with the author?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Abdus Selim — মার্চ ৬, ২০১৭ @ ২:১৮ অপরাহ্ন

      Shafia,
      Thanks for your comments. Good to know you are researching translation studies. You can contact me via email. My email address: selimminubd@gmail.com.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন amar mudi — মার্চ ৬, ২০১৭ @ ২:৪৯ অপরাহ্ন

      কয়েক দিন আগে সাহিত্য আকাদেমি, দিল্লি তে এক সেমিনার এ ‘অনুবাদ এবং পুনঃকথন’ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমার মতে মুলগতভাবে দুটি আলাদা হলেও মূল রচনার গ্রহণযোগ্যতা পুনঃকথনেই সামগ্রিক হতে পারে, অনুবাদে নয়। মহাভারত এবং রামায়নের ভাষান্তর তার উদাহরণ। এ নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com