বইমেলা ২০১৭: আলোকোজ্জ্বল একশ বইয়ের সন্ধানে…

আবদুর রাজ্জাক শিপন | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৭:২৮ অপরাহ্ন

BooksWhenever you read a good book, somewhere in the world a door opens to allow in more light. –Vera Nazarian

ভালো বই পৃথিবীর যে কোথাও আলোকোজ্জ্বল একটি দরজা খুলে দেয় । একুশের বইমেলা ২০১৭ তে, ফেব্রুয়ারির ২৫ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩ হাজারের অধিক ! ৩ হাজার বইয়ের সবগুলো নিশ্চয় ভালো বই নয় । ৩ হাজার বইয়ের ভেতর আছে আলোকোজ্জ্বল কিছু বই ! সে সংখ্যা কত হবে, ১০০ শ’ ? ২০০ শ’? ৩ হাজার বইয়ের গাদা থেকে আলোকোজ্জ্বল সেই বইগুলোর সন্ধান কীভাবে পাওয়া সম্ভব ? পত্রিকাতে বিজ্ঞাপন দেখে ? রিভিউ পড়ে ? পাঠকের মুখে শুনে ? সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকা দেখে ?

বিদ্যমান নিবন্ধে উত্তরগুলো খুঁজবো । তার আগে, শুদ্ধতম কবিখ্যাত রূপসী বাংলার জীবনানন্দ দাশের দিকে খানিক মুখ ফেরানো যাক । আমাদের এই লেখাতে প্রাসঙ্গিকভাবেই ভদ্রলোক এসে হাজির হয়েছেন । মৃত্যুর পূর্বে তাঁর রচিত ছোটগল্প ১০৮ টি । ২১টি উপন্যাস । জীবদ্দশাতে তিনি এই লেখাগুলোর একটিও ছাপার অক্ষরে আলোর মুখ দেখান নি । কবি হিসেবে ততোদিনে তিনি বেশ আলোচিত হচ্ছিলেন যদিও। পাঠক কী একটু অবাক হচ্ছেন ? বর্তমান সময়ের যশঃপ্রার্থী লেখকের সঙ্গে মিলিয়ে ? কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালক, প্রকাশকাল ১৯২৭ । দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পাণ্ডুলিপি, ১৯৩৬ । প্রথমটির সঙ্গে ব্যবধান ৯ বছর । ততোদিনে নিজের ভেতর নিজেকে কবি ঝালিয়েছেন, একটু একটু করে ঝালিয়ে নিয়েছেন । পরিপক্ক করেছেন নিজেকে । তারও ৬ বছর পর প্রকাশিত হয় তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বনলতা সেন’ ! বাংলা কবিতা পাঠকমাত্রই বনলতাসেনের কথা জানেন ।

৩ হাজারের অধিক বইয়ের প্রকাশ-প্রকাশনা জগতের জন্য ভালো খবর । অনেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, লেখতে চাইছেন-এটা আনন্দের । সুযোগ আছে বলেই গ্রহণ করছেন অনেকে । এদের মধ্য থেকেই উঠে আসবেন অন্য কোন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির । অথবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির বা হুমায়ূন আহমেদ এর মত করে না, তারা উঠে আসবেন নিজেদের মত করে । পাঠককে হাতে ধরে, ধরে নিয়ে যাবেন-কল্পজগতের বাঁকে বাঁকে । হাসি-কান্না, আনন্দ-আলোক, জোছনায় । তেমনভাবে উঠে আসার জমিন এই একুশের বইমেলা, প্রাণের মেলা । আমরা সৌভাগ্যবান, আমাদের এমন একটি জমিন রয়েছে । এই জমিন, এই ক্ষেত্র এমনি এমনি তৈরি হয় নি । এই জমিন তৈরি করেছেন-রফিক, সালাম, বরকত, শহীদ কিশোর ওহি ওল্লাহ ! ৫২’র ভাষা আন্দোলনে ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা মিছিলের প্রতিটি পা । প্রতিটি হাত । প্রতিটি রক্তবিন্দু ! এই জমিনটাকে আমাদের আরো একটু পরিচর্যা, যত্ন করা উচিত । উর্বর করা উচিত ! বছরের পর বছর বাংলা একাডেমি সেজন্য কাজ করছেও । কাজের কাজ কি হচ্ছে, তা আলোচনাসাপেক্ষ যদিও ! সংখ্যাধিক বইয়ের প্রকাশই কী আমাদের আত্মতুষ্টি ! প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাধিক্যে, দরোজা খুলে দেয়া আলোকোজ্জ্বল বইগুলোর প্রচার-প্রসার ব্যহত করছে নাতো ? সেদিকটা কী আমরা দেখছি ? আমাদের কী দেখা উচিত ?

বই প্রকাশ, যশ খ্যাতি অর্জনের সহজ পথ ভেবে যশঃপ্রার্থী লেখক ভুল করতে পারেন । পথটি সহজ না । অধ্যাবসায় ছাড়া, লেখার সহজাত গুণ ছাড়া এটি সম্ভব নয় । নিজের ভেতর নিজেকে ঝালাই করে করে, তবেই একজন লেখক সিদ্ধান্ত নেবেন, বই প্রকাশের জন্য এটিই তার উপযুক্ত সময় কিনা । লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে সেল্ফসেন্সরশীপটা তাই খুবই জরুরি । কোন লেখাটা ছাপার অক্ষরে যাবার যোগ্য, কোনটা না, এটা লেখককে বুঝতে হবে । নাইলে, বইমেলাতে আরো একটি বইয়ের সংখ্যাবৃদ্ধি ছাড়া, সেই বই পাঠকের কোন কাজেই আসবে না । ‘তুমি খুব ভালো মেয়ে’ বা ‘এক লক্ষ লাইক’ জাতীয় সস্তা নামের বইয়ের ভেতরের মসলা কেমন হতে পারে, তা বুঝবার জন্য বোদ্ধা হবার প্রয়োজন পড়ে না । এক শ্রেণীর হুজুগে পাঠক তবু কেনেন, পড়ে দিনশেষে ভুলেও যান বইটির কথা । আরেকটু উন্নত পাঠকের হাতে পড়লে, দুই পাতা পড়ে তারা বইটি রেখে দেন । তেমন লেখকরা আর্থিকভাবে লাভবানও হন । তবে, পাঠককে অখাদ্য গেলানোর চেষ্টার দায়টাও তাদের । ঘাড়ের মধ্যে এই দায়ভার নিয়ে দিনরাত পার করবার কষ্টটা তারা জানেন । নিশ্চয় জানেন । ইলিশ কাঁটার মত অস্বস্তি ঝুলে থাকে তাদের কন্ঠনালীতে । নিশ্চয় থাকে । এক হালির মত তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত লেখক এইরকম ছাইপাশ পাঠককে গেলাচ্ছেন । প্রতি মেলাতে হালি হালি বই বের করছেন । সেইসব বইয়ের কথা কেউ মনে রাখছে না । আপনি তরুণ, আপনি তাদেরকে মানদণ্ড ধরে এই চমৎকার জমিনটিতে চাষাবাদ করতে না এলেই ভালো । মনে রাখতে হবে- তাদের শেষ, আপনার শুরু ।

৩ হাজারের অধিক বই বেরিয়েছে । নিঃসন্দেহে অনেক ভালো লেখা, ভালো বই এর মধ্যে রয়েছে । কিন্তু ৩ হাজার সংখ্যার নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে সেইসব ভালো বই । যদ্দুর পাঠকের কাছে পৌঁছে যাবার কথা, তা হচ্ছে না । পাঠক বঞ্চিত হচ্ছেন, চমৎকার কোন বই থেকে । লেখক বঞ্চিত হচ্ছেন, কাঙ্ক্ষিত পাঠক থেকে । লেখক হারিয়ে যাচ্ছেন, হতাশ হচ্ছেন…

যদি, আলোক দরজা খোলা সেই ১০০-২০০টি বই আলাদা করা যেত, পাঠক মনে-মননে তার প্রভাব হতো অতুলনীয় । কীভাবে আলাদা করা যাবে ? পাঠকের পক্ষে হাজার হাজার বইয়ের রিভিউতো পড়া সম্ভব না । চটকদার বিজ্ঞাপনে মজলেও, পাঠকের ঠকবার সম্ভাবনা থাকে বেশি ! অন্যের মুখে ঝোল খেয়ে পাঠকমনের তৃষ্ণা মিটবে কেন ? সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকা ধরে কিনতে গেলেতো, সেই ‘এক লক্ষ লাইক’ জাতীয় বই-ই কিনতে হবে ! পরিচিত পড়ুয়াদের মুখে শুনে না হয়, দু’চার দশটা কিনলেন, বাকিগুলো?

এই কাজটির খুব সহজ একটি সমাধান সম্ভব । বাংলা একাডেমি, বাংলা ভাষার উন্নয়নেই যারা কাজ করছেন বলে আমরা জানি, তাদের একটু সদিচ্ছা আমাদের নিস্তার দিতে পারে । প্রতি বছরের গাদা গাদা বই থেকে আমরা পেয়ে যেতে পারি, মণিমুক্তো সেইসব শ’খানেক বই । পাঠক-লেখক-প্রকাশক সেতুবন্ধনটাও আরো দৃঢ় আর কর্যকর হওয়া সম্ভব এভাবে । প্রকাশিত প্রতিটি বই একাডেমির যোগ্য একটি প্যানেল পড়বেন, তারা মতামত দেবেন । রেটিং দেবেন । সর্বোচ্চ রেটিং প্রাপ্ত বইগুলোর তালিকা প্রকাশ করবেন । সেরা আলোকবর্তিকা বইগুলো পাঠক পেয়ে যাবেন । পাঠকমনের আলোকোজ্জ্বল দরজাগুলো খুলতে থাকবে । বাংলা একাডেমির একটু সদিচ্ছায়, বাংলা সাহিত্য এবং পাঠকের বড় উপকার হয় । একাডেমির কর্তারা কী একটু সদয় নজর দেবেন, এদিকটায়?
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শরিফ — ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৭ @ ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

      সবশেষে পাঠকতো পথ্য পেল না ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sakib Jamal — ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৭ @ ২:৩৬ অপরাহ্ন

      ভালো বই এর কদর নাই । লেখককে আমার ” কচুরিপনার ডকুমেন্টারি ” কাব্যগ্রন্থটি পড়ার অনুরোধ রাখলাম ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sanjit Kumar Karmakar — মার্চ ১, ২০১৭ @ ১১:২৩ পূর্বাহ্ন

      শিপন ভাই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এত চমৎকার উপস্থাপনের জন্য। শুধু যথাযথ কর্তাদের নজরে আসলেই হয়……

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — মার্চ ৪, ২০১৭ @ ৭:০২ অপরাহ্ন

      I understand your message. But I will never be able to understand the cause of decadence and degeneration that has taken a vicious shape in the elitist class of our Bangladesh
      literary and cultural society who is determined to suppress and subvert the best creations of recent day Bengali literature. My epic on Muktijuddha, entitled ‘Aakjon Prometheus Tini’ is a prey to their negligence. Only a number of twenty or so of the noble minds of home and abroad have taken the labour of reading the book. But about a hundred so called great ones and well-stationed in superior positions have put it to negligence because of their pride or the feeling of self-glorification. I call it decadence in present day Bengali literature. As if’ it is the age of self-seeking.
      have deprived me.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com