ভাষা ব্যবহার ও মানসিক দাসত্বের খামখেয়ালি

অলভী সরকার | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ২:২৬ অপরাহ্ন

“কোনো ভাষারই চলে না শুধু নিজের শব্দে। দরকার পড়ে অন্য ভাষার শব্দ। কখনো ঋণ করতে হয় অন্য ভাষার শব্দ। কখনো অন্য ভাষার শব্দ জোর করে ঢুকে পড়ে ভাষায়। জোর যার তারই তো সাম্রাজ্য।”

ভিন্ন ভাষার শব্দ প্রসঙ্গে হুমায়ুন আজাদ তাঁর কতো নদী সরোবর বা বাংলা ভাষার জীবনী গ্রন্থে এভাবেই বলছেন।

এটা অবশ্যই বেদনাভারাক্রান্ত হওয়ার মতো বিষয় নয়। কারণ, পরিবর্তন, বিবর্তন- এ সবই ভাষার ধর্ম। আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখতে গেলে ভাষা, এমনকী ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে। ইতিহাসে এর নজিরও দুষ্প্রাপ্য নয়। কিন্তু, যদি কেউ তার প্রকৃত সম্পদের চেয়ে বেশি ঋণ করে, তবে নিঃসন্দেহে তার নাম হবে দেউলিয়া। ফলত, কোনোদিন, সুদের হিসেব মেলাতে না পারার দায়ে, নিলামে উঠতে পারে আসলটুকু।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ দিয়ে শুরু করা যাক।

দেশের প্রথম সারির একটি গণমাধ্যমে, কথোপকথন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন জনৈক তারকা। (সংগত কারণেই, নাম উহ্য রাখছি)। প্রতি চার শব্দের বাক্যে, অন্তত দুটি করে ইংরেজি শব্দ। “অন্তত” বলছি এই কারণে যে, অনুপাতটা প্রায়ই আরো বেশি হারেই ইংরেজির দিকে ঝুঁকছিল।

শুনতে শুনতে আমার খুব প্রিয় একটি চলচ্চিত্রের সংলাপ মনে পড়ে গেল, “… বাংলা বলতে হবে থেমে থেমে। যেন, তুমি ভালো করে বাংলাটা বলতেই জানো না…!”-একজন তরুণী, অপেক্ষাকৃত প্রাচীন যুগের এক চরিত্রকে হাল আমলের কায়দা-কানুন রপ্ত করানোর চেষ্টা করছেন।

এগুলো উদাহরণ মাত্র। এমন তো অজস্র আছে। কিন্তু এসবের উল্লেখ করছি মানে এই নয় যে, আমি ভালো-মন্দ বা, ঠিক-ভুলের কোনো বিচার করতে চাইছি! আমি কেবল বর্তমান কিছু পরিস্থিতি এবং অন্তর্নিহিত কারণ বিবৃত করতে চাইছি। বলা ভালো, খুব স্বল্প পরিসরে, ভাষার এই বিবর্তনের পেছনে, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক কারণ উদঘাটনের, কিংবা, চলমান প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব বোঝার এ এক প্রয়াস মাত্র।

আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজির উত্থানকে আকস্মিক কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইংরেজি ভাষা বরাবরই নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে এতটা সক্ষম হয়েছে যে, ইতিহাসে তার চলমানতার গতি বেশ সাবলীল। যখন কোনো রাষ্ট্র বা অঞ্চলের সাথে, ইংরেজি ভাষার পরিচয় হয়েছে, সে যতটা বাণিজ্যিক উছিলাতেই হোক না কেন, ভাষাটি সাংস্কৃতিক যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে তার বুনিয়াদ শক্ত করে নিতে পিছপা হয়নি। তাত্ত্বিকেরা একেই বলছেন, “ভাষার সাম্রাজ্যবাদ” বা, ভাষাতাত্ত্বিক সাম্রাজ্যবাদ।

কিন্তু, আমরা কেন মাতৃভাষায়, অল্পবিস্তর কৃতঋণ শব্দের নিষ্পাপ সীমারেখা ছাড়িয়ে, “আধা মাতৃ-আধা কর্তৃ” ভাষা ব্যবহারের প্রয়োজন বোধ করি, তার দায়টা কেবল ভিন্ন ভাষা বা সংশ্লিষ্ট জাতিসত্তার সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের উপর চাপিয়ে দিয়েই ভারমুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। হেন কোনো সত্তা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যে শক্তিমান হয়ে উঠতে চায় না। সে কোনো ব্যক্তি, কিংবা, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, যা-ই হোক না কেন! কেউ হেরে যায়, কারণ কেউ না কেউ বিজেতা হয়ে ওঠে। খেলা অথবা যুদ্ধ, কোনো ময়দানেই, ফাঁকা মাঠে গোল দেবার সুবর্ণ সুযোগ অন্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে কেউ বলবে, “আসুন, এবার খানিকক্ষণ সাম্যের গান গাই”- এই দৃশ্য দুষ্প্রাপ্য। শেষ পর্যন্ত, গল্পটা তাই “আঙুর ফল টক” হয়েই থাকে।

একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ভাষা সময়ের একটি প্রয়োজনও বটে। এমন নয় যে, মাতৃভাষা বা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলনির্ভর ভাষায় কাজ চলতে পারে না। নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু এটা বোঝা জরুরি যে, ভাষার সাথে আরও যা কিছু সম্পর্কযুক্ত, সেই সবকিছুতেই আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারছি কিনা।

এখন প্রশ্ন এই, ভাষার সাথে কী কী সম্পর্কযুক্ত?

উত্তরটা এমন- ভাষার সাথে কী সম্পর্কযুক্ত নয়, সেটাই বলা মুশকিল। অর্থাৎ, হেন কিছু নেই, যা ভাষাকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে না যা ভাষানির্ভর না হয়ে বাঁচতে পারে!

ধরেই নিচ্ছি, আমাদের ওপর বড় রকমের সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে। প্রাথমিক বুনিয়াদ অর্থনৈতিক হলেও শেষ পর্যন্ত তা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত- ইত্যাদি বিবিধ ক্ষেত্রে তার ডানা মেলে দিয়েছে। কিন্তু, ভাবনার কথা হল, এই বেড়াজাল থেকে আমরা কেন বের হতে পারি নি?

যারা সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে, ব্যাপক অর্থে বললে, এখনও করে চলেছে, তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে জাতীয়তাবাদ আছে। (আমরা যতই তাকে ‘উগ্র জাতীয়তা’ বলি না কেন)। কিন্তু আমাদের ঢাল কোথায়? আমাদের মনস্তত্ত্বতে কেন এক তাল নরম কাদার মতো ছেড়ে দিয়েছি তাদেরই মনমতো গঠন করে নেবার জন্য!

এই সব বক্তব্যের পর, পাঠক ভাবতেই পারেন যে, ভাষাকে ভীষণভাবে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখার কথাই আমি বলছি! কিন্তু, আদতেই তা নয়।

একটু পিছিয়ে, আমারই একটি বাক্যে আমি ফেরত যেতে চাই, যখন আমি বলছি ফাঁকা মাঠে “গোল” দেবার কথা। বাস্তবতা এই, আমার হাতে আর কোনো শব্দ নেই যা দিয়ে নিশ্চিতভাবেই আমি “গোল”-কে বোঝাতে পারছি! এমন একটি জবাব আসতেই পারে, সঙ্গে অত্যন্ত বিজ্ঞ পরামর্শও বটে- আসুন আমরা বাংলা শব্দ বানাই।

এর প্রয়োজনীয়তা আছে; অস্বীকার করছি না। কিন্তু, তাতে সবটা সমাধান হবে কিনা বলা মুশকিল। অন্তত, এ যাবত অনুবাদকৃত বহু শব্দের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। এছাড়া, যেহেতু, শব্দ এবং তার অর্থের/ অন্তর্নিহিত ধারণার (সিগনিফাইড এবং সিগনিফাইয়ার) সম্পর্ক নেহাত খামখেয়ালি। অর্থাৎ, জলকে ‘জল’ বলছি বলেই, শব্দটি উচ্চারিত হলে বর্ণহীন তরলকে আমরা কল্পনা করতে পারছি, বা সনাক্ত করতে পারছি। ক্ন্তিু যদি কোনো কারণে জলের নাম ‘লোহা’ হতো, তাহলে ‘লোহা’ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই বর্তমানে যাকে জল বলে জানি, তার চেহারাটাই চোখের সামনে ভেসে উঠতো। সে কারণে, শব্দের, ব্যাপক অর্থে ভাষার, অস্তিত্ব পাকাপোক্ত হয় এর ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে।

ধার করা শব্দের অনুবাদগুলো খুব সাবলীলভাবে চর্চা করা যাচ্ছে কিনা, তার চেয়ে বড় তর্ক এই, আমরা ধার করার সংস্কৃতিকেই খুব বেশি বাড়িয়ে তুলছি কিনা। শুরুর প্রসঙ্গে আসা যাক। যখন বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ ভাষা বিষয়ক দারিদ্র্যে ভুগছে। যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানেও ঋণের প্রবণতা আমাদের পেয়ে বসেছে।

আপনি আমাকে প্রশ্ন করতেই পারেন যে, নিশ্চয়ই মানুষের প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়, সেক্ষেত্রে কী করণীয়।

ঠিক এই প্রসঙ্গেই আমি আসতে চাইছিলাম, যেখানে একটি ধাঁধাঁ লুকিয়ে আছে। অর্থাৎ, আমরা বুঝতেও পারবো না যে, অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি। বরং, ভাবতে শুরু করবো, আমরা ক্রমশ শ্রেষ্ঠত্বের দিকেই যাচ্ছি।

পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার চর্চা আমরা নিশ্চয়ই করবো। আবার, ভাষার সাথে ভাষার মিশেল হবে, এটাও খুব প্রাকৃতিক নিয়মেই ঘটতে পারে। কিন্তু, আমরা যে, কোনো অর্থেই তুচ্ছ নই, সেই বোধটা খুব জরুরি। মানসিক দাসত্বের খামখেয়ালিতে, অকারণেই কোনো ভাষাকে সংক্রমিত না করাই শ্রেয়।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরিফুল ইসলাম মিঠু — ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৭ @ ৫:১৫ অপরাহ্ন

      লেখাটা ভালো হয়েছে। আমি লেখাটা পড়ে ভালো ফিল করছি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com