মোহাম্মদ রফিকের ‘মানব পদাবলি’ জীবনবিলাসী হাওয়ার অবিনশ্বর গান

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৩:১৭ অপরাহ্ন

আজ কোনো কথা নয়
তোমাকে জড়িয়ে শুয়ে থাকি
চুপচাপ
মুখে-মুখ, ঠোঁটে-ঠোঁট, চুলে-নাক,
উথাল-পাথাল বুকে-বুক
নীরব, নিস্তল
আজ রাতে
তুমি দু-শো মাইল দূরে
হয়তো-বা কালের ওপারে
আপন শয্যায়
তাতে কী-বা এসে যায়
এই তো এই তো তুমি
নিশ্বাসে নিশ্বাস টের পাই
বেঁচে আছো, বেঁচে আছি!

(মানব পদাবলি ৪)

comboকেন সংশয়ের মতো এক বিস্ময়চিহ্ন রেখে শেষ এই কবিতা? কোন সময়ের কবিতা এটি? এই কবিতার মতোই কিন্তু এই কবিতাটিই নয় এমন বেঁচে থাকা জীবন ঘনিষ্ঠ ৮৩টি টুকরো পদকবিতা মিলে এই কবিতার বই, মানব পদাবলি। প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের বাতিঘর।
পড়ে আমি চমকে উঠেছি, শিহর লেগেছে ভেতরে আমার। এতো সহজ সুন্দর করে কিভাবে লিখলেন ৭৪ বছর বয়সের প্রায় ৪ দশকেরও বেশি সময় কাব্যভাষায়আড়ষ্টতার বদনাম বয়ে চলা ২৩ বছর বয়সের কবি মোহাম্মদ রফিক!আমাদের কবিতাটিমের ফ্রন্টলাইনের এক মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রফিক এবার ছক্কা মেরেছেন, জিতিয়েছেন বাংলা কবিতাকে। এই বইয়ে এক নতুন মোহাম্মদ রফিককে আবিস্কার করবে তার প্রস্তুত পাঠক।

হালের ফলার কষ্ট, দীর্ঘ সভ্যতার প্রান্ত ছুঁয়ে ধাপে ধাপে মোহাম্মদ রফিক গড়ে তুলেছেন এই কাব্যের শরীর, এর নড়নে আছে বেহাগে ঘুঙুরের লয় তাল, আছে ঝিঁঝির ক্রেংকার, ব্যাং-ব্যাঙাচির তীব্র নাদ। কবির প্রতিটি কবিতায় ধরা পড়েছে এদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা-বিদ্রোহ, ভালোবাসা-ঘৃণা, সর্বোপরি মানবজীবনের একান্ত অনুভূতিসমূহের প্রকাশ। আছে শুদ্ধ শুভ্র চিরায়ত প্রেম, নেই কোন যৌনগন্ধী শব্দমালা।

বরেণ্য এই কবি মনে করেন, পৃথিবীর তাবৎ লেখাই ব্যর্থ; যদি না তা মানুষের হৃদয়ছুঁয়ে যায়। নিজের কাব্যবিভূতির থেকে অনেকটা সড়ে এসে সহজবোধ্য এক ভাষায় কবি লিখেছেন মহাকাব্যিক আখ্যান মানব পদাবলি।শব্দ প্রয়োগ, ভাবের মাধুর্যের দিক থেকে কবির মানসে কাজ করেছে শ্রী চৈতন্যের বৈষ্ণব পদাবলি। কবি মনে করেন, মানবজীবনের কোনোকিছুতেই মুক্তি নেই, একমাত্র ভালোবাসা ছাড়া। তাইতো কবি লেখেন—

তোমার আঙুলে আমি আছি
তোমার চুলের ভিড়ে ঘুম যাই

তুমি হাঁটো চলো কথা বলো
আমার পাঁজরে জ্বলে-নেভে আলো,

কতকাল দেখিনি তোমাকে
শূন্যতায়, তবু জানি তুমি নয়, শূন্যতাও

বাতাস অস্তিত্ব হয়ে
এনে দেয় জলের সংবাদ।

ডুবি জলে, প্রবাহিত স্রোত, রক্তধারা
মৎস্যনারী, তুমি তবে, অধরা কুমারী।

(মানব পদাবলি/ ৭)

এই যে থাকাথাকি, শূন্যতা ও পূর্ণতার ডিলেমা, বাতাস ও জলের অস্তিত্বসম্পর্ক এবং অধরা কুমারীর জন্য কাতরতা, সব মিলে ঐতিহ্যের পায়ের কাছে এসে চুপটি করে বসা, এই প্রবণতা প্রস্তুত পাঠককে মনে করিয়ে দেবে কাব্যবিদ ফ্রেডরিখ স্নেগেলকে। তিনি কথা তুলেছিলেন পুরা সমাজ ও ইতিহাসকে কবিতাকরণের। এখানে প্রশ্নটি কবিতাকে সামাজিক করার নয়, বরং সবকিছুর সঙ্গে কবিতার আমৃত্যু আজীবন বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের। সে যাপনের সাথে যেমন তেমনি কল্পনার সাথেও। এই নান্দনিক উপলব্ধির বা অভিপ্রায়ের উত্তরাধিকার বহন করে পৃথিবীর কবিতায় সুররিয়ালিস্টদের আবির্ভাব। সুররিয়ালিস্টরা প্রস্তাব করেছিলেন কাব্যভাষার বৈপ্লবিক উত্তরণের। কেমন সে উত্তরণ?

ভাষা ব্যবহার করে মানুষ। আরো বৃহত্তর অর্থে জনমানুষ। সুররিয়ালিস্ট চিন্তাবিদ কবিকূল-গদ্যকাররা এই বিশ্বাসে পৌঁছেছিলেন যে, কাব্য ভাষার বৈপ্লবিক পরিবর্তন উন্মুক্ত করে দেবে বা বয়ে আনবে মানুষের বৈপ্লবিক মুক্তির সম্ভাবনা। তাদেরই মতোন মোহাম্মদ রফিক জট খুলে দিতে চেয়েছেন মরচে ধরা এবং নিপীড়ক পুঁজিবাদী সম্পর্কগুলোর, তার সারাজীবনের কাব্যপ্রচেষ্টায়, চেয়েছেন সর্বমানুষের মুক্তি। মুক্তির অর্জনের পথে কবির অস্ত্র শ্বাশত ভালোবাসা, প্রেম। প্রেমের, মিলনের উদ্দেশ্যেই তার অবচেতনে অবগাহন এবং একইসাথে পরাবাস্তবের সাথে উদগ্র অভিসার।

পড়ুন—
শুরু তবে, নিঃসীম অসীম শূন্যে
আকাশ-পাতাল শূন্যতায়,
মধ্যিখানে অরূপ বিরতি
এই তবে, অক্সিজেন হাইড্রোজেন ও কার্বন
চিনি-জল
যুগ-মহাযুগ যুগান্তর-মহাযুগান্তর
পার হয়ে
অবশেষে
হৃদয় শরীর স্তন যোনি
হৃৎপিণ্ড পাঁজর পেশি-শিশ্ন
ওষ্ঠে-ওষ্ঠে, দেহে-দেহে,
অভ্যন্তরে নিঃশেষ বাষ্পীয়
লাল নীল ধবল সবুজ
বীর্য, বীর্যায়ন
বাষ্পময়, শূন্যতায়,
জলীয়, আগ্নেয়
শেষ তাই অসীম নিঃসীম শূন্যে
শূন্যে শূন্যে মিলে শূন্য
শূন্য শূন্য তুমি আমি
তুমি শূন্য আমি শূন্য
এখন আমার তুমি
এবং তোমার আমি
শূন্য, অনির্বচনীয়
মহাসৃষ্টি, প্রলয়, বিলয়, অনিঃশেষ
অন্তিম নিশ্বাস, নিঃসরণ
তুমিই আমার শূন্য
আমিও তোমার শূন্য—
অগ্নিবাষ্প তুমি, অগ্নিবাষ্প আমি
অনির্বাণ

আদিতে, কবিতা
কবিতা, অনাদি, তুমি।

(মানব পদাবলি ১৬)

মোহাম্মদ রফিক এই কবিতায় যেনো ধ্রুপদী ঠুমরির মতো এক একটি মোক্ষম শব্দের মালায় গেঁথেছেন পুরো জীবন, বেদনা, অপ্রাপ্তি আর প্রাপ্তির আনন্দ। যেনো ঘটনার ঘনঘটাময় একটি জীবন। যেনো এক আশ্চর্য ভ্রমণ কবিতার দিকে। দেশকাল নিরপেক্ষ এই কবিতা হেঁটে চলতে পারে যে কোন প্রকৃত কবির মননে মগ্নতায়।

এই কবিতা আবারও প্রমাণ করে, কবিতায় প্রকৃত আধুনিকতা উঠে আসে আপন দেশকাল ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়, কোন আহরিত বা চাপিয়ে দেয়া অনুভবে নির্ভর করে নয়।

মোহাম্মদ রফিকের কাব্যিক ধারাক্রম যারা জানেন, তারা জানেন যে, এ অঞ্চলের মাটি মানুষ জনসংস্কৃতিকে তিনি তার কবিতার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ষাটের দশকে ‘সমকাল’ ও ‘কণ্ঠস্বরে’ লেখালেখি শুরু করা কবি মোহাম্মদ রফিক জীবনভর নদী, জল, কাদামাটির সঙ্গে যুক্ত জীবনযাপনের চিত্র তুলে এনে তাঁর স্বাদু কবিতার মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার ভাণ্ডার মণিরত্নে ভরে দিয়েছেন।

কির্তিনাশা, কপিলা, গাওদিয়া, খোলাকবিতা, বিষখালী সন্ধ্যা বা কালাপানি, অশ্রুময়ীর শব বা নোনাঝাউ—তাঁর এসব কাব্য বাংলা কবিতায় অনন্য সংযোজন বলে স্বীকার করবেন কবিতার পাঠক পদবাচ্যের যে কেউ। ‘সব শালা কবি হবে‘—সামরিক শাসন ও শাসকের তথাকথিত কবি হওয়ার অভিলাষের বিরুদ্ধে তাঁর রচিত বহুবিশ্রুত পঙ্ক্তি। আধুনিক বাংলা কাব্যসম্ভারে তাঁর কপিলা (১৯৮৩) মহাকাব্যোপম এক সৃষ্টি। এরই মধ্যে গতবছরই (২০১৬) তে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মহাকাব্যিক দুই আখ্যানকাব্য, দুটি গাথাকাব্য শিরোনামে। সে ছিল বেদেনি আর এ কোন বেহুলা। কবির কাব্যকর্মের ধারাক্রম বিবেচনা করলে এই মানব পদাবলির কবিতাগুলি তারপর লেখা। পদগুলি লেখা হয়েছে ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫ থেকে, ১ মার্চ ২০১৬ এর মধ্যে।

মানব পদাবলি তে কবির যে স্বতন্ত্র সুর লয় আলাদা রকম বলবার ভঙ্গি, সবই ঠিক থাকছে। প্রথাগত ছন্দ ও প্রকরণের বন্ধন থেকে যেনো মুক্ত হয়েছেন কবি। লিখেছেন একেবারে স্বতস্ফূর্ত, সাবলীল। রফিক লিখেছেন যখন তার লেখা এসেছে, তিনি যা লিখতে চেয়েছেন তা না হয়ে এটি হয়ে উঠেছে অনন্যতুল্য একটা কিছু।

বইটির উৎসর্গ পত্রে লেখা হয়েছে—“হে কিন্নরকণ্ঠী”। পাঠকের প্রথমেই ধন্দ হবে, কে এই কিন্নরকন্ঠী? কবির কোন প্রেমাস্পদ? নাকি পাঠকের জন্য নির্মিত কোন প্রেয়সীচরিত্র। অলৌকিক কোনকিছু কী ভর করেছে কবির উপর—
এই দেহ, তোমার শরীর,
তোমার শরীর, এই দেহ
আচমন সেরে নেয় রাত্রি-দিন,
চরম পুলকে, তপোধীর
ত্রিভুবন, দিগন্তবিস্তৃত
বিরাজিত সর্বভূতে।

(মানব পদাবলি, ৩২)

কবিতাদেবির আরাধনায় সারাজীবন কাটানো কবির দেবির সাথে দেওয়া নেওয়া থেকে উৎসারিত এই পংক্তিমালা। জীবনের যে ভালোবাসা, জীবনের যে টানাপোড়েন—তাতে ঢুকে যাওয়ার পর ঘটেছে এই অলৌকিক সংশ্লেষ—
কে যেন-বা বলেছিল, ধরা তুমি দেবে না কখনো এই ধরাধামে।
সেই কথা মাথা পেতে নিয়ে, আজ, কঙ্কালের ছায়া
শুয়ে পড়ছ খাট বেয়ে।

সরে যাও, এখনও সময় আছে,
আমাকে, আঙুলে খামচে ধরো।

এইবার উঠে বসো
তাকাও মুখের দিকে, মৃত চোখে।

ধুসরাভ আলো ফেলে
শ্বাস নিক অমর কাহিনি ধরাতলে!

(মানব পদাবলি ৩৭)

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন কীর্তি বৈষ্ণব পদাবলির সাথে এই মানব পদাবলির আশ্চর্য কিছু মিল রয়েছে। প্রথমত নামে, দ্বিতীয়ত বিষয়ে। দুটি কাব্যের বিষয়ই চিরায়ত। প্রেম। যে মানব মানবীর প্রেম চিরায়ত হয়ে বিধৃত বৈষ্ণব পদাবলিতে তার একটা এক্সটেনশন বা রেজোনেন্স এই মানব পদাবলি।

তবে এর ভেতর দিয়েই উঠে এসেছে আধুনিক কবির দর্শন, জীবনকে দেখবার দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিক্ষেপসমূহ। পৃথিবীতে যত তত্ত্ব তথ্য আন্দোলন এসেছে, মানুষের মুক্তি কিন্তু ঘটেনি, এবং মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ তাকে ভালোবাসার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হতে হবে, এমন মনে করেন কবি। পরস্পরকে ভালোবাসতে হবে, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে, ভালোবাসা নরনারীর আকর্ষণ থেকে শুরু হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি প্রকৃতি, পরিবেশ, সর্বমানুষকে ভালোবাসাতে গিয়ে পৌঁছে। মোহাম্মদ রফিক মানব পদাবলির ৮২ নাম্বারে লিখছেন—


তোমাতে মানুষ ছিল একদিন
বীরযোদ্ধা উদাত্ত সুন্দর, হয়তো, আমিও ছিলাম

বন-বেড়ালের ভালোবাসা বন-বেড়ালির ক্ষোভ
নীল যমুনার জল ইউফ্রিতিসে মত্ত স্রোত

বালুময় বালুর পাহাড় জুড়ে
লাইলির নয়নে জল মজনুর নির্ভস্ম চিতাধুম

ভোরের আকাশ ছেড়ে পাখি হাওয়া মেঘের পাঁচালি
বিদায়ী চাঁদের মৃদু সোহাগি কিরণে আলতো ছোঁয়া,

একদিন তোমার শরীরে ধরে ঘুণ, কালের বেরাম,
ক্ষয়ে আসে মস্তিষ্ক মগজ হাড়-গোড়ে বুকের পাঁজরে
……………
তোমার শরীরে, দেখি, ছায়া ফেলছে মানুষ, প্রকৃতি পশুপাখি
মুখগুলি, এখনো ততটা স্পষ্ট নয়, তবু বুঝি, ওরা আসছে।

ধীরে, অতি ধীরে, উঠে বসলে তুমি, হাই তোলো,
আড়মোড়া ভেঙে, এতকাল পরে, পা রাখলে মাটিতে।

খুলে দিলে দরজা কপাট, হুড়মুড় ঢুকে পড়লো আলো, প্রকৃতি মানুষ
মানুষ, হয়েছ ফের তুমিই সুন্দর, আমি আছি!

পদাবলি বা পদকীর্তন, ভাওয়াইয়া বা ভাটিয়ালি অকালের কাল অন্তে
ধমনিতে গুহ্যনাদ, আবির্ভাব কোন এক মানবীর!

(মানব পদাবলি ৮২)

এতে মনে হবে, কবিতার যে ইতিহাস, এপিকের যুগ থেকে, তারপর কবিতা মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো, এই সম্পূর্ণ ইতিহাস হতে আহরিত মোহাম্মদ রফিকের কাব্যিক যে ধারণা বা ধ্যান তা ধরা দিয়েছে। এই বইয়ের প্রায় সব কবিতাগুলিই কবির কনসাসনেসের সঙ্গে আনকনসাসনেসের এক ধরণের সেতুবন্ধন রচনা করেছে।

বিশতম পদটির কথাই ধরা যাক,

কী ভাষায় কথা বলো
আমি বলি

পালটে গেছে শব্দ, বাক্য, আচরণ
ভুলে গেছে নিজে, নিজেকেই
তুমি-আমি, ভুলে আছি,
লুপ্ত রক্ত-উষ্ণতার সাংগীতিক বোধ ও বিস্ময়।

ঔপনিবেশিক দুরাচার
প্রচার-মাধ্যম
যত সস্তা নাটক-নভেল
ঠাসা অর্থহীন শব্দ, শব্দহীন বাক্য
উচ্চারণ।

অশ্লীল আচার-আচরণ
ঢুকে গেছে
শোয়ার ঘরেও, বেহুলার সাপ, মহুয়ার ছুরি,
ধনতন্ত্র, উন্মুক্ত বাজার, পার্কে, থিয়েটারে,
বন ও বনানি প্রাকৃতিক সম্মিলন,
তৃণ ছায়া জুড়ে
নির্বিবেক ছলাকলা, মিথ্যাচার

ভালোবাসা পালিয়ে গিয়েছে, বহুকাল
টের তো পাইনি, কেউ, আমি-তুমি,

আজ শূন্য মন্দির আমার
ফিরে যায় আশ্বিনের বাষ্পহীন মেঘ, বৃষ্টিহীন।

(মানব পদাবলি ২০)

এই যে আকাল চলছে এই দেশে, তাও দেখুন কী কাব্যিকভাবে উঠে এসেছে এই কবিতায়। হতাশ মানুষ যখন আকাশের ঈশাণ কোনে তাকায়,তখনি না দেখে সে “ফিরে যায় আশ্বিনের বাষ্পহীন মেঘ, বৃষ্টিহীন”।

তুমি-আমি মারা যাব
একদিনে একরাত একই সময়ে
সকালে, বিকেলে,
তুমি আমি একই সঙ্গে হেসে উঠি
এক স্বরে কথা বলি
স্বপ্ন বুনি, গান গাই
তুমি আমি একটি পাখি, একটি ডালে
একই ঠোঁটের দুটি ওষ্ঠ
একটি জিহ্বা, একটি তালু
একই যন্ত্রণার দুটি প্রান্ত ছুঁয়ে
তুমিই জীবন, আমি জন্ম
নিশ্বাস, প্রশ্বাস
এক দীপ্ত মুখরতা, একই বিস্ময়
আমি নদী, তুমি স্রোত
উষ্ণতা, আবেগ
একস্তুপ পলিমাটি, গুচ্ছে রোয়া ধান
তুমি উর্বরতা, আমি হাওয়া
নিঃসীম, অসীম
আকাশ মিশেছে ওই দিগন্তরে,
তুমিই আকাশ, আমি দিক,
মিলেমিশে একটিই ছায়া, নিরন্তর কম্পমান।

(মানব পদাবলি ১৯)

ইচ্ছাকৃতভাবে চণ্ডীদাশ, রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ দাশ এর কবিতার নানা অনুষঙ্গ নিয়েছেন মোহাম্মদ রফিক, ব্যবহার করেছেন একেবারে নিজের মতো, নতুন একেকটা কবিতায়, উস্তাদ আমজাদ আলী খানের সরোদের সর্বোচ্চ ঝালার সাথে যেনো মিশে গেছে মানুষের কথা বলা, শব্দ আচরণ সভ্যতা। এবং দ্যাট টেন্ডস টু ট্রু লাভ পোয়েট্রি।এপিকের যুগ থেকে কবিতার যে ইতিহাস, কবিতা, কাব্যিক যে ধারণা সেটা এখানে ধরা দিচ্ছে। এই কবিতা হচ্ছে কবির কনসাসনেসের সাথে আনকনসাসনেসের এক ধরনের সেতুবন্ধন। এবং টের পাওয়া যাচ্ছে, বেহুলা পর্যায়ের লেখায় মোহাম্মদ রফিক নিজস্ব যে প্রকরণের উর্ধ্বে উঠে গেছেন, সেই প্রকরণের শাষনহীন একটা জায়গা থেকে লেখা মানব পদাবলি।একজন কবির অন্বিষ্ট যে সরলতা তা দিয়ে শুরু হয় না তার, সেই সরলতা তাকে অর্জন করতে হয়। মোহাম্মদ রফিক মানব পদাবলিতে সেই সরলতা অর্জন করেছেন। তিনি যেনো ৭৪ এর এক শিশু যার আবার আছে প্রেমবোধ।“ খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে, বিরাট শিশু’র মতো কবিও খেলছেন তার আপন ভুবন নিয়ে । কবি চান, তিনি যখন যাবেন পৃথিবী থেকে, তিনি যেনো শিশুর মতো পৃথিবী থেকে যেতে পারেন। মোহাম্মদ রফিক বালজাকেই মতোন ইটারনাল চাইল্ড। যেদিন তার শিশুত্ব থাকবে না, সেদিন তার মরণ হবে। মানব পদাবলি ঠিক আত্নজীবনী নয়, কোন লেখাই তা নয় বৈকী, কবিরে খুঁজো না তার জীবন চরিতে, খুঁজো তার লেখায়— এই বইটা মোহাম্মদ রফিকের আত্মজীবনী ঠিক না হলেও তারআত্মানুসন্ধানের একটা প্রয়াসতো বটেই।

বইটা পড়ার পর কথা হলো আমার কবির সাথে, তিনি বললেন, কাফনের সাথে যে কবিতার বই চায় সারাজীবন ধরে কাজ করা একজন কবি, সেটা তিনি লিখে ফেলেছেন, আমি যেনো তাঁর কবরগাত্রে মানব পদাবলির একটি অন্তত কপি রেখে আসি। বললেন, নিজের এই কবিতার বই তিনি বারবার পড়েছেন, যেটা বিরল। মৃত্যুভাবনার এমন নিকটে দাঁড়িয়ে কবি লিখে ফেলেন অমর কবিতা:

দুটো মড়া, লাগালাগি শুয়ে থাকলে
শুরু হয় ইঁদুরের দৌড়
আরও একটি জীবন তৎপর।

(মানব পদাবলি ৭৪)

মানব পদাবলিতেভালোবাসা যে দার্শনিকতার আশ্রয় পেয়েছে, তা একজন কবির সারাজীবনের শ্রমকে স্বার্থক করে দিতে পারে। কবিতার পাঠক যারা, তাদের সম্পূর্ণ বইটা পড়তে অনুরোধ করছি, সর্বশেষ পদটি উৎকীর্ণ করে—

কী হবে তোমাকে পেয়ে
যদি-না-বা ছুঁয়ে যেতে পারি
সৃষ্টি
প্রলয় বিলয় ধ্বংস
রহস্যে উন্মুখ
গোটা ভূ-বিশ্বের অন্তরাল
অভ্যন্তর
অগ্নি ও বরফ

তোমার সান্নিধ্য ব্যর্থ হবে
যদি না প্রতিটি শব্দ
উচ্চারণ
হয়ে ওঠে ওঁম
মন্ত্রধ্বনি
মুক্তিমন্ত্র
সর্বমানুষের

একাকার
মানুষ-প্রকৃতি ভূমি
প্রকৃতি-মানুষ,
কবিতার সরল আঙ্গিক
হৃদয়ে-হৃদয়ে
রক্ত ও মাংসের অঙ্গীকার

পার্বতী ও মহেশ্বর।

(মানব পদাবলি ৮৩)

কবি মোহাম্মদ রফিকের ওঁম মন্ত্রধ্বনি, সর্বমানুষের মুক্তিমন্ত্র হয়ে ওঠা এ কাব্যগ্রন্থের সান্নিধ্য ব্যর্থ হবার নয়। বাংলা কবিতার ইতিহাসে এ বই খুলে দেবে নতুন অনেক দিগন্ত, প্রসারিত করবে হাজারো তরুণ কবির চোখ।
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অরিন্দম শীল — ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৭ @ ১২:৩২ পূর্বাহ্ন

      খুব দারুন আলোচনা পড়লাম একটা। কবির অন্তঃকরণ ধরা পড়ছে। বইটা দেখছি ঢাকা থেকে আনাতেই হবে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com