মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করা মূর্খতারই নামান্তর

শাহনাজ মুন্নী | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ২:১৮ অপরাহ্ন

Babelঅনেক বছর আগে একবার পত্রিকায় পড়েছিলাম, কোন একটি প্রাচীন ক্ষয়িষ্ণু ভাষার কথা, যে ভাষায় কথা বলা মানুষ কমতে কমতে এমন হয়েছিল, যে শেষ পর্যন্ত ওই ভাষায় কথা বলেন বা ভাষাটি জানেন এমন একজন মাত্র মানুষ শুধু বেঁচেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ওই ভাষাটি পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যাবে। অর্থাৎ ব্যক্তিটির সাথে সাথে মারা যাবে তার প্রাচীন ভাষাটিও। শুধু কি ভাষা মরে যায় ? ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তো একটি জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা জীবনধারা ও সংস্কৃতিরও মৃত্যু ঘটে।

আমি হঠাৎ শিউরে উঠেছিলাম এই আশংকায় যে কোন দিন, কোন দূর্ভাগ্যময় দূর ভবিষ্যতে বাংলা ভাষাও কী তবে লুপ্ত হতে পারে? হারিয়ে যেতে পারে প্রচণ্ড প্রতাপশালী আধিপত্যবাদী কোন ভাষার দুর্দান্ত দাপটের কারণে?
যে ভাষায় প্রায় ২৫ কোটি লোক কথা বলে, সে ভাষা এত সহজে লুপ্ত হবে না, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে, আমাদের সামনে মানে বাংলাদেশের মানুষের সামনে ভাষা নিয়ে কথা বলতে গেলেই যখন অবধারিতভাবে মনে পড়ে যায় ১৯৫২। জ্বলজ্বল করে ২১ শে ফেব্রুয়ারি। মনে হয়, শহীদের বুকের তাজা রক্ত যেন মিশে আছে এই বাংলা ভাষার সাথে, বাংলা বর্ণমালার সাথে। ফলে বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা- এমন উচ্ছাসে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ভেসে যাই। কবি শামসুর রহমানও– ধারণা করি–সেই আবেগ থেকেই লিখেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ/ বারান্দায় লাগে জোৎস্নার চন্দন। বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে উদার গৈরিক মাঠে, খোলা পথে, উত্তাল নদীর বাঁকে বাঁকে, নদীও নর্তকী হয়।’
তবে এসব আবেগী ভাবনার বাইরে এসে কঠিন বাস্তবকেও তো উপেক্ষা করতে পারি না।
এটা তো অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে সারা বছর ধরে ভাষা নিয়ে প্রায় সর্বত্রই দেখা যায় এক ধরনের উদাসীনতা, দেখি বাংলা ব্যবহারে অসচেতনতা, দেখি নতুন প্রজন্ম বাংলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, দেখি বাংলা ভাষায় অনায়াসে অনুপ্রবেশ ঘটছে বিস্তর ইংরেজি ও বিদেশী শব্দের।

পণ্ডিতরা অবশ্য বলেন, ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। বহতা নদীর মতো প্রবাহমান। এটি কখনোই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। ভাষার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী এবং এই পরিবর্তন রোধ করাও সম্ভব নয়, রোধ করার প্রয়োজন’ও নেই। পৃথিবীর সব ভাষাতেই অন্য ভাষার মিশ্রণ আছে। এরকমও বলা হয় যে, ভাষায় নতুন নতুন শব্দ আসা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি তা ভাষাকে সমৃদ্ধও করে। সময়ের সাথে সাথে ভাষার বাঁক বদল’ও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কি হবে সেই নতুন শব্দ, আর কেমন হবে সেই বাঁক বদল, তা নিয়ে বিতর্ক আছেই।
তবে এটুকু হয়তো বলা যায় যে, বাংলার সঙ্গে বিভিন্ন ভাষার শব্দের মিশ্রণ এখন অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও পরে হয়তো এগুলোই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। একশ বা পঞ্চাশ বছর আগে যেভাবে আমরা বাংলা লিখতাম বা বলতাম, এখন কি আর সেভাবে বাংলা লিখি বা বলি? অতএব, এসব স্বতঃস্ফূর্ত পরিবর্তন নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। ভাষার রূপান্তরকে রোধ করা যায় না, একে মেনে নিতেই হবে। তবে রূপান্তরের এই ধারা দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়, একবার টাইম মেশিনে চড়ে ২১১৭ সালে ঘুরে আসি। শুনে আসি ভবিষ্যতের রূপান্তরিত বাংলা ভাষা। দেখি এই শতাব্দির জানা বোঝা দিয়ে সেই শতাব্দির বাংলাকে বুঝতে পারি কীনা। কে জানে, তখন হয়তো বাংলা ভাষা অনেক বেশি সাংকেতিক বা ধ্বনিময় হয়ে যাবে। হয়তো তখন বাংলাকে নতুন করে আবিস্কার করতে হবে। খুঁজে নিতে হবে তার পরিবর্তিত রূপকে।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় ২০১৪ সালের এপ্রিলে একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল, যার শিরোনাম ‘আ মরি বাংলাভাষা’কে প্যারোডি করে ‘আ মরে বাংলা ভাষা’। সেখানে পশ্চিম বঙ্গের প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার প্রাণহীন নির্জীব হয়ে পড়ার কথাও যেমন বলা হয়েছে, তেমনি এও বলা হয়েছে যে নতুন প্রজন্মের একটি অংশ বাস্তব প্রয়োজনে ইংরেজি বা হিন্দি ভাষার চর্চা করলেও বাংলার সঙ্গ ছাড়েনি। ওয়েব সাইটে, ব্লগে, অনলাইনে, গল্প, কবিতায় তাদের হাতেই আবার প্রাণ পাচ্ছে বাংলা ভাষা।

বলা হয়েছে, ফেস বুক প্রজন্মের কথাও যারা দুটো বাংলা শব্দের সাথে সাতটা ইংরেজি শব্দ মিলিয়ে দেয়। বাক্য সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে উদ্ভট সব ধ্বনি উচ্চারণ করে। তাদের হাতে বাংলার মান সম্মান তো কিছু থাকছেই না, উল্টো বাংলা ভাষার চিতায় উঠার জোগাড় হয়েছে। পাশাপাশি এটাও বলা হয়েছে যে, এরকম সংকট শুধু বাংলা ভাষার নয়, পৃথিবীর আরো অনেক ভাষারও রয়েছে। এমনকি খোদ ইংল্যান্ডেও নাকি নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি বলছে ভুল ব্যাকরণে, নিজেদের সুবিধাজনক সংক্ষিপ্ত উচ্চারণে।

আসলে ভাষা হয়তো চলেই এমন টানা-পোড়েনের মধ্য দিয়ে। এভাবেই তার টিকে থাকা, এভাবেই তার বিবর্তন।
তবে এসবের বাইরে ইদানিং আরেকটা প্রশ্নও মনে জাগে, সেটা হল, বাংলা ভাষা নিয়ে কি এক ধরনের হীনমন্যতাও আছে আমাদের? নইলে ইংরেজী মাধ্যমে পড়ুয়ারা ষ্টাইল করে এমন ইংলিশ উচ্চারণে বাংলিশ কেন বলবে? আমার ছেলে মেয়েরা বাংলা পড়তে বা বলতে পারে না- বলে কেন আত্মপ্রসাদ অনুভব করবে তাদের অভিভাবকেরা? ভাষার প্রতি কেন শ্রদ্ধাবোধ থাকবে না? মাতৃভাষা নিয়ে এই হীনমন্যতা তো নিজেদের মনের দারিদ্র্যকেই প্রকাশ করে, নিজেদের আত্মসম্মান ও মর্যাদা বোধের অভাবকেই সবার সামনে প্রকট করে তোলে। অথচ আমাদের কবিরাই তো বলেছেন, বাংলা ভাষা আমাদের গর্ব, আমাদের আশা। ভাষাতাত্ত্বিকরা বলেছেন, বাংলা অত্যন্ত ঐশ্বর্যময় ও সম্পদশালী একটি ভাষা। এর গ্রহণ ক্ষমতা অসাধারণ, ভাব প্রকাশেও এই ভাষার জুড়ি মেলা ভার। অন্য ভাষার মানুষেরা পর্যন্ত অর্থ না বুঝেও এই ভাষার ধ্বনি মাধুর্যে মুগ্ধ হন। তারপরও দুঃখের বিষয়, আমরাই বাংলা ভাষাকে অবহেলা করছি।

যে দেশ আর যে জাতি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে যত শক্তিশালী সেই দেশ বা জাতির ভাষার দাপটও তত বেশি। এটি সাধারণভাবে জানা কথা। তবে, নিজের ভাষাকে ভালবেসে সেই ভাষাটা শুদ্ধভাবে বলতে লিখতে ও পড়তে পারার মধ্যে তো অগৌরবের কিছু নেই। বরং বাঙালী হয়ে বাংলা না জানাটাই অগৌরবের। কাজের প্রয়োজনে, শিক্ষার প্রয়োজনে, অন্য ভাষা শিখলে নিজের ভাষাকে ভুলে যেতে হবে, এমন কথা কে বলেছে? বিদেশী ভাষা শেখা আমাদের দরকার। কিন্তু অন্য ভাষার প্রতি আনুগত্য দেখাতে গিয়ে মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করা মূর্খতারই নামান্তর। নিজের ভাষার সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও পরিচর্যা করা, এর চর্চা করা, একে বিকশিত করা ও সম্প্রসারণ ঘটানো আমাদের সবার দায়িত্ব। বাংলা নিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের যে মাতামাতি তা যদি শুধু বাহ্যিক বিষয় না হয়ে অন্তরের ব্যাপার হয়ে উঠতো তাহলে সেটা হয়তো অনেক বেশি কাজের হত।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com