নাসির আলী মামুন: বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে থেকে, তার কাছাকাছি গিয়ে ছবি তুলেছি

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ৯ মার্চ ২০১৭ ৪:৪১ অপরাহ্ন

Nasir-1একটি জাতি কত সমৃদ্ধ তা বোঝা যায় তার বড় মানুষদের সংখ্যাধিক্যে। নাসির আলী মামুন বাঙালি জাতির বড় বিজ্ঞাপন বড় বড় মানুষদের মুখাবয়ব ধরে রেখে আদতে এই জাতির একটি ফটোগ্রাফিক অবয়ব নির্মাণ করেছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফির পুরোধা বলা যায় নাসির আলী মামুনকে। তার শস্তা ক্যামেরার লেন্সেই রচিত হয়েছে পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফির এক অনবদ্য কাব্যময়তা। নিরন্তর পোর্ট্রেট তোলার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা নাসির আলী মামুন ছুটে বেরিয়েছেন দেশ-দেশান্তরে। তার তোলা পোর্ট্রেটের সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি। শিল্পী, লেখক, রাজনীতিবিদ, বিশ্বের খ্যাতনামা ব্যক্তিরা হয়ে উঠেছেন তার শিল্পিত লেন্সের অন্তর্দর্পন। এছাড়া তার একটি বিশেষ শখ শিল্পীদের শিল্পকর্ম সংগ্রহ এবং খ্যাতনামা ব্যক্তিদের হাতে খাতা ও রঙ-তুলি দিয়ে ছবি আঁকিয়ে নেয়া। ব্যক্তিত্বের পোর্ট্রেট সংগ্রহের পাশাপাশি ব্যক্তিত্বের গহিনে লুকিয়ে থাকা অন্য এক সত্তাকে তিনি আবিষ্কার করে আনেন। ব্যক্তির মননে লুকিয়ে থাকা শিল্পীর জাদুকরী নান্দনিক রেখায় ধরা দিয়েছে নাসির আলী মামুনের সমৃদ্ধ শিল্প সংগ্রহশালা। বাংলাদেশের শিল্পী শাহাবুদ্দীন, কাজী আবুল কাশেম, আমিনুল ইসলাম, কামরুল হাসান, যোগেন চৌধুরী, সুহাস চক্রবর্তী, দেবদাস চক্রবর্তী, মনিরুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইউনূস, পরিতোষ সেন, সন্তুর সম্রাট শিবকুমার শর্মা, ঠুমরীর রানী বিদুষী গিরিজা দেবী, কবি শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, বরেণ্য শিক্ষাবিদ আবদুর রাজ্জাক, শিল্পী এসএম সুলতান, রণি আহম্মেদ,— কে নেই তার সংগ্রহশালায়?

নাসির আলীর মামুন একটি ব্যক্তিগত আর্কাইভ বা মিউজিয়াম গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ‘ফটোজিয়াম’ নামের একটি জাদুঘর নির্মাণে কাজ করছেন কয়েক বছর ধরে। ক্যামেরায় ছবি তোলার পাশাপাশি তিনি পরম যত্নে সংগ্রহ করেছেন শিল্পী-সাহিত্যিক এবং সৃজনশীল ব্যক্তিত্বদের আঁকা বিভিন্ন মাধ্যমের দুর্লভ সব ছবি। ছবিমেলার নবম আসরে তিনি পেয়েছেন আজীবন সম্মাননা। ছবিমেলা শুরুর আগে সংবাদটি জানার পরপরই তার তোলা ছবি দিয়ে সাজানো গ্যালারিতে নাসির আলী মামুনের মুখোমুখি হয়েছিলেন কবি শিমুল সালাহ্উদ্দিন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অভিনন্দন মামুন ভাই! জাস্ট একটু আগেই শুনলাম যে আপনি ছবিমেলার নবম আসরের আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন, আপনার পাশাপাশি এ সম্মাননা পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী সাঈদা খানম। আপনার অনুভূতি জানতে চেয়ে শুরু করতে চাই আজকের এই সাক্ষাৎকারটি। কেমন লাগছে?
নাসির আলী মামুন: আমি তো মহাখুশি। এই কারণে যে এর আগেও কিন্তু আমি সম্মানীত হয়েছি এ রকম লাইফ টাইম এচিভমেন্ট এ্যাওয়ার্ড অনেকগুলো অর্গানাইজেশনের। কিন্তু ছবিমেলা একটা একটা আন্তর্জাতিক উৎসব। দুই বছর পর পর হয় ঢাকাতে। এবং এই উৎসবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আলোচিত শিল্পীরা অংশগ্রহণ করে। শুধু তাই না, বিভিন্ন বড় বড় মিউজিয়াম গ্যালারির কিউরেটর যারা, তারা কিন্তু আসে। কাজেই এটা আমি মনে করি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এবং এই ফোরাম থেকে, ছবিমেলা থেকে যে আমাকে এইবার লাইফ টাইম এচিভমেন্ট এ্যাওয়ার্ড দেয়া হলো, আমি এটার জন্য সত্যিই সম্মানীত বোধ করছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মামুন ভাই, ছবিমেলায় একটা বড় গ্যালারি শুধু আপনার জন্যই রাখা হয়েছে আপনার তোলা ছবির কাজ দিয়ে এবং তার নাম দেয়া হয়েছে দ্যা পোয়েট অফ দ্যা ক্যামেরা এবং আমরা জানি যে কবি শামসুর রাহমান আপনাকে ক্যামেরার কবি বলেছেন। কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন আলোছায়ার কবি। এই যে কত কাজ করেছেন, আমদের দেশের বড় মানুষগুলোকে আপনি আসলে ফ্রেমে ধরে রেখেছেন। এখন জীবনের দিকে পেছন ফিরে তাকালে আপনার আসলে কী মনে হয়?
নাসির আলী মামুন: আমি তো মনে করি যে ১৯৭২ সালে আমি যে বাংলাদেশে প্রথম পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফির সূচনা করলাম, এতো বছর পরে এই পাঁচচল্লিশ বছর পরে আমি মনে করি যে আমি বাংলাদেশে সঠিক জায়গায় আমার ক্যামেরা ফোকাস করেছিলাম। এই কারণে যে, যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব— কবিতা, সঙ্গীত, সাহিত্য, শিল্পকলা, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধূলা এবং এই যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা বিখ্যাত লোক তারা কিন্তু সারাজীবন অনেক কাজ করে একদিন উধাও হয়ে যায়। আর ফেরে না। এইসব মানুষদের আমি, বাহাত্তর সালে দেখতাম যে, তাদের ঘরে ভালো কোন ছবি নেই। যেই ছবি তাদের ঘরে রাখা আছে অথবা তাদের বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে, সেগুলো স্টুডিওর ছবি, তার আসল চেহারার সাথে সেই ছবির কোন মিলই নেই। আমি দেখলাম যে না, এই মানুষগুলোকে মহাতারকা করতে হবে। এবং আমি স্টুডিও হয়ে, আমি ফটোগ্রাফার হয়ে তাদের বাসায় যাওয়া শুরু করলাম, বিখ্যাত মানুষদের। প্রথম দিকে তারা কেউ পাত্তা দিতে চাইল না। সময় দিতে চায় না। আমি বললাম যে দেখেন, আমি এই যে ফটোগ্রাফার, একটা স্টুডিও, আপনার স্টুডিওতে যান, সময় ব্যয় করেন অর্থ ব্যয় করেন; আমি যে আপনার বাসায় আসছি, আপনাদের ছবি আমি তুলব, আপনারা তো তারকা! তখন অনেকে নড়েচড়ে উঠলেন এবং আস্তে আস্তে তারা রিয়েলাইজ করলেন যে না, ও তো আমাদের পক্ষেই কাজ করছে। ভালো কাজ। এবং আমাদের যে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন মুহূর্তের আলোকচিত্রের যে ইতিহাস, মুখচ্ছবির যে ইতিহাস, এটা তো সে তৈরি করছে। তারপর থেকে আমাকে কো-অপারেট করা শুরু করল। এটা আমি আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আমি তাদের প্রতি প্রথম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব। যারা বিভিন্ন সময়ে আমার ছবি তোলার জন্য আমার ক্যামেরার সামনে বসেছেন এবং নিজেদেরকে উজাড় করে দিয়েছেন এবং সমর্পণ করেছেন। তাদের কাছে আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মামুন ভাই আপনার ঠিক পিছনে চারটা ছবি রয়েছে। উপরে বঙ্গবন্ধু, বামপাশে জেনারেল এম. এ. জি ওসমানী, নিচে মাদার তেরেসা এবং ডানপাশে জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। এই চারটা ছবি তোলার গল্প যদি ছোট্ট করে আমাদেরকে বলেন!
নাসির আলী মামুন: আমি বঙ্গবন্ধুরটা দিয়ে শুরু করি। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জাতির পিতা এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ তার নেতৃত্বে যদি না হতো তাহলে মনে হয় যে আমি নাসির আলী মামুন হতে পারতাম না। এটা আমি বিশ্বাস করি। তার প্রতি এমনি আমার এক ধরণের অবসেশন ছিল যে এতো বড় নেতা! এবং বাঙালিরা তো তার মতো এতো উঁচু লম্বা বুক এতো বড় হয় না আসলে। কিন্তু উনাকে দেখতে হলে হিমালয়কে যেভাবে দেখতে হতো এইভাবে দেখতে হয় আসলে। আমি সেইভাবে দেখেছি তাকে। বাহাত্তর সালে, তেহাত্তর সালে এবং মুক্তিযুদ্ধের আগেও বহুবার তাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখেছি। কিন্তু যখন প্রথম ছবি তুললাম আমি, বাহাত্তর সালে, তো কাছাকছি গেলাম। তখন ক্যামেরা থাকলে সরকার প্রধানের যে কোন অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ ছিল, সুবিধা ছিল। এতো সিকিউরিটি ছিল না। তো যেই ছবিটার কথা আপনি বললেন, সেটা ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় প্রকাশ্য কংগ্রেস ইঞ্জিয়ার্স ইনস্টিটিউটে হচ্ছিল। জাতির জনক প্রধান অতিথি। তিনি মঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। বক্তৃতা দেয়ার সময় আমি খুব জুতসই কোন এ্যাঙ্গেল পাচ্ছিলাম না, যে তার একটা পোর্ট্রেট করা যায় কি না। এমনি ছবি না। তার চেহারার যে বিভিন্ন অক্ষর, তার চেহারার মধ্যে যে ব্যক্তিত্ব, তার উদার কণ্ঠ, চোখের যে ঝিলিক, যখন সে কথা বলতে শুরু করে; সেইটা আমি ঠিক পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ দেখলাম যে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটা বড় সানগান ওইদিক থেকে দেয়া হল এবং বঙ্গবন্ধুর এই দিকটা জ্বলজ্বল করে উঠল একদম। চকচক করে উঠল একদম, মার্বেল পাথরের মতো। আর এই দিকটা অন্ধকার হয়ে গেল। আমি ছিলাম স্টেইজের নিচে। আমার সঙ্গে ওয়ান টোয়েন্টি ক্যামেরা ছিল সেইটা উঁচু করে আমি ফোকাস করে এই ছবি তুললাম। সামনে কিন্তু মাইক ছিল। ওইটা বাদ দিয়ে দিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাকে চেনেন না উনি আমার জন্য আলাদা সময়ও দেননি। তারপরেও আমি বলব যে তিনি আমাকে সময় দিয়েছেন। না হলে এই ছবি আমি কীভাবে তুললাম! পরবর্তীকালে তো আমি বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে থেকে, তার কাছাকাছি গিয়ে ছবি তুলেছি। যদিও আমাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল না। ছিল আত্মিক সম্পর্ক।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তার নিচে আছে মাদার তেরেসার ছবি। তিনিও বিখ্যাত..
নাসির আলী মামুন: মাদার তেরেসা নোবেল পুরস্কার বিজয়ী শান্তিতে। উনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এলেন ১৯৮১ সালের জানুারি মাসে। তেজগাঁর একটা চার্চে এসে উঠলেন। আমি খবরের কাগজে সেই নিউজ দেখলাম। দেখে সেই চাচের্র সামনে আমি সকালবেলায় গেলাম। দেখলাম যে চার্চের গেটটা বন্ধ। এবং বললাম যে মাদার তেরেসা ভেতরে আছেন, তার সঙ্গে আমার এক মিনিট, আমি ছবি তুলেই বেরিয়ে যাব। যারা যায় তারা ভেতরে চলে যায় আর আসে না। কিছুক্ষণ পরপরই একজন দুইজন নান এসে উঁকি মারে গেট দিয়ে। আমাকে দেখে ভেতরে চলে যায়। আমার কোন কথাই শোনে না। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টার মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম। ক্যামেরা সঙ্গে আমার ছিল, ব্যাগ ট্যাগ ছিল। এক ঘণ্টা পরে দেখলাম যে একটা মাইক্রোবাস সামনে দাঁড়ানো, তার দরজা খোলা। আমি তখন বুঝলাম যে মাদার তেরেসা বেরোবে। কারণ আমি জানতাম যে ওই দিন তিনি পুরনো ঢাকায় যাবেন সকালবেলায়। দেখলাম মাদার তেরেসা খুব দ্রুত হেঁটে, এতো বয়সী ভদ্রমহিলা, চামড়ার স্যান্ডেল পরা এবং তার যে পোশাক হঠাৎ দেখে আমার মনে হল যে দুইশ আড়াইশ বছর আগের কোন ভদ্রমহিলা। এবং তার চামড়ার জুতাটা হাতে তৈরি, হাতে বানানো। এটা কোন ইন্ডাস্ট্রির না কোন কোম্পানির না। এইগুলো সব আমি দেখলাম, ত্বরিৎ। এবং উনি মাইক্রোবাসে যখন উঠছিলেন, তার সঙ্গে আবার তিনজন নান। তখন আমি মাইক্রোবাসের কাছ থেকে এরকম বাধা দিলাম যে আমাকে আপনি একটু সময় দিন। অনেকটা ক্ষমা চাওয়ার মতো যে আমাকে দুই মিনিট সময় দিন। মাদার তেরেসা খুবই বিরক্ত হলেন। এবং বেশ রাগ তার কথায়। আমি খালি দেখছিলাম যে শান্তির দূত, এরকম একটা মিশনারী , এখন তো উনি সেইন্ট, তাকে ঘোষণা করা হয়েছে। (দ্বিতীয় অডিও ক্লিপ এখান থেকে শুরু) তার রাগ হলে কেমন দেখা যায় সেটা আমি দেখলাম কিন্তু ক্যামেরায় ছবি তুলতে পারলাম না। যদি ছবি তুলতাম হয়ত তিনি গাড়িতে করে চলে যেতেন। তখন উনি বলল যে ঠিক আছে তোমাকে পাঁচ মিনিট সময় দেব। দ্রুত আবার হেঁটে অ্যাবাউট টার্ন করে…..আমিও তার পিছু নিলাম। ওই চার্চের ভেতরে একটা স্কুল ঘরের মতো ছিল, লম্বা লম্বা বেঞ্চ-চেয়ার, লম্বা টুলের মতো; মাদার তেরেসাও বসলেন উল্টা দিকে আমি বসলাম। আমার কিন্তু তখন হাত-পা এরকম কাঁপছে। নোবেল লরিয়েট। ওই রকম একটা নোবেল লরিয়েটকে প্রথম আমার দেখা, সামনাসামনি। এবং তাকে ক্ষুব্ধ করলাম আমি। তো প্রথমেই তিনি বললেন যে, ভাঙা ভাঙা ইংরেজি আবার ভাঙা ভাঙা বাংলায়, যে আমি কি যথেষ্ট দুঃখিত না যে উনাকে আমি এইভাবে আটকে দিলাম। এবং উনার জন্য অনেক শিশু অপেক্ষা করছে পুরনো ঢাকায়। যারা তার ভালোবাসা চায়,আদর চায়। তো আমি তখন মনে মনে ভাবলাম যে আমি তো ছবি তুলতে এসেছি। আমার কাজটা, আমার উদ্দেশ্য হল ছবি তোলা। বিরক্ত হন আর যা-ই হন। কিন্তু আমি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলাম। দুইহাত এরকম করে, যে, আমি ক্ষমা চাই, আমি ভুল করেছি, আমি অন্যায় করেছি। তো মাদার তেরেসা বসলেন কিন্তু তখনো তার বিরক্ত ভাবটা যায় না। আমি বলতেও পারি না যে আপনি আমার ক্যামেরার দিকে তাকান, এই দিক তাকান! উনি নিজে নিজেই অপার্থিব দূরে ইনফিনিটি একটা জায়গার দিকে তাকিয়ে…. তখন এই ছবিটা আমি তুললাম, ক্লিক করলাম। এবং ওই রুমের মধ্যে আলোটা একটু কম ছিল। কারণ ঠিক মাঝখানে বসা উনি। আর চারিদিকে উঁচু চার্চের দেয়াল। তো তারপরেও এরকম একটা ছবি আমি মনে করি যে মাদার তেরেসার একটা বিশেষ মুহূর্ত ঢাকায় আমি বন্দি করতে চেষ্টা করেছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এবং লেফটেনেন্ট এম. এ. জি ওসমানী।
নাসির আলী মামুন: অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যারের ওখানে তো আমি অনেক বার গিয়েছি। ছবিও তুলেছি কয়েকবার। উনি আমার ছবি পছন্দ করতেন। আমি বিস্মিত হতাম যে উনি ফটোগ্রাফিও বুঝতেন। এবং ছবি যখন দেখতেন উনি বুঝতে পারতেন। বর্ণনা করতেন ছবি। তখন বুঝতাম যে উনি শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সঙ্গীত, সাহিত্য, রাজনীতি নিয়ে না, ফটোগ্রাফিও উনি কিন্তু বুঝতে পারেন। এবং আমাকে সাজেশনও দিতেন। গ্রামের কারো ছবি তুললে তাবিজ-তাগা এগুলো যাতে দেখা যায়, এগুলোও রাখবে। তো যেদিন আমি তার ছবি তুলতে গেলাম ওই পাইপ ছিল উনার মুখে। এবং অনেক বই ছড়ানো ছিটনো তার টেবিলটার উপরে। এই ছবিরটার মধ্যে একটু আংশিক এসছে। তাতে আমি বুঝতে পারছিলাম না যে উনি আসলে কোন বইটা পড়ছেন। প্রায় কুড়ি-পঁচিশটা বই, বিরাট টেবিলটার উপরে সাজানো এবং খোলা; বই বন্ধ না। এবং বিভিন্ন বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠা, শুরুর দিকে না। তখন বুঝতে পারলাম তিনি একই সময়ে অনেকগুলি বই পড়েন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মামুন ভাই লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম. এ. জি ওসমানীর এই ছবিটা খুবই বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
নাসির আলী মামুন: না, জেনারেল এম. এ. জি ওসমানী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ, জেনারেল এম. এ. জি ওসমানী।
নাসির আলী মামুন: মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী, উনি ১৯৭৮ সালে যখন অবসর জীবনযাপন করছিলেন, ক্যান্টনম্যান্টের বাসায় আমি অ্যাপয়েনমেন্ট করে গেলাম। গিয়ে দেখলাম যে উনি একদম ফিটফাট। প্যান্ট, স্টাইলের শার্ট, এখান দিয়ে যে একটা ইয়ে থাকে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বটমওয়ালা শার্ট।
নাসির আলী মামুন: হ্যাঁ, ওই রকম পকেট সুন্দর, মোটা একটা শার্ট পরে, খুব গম্ভীর। তাকে যখন আমি বসালাম, আমার ক্যামেরার সামনে, তখন কিন্তু উনি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করে দেননি। উল্টা আমিই কেন যেন তার ভেতরে ঢুকে গেলাম। তার ব্যক্তিত্ব, তার কঠোর ব্যক্তিত্বে আমি ঘাবড়ে গেলাম। আমার প্রথম দুইটা ছবি কেঁপে গেল। কেঁপে আউট অফ ফোকাস হয়ে গেল। তারপর তৃতীয় ছবি ওইটা। এবং তাকে বললাম যে আপনি একটু এইদিকে তাকান, জানালার দিকে। উনি এমনভাবে তাকালেন, তার যে দৃষ্টি এবং বিদ্যুতের মতো চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠল, এই সময় আমি ক্লিক করলাম যে তার এই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছবিটা ধরার জন্য।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মামুন ভাই আপনি অনেক বিখ্যাত মানুষের ছবি তুলেছেন। এবং একটু আগে সংবাদ শিরোনামে বলা হচ্ছিল যে কোনো জাতি কত বড় সেট বোঝা যায় তার বড় মানুষদের পরিবার এবং আয়োজন দেখে। সেই বড় মানুষদের পোর্ট্রেট আপনি করেছেন। এবং আপনি একটু আগে বলছিলেন….
নাসির আলী মামুন: শুধু পোট্রেট না কিন্তু, তাদের মুখচ্ছবির ইতিহাস! আপনি আমার ছবিগুলি দেখলে বুঝতে পারবেন যে তারা কারা! তারা কী রকম পরিবেশে ছিল! শুধু একটা ছবি তুলে ক্ষান্ত হইনি। অনেকের সিরিজ, তার পরিবার, তার ঘরবাড়ি, তার কাজের জায়গা— এগুলোর ছবিও আমি তুলে রেখেছি। এখানে যেমন একজনের একটা একটা করে ছবি এবং এটা খুবই সিলেক্টেড একটা এক্সিবিশন, দশ বছরের কাজ ৭২ থেকে ৮২, তারমানে দশ বছরের সব কাজ এখানে নেই। ওইখানে তো অনেকের ছবি তুলেছি, কয়েকশ, এক হাজারের উপরে। এখানে মোটামুটি একটা লিমিটেড অংশ। যাদের ছবির কোয়ালিটি ভালো, যারা খুবই বিখ্যাত শুধুমাত্র তাদের ছবিই ছবিমেলা ওরা কিউরিট করেছে, ওরা নির্বাচন করেছে।
Nasirশিমুল সালাহ্উদ্দিন: অসাধারণ! মামুন ভাই, আপনি একটু আগে যে বলছিলেন সমর্পণ করা বা তার ভেতরে তার ব্যক্তিত্বের ভেতরে ঢুকে যাওয়া— আমার খুব কম দুএকবার আপনার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার এবং আমি দেখেছি আপনার যে মিশন সেটা আপনি সব সময় যে কোন উপায়ে আপনি সেটা করার চেষ্টা করেন। এই ব্যাপারে আপনার অনুজদেরও শেখার বিষয় আছে নিশ্চিতভাবে। আপনি আসলে এই গুণাবলী কিভাবে অর্জন করছেন? বা এই বিষয়ে কী বলবেন আপনি?
নাসির আলী মামুন: আসলে আমি মনে করি যে, যখন আমি ছবি তুলতে যাই, কারো পোর্ট্রেট আমি করতে যাই তখন তার সাথে আমি যুগলবন্দী করি। সেটা কেমন? সে যদি সরোদ বাজায় আমি সেতার বাজাই। সে যদি কবিতা লেখে আমি গান লিখি সঙ্গীত লিখি তার সাথে, এবং বাহাস করি। এইভাবে আত্মিক একটা সম্পর্ক আমি গড়ে তুলি। এমন কি যার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছে তার সাথে গেলেও আমি গল্প করি। ওই যে আত্মিক সম্পর্ক। তার ভিতরে আমি ঢুকে যাই। তার চোখের ভিতরে ঢুকে যাই। তার হৃদয়ের ভিতরে ঢুকে যাই। ঢুকে তার ভিতরটা দেখি। দেখে আমি ঠিক করি যে তার কোন দিকটা কোন মুহূর্তটা আমি বন্দী করব! এইভাবে আমার বেশিরভাগ ছবি তোলা। এই যে একটা আত্মিক সম্পর্ক আমি গড়ে তুলেছি তাদের সাথে, এটা কিন্তু আমৃত্যু তাদের সাথে এই সম্পর্ক আমার। যারা জীবিত আছে তাদের সঙ্গে আছে, যারা মারা গিয়েছেন তাদের সঙ্গেও ছিল। এবং এখন তাদের পরিবারের অনেকের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। তাদের তৃতীয় জেনারেশন, তাদের নাতি-নাতনি পর্যন্ত।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অসাধারণ!
নাসির আলী মামুন: আর নতুন প্রজন্মের কথা বললেন, নতুন প্রজন্মের ওদেরকেও আমি বলি যে, আপনারা কারো পরামর্শ শুনবেন না। কিন্তু আপনাদের মধ্যে যে সৃষ্টিশীল মানুষরা আছে, তাকে বের করে আনেন। তার কথা শোনেন। তাকে ভালোবাসেন। তাহলে আপনি যা হতে চান— সঙ্গীতশিল্পী হোক, লেখক হোক, কবি হোক, বিজ্ঞানী হোক অথবা ফটোগ্রাফার হোক— আপনি তাই হতে পারবেন। সেই আপনাকে সাহায্য করবে। উস্কে দেবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মামুন ভাই, আপনি ফটোজিয়াম গড়ে তুলছেন, সেটা একটা জাদুঘর এবং আপনি বহুবার আমাদের নোবেল লরিয়েট বাংলাদেশের, ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের সাথে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করতে গেছেন। আমরা জানতে চাই যে, আপনার জাদুঘর ফটোজিয়ামের এখন কী অবস্থা?
নাসির আলী মামুন: আপনাকে সত্যি কথা বলি যে ফটোজিয়াম এটা বেশ বড়সড় একটা আয়োজন। ফটোজিয়ামে যা যা রাখা হবে, বিখ্যাত লোকদের পোর্ট্রেট, তাদের ব্যবহার করা কিছু জিনিসপত্র, তাদের লেখা পাণ্ডুলিপি ডায়রী চিঠি এবং আমার তোলা পোর্ট্রেট, তাদের হাতে আঁকা ছবি, যারা ছবি আঁকেন না তাদের দিয়েও আমি ছবি আঁকিয়েছি— এইসব জিনিসের লিমিটেড একটা অংশ এডিট করে সুন্দরভাবে রাখতে চাই। কিন্তু রাখার জন্য তো.. একটা ভবন দরকার, হাওয়ার মধ্যে তো রাখা যাবে না। এটার জন্য একটা সুন্দর আধুনিক ভবন লাগবে। সেই ভবনটাই এখন করতে পারছি না। সেই জন্য আমি বিভিন্ন জাগায় গেলে বিভিন্ন ফোরামে বলি যে, ফটোজিয়াম করতে চাই এটার জন্য যদি কোন ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসরকারি অথবা কোন ধনী উদ্যোক্তা এগিয়ে আসেন আমি স্বাগত জানাই। আমি আহবান জানাই যাতে ফটোজিয়ামের সঙ্গে, আমার এই স্বপ্নের সঙ্গে তারা যুক্ত হন। কারণ, এটা শুধু আমার একার না। এই দেশের জন্য ফটোগ্রাফি-বেইজড একটা মিউজিয়াম খুব জরুরি। যেখানে আমাদের বিখ্যাত লোকদের পোর্ট্রেট ছাড়াও নানা জিনিসপত্র থাকবে। পরবর্তী প্রজন্ম যেগুলি দেখে শিক্ষিত হবে। এবং তারা অনেক কিছু শিখতে পারবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মামুন ভাই, আমরা জানতে চাই যে এই ছবিমেলায় প্রচুর নিরীক্ষামূলক কাজ হচ্ছে। আমাদের দেশের আলোকচিত্রের যে চর্চা তাতে আসলে ছবিমেলার এই অবদানকে আপনি কিভাবে দেখেন?
নাসির আলী মামুন: আমি তো মনে করি আমাদের দেশে আলোকচিত্র যে জায়গায় আজকে এসে দাঁড়িয়েছে, এই ২০১৭ সালে, এটার পেছনে দৃক, পাঠশালা, বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট এবং আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি— তার মধ্যে গোলাম কাশেম ড্যাডি, আমানুল হক, নাইবুদ্দিন আহম্মেদ, ডক্টর নওয়াজেশ আহম্মেদ, মনজুর আলম বেগ, আনোয়ার হোসেন এবং আরো অনেকের, জীবিত, মৃত তাদের অবদান আছে। তাদের অবদানের ফসলে এবং অফকোর্স ছবিমেলার পরিচালক শহীদুল আলম— তারা যে ফটোগ্রাফিকে একটা আধুনিক প্লাটফরমে নিয়ে গিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে যে বাংলাশের ফটোগ্রাফারদের পরিচিতি— আমি তো মনে করি যে এদের অবদানকে সারা জাতি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মামুন ভাই অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, আমাদেরকে সময় দেবার জন্যে। আপনার সমস্ত স্বপগুলো পূরণ হোক। এই শুভকামনা।
নাসির আলী মামুন: ধন্যবাদ। আমি চাই যে এই বাংলাদেশে আমি যখন থাকব না এবং আজকে এই যে প্রদর্শনীর মধ্যে যেমন অনেকে প্রয়াত, এখানে মাত্র তিনজন জীবিত, আর সকলেই প্রয়াত, তারা একদিন ছিল, নইলে তাদের ছবি কিভাবে তুললাম, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল, তাদের সঙ্গে কোলাকুলি করেছি, তাদের চুল স্পর্শ করেছি, তাদের হাত স্পর্শ করেছি এবং তাদের সঙ্গে যে যুগলবন্দী করতাম আমি– আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আমার মনটা খুবই ভারাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এবং একই সঙ্গে বলব যে, আমি নিজেও একদিন থাকব না। এই যে আগামী প্রজন্ম, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং এই যে তরুণ প্রজন্ম তাদেরকে আমি বলব যে, আপনারা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের যারা বিখ্যাত লোক, বিশিষ্ট মানুষ, সৃষ্টিশীল মানুষ তাদেরকে ভালোবাসুন, তাদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। তাহলে দেখবেন যে জাতি হিসাবে আমরা সম্মানিত হব। একটা কথা তো আপনারা জানেন যে, অন্যকে সম্মান করলে নিজেরাও সম্মানিত হওয়া যায়। অন্যরা আপনাকে সম্মান করবে। এই বোধটা আপনাদের মধ্যে যাতে তৈরি হয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনেক ধন্যবাদ।

শ্রুতিলিখন সহায়তা: তরুণ গল্পকার সাব্বির জাদিদ

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন SHAFIQUL ISLAM, LONDON — মার্চ ১০, ২০১৭ @ ৭:৩৬ অপরাহ্ন

      VERY NICE ARTICLE. INTERESTING INTERVIEW. I KNOW HIM PERSONALLY. NASIR AL MAMUN VAI IS ASSET OF OUR NATION. WE ARE VERY PROUD OF HIM. MAY ALLAH GIVE HIM LONG LIFE.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নাজমুল আবেদিন — মার্চ ১০, ২০১৭ @ ১০:২৭ অপরাহ্ন

      বাহ খুব সুন্দর ভুমিকা ও সাক্ষাৎকার। অভিনন্দন মামুন এবং শিমুলকে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sazal — মার্চ ১৩, ২০১৭ @ ৯:১৯ অপরাহ্ন

      Aha unar shara lakhay chuye porse tel! Ottonto toilakto lekha.E lekha unake onek upore niye jabe.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com