মণীশ রায়ের গল্প: টিয়া

মণীশ রায় | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১২:৪৯ অপরাহ্ন

1229055-7ইলিয়াছ আজ রোমান্টিক হতে চায়।
কৈশোরে সে এক আঁতেল বন্ধুকে এর মানে জিজ্ঞাসা করেছিল।
সে রবীন্দ্রনাথের ফটিকের মতো নিঃসীম আকাশে চোখ ফেলে উত্তর দিয়েছিল,‘ওড়াওড়ি।’
কমবয়সের শব্দ তো; সঙ্গে সঙ্গে গেঁথে রইল অন্তরে।
এখনো শব্দটা কোথাও উচ্চারিত হলে হাসানের সেই স্মৃতিটা মনে পড়ে যায়। ওড়াওড়ি ওর জন্য শব্দ নয় কেবল; বন্ধু হাসানের মুখ থেকে শোনা স্মৃতিময় এক চিত্রকল্প।
আজ সে রোমান্টিক ওড়াওড়িতে নিজেকে জড়াবে; এজন্য দুমাস আগে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ছুটির দিনে ঘুরে-ঘুরে লাল পাঞ্জাবী কিনেছে। ক্রেডিট-কার্ডের ১০% সুবিধা ভাঙিয়ে কান্তার জন্যে উপহার হিসাবে পারফিউমের সেট নিয়েছে।
ইটালিয়ান জুতো কেনার শখ থাকলেও দরদামে বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্ত-জনপ্রিয় টেকসই বাটার স্যান্ডেল জোড়াই পায়ে গলাতে হয়েছে।
ব্যাংকের কর্মকর্তা সে। বছর চারেকের চাকরি জীবন; এরই মাঝে সে একটি পদোন্নতিও বাগিয়ে ফেলায় মনে মনে সে খুব গর্বিত। সম পদমর্যাদার বয়স্ক সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে প্রায়ই ওর কেন যেন হাসি পায়। কান্তার মন জয় করার মতো পদোন্নতিও ছিনিয়ে নিতে পারায় ওর মেজাজ-মর্জি নিমহাওয়ার মতো স্বাস্থ্যকর ও ফুরফুরে।
এরকম মন নিয়ে ইলিয়াছ আকদ হওয়া স্ত্রী কান্তার সঙ্গে দেখা করতে চলেছে আজ।
এজন্য এক সপ্তাহ আগেই বসের কাছ থেকে একদিনের নৈমিত্তিক ছুটির অনুমোদন পেয়েছে।

বসের মুখে তখন মিটিমিটি হাসি মেশানো কিঞ্চিৎ আস্কারার ছটা। মুখে বললেন,‘১লা ফাল্গুন। হবু শ্বশুরবাড়ি তো?’
সম্মতিসূচক সলজ্জ মাথা দোলায় ইলিয়াস। উত্তরে চেহারায় রহস্যময় নরোম হাসি ভাসিয়ে বস আস্তে করে বলেন,‘গুড।’
সারাদিনের কর্মসূচি। সকাল আটটার ভেতর পৌঁছুতে হবে ভূতের গলির শ্বশুরালয়ে। সেখানে সবার সঙ্গে নাশতা সেরে শুরু হবে ওদের নিরুদ্দেশ যাত্রা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, টিএসসি, বইমেলা এসব নিয়ে এক মহাআয়োজন। হাঁটতে গিয়ে ক্লান্ত হলে ওরা থামবে ; ফুস্কা খাবে ; হাতে আইসক্রীম নিয়ে ঘুরে বেড়াবে ; যদি রাস্তায় দিশি বড়ই মিলে তো তাও ওরা ছাড়বে না। অবশ্য , একটা বিড়ি খাওয়ার হঠাৎ শখ জাগতেই পারে ; কান্তার অনুমতি পেলে অদূরে কোনো গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সুখ-সুখ মন নিয়ে নিবিড়ভাবে সিগারেটে দু-চারটা আনাড়ি টানও দেবে সে।
কান্তা বলবে ,‘ তুমি কি? আকদ হওয়ার আগে রোদে ঘোরাঘুরি করা আমার দুচোখের বিষ ছিল। আর এখন মাথার উপরকার কড়া রোদটাই যে কি ভাল লাগছে।’
‘আর কিছু ?’ গর্বভরা হাসিমুখ ইলিয়াছের।
‘কোনোদিন বাইম মাছ খাইনি। দেখলেই ক্যামন সাপ-সাপ লাগত। তোমাদের বাসায় গিয়ে সেই বাইম মাছ খেয়ে কী যে ভাল লাগল ; মনে হতে থাকে , এদ্দিন কেন বাইম খাইনি। তোমার বেলায় হয় না এমন ?’ খলবল করে বলতে থাকবে কান্তা।
‘হয় না আবার? আমাদের বাড়ির কেউ গজার মাছের নাম পর্যন্ত নেয় না। খাওয়া তো দূরের কথা। কেমন বীভৎস-ভয়ংকর এক মাছ। তোমাদের বাসায় সেই মাছের দো-পেঁয়াজা খেয়ে আমি তো পাগল ; এমন সুস্বাদু মাছটা এদ্দিন খাইনি কেন ? বাসায় একথা বলায় সবাই আমাকে পাগল ভাবল। বল এটা কি ?’
এরকম কথা বলাবলির ভেতর ওরা ঘুরে বেড়াবে ওদের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। বইমেলায় গিয়ে বই ওল্টাবে, পরিচিত লেখকের দু-চারটা বই কিনবে আর অহেতুক হাসির গমকে চারপাশ প্রাণবন্ত করে তুলবে।
ইলিয়াছ একতোড়া ফুল কিনেছে রাতে। সেটি যত্ন করে ফ্রিজে তুলে রেখেছে। সঙ্গে নামকরা ব্রান্ডের দু-কেজি মিস্টির প্যাকেট। গোপনে দুটো বিদেশী চকোলেট বারও নিয়ে রেখেছে ; একটি কান্তার জন্যে ; আর অন্যটি শ্যালিকা রূহির।
এবাড়ির সে বড় ছেলে। মেজাজ-মর্জি খুব চড়া। কেউ আগ বাড়িয়ে ওর উপর কথা বলতে নারাজ। ও বাড়িতেও সে বড় জামাই। অথচ ওখানে নিপাট ভদ্রলোক সে; কান্তা একদিন চোখ বড় বড় করে বলল,‘ তুমি নাকি খুব মেজাজী ? হিঃ হিঃ হিঃ। নাক টিপলে দুধ বেরোয় , তার আবার মেজাজ।’ বলেই ওর নাকটা টিপে দিল।
কান্তার হাসিতে ইলিয়াছও শরিক হয়। বোকা বনতেও যে কী সুখ, আহ!
ইলিয়াছদের পারিবারিক গাড়ি একটাই ; মালিবাগের পিতৃদত্ত ফ্ল্যাটের গ্যারেজে সেটি বেশিরভাগ সময় অলস পড়ে থাকে ; কখনো সখনো কোনো বিশেষ আয়োজনে পরিবারের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে এটি ব্যবহার করেন। টয়োটা হানড্রেড স্যালুন কার। লক্কর ঝক্কর ; ওর অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী আব্বার মতো প্রায়ই বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগে। কোনো চালক নেই। ইলিয়াছই বাহনটির রক্ষাকর্তা এবং চালনার কাজটিও সে একাই করে থাকে।
আজকের দিন উপলক্ষ্যে দু সপ্তাহ আগে থেকে গাড়িটির যত্ন-আত্তি শুরু করেছে সে। গ্যারেজ-ডাক্তারের কাছে নিয়ে এর ইঞ্জিন-ব্রেক-রেডিয়েটর সব দেখিয়েছে ; ব্যবস্থাপত্র অনুসারে কাজও হয়েছে কয়েক হাজার টাকার। তারপর ধোয়ামোছা চলেছে আরো কদিন। সবশেষে, গাড়িটা কিছুক্ষণ চালানোর পর যখন বুঝেছে মাঝপথে মুখ থুবড়ে পড়ার কোনো আশংকা নেই তখন সে সেটি ধুলাবালির হাত থেকে রক্ষা করতে ঢেকেঢুকে নিজেদের কেনা গ্যারেজে মড়া লাশ বানিয়ে শুইয়ে রেখেছে ।
অন্যদিন উড়ু–উড়ু– থাকে মন, আজ সে ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে ধীর-শান্ত ও পবিত্র মন নিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করল। ওদের ফ্ল্যাটের চারপাশে কোনো বকুলতলা নেই ; তবু যে কোত্থেকে বকুলের সুগন্ধ নাকে আসতে থাকে, বলা দায়।
সকাল-সকাল গোসলখানায় যাওয়ার আগে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছোটোবোন লিথিকে ফ্রিজ থেকে ফুল-মিষ্টিগুলো নিয়ে খাওয়ার টেবিলের উপর রাখার নির্দেশ দিল। একইসঙ্গে ছোটোভাই বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া আরমানের হাতে গাড়ির চাবি ধরিয়ে দিয়ে আদেশ দিল গ্যারেজে গিয়ে গাড়ির ঢাকনি খুলে যেন সেগুলো সুন্দরভাবে রেখে দিয়ে আসে।
এফাঁকে সে ঢুকল নিজের রুমে। নতুন কেনা পাঞ্জাবী-পাজামা আর জুতো পরে শরীরে পারফিউম ছড়িয়ে আয়নায় মুখ রাখতেই মোবাইলটা বেজে উঠল,‘এ্যাই ? তুমি কি সাজুগুজু করছ?’
‘টের পেলে কি করে?’ বিস্ময়ভরা জিজ্ঞাসা।
‘পাই।’ সফটওয়্যার কোম্পানীর চাকুরিজীবী কান্তার গলা এসময় বালিকা হয়ে যায়। অনেক্ষণ ওপাশে নীরব থেকে সে মোবাইলটা একসময় অফ করে দেয়, হয়তো লজ্জায়।
ইলিয়াছ গুনগুন করে উঠল,‘তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আস নি…কাল ভালবাস নি..’ চলে বেশ কিছুক্ষণ।
একুট বাদে আম্মা ওর কাছ থেকে এ অভিযাত্রার স্থায়িত্বকাল জেনে নেন।
বাইরে পা দেয়ার আগে সদ্য অবসর নেয়া অসুস্থ আব্বা সঙ্গে বেশি করে টাকা নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
ইলিয়াছ মানিব্যাগে চারহাজার আর প্যান্টের চোরাপকেটে বাকি ছয় হাজার রেখে দিয়ে আব্বাকে জানাল,‘ চিন্তা করবেন না। সঙ্গে ক্রেডিটকার্ড তো আছেই। ’
এই বলে সে বেরিয়ে পড়ল।
প্রথম স্টার্টেই গাড়িটা ওর কথা শুনল। কোনোরকম দুষ্টুমিতে না জড়িয়ে একেবারে নতুন কেনা গাড়ির মতো ভদ্র আচরণ করায় ইলিয়াছ গাড়ির বদলে নিজের উপর বেজায় খুশি হয়ে গেল।
সে যাবে মালিবাগ থেকে ভূতের গলি। কিন্তু সাতসকালেই বস্ত্রবালিকাদের বড় বড় এক-একটি দল ওর গাড়ির সামনে দিয়ে জননেত্রীর মতো হাত দেখিয়ে চলে যেতে থাকে ; ওদের পরনেও হলুদ শাড়ি-কামিজ। মুখে ফুল্ল হাসির ছটা। বিভিন্ন গলি থেকে ছেলে-মেয়েরা এমনভাবে বেরুচ্ছে যে ইলিয়াছের মনে হল অনেকগুলো পেঁয়াজের বস্তার মুখ খুলে দিয়ে মজা লুটছে কেউ। এরই ভেতর চলতে গিয়ে দুবার গাড়িটার হেঁচকি ওঠে ; শুকিয়ে বুক একেবারে মরুভূমি। এরকম খানা-খন্দময় জন ও যান¯্রােতের ভেতর হানড্রেড টেন যদি থেমে যায় তাহলে ওর কী হবে– ভাবতেই একরাশ ভয় ও শঙ্কায় কান্তার টেলিফোনটা পর্যন্ত ধরতে পারে না সে। সীটের উপর মোবাইল বাজছে আর সে ঘামছে ফাগুনদিনে।
তবে বাহনটি ওর সঙ্গে রঙ্গ-রসিকতা করলেও শেষ পর্যন্ত নিরাপদেই ভূতের গলির শ্বশুরবাড়ি ওকে পৌঁছে দেয়। এখন একে সময় দিতে হবে ঠান্ডা হবার ; নইলে সে সত্যি সত্যি রেগে গিয়ে জ্ঞান হারাবে।
ইলিয়াছ ওর শ্বশুরের বাড়িটির দিকে বারকয় তাকাল। ভদ্রলোক কলেজের অধ্যাপক ; বহু কষ্টে ঋণের আশ্রয় নিয়ে, গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে এই রং-পলেস্তারাহীন তিনতলাটি করতে পেরেছেন। নিজেরা একতলায় থেকে পুরোটাই ভাড়ায় খাটাচ্ছেন। এমন কি, উপরের চিলেকোঠাটাও পাঁচহাজারে তুলে দিয়েছেন এক নিঃসন্তান দম্পতির হাতে। তবু অভাবের প্রচ্ছন্ন দীর্ঘশ্বাস চারদেয়ালে প্রায়ই ধাক্কা খায়।
কিন্তু ইলিয়াছের কাছে এ বাড়িটি লাগে বেহেশতিখানার মতো; কান্তা বলেছে, এ বাড়ির ছাদে নাকি অনেকগুলো টিয়াপাখি এসে রোদ পোহায় শীতে ; শুনতেই নিজের মন টিয়াপাখি ; উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে যেখানটায় এসে তিষ্ঠায় সে তো এ-বাড়িটাই।
নাশতার টেবিলে গজার মাছের দোপেঁয়াজা আর পরোটা। সঙ্গে ওমলেট, ফিরনি আর চা-কফি। শাশুড়ি মুখভরা হাসি দিয়ে জানালেন,‘ বাবা, তোমার তো গজার মাছ খুব পছন্দ। চারদিন হাতিরপুলের বাজারে ধর্না দিয়েও তোমার শ্বশুর মাছ পায় নাই, কালকে তোমার আর কান্তার ভাগ্যে পেয়েছে। এখানে না। কাওরানবাজারে।’ শাশুড়ির গুণগানে শ্বশুরের দাড়িমুখে বেকুবি হাসি।
ঠিক এসময় লিথির ফোন এল বাসা থেকে,‘দাদা, প্রাতঃরাশ চলছে ? মেন্যু কিরে ?’ কন্ঠভরা উৎফুল্ল কৌতূহল।
‘গজার মাছের দো-পেঁয়াজা আর পরোটা। ’ গম্ভীর মুখে জানায় ইলিয়াছ।
‘এ্যা মা! তুই চিকা খাওয়া গজার মাছ খাইতেছিস ? আম্মা, আব্বা , ভাইজান .. শোন .. শোন দাদার কান্ড।’ চেঁচিয়ে ওঠে সে । সঙ্গে সঙ্গে ইলিয়াস ফোনটা বন্ধ করে দেয়। তারপর হয সব ভুলে পরম তৃপ্তি আর আনন্দিত চিত্তে পরোটা ছিঁড়ে দো-পেঁয়াজার ঝোলে চুবিয়ে উদর পূর্ণ করতে থাকে।
ইলিয়াছের চোখের সামনে কান্তা। হলুদ শাড়িতে ওর উজ্জ্বল শ্যামলা রং যেন বিকালের স্নিগ্ধ গোধূলি-বেলা; যত তাকাচ্ছে আশ আর মিটছে না। পাশে হাসিমুখে দাঁড়ানো শালিটাকেও মনে হচ্ছে কাকাতুয়া।
ইলিয়াছ খাচ্ছে আর সবাই ওরই দিকে তাকিয়ে রয়েছে ; নিজের সম্পর্কে উপলব্ধিটাই পাল্টে যাচ্ছে ; ওর মতো ব্যাংকের কেরানিও কি নায়ক হয় কখনো কখনো ?
গাড়ি নিয়ে বের হওয়া গেল না ; ফুয়েল লাইনে অসুবিধা হওয়ায় শ্বাসকষ্টের রোগীর মতো টানা দম নিতে পারছে না ; থেমে যাচ্ছে বারবার। অগত্যা, কান্তাদের একচিলতে গ্যারেজে বহুকষ্টে একে সেঁধিয়ে দিয়ে ওরা রিক্সায় চড়ে রওয়ানা দেয় ভার্সিটির দিকে।
মাথার উপর ফেব্রুয়ারির চড়া রোদ। এত গরম যে একটুক্ষণ থাকলেই চামড়া জ্বলতে শুরু করে।
দরদভরা গলায় ইলিয়াছ শুধায়,‘ একটা ছাতা থাকলে ভাল হত খুব। তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, না ?’
‘এ রোদটাকে আমি এখন খুব ভালোবাসি। কারণ, এটা আমার সঙ্গী ; আমার আনন্দ।’ হেসে উঠে খিলখিল করে ; হাসতে হাসতে সুখ-বিহবল নায়িকাদের মতো নিজের হাতদুটো বুকের মাঝখানে জড়ো করে স্বচ্ছ নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে একটা মুদ্রা তৈরি করে নেয় সে।
ইলিয়াছের অপলক মুগ্ধ চোখ কিছুতেই সরতে চায় না কান্তার মুখ থেকে ; বুকভরা ওর আনন্দ ও গর্ব ।
সে আদুরে আঙুল দিয়ে স্ত্রীর খোঁপায় গাদাফুলের মালাটা আরো স্থায়ী করে বসিয়ে দিতে চায়। বেড়ালের মতো আইসক্রিম কিনে তাতে আলতো করে বারবার জিহ্বা ছোঁয়ায়।
কান্তা বলে,‘একটা গান ধর। প্লিজ।’
কোনো ভণিতা না করে ইলিয়াছ গায় ,‘ শোন গো দখিন হাওয়া..’ গাওয়া শেষ হবার পর জিজ্ঞাসা করে,‘কেমন হল ?’
‘আব্বুর গান। অন্য একটা ধর। ’
‘তুমি ধর। আমি শুনি। ’ ইলিয়াছ আব্দার করে।
‘ভালবাসব, বাসব রে…’ কুনকুনে গলায় আস্তে আস্তে গাইতে থাকে কান্তা। মুখে স্মিত হাসি; ইলিয়াছের চোখেমুখে আচমকা কোনো অপরূপ সৌন্দর্য আবিষ্কারের মুগ্ধতা।
আর ঠিক এমনি সময় ছাল-বাকলহীন নেড়িকুত্তার মতো দেখতে একটা টেম্পো বাঁ-দিক থেকে এসে ওদের রিক্সাটাকে ধাক্কা মারে জোরে।
ওরা দুজন ছিটকে দুদিকে রাস্তার উপর পড়ে যায়। ওদের হাতে ধরা আইসক্রীম পিচঢালা রাস্তার উপর থেঁতলে গিয়ে সাদা-কালো রেখা তৈরি করে। ফুটপাতের অলস লোকজন নিমিষে সক্রিয় হয়ে ছুটে আসে এদিকে ; ত্রাতা যুবকদের কেউ প্রথমেই চপেটাঘাত লাগায় টেম্পোওলার গালে ; কেউ খোঁজ করে কান্তা-ইলিয়াছের রক্তের চিকন ধারা ; যাতে ওরা চীৎকার দিয়ে সমবেত সবাইকে জানাতে পারে,‘ হায় আল্লাহ ! কত রক্ত। সব শেষ , মগজ বাইর অয়া গেছে। সব শেষ।’
দেখাদেখি মুরুব্বী পুলিশও যুবক-যুবতীর রক্তের সন্ধান করে। এর উপর নির্ভর করছে ওদের ভূমিকা ও এ্যাকশনের ধরন।
কিন্তু সবাইকে হতাশ করে দিয়ে ওরা দুজন একসঙ্গে গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়। দুজনার শরীরের এখানে-সেখানে ছাল-বাকল উঠে গেছে। তবু ওরা দ্রুত কাতরাতে কাতরাতে হুজ্জোতিপূর্ণ এ-স্থান ত্যাগ করে। স্থানীয় এক ক্লিনিক থেকে চিকিৎসা নিয়ে ওরা ফিরে আসে ভূতের গলির বাড়িটায়।
দুই বাড়ির সবার উদ্বেগ-উৎকন্ঠা যখন স্তিমিত হয়ে আসে তখন ইলিয়াছ ব্যথাভরা কন্ঠে কান্তাকে জানায় ,‘আজ তোমাদের বাড়ির ছাদে ওড়াওড়ি করা টিয়াপাখির ঝাঁক দেখব। ’
‘আমিও।’ হাসার চেষ্টা করে কান্তা।
ব্যথাভরা কোঁকানোগুলো হজম করেও ওরা স্বপ্ন দেখে দুজন মিলে টিয়াপাখির ঝাঁক দেখছে ঢাকার ঘোলা আকাশে !

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন jahanara asma — ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৭ @ ৫:৩৩ অপরাহ্ন

      nice

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com