একুশের অপমান

আলম খোরশেদ | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৭:১৬ অপরাহ্ন

একুশ নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতার অন্ত নেই। ফেব্রুয়ারি আসতে না আসতেই দেশজুড়ে ব্যাঙ-এর ছাতার মত গজিয়ে ওঠা তথাকথিত ’ফ্যাশন হাউস’গুলোতে বাংলা বর্ণমালা উৎকীর্ণ পোশাক বিক্রির ধুম পড়ে যায়। আর সেইসব ফ্যাশনদুরস্ত ধরাচুড়ো গায়ে চাপিয়ে একুশের সাতসকালে আমরা দলবেঁধে, সংবৎসর চূড়ান্ত অবহেলার শিকার, জরাজীর্ণ শহীদ মিনারটিতে লাইন লাগিয়ে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ আর সুরে-বেসুরে দুই কলি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গেয়ে আমাদের বাংলাপ্রীতির পরাকাষ্ঠা দেখাই। অথচ বছরের বাকি তিনশ চৌষট্টি দিন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাভক্তির লেশমাত্র বহিঃপ্রকাশ দেখিনা।

আমরা শুদ্ধ করে, প্রমিত উচ্চারণে কথা বলার ব্যাপারে নিদারুণরকম উদাসীন। অথচ কথায় কথায় বিনা দরকারে ভুলে-ভরা ইংরেজি কপচাতে রীতিমত পারঙ্গম। বইপত্রে, রেডিও-টেলিভিশনে, মঞ্চে-মাইকে কোথাও বাংলা ভাষাটিকে শুদ্ধ ও সুন্দরভাবে উপস্থাপনের কোন প্রচেষ্টা নেই। অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-রেস্তোরাঁ সর্বত্র কারণে-অকারণে ইংরেজির ঢালাও ব্যবহারে আমাদের কোন লজ্জাবোধ হয় না। এমনকী পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানসমূহেও আমরা অবলীলায় বাংলা ভুলে বিজাতীয় বুলির কষ্টকর কসরতে ব্যস্ত থাকি অহর্নিশি। বিয়ের কার্ড ইংরেজিতে ছাপানো আর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে পাড়াপড়শির ঘুমের শ্রাদ্ধ করে তারস্বরে হিন্দি, ইংরেজি গান বাজানোটা যেন আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশই হয়ে উঠেছে ইদানিং। আমরা খেয়ে না খেয়ে আমাদের পুত্রকন্যাদের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়াতে যারপরনাই উৎসাহী। এই কর্মে আমাদের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এবং বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির তথাকথিত ধারকবাহকদেরও উৎসাহে কোন কমতি দেখি না। ভিনদেশি পোশাক-আশাক, খাদ্যাখাদ্য আর সংস্কৃতির বেনোজলে গা ভাসিয়ে দিয়ে পরম তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে বাধে না আমাদের বিবেকে। আমাদের চিত্রশিল্পীরাও বুঝি তাঁদের শিল্পকর্মের নামগুলো ইংরেজিতে রাখতে পারলেই বর্তে যান। নগরসংস্কৃতির নতুন অনুষঙ্গ এফ এম রেডিওর জকি-সম্প্রদায় আর ’টিভি প্রেজেন্টার’ প্রজাতির সদস্যরাও বিকৃত উচ্চারণের এক অদ্ভূতুড়ে খিচুড়ি-বাংলা বলার মহোৎসবে মত্ত, কল্পিত এক ‘স্মার্টনেস’ জাহিরের প্রাণান্ত প্রতিযোগিতায়।

এদিকে ফেব্রুয়ারি এলে আরেক উন্মাদনা শুরু হয় বইমেলাকে কেন্দ্র করে। বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসাহীন এবং ন্যূনতম ভাষিক দক্ষতাবিহীন স্বঘোষিত লেখককুল তখন নিজেদের গাঁটের পয়সা খরচ করে মুড়িমুড়কির মত বই প্রকাশের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামেন। আর তাঁদের এই লেখক-যশোপ্রার্থনা আর কবিখ্যাতির জন্য কাঙালিপনার সুযোগ নিয়ে নীতিনৈতিকতা বিবর্জিত কিছু অসাধু প্রকাশকও ফোকরে টুপাইস কামিয়ে নিতে তৎপর হয়ে ওঠেন তখন। অমর একুশে বইমেলায় হুজুগে দর্শনার্থীদের ভিড়ে পা ফেলাটাই রীতিমত দায় হয়ে ওঠে অথচ বই বিক্রির অবস্থাটা বরাবরই নিতান্ত করুণ ও শোচনীয়। হাতেগোনা কিছু বাজারি লেখকের চটুল ও চটকদার বই কেনার জন্য তরলমতি পাঠকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়লেও সত্যিকারের সাহিত্যমানসম্পন্ন একটি ভালো বইএর পাঁচশো কপি বিক্রি হতে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় লেগে যায় এই সতেরো কোটি মানুষের দেশে, এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে!

তাই বলি, একুশ নিয়ে এত লোকদেখানো হৈচৈ আর হুজুগেপনায় একুশকে এবং একুশের সেই নির্ভীক, বীরোচিত ভাষা শহীদদের অপমানই করা হয় শুধু, যাঁদের আত্মত্যাগে আজ আমরা স্বাধীন একটি দেশের নাগরিক, বাংলা ভাষা বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ভাষার আসনে অধিষ্ঠিত এবং খোদ একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি আজ ’আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও সমাদৃত। একুশকে তাই স্রেফে একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় আটকে না রেখে তাঁর অন্তর্নিহিত চেতনাটুকুকে ধারণ করতে হবে আমাদের বোধে ও মননে, তাকে লালন করতে হবে আমাদের প্রতিটি প্রাত্যহিক পদক্ষেপে; বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে দিতে হবে তাঁর যথাযোগ্য মর্যাদা ও অবস্থান। আমাদের অস্তিত্বের স্মারক একুশকে তার এই অন্তহীন অপমানের হাত থেকে বাঁচাতেই হবে যে-কোন মূল্যে।
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Farooque Chowdhury — ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৭ @ ৮:২৫ অপরাহ্ন

      খুব ভালো লেখা। সালাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন akm fazlul bari — ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৭ @ ৭:২৮ পূর্বাহ্ন

      Irony of our language movement day is that it is called 21 February. Though our 4 brothers died for demanding State Language of Pakistan as Bangla, our wise leaders chose to called it as ’21 February’ or Ekushey February, and English month and day instead of it should have been called as 8 Falgun day as it was Bengali calendar day when our 4 brothers were shoot dead by the Pakistani government.
      One hand we want Bengali our mother language to established on the other hand we labeled our mother day celebration as ‘Ekushey February’. Why should not we say ‘Aat-e Falgun’ which validates our love for language.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com