সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: ট্রাম্পের জামানায় অরওয়েলের পুনরুত্থান

মুহিত হাসান | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৮:৪৪ অপরাহ্ন

trump_orwell-620x412এই বছরের জানুয়ারি মাসে ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চেয়ারে অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বসতে চলেছিলেন, তখন গোটা দুনিয়ার মানুষই উদগ্রীব হয়ে নানান বিদঘুটে ও ভয়ানক কাণ্ডকারখানা ঘটবার শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। যথারীতি সেই শঙ্কা ভুল প্রমাণিত হয়নি। যেসব উদ্ভট অনুমান বা ভয়ানক গুজব বিতর্কিত ট্রাম্পকে ঘিরে বয়ে চলেছিল, সেসবের অনেকগুলোই তিনি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বাস্তবে পরিণত করেছেন।

তবে একটি অনুমান সম্ভবত কেউই করেননি, তা হলো ট্রাম্পের কারণে চৌষট্টি বছর পূর্বে প্রকাশিত ইংরেজ লেখক জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ বা নাইন্টিন এইট্টি ফোর উপন্যাসটির বিক্রি হঠাৎই হুড়মুড়িয়ে বৃদ্ধি পাবে। অরওয়েলের এই সুবিখ্যাত চিরায়ত ডিসটোপিয়ান উপন্যাসে একটি সর্বগ্রাসী স্বৈরাচারী দেশের আখ্যান বর্ণিত হয়েছিল, যেখানে কিনা সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় ‘বিগ ব্রাদার’-এর দ্বারা আর সর্বত্রই ঝুলছে সাবধানবাণী সম্বলিত পোস্টার ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ’। ফলত বাকস্বাধীনতা সেখানে বিসর্জিত ও আপত্তিকর এক বস্তু হিসেবে গণ্য হয়। উপন্যাসটিতে বর্ণিত ওই পরিস্থিতির সাথে ট্রাম্পের ‘স্বপ্নের’(!) কর্তৃত্বপরায়ণ, বৈষম্যবাদী ও নজরদারিময় মার্কিন মুলুকের যে খুব মিল রয়েছে, সে তো বলাই বাহুল্য।

ফেব্রুয়ারির বারো তারিখে এসে দেখা যাচ্ছে, ১৯৮৪ এখনও আমাজন ডট কমের ‘বুক সেকশন’-এর বেস্টসেলার তালিকার তিন নম্বর স্থানে আসীন। মাঝে কার্যত এক নম্বরেই উঠে এসেছিল। এর প্রকাশক ‘পেঙ্গুইন ইউএসএ’-র প্রচার-প্রচারণা সংক্রান্ত পরিচালক ক্রেইগ ব্রুক জানিয়েছেন, তাঁরা এই সময়সীমার মধ্যেই বইটির প্রচুর অর্ডার পেয়েছেন। দ্রুততম সময়ে নতুন করে পঁচাত্তর হাজার কপি ছাপতেও দিয়েছেন। তাও বইটি শীঘ্রই ফের পুনর্মুদ্রণ করতে হতে পারে, এমনটা হওয়াও অসম্ভব নয়।

তিনি আরো বলেন, বইটির বিক্রি হঠাৎই চড়চড় করে বেড়ে গিয়েছে। এবং সেই বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় প্রায় নয় হাজার পাঁচশ শতাংশ বেশি। বাজারে আচমকা তৈরি হওয়া চাহিদা মেটাতে তাঁদের হিমশিমই খেতে হচ্ছে। বইটি পুনর্বার প্রবল বিক্রমে বেস্টসেলার ও আলোচিত হওয়ায় তাঁদের আনন্দ ও পরিশ্রম দুই-ই তাই ক্রমবর্ধমান।

1984ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণের সাথেই কেবল উপন্যাসটিতে বর্ণিত ঘটনাবলি মিলছে তা নয়, তাঁর মিডিয়া উপদেষ্টা কেল্যান কনওয়েও নাকি কথা বলেছেন ওই একই সুরে। তাঁর একটি টিভি সাক্ষাৎকার ও তৎপরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টি উঠে এসেছে। শ্রীমতি কনওয়ে এনবিসি নিউজে প্রচারিত উক্ত সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউজের বর্তমান প্রেসসচিব শেন স্পাইসারের একটি ভুল তথ্য দেওয়ার বিষয়টি রীতিমতো উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, স্পাইসার ‘বিকল্প সত্য’-টা জানিয়েছেন মাত্র। তো সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হবার পর এই হাস্যকর বক্তব্যের সাথে ১৯৮৪-এ উল্লেখিত স্বৈরাচারী শাসনযন্ত্রের ‘সত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের’ প্রচারিত বিবিধ ভ্রান্ত-মিথ্যা বুলির মিল খুঁজে পান সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা। এই সাদৃশ্য নিয়ে তখন শুরু হয় তুমুল আলোচনা। ফলে আগুনে ঘি পড়ার মতো বইটির বিক্রি আরেক দফা বেড়ে যায়।

শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, অন্য কয়েকটি দেশেও ১৯৮৪-এর বিক্রি বেড়েছে বলে জানা গেছে। এমনিতে ইংরেজিভাষী দেশগুলোতে বইটি বছরে এক লাখ কপির বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। এবারে যুক্তরাজ্যে বইটির বিক্রি কুড়ি শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতেও বিক্রি বেড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গণগ্রন্থাগার থেকেও বইটি আগের তুলনায় অনেক বেশি পাঠক তুলছেন বলে খবর মিলেছে। সান ফ্রান্সিসকো পাবলিক লাইব্রেরিতে বইটির মোট ১৫৯টি মুদ্রিত কপি থাকলেও জানুয়ারির শেষে দেখা গেছে, এর মধ্যে ১৩৩টি কপিই কেউ না কেউ পড়ার জন্য নিয়েছেন, মাত্র ২৬টি পড়ে রয়েছে।

১৯৮৪ নিয়ে অন্য শিল্পমাধ্যমেও কাজ হচ্ছে । নিউইয়র্কের ব্রডওয়েতে উপন্যাসটি অবলম্বনে একটি নাটকও মঞ্চস্থ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সোনিয়া ফ্রিডম্যান ও স্কট রুবিন প্রযোজিত ১৯৮৪-এর এই অনুসৃজিত নাট্যরূপটি আগে অবশ্য লন্ডনে মঞ্চায়িত হয়েছিল। ব্রডওয়েতে প্রথমবারের মতো এটি দেখার সুযোগ মিলবে আগামী ২ জুন তারিখে, সেখানকার হডসন থিয়েটারে।

উল্লেখ্য, ট্রাম্পের উত্থানের পর ১৯৮৪ ছাড়াও আরো কয়েকটি সুবিখ্যাত ডিসটোপিয়ান উপন্যাসের দিকেও নতুন করে পাঠকের নজর পড়েছে। বিশেষত অলডাস হাক্সলির ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড ও রে ব্র্যাডবেরির ফারেনহাইট ৪৫১ উপন্যাসের বাজার ফের চড়েছে।

প্রতিবাদের পথে বইবিপণীও

১৯৮৪ বইটি নিয়ে একটি ভিন্নরকমের মজার কাণ্ডও ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো অঙ্গরাজ্যে। আর সেইসূত্রে উঠে এসেছে একটি বইবিপণীর ভিন্নরকম প্রতিবাদের চিত্রও। গত তিন ফেব্রুয়ারি রাতে সেখানকার হিপ্পি-অধ্যুষিত জেলা Haight-Ashbury-র একটি বিখ্যাত বইয়ের দোকান ‘বুকস্মিথ’-এ এসে ওই এলাকাতেই থাকেন এমন এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তি বইটির পঞ্চাশটি কপি কিনবার পর জানান, বইবিপণীর মালিক যেন তাঁর খরিদকৃত ওই পঞ্চাশ কপি বই বিনামূল্যে পঞ্চাশজন পাঠকের কাছে বিলিয়ে দেন। এ হয়তো কোনো পাঁড় ট্রাম্প-বিরোধী পাঠকেরই কাণ্ড! ‘বুকস্মিথ’ কর্তৃপক্ষও ওই আবেদনে সাড়া দিতে সময় নেননি। তো সেই অর্ধশত বই তাঁরা একটি টেবিলে সাজিয়ে রেখে তার ওপর একটি ঘোষণাপত্রও রেখে দেন, যাতে লেখা ছিল : “পড়ে ফেলুন! ঘুরে লড়ুন! একজন রহস্যময় দাতা আপনার জন্যই ১৯৮৪-এর এই কপিগুলো কিনে রেখে গেছেন, যদি তা আপনার প্রয়োজন হয়।”

MargaretAtwoodএরপর ওই একই ব্যক্তি মার্গারেট অ্যাটউডের উপন্যাস দি হ্যান্ডমেইডস টেল ও এরিক লারসনের গবেষণাগ্রন্থ ইন দি গার্ডেন অফ বিস্টস (হিটলারের জার্মানিতে এক মার্কিন পরিবারের অভিজ্ঞতা বিষয়ে লেখা)– এই দুটি বইও ক্রয় করেন পঞ্চাশ কপি করে, এবং ‘বুকস্মিথ’কে ফের বই বিলির নির্দেশনা দিয়ে যান। ‘বুকস্মিথ’-এর মালিক ক্রিস্টিন ইভান্স জানান, ওই বইগুলো অতি দ্রুতই ফুরিয়ে গিয়েছিল। ক্রিস্টিন আরো জানান, তাঁরা নিজেরাও এখন একশ কপি ১৯৮৪ বিনামূল্যে বিলি করবেন। কেননা বিষয়টিকে ফলপ্রসূ প্রতিবাদ ও সারবান প্রতিরোধ হিসেবেই তিনি দেখছেন। বর্তমান অসহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বইয়ের দোকানগুলো এইভাবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম বলেও ধারণা তাঁর, কারণ “বইবিপণীগুলো লিখিত শব্দের শক্তিতে বিশ্বাস করে, সেইসব শব্দেরা জানায়, শেখায়, বোঝায় আর অনুপ্রাণিত করে।”


বিশ্ব পরিস্থিতি ও নিজের ডিসটোপিয়ান উপন্যাস প্রসঙ্গে মার্গারেট অ্যাটউড

কানাডিয় কথাসাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউডের ডিসটোপিয়ান উপন্যাস দি হ্যান্ডমেইডস টেল-ও ট্রাম্পের আমলে নতুন করে বেস্টসেলারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এটি রয়েছে আমাজন ডট কমের বেস্টসেলার তালিকার দশ নম্বর স্থানে। ওই উপন্যাসে তিনি এমন এক অমানবিক আমেরিকার চিত্র অঙ্কন করেছেন, যেখানে কিনা নারীরা কেবল সন্তানের দেখাশোনা করেই জীবন পার করতে বাধ্য– শাসকশ্রেণী এমন কঠোর ও অমানবিক নির্দেশনা দিয়ে থাকে। অ্যাটউড নিজেও মনে করেন, ট্রাম্পের জয়লাভ ও ক্ষমতার গদিতে বসার কারণে নতুন করে মার্কিনি নারীদের অধিকার নিয়ে শঙ্কা-সংশয়ের ধুম্রজাল তৈরি হয়েছে, আর সেজন্যই বইটিও পুনরায় পাঠকের মধ্যে আগ্রহের সঞ্চার ঘটিয়েছে। সম্প্রতি কিউবা আন্তর্জাতিক বইমেলায় অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। হালে ফের আলোচিত ওই উপন্যাসটির বিষয়ে তিনি সেখানে আরো বলেন : “আদতে, এটা লেখার সময় আমি যথেষ্ট যত্নবান ছিলাম এখানে যেন এমন কিছু না এসে পড়ে যা এর আগে মানবসভ্যতায় কেউ কখনও কোনোখানে করেনি।”

গর্ভপাত বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতিবাচক কথাবার্তার সাথে সতেরো শতকের ‘নিউ ইংল্যান্ড’ এলাকার(কানেক্টিকাট, নিউ হ্যাম্পশায়ারসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য সতেরো শতকে একটি কনফেডারশনে একত্রিত হওয়ার পর তাদের এই নামে আখ্যায়িত করা হতো) ‘পিউরিটান’ মানসিকতার মিল আছে বলে অ্যাটউড মন্তব্য করেন। বস্তুত, ওই সময় ও এলাকার সম্পর্কে পড়াশোনা করতে গিয়েই দি হ্যান্ডমেইডস টেল উপন্যাসটি লিখবার প্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন। “এ তো সতেরো শতকের নিউ ইংল্যান্ডের পিউরিটান মূল্যবোধে ফিরে যাওয়া, যেখানে কিনা নারীরা সমাজব্যবস্থায় অত্যন্ত খারাপ দশায় ছিল”– ট্রাম্পের কাণ্ডকারখানা সম্পর্কে অ্যাটউড এমনই প্রচন্ড তিক্ত মনোভাব পোষণ করেছেন। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মীদের তিনি কিছু জরুরি সতর্কবাণীও শুনিয়েছেন : “আমরা ভাবি প্রগতি সর্বদা সোজাসাপটা উর্ধ্বগামী হবে, কিন্তু ওরকমভাবে তা কখনোই হয়নি, আপনি ভাবতে পারেন যে একটা উদার গণতান্ত্রিক দেশেই আছেন, কিন্তু দেখলেন, ধপাশ করে আপনি এসে পড়েছেন হিটলারের জার্মানিতে। এমনটা খুব অতর্কিতেই ঘটতে পারে।”

সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, ভ্যানিটি ফেয়ার, সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকল

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com