মাহী ফ্লোরার গল্প: ঝোঁক

মাহী ফ্লোরা | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৪:০৬ অপরাহ্ন

কল ছাড়ার শব্দ পেতেই দেবব্রত চঞ্চল হয়ে ওঠে। হাতের পত্রিকাটা আস্তে করে নামিয়ে রাখে পাশে। সাড়ে সাতটা বাজতে ঠিক পাঁচ মিনিট বাকি। মিনতি এ সময় খুব দ্রুত হাতে সকালের নাস্তার জন্য লুচির আটা মাখে। তার শাখা নোয়ার সাথে পিতলের বাসনে ঠোকার আওয়াজ বড্ড মধুর লাগে। স্টোভের শোঁ শোঁ শব্দ প্রেসার কুকারের সিঁটি সব ছাপিয়েও কল ছাড়ার শব্দটা দেবব্রতকে টানে। পা টিপে টিপে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায় সে। বাম দিকে তাকালে মিনতির উবু হয়ে বসে থাকা নজরে আসে। বুবুন হবার পর মিনতির পিঠে ব্লাউজের ভেতর থেকে যেন বেরিয়ে আসতে চায় বাড়াবাড়ি রকমের মাংসল ভাঁজ। খোলা পিঠে ছড়িয়ে থাকা চুলের ভেতর দেবব্রত মনটাকে আটকে ফেলতে পারতো হয়ত। কিন্তু এ সময়টা ঠিক এ সময়টাতে তার আনচান লাগে।

paintings-16-728ডান দিকে কলতলার একটা অংশ ঘিরে চান করার ব্যাবস্থা। টিনের খাটো দরজা ছাদ খোলা। দরজার উপর দিয়ে সাদা ছোট পাড়ের শাড়ি আর বাদাম রং এর একটা ছায়া ঝুলছে। দরজার নিচ দিয়ে একজোড়া ধবধবে সাদা পা তাকে টানতে থাকে। দেবব্রত জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে।
মিনতির বাবা মারা গেলেন গত পৌষ মাসে। মা তার পর থেকেই এ বাড়িতে আছে। শ্বশুরের একটাই মেয়ে হওয়ায় সব কিছু দেবব্রতকেই দেখাশোনা করতে হত। গ্রামের ছোট্ট বাড়ি আর অল্প কিছু জায়গা জমি সব বেঁচে দিয়ে দেবব্রতই নিয়ে এসেছেন তাঁকে। এখানে একটা কোনো রকম মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়ে গেছে ওই টাকায়। জায়গাটায় একটু মফস্বল মফস্বল ভাব আছে, তবু মন্দ না।

শাড়িটা দরজার উপর থেকে টেনে নেয়ার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে দেবু। কেমন একটা অপরাধবোধও কাজ করে তার ভেতরে। অথচ কিছুতেই সে নিজের চোখটাকে বশে আনতে পারেনা। সকাল হলেই তার কান যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত মনোযোগী হয়ে পড়ে। কল ছাড়ার ছড়ছড় শব্দটা মাথায় ঘুরতে থাকে। আহ ভগবান, এত পাপ কি সইবে!

ফিরে এসে ছোট টুলটায় বসে আবার কাগজটা হাতে নেয় সে।
মিনতি ভাত নামাতে নামাতে বলে ওগো এই রবিবারে একবার সাথে নিয়ে যেওতো আমাকে। বুবুনের জন্য মানসা ছিল। পূজোটা দিয়ে আসবো।
ঘর থেকে বুবুনের কান্নার শব্দ এলে মিনতি আবার চেঁচিয়ে ওঠে, ওগো একটু দেখোনা? তোমার খাবারটা না নামালে সাথে নিতে পারবেনা তো।
মিনতি একটু জোরেই বলে, মা হলো তোমার?
ভেজা কাপড়টা রোদে ঝেড়ে শুকাতে দিতে গিয়ে হাতের নাগালে তারটাকে পেতে পায়ের গোড়ালী উঁচু করেন মা। দেবু চোখ ফিরিয়ে নেয়।

বুবুনের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তের মাস বয়সি বুবুন বাবা বলে হাত বাড়ায়। মশারীর ভেতর ঢুকতে ঢুকতে দেবুর মুখ হাসিতে ভরে যায়। মা মা কুটুমুটুসোনামাটা আমাল ঘুম ভেঙেতে! ভেঙেতে আপনাল! এমন অনেক অর্থহীন শব্দে সারা ঘরের ভেতর উড়তে থাকে নানা বয়সী প্রজাপতি। মন ভরে যায় দেবুর।

সামান্য ছা পোষা কেরানী বলতে যা বোঝায় দেবু তাই। আটটা বাজতেই তাকে বেরিয়ে গিয়ে হেঁটে স্টেশনে যেতে হয়। সাড়ে আটটার ট্রেন না ধরতে পারলে অফিসে সময় মত পৌঁছাতে পারবেনা। দুপুরের ভাত টিফিন বাটিতে থাকে। রোজকার এই রুটিনে দেবু অভ্যস্ত।
বেরিয়ে যাবার আগে মিনতিকে মনে করিয়ে দিয়ে যায় সে, আজ কিন্তু নাইট শো মনে রেখো।
মিনতি মুখ টিপে হাসে।

অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে বড্ড দেরি হয়ে যায় আজ। বস বিরক্ত ছিল। একটা ফাইল দুবার দেখিয়ে নেবার পরও দেবু নির্ভুল করতে পারেনি। সেটা ঠিক করতেই যত গন্ডগোল।
কি দেবুদা বেরোবে না? কলিগরা সব একে একে বেরিয়ে যাচ্ছে। তুমি এগোও আমি হাতের কাজটা শেষ করেই বেরোবো।
দেবু বারবার হাতের কম দামি ঘড়িটার দিকে তাকায়।
বেশ কিছুদিন ধরে সামনের টেবিলে বসা সুন্দরী কলিগ কেমন কেমন করে যেন চায়। দেবুর দিকে কি বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছে মেয়েটা! আজ বেশ কয়েকবার কাজের অজুহাতে বড্ড কাছে আসছিলো। কেমন মাথা ঘুরানো গন্ধ মেয়েটার গায়ে। দেবু মনে মনে হাসে।
অফিস থেকে বেরিয়ে রিকশার জন্য একটু দাঁড়াতে হয় দেবুকে। হেঁটে গেলে আজ আর ট্রেন ধরতে পারবেনা। হোক, যা হোক বেহিসেবি খরচ তো আর রোজ করেনা দেবু।
মামা যাবেন?
উল্টো দিকে চোখ যায় দেবুর। রিকশায় উঠতে উঠতে তার চোখ সরেনা। মাঝবয়সী এক মহিলা রিকশায় উঠছে। উঠতে গিয়ে পায়ের কাপড় বেশ খানিকটা সরে গেছে। শ্যামলা পায়ে কালো লোম বেরিয়ে পড়ছে। খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে দেবু।
কত রকমের পা চারিদিকে! মনে হয় চোখ বন্ধ করলেই হয়ত ফস্কে যাবে এক জোড়া পা।
স্যারের সুন্দরী পিএর পা মনে পড়ে; কি তেলতেলে আর মসৃণ। মনে হয় মোমের মত এক্ষুনি গলে যাবে বুঝি। নাহ পেস্ট্রির মত। হ্যাঁ, ঠিক পেস্ট্রির মত মুখে দিলেই গলতে শুরু করবে।
দাদা একটু জোরে টানুন না। বড্ড দেরী হয়ে গেছে। ট্রেনটা ছেড়ে দেয় কিনা কে জানে। বগলে অফিসের চারকোনা ব্যাগটা চেপে ধরে কপালের ঘাম মোছে দেবু। ডান হাতে ধরা আছে দু বাটির টিফিন কেরিয়ারটা। আজকাল খাবার গরম রাখে এমন বাটিও পাওয়া যায়। দেবুর ইচ্ছে করে সেরকম একটা বাটি কিনতে। কত দাম কে জানে।
কি ভ্যাপসা গরম বাবা!

সময়ের আগে পৌঁছে গিয়ে খুশিতে দেবু রিকশাওয়ালাকে দুটো টাকা বখশিশ দিয়ে ফেলে আজ।

এবার বর্ষা আগে আগেই নেমেছে, কি বল? মিনতি রাস্তার জমা জল থেকে বাঁচতে শাড়িটা বাম হাতে একটু উঠায়। তারপর বিরক্ত হয়ে বলে আজকাল আবহাওয়ার ছিরি দেখেছো? কথা নেই বার্তা নেই হুট বলতে জল। বেরুবার সময়ও তো মেঘ ছিলনা বলো? ধুস, নতুন চটিটা! ল্যাম্পোস্টের আলোয় মিনতির পা জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে দেবব্রত। কেমন নেশার মত টানতে থাকে মিনতির পা দুটো! আহ মিনতি এবার কিন্তু তোমার পা দুটো রূপো দিয়ে বাঁধিয়ে দেব। আচ্ছা নুপুরটা পরোনি কেন?
মিনতি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। যাহ বাবা পা বাধিয়ে দিলে চলব কি করে বলোতো?
এই খুব দেরি হয়ে গেছে নাগো। বুবুনটা বোধ হয় মাকে খুব জালাবে তাইনা?
হু…
কি হলো? কি ভাবছো শুনি?
না, কিছুনা। এই শোনো সিনেমাটা বেশ ছিল তাইনা?
সিনেমাটা বেশ না ছাই, বলো নায়িকাটা সুন্দর। মিটিমিটি হাসে মিনতি।
দেবুও হেসে ফেলে। তা যা বলেছো বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে যখন চিঠি লিখছিলো উফফ পা জোড়া যা লাগছিল না!
এই খবরদার! চোখ পাকায় মিনতি।

বাড়ি ফিরে মার হাতে খাবারের প্যাকেটটা দিয়ে দেবু বলে মা খেয়ে নিনতো। আমরা খেয়ে এসেছি। রাত অনেক হয়েছে। বুবুন খেয়ে ঘুমিয়েছে তো? খুব কি কান্নাকাটি করছিল?
এসব কথা বলার সময় দেবু মায়ের চোখের দিকে তাকাতে পারেনা। ভীষণ লজ্জা লাগে। শাদা খোলের শাড়ি ভেদ করে তার চোখ এক জোড়া ধবধবে শাদা পা দেখে। চোখ বন্ধ করলে মনে হয় ঝপ করে কেউ দ্রুত হাতে দোকানের ঝাঁপ ফেলছে বুঝি। হরতাল টরতালে যেমন হয় আর কি!
দেবুর বুকের মধ্যে একজোড়া পায়ের নেশা কবুতরের মত ছটফট করতে থাকে। কলঘর থেকে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে ঢোকে দেবু। মিনতির চোখেও আজকাল চোখ রাখতে পারেনা সে। খুব অপরাধবোধ কাজ করে মাঝেমাঝে।

ঘরে ঢুকে বুবুনের ঘুমন্ত মুখটা দেখে কি যে মায়া লাগে দেবুর। নিজের সন্তানের কাছে এসে সব সুন্দর লাগে। নিষিদ্ধ পাগুলো সব হারিয়ে যায় চোখ থেকে।
ছোট্ট ছোট্ট দুটো চাঁপা ফুলের মত পা নিয়ে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে বুবুনটা। ঘুমুনোর সময় দেবু বুকের কাছে পা দুটোকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। যেন ছাড়লেই হারিয়ে যাবে পাখির দুটি ডানা!

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৭ @ ১০:১২ অপরাহ্ন

      বাহ্। খুব সুন্দর একটা স্নিগ্ধ ভালোবাসার গল্প লিখেছেন মাহি। প্রাঞ্জল ভাষা, আবেদনময় বয়ান। প্রচুর গল্প পড়তে চাই আপনার।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com