কাইয়ুম চৌধুরী: আঙুল যার রঙের ঝর্ণাধারা

মাজহার সরকার | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১২:৫৩ অপরাহ্ন

kaium chiowdhury“এই প্রদর্শনীতে খোলা ছুরি হাতে কোন উদ্ধত খুনি যদি এসে ঢোকে, এই ছবি দেখে তার হাত থেকে ছুরি নিচে পড়ে যাবে।”
সত্তর দশকের শেষ দিকে শিল্পকলা একাডেমিতে তরুণ শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর একটা চিত্র প্রদর্শনীতে আসা প্রধান অতিথি এই কথা বলেছিলেন।
কাইয়ুম চৌধুরী। তেলরং, জলরং, রেশম ছাপ, কালি-কলম, মোমরং ইত্যাদি মাধ্যমে তিনি কাজ করেছেন। তার ছবিতে রয়েছে জ্যামিতিক প্রবণতা। আসলে নকশা। এর কারণ এই বাংলায় মানুষ ছবি আঁকতে শিখেছে নারীর কাছে। নারী যখন কাঁথা সেলাই করতেন, নানা নকশার পিঠা বানাতেন, মাটি গুলিয়ে উঠোন আর ভিটে লেপতেন- সেই হাতের টান মানবিকী মূর্ছনায় পুরুষের মনে ছবি আঁকার প্রেরণা জুগিয়েছে। গতি দিয়েছে তুলির রেখায়।
ক্যানভাসের পটভূমিতে কাইয়ুম চৌধুরীর মোটাদাগের নকশা সে কথাই বলে। তার বর্ণোজ্জ্বল রঙ মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশের ষড়ঋতুর কথা। লাল, সবুজ আর নীল এই তিনটি রঙের প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার আমাদের জাতীয়তাবাদী করতে তোলে, প্রেমিক হতে শেখায়। এই বর্ণভঙ্গী মাতৃভূমির প্রতি তার অঙ্গীকার। তিনি যেন ছবি আঁকেননি, আজন্ম বাংলাদেশকে এঁকেছেন।
তার চিত্ররীতিতে এ দেশের লোকশিল্পসুলভ পুতুল, পাখা, শীতলপাটি, কাঁথা, হাঁড়ি ইত্যাদির পৌনঃপুনিক ব্যবহার আমাদের শৈশব মনে করিয়ে দেয়।

প্রত্যেকটা শিল্পের প্রয়োজন কিছু অস্পষ্টতা, কিছুটা আড়াল। স্পষ্ট আর নগদ বোধগম্যতা শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই বলে একজন কবিকে তার বিমূর্ত কবিতার অর্থ কী এই প্রশ্ন করাই যায়, কেন নয়! একজন চিত্রশিল্পীকে জিজ্ঞেস করা যায় তার শিল্পের অর্থ কী। কিন্তু এটা শিল্পের উদ্দেশ্যকে আহত করে। শিল্পের অর্থ কেবল আত্ম-সন্ধানের মাধ্যমেই সম্ভব। কিন্তু মানুষ নিজের কাছে কখনও যেতে চায় না। এই ঘরে ওই ঘরে অন্য মানুষের কাছে অর্থ খুঁজে বেড়ায়। কাইয়ুম চৌধুরীর ছবি দেখে দর্শকের যেন নিজের সঙ্গেই দেখা হতো, যে মানুষটাকে সে বহুদিন থেকে খুঁজেছে!
কবিতা পড়বো এই ভেবে কবিতা পাওয়া যায় না। একটা ছবিও তাই, আমরা যা চোখের সামনে দেখি ততটুকুই। পুরো জিনিসটাই যখন আমার চোখের সামনে, তখন এর বাইরে তা আর কিছু নয়। কাইয়ুম চৌধুরীর ছবিতে গোটা বাংলাদেশকে পাওয়া যায়, শৈশব আর ভুলে যাওয়া স্মৃতিকে পাওয়া যায়। এমন নির্ভুল বাংলাদেশ খুব কম মানুষই ভাবতে পেরেছেন।
প্রত্যেকটা শিল্পই মূলত শিল্পী নিজে। আমরা যে এতো প্রশংসা করি, কোন শিল্পই নিজে থেকে সুন্দর নয়। আসলে জীবন সুন্দর, বাংলাদেশ সুন্দর, এমন করে ভাবতে পারা মানুষ সুন্দর। যে কথাটা আমি অনেক বলেও বুঝাতে পারি না তা বুঝানোর জন্য কবিতা, যে কথাটা আমি অনেক শব্দেও বুঝাতে পারি না তার জন্য চিত্রশিল্প। পরিচিতকে দেখে হেসে ফেলে- দাঁড়িয়ে গিয়ে- পারস্পরিক কুশল জিজ্ঞেস করে- প্রচুর কথা বলে- আলাপ করে- চা খেয়ে- মানুষ যদি সন্তুষ্ট থাকতো তাহলে শিল্পের জন্ম হতো না। প্রত্যেক মানুষ নিজের পায়ে একা ঘরে ফিরে আসে। শুধু ছড়িয়ে পড়া শিল্প নয়। অনেক দাগের ভেতর একটি দাগ, অনেক রঙের ভেতর একটা রঙ আমাদের হয়তো আক্রান্ত করে। কাইয়ুম চৌধুরীর আঙুলের রঙ ও রেখা এভাবে মুহুর্মুহু জীবনের চাষ করে। টানে, ডোবায়।
এই তো মনে হচ্ছে সেদিন! ২০১৪ এর নভেম্বরের ৩০ তারিখ সন্ধায়, ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে আমরা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উৎসব দেখতে গিয়েছি। বক্তৃতা দিতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যান কাইয়ুম চৌধুরী। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নেওয়া হয় কাছের ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে।
কাইয়ুম চৌধুরী বক্তৃতা দেওয়ার পর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু কাইয়ুম চৌধুরী এ সময় ডায়াসে ফিরে বলেন- ‘আমার একটি কথা বলার রয়েছে’। এরপর হাসপাতালে নেওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুর কথা জানা যায়। কী কথাটি তিনি বলতে চেয়েছিলেন, তা আর জানা যায়নি।
আনিসুজ্জমান মঞ্চে দাঁড়িয়ে বললেন, “অনুষ্ঠান চলবে, যেমন করে জীবন বয়ে চলে”।
জহির রায়হানের শেষ বিকেলের মেয়ে বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকে প্রচ্ছদশিল্পে নতুন যুগের শুরু করেছিলেন শিল্পী। শিল্পমানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি একবার বলেছিলেন, “মানুষ শুধু পড়ে না, বই দেখেও।”
ছোটবেলা থেকে আমরা এই প্রজন্ম শুধু নিজের চোখ দিয়ে বাংলাদেশ দেখেনি, কাইয়ুম চৌধুরীর ছবি দেখেও বাংলাদেশকে দেখেছি- চিনেছি। সেই শৈশবে বইয়ের মলাটে কিংবা বিকেলের ক্লান্ত পত্রিকার পাতাটা যখন সিলিং ফ্যানের বাতাসে আলতো দোল খেতো- তখনো বিছানা থেকে আধঘুম অবস্থায় দেখতাম কাইয়ুম চৌধুরীর একটি অনবদ্য ইলাস্ট্রেশন। আমাদের চেতনে- বিশ্রামে এমনি করে তিনি পাতায় পাতায় অক্ষরের পাশাপাশি কি দারুণ করে বাংলাদেশকে মূর্ত করে তুলতেন!
যাদের দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা খুলে বসে থাকার অভ্যাস আছে, কোন ছবি বা বইয়ের মলাট দেখেই তারা বলে দিতে পারবেন এটা কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা। জীবনের নানা অনুষঙ্গে আমরা এখনও তাকে খুঁজে পাই। যারা লেখালেখি করেন কিংবা বইয়ের খোঁজে শাহবাগের আজীজ মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোতে ঢুঁ দেন তারা বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে বলে দিতে পারেন এটা কাইয়ুম চৌধুরী এঁকেছেন।
কাইয়ুম চৌধুরীর ছবির মূল উপকরণ হচ্ছে তার কল্পনা। আর সে কল্পনাকে তিনি রেখা ও রঙ দিয়ে মূর্ত করেন। তার ছবি দেখে মনে হয় এটা আমারই গ্রাম, আমার গ্রামের পাশে বয়ে চলা নদী। মাঠের ঘাস, ওইতো! ওইতো! দৌড়ে যাওয়া মেঘ, নীল আকাশ। মেয়েটি ঠিক আমার গ্রামের কারও মেয়ে হবে। দর্শককে এমনটা ভাবতে দেওয়া মেধাবী মানুষের কাজ।
এখনও মনে হয়, এইতো কাইয়ুম চৌধুরীর পাঁচটি আঙ্গুল পাঁচটি বলবান ঘোড়ার মতো ক্যানভাসে দৌড়ে বেড়াচ্ছে!

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন poliar wahid — ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৭ @ ৮:০৫ অপরাহ্ন

      মাজহার সরকারের গদ্যও কবিতা রঙে ভেজানো। ভালো লাগলো বন্ধু। কাইয়ুম চৌধুরী মানেই টুকরো টুকরো স্মৃতির বারান্দায় হেটে বেড়ানো টুকটুকে বাংলাদেশ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com