মোস্তফা কামালের অগ্নিকন্যা

হারুন রশীদ | ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১:৪৮ অপরাহ্ন

border=0একজন বড় লেখকের অভীষ্ট হচ্ছে দেশ-কাল ভূগোল সংশি­ষ্ট শিল্পরীতি। বিষয় ও আঙ্গিকতো বটেই, সময় ও কালকেও মাথায় রাখতে হয়। কথাশিল্পী মোস্তফা কামাল তাঁর অগ্নিকন্যা উপন্যাসে এই লক্ষ্যকে বিবেচনায় রেখেছেন বলে মনে হয়। উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে তিনি শুধু দেশভাগের মর্মন্তুদ ইতিহাসকে আশ্রয় করেননি বরং বিশাল ক্যানভাসে আন্দোলনমুখর উত্তাল সেই সময়ের ইতিহাসের নায়ক-খলনায়কদের তুলে ধরেছেন নির্মোহ দৃষ্টিকোন থেকে। একটি দেশ বা অঞ্চলের ইতিহাসের শিরদাঁড়ার ওপর দাঁড়িয়েই সেই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য রচিত হয়। দায়িত্বশীল লেখকের জন্য এ এক ঐতিহাসিক দায়ও বটে। অগ্নিকন্যায় সেই দায়ও যেন মেটালেন লেখক।
ভাাষা-রীতি ও কুশলী উপস্থাপনার গুণেও উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে চিত্তাকর্ষক। উপন্যাসটি শুরু হয়েছে নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে–‘মতিয়ার দুই হাতে দুটি পুতুল। সে ঘরের মেঝেতে বসে বসে গভীর মনোযোগে পুতুল দুটিকে সাজায়। পতুলের ছোট্ট চুল বেণী করে। ঠোঁটে পায়ে আলতা লাগায়। মনে মনে বলে বাহ! ভারী সুন্দর হয়েছে তো দেখতে। …হঠাৎ তার কানে শ্লোগানের ধ্বনি ভেসে আসে। একেবারে গগনবিদারি শে­াগান। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ মতিয়া দৌড়ে বারান্দায় যায়। বাইরের দিকে তাকিয়ে সে দেখে, বিশাল একটি মিছিল দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ।…সবার কণ্ঠে এক আওয়াজ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’

এভাবে পাঠককে অনেকটা হাত ধরে তিনি নিয়ে যান ইতিহাসের পাদপ্রদীপের নিচে। একটি কালের সামগ্রিক পরিচয় তিনি তুলে আনেন সেই সময়ের চরিত্র, স্থান ও ঘটনার অনুপুঙ্খ বর্ণনায়। সবাই ঐতিহাসিক চরিত্র, কিন্তু ঔপন্যাসিকের সৃষ্টিশীলতায় তারা নতুন করে আবির্ভূত হন বর্তমান কালের আয়নায়। পাঠককে তিনি হাত ধরে নিয়ে যান ইতিহাসের সেই কণ্টকাকীর্ণ পথে-
পূর্ব বাংলার তুমুল জনপ্রিয় নেতা শেরে বাংলা পাকিস্তানের প্রস্তাবক হয়েও জিন্নাহ সাহেবের কূটকৌশলে হয়ে গেলেন ‘দুশমন’। পাকিস্তান আন্দোলনের শীর্ষনেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেবকেও দেশভাগের আগেই সরিয়ে দেয়া হল। কপাল খুলল জিন্নাহ-লিয়াকত খাঁর প্রিয়ভাজন খাজা নাজিমুদ্দিনের।
উচ্চাকাঙ্ক্ষী জিন্নাহ দেশভাগের প্রাক্কালে পাকিস্তানের হিস্যা আদায়ের চেয়ে বড়লাট হওয়ার ব্যাপারেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। এটাই পাকিস্তানের জন্য কাল হলো। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলল পাকিস্তানে।
তাতেও জিন্নাহ সাহেবের খায়েশ মিটল না। তিনি নিজে উর্দুভাষী নন। অথচ খাজা সাহেবের পরামর্শে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। আর তাতে ফুঁসে উঠল বাঙালি। রাস্তায় নামলেন শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবসহ আরো অনেকে।
রক্তের বিনিময়ে ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত হলো। কিন্তু এতে শোষণ নিপীড়ন যেন অনেকটাই বেড়ে গেল। চুয়ান্ন সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয় ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। শুরু হল গোলাম মোহাম্মদ-ইস্কান্দার মির্জাদের ষড়যন্ত্র। তাঁরাও অবশ্য দোর্দন্ড প্রতাপশালী সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের কাছে পরাস্ত হলেন। বন্দি হলো রাজনীতি। কারাগারে বসে শোষিত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য শেখ মুজিব আঁকলেন ছয় দফার ছক।

প্রতিটি ঘটনাই বর্ণনা করা হয়েছে প্রাঞ্জল ভাষায়। উপন্যাস পড়তে গেলে চরিত্রগুলোকে আর ঐতিহাসিক মনে হয় না। লেখক যেন প্রতিটি চরিত্রকে তুলে আনলেন অনন্য সৃষ্টিশীলতায়। জীবন্ত করলেন তাদেরকে। উপন্যাসের রস আস্বাদন করেও খুব সহজেই ইতিহাসের পাঠটাও নিতে পারেন পাঠক।

মতিয়া চৌধুরীর পুতুল খেলা দিয়ে উপন্যাসের শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত আমরা রজপথের লড়াকু কর্মী হিসেবেই তাকে দেখতে পাই। উপন্যাসের শেষটা এরকম–‘মতিয়া হাসি হাসি মুখ করে নূরজাহান বেগমের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ পর নিজের ঘরে গিয়ে বসলেন তিনি। আবার গভীর মনোযোগে পত্রিকার প্রতিবেদনটি পড়লেন। তারপর দু-একজনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বললেন। মনে মনে বললেন, ক্যাম্পাসে যেতে হবে। ছয় দফা নিয়ে আলোচনার জন্য ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বসতে হবে। সারাদেশে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলবে হবে।…’
মতিয়া চরিত্রটি সূত্রধর হিসেবে এসেছে উপন্যাসে। অগ্নিকন্যা খ্যাত মতিয়ার জীবনালেখ্য নয় এই উপন্যাস। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সময়ও এখানে চরিত্র। সেই চরিত্রই হয়ে উঠেছে অগ্নিকন্যা।

বইটির ভূমিকায় তিনি যেমনটি বলেছেন-‘ অগ্নিকন্যা ঐতিহাসিক উপন্যাস, ইতিহাস গ্রন্থ নয়। অগ্নিকন্যা এই উপন্যাসের প্রতীকী নাম। কাজেই শুধু একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাস রচিত হয়নি। একটি বিশেষ সময়কে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এর সময়কাল হচ্ছে ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ। দেশভাগ ও তার পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের নায়কদের ভূমিকা তুলে ধরার ক্ষেত্রে কোনোরকম পক্ষপাতিত্ব করা হয়নি। ঘটনা পরম্পরায় যাঁর যে ভূমিকা ছিল তা তুলে ধরতে কার্পণ্য করিনি।
এ উপন্যাস রচনা করতে আমাকে প্রচুর পড়তে হয়েছে। কোনো কোনো গ্রন্থ থেকে উদারভাবে তথ্য নিয়েছি। এ জন্য আমি গ্রন্থকারদের কাছে ঋণী।’ লেখক আমাদের এটিও জানাচ্ছেন যে অগ্নিকন্যা প্রথম খন্ড লেখা হয়েছে। আরো দুটি খন্ড লেখার ইচ্ছা আছে তাঁর।

এবারের বইমেলায় ধ্রুব এষের প্রচ্ছদে পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত অগ্নিকন্যা পাঠকের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।

অগ্নিকন্যা : মোস্তফা কামাল। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ। প্রকাশক: পার্ল পাবলিকেশন্স। প্রকাশকাল: ২০১৭। ৩২০ পৃষ্ঠা । দাম: ৫০০ টাকা।

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।