মুস্তাফিজ শফির আটটি কবিতা

মুস্তাফিজ শফি | ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৬:৫৭ অপরাহ্ন

হাতের মুঠোয় একগুচ্ছ অন্ধকার

আমি এখন ইচ্ছে করলে খুব সহজেই তোমাকে বানিয়ে ফেলতে পারি। আমার হাতের মুঠোয় তুমি খলবল হেসে ওঠো, প্রথম শাড়ি পরার উচ্ছ্বলতা নিয়ে পরিপাটি দাঁড়াও সকাল-সন্ধ্যা। আমরা ঠিকই হেঁটে আসি আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ, হলুদ শর্ষে ক্ষেত। তোমার বাম গালে ঠিক আগের মতো টোল পড়ে। আর আবেগে কিছুটা ফুলে ফুলে ওঠে ঠোঁট।

আমি এখন ইচ্ছে করলেই সকালে মুড়িয়ার পথে থামিয়ে দিতে পারি লাতুর ট্রেন। আর ট্রেনের ধোঁয়াগুলোকে অনায়াসে বানিয়ে ফেলতে পারি মেঘ। তুমিতো মেঘ ভালবাসতে, মাঝে মাঝে ঝরাতে বৃষ্টিও। মেঘ ধরবো বলে আমরা কতোবার ছুটেছি নীলগীরি-নীলাচল। আর প্রকৃতির ছলনায় কতোবার ভেসেছি আক্ষেপের জলে। অথচ দেখো আমার হাতে এখন একসাথে ব্ল্যান্ড হতে থাকে মেঘ, বৃষ্টি এবং নীল আকাশ।

Shakil-storyধোঁয়াওঠা চায়ের কাপে তুমি মাঝে মাঝে ঝড় তুলতে, ফুটপাত পেরিয়ে চারুকলার বারান্দা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ধরতে চাইতে পরাবাস্তব নির্জনতা। আমি এখন খুব সহজেই হাতের মুঠোয় ধরে থাকি সেই নির্জন দুপুর আর নিঃসঙ্গ শালিকের ডানায় ভর করে আসা একগুচ্ছ অন্ধকার।

আমার হাতের তালুতে খেলা করে নদীÑ সুরমা, কুশিয়ারা, সোনাই। সুরমাকে আমি এখন অনায়াসে ধানসিঁড়িতে রূপান্তর করে ফেলতে পারি, কুশিয়ারাকে কীর্তনখোলায়। সোনাইয়ের বুকে তোমাকে ভাসিয়ে রাখি, কেবলই ভাসিয়ে রাখি জলগামী নীল বালিহাঁস।

তুমিতো বেলি ফুল ভালবাসতে, তোমার প্রিয় ফুলের তালিকায় ছিলো দোলনচাঁপাও। আমি এখন ফুঁ দিলেই হাতের তালুতে নামিয়ে আনতে পারি হাজার বেলি, গুচ্ছগুচ্ছ দোলনচাঁপা। চন্দ্রমল্লিকা আসে, জিনিয়া আসে, গোলাপ আসে, ভিনদেশি টিউলিপও এসে ধরা দেয় হাতে। আমি এখন তোমার জন্য বেলিফুল সন্ধ্যা নিয়ে বসে থাকি, দোলনচাঁপা সন্ধ্যা নিয়ে বসে থাকি। মাঝে মাঝে টিউলিপ সন্ধ্যাকেও কাছে ডাকি। কাছে ডাকি গোলাপ, জিনিয়া কিংবা চন্দ্রমল্লিকাকেও। ওরা তখন সামনে দাঁড়িয়ে অনুগত ভৃত্যের মতো কুর্ণিশ করতে থাকে। করতেই থাকে।

বকুল কুড়োনিরা চলে গেলে কদমফুলের বুনো ঘ্রাণ হয়ে তুমি ঢুকে পড়তে বারান্দায়–সন্তর্পনে লেখার টেবিলে। প্রতি ভ্রমনেই তুমি হাজির হতে ভোরের পাখির গান নিয়ে। দেখো কতো সহজেই আজ তুমি খাঁচাবন্দি আমার টেবিলে।

আকাশের নীল ধরবো বলে দিগন্তরেখা বরাবর ছুটেছি দিনের পর দিন। অন্ধকার রাতে জোনাক পোকা হয়ে আলো জ্বলবো বলে আমরা কেটেছি অনন্ত সাঁতার। আজ আমার ঘরে গুহাচিত্রের অন্ধকারে জ্বলে হাজার জোনাক পোকা। আজ আমার চারপাশে শুধু নীল দীর্ঘশ্বাস। ডেস্কটপের মাউস চালাতে চালাতে দুঃস্বপ্নের ভেতর আমি এখন প্রায়ই ডুকরে কেঁদে উঠি।

এসো আনত প্রিয় মুখ, প্রিয় নীল বালিহাঁস, তুমি এসে ঝাঁকি দিয়ে ভেঙে দাও ঘুম।

অন্ধ চোখে আমি আজ

আমি নাকি কিছুই ধরতে পারি না। না নদী, না নক্ষত্র, না আকাশ, না পাখি। আমার চোখের সামনে নদীগুলো গুমরে কাঁদে। পাখির ডানায় রোদ গিলে খায় পরবাসী মেঘ। কোথায় খুঁজবো বলো নক্ষত্রের ঠিকানা? কোথায় নামাবো নীলিমার নীল?

পড়তে গেলে বইয়ের পাতা থেকে শব্দরা উড়ে যায়। লিখতে গেলে খাতার সামনে শরীর মেলে অসীম শূণ্যতার জলছবি। চোখের সামনে স্বপ্ন হারায়, কৈশোর হারায়, যৌবন হারায়, অতঃপর ছায়ারাও হারায়।

কিছুই ধরতে পারিনি আমি। কোনোদিন পারিনি। অথচ দেখো অন্ধ চোখে আমি আজ তোমাকেই ধরে আছি।

মরা শালিক, মরা জোনাক

ধানশালিকের পেছন পেছন আমরা হেঁটেছি
অনেকটা দূর মেঠোপথ।
বুক পকেটে এখনও জোনাক পোকার স্মৃতি,
মাথার উপর নিঃসঙ্গ তালগাছের ছায়া।

একটি শালিক ঝুলে আছে বরুণের ডালে,
মেঠোপথের ধারে মরে পড়ে আছে
একটি জোনাক পোকা।

প্রতিদিন আমি কান পেতে শুনি
শিশির ঝরার শব্দ,
শিশিরের মতো তুমিও কি
ঝরো অবিরত, মায়া ?

মরা শালিককে প্রশ্ন করি– তোমার নাম কি,
মরা জোনাককেও।
শালিক বলে আমার নাম আগুন,
জোনাক বলে তৃষ্ণা।

আমরা আগুন হতে চেয়েছিলাম।
আমরা তৃষ্ণা হতে চেয়েছিলাম।
আর আজ আমরা নিঃসঙ্গতার কোটরে বন্দি
মরা শালিক, মরা জোনাক।

নিঃসঙ্গতার কাছে দীর্ঘশ্বাস গচ্ছিত রেখে

ভেজা আষাঢের বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কোন জন্মকে তুমি কাছে ডাকো আজ? বৃষ্টিতে ভেজা দিয়াশলাইয়ের কাঠির মতো কোন হিরন্ময় আঁধারে তুমি নিজেকে লুকাতে চাও বলো?

রাত দিন ক্যানভাসে জেগে থাকে একটি সুবর্ণরেখা। আর দূরের মাঠে কাশফুল হাতে তুমি দাঁড়িয়ে থাকো স্থিরচিত্রের মতো একা। কুয়াশার মতো স্মৃতির পথরেখার পাশে তুমি এঁকে যাও নিবিড় নিপুন ছায়া। অভিমানÑ এ বড়ো কঠিন দাগ হৃদয়ের গভীরে তোমার।

ধূ ধূ মাঠে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছটির মতো একা হতে হতে আমিও যে দাঁড়িয়েছি আজ তোমার উঠোনে। এইসব মায়াময় নির্জনতার কাছে, নিঃসঙ্গতার কাছে গচ্ছিত রেখে আমার দীর্ঘশ্বাস।

পথ হারানো পথের বাঁকে

এই জন্মের পথের বাঁকে কেবলই
বিছানো দেখি গত জন্মের শোক।
এইখানে চিরহরিৎ বনের ফাঁকে
কেবলই টের পাই, টের পাই
এক মায়াহরিণীর আর্তনাদ
আমি যাকে ডেকে এনে খুন করেছি
ধবল জ্যোৎস্নায় প্রবল প্রলোভনে।

এইসব ভোরের আলো,
দুপুরের মাঠে গোল হয়ে বসা
শালিকের ঝাঁক, মেঘবর্তী দিন শেষে
সন্ধ্যাপাখির গান এসবইতো
মানুষ জন্মের স্মৃতি, এসবইতো
সামনে টেনে নেওয়া মানবজীবন।

ও জীবন, রক্তাক্ত উপত্যকা মাড়িয়ে
তুমি আর কতদূর যাবে,
তুমি আর কতো পথ হারাবে পথের বাঁকে?

নির্জনতার বাড়ি

চলো আজ নির্জন হয়ে যাই নির্জন
মৃত্যুকে পাশে রেখে যেমন শুয়ে থাকে
কেউ কেউ নাকে দিয়ে তুলো।
চলো আজ সেই রকম পাশাপাশি শুয়ে থাকি
সবার চোখে দিয়ে ধুলো।
আর দূরের জানালা থেকে দেখি
তাহাদের তাবত কোলাহল।

নির্জনতা কি মৃত্যুর ডাকনাম,
ঝিঁঝিঁদের ঝাঁক বুঝি তার প্রতিবেশি?
সেও ভালবাসে অভিমান,
বারান্দার ওপাশে নীরব পায়চারি?

নির্জনতা আমি আজ যাবো তোর বাড়ি।

বসন্তের সন্ধ্যায় মহাকাব্যের বিষণ্নতা

এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন এই আলো অন্ধকারে, এই বৃরে সকরুণ মায়ায়? তোমার হাতে দুই নীলপদ্ম, তোমার চোখে দুই কালো ভ্রমর, তোমার করোটিতে খেলা করে মেঘেদের আশীর্বাদ; বলো তুমি, বলো এবারÑ তুমি কে, তুমি কার উত্তরাধিকার?

ঈশ^রের বাহুবন্ধন থেকে ছাড়া পেয়ে তুমি কি এসেছো নেমে স্বর্গ থেকে, তুমি কি প্রকৃতির প্রেরিত মানবী, নাকি নিসর্গের সন্তন? তোমার পায়ের কাছে শান্তিতে ঘুমায় সমুদ্রের ঢেউ, তোমার এলোচুল ঘিরে নৃত্যরত সাতটি প্রজাপতি, তোমার ঠোঁট জুড়ে পৃথিবীর দীর্ঘতম চুম্বনের দাগ; বলো তুমি তুমি কার পাঁজরের হাড়ের জাতক, তোমার নাভিমূলে খেলা করে কোন সে চিবুক?

তবে কি তুমি জানতে, আজ এই বসন্তের বিষণ্ন সন্ধ্যায় এইখানে সোনাইয়ের জলে ভেজা পলিমৃত্তিকায় এই রাইসর্ষের আবাহনী গানে রচিত হবে এক রহস্য আখ্যান?

তোমার কোমরের ঝিলিকে, উরুর মায়ায় তুমি আজ টেনে আনলে নত্রপুঞ্জের স্পন্দমান দ্যুতি, তুমি সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা বনমোরগের রঙিন স্বপ্নগুলোকে ধরতে চাইলে, ডাহুকের কণ্ঠ থেকে তুলে আনতে চাইলে গান।

ততণে এ তল্লাটের পুরুষেরা সব জড়ো হয়ে গেছেÑ তোমাকে ঘিরে ওরা সব দাঁড়িয়েছে কুর্ণিশের ভঙ্গিতে, ওরা সব নিজেদের দিয়েছে সপে তোমার ফনা তোলা ছুরির নিচে। আর তুমি হাততালি দিয়ে ফেটে পড়েছো অট্টহাসিতে। কে যেনো কাঁদছে দূরে, বাতাসে ভেসে আসে তার সুর।

একী হায়! যাচ্ছো কোথায়, তীর ভাঙা নদীর কোলে নগ্ন পদচ্ছাপ ফেলে? মাঠের ওপর বিছানো জোৎস্নার কাফন, মাথার ওপর চাঁদ, এগুলোই কী তবে ধারণ করবে তোমার এই মহাকাব্যের বিষণ্নতা, পাষাণ পাষাণ খেলা?

পান করি সমুদ্রের গর্জন

পুরনো ঢেউয়ের শব্দ শুনতে কি পাও তুমি ছায়াচ্ছন্ন দূপুরে, দূরে, বহুদূরে কুয়াশার মতো বিভ্রম রেখার ওপারে? জানালার ওপাশে শুনতে কি পাও মায়ের ডাক, বাবার শাসন, কলধ্বনি ভাইয়ের বোনের?

গোধুলির ওপারে মেঠোপথে পড়ে আছে তোমার ঘুড়ির নাটাই, মেলায় কেনা বাঁশি, ময়ুরের পালক। পালকতো বিচ্ছিন্ন দূরবর্তী ছায়া; তবুও তার টান থাকে নাটাইয়ের সঙ্গে যেমন ঘুড়ির, ডাঙ্গুলির সঙ্গে শক্ত হাতের, ঢেউয়ের সঙ্গে যেমন ফেনার, কচুরিপানার। আর ভাঙনের সঙ্গে সুতীব্র হাহাকারের।

পায়ে হাটা মেঠো পথে হারায় বন্ধুর মুখ, আর আমি পুরনো নূড়ি পাথরে খুঁজে ফিরি এক টুকরো আয়না। আয়না কি ধরে রাখতে পারে সময়ের প্রতিচ্ছবি? আয়না কি ধরে রাখতে পারে নদীর প্রতিটি ঢেউ, শুশুকের ঘাই? হাহাকার ধুয়ে দিতে আকাশ ভেঙে নেমে আসে যে বৃষ্টি, আয়না কি ধরে রাখতে পারে তার কান্না? কিংবা ঝড়-বৃষ্টি কোনোটারই সম্ভাবনা নেই আয়না কি ধরে রাখতে পারে প্রকৃতির ওই নৈর্ব্যক্তিকতা?

এখনও রাত্রি ঘন হয়ে এলে হাতের তালুতে নাচে বড় বিলের স্বর্নের থালাবাটি। স্তব্ধতার ভেতর থেকে ঝড়ের বেগে জেগে ওঠে আদিম প্রাগৈতিহাসিক মন। মখমলের মতো কোমল নরম নির্জনতাকে খান খান করে ভেঙে ফেলো, চলো আজ উচ্ছ্বাসে পান করি সমুদ্রের গর্জন।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shams hoque — ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৭ @ ১:৪০ অপরাহ্ন

      bah besh!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন poliar wahid — ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৭ @ ৮:১৬ অপরাহ্ন

      কবিতাগুলো তুলতুল, রোদের মতো নরম, জোছনার মতো গলে গলে পড়ছে যেন। ভালোবাসা শফি ভাই

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাসুদ — ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৭ @ ৮:০৪ অপরাহ্ন

      ‌’পরাবাস্তব নির্জনতা’ শব্দবন্ধটা এই প্রথম পেলাম।
      সাবলীল গতি। হোঁচট খাইনি কোথাও।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাসুদ — ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৭ @ ৮:০৬ অপরাহ্ন

      সাবলীল গতি। হোঁচট খাইনি কোথাও।
      ‌’পরাবাস্তব নির্জনতা’ শব্দবন্ধটা এই প্রথম পেলাম।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com