ভাষার বিকৃতি: হীনম্মন্যতায় ভোগা এক মানসিক ব্যাধি?

রাজু আলাউদ্দিন | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১১:১২ পূর্বাহ্ন

The corruption of man is followed by the corruption of language–Ralph Waldo Emerson

বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের গর্বের কোন শেষ নেই, আবার নিজের ভাষাকে অপমানেও আমাদের কোনো জুড়ি নেই। যে ভাষার জন্য আমরা শহীদ হয়েছি সেই ভাষাই যথেচ্ছ ব্যবহারের দায়িত্বহীনতার মাধ্যমে তার ঘাতক হয়ে উঠেছি। পুরো বিষয়টি জাতীয়তাবাদের দ্বৈতরূপ সম্পর্কে হোর্হে লুইস বোর্হেসের উক্তিরই সমধর্মী হয়ে উঠেছে: “যিনি শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত তিনি জল্লাদও হতে পারেন এবং তোর্কেমাদা(স্পেনে ইনকুইজিশনের যুগে অত্যাচারী যাজক–লেখক) খ্রিষ্টের অন্য রূপ ছাড়া আর কিছু নন।” আর এই জল্লাদের ভূমিকায় এখন জনগন ও রাষ্ট্র একই কাতারে সামিল হয়েছে।

একটি সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত অভিব্যক্তিপূর্ণ ভাষা গড়ে উঠতে হাজার হাজার বছর লাগে। আর একটি ভাষার গড়ে ওঠার পেছনে থাকে শত সহস্র মানুষের অবদান যারা শব্দ ও শব্দার্থের জন্ম দিয়ে ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। আর লেখকরা এসে এই শব্দ ও শব্দার্থের সীমা বাড়িয়ে দেন বা নতুন নতুন অর্থের ব্যঞ্জনায় দীপিত করে তোলেন ভাষাকে।

কিন্তু আমাদের অজ্ঞতা, অবহেলা, স্বেচ্ছাচার ও দায়িত্বহীনতার কারণে এই সম্মিলিত অর্জনকে আমরা বিকৃত করছি প্রতিনিয়ত।

অনেকেই বলেন ভাষা কোন স্থির বিষয় নয়, নদীর মতো পরিবর্তিত হতে বাধ্য। অবশ্যই তা পরিবর্তিত হবে, কিন্তু বিকৃত নয়। আমরা স্বেচ্ছাচার ও অবহেলার মাধ্যমে একে বিকৃতও করে তুলতে পারি, প্রবহবান নদীতে রাসায়নিক বর্জ ও জঞ্জাল ফেলে একে দুষিতও করতে পারি, যেভাবে বুড়িগঙ্গা নদীকে আমরা করেছি।
ভাষা স্থির কোন বিষয় নয় বলেই তা প্রতিনিয়ত বদলায়। আর বদলায় বলেই শব্দে ও অর্থে বৈচিত্র ও বিস্তার লাভ করে। কিন্তু ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে পরিবর্তন এক জিনিস আর দায়িত্বহীনতার কারণে বিকৃতি ঘটানো আরেক জিনিস। (সম্পূর্ণ…)

বইমেলা ২০১৭: আলোকোজ্জ্বল একশ বইয়ের সন্ধানে…

আবদুর রাজ্জাক শিপন | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৭:২৮ অপরাহ্ন

BooksWhenever you read a good book, somewhere in the world a door opens to allow in more light. –Vera Nazarian

ভালো বই পৃথিবীর যে কোথাও আলোকোজ্জ্বল একটি দরজা খুলে দেয় । একুশের বইমেলা ২০১৭ তে, ফেব্রুয়ারির ২৫ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩ হাজারের অধিক ! ৩ হাজার বইয়ের সবগুলো নিশ্চয় ভালো বই নয় । ৩ হাজার বইয়ের ভেতর আছে আলোকোজ্জ্বল কিছু বই ! সে সংখ্যা কত হবে, ১০০ শ’ ? ২০০ শ’? ৩ হাজার বইয়ের গাদা থেকে আলোকোজ্জ্বল সেই বইগুলোর সন্ধান কীভাবে পাওয়া সম্ভব ? পত্রিকাতে বিজ্ঞাপন দেখে ? রিভিউ পড়ে ? পাঠকের মুখে শুনে ? সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকা দেখে ?

বিদ্যমান নিবন্ধে উত্তরগুলো খুঁজবো । তার আগে, শুদ্ধতম কবিখ্যাত রূপসী বাংলার জীবনানন্দ দাশের দিকে খানিক মুখ ফেরানো যাক । আমাদের এই লেখাতে প্রাসঙ্গিকভাবেই ভদ্রলোক এসে হাজির হয়েছেন । মৃত্যুর পূর্বে তাঁর রচিত ছোটগল্প ১০৮ টি । ২১টি উপন্যাস । জীবদ্দশাতে তিনি এই লেখাগুলোর একটিও ছাপার অক্ষরে আলোর মুখ দেখান নি । কবি হিসেবে ততোদিনে তিনি বেশ আলোচিত হচ্ছিলেন যদিও। পাঠক কী একটু অবাক হচ্ছেন ? বর্তমান সময়ের যশঃপ্রার্থী লেখকের সঙ্গে মিলিয়ে ? কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালক, প্রকাশকাল ১৯২৭ । দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পাণ্ডুলিপি, ১৯৩৬ । প্রথমটির সঙ্গে ব্যবধান ৯ বছর । ততোদিনে নিজের ভেতর নিজেকে কবি ঝালিয়েছেন, একটু একটু করে ঝালিয়ে নিয়েছেন । পরিপক্ক করেছেন নিজেকে । তারও ৬ বছর পর প্রকাশিত হয় তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বনলতা সেন’ ! বাংলা কবিতা পাঠকমাত্রই বনলতাসেনের কথা জানেন । (সম্পূর্ণ…)

ভাষা ব্যবহার ও মানসিক দাসত্বের খামখেয়ালি

অলভী সরকার | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ২:২৬ অপরাহ্ন

“কোনো ভাষারই চলে না শুধু নিজের শব্দে। দরকার পড়ে অন্য ভাষার শব্দ। কখনো ঋণ করতে হয় অন্য ভাষার শব্দ। কখনো অন্য ভাষার শব্দ জোর করে ঢুকে পড়ে ভাষায়। জোর যার তারই তো সাম্রাজ্য।”

ভিন্ন ভাষার শব্দ প্রসঙ্গে হুমায়ুন আজাদ তাঁর কতো নদী সরোবর বা বাংলা ভাষার জীবনী গ্রন্থে এভাবেই বলছেন।

এটা অবশ্যই বেদনাভারাক্রান্ত হওয়ার মতো বিষয় নয়। কারণ, পরিবর্তন, বিবর্তন- এ সবই ভাষার ধর্ম। আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখতে গেলে ভাষা, এমনকী ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে। ইতিহাসে এর নজিরও দুষ্প্রাপ্য নয়। কিন্তু, যদি কেউ তার প্রকৃত সম্পদের চেয়ে বেশি ঋণ করে, তবে নিঃসন্দেহে তার নাম হবে দেউলিয়া। ফলত, কোনোদিন, সুদের হিসেব মেলাতে না পারার দায়ে, নিলামে উঠতে পারে আসলটুকু।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ দিয়ে শুরু করা যাক।

দেশের প্রথম সারির একটি গণমাধ্যমে, কথোপকথন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন জনৈক তারকা। (সংগত কারণেই, নাম উহ্য রাখছি)। প্রতি চার শব্দের বাক্যে, অন্তত দুটি করে ইংরেজি শব্দ। “অন্তত” বলছি এই কারণে যে, অনুপাতটা প্রায়ই আরো বেশি হারেই ইংরেজির দিকে ঝুঁকছিল।

শুনতে শুনতে আমার খুব প্রিয় একটি চলচ্চিত্রের সংলাপ মনে পড়ে গেল, “… বাংলা বলতে হবে থেমে থেমে। যেন, তুমি ভালো করে বাংলাটা বলতেই জানো না…!”-একজন তরুণী, অপেক্ষাকৃত প্রাচীন যুগের এক চরিত্রকে হাল আমলের কায়দা-কানুন রপ্ত করানোর চেষ্টা করছেন। (সম্পূর্ণ…)

কবরীর জীবনস্মৃতি: কবির রচিত আত্মজৈবনিক গদ্য

নির্মলেন্দু গুণ | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১০:৫০ পূর্বাহ্ন

Cover-Smriti-Tuku-Thakসুচিত্রা সেনকে নিয়ে, তাঁর জীবদ্দশায় আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম। ঐ কবিতায় সুচিত্রা সেনের অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর দৈহিক সৌন্দর্যের অকপট বর্ণনাও ছিল।
তাঁর মৃত্যুর বছর দশেক আগে লেখা আমার ঐ কবিতাটি সুচিত্রার মহাপ্রয়াণের পর আলোচনায় আসে।
তখন কেউ-কেউ কবিতাটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ হানেন।
সুচিত্রা সেন স্মরণে প্রযোজিত একটি টিভি অনুষ্ঠানে আমি এই কবিতাটি পাঠ করি। ঐ অনুষ্ঠানে প্রয়াত চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম, চিত্রপরিচালক ও কথাশিল্পী আমজাদ হোসেন ও নায়িকা কবরী উপস্থিত ছিলেন। নায়িকা কবরী আমার কবিতাটির প্রসংশা করেন। বলেন, ‘সুন্দরের সুষম বন্টন’ কথাটা সুচিত্রা সেনের বেলায় খুব যথাযথ হয়েছে।
পরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত একটি কবিসভায় আমি ঐ কবিতাটি পুনরায় পড়ি। দর্শকসারিতে সেদিন উপস্থিত ছিলেন সুচিত্রা সেনের কন্যা নায়িকা মুনমুন সেন। আমার কবিতা শুনে তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। মঞ্চ থেকে নেমে আসার পর মুনমুন আমাকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন এবং বলেন – “আমার মাকে নিয়ে এমন কবিতা পশ্চিমবঙ্গের কোনো কবি লেখেননি।”
কবরী এবং মুনমুন দুই নায়িকাই যে কবিতা বোঝেন– এই তথ্যটি সকলের গোচরে আনার জন্যই এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছি।

সম্প্রতি আমাদের কিংবদন্তীতুল্য চিত্রনায়িকা কবরীর লেখা আত্মজীবনী “স্মৃতিটুকু থাক” -এর পান্ডুলিপি পাঠ করে আমার মনে হলো, আমি কোনো কবির রচিত আত্মজৈবনিক গদ্য পাঠ করছি।
১৯৬৪ সালে, সুভাষ দত্ত পরিচালিত সুতরাং ছবিতে সদ্য কৈশোর পেরোনো কবরীর অভিনয় ও কবরীর দেহপট দর্শন করে যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছিলাম। (সম্পূর্ণ…)

রবীন্দ্রনাথের কাছে ঈশ্বরের অর্থ অপরিহার্য রূপে ভালোবাসা

প্রদীপ কর | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৫:২৬ অপরাহ্ন

Kabirরবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি কবিতায় কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত, লিখেছিলেন; ‘তোমার পায়ের পাতা, সবখানে পাতা; কোনখানে রাখবো প্রনাম?’ বর্তমান সময়ে বাঙালির এরকম হতশ্রী দশা কেন? আসলে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ বাঙালি তথা সমগ্র মানবজাতিকে যেরকম নিবিড়ভাবে অনুভব করেছিলেন এবং তার সৃষ্টি-ঐশ্বর্যে মানবতাবাদকে যেরকম সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন, সেই দর্শন, মানবপ্রকৃতির প্রতি সেই আদর্শগত অনুধ্যান এখন অত্যধিক পরিমানে ক্ষয়প্রাপ্ত! ফলতঃ আমরা না বুঝেছি নিজেকে না নিজেদের সমাজকে; এই অজ্ঞতাবশতই আমরা চিনতে পারিনি বর্হিবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ! যে কারণে, নৈতিকতা বহির্ভূত আত্মকেন্দ্রিক ভোগবাদ-সর্বস্ব জগৎ আমাদের বিচ্ছিন্ন করেছে নিজস্ব শেকড় থেকে। আত্মবিস্মৃত হয়ে মিশে যাচ্ছি ঘনতমসায়। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র উপায় বাঙালি মানস বাঙালি মনীষাকে সঠিকভাবে চিনতে শেখা। রবীন্দ্রনাথ তেমনই এক উদ্ভাসিত আলোক, যার ভাস্বরতায় অবগাহন করলে অবশ্যই উজ্জ্বল হওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বাংলাসহ পৃথিবীর নানান ভাষায় নিয়মিতভাবেই ‘কাজ’ হয়ে চলেছে। সেই কাজের অধিকাংশই যদিও হিমঘরের শীতলতায় নিমজ্জিত। তাই অস্তিত্ব বিপন্ন হলে আশ্রয় নিতে হয় তেমন এক দুর্লভ সান্নিধ্যের যেখানে আমরা নিশ্চিন্ত রক্ষা পাই। তেমনই এক তরুছায়া হুমায়ুন কবির প্রণিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রন্থটি।
যদিও বিশিষ্ট প্রজ্ঞার অধিকারী হুমায়ুন কবির, গ্রন্থটি বাংলায় রচনা করেননি। ১৯৬১তে, রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে, যুক্তরাজ্যে স্কুল অব্ ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ যে বক্তৃতামালার আয়োজন করেছিল, তার উদ্বোধনী ভাষণ দিয়েছিলেন হুমায়ুন কবির। এই বইটি সেই ভাষণেরই সংকলন। ১৯৬২তে School of Oriental And African Studies, University of London থেকে প্রকাশিত হয় Rabindranath Tagore শিরোনামের এই দুষ্প্রাপ্য ইংরেজি গ্রন্থটি। বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক, গবেষক হায়াৎ মামুদ বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেছেন। শুধু অনুবাদ বললে প্রায় কিছুই তেমন বলা হয় না। অসাধারণ এই পুস্তকের প্রাঞ্জল অনুবাদের সঙ্গে সূত্র নির্দেশের মাধ্যমে, দুরূহ টীকা সংযোজনসহ গ্রন্থকার হুমায়ুন কবিরের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি এবং একটি প্রয়োজনীয় ভূমিকার মাধ্যমে গ্রন্থটিকে আরও বেশি মহার্ঘ করে তুলেছেন। এই পরিশ্রমসাধ্য কাজটি তিনি করেছেন কেননা, তার মনে হয়েছে: ‘বর্তমান বাঙালির মননশৈথিল্যের যুগে এই লেখা রবীন্দ্রনাথের অবদান বুঝতে সাহায্য করবে বাঙালিকেও’ তার এই ‘মননশৈথিল্যের যুগে’ শব্দবন্ধটির মুখোমুখি হলে বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়ি। (সম্পূর্ণ…)

একুশের অপমান

আলম খোরশেদ | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৭:১৬ অপরাহ্ন

একুশ নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতার অন্ত নেই। ফেব্রুয়ারি আসতে না আসতেই দেশজুড়ে ব্যাঙ-এর ছাতার মত গজিয়ে ওঠা তথাকথিত ’ফ্যাশন হাউস’গুলোতে বাংলা বর্ণমালা উৎকীর্ণ পোশাক বিক্রির ধুম পড়ে যায়। আর সেইসব ফ্যাশনদুরস্ত ধরাচুড়ো গায়ে চাপিয়ে একুশের সাতসকালে আমরা দলবেঁধে, সংবৎসর চূড়ান্ত অবহেলার শিকার, জরাজীর্ণ শহীদ মিনারটিতে লাইন লাগিয়ে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ আর সুরে-বেসুরে দুই কলি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গেয়ে আমাদের বাংলাপ্রীতির পরাকাষ্ঠা দেখাই। অথচ বছরের বাকি তিনশ চৌষট্টি দিন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাভক্তির লেশমাত্র বহিঃপ্রকাশ দেখিনা।

আমরা শুদ্ধ করে, প্রমিত উচ্চারণে কথা বলার ব্যাপারে নিদারুণরকম উদাসীন। অথচ কথায় কথায় বিনা দরকারে ভুলে-ভরা ইংরেজি কপচাতে রীতিমত পারঙ্গম। বইপত্রে, রেডিও-টেলিভিশনে, মঞ্চে-মাইকে কোথাও বাংলা ভাষাটিকে শুদ্ধ ও সুন্দরভাবে উপস্থাপনের কোন প্রচেষ্টা নেই। অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-রেস্তোরাঁ সর্বত্র কারণে-অকারণে ইংরেজির ঢালাও ব্যবহারে আমাদের কোন লজ্জাবোধ হয় না। এমনকী পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানসমূহেও আমরা অবলীলায় বাংলা ভুলে বিজাতীয় বুলির কষ্টকর কসরতে ব্যস্ত থাকি অহর্নিশি। বিয়ের কার্ড ইংরেজিতে ছাপানো আর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে পাড়াপড়শির ঘুমের শ্রাদ্ধ করে তারস্বরে হিন্দি, ইংরেজি গান বাজানোটা যেন আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশই হয়ে উঠেছে ইদানিং। আমরা খেয়ে না খেয়ে আমাদের পুত্রকন্যাদের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়াতে যারপরনাই উৎসাহী। এই কর্মে আমাদের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এবং বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির তথাকথিত ধারকবাহকদেরও উৎসাহে কোন কমতি দেখি না। ভিনদেশি পোশাক-আশাক, খাদ্যাখাদ্য আর সংস্কৃতির বেনোজলে গা ভাসিয়ে দিয়ে পরম তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে বাধে না আমাদের বিবেকে। আমাদের চিত্রশিল্পীরাও বুঝি তাঁদের শিল্পকর্মের নামগুলো ইংরেজিতে রাখতে পারলেই বর্তে যান। নগরসংস্কৃতির নতুন অনুষঙ্গ এফ এম রেডিওর জকি-সম্প্রদায় আর ’টিভি প্রেজেন্টার’ প্রজাতির সদস্যরাও বিকৃত উচ্চারণের এক অদ্ভূতুড়ে খিচুড়ি-বাংলা বলার মহোৎসবে মত্ত, কল্পিত এক ‘স্মার্টনেস’ জাহিরের প্রাণান্ত প্রতিযোগিতায়। (সম্পূর্ণ…)

‘রাস্ট্র ভাষা গান’ ও একজন পল্লীকবি শামসুদ্দীন

আশেক ইব্রাহীম | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনও করিলিরে বাঙ্গালী
তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি।
১.
আমরা তাকে চিনি চারণ কবি শামসুদ্দীন নামে, তিনি নিজের নাম লিখতেন ‘সেখ সামছুদ্দীন’ গ্রাম: ফতেপুর, পোস্ট: বাগেরহাট, জেলা খুলনা (১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে প্রকাশিত গানের বই থেকে নেওয়া)। জন্ম আনুমানিক ১৩২১-২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫ খ্রি.) মৃত্যু ১৩ ই আশ্বিন ১৩৮১ বঙ্গাব্দ (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ খ্রি.)। ভাষা আন্দোলনের প্রথম গানের রচয়িতা হিসেবে খুব বেশীদিন হয়নি এই নামটি আমাদের আলোচনায় এসেছে। ‘রাস্ট্র ভাষা গান’ নামে পরিচিত অমর এই গানের রচয়িতা কবি শামসুদ্দীন একুশের প্রথম গানের রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিভিন্ন লেখার সূত্র ধরে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় বাগেরহাট এ, সি, লাহা টাউনক্লাবে সর্বদলীয় সমাবেশে কবি শামসুদ্দীন স্ব-কন্ঠে এই গান গেয়ে ভাষা আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন।

কবি শামসুদ্দীনের পরবর্তি প্রজন্ম, আবুবকর সিদ্দিক, মোহাম্মদ রফিক এবং ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহম্মেদ প্রমুখ পল্লীবাসি কবি সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁকে স্মরণ করেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে, স্মৃতিচারণায়, গল্পে। পৌঁছে দিয়েছেন বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত। কবি আবুবকর সিদ্দিকী সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লিখেছিলেন কবি শামসুদ্দীন এবং তাঁর গান নিয়ে। বাগেরহাটের ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহমদ লিখেছেন বাগেরহাটের ছোটকাগজ ‘চোখ’-এর ফেব্রুয়ারী ১৯৯০ সংখ্যায়। মোহাম্মদ রফিক তার গল্পগ্রন্থ ‘গল্পসংগ্রহ’ –এ গল্প লিখেছেন কবি শামসুদ্দীনকে নিয়ে। আড্ডায় আলোচনায় বাগেরহাটের প্রবীণ মানুষের কাছ থেকে শামসুদ্দীন সম্পর্কে শোনা যায়। কয়েকদিন আগে কবি মোহাম্মদ রফিক তার পৈত্রিক গ্রাম বৈটপুরে বেড়াতে আসেন, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এক প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “জানো, বাঙ্গালী শব্দটা আমি জীবনে প্রথম শুনেছিলাম শামসুদ্দীনের এই গানে”। বাগেরহাটে আরেক কিংবদন্তী প্রয়াত গনি সরদার, যিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারী রাত ১২ টার পর থেকে সারারাত একটা ভ্যানের সামনে লাউড স্পিকারে ‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনও করিলিরে বাঙ্গালী, তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’-এই গান গাইতে গাইতে কাঁদতেন আর ঘুরে বেড়াতেন শহরের অলিতে গলিতে। তার কন্ঠে প্রকাশিত হাহাকার আমাদের নিয়ে যেত ৫২ সালের রক্তাক্ত রাজপথে। সমস্ত শহর যেন বুকচাপা কান্নায়, শোকে নিমজ্জিত হয়ে থাকত সমস্ত দিন। শ্রদ্ধেয় গনি সরদারের কন্ঠেই এই গান আমি প্রথম শুনেছি, শামসুদ্দীনকে চিনেছি। এভাবেই শামসুদ্দীন লোকমুখে টিকে আছেন বছরের পর বছর ধরে।

‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙ্গালি’ গানের রচয়িতা এবং সুরকার সম্পর্কে তথ্য বিভ্রান্তি আগে থেকেই ছিল, সে সম্পর্কে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত কবি আবুবকর সিদ্দিক-এর লেখায় বিস্তারিত জানা যায়। পরবর্তিতে ২০০৯ সালে বাংলালিংক-এর একটি বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে আবারো এ প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে, কে এই গানের গীতিকার এবং সুরকার? আসলেই কি একুশের প্রথম গানের রচয়িতা এবং সুরকার বাগেরহাটের ফতেপুর গ্রামের দরিদ্র কবি শামসুদ্দীন নাকি অন্য কেউ? ঐ সময়ে কয়েকটি পত্রিকায় লেখালেখি হয়। অনেকে বাংলালিংক-এর বিজ্ঞাপনকে ইতিহাস বিকৃতির দায়ে দোষারোপ করেন। গীতিকার হিসেবে কবি শামসুদ্দীন এবং সুরকার হিসেবে অনেকে আলতাফ মাহমুদের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে বাগেরহাটের ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহম্মেদ, আবুবকর সিদ্দিক প্রমুখের লেখায় ২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সন্ধ্যায় বাগেরহাটে শামসুদ্দীনের স্ব-কন্ঠে এই গান গেয়েছিলেন এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। ক’দিন আগে এই লোককবি’র প্রকাশিত প্রথম গানের বই হাতে এসে পৌঁছানোর পর সে-সব বিভ্রান্তি কেটে গেছে। এখন আমরা নিশ্চিত বলতে পারি, ‘রাস্ট্র ভাষা গান’-এর গীতিকার এবং সুরকার কবি শামসুদ্দীন নিজেই। পরবর্তিতে গানের কথায় এবং সুরে কিছু পরিবর্তন করেছিলেন আলতাফ মাহমুদ। বর্তমানে যে গান শোনা যায়, সেটি আলতাফ মাহমুদ কর্তৃক ‘রাস্ট্র ভাষা গান’-এর পরিবর্তিত রূপ। (সম্পূর্ণ…)

Mohammad Nurul Huda on Ekushey February

মুহম্মদ নূরুল হুদা

21 FebThis is the Ekushey day — recalling the 21st of February
The day when a stirred-up race erupted incandescently
And till now, that day in Bengali minds shines brilliantly.

It’s a day for morning processions and bare-feet walks
For crimson-lined white saris and pinned black badges
For grieving people with bosoms bearing history’s burdens

The day is all about the mother tongue and mother earth’s gifts
It is all about promoting harmony and humanity’s happiness
And reminding people everywhere about loving languages

This is the day when all mothers won—their children as well
A day of condolence meets, silence and of victory eternal
Ekushey is the day of victors and of champions one can tell (More…)

একুশে ফেব্রুয়ারি

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৯:৩৫ পূর্বাহ্ন

21 Febআজ মাস ফেব্রুয়ারি, তারিখ একুশ,
আজ ক্ষিপ্র জনতার বুকে দীপ্র হুঁশ :
আজ বীর বাঙালির চেতনা-অঙ্কুশ।

আজ তো প্রভাতফেরি, খালি পায়ে হাঁটা;
লালপেড়ে শাদা শাড়ি, কালো ফিতে আঁটা :
বিরহী বিজয়ী বুকে ইতিহাস ঘাঁটা।

আজ মূল মাতৃভাষা, মাতৃ-ধাত্রী আশা;
মানুষেরা সাম্য-সুখী, মানবিক চাষা :
সকল জাতির মুখে ভাষা ভালোবাসা।

আজ তো মাতার জয়, সন্তানের জয়;
শোকসভা, নিরবতা, বিজয় অক্ষয় :
একুশ যোদ্ধার দিন, বীরের সময়।

একুশ তো বাঙালির বিদ্রোহী ফাগুন
একুশ তো বরকত সালামের খুন :
যুগে যুগে বিপ্লবীর বুকের আগুন। (সম্পূর্ণ…)

মোহাম্মদ রফিকের ‘মানব পদাবলি’ জীবনবিলাসী হাওয়ার অবিনশ্বর গান

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৩:১৭ অপরাহ্ন

আজ কোনো কথা নয়
তোমাকে জড়িয়ে শুয়ে থাকি
চুপচাপ
মুখে-মুখ, ঠোঁটে-ঠোঁট, চুলে-নাক,
উথাল-পাথাল বুকে-বুক
নীরব, নিস্তল
আজ রাতে
তুমি দু-শো মাইল দূরে
হয়তো-বা কালের ওপারে
আপন শয্যায়
তাতে কী-বা এসে যায়
এই তো এই তো তুমি
নিশ্বাসে নিশ্বাস টের পাই
বেঁচে আছো, বেঁচে আছি!

(মানব পদাবলি ৪)

comboকেন সংশয়ের মতো এক বিস্ময়চিহ্ন রেখে শেষ এই কবিতা? কোন সময়ের কবিতা এটি? এই কবিতার মতোই কিন্তু এই কবিতাটিই নয় এমন বেঁচে থাকা জীবন ঘনিষ্ঠ ৮৩টি টুকরো পদকবিতা মিলে এই কবিতার বই, মানব পদাবলি। প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের বাতিঘর।
পড়ে আমি চমকে উঠেছি, শিহর লেগেছে ভেতরে আমার। এতো সহজ সুন্দর করে কিভাবে লিখলেন ৭৪ বছর বয়সের প্রায় ৪ দশকেরও বেশি সময় কাব্যভাষায়আড়ষ্টতার বদনাম বয়ে চলা ২৩ বছর বয়সের কবি মোহাম্মদ রফিক!আমাদের কবিতাটিমের ফ্রন্টলাইনের এক মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রফিক এবার ছক্কা মেরেছেন, জিতিয়েছেন বাংলা কবিতাকে। এই বইয়ে এক নতুন মোহাম্মদ রফিককে আবিস্কার করবে তার প্রস্তুত পাঠক।

হালের ফলার কষ্ট, দীর্ঘ সভ্যতার প্রান্ত ছুঁয়ে ধাপে ধাপে মোহাম্মদ রফিক গড়ে তুলেছেন এই কাব্যের শরীর, এর নড়নে আছে বেহাগে ঘুঙুরের লয় তাল, আছে ঝিঁঝির ক্রেংকার, ব্যাং-ব্যাঙাচির তীব্র নাদ। কবির প্রতিটি কবিতায় ধরা পড়েছে এদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা-বিদ্রোহ, ভালোবাসা-ঘৃণা, সর্বোপরি মানবজীবনের একান্ত অনুভূতিসমূহের প্রকাশ। আছে শুদ্ধ শুভ্র চিরায়ত প্রেম, নেই কোন যৌনগন্ধী শব্দমালা। (সম্পূর্ণ…)

‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও ইসলাম’: আট দশকের জমানো প্রশ্ন, আটাশি পৃষ্ঠায় উত্তর

হাবিব ইমরান | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১২:১৭ অপরাহ্ন

mawlana+Cover-02মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআনের কোনো কোনো আয়াতের ‘অপব্যাখ্যা’ দিয়ে সন্ত্রাসবাদে উদ্বুদ্ধ বা ‘ব্রেনওয়াশ’ করা হয়, আপনি জানেন?
মুরতাদ-মুশরিক-কাফের কাকে বলে? এদের মধ্যে পার্থক্যই কী ? মন্দির-গির্জা-প্যাগোডা রক্ষা করার দায়িত্বও একজন মু’মিনের, যেটা কিনা জিহাদেরই অংশ- জানেন কি!
আট দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব রাজনীতি ও ইসলামকে কেন্দ্র যেসব প্রশ্ন, প্রসঙ্গ এবং বিতর্ক বারবার ঘুরেফিরে এসেছে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও ইসলাম বইটিতে সেগুলোর সব উত্তর রয়েছে।
মাত্র আটাশি পৃষ্ঠার বইটি পড়তে একজন সাধারণ পাঠকের সময় লাগবে তিন থেকে চার ঘণ্টা, বিনিময়ে পাবেন ইসলাম সম্পর্কে আশি বছরেরও বেশি সময় ধরে জমিয়ে রাখা কিছু প্রশ্নের পরিষ্কার এবং নির্ভরযোগ্য উত্তর।
উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত ‘শোলাকিয়া’র গ্র্যান্ড ইমাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ-এর বইটি সাজানো হয়েছে প্রশ্নোত্তরের ছলে। সমসাময়িক দুনিয়ায় আগুনের মত গনগনে বিষয়- জিহাদ, কিতাল, আত্মঘাতী হামলা, খিলাফত, নারী ও ইসলাম, হিজাব, কওমী মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিনিয়ত জমা হতে থাকা প্রশ্নগুলো আল কোরআন ও সহীহ হাদিসের ভিত্তিতে দৃঢ়ভাবে ব্যাখা দেওয়া হয়েছে এতে।
‘ছাপ্পা ঘুড়ি’র মত এলোমেলো দুলতে থাকা নানা বিষয়কে এক সুতোয় বাঁধতে গিয়ে মাওলানা মাসঊদ উত্তর শুরু করেছেন গোড়া থেকেই- কখনো কখনো বেছে নিয়েছেন ফিকহ শাস্ত্রের রেফারেন্স।
জিহাদের নামে সন্ত্রাসবাদ তৈরি করে বিশ্বব্যাপী যে ‘ইসলামোফোবিয়া’ তৈরি করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে মাওলানা মাসঊদের এ বইটি একটি ‘জিহাদ বিল কালম’ এর উদাহরণ। (সম্পূর্ণ…)

মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করা মূর্খতারই নামান্তর

শাহনাজ মুন্নী | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ২:১৮ অপরাহ্ন

Babelঅনেক বছর আগে একবার পত্রিকায় পড়েছিলাম, কোন একটি প্রাচীন ক্ষয়িষ্ণু ভাষার কথা, যে ভাষায় কথা বলা মানুষ কমতে কমতে এমন হয়েছিল, যে শেষ পর্যন্ত ওই ভাষায় কথা বলেন বা ভাষাটি জানেন এমন একজন মাত্র মানুষ শুধু বেঁচেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ওই ভাষাটি পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যাবে। অর্থাৎ ব্যক্তিটির সাথে সাথে মারা যাবে তার প্রাচীন ভাষাটিও। শুধু কি ভাষা মরে যায় ? ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তো একটি জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা জীবনধারা ও সংস্কৃতিরও মৃত্যু ঘটে।

আমি হঠাৎ শিউরে উঠেছিলাম এই আশংকায় যে কোন দিন, কোন দূর্ভাগ্যময় দূর ভবিষ্যতে বাংলা ভাষাও কী তবে লুপ্ত হতে পারে? হারিয়ে যেতে পারে প্রচণ্ড প্রতাপশালী আধিপত্যবাদী কোন ভাষার দুর্দান্ত দাপটের কারণে?
যে ভাষায় প্রায় ২৫ কোটি লোক কথা বলে, সে ভাষা এত সহজে লুপ্ত হবে না, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে, আমাদের সামনে মানে বাংলাদেশের মানুষের সামনে ভাষা নিয়ে কথা বলতে গেলেই যখন অবধারিতভাবে মনে পড়ে যায় ১৯৫২। জ্বলজ্বল করে ২১ শে ফেব্রুয়ারি। মনে হয়, শহীদের বুকের তাজা রক্ত যেন মিশে আছে এই বাংলা ভাষার সাথে, বাংলা বর্ণমালার সাথে। ফলে বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা- এমন উচ্ছাসে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ভেসে যাই। কবি শামসুর রহমানও– ধারণা করি–সেই আবেগ থেকেই লিখেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ/ বারান্দায় লাগে জোৎস্নার চন্দন। বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে উদার গৈরিক মাঠে, খোলা পথে, উত্তাল নদীর বাঁকে বাঁকে, নদীও নর্তকী হয়।’
তবে এসব আবেগী ভাবনার বাইরে এসে কঠিন বাস্তবকেও তো উপেক্ষা করতে পারি না।
এটা তো অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে সারা বছর ধরে ভাষা নিয়ে প্রায় সর্বত্রই দেখা যায় এক ধরনের উদাসীনতা, দেখি বাংলা ব্যবহারে অসচেতনতা, দেখি নতুন প্রজন্ম বাংলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, দেখি বাংলা ভাষায় অনায়াসে অনুপ্রবেশ ঘটছে বিস্তর ইংরেজি ও বিদেশী শব্দের। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com