আমার ডাকনাম অন্ধকার…

তাপস গায়েন | ১৬ জুলাই ২০১৬ ২:০০ অপরাহ্ন

(কবি আলফা পারভীন স্মরণে)

রণদেবী এথিনাকে দেখিনি কখনো
যেভাবে তুমি ছিলে আমার অদেখা ঈশ্বরী
কবি তুমি, অসামান্য যোদ্ধা তুমি, আর ছিলে অপরূপা নারী
এখন তোমার ছায়া স্থির, যেভাবে সুসজ্জিত হয়ে আছে
গ্রীক বর্ণমালার আদ্যাক্ষর, তাই
প্রেমহীন কবি এসে জড়ো হয়েছিল তোমারই চারিপাশে
প্রেমের কাছে আসতে আমাদের
পার হয়ে যায় শতকোটি বছর;
কবিরা আসে যত দ্রুত,
চলে যায় তারও থেকে দ্রুততর বেগে
Taposh
মহাকালব্যাপী তাই চিতাগ্নি জ্বলে!

সূর্যের বর্ণচ্ছটায় আঁকা তোমার কালো শাড়ির আঁচল
অভাবিত উজ্জ্বল, করুণ;
সিঁদুরের মতো লাল তোমার কপালের টীপ, আর
প্রতিসাম্যময় তোমার অবয়বের কাছে যখন
সময় এসে থমকে দাঁড়িয়েছিল, (সম্পূর্ণ…)

ইভ বনফয়ের ৫টি কবিতা

মাসুদুজ্জামান | ১৫ জুলাই ২০১৬ ৩:০৬ অপরাহ্ন

Bonfoy“কবিতা লেখা মানেই চিন্তা করা, কিন্তু কবিতা লিখতে হবে কবিতারই আঙ্গিকে, সংগীতের মাধ্যমে – আমরা যদি জানি কীভাবে গান শুনতে হয়, তাহলে গান আমাদের কবিতাকে সাহায্য করবে। আমাদের জীবনে যা ঘটে, কবিতা সেই গানই রচনা করতে চেষ্টা করে।” এই কথাগুলো বলেছিলেন ফরাসি কবি ইভো বনফয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ফরসি কবিতাভুবনে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। পল ভ্যালেরি ছাড়া আর কারও প্রথম কাব্যগ্রন্থ এতটা আলোড়ন তুলতে পারেনি। তাঁর কবিতা তীব্রভাবে রোমান্টিক কিন্তু ছুঁয়ে যায় আমাদের ইন্দ্রিয়জ সজ্ঞা ও প্রজ্ঞা, জীবনাসক্তি ও মৃত্যু, প্রাকৃতিক জীবন ও অধিবাস্তবতা, প্রতিদিনের যাপন ও অভিজ্ঞতা। প্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন-পড়া আর তুলনামূলক কবিতার অধ্যাপক বনফয় মনে করতেন আমরা যা ভাবি, ভাষা সেখানে পৌঁছাতে পারে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাকেই মনে করা হয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফরাসি কবি। কবিতার শব্দ, একটা কবিতায় তিনি বলেছিলেন, আকাশের মতো অনন্ত। আমাদের প্রতিদিনের মুখের বুলি আর ধ্রুপদী লেখ্যভাষার বিমিশ্রণে তৈরি বনফয়ের কবিতা তাই অনেকটাই আলাদা বলে মনে করেন সমালোচকেরা।
এখানে সদ্যপ্রয়াত (জন্ম জুন ২৪, ১৯২৩, মৃত্যু ১ জুলাই ২০১৬) এই কবি প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে তাঁরই একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশ করা হলো। কবিতাগুলি ইংরেজি অনুবাদ থেকে অনূদিত। (সম্পূর্ণ…)

পাবলো নেরুদার প্রাচ্যবাসের অভিজ্ঞতা ও দুটি কবিতা

রাজু আলাউদ্দিন | ১৩ জুলাই ২০১৬ ১০:১৭ অপরাহ্ন

pablo nerudaলাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক ভারতবর্ষে চাকরিসূত্রে এসেছিলেন। কেউ কেউ নিছক ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতি কৌতূহল থেকেও এসেছিলেন। আমাদের মনে পড়বে অক্তাবিও পাসের নাম, মনে পড়বে পাবলো নেরুদার নাম। মনে পরবে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের কথাও। এসেছিলেন হুলিও কোর্তাসারও ১৯৫৯ সালের দিকে। কলকাতা শহরের সাধারণ রাস্তাঘাটের দৃশ্যাবলির বর্ণনাসহ রয়েছে তাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ লেখাও। এসেছিলেন আর্হেন্তিনার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক রিকার্দো গুইরালদেসও ১৯১০ সালে, যিনি নিজ দেশে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর মাধ্যমে ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিতি হয়েছিলেন।

নেরুদা ভারতে এসেছিলেন তিনবার। প্রথমবার এসেছিলেন রেঙ্গুনে চিলির কনসালের চাকরি নিয়ে। ১৯২৭ সালের অক্টোবরে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করে ১৯২৯ সালের শুরু পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাটান। ফুন্দাসিওন পাবলো নেরুদার দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, ডিসেম্বরের শেষের দিকে তিনি শ্রীলঙ্কা থেকে মাত্র অল্প কয়েক দিনের জন্য ভারতের কলকাতায় এসেছিলেন। জানুয়ারির শুরুর দিকেই তিনি কলকাতা থেকে আবার শ্রীলঙ্কা ফেরেন। এ সফরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘ভারতীয় মহাসভা’র জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে এসে দেখা হয়েছিল মতিলাল নেহরু ও মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে। দেখেছিলেন সদ্য বিলেতফেরত জওহরলাল নেহরুকে। তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ স্বীকার করি বেঁচেছিলাম ( Confieso Que he vivido : memorias )-এ তিনি এর বর্ণনা দিয়েছেন, যা আনন্দময়ী মজুমদারের অনুবাদে পাবলো নেরুদার স্মৃতিচারণ গ্রন্থে বাঙালি পাঠকরা খুঁজে পাবেন।
এরপর তিনি আরো একবার ভারতে আসেন ১৯৫০ সালে। প্যারিস থেকে বিশ্বশান্তি আন্দোলনের লক্ষ্যে নেহরুকে দেওয়া জোলিও কুরির একটি চিঠি বয়ে আনার দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর ওপর। অক্টোবরের দিকে তিনি দিল্লিতে এসে নেহরুর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে সেই চিঠি হস্তান্তর করেন। এ যাত্রায় তিনি ১০ দিনের মতো ছিলেন স্বাধীন ভারতে।
আরো একবার তিনি ভারতে এসেছিলেন ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে। এ সফরের কথা কোথাও খুব একটা শোনা যায় না। নেরুদা নিজেও তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থে এ নিয়ে কিছুই বলেননি। তবে বিষ্ণু দের গ্রন্থে উল্লেখিত তথ্য থেকে জানা যায়, তিনি কলকাতা এসেছিলেন। ফুন্দাসিওন পাবলো নেরুদার সঙ্গেও এ তথ্য মিলে যায়। এ যাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্রাজিলের বিখ্যাত বামপন্থী লেখক জোর্জে আমাদো। এই তৃতীয় সফরে তিনি ভারতের কোন কোন জায়গায় কার কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ অন্য কোথাও–ইংরেজি বা স্প্যানিশে–পাওয়া যায় না।
প্রথমবার চাকরিসূত্রে যে উচ্ছ্বাস ও কৌতূহল নিয়ে তিনি প্রাচ্যে এসেছিলেন, তা দ্রুতই লুপ্ত হতে থাকে এ অঞ্চলের ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আবহের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণে। আত্মজীবনীতে তিনি ‘সিংহল’ অধ্যায়ে স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘সাহেব আর হিন্দুদের মাঝখানে পড়ে আমার জীবন হয়ে উঠল দুঃসহ। না পারতাম প্রতি সন্ধ্যায় ডিনার-জ্যাকেট চড়িয়ে ক্লাব আর নাচের আসরে যোগ দিতে, না সইত হিন্দুদের জাতিভেদের নিয়মকানুন। ভয়ানক একাকিত্ব তখন গ্রাস করেছে আমাকে (‘পাবলো নেরুদা, অনুসৃতি’)
চাকরিসূত্রে যে কয়টা দিন তিনি এ অঞ্চলে ছিলেন তার বেশির ভাগ সময়ই ছিল একাকিত্বের। এর বর্ণনা ওই অধ্যায়ের বেশ খানিকটা জায়গাজুড়েই দেখা যাবে। কলম্বোর ওয়েলাওয়াতিতে থাকার সময়কার অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে এভাবে : ‘একাকিত্বের যে কী অসহনীয় যন্ত্রণা–ওয়েলাওয়াতির ওই কটা বছরের জীবনেই আমি তা উপলব্ধি করেছিলাম। সঙ্গী বলতে ছিল একটি খাট, একটি টেবিল, দুটি চেয়ার আর আমার কুকুর ও বেজিটি। আর ছিল একজন ভৃত্য–যার নাম ছিল ভ্রাম্পি। এই নিঃসঙ্গতা আমার কিন্তু কবিতা লেখার কোনো উপাদানই দেয়নি বরং দিয়েছে বন্দিশালার অসহ্য যন্ত্রণা।’ (প্রাগুক্ত)
তিনি যদিও বলেছেন, এ নিঃসঙ্গতা তাঁকে লেখার কোনো উপাদান দেয়নি, কিন্তু তাঁর লেখার ইতিহাসের ক্রমপঞ্জি মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলেই দেখা যাবে ঘটনা ঠিক উল্টো। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত তাঁর Residencia en la tierra কাব্যগ্রন্থের প্রথম খণ্ডের বেশির ভাগ কবিতা লেখা হয়েছিল এই প্রাচ্যবাসের সময়।
এটা ঠিক যে প্রাচ্যবাস তাঁর জন্য যত একাকিত্ব ও দুঃসহ যন্ত্রণাই নিয়ে আসুক না কেন, এমনকি নেহরুর সঙ্গে তাঁর শীতল সাক্ষাৎ, দিল্লির বিমানবন্দরে পুলিশ ও শুল্ক বিভাগের লোকদের অপমানকর ও অমর্যাদাকর আচরণ সত্ত্বেও এ সময়ই তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখা জন্ম হয়েছিল রেঙ্গুন, শ্রীলঙ্কা ও কলকাতায়। এ ছাড়া তার প্রাচ্যদেশীয় রোমান্সের ঘটনা তো আছেই। বার্মিজ রমণী জোসি ব্লিস যাকে নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন, আর আছে ডাচ সেই নারী–মারিয়া আন্তোনিয়েতা হাগেনার–যার সঙ্গে ১৯৩০ সালে বিয়ে হয়, তার সঙ্গেও তিনি পরিচিত হন এই শ্রীলঙ্কার কলম্বোয়।
জোসি ব্লিসের সাথে তার সম্পর্ক ছিল তীব্র, তবে ক্ষণস্থায়ী। সম্পর্কের প্রগাঢ়তা ও তীব্রতা তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত Memoria de la isla Negra (iii) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘ভালোবাসা : জোসি ব্লিস’-এর মতো কবিতা। জোসির জন্য স্মৃতিকাতরতা নেরুদার সঙ্গী হয়েছিল বহুদিন। কবিতার সর্বশেষ স্তবকটি পাঠকের হৃদয়কে বিষণ্ন করে দেয় নেরুদার স্মরণ-কৌশল আর অভিব্যক্তি :
এখন, হয়তো-বা
বিশ্রামে শুয়ে আছে
হয়তো বা শুয়ে নেই
রেঙ্গুনের সুবিশাল গোরস্থানে
অথবা হয়তো সেই ইরাবতী নদীটির তীরে
সমস্ত বিকেলজুড়ে পুড়িয়েছে দেখখানি তার,
আর নদী সে সময় নিচু স্বরে বলে গেছে
বলতে যা পারতাম কান্নাভেজা স্বরে।

নেরুদা এই অবিস্মরণীয় প্রেমিকার কথা মনে করতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “মিষ্টি মেয়ে জোসি ব্লিস আমার প্রতি এতটাই আবেগঘন আর আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল যে শেষ পর্যন্ত সে ঈর্ষায় আক্রান্ত হয়ে পড়ল। এ রকম না হলে হয়তো তার সাথে আমার জীবনটা চিরকাল কেটে যেত।”
জোসি ব্লিসের সাথে সম্পর্কের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে একাধিক কবিতা তিনি লিখেছিলেন। তিনি নিজেই ওই একই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন :
“হ্যাঁ, জোসি ব্লিস ছিল এমন এক নারী আমার কবিতায় যার গভীর প্রভাব মুদ্রিত হয়ে আছে। আমি সব সময়ই তাকে স্মরণ করি, এমনকি আমার সাম্প্রতিক বইগুলোতেও।” ( Interview with Reta Guibert )
আধা ডাচ-আধা মালয়ী মারিয়া আন্তোনিয়েতা হাগেনার-এর সাথে নেরুদার বিয়ে হলেও জোসি ব্লিসই তার জীবনে সবচেয়ে বেশি গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কারণ হাগেনার বিয়ের অল্প কিছুদিন পরই মারা গিয়েছিলেন। জোসি ব্লিসের ঈর্ষাময় প্রেম থেকে বাঁচার জন্য একাকী না হলে এবং হাগেনারের মৃত্যু না হলে হয়তো নিঃসঙ্গতা এতটা দুঃসহ হয়ে উঠত না নেরুদার জন্য।
সুতরাং দুঃসহ একাকিত্বের যন্ত্রণার সঙ্গেই যমজ ভাইবোনের মতো সৃষ্টিশীলতা ও রোমান্সের উষ্ণ ধারা প্রবহমান ছিল একটা সময় পর্যন্ত। সত্য বটে, নেরুদা এ অঞ্চল সম্পর্কে অক্তাবিও পাসের মতো কৌতূহলী ছিলেন না। পাসের মতো তিনি প্রাচ্যকে আবিষ্কার করতে চাননি। পাসের জীবনে ভারত এনে দিয়েছিল ‘পরিপক্বতা’, অন্যদিকে নেরুদার জীবনে এ পর্বটি ছিল বন্দিত্বের। কিন্তু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, এ বন্দিত্বের মধ্যেই উন্মুক্ত হয়েছিল তার সৃষ্টিশীল সত্তা; জন্ম নিয়েছিল কয়েকটি কবিতা, ছোট ছোট কয়েকটি গদ্য, আর আর্হেন্তিনীয় লেখক ও বন্ধু এক্তর এয়ান্দিকে লেখা সেই বিখ্যাত চিঠিগুলো। এ ছাড়া রয়েছে চিলির লেখক বন্ধু হোসে সান্তোস গনজালেস বেরা ও মাকে লেখা চিঠিপত্র। ‘অনুস্মৃতি’র বাইরে, উপরোক্ত এসব লেখায় নেরুদার নিঃসঙ্গতার পাশাপাশি দেখতে পাব তাঁর অন্তরঙ্গ উন্মোচন।
‘আত্মস্মৃতি’তে নেরুদা প্রাচ্যদেশীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেক কথাই বলেছেন, আবার অনেক কথাই আমাদের জানাননি সেখানে। সেসব অজানা কথার কিছু সন্ধান পাওয়া যাবে সে সময়ের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আর তাঁর বিভিন্ন বইয়ের স্প্যানিশ সংস্করণগুলোয়।
১৯২৭ সালে মাদ্রিদ থেকে প্যারিস, পোর্ট সৈয়দ, জিবুতি, কলম্বো, সিঙ্গাপুর হয়ে রেঙ্গুন পৌঁছানোর আগে বঙ্গোপসাগরে এলসিমোর ( Elsimor ) জাহাজে বসে লিখেছিলেন ‘El sueño de la tripulacion’ বা ‘the Dream of crew’ শিরোনামে কাব্যময় এক গদ্য-টুকরো। এটি ভ্রমণকালীন জাহাজে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষজনের বর্ণনা। তবে বর্ণনাটা ঘুম আর স্বপ্নকে কেন্দ্রে রেখে। লেখাটির এক জায়গায় তিনি বলছেন :
“হিন্দুরা কাপড় দিয়ে চোখ-ঢেকে ঘুমায়, জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে মৃত্যুর স্মারক এই আচ্ছাদনের মাধ্যমে। কেউ কেউ হৃৎপিণ্ড বরাবর বুকের কাছে আলতোভাবে হাত রেখে তীব্র স্বরে নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়ে।”
(Pablo Neruda: Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-87)
বঙ্গোপসাগর এলাকায় থাকতে থাকতেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি কবিতা লেখেন, যা পরে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত Residencia en la tierra-1 গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। কবিতাটির শিরোনাম Coleccion Nocturna বা Nocturnal Collection. কবিতাটির রচনাকাল কেবল ১৯২৭ সাল উল্লেখ করা হলেও এটি সম্ভবত লেখা হয়েছিল ওই বছরের সেপ্টেম্বরের দিকেই। কারণ আগের লেখাটির রচনাকাল সেপ্টেম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুটো লেখাই যে কাছাকাছি সময়ে তার আরেকটি প্রমাণ রচনাস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘বঙ্গোপসাগর রেঙ্গুন ১৯২৭’ বলে। আগের লেখাটির যে উদ্ধৃতি একটু আগে হাজির করা হয়েছে, তার এক কাব্যিক রূপান্তর দেখা যাবে এই কবিতাটির এক জায়গায় :
ঘুমন্ত মৃতদেহ যারা প্রায়শই
হাত ধরে নেচে যায় আমার মর্মযাতনায়,
কত যে ধূসরতর শহর বন্দর আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি।

(Pablo Neruda: Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-87)
পরের মাসে তিনি রেঙ্গুনে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৯২৯ সালের শুরু পর্যন্ত অবস্থান করেন। ১৯২৮ সালে তিনি আলবারো ইনোহোসাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ান ইন্দোচীন, সাইগন, ব্যাংকক, বাট্টামব্যাং এবং বেরেমবার্গ। ফেব্রুয়ারিতে তিনি চীনে যান। কাউলুন, হংকং ও সাংহাই থেকে পরে জাপানে যান। সাংহাই অবস্থানকালে তিনি ফেব্রুয়ারিতে ‘Invierno en los puertos ‘ বা ‘নানান বন্দরে শীতকাল’ শিরোনামে একটি ভ্রমণাখ্যান লেখেন, যা তার ‘আত্মস্মৃতি’তে ঠাঁই পায়নি। বাট্রামবাং, বেরেনবেং, সাইগন, ব্যাংকক, চীন, কাউলুন, হংকং, নানকিন, সাংহাইসহ বিভিন্ন শহর বন্দর ভ্রমণের ওপর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এই লেখাটি।
১৯২৮ সালের ১১ মে নেরুদা এয়ান্দিকে রেঙ্গুন থেকে এক চিঠিতে তাঁর নিঃসঙ্গতার কথা জানান। এই চিঠির এক জায়গায় তিনি লেখেন : ‘মাঝেমধ্যে দীর্ঘ সময়ের জন্য আমি এত শূন্য হয়ে থাকি যে না থাকে কোনো কিছু প্রকাশের শক্তি, না পারি নিজের অভ্যন্তর খনন করতে। তীব্র কাব্যিক ব্যাকুলতা আমাকে ছেড়ে যায় না।’
(Pablo Neruda: Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-87)
রেঙ্গুনে লেখা আরো একটি জার্নাল ধরনের টুকরো গদ্য রয়েছে যার শিরোনাম La noche del soldado (সৈনিকের রাত), এটি পরে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত ‘মর্তের বাসিন্দা’ বা Residencia en la tierra -এর প্রথম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, যেখানে তার নিঃসঙ্গ অবস্থার পাশাপাশি রয়েছে সেখানকার জীবনশৈলী ও সাংস্কৃতিক জীবনের ওপর তার পর্যবেক্ষণ।
নিঃসঙ্গতার একটা চমৎকার কাব্যিক বর্ণনা আছে এই লেখাটির তৃতীয় স্তবকের শেষ পংক্তিটিতে : ‘একই অবস্থানের ঘণ্টাগুলো আমার দু’পাকে ঘিরে আছে। দিবস ও রাত্রির রূপে দিন যেন প্রায় সবসময় আমার ওপর থমকে আছে।’ (Pablo Neruda : Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-87)
এর পরের মাসে (জুলাই ১৯২৮) লেখেন তিনি Juntos nosotros (আমরা একসঙ্গে) শিরোনামে রেঙ্গুনে তাঁর প্রথম কবিতাটি। একই বছরের জুলাই-আগস্টে লেখেন Sonata Y Desctrucciones (সোনাটা ও ধ্বংস) কবিতাটি।
৬ আগস্ট রেঙ্গুন থেকে চিলির লেখক বন্ধু হোসে সান্তোস গনছালেস বেরাকে লেখেন এক চিঠি, যাতে তিনি এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বর্ণনার পাশাপাশি জানাচ্ছেন তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের সম্ভাব্য শিরোনাম–মর্তের বাসিন্দা। ধর্মীয় সংস্কৃতির সূত্রে তিনি চিঠির শুরুতেই বলছেন : ‘এক বছরেরও বেশি হয়ে গেল এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে। চমৎকার এই জায়গাটার এমন সব লোকজনের মধ্যে আছি যারা গরু আর সাপকে পূজা করে। ….’ (Pablo Neruda : Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-99)
নিজের নিঃসঙ্গতার কথা জানিয়ে এই একই চিঠিতে তিনি বলছেন : ‘কথা বলি আমার কাকাতুয়ার সঙ্গে, একটা হাতিকে মাসকাবারি টাকা দিই। দিনগুলো আমার মাথার ওপর লাঠির মতো এসে পড়ে; কিছুই লিখছি না কিছুই পড়ছি না, সাদা কাপড়-পরা মাথায় শোলার টুপি, একেবারে বিশুদ্ধ ভূত,…’ (Pablo Neruda : Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-99)
বন্ধুর কাছে নিজের নিঃসঙ্গতার একটা অন্তরঙ্গ ছবি তুলে ধরার স্বার্থে, নিছক অভিব্যক্তি হিসেবে ‘কিছুই লিখছি না’ বললেও তিনি লিখছিলেন অনেক কিছুই।
আগস্ট মাসেই তিনি লেখেন El joven monarca (তরুণ রাজা) নামে একটি কাব্যধর্মী টুকরো গদ্য বা গদ্য কবিতা। এটিও পরে মর্তের বাসিন্দায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
৮ সেপ্টেম্বর এয়ান্দিকে আরেকটি চিঠি লেখেন, যেখানে তার মর্তের বাসিন্দা শেষ করে এনেছেন বলে জানিয়েছেন। রেঙ্গুনে পরের মাসেই (অক্টোবর ১৯২৮) লেখেন Diurno Doliente (যন্ত্রণার দিন) নামে একটি কবিতা।
সম্ভবত নভেম্বর-ডিসেম্বর-=-দুটি মাসই তিনি কলকাতায় কাটান। কারণ এখানে লেখা তার দুটি বিখ্যাত কবিতার রচনাকাল এবং রচনাস্থান সেই সাক্ষ্যই দেয়। নভেম্বরে লেখেন তিনি Tango del viudo (বিপত্নীকের তাঙ্গো) নামক সেই বিখ্যাত কবিতাটি যা তাঁর খ্যাতি ও কাব্যকৃতির এক আশ্চর্য নমুনা। এরই ধারাবাহিকতায় লেখেন আরো একটি অসাধারণ কবিতা Arte poetica (শিল্পতত্ত্ব বা কাব্যতত্ত্ব) যা তাঁর কাব্যকৃতির মূল দর্শনকে তুলে ধরে।
এই দুটি কবিতাও তার মর্তের বাসিন্দা গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সম্ভবত ১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি কলকাতা ছেড়ে চলে আসেন শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয়। এখান থেকে ১৪ মার্চ মাকে এক চিঠিতে তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের কথা জানান। একই সঙ্গে জানান এখানকার পরিবেশ ও জীবনে তাঁর অনুভূতির কথা।
প্রাচ্যজীবনের সঙ্গে নেরুদা খাপ খাওয়াতে না পেরে নিঃসঙ্গ ছিলেন বটে; কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তা স্তব্ধ ছিল না। একাকিত্ব ও যন্ত্রণা, তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তাকে যে গভীরতা ও মুখরতা এনে দিয়েছিল, তা নেরুদার কাব্যজীবনের উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি।

কাউকে করো না দায়ী

কারোর বিরুদ্ধ তুমি কোরো না নালিশ কখনোই,
কোন কিছুকেই দায়ী কোরো না কখনো;
কারণ জীবনে তুমি যা চেয়েছ
তা-ই তুমি করেছ মূলত।
মেনে নাও নির্মানের অন্তরায় আর
নিজেকে শোধরানোর শুরুর সাহস।
ভুলের ভস্ম থেকে উঠে আসে প্রকৃত
মানুষের সফলতা।
কখনো কোরো না দায়ী নিয়তি ও একাকিত্বকে
মোকাবেলা করো সব সাহসের সঙ্গে।
যেকোনভাবেই হোক-এ তোমারই কাজের ফসল,
তুলে ধরো নিয়ত জয়ের লক্ষণ।
নিজের ব্যার্থতায় তিক্ত হোয়ো না আর
অন্যের কাঁধে তাকে দিয়ো না চাপিয়ে,
এই বেলা মেনে নাও কিংবা শিশুর মতো
ভাববে তুমি নিজেকে সঠিক।
যেকোন সময়েই, শোনো, সুসময় সূচনা করার
ভন্ডুলের জন্য এত ভয়ানক আর কিছু নেই।
ভুলো না, তোমার এই মূহুর্তের কারণটি তোমারই অতীত
যেমন তোমার ভবিতব্যের কার্যকরণ
হবে এই মুহুর্ত তোমার।

শিখে নাও হিম্মত ও বল
তোয়াক্কা যে করবে না পরিস্থিতির;
বেঁচে রও উজানে ও তোমার নিজের
মসিবত নিয়ে ভাবো কম, কাজ করো বেশী।
তোমার সমস্যাগুলো এমনিই ঝরে পড়ে যাবে।
বেদনার মধ্য থেকে জন্ম নিতে শেখো
বাধার চেয়েও বেশী বড় হয়ে ওঠো।
নিজের দর্পণে দেখো নিজেকে এবং
মুক্ত হও, বলবান হও;
হয়ো না পুতুল তুমি পরিস্থিতির,
কেননা নিজেই তুমি নিজের নিয়তি।
ওঠো, দেখো প্রতুষ্যের সুর্যের দিকে
নাও শ্বাস ভোরের আলোয়।
তোমার জিন্দেগিরই অংশ যে তুমি;
চোখ খোলো, যুদ্ধ করো, হাটো আর ঠিক করো তোমার
নিশানা;
জয় করো জীবনকে,
নিয়তির কথা তুমি ভেবো না কখনো
কেননা নিয়তি হল:
ব্যর্থতারই অজুহাত।

এখানে নাজিম হিকমত

Nazim
অনূদিত কবিতাটি সম্পর্কে দুটি জরুরি কথা পাঠকদের আগেই জানিয়ে রাখি। ইংরেজিতে অনূদিত নেরুদার কবিতার যে বইগুলো সহজলভ্য তাতে এ কবিতাটি আমি খুঁজে পাইনি। তবে ইন্টারনেটের বদৌলতে এটি স্প্যানিশ ভাষায় পাওয়া যায়। আমার উৎস এ ইন্টারনেট। এর দু-একটি ইংরেজি অনুবাদও আছে এ কবিতাটির নেরুদার অনুরাগী পাঠকদের কোনো কোনো ওয়েবসাইটে। তবে আমি নির্ভর করেছি স্প্যানিশ সংস্করণটিতেই। আরেকটি জরুরি কথা হলো এই যে হাতের কাছে নেরুদার স্প্যানিশ রচনাসমগ্র বা কবিতাসমগ্র না থাকায় এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলতে পারছি না কবিতাটির রচনা বা প্রকাশকাল। সম্ভবত ১৯৫১ সালে মস্কোতে পরস্পরের সাক্ষাতের পর রচিত।

সদ্য মুক্তি পাওয়া
বন্দীদের একজন নাজিম হিকমত
তার কবিতার মতো
লাল রং সোনার সুতায়
বোনা জামা উপহার দিয়েছে আমায়।

তুর্কি লহুর সুতাগুলো
তার পদাবলি।
প্রাচীন প্রত্যয়ে গড়া,
—বাঁকা বা সরল—
সত্যিকার গল্পগুলো
ভোজালি বা তরবারির মতো।
গোপন কবিতাগুলো তার
আলোকিত দুপুরের
মুখোমুখি হবে বলে তৈরি হয়েছিল;
আজ তারা লুকায়িত আয়ুধের মতো,
জ্বলজ্বল করছে তারা মেঝের নিচে,
কুয়ার ভেতরে তারা অপেক্ষমাণ,
তার জনতার কালো চক্ষুযুগলের
দুর্গম আঁধারের নিচে।
বন্দিশিবির থেকে সে এল আমার
ভাই হতে আর
আমরা হেঁটেছি একসাথে
বরফে মোড়ানো স্তেপে;
রাত ছিল প্রজ্বলিত
আমাদের নিজস্ব আলোয়।

দেহের গড়ন তার ভুলব না বলে
আমি তার প্রতিকৃতি আঁকছি এখানে:

পুষ্পময় ভূখণ্ডের শান্তিতে উত্থিত
টাওয়ারের মতো
লম্বা সে
এবং ওপরে
তুর্কি আলোয় ভরা চক্ষুযুগল
দুটি বাতায়ন।

আমরা দুই ভবঘুরে
পেয়েছি শক্ত ভূমি আমাদের
পায়ের তলায়
বীর আর কবিদের
বিজিত ভুবন,
মস্কোর রাস্তায়, দেয়ালে দেয়ালে
পুষ্পিত হতে থাকে
পূর্ণিমার চাঁদ,
রমণীর প্রতি প্রেম
আনন্দ আর
প্রণয়ের প্রতি অনুরাগ
আমাদের একমাত্র গোত্র-পরিচয়।
সমগ্র বাসনাকে ভাগ করে নেওয়া,
সর্বোপরি, জনতার সংগ্রামের এক একটি ফোঁটা,
মানবসমুদ্রের ফোঁটাগুলো
তার আর আমার কবিতা।

কিন্তু
হিকমতের আমোদের অন্তরালে
অন্য এক নির্মাণ,
নির্মাণ ছুতারের মতো
কিংবা দরদালানের ভিত্তির মতো।

বহু বছরের নীরবতা
আর কারাবাস।
এসব বছর
বসাতে পারেনি দাঁত,
কিংবা পারেনি খেতে, গিলে ফেলতে
বীরোচিত যৌবনেরে তার।

আমাকে সে বলেছিল
দশ বছরের বেশি
বিজলিবাতির আলো
রাখত জ্বালিয়ে ওরা সমস্ত রাত
আজ সে গিয়েছে ভুলে সেই সব রাত
ভ্রুক্ষেপ নেই তার বিদ্যুতালোকে।
ডোবার ফুলের মতো
তার আমোদের
কালো রং শিকড়-বাকড়
প্রোথিত স্বদেশে;
আর তাই
যখন সে হাসে,
মানে নাজিম,
মানে নাজিম হিকমত
তখন সে হাসি নয় তোমার মতন;
তার হাসি অনেক সফেদ,
তার সে হাসিতে হাসে চাঁদ
নক্ষত্র,
শরাব,
মৃত্যুহীন মৃত্তিকা,
তাবৎ সোনালি ধান জানায় সম্ভাষণ
তার হাসি দিয়ে।
তার কণ্ঠে গান গায় মাতৃভূমি তার।

আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিনের অন্যান্য প্রবন্ধ:
বোর্হেস সাহেব

অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা

“একজন তৃতীয় সারির কবি”: রবীন্দ্রকবিতার বোর্হেসকৃত মূল্যায়ন

রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথ

কার্লোস ফুয়েন্তেসের মৃত্যু:
সমাহিত দর্পন?

মান্নান সৈয়দ: আমি যার কাননের পাখি

বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আঁদ্রে মালরো

স্পানঞল জগতে রবীন্দ্র প্রসারে হোসে বাসকোনসেলোস

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ:
‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে আমার কয়েক টুকরো স্মৃতি

বনলতা সেনের ‘চোখ’-এ নজরুলের ‘আঁখি’

ন্যানো সাহিত্যতত্ত্ব: একটি ইশতেহার

যোগ্য সম্পাদনা ও প্রকাশনা সৌষ্ঠবে পূর্ণ বুদ্ধাবতার

দিয়েগো রিবেরার রবীন্দ্রনাথ: প্রতিপক্ষের প্রতিকৃতি

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: তাহলে গানের কথাই বলি

অজ্ঞতার একাকীত্ব ও আমাদের মার্কেস-পাঠ

আবেল আলার্কন: স্পানঞল ভাষায় গীতাঞ্জলির প্রথম অনুবাদক

জামান ভাই, আমাদের ব্যস্ততা, উপেক্ষা ও কদরহীনতাকে ক্ষমা করবেন

এদুয়ার্দো গালেয়ানোর ‘দর্পন’-এ বাংলাদেশ ও অন্যান্য

প্রথমার প্রতারণা ও অনুবাদকের জালিয়াতি

আবুল ফজলের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

আবু ইসহাকের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

কুদরত-উল ইসলামের ‘গন্ধলেবুর বাগানে’

মহীউদ্দীনের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

বোর্হেস নিয়ে মান্নান সৈয়দের একটি অপ্রকাশিত লেখা

অকথিত বোর্হেস: একটি তারার তিমির

ধর্মাশ্রয়ী কোপ

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা সম্পর্কে অক্তাবিও পাস

লাতিন আমেরিকার সাথে বাংলার বন্ধন

উপেক্ষিত কাভাফির অর্জুন ও আমরা

Flag Counter

শাপলা সপর্যিতার সাতটি কবিতা

শাপলা সপর্যিতা | ১৩ জুলাই ২০১৬ ১:১২ অপরাহ্ন

ঋষির ঠোঁটে প্রেম

ফের উঠে আসে জল ছল ছল শব্দে সে প্রপাত।
মানুষের বুকে পাথর। অন্ধ ধারাজল। ঋষির ঠোঁটে প্রেম।
অবাধ লীলা সঙ্গম। কোনো এক অনামা পাখি
কবে বুঝি গর্ভে নিয়েছিল মানুষের বীজ। জন্ম দিয়েছিল মানুষ।
বুকে পাখির প্রাণ।
তাই আজন্ম পাখির মতো উড়ে উড়ে বেড়ালো জীবনভর।
ঢেউয়ে ঢেউয়ে জলপ্রপাতের ধারায়।
ভাঙলো ঘর। ভাঙলো বাড়ি। প্রেম, আলোর নিকেতন।
তারপর দীর্ঘপাখা মেলে চলে গেল…
কোথায় মথুরা বৃন্দাবন। আহা মানুষ।
উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে অবশ-বিবশ।
Shapla
ঘোড়সওয়ার

সন্দিগ্ধ সন্ধ্যায় পায়রা ওড়ে আকাশে। সুনির্দিষ্ট সময়, পারবে কি?
পৌঁছুতে নিয়ে যক্ষপ্রিয়ার কাছে? চিঠি অমরাবতী?
হায় মেঘের দেবতা কবে যেন দিয়েছিল রৌদ্র সকাল
রূপবতী রূপালি আকাশ মেঘে মেঘে এঁকেছিল
কত না রাজকন্যার মুখ, আলসে মায়াবী চাঁদের ছায়ায়
কত না জোছনার নুপূর নিক্কন। ক্লান্ত বেজে বেজে। অধীর অপেক্ষায়।
তবু কেন ঢেকে যায় আঁধারে পৃথিবীর মুখ?
কেন রাজার কুমার সাত সমুদ্রের পাতাল থেকে তুলে আনে
অথচ খুঁজে পায় না রাজকন্যার দেখা। আহ । এ কি বেঘোর মরণ।
জনমে জনমে মরণের পিছে পিছে
ঘোড়সওয়ার। সে এক মায়াবী জীবন! (সম্পূর্ণ…)

মোহাম্মদ রফিক: তাদেরকে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ১১ জুলাই ২০১৬ ৬:৪৮ অপরাহ্ন

Rafiq
ছবি: নাসির অালী মামুন

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার আপনি এ অঞ্চলের মাটি মানুষ জনসংস্কৃতিকে আপনার কবিতার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গুলশান হামলার এই ঘটনার পর সবার মধ্যে যেনো একটা ভীতি ঢুকে গেছে। এ দশায় করণীয় কি স্যার বাঙালির। বাঙালি এখন কি করবে?
মোহাম্মদ রফিক: তুমি যে বাঙালি বলছো তার মধ্যেই তুমি উত্তর দিয়ে দিয়েছো। বাঙালি আরো বাঙালি হবে। বাঙালিকে আরো বাঙালি হতে হবে। আমরা ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, এবং এদের বিরুদ্ধেই তো মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। এদের মতো ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা কিছু মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই তো দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা কি মন্ত্রে দেশ স্বাধীন করেছি! অন্য যা কিছু থাক, আমাদের মূল উদ্দ্যেশের জায়গা ছিলো, আমরা আমাদের বাঙালিত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা আবির্ভূত হয়েছিলাম এদের সাথে লড়াই করে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনেক তরুণরা ধর্মীয় রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, এমনকী তারা জীবনের তোয়াক্কা করছে না। গুলশানের হামলায় বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা বিশজন মানুষকে জবাই করে হত্যা করেছে, তাদের এই মোটিভেশনের কারণ কি বলে মনে করেন আপনি?
মোহাম্মদ রফিক: আজকের তরুণদের বিভ্রান্ত হওয়ার বড় কারণ, তাদের সামনে কোন মন্ত্র নেই। তারা জানে না, তারা কেনো জীবন ধারণ করছে। তাকে যদি এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করা যায়, যেটা আমাদের মতোই, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব বলে আমি মনে করি, যে, তাকে বোঝাতে হবে, তুমি বাঙালি, তোমার বাঙালি সত্ত্বাকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে হবে— তাহলে দেখবে এই জঙ্গিবাদের ক্ষমতা অনেক কমে যাবে। (সম্পূর্ণ…)

শহরে অচেনা মাছ

আবদুস সেলিম | ৯ জুলাই ২০১৬ ১০:৪৫ অপরাহ্ন


সূচনা

William
২০০৪ সালে “উইল ইন দ্য ওয়াল্ড” গ্রন্থের প্রণেতা স্টিফেন্ গ্রিনব্লাট্ বলছেন, এ এক বিস্ময়কর ঘটনা– এক অজানা অচেনা তরুণ যাঁর না ছিলো কোনো স্বচ্ছল সম্পদ, না কোনো পারিবারিক প্রতিষ্ঠা এবং সর্বোপরি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সনদ– সেই তরুণ ১৫৮০-এর দশকের সুদূর এক মফস্বল থেকে লন্ডন শহরে এসে খুবই অল্প সময়ের ব্যবধানে শুধু মাত্র তাঁর সময়েরই নয়, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকার রূপে নিজেকে উন্মোচিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই শহরের অচেনা মাছ উইলিয়ম শেক্সপিয়র-এর ছেলেবেলা কেমন ছিল এবং তাঁর সাহিত্যকর্মে তা কোনোভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে কিনা সে বিষয়ে খুব কমই অবহিত আমরা। অনুমান করা হয় তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৫৬৪ সালের ২৩ থেকে ২৬ এপ্রিলের কোনো এক দিনে। বিষয়টি এমন শেক্সপিয়-এর দীক্ষিত নামকরণ (baptism)-এর নিবন্ধন হয় ২৬ এপ্রিল ১৫৬৪। কিন্তু গীর্জায় নামকরণ নিবন্ধনের তদানিন্তন রীতিমাফিক শিশুর জন্মের তিন দিন পরে এই কার্যক্রম সম্পন্ন করা হতো। ফলে একাধিক জীবনীকার মনে করেন, যদিও সালটি সঠিক, জন্মের তারিখটি ২৬ নয়, ২৩। (সম্পূর্ণ…)

সম্পাদকীয়: আনন্দপাঠ ২০১৬

| ৮ জুলাই ২০১৬ ১:৩৬ পূর্বাহ্ন

ঈদ ফিরে ফিরে আসে। আসে সময়ের বিবর্তনে। নতুন পরিপ্রেক্ষিতে, নতুন অনুষঙ্গ নিয়ে। ঈদের স্থায়ী অনুষঙ্গ মূলত দুটি: আনন্দময়তাও সৃষ্টিশীলতা। এর সঙ্গে এবারে যুক্ত হয়েছে অন্য অনাকাঙিক্ষত বৈপরীত্য: শঙ্কা ও সংশয়। জুলাই মাসের শুরুতে গুলশানের একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় মানবতাবিরোধী চক্র ও হন্তারক সন্ত্রাসীদের হামলার ফলে যে নির্মমতম হত্যাকাণ্ড সঙ্ঘটিত হলো, তাতে ভিত নড়ে গেছে বিশ্বব্যাপী মানবিকঅখণ্ডতার। ভিত নড়ে গেছে মানুষে মানুষে পারস্পরিক আস্থা,বিশ্বাস আর সহমর্মিতার। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্রতম প্রতিবাদ করছি। ধর্মবর্ণদেশজাতিনির্বিশেষে লোকান্তরিত সকল আত্মার সদগতি কামনা করছি।
এই বর্বরতম ক্ষত শুকাতে হয়তো সময় লাগবে অনেক। তবু আমরা পিছু হটে যাবোনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে এই সংকটে জয়ী হতে হবে। ফলে এবারের ঈদের নতুন অনুষঙ্গ হচ্ছে মানবিকতার বিকল্পহীন বিজয়ের শপথ। আত্মিক ও নৈতিক বিচারে মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হতে হবে। ধর্মবর্ণগোত্রদেশজাতিনির্বিশেষে সব মানুষের দিকে বাড়াতে হবে নিশর্ত সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত। মত-পথ-বিশ্বাস নির্বিশেষে সর্বমানবিক আনন্দযজ্ঞে শরিক হতে হলে এই নান্দনিক সহমর্মিতার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের বিশ্বাস, মানুষের সম্মিলিত সৃষ্টিযাত্রা বিজয়ী হবেই।
বরাবরের মতো এবারেও আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য ‘পাঠ-আনন্দ’। গত কয়েক বছর ধরে ঈদ-সংখ্যা প্রকাশ করে লেখক-পাঠক সেতুবন্ধ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে‘বিডিনিউজ’। প্রাথমিক পর্যায়ে ২০০৪ সালে ‘বিডিনিউজ’ নবায়িত আঙ্গিকে সংবাদ কার্যক্রম শুরু করে। অতঃপর ২০০৬ সাল থেকে পরিবেশিত বিষয় ও আঙ্গিকে যুক্ত হতে থাকে নতুন মাত্রা। বদল হয় মালিকানাও। পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান সম্পাদক জনাব তৌফিক ইমরোজ খালিদীর গতিশীল নেতৃত্বে নতুনভাবে সংগঠিত হয় ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম’। ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথম প্রহর থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারনেট সংবাদপত্র রূপে আত্মপ্রকাশ করে। (সম্পূর্ণ…)

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঈদ উৎসব

শামসুজ্জামান খান | ৭ জুলাই ২০১৬ ৬:৪৮ অপরাহ্ন

ঢাকার সাবেক কালের সমন্বিত সাংস্কৃতিক জীবনের কিছু নতুন দিক এখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। ঢাকার নওয়াবরা উর্দুভাষী হিসাবে বাঈজিনাচ, মহরমের মিছিল, ঈদোৎসব, কাওয়ালি বা জয়বারী গানবাজনার সঙ্গে যেমন জড়িত ছিলেন তেমনি হিন্দুদের দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমি, ঝুলনযাত্রা ইত্যাদিতেও যোগ দিতেন। নওয়াব পরিবারের ডায়েরিতে ঢাকার সমাজ ও সংস্কৃতি (সম্পাদনা- অনুপম হায়াৎ) গ্রন্থ থেকে জানা যাচ্ছে নওয়াবরা বাংলা নববর্ষ, নবান্ন, গায়ে হলুদ, মেয়েদের ঘুড়ি উৎসব, পৌষ সংক্রান্তি এমনকি ষষ্ঠী প্রভৃতি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান করতেন এবং এসব উৎসবেও অংশ নিতেন।
১৯১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি তারিখের খাজা মওদুদের ডায়েরিতে লেখা আছে : “আজ সোমবার। পৌষ-সংক্রান্তির দিন। নওয়াবজাদী আমেনা বানু আজ আহসান মঞ্জিলে ঘুড়ি ওড়ানো উৎসবের আয়োজন করেন। এতে তিনি শুধু মহিলাদের দাওয়াত দেন। মহিলাদের এই আনন্দ উৎসবে সারা দিন রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া ও নাচগানের এন্তেজাম করা হয়। পরের বছর নওয়াববাড়ির গোলতালার পারে পুরুষদের ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা বা ‘হারিফি’ খেলা অনুষ্ঠিত হয়। খাজা হুমায়ুন কাদের এতে অংশ নেন। এতে বিপুল দর্শক সমাগম ঘটে।”
ঈদোৎসবে নওয়াবরা নানা আমোদ-ফূর্তির ব্যবস্থা করতেন : যেমন কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারের নাটক ঢাকার নওয়াব বাড়িতে প্রদর্শন, জাদু ও সার্কাস দেখানো, বায়োস্কোপ দেখা বা কোনো খেলাধুলার আয়োজন। পাটুয়াটুলির ক্রাউন থিয়েটার, জগন্নাথ কলেজ, ন্যাশনাল মেডিকেল ইত্যাদির মঞ্চে বায়োস্কোপ দেখার তথ্য যেমন আমরা পাই তেমনি পিকচার হাউস, এম্পায়ার থিয়েটার ইত্যাদিতে সিনেমা উপভোগের রূপছায়াময় বিবরণ পাওয়া যায় নওয়াব পরিবারের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে। নওয়াবেরা ঈদের এমন সব বিনোদনে অংশগ্রহণের জন্য পরিবারের ছেলেমেয়েদেরও সুযোগ করে দিতেন ।
ঈদ নিয়ে নওয়াব বাড়িতে দু’একবার বিবাদ-বিসম্বাদও বেধে যায়। ১৯২০ সালের ২৫ আগস্টের খাজা শামসুল হকের ডায়েরিতে লেখা হয়েছে– ‘বকরা ঈদ নিয়ে নওয়াব বাড়ির দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ হয়। এক পক্ষে খাজা মোঃ আজম ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করেন যে, আজ বকরা ঈদ হবে। অপর পক্ষে নওয়াব হাবীবুল্লাহ ঢোল পিটিয়ে দেন যে, আগামীকাল ঈদ হবে। শেষ পর্যন্ত ওই বছর ঢাকায় দুই দিন বকরা ঈদ হয়। ১৯২২ সালের ঈদ-উল-আযহার ব্যাপারেও একই ঘটনা ঘটে।’ (সম্পূর্ণ…)

জন্মের আগেই আমি মৃত্যুকে করেছি আলিঙ্গন

তারিক সুজাত | ৬ জুলাই ২০১৬ ৩:১৬ অপরাহ্ন

[গুলশান হত্যাকান্ডে নিহত ইতালীয় নাগরিক অন্তস্বত্ত্বা

নারী সিমোনা মনটির অনাগত শিশু মাইকেলেঞ্জেলো স্মরণে]

জন্মের আগেই আমি মৃত্যুকে করেছি আলিঙ্গন
আমার কোন দেশ নেই, ভাষা নেই, জাতি নেই
ধর্ম-অধর্ম, পাপ-পূণ্যের ভেদাভেদ নেই
জীবনের বিভৎস রূপ দেখে জন্মের আগেই
আমি ক্রন্দনকে গিলে ফেলেছি।
আমার প্রথম নিঃশ্বাস পৃথিবীর বায়ুমন্ডল
একটুও বিষাক্ত করেনি
শেষ নিঃশ্বাসই এ পৃথিবীর কাছ থেকে পাওয়া
আমার প্রথম উপহার!
মা,

তুমিই আমার খেলাঘর, আমার স্কুল, আমার কফিন
আমার চোখ ফোটেনি তবু আমি দেখেছি
জল্লাদের ধারালো নখে ছিঁড়ে যাচ্ছে আমার নাভি
আমার কান তৈরী হলো না
তবু আমি শুনলাম স্কুলের ছুটির ঘন্টা,
ঐ অচেনা শব্দ গীর্জা, মন্দির আর মসজিদের মিনারে
প্রতিধ্বনি তুলে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো…
আমার প্রথম শয্যাই আমার শেষ শয্যা
মাতৃগর্ভই আমার অদেখা পৃথিবীর একমাত্র গৃহকোণ।
সেখানেও গাঢ় অন্ধকার নেমে এলো
রক্তের নদীতে আমি আমার মায়ের নাড়ি ধরে (সম্পূর্ণ…)

আনন্দপাঠ: ঈদের কবিতা

| ৬ জুলাই ২০১৬ ১:৪১ অপরাহ্ন

আসমান থেকে জমিনে
আমানুল্লাহ কবীর

যাকে কেউ চেনে না, চোখে দেখে নাই
তিনিই কি ভগবান?
তিনিই কি দাঁড়িয়ে দুয়ারে?
দুয়ার খুলে দাও, পেতে দাও সিংহাসন,
আয়োজন করো, তিনি আজ অতিথি
সাত আসমান থেকে জমিনে।

দিবারাত্রির আলো-অন্ধকারের আবর্তে,
গণগনে রৌদ্রচ্ছটায়, ঘাসফুলের শিশিরে,
জলের ফোঁটায়, সবুজের অপার বিনুনীতে
যিনি দেদীপ্যমান, তবু যিনি দৃশ্যমান নন,
যিনিবিরাজমান অনন্ত মহাশূন্যে,
তিনি কোনো কিংবদন্তী নন,
নন আত্মজ কিন্তু আত্মীয় সবার—
বাদশাহ-ভিখিরি নির্বিশেষে।
পাথরের মূর্তি নন, শিল্পীর ছবি নন—
অতিথি অন্তরাত্মার অন্দরমহলে।

মসজিদে কিংবা মন্দিরে যিনি আরাধ্য,
জন্ম মৃত্যুর উদয়-অস্তে
যিনি বিরাজমান আঁতুড়ঘর থেকে শ্মশানে,
তিনি এই সৃষ্টি ও ধ্বংসের অদম্য কর্মকূশলী।
তিনি কোনো কিংবদন্তী নন।
তিনিই কি দাঁড়িয়ে দুয়ারে?
দুয়ার খোলে দাও, পেতে দাও সিংহাসন,
আয়োজন করো, তিনি আজ অতিথি
সাত আসমান থেকে জমিনে। (সম্পূর্ণ…)

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: বিদায় আব্বাস, বিদায় বনফয়

বিপাশা চক্রবর্তী | ৫ জুলাই ২০১৬ ৭:৪৮ অপরাহ্ন


বিদায় কবি রুপালী পর্দার

Abbasসমসাময়িক চলচ্চিত্রের ইতিহাস যদি আপনি লিখতে বসেন তাহলে চাইলেও কিছুতেই যার নামটি আপনি বাদ দিতে পারবেন না তিনি হলেন-আব্বাস কিয়ারোস্তামি। হলিউডের রুক্ষ সংস্করণের বিপরীতে চলচ্চিত্রে তিনি নিয়ে এসেছিলেন কাব্যময়তা। যা ছিল অত্যন্ত পরিশালীত ও স্ব-অর্জিত, একই সাথে আধুনিক অতিন্দ্রিয়তার প্রতিফলন। তাঁর চলচ্চিত্রেরর প্রতিটি অংশেই তাঁর নিজস্বতা ছিল। তিনি নিজেও ছিলেন কবি। তিনি এ যুগের চলচ্চিত্রের কবি। নিজের মাতৃভূমি ইরানকে তিনি উপস্থাপন করেছেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে। ইরানের সংস্কৃতি, ইতিহাস, সামাজিক জীবনধারাকে সারা পৃথিবীর কাছে পরিচিত করিয়েছেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এমনকি দেশটিতে ইসলামিক বিপ্লবের পরেও তিনি দেশ ত্যাগ করেননি। বরং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর কাব্যিক ঝঙ্কার অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্র মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নিবিড় অথচ সুক্ষ্ম বর্ণনা। বর্ণনা এমন রহস্যময় পরাবাস্তব আবহ সৃষ্টি করে যে আপনার মনে হবে যেন আপনি এই জগতে থেকেও নেই। কোথাও হারিয়ে গেছেন। এভাবেই একজন আব্বাস কিয়ারোস্তামী হয়ে ওঠেন রুপালী রূপকথাকার, কখনো কবি। আব্বাস ছিলেন বর্তমান পৃথিবীর একজন প্রধানতম ‘ওটার’। মানে হল যিনি একই সাথে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা, পরিচালনা, প্রযোজনা, শব্দ ও সুর সংযোজন, চিত্রগ্রহণ এবং সম্পাদনা করতে পারতেন। বলা যায় চলচ্চিত্র নির্মানে তিনি সর্বময় গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের প্রতিটি অংশে ছিল স্বকীয়তার ছাপ। নিজ গুনেই সুপ্রসিদ্ধ এই নির্মাতা হয়ে ওঠেন পৃথিবীর রুপালী জগতের কিংবদন্তী। জীবনের বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। ১৯৪০ সালে ইরানের তেহরান শহরের জন্ম নেন আব্বাস। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন। কর্মজীবনের শুরু গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে ইরানিয়ান টেলিভিশনের জন্য বেশকিছু বিজ্ঞাপন নির্মানের মাধ্যমে। ১৯৬৯ সালে –‘কানুন’ নামে একটি সংগঠনে যারা শিশু কিশোরদের মানবীয় বৃদ্ধিবিকাশ নিয়ে কাজ করে। এখানকার ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব নিয়ে প্রায় এক যুগ কাজ করার সময় শিশুদের নানান সমস্যা নিয়ে বেশ কটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন। পরবর্তীতে নিজেই স্বনির্ভর চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে আব্বাস বলেন, “শুরতে যা ছিল শুধুই চাকরী পরে তা ক্রমশ আমাকে একজন শিল্পী হয়ে উঠতে সাহায্য করে”। ১৯৯৭ সালে নির্মিত‘টেস্ট অফ চেরি’ চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্ব্বোচ্চ ‘পাম দোর’ পুরস্কার অর্জন করে। ১৯৭০ সাল থেকে নিয়মিত ভিন্ন ধারার ডকুমেন্টরি, স্বল্প ও পূর্ণ-দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন এই চলচ্চিত্রকার। আজ যে সারা পৃথিবীতে ইরানী চলচ্চিত্রের জয়জয়কার তা মূলত আব্বাসের বদৌলতে। কেননা, তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মানে তাঁর বৈশিষ্ট্য ও ভাবধারা সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন তাঁর উত্তরসূরি ইরানী চলচ্চিত্রকারদের মাঝে। তিনি নিজে প্রভাবিত ছিলেন সত্যজিৎ রায়, ভিত্তোরিও দে সিকা ও জাক তাতি’র কাজ দ্বারা। (সম্পূর্ণ…)

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

রাজু আলাউদ্দিন | ৪ জুলাই ২০১৬ ১:০৬ পূর্বাহ্ন

Goon-1এ মাসের প্রথম দিন কবি নির্মলেন্দু গুণের সাথে রোজা ও ঈদের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা হয়েছিল কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের সাথে। এখানে তাদের সেই আলাপচারিতা প্রকাশ করা হলো বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমর-এর পাঠকদের জন্য।

রাজু আলাউদ্দিন: গুণদা, কেমন আছেন? ভাবছিলাম যে ঈদ সংখ্যার জন্য একটি কবিতা চাইবো আপনার কাছে, কিন্তু জানি ঐভাবে তো কবিতা সঙ্গে সঙ্গে চাইলে পাওয়া যাবে না।
নির্মলেন্দু গুণ : কালকে নাকি যুগান্তর আমার কবিতা ছাপছে।
রাজু :আপনার?
গুণ:হ্যাঁ হ্যাঁ।
রাজু : আচ্ছা, আমি খেয়াল করিনি তো! পুরোনো কবিতা নিশ্চয়।
গুণ:ওটা ফেসকুব থেকে নেয়া ,ছাড়পোকার উপর যে কবিতাটা।
রাজু :ও আচ্ছা। ওরা ছাপছে এইটা তা আমি জানি না।
গুণ: একজনে ফোন করে আমাকে বলল।
রাজু:ও! আচ্ছা। হইতে পারে আমি খেয়াল করিনি। আমি ওদের পাতাটা দেখিনি গতকালকে। আমি যেটা জানতে চাচ্ছিলাম সেটা হলো যে, আপনি তো ধরেন অন্য একটি সম্প্রদায়ের লোক। এখন মুসলমানদের এই ঈদের আনন্দ বলে কী আপনার কোন প্রতিক্রিয়া বা অনুভুতি আছে?
গুণ: হ্যাঁ, আমি তো ডেইলি সেহেরি না খাইলেও ইফতারি করতেছি। আমার বাসায় তো দুইজন ইসলামধর্মী থাকে, তাদেরকে ভোর রাতে তুলে দিতে হয়।
রাজু : আচ্ছা, আপনি যখন ছোট ছিলেন তখন তো মুসলমান বন্ধুবান্ধব ছিল, তাই না? তাদের বাড়ীতে গিয়ে ঈদের আনন্দ আপনি কাটিয়েছেন কিনা কখনো।
গুণ: এইগুলো আমার ছেলেবেলার বইয়ে আছে যে মুসলমান বন্ধুরা আমাদের বাড়ীতে যেত। সেই রকম আমার এক বন্ধু মতউর রহমান, ওর সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্ক ছিল, যাতায়াত করতো আমাদের বাড়ীতে। তো ওরা যখন আমাদের বাড়ীতে আসতো, আমাদের বাড়ীটা দর্শনীয় ছিল। মানুষ এমনিতেও বাড়ী দেখার জন্য আসতো। তো ঐরকম বন্ধুবান্ধব মুসলমান যারা ছিল বা তাদের বাড়ীতে যাতায়াত ছিল এইরকম আছে দুই চারজন। এসব কাহিনী আমার ছেলেবেলার বইতে আছে।
রাজু : আচ্ছা, এর বাইরেও যেগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়নি–এর রকম দুই একটা স্মৃতি বলেন না অনুগ্রহ করে। (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা | পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com