মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীকের থাকা ও না থাকা

| ৩০ december ২০১১ ২:৩৫ অপরাহ্ন
[১৬ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে আর্টস-এ ছাপা হয় অদিতি ফাল্গুনীর ভূমিকাসহ মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীক প্রণীত ডায়রি বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ এবং ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট’ গঠনের মূল ইতিহাস। এই ডায়রি ছাপা হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক ব্যবহারকারী কারো কারো পক্ষ থেকে দাবি ওঠে যে এই নামে কোনো মুক্তিযোদ্ধা কখনো ছিল না। তারা এর প্রমাণ স্বরূপ ‘বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা’র লিংক সরবরাহ করেন। সেখানে মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীক নামে কারো ভুক্তি নেই। এ প্রেক্ষিতে ‘বীর প্রতীক’ সংক্রান্ত প্রকৃত অবস্থা অনুসন্ধানের জন্য ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’-এ গিয়ে দেখা গেল ‘বিশ্রামাগার’-এর নির্মাণ কাজ চলছে। সংলগ্ন অস্থায়ী অফিসের সামনে ডিসেম্বর ২০১১-র ২৪ তারিখে হুইলচেয়ারে স্থিত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হক বীর প্রতীকের সঙ্গে কথা বলেন অদিতি ফাল্গুনী। কিন্তু রাস্তার পাশে শব্দের প্রাবল্য থাকায় কাছেই ১/৬বীর উত্তম নুরুজ্জামান সড়কের ‘রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতাপ্রাপ্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বাসস্থানে’র আঙিনায় অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কথাবার্তা ধারণ করা হয়। সেখানে মধুর ব্যাপারে কথা বলেন মোঃ গোলাম মোস্তফা বীর বিক্রম বীর প্রতীক, মোঃ সামসুদ্দিন বীর প্রতীক, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শুকুর আলী। এ ছাড়া মিসেস মনোয়ারা সামসুদ্দিন, আবুল কাশেম ও আবদুস সোবাহান মন্টুও মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীকের এক সময়ে অস্তিত্বশীল থাকার ব্যাপারটি নিশ্চিত করেন। তারা জানান যে মধু এখন আর নাই–২০০৫ সাল থেকেই নাই। তবে তার স্ত্রী এখনও সরকারি ভাতা পাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি চাপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ এলাকায় বন্দুকের গুলি লেগে আহত হন। পরে ভারতে চিকিৎসা লাভ করেন ১৯৭২ সালে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলের শেষ দিকে ১৯৭৯ সালে ২৪ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে বীর প্রতীক পদকে ভূষিত হন। তবে তাদের সেই তালিকা কখনো গেজেট ভুক্ত হয় নাই।

আর্টস-এ প্রকাশিত তাঁর ডায়রির লিংক: এক মৃত মুক্তিযোদ্ধার দিনপঞ্জির পাতা থেকে…।

–বি. স.]

সাক্ষাৎকার গ্রহণ:ব্রাত্য রাইসুঅদিতি ফাল্গুনী


মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীকের বন্ধু ও পরিচিতজনদের ভিডিও সাক্ষাৎকার।

অদিতি ফাল্গুনী: মোদাস্বার হোসেন মধু বেঁচে ছিলেন। তারপরে উনি মারা গেছেন। ওনার একটা ডায়রি ছিল, ডায়রিটা আমি ছাপালাম, ছাপানোর পরে কেউ কেউ বলতেছেন উনি নাকি ছিলেন না–এটা নাকি কল্পনা, এটা নাকি বানোয়াট, তাই কি?

তোজাম্মেল হক: না না না। আমরা আগাগোড়া এখান থেকে আছি, একসঙ্গে ছিলাম। উনি মারা গেলো, মারা যাওয়ার পরে… উনার অনেক কিছু কথা আছে–সেরকম–উনি প্রথমে গুলি লাগা সৈনিক, তারপরে প্যারালাইসিস, উনি যা কিছু বলতো সত্যি বলতো এবং যা ন্যায় বলতো এবং যা জাতির কাজে লাগবে… এবং সেগুলোর কথাই উনি বলতো।

tozammel.jpg……..
তোজাম্মেল হক বীর প্রতীক। জন্ম. সিংগিমারি, পার্বতীপুর, দিনাজপুর। ১৯৭২-এর ৬ জানুয়ারি দিনাজপুর মহারাজা হাইস্কুলে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে স্বাধীনতা পরবর্তী বিস্ফোরক ও অস্ত্র জমা করার সময়ে আকস্মিক বিস্ফোরণে ৭০০ মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন, আহত হন শতাধিক। তাদের একজন তিনি।
……..

অদিতি ফাল্গুনী: এটা তো অস্থায়ী অফিস? ওই যে আপনাদের যে বিশ্রামাগার…?

তোজাম্মেল হক: বিশ্রামাগার আমাদের স্থায়ী। এখন ভাঙ্গি ফেলাইয়ি অস্থায়ী… অনেকে ভাড়া থাকে, ফ্যামেলি নিয়া থাকে। এখন শেল্টার হইলে আমরা সবাই একত্র হবো।

অদিতি ফাল্গুনী: এইটা কবে নাগাদ মানে পুরাটা আবার ঠিক হবে?

তোজাম্মেল হক: ওই যে ২৪ মাস, দুই বছর টাইম নিছে।

অদিতি ফাল্গুনী: দুই বছর সময় দিছে।

২.
অদিতি ফাল্গুনী: আজ থেকে দশ-এগার বছর আগে আমি প্রথম আসি, এসে আপনাদের দুইজনের একটা ছবিও নিয়েছিলাম? সেটা আর কি পত্রিকাতে ছাপাও হয়েছিল, আমি দেখাই। অনেক আগের পত্রিকা [The Daily Star, 7 December 2000] –এই যে। আপনি আর এই তো মধু, তাই না?

madhu-ds.jpg……..
২০০০ সালে প্রকাশিত অদিতির লেখায় মধু ও গোলাম মোস্তফার ছবি
……..

গোলাম মোস্তফা: হ্যাঁ এই যে, ঠিক আছে। তো এইডা কী হইছে এখন?

অদিতি ফাল্গুনী: এখন ওই ছাপানোর পরে, অনেক দিন পরে আবার দুই বছর আগে এসে আপনাদের অনেকের ইন্টারভিউ নিই, তাই না? তারপরে মধুর একটা ডায়রি খাতাও আমার কাছে ছিল। তো এইগুলো নিয়ে উনার পত্রিকাতে [http://arts.bdnews24.com] একটা লেখা ছাপা হইছে। সেই লেখাটার পরে সবাই বলতেছে মধু নামে কেউ ছিল না। এটা কল্পনা, এটা আমি বানাইয়া লিখছি, আমি টাকা খাইছি…

গোলাম মোস্তফা: মোদাস্বার হোসেন মধু… ঠিকই আছে। এই যে মধু…।

ব্রাত্য রাইসু: এটা চিনেন আপনারা ওনারে?

গোলাম মোস্তফা: আরে চিনা!… আমার সাথে লাখনৌ কমান্ড হসপিটালে… একসাথেই ছিলাম, আহত হইয়া। (সম্পূর্ণ…)

ঊনিশ শো তেতাল্লিশ চুয়াল্লিশ বলে মনে হয়

শিকোয়া নাজনীন | ২৬ december ২০১১ ১১:০২ অপরাহ্ন

ঘাঘট নদীর কাছে স্টিমারে উঠেও তো জলঢাকাতে যাওয়া যেতো। কিন্তু ধল শ্রাবণের আকাশে বিশ্বাস নাই। বৃষ্টি নামে যখন তখন, মেঘ কালো আকাশে নবগঙ্গা ফুলে ওঠে। ঢাল ধরে রোহনপুরে পৌঁছতে দিনটা হেলে পড়ে। আল ধরে ঢাল পথে উঠে গিয়ে আবার খাঁড়ি বেয়ে মাঝনদীতে এমন ঢেউ। ডাঙাতেও

map_s2.jpg
সহায়ক মানচিত্র;মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক ১৯৯৯-২০০০ সংখ্যা থেকে।

পিছল মাটি। কাঁচা সড়ক পথে হাঁটখোলার মানুষচলা পথেই আবার নদী উঠে আসা। দপদপিয়া পেরোলোই তো জলঢাকা। লতাবেড়ি দিয়ে প্যাঁচানো আশ্চর্য বিলপাড় জমিগুলি ঘরগুলি সেখানে উঁচু। পারে নোঙর বাঁধা। মলিনাহাটের মানুষ বলে এখানে রাজার বাড়ি ছিল। বসত জায়গাটা আর নেই। চক্রাকারে জমিজমা ঘাটপাট রাজাপ্রজা, জলমাটি, নৌকা ভিড়ানো নদীপাড়। শ্রাবণ ভাদ্রে জল না পাওয়ায় পলি পড়ে বাখরগঞ্জ, ফরিদপুর হয়েছে, আঁড়িয়াল খাঁ শায়েস্তাবাজার। বৃষ্টিতে বাণের জলে সেসব তো শুধু অন্ধকার ঘন স্যাঁতস্যঁতে ঘেমো চলতা পড়া বলেশ্বরের স্থলভূমি। চক্রাকার হাওড় জলাঙ্গি আর সমুদ্রমুখ। অববাহিকার খাঁড়িতে, বাবুবাজার ঘাটে রাহেলারা, চন্দনারা বসে আছে লঞ্চের গলুইয়ের ডগায়। চন্দনারা প্রতীক্ষা করছে আর ভিড়টা কোনদিকে গড়াচ্ছে তা দেখছে। কাল রাত থেকে যাত্রীরা এখানে আসছে। পরেশ, আলি মিঞা, জান্নার বাপ প্রতিদিনের আসা যাওয়া, হাঁটাচলাতে প্রতিদিনের এই শ্রাবণ প্রান্তর আর মেঘলা দিগন্তের মধ্যে এমন টুকরাটাকরা নদী মোহনা, খাল বিল, ধানের ডগা পায়ে দলিয়ে এমন আনমনা পার হয় যে, এই রাতের আকাশটা তারা ছিটানো গোধূলিবেলাটা তাদের শোরগোলের ভেতরে আলাদা কিছু হয়ে ওঠে না। এই তল্লাটে ব্যস্ত নিবারণ চরণ, বলাইরা ডাঙাজলের নানাবিধ কর্মকাণ্ড দেখে। ঘটিবাটি কিছু কিছু বিক্রী করে দিয়েছে শানুরা, রাহেলারা বলে এখানে তারা বিচ্ছিন্ন। সমাজ নাই। জলঢাকাতে, মলিনাহাটে চন্দনাদেরও সমাজ ছিল। মলিনাহাটে কাঁটামণসার, ময়নাকাঁটার বেড়া দিয়ে ঘেরা উনুন ছিল। বাষ্প ছিল। সেই ফুটন্ত ভাতের গন্ধটা স্টিমার ঘাটে এসে বাতাসে নদীতে মিশে থাকে। এমন যে সেই স্মৃতিতে সন্ধ্যের ক্ষেতে বিছন ছড়ানো রাতটা, সেই গুড়জাল, খৈসা, তালপা, বিছুটি, চলনবালাম ধানগুলো একদম নিজস্ব শৈলীতে ফলানো যার বাসনাটাও আলাদা হতো। সেই সুগন্ধি বাসনাটা এখন স্টিমার ঘাট পর্যন্ত মৌ মৌ করে। নিজের খাটনিতে উৎপন্ন রাতপোহানি ধানের গন্ধও আলাদা। কোনোটাই এক রকমের না। তাই এই ধানের বাসনা নিয়ে তাদের কোনো যৌথ স্মৃতি নেই। চন্দনাদের আঠারো কানি জমিতে বারোমাসি চাষের বায়না। নিচু চলতাপড়া ঘসটানো থোবড়ানো দাওয়া, দক্ষিণের ভিটায় বারবাড়ি, উঠোন পেরিয়ে দৌড়ঝাঁপ করেই বাঁদিকের ঘাটলা ছাড়িয়ে সোজাসিধা ঘরের ঝাঁপ। গোলাঘরের একটু আগ বেরিয়ে বাঁ হাতে মলিনাহাট। বড় সরদারবাড়ি। সেটাই একটা নিজস্ব গ্রাম। একটা আস্ত পরিচয়। দাড়িঅলা যবেত আলি, তুলসির মা, নানা ধর্মের নানা সমাজের নারী পুরুষের অজস্র শব্দমালা ধ্বনি পটুয়াখালি, বরিশাল, নোয়াখালি চাঁদপুর সবটাই বাতাস মাটি রৌদ্র ছায়াতাপের ভেতরে ঢেউয়ের পর ঢেউ তোলে। বড়খালের রৌদ্রহাওয়াময়তার ছবিটি, উচু শক্ত খাদের গল্পটি, কোথাও বাঁশের সাঁকোতে অদৃশ্য পারাপারের স্মৃতিটি, দক্ষিণের ক্ষেতে বারোমাসি ধানভানার রাংমালি টিলা সব একই পটের ছায়াছবি বনে যায়। নদীর মধ্যে স্রোতের টান টের পায় তারা। বাকেরগঞ্জে… ফরিদপুরে… বরিশাল বুড়িশ্বরে শাহবাজপুরে ব্রহ্মপুত্রতে মাটির উপর ফুলে ফেঁপে ওঠা আবার মাটি আকড়ে থাকা। কীর্তনখোলা, আঁড়িয়াল খা, মেঘনা তেতুলিয়া… বিঘাই বারনাবাদ সব ছড়িয়ে কেমন সুবিশাল স্থলভাগ বিরাণ করে দিয়ে গেল। কিন্তু বরিশালে… সুগন্ধাতে মধুখালিতে নদীর বৈচিত্র কই? সেগুন শাল খয়ের পাতা বর্ষায় ঘন মাটির তলার নদীর জল টেনে নিয়ে বাড়ছে। ভাদ্রে মাটি পোড়ে। মাটির শেষ জলটুকু টেনে নিয়ে পাতার বাড়ন্ত গঠনে ক্রমে মাটি জলশূন্য হয়ে পড়ে। মাটি খঁটমটে শক্ত পাথর বনে যায়। ঝোপজঙ্গলের ভেতর মাটি পঁচা পাতায় বিদীর্ণ হয়ে সেখানের জলটা সারাবচ্ছর নরম পলির মতো জমাট বেঁধে বেঁধে একটা আস্ত হাওড়ে রূপ নেয়। সেখানে ঝোপঝাড় গাছগাছড়া আকাশ ভাঙা জল, মাটির তলার জল সব জমে শক্ত জমাট আচ্ছাদন। সামনে তাকালেই কালচে গুমোট সবুজ গাছের জটিল বাঁক। যেন মাটির ভেতর থেকে গজিয়ে ওঠা। এই বুনো ভারি পাতার পিঠটা সরেস হবে বলে জল শুধু এর ঘন দৈর্ঘ্যটার দিকে তাকিয়ে রয়। একটা পাকিয়ে ওঠা আড়াল তৈরি হলে একসারি গাছের বাকলের খাবলানো চ্যাবকানো ঘনতা এভাবে খলিল মাষ্টার, বদিমাষ্টারের তালুক বনে যায়। (সম্পূর্ণ…)

কুর্মিটোলা, ময়নামতি

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ২৩ december ২০১১ ১:৩১ অপরাহ্ন

লেফটেন্যান্ট/সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট–এই দুই পদবীধারীকে ডাকাডাকি করতে লেফটেন্যান্ট অমুক বলার রীতি। লিখতে গেলে অবশ্যই সঠিক র‌্যাঙ্ক উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়। আমরা সকলেই সরাসরি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে কমিশনপ্রাপ্ত–যেহেতু এমএ/এমএসসি/বিই ইত্যাদি ডিগ্রিধারী এবং বিশেষ বিশেষ টেকনিক্যাল কোরে নিয়োগপ্রাপ্ত। তো আমার ‘সামান’ এসে গেলে আমি সুটকেস খুলে তোয়ালে, সাবান বের করে হাতমুখ ধুয়ে এসে ইজিচেয়ারে বসেছি। চা এল একপট। কমপ্লিমেন্টারি। নতুন অফিসারের রিসেপশ্যনের অঙ্গ। সঙ্গে একটা ফলের চ্যাঙারি আর বিস্কিট। বেশ ভাল লাগল। মেস ওয়েটার বলে গেছে, চা খেয়ে মেসে গেলে অন্যান্য অফিসারদের সঙ্গে আলাপ হবে। অবশ্য, যাবার আগে ফুলহাতা শার্ট এবং টাই পরে নিলে ভাল হয়, কারণ আমাদের ইন-সার্ভিস মিলিটারি ট্রেইনিং–গ্রুমিং শুরু হয়ে গেছে।

c_wali.jpg……
সেনাশিক্ষা কোরের ক্যাপ্টেন ওয়ালী, সাল ১৯৭৫
……
পড়েছি মোগলের হাতে…। অতএব, এর শেষ দেখার সহজ সংকল্প নিয়ে ধড়াচূড়ো ধারণ করে অফিসার্স মেসে গেলাম। ভুলে গেলাম, আমি একজন কমিশন্ড আর্মি অফিসার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ, প্রাক্তন প্রভাষক, মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ। মেসে পা দিয়ে মনে হল, আমি একজন জেন্টলম্যান ক্যাডেট মাত্র, ভরদুপুরে গলায় টাই বেঁধে ঘামছি আর সামনে কী দেখব, সে বিষয়ে পূর্বধারণা অনুযায়ী সবচেয়ে খারাপ কিছু র‌্যাগিং নমুনা মনশ্চক্ষে অবলোকনের চেষ্টা চালাচ্ছি। ঢুকেই লম্বাটে রিসেপশ্যনে হ্যাট স্ট্যান্ড, বড় বড় আয়না দেয়ালে আর একপাশে বার কাউন্টার। সব ফার্নিচার মেহগনি রং-এর। ভারি লাল ভেলভেট দিয়ে তৈরি পর্দা–কাল্‌চে লাল। কার্পেটও ম্যারুন। আমি একটু বাঁয়ে ঘুরে কাছের লম্বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাইয়ের গেরো ঠিকঠাক করলাম। আসলে এনটিসিপেশনের এলোমেলো একটু স্ট্রিমলাইন করা আর কি। কিন্তু অনন্তকাল তো আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা চলে না।

অতএব, যা থাকে কপালে ভাব নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম। মস্ত ঘর। দু’দিকের দেয়ালজোড়া সোফায় কেউ বসে, নিচুস্বরে বাক্যালাপে রত, কেউবা দাঁড়িয়ে। আস্‌সালামু আলাইকুম, স্যর। অন্ধের মতো উইশ করে এগিয়ে গিয়ে সবচেয়ে কাছের অফিসারের সঙ্গে করমর্দন করে নিজের নাম এবং র‌্যাঙ্ক উচ্চারণ করলাম, মুখে চিলতে হাসি ধরে রেখে। অফিসার মোটা গোঁফ নাচিয়ে হেসে উঠলেন, বললেন, আই থিঙ্ক উই হ্যাভ মেট বিফোর। আয়্যাম ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম, ইস্ট বেঙ্গল। সিন্স আয়্যাম দ্য সিনিয়্যরমোউস্ট অফিসার প্রেজেন্ট হিয়ার, ইটস মাই প্রিভিলিজ টু ইন্ট্রোডিউস ইউ টু দ্য রেস্ট…। পরিচয় হল। আমার ব্যাচের আরো ক’জন এসে ইতোমধ্যে জয়েন করছে। কামাল, জহির, আলী, জাকারিয়া, আলম, ভুঁইয়া, রায়হান, কায়সার আর মাহ্‌বুব। আরো কয়েকজন আসবে বিকেলের মধ্যে। আমাদের সবারই বাসস্থান এই মেসে। পরদিন সকাল থেকে প্রশিক্ষণ শুরু হবার কথা। বোঝা গেল, ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম আমাদের প্রাথমিক ব্রিফিং দেবার জন্যই মেসে উপস্থিত এবং দিনটি উনি আমাদের সঙ্গেই কাটাবেন। আমরা যে কোনো বিষয়ে তার সঙ্গে আলাপ করতে পারি দিনভর, রাতে ডিনারের পর দশটা পর্যন্ত। পরদিন সকালে উঠে সাড়ে পাঁচটায় পিটি কিটে আমাদের উনি মার্চ করিয়ে ৪ ইস্ট বেঙ্গলের মাঠে নিয়ে পরবর্তী ট্রেইনারের কাছে সোপর্দ করবেন। (সম্পূর্ণ…)

সিডনির পথে পথে (৯)

আবু সুফিয়ান | ২১ december ২০১১ ১০:১০ অপরাহ্ন

hb8.jpg
বিয়ের ছবি তোলার সেশন হচ্ছে। ওপর থেকে তোলা ছবি।

সিডনির পথে পথে ১ | সিডনির পথে পথে ২ | সিডনির পথে পথে ৩ | সিডনির পথে পথে ৪ | সিডনির পথে পথে ৫ | সিডনির পথে পথে ৬ | সিডনির পথে পথে ৭ | সিডনির পথে পথে ৮

(গত সংখ্যার পর)

রাস্তা হারানো আমার জন্য নতুন কোনো বিপদ না। দেশে এবং বিদেশে বহুবার এই ঘটনা ঘটেছে। কচু গাছ কাটতে কাটতে মানুষ ডাকাত হয়। পথ হারিয়ে আমি পথ চিনি। তবে আজ খানিক সুবিধাজনক আবস্থায় আছি। কারণ সাবৃনা সাথে নেই। স্ত্রীর কাছে এই ধরনের ‘কেলাসপনা’ স্বামীদের বড় ধরনের অযোগ্যতার প্রমাণ।

মোবাইল ফোনে সময় দেখলাম। বেলা একটার মধ্যে বাসায় ফিরতে হবে। একসাথে খাবো। বাড়ির রাস্তা খুঁজে পাওয়ার জন্য এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় হাতে আছে।

আমি হাঁটা শুরু করলাম।

সিডনির ফুরফুরে উজ্জ্বল আবহাওয়া বড়ই মনোরম। একটা সুখ সুখ ভাব হয়। রাস্তায় গাড়ি যথেষ্ট। কিন্তু পথে হাঁটা লোকজনের সংখ্যা কম। দু-একজন যাও পাই, তারা আমার চেয়েও মহককল। ঠিকানা জিজ্ঞেসা করলে ঠোঁট উল্টানি দেয়। অর্থাৎ চেনে না।

hb7.jpg
সিডনি হারবার ব্রিজের কাছে বাড়িঘর, সাথে লাগোয়া সমুদ্র।

সামনে মোটা মতো এক ভদ্র মহিলা অপেক্ষা করছেন, রাস্তা পার হবেন। বয়স্ক। হাতে বাজারের ব্যাগ। সম্ভবত স্থানীয়। তাকে ঠিকানা দেখিয়ে জিজ্ঞেসা করলাম, এই রাস্তাটা কোথায়? তিনি যে উত্তর দিলেন, সেই ডিরেকশন ফলো করলে দুপুরে আমাকে বাইরে খেতে হবে। মহিলা বললেন, সামনে ৫০ গজ গিয়ে ডানে টার্ন করবে। তারপর ত্রিশ থেকে চল্লিশ স্টেপ যাবে। তারপর আবার টার্ন করে স্ট্রেইট হাঁটবে… কিছুদুর গেলে একটা পাম্প দেখবে…

উনার ডিরেকশন যতক্ষণ শুনবো, সেই সময়টাই নষ্ট। ‘বিশেষ ধন্যবাদ’ বলে আমি কেটে পড়লাম।

সামনে বেশ কিছু স্টেশনারি জাতীয় ছোট দোকান আছে। ফোন কার্ড রিচার্জ করা দরকার। (সম্পূর্ণ…)

এক মৃত মুক্তিযোদ্ধার দিনপঞ্জির পাতা থেকে…

অদিতি ফাল্গুনী | ১৬ december ২০১১ ১০:১৬ পূর্বাহ্ন


মুক্তিবাহিনী ট্রেনিং, ১৯৭১; ছবি. উইকিপিডিয়া

গল্পের লোভে মাঝে মাঝেই আমি এদিক ওদিক ঘুরি। নানা মানুষের সাথে মেশার চেষ্টা করি। মূলতঃ এই গল্প খোঁজার লোভ থেকেই ঢাকার মোহাম্মদপুর কলেজ গেট সংলগ্ন ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’-এ গত বছর দশেক ধরে আমার ঘোরাঘুরি। কখনো টানা ঘোরা, আবার কখনো লম্বা সময়ের বিরতিতে যাওয়া। শুধু বিশ্রামাগার নয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের বারান্দা বা করিডোরেও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা হয়েছে প্রচুর। ২০০০ সালে ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’-এ হুইল চেয়ার বন্দি বীরপ্রতীক মোদাস্বার হোসেন মধুর সাথে আমার পরিচয়। কথায় কথায় দেখলাম স্কুল-কলেজের সার্টিফিকেটের হিসেবে এই ‘স্বল্পশিক্ষিত’ মানুষটির স্বচ্ছ রাজনৈতিক চিন্তার বিন্যাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি একদিকে যেমন রয়েছে তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা, তেমনি রয়েছে ক্ষোভ। কিম্বা, বঙ্গবন্ধুর চেয়েও ‘মুজিব বাহিনী’র কেষ্ট-বিষ্টুদের প্রতিই এই ক্ষোভটা যেন বেশি। মধু, যিনি একাত্তরের যুদ্ধে প্রাক-পঁচিশেই সারাজীবনের মতো চলৎশক্তি হারিয়েছেন, তিনি একদিন আমার হাতে তুলে দিলেন একটি সাদা কাগজের সেলাই করা খাতায় বেশ কিছু পাতা লেখা। মধুর চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধের পরবর্তী কয়েক বছরের ইতিহাস।
—————————————————————–
“হঠাৎ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বলে উঠলেন, ‘এ্যাটেনশন প্লিজ!’ সকলের দৃষ্টি ও কান চলে যায় রাষ্ট্রপতির দিকে। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আপনারা মন দিয়ে শুনুন। আমি শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করব। কমিটিতে পুঁজির দরকার।… প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান সর্বপ্রথম যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটিতে তাঁর এক মাসের বেতন দান করেন।… ক্ষোভে-দুঃখে তখন শুধু পাশে বসা বন্ধু নূরুল আমিনের হাতটা চেপে ধরে শরীরের রাগ মেটালাম। রাজাকারের প্রথম সাহায্যে গঠিত হল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটি।” / মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীক
—————————————————————-
ফটোকপি করলাম। প্রচুর বানান ভুল। কাঁচা হাতের অক্ষর। তবু, মুক্তিযুদ্ধের অনেক না-বলা কথা আছে তাঁর এই লেখায়। তারপর… তারপর মধ্যবিত্ত জীবনের দৌড়, কর্মব্যস্ততা ও মধুকে আমার ভুলে যাওয়া! মধুর ঐ লেখা আমার কাছে ফাইলবন্দিই হয়ে রইলো। প্রায় বছর দশেক পরে গত বছরের শুরুতে আবার যখন ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগ বিশ্রামাগার’-এ গেলাম, মধুর সহযোদ্ধারা জানালেন মধু মারা গেছেন (এর ভেতর আরো দু/তিন বার গেছিলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে, সেই সময়গুলোয় প্রতিবারই গিয়ে শুনেছি যে মধু ক’দিনের জন্য দেশের বাড়ি গেছেন)। মধুর স্ত্রী ছিল জানতাম। তার ছেলে-মেয়ে ক’জন জিজ্ঞাসা করতে গেলে অপর এক হুইল-চেয়ারবন্দি সহযোদ্ধা খুব নির্বিকার ভাবে জানালেন, ‘বিয়া তো করিছিল শেষের দিকি দেশের বাড়ির ঘর দেখা-শুনা করতি আর নিজির কিছু সেবা-যত্নির জন্যি। মাঝে মাঝে দেশের বাড়ি গেলি পর সেবা করার লোক লাগে না? ছেলে-মেয়ে হবি কীভাবে? যুদ্ধে ওর পায়ের মতো পেনিসও উড়ি গিছিল!’ চমকে উঠলাম। মধুর এই কয়েক পাতার অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সাথে মরিয়া হয়ে দেখা করা কিছু তরুণ মুক্তিযোদ্ধার ভেতর জনৈক তরুণের হঠাৎই নিজের হাতে ট্রাউজার ও অন্তর্বাস খুলে হারিয়ে যাওয়া পৌরুষের জন্য হাহাকার করার বেদনার কথা লেখা আছে। বঙ্গবন্ধু তখন দু’হাতে চোখ চাপা দিয়েছিলেন। মধুর হাতে লেখা দিনপঞ্জির পাতায় আবার চোখ বুলাই। হ্যাঁ, যুদ্ধে যে ‘পুরুষত্ব’ হারিয়েছেন সেকথা তিনি নিজেও লিখেছেন। (সম্পূর্ণ…)

সুপারলুমিন্যাল নিউট্রিনো–আইনস্টাইন কি তবে ভুল ছিলেন?

অভিজিৎ রায় | ১২ december ২০১১ ১২:৫৪ অপরাহ্ন

ea1945.jpg
১৯৪৫-এ সাগরতীরে আলবার্ট আইনস্টাইন

বিজ্ঞানে কোনো কিছুই স্থির নয়। সেজন্যই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে–এটিতে ভুল প্রমাণের সুযোগ থাকতে হবে, যেটাকে আমরা বলি ‘বাতিল-যোগ্যতা বা ফলসিফায়াবিলিটি। সোজা কথায়, ‘scientific theories must be falsifiable’, না হলে সেটি তত্ত্ব হয়ে ওঠে না[১]। নতুন নতুন পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞানের সাপেক্ষে বিজ্ঞানের পুরনো তত্ত্ব বাতিল কিংবা বদলে ফেলার দৃষ্টান্ত বিজ্ঞানে আছে বহু। পরীক্ষা নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণের সাথে মেলেনি বলেই টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক তত্ত্ব বাতিল হয়ে গিয়েছিলো, কোপার্নিকাস আর গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণের ধাক্কায়। অতীতে ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব, ফ্লোগিস্টন তত্ত্ব, ইথার তত্ত্ব, ল্যামার্কের তত্ত্ব, প্যাঞ্জিয়াম তত্ত্ব, আলো চলাচলের জন্য নিউটনের কর্পাস্কুলার তত্ত্ব সবই একসময় ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আমরা পেরেছি পুরাতনকে বর্জন করে নতুন ‘আলোকেরই ঝর্নাধারায়’ নিজেদের সিক্ত করতে। সেজন্যই কিন্তু বিজ্ঞান ‘ডায়নামিক’, ধর্ম কিংবা ডগমার মত স্থবির কিছু নয়। বিজ্ঞানে কোনো কিছুই পাথরে খোদাই করে লেখা হয়নি, লেখা হয় না। বিজ্ঞানে ‘হিরো’ আছে, কিন্তু নেই কোনো প্রফেট বা পয়গম্বর। আর এই হিরোদের অবদান নিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ হয় বিজ্ঞানের জগতে– তা তিনি নিউটনই হোন, ডারউইনই হোন কিংবা হোন না তিনি জগদ্বিখ্যাত প্রতিভা আলবার্ট আইনস্টাইন।

—————————————————————–
এখন আপনার বেগ যদি আলোর বেগকে অতিক্রম করে যায়, মানে আপনি আলোর চেয়ে বেশি বেগে ভ্রমণ করতে থাকলে নানা ধরনের অস্বাভাবিক ব্যাপার স্যাপার ঘটতে থাকবে। আপনার জন্য সময়ের চাকা সামনে না চলে পেছনের দিকে চলতে থাকবে, আপনার ভর অসীমতার স্তর পার হয়ে, হয়ে যাবে কাল্পনিক, এবং আপনার দৈর্ঘ্য হয়ে যাবে ঋণাত্মক।
—————————————————————-

কিন্তু তারপরেও বিজ্ঞানের কিছু কিছু তত্ত্ব পর্যবেক্ষণ দিয়ে এতোটাই সমর্থিত হয়ে ওঠে যে, সেই তত্ত্বের উপর আস্থা প্রকাশ করে যান বিজ্ঞানীরা অনেকটাই নির্ভয়ে। এমনি একটি আস্থা ছিল আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে পাওয়া অনুসিদ্ধান্তগুলোকে ঘিরে। ১৯০৫ সালের পর থেকে একটি ব্যাপারে পদার্থবিদরা নিশ্চিত ছিলেন–আলোর গতি এক সেকেণ্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল (বা ২৯৯,৭৯২,৪৫৮ মিটার), আর আলোর চেয়ে বেশি বেগে কোনো পদার্থের পক্ষে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়। আলোর চেয়ে বেশি বেগে কারো পক্ষে ভ্রমণ করা সম্ভব না– এটি বিজ্ঞানীদের কাছে আস্থার প্রতীক; হয়ে উঠেছিলো অনেকটা আগামীকাল পূর্বদিকে সূর্য ওঠার মতোই ধ্রুব সত্য। অবশ্য এই ধরনের আস্থার কারণও সহজেই বোধগম্য। আমাদের আধুনিক টেকনোলজি– জিপিএস, ট্রানজিস্টর, কম্পিউটার, ইন্টারনেট সহ যে অবদানগুলোর প্রতি নির্ভয়ে অহর্নিশি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি–সেগুলো আইনস্টাইনের তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই নির্মিত। তার চেয়েও বড় কথা সার্নের এই ফলাফলের আগে কোনো পরীক্ষালব্ধ ফলাফলই আইনস্টাইনের তত্ত্বকে কখনো প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেনি। আইনস্টাইন তার তত্ত্ব দেবার পর আক্ষরিক অর্থেই অন্ততঃ হাজার খানেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে তার তত্ত্বকে ঘিরে। প্রতিবারই এটি অতি সফলভাবে বাধা বিপত্তি আর সংশয়ের দেওয়ালকে অতিক্রম করতে পেরেছে[২]

pic_1_cngs_layout_opera_experiment.jpg
ছবি ১– সার্ন এবং গ্রান সাসো ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির অপেরা প্রকল্পের রেখচিত্র (ছবির কৃতজ্ঞতা: T. Adam et al. OPERA collaboration, Measurement of the neutrino velocity with the OPERA detector in the CNGS beam, 22 September, 2011.)

আমাদের গাড়ির কিংবা আইফোনের জিপিএস সিস্টেমের কথাই ধরা যাক। এই জিপিএস সিস্টেমের বদৌলতে পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান এমনকি কয়েক ফুটের পরিসীমায়ও আমরা এখন সূক্ষ্মভাবে বলে দিতে সক্ষম। অথচ জিপিএস ঠিকমতো কাজই করতো না যদি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা থেকে পাওয়া ‘সংশোধনীগুলো’ গোনায় না নেওয়া হত। আমাদের মতো আমজনতার কথা না হয় বাদ দেই, আমেরিকার পেন্টাগনের জেনারেলদেরও নাকি এখন পদার্থবিদদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত ‘আপেক্ষিকতার সবক’ নিতে হচ্ছে, কারণ শত্রুদের অবস্থান স্যাটেলাইট কিংবা জিপিএসের মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানার জন্য এ ছাড়া গতি নেই[৩]। তারা বুঝতে পেরেছেন বেগ বাড়ার সাথে সাথে পৃথিবীর উপরে অবস্থিত জিপিএস-এর ঘড়ির সময় বদলে যায় খাপে খাপ মতো আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের গণনা অনুসরণ করে। (সম্পূর্ণ…)

রাঙামাটির পথে

নূরুল আনোয়ার | ১১ december ২০১১ ১:০৯ অপরাহ্ন

nar_11.jpg………
আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র
……..
রাঙামাটির কথা শুনে আসছিলাম একেবারে ছোটকাল থেকে। আমাদের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় পরিবার-পরিজন নিয়ে ওখানে থাকতেন। শুনতে পাই খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা বেশ সহায়-সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছেন। প্রথমে ব্যবসায়, পরে ভূ-সম্পত্তিতে বিস্তার লাভ করেছিলেন। পরে তাদের জায়গা-জমি সব পানিতে ডুবে গেছে। তারা পথে বসেছেন। কাপ্তাই বাঁধের পানি তাদের জমি-জমা, বাড়ি-ঘর সব পানির নিচে তলিয়ে দিয়ে একরকম অভিশপ্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও পরে শুনলাম কাপ্তাই বাঁধের পানি অভিশপ্ত বটে, কিন্তু সম্পদ হিসেবেও এর জুড়ি নেই। কাপ্তাই বাঁধের পানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। আবার সেই পানির মৎস্যসম্পদ জনসংখ্যার এক বিরাট অংশের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে। সবচে’ বড় কাজ যেটি হয়েছে সেটি হল এই বাঁধ একটা বিস্তীর্ণ জলরাশি সৃষ্টি করছে। এই জলরাশি একরকম নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আধার হিসেবে সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে চলে রাঙামাটির সৌন্দর্য অবলোকন করতে।

কাপ্তাইর পানি তো মানুষকে একরকম নিঃস্ব করে দিয়েছে। তারপরেও দেখতাম আমাদের এলাকার মানুষ রাঙামাটির দিকে ছুটছে। আমিও স্বপ্ন দেখতে থাকি রাঙামাটি যাবার। কিন্তু বহুদিন সেই স্বপ্ন আমার পূরণ হয়নি। পত্রপত্রিকায়, ক্যালেন্ডারে যখন রাঙামাটির সেই টানা ব্রিজের ছবিটা দেখতাম তার সৌন্দর্য আমাকে একরকম আলোড়িত করত। আমি এই টানা ব্রিজটাকে মনে রেখে আমার কল্পলোকে রাঙামাটিকে আরও নানাভাবে সাজিয়ে নিতাম।

nar_07.jpg………
রাঙামাটি বৌদ্ধবিহার
……..
দুই হাজার এক সালে আমার কাকা আহমদ ছফা সাহেব যখন সহসা ধরাধাম ত্যাগ করলেন আমি অনেকদিন কোনো কাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারিনি। সব সময় আমার ভেতর একটা অজানা ব্যথা ক্রিয়া করত। স্বস্তি কী জিনিস আমি একরকম ভুলে গিয়েছিলাম। তাঁর পালকপুত্র সুশীল চাকরিসূত্রে খাগরাছড়িতে থাকত। আমার মনের অবস্থা সে টের পেয়ে গিয়েছিল। সে আমাকে বলল, তুমি কিছুদিন খাগড়াছড়িতে এসে আমাদের সঙ্গে থাক। সে এ-ও জানাল, বাইরের আলো-বাতাস গায়ে লাগলে মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠতে পারে।

খাগড়াছড়িতে আমি কোনোদিন যাইনি। এ এলাকা সম্পর্কে আমার ধারণাও অন্ধকারাচ্ছন্ন। শুধু এটুকু জানি খাগড়াছড়ি পাহাড়ি এলাকা। সুতরাং পাহাড় কি আমার মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে? আমি তো একরকম পাহাড়ি কীট। তারপরেও আমি রাজি হয়ে গেলাম। (সম্পূর্ণ…)

নারীর ক্ষমতায়ণ: রোকেয়ার স্বপ্ন

বেবী মওদুদ | ৯ december ২০১১ ১১:১১ অপরাহ্ন

br_1234.jpg
মিসেস্‌ আর, এস্‌, হোসেন (১৮৮০-৯.১২.১৯৩০)

যুগে যুগে বাঙালির ইতিহাসে এমন সব মনীষীদের আগমন ঘটেছে যাঁরা সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে তাদের কথা ও কাজের মধ্য দিয়ে উজ্জীবিত করেছেন। বিশেষ করে সংস্কারকের ভূমিকায় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। মহিয়সী রোকেয়া এমনই ব্যক্তিত্ব যিনি তার সময়ের চেয়ে একশ অথবা দুইশ বছর এগিয়ে ছিলেন। তার ছিল আধুনিক, উদার ও বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। আর এসব কারণে বাংলার অসহায় নারী জাগরণে মহিয়সী রোকেয়ার ক্ষুরধার লেখনীর যথেষ্ট অবদান রয়েছে বলে গবেষকরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।

একশ বছর পূর্বে তিনি তাঁর লেখায় নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা প্রসঙ্গে যেসব কথা বলেছেন তা বর্তমানে গভীরভাবে উপলব্ধি করা হচ্ছে শুধু নয়, নারী তার মেধা, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছে। আজ বিশ্বের সর্বত্র আমরা নারীর ক্ষমতায়ণের কথা শুনছি, দাবিও উঠছে।

নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য জাতিসঙ্ঘ সনদ প্রণীত হয়েছে, দেশে দেশে নারী উন্নয়নের নীতিমালা রয়েছে। এসব কথা আমরা রোকেয়ার রচনার মধ্যে খুঁজে পাই। রোকেয়া তার জীবনব্যাপী সাধনা দিয়ে নারীর অধিকারের প্রশ্নটি তুলেছেন সমাজের কাছে। আর পুরুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন তারা কীভাবে নারীকে বঞ্চিত, অবহেলিত ও শোষিত করে তাদের অধীনে বন্দি করে রেখেছে যেখানে স্বাধীনতা বলতে কিছুই ছিল না। নারীর ওপর পুরুষ যেন প্রভূত্বের স্থান দখল করে রেখেছে। নারীকে মানুষ নয়, পুরুষ তার অধীনস্থ ক্রীতদাসী হিসেবে বিবেচনা করতো। নারীর জীবন ছিল পশুরও অধম। পুরুষের মধ্যেও সেকালে তিনি এক নব জাগরণ ঘটিয়েছেন। আমাদের স্বীকার করতে হবে পুরুষ জেগেছিল বলেই তাদের কন্যারা পরবর্তীকালে শিক্ষার সুযোগ পায়–রোকেয়ার সার্থকতা এখানেই।

রোকেয়ার পূর্বে নারীর অবস্থা কেমন ছিল আমরা ইতিহাসের পাতা খুললেই তার যথেষ্ট প্রমাণ পাই। আমরা দেখতে পাই কন্যা সন্তানের জন্ম হলে কেউ সন্তুষ্ট হতো না। পুত্র সন্তানের জন্ম সৌভাগ্য মনে করা হতো। কন্যার অভিভাবক শৈশবে পিতা, তারপর বিয়ে হলে স্বামী এবং বার্ধক্যে পুত্র হয়েছে। নারী নিজে অভিভাবক ছিল না সন্তানদের। কন্যাকে শিক্ষা দেয়া হতো শুধুমাত্র ধর্ম, সেলাই, রান্না, ইত্যাদি গার্হস্থ কর্মকাণ্ড। এ শিক্ষায় যে যত পারদর্শী হতো তারই প্রশংসা হতো। নারীর জীবন ছিল স্বামীর মনোরঞ্জন, তার সেবাযত্ন, সন্তান গর্ভে ধারণ, জন্মদান ও লালন পালন। সংসারে তার কোনো মতামত ছিল না, অধিকারও ছিল না। ফলে পরিবারেও তার কোনো সম্মান ছিল না। (সম্পূর্ণ…)

তথ্যচিত্রে ‘অপরাজেয় বাংলা’

শামীম আহমেদ | ৯ december ২০১১ ৪:৫৮ অপরাহ্ন

ob_1.jpg……..
অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্য
……..

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ঐতিহ্যের প্রতীকে পরিণত হওয়া অনন্য ভাস্কর্য `অপরাজেয় বাংলাকে’ কেন্দ্র করে নির্মিত তথ্যচিত্র অপরাজেয় বাংলা যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০তম বার্ষিকীতে এক বিজয়ের নৈবেদ্য। গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য সারসংক্ষেপ, সংস্কৃতি, দেশের অতীত ও বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা এখানে মিলেছে নানা প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের জনগণের অপরাজেয় চেতনাকেই যেন তা চিত্রায়িত করেছে।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের চল্লিশতম বার্ষিকী উদযাপনের সময়েই তথ্যচিত্র অপরাজেয় বাংলার উদ্বোধনী প্রদর্শনী হচ্ছে শুক্রবার, নিউ ইয়র্কে। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় জ্যাকসন হাইটস-এর দ্য জুইশ সেন্টারে এ ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের আয়োজন করছে নিউ ইয়র্ক ফিল্ম সেন্টার।

ak_1.jpg……..
সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ
…….
সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল পরিচালিত ও শফিউল ওয়াদুদ প্রযোজিত এ তথ্যচিত্রে একদিকে যেমন এ ভাস্কর্য নির্মাণের সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া, মডেলদের কথা, নির্মাণের খুঁটিনাটি বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে; তেমনি উঠে এসেছে দেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং প্রগতিশীলতার পথপরিক্রমায় এ ভাস্কর্য নির্মাণের তাৎপর্যও।

এ ভাস্কর্য কীভাবে বাঙালীর আত্মপরিচয়, আশা, স্বপ্ন, অনুপ্রেরণার বাহন হয়ে ওঠে এবং অধিকার রক্ষার চেতনাসঞ্চারী প্রতীকে পরিণত হয় তাও এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরেছেন নির্মাতা হেলাল। (সম্পূর্ণ…)

অনিঃশেষ প্রাণ: হইয়াও হইল না শেষ

আলী যাকের | ১ december ২০১১ ১০:০৪ অপরাহ্ন
[২৮ নভেম্বর ২০১১ তারিখ সন্ধ্যায় ঢাকার র‌্যাডিসন হোটেলে এক্সকালিবার এন্টারটেইনমেন্ট ও যাত্রিক-এর উদযোগে আয়োজিত হয় রবীন্দ্রনাথের কাজ ও জীবনালেখ্য নিয়ে মঞ্চায়ন–‘জীবন অনিঃশেষ: লাইফ আনএন্ডিং‘। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় আলেখ্য পাঠ ও অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শর্মিলা ঠাকুর ও জগন্নাথ গুহ। বি. স.]

unending_2.jpg
পাঠ করছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শর্মিলা ঠাকুর; ছবি. আরিফ হাফিজ

এ বছর রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী। এই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এবং পশ্চিমবঙ্গে তাঁর জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপনের নানাবিধ অনুষ্ঠান প্রতিনিয়তই হচ্ছে। তাঁর সঙ্গীত, নৃত্য, কবিতা, ও নাটকের বাইরেও তাঁর জীবনের নানা দিক আলোচনা করা হচ্ছে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ একমাত্র স্রষ্টা যিনি দুটি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতাও বটে–ভারত ও বাংলাদেশ। ভারতের জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচিত হয় খুব সম্ভবত ১৯১১ সালে। তখন আমার জন্মও হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ১৯৭১-এ, এক রক্তস্নাত বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জ-জনপদে দাঁড়িয়ে, দেশকে মুক্ত করার মানসে উন্মুখ গণমানুষ সমস্বরে গেয়ে উঠেছিল–“আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।”

in_paris.jpg……
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৩০-এ, প্যারিসে
…….
রবীন্দ্রনাথ বস্তুতপক্ষে আমাদের আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বকীয়তা এবং স্বাধিকারের ধ্বজাবাহী হয়ে উদিত হয়েছিলেন বাংলার আকাশে সেই তখন থেকেই যখন পাকিস্তানিদের বর্বরতায় আমার ভাষা হয়েছিল লাঞ্ছিত, আমার সংস্কৃতি ভূলুণ্ঠিত। পাকিস্তানি শাসক ও শোষকেরা জানত যে, রবীন্দ্রনাথকে আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই আমাদের দেশকে মুক্ত করার উত্তোলিত হাত ভেঙে দেওয়া হবে। তবে রবীন্দ্রনাথের এমনই শক্তি যে তিনি আমাদেরই মাঝে অবস্থান করে আমাদেরকে সর্বদাই অনুপ্রাণিত করে এসেছেন এক স্বাধীনচেতা জাতি হিসেবে। (সম্পূর্ণ…)

রশীদ করীম: সমকালীন ও চিরকালীন

মফিদুল হক | ১ december ২০১১ ২:৩০ অপরাহ্ন

rk118.jpg……
রশীদ করীম
…..
রশীদ করীম লিখবার ক্ষমতা হারিয়েছিলেন অনেককাল আগে। স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি হয়ে পড়েছিলেন অশক্ত, চলতে ফিরতে পারঙ্গম ছিলেন না আর। কলম বশে আনতে পারগ ছিল না হাতের আঙুল, সর্বোপরি স্মৃতি তাঁর সাথে খেলছিল নিষ্ঠুর এক খেলা, আলোছায়ার ভোজবাজির মতো স্মরণ ও বিস্মরণ খেলতে থাকে তাঁকে নিয়ে, তিনি বুঝতে পারেন সব কিন্তু কিছু করবার উপায় থাকে না। বই পড়তে পারেন না, কেননা পাঠের ধারাক্রম বজায় রাখা তাঁর আয়ত্তের বাইরে, লিখতে পারার প্রশ্নই ওঠে না, বাইরের জীবনের সঙ্গে একেবারে সংযোগবিহীন হয়ে পড়েন তিনি। আজীবন সাহিত্যচর্চায় সমর্পিত ছিলেন যে-মানুষটি তাঁর জন্য এই পরিস্থিতি ছিল গভীর বেদনাদায়ক। ১৯৯১ সালে তাঁর সর্বশেষ রচনা, স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ জীবন মরণ যখন বের হলো তখন তিনি পুরোপুরি স্মৃতিধূসর হন নি, বহু কষ্টে শেষ করেছিলেন নিজের জীবনকথা, নিজের তো নয়, তাঁর চারপাশের মানুষদের কথা এবং সেই গ্রন্থের উৎসর্গপত্রের পরে আলাদা এক পৃষ্ঠায় লিখেছিলেন, লেখেন তো নি, মুখে মুখে বলে দিয়েছিলেন কথাগুলো : “এই আমার শেষ লেখা, ইংরেজিতে যাকে বলে সোয়ান সঙ্–ময়ালসঙ্গীত।”
—————————————————————–

উত্তম পুরুষ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে, যদিও এর মুসাবিদা তিনি শুরু করেছিলেন অনেক আগে… সমকাল পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসের প্রকাশ এক পর্যায়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর, তাঁর মনে হয়েছিল সাম্প্রদায়িক ভাবনাদুষ্ট এই রচনা।

—————————————————————–
আমি যখন তাকাই রশীদ করীমের দুঃখভরা শেষ জীবনের দিকে, সেই ১৯৯২ সাল থেকে যে রোগজর্জর জীবন তিনি বহন করে চলেছিলেন, কিন্তু শত বাধা ও দুঃখময়তা সত্ত্বেও আভিজাত্যবোধ ও শরাফতিতে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটতে দেন নি, কাউকে তাঁর জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতিময় হওয়ার অবকাশ যোগান নি। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com