আচারকাহিনি

মোহাম্মদ আজম | ৩১ আগস্ট ২০১০ ৮:২০ অপরাহ্ন

এই কাহিনি হয়তবা সম্পূর্ণরূপে আপনাদের কানে যাবে; কিংবা, এমনও হতে পারে—যেমনটা প্রায়ই হয়ে থাকে—আধখেচড়া হয়ে বেগানা কারো হাত ধরে পৌঁছে যাবে আপনার দ্বারে। যেভাবেই পৌঁছাক না কেন, আপনি এর অসাধারণত্ব কম-বেশি আঁচ করতে পারবেন। আপনি নিজগুণে ফাঁকা ফাঁকা ভাংতিগুলোকে কাটাস্থান জোড়া লাগানোর মতো করে অনায়াসে ভরিয়ে দিয়ে চিক্কন-নধর দেবীপ্রতিমার মতো আখ্যানটি আস্বাদন করে থাকবেন। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এ সময় কিছুতেই আপনার পাঁচ বছরের দীর্ঘ সময়কে ফালি ফালি করে কেটে দেখার উৎসাহ জাগবে না। পাঁচ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। আর আসলেই এখন যে কাহিনিটি হাতের মুঠোয় নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছেন আপনি, তার ১৮২৬ দিনের অনেকগুলো দিন কোনো শারীরিক-মানসিক চিহ্ন না রেখেই হাপিস হয়ে গেছে। এর মধ্যে, মনে করা যাক, সর্বমোট ৩৮ দিন ঝড়ো-হাওয়াসহ বৃষ্টি এসে দক্ষিণ-পূর্ব করিডোর সংলগ্ন তাকটির গ-দেশ পর্যন্ত ভিজিয়ে দিয়েছিল। এখন, আমরা যেহেতু শুনছি বা শুনব কেবল আচারকাহিনি, এবং সাধারণভাবে অহেতুক অনুসন্ধিৎসায় কথককে মাঝপথে বিভ্রান্ত না করার পাঠ ইংরেজিশিক্ষার দৌলতে আত্মস্থ করেছি, সেহেতু ঝড়োহাওয়াময় বৃষ্টিবাদলার দিনগুলো থেকে আমরা এই কাহিনিতে কেবল সে দিনগুলোরই চিহ্ন বিচড়ে দেখব, যেসব দিনে বারান্দার নিবিড় তাকে মাঝারি ও বড় আকারের বৈয়ামগুলো পরদিন রোদে শুকাতে দেয়ার জন্য তুলে রাখা ছিল। পাঁচ বছর যথেষ্ট দীর্ঘ আর প্রয়োজনীয়।
—————————————————————-
জোহরা বেগম প্রায় অকস্মাৎ পরিবারের আর আশপাশটার মনোযোগের কেন্দ্রে আসীন হন। আপনারাও নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারবেন, গেলবার বিখ্যাত আচারকোম্পানি ‘মাসকাট’ ‘দিনের শুরু’ পত্রিকার সাথে যৌথ উদ্যোগে আচার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। জনৈকা জোহরা বেগম কাঁপা কাঁপা হাতে অনুষ্ঠানের সভানেত্রী প্রফেসর ইলোরার হাত থেকে পুরস্কারের চেক এবং ক্রেস্ট গ্রহণ করছে—এরকম ছবি পত্রিকাটি পরের দিন ফলাও করে প্রচার করায় ‘মাসকাট’ কোম্পানি এবং বিশেষত ‘দিনের শুরু’ পত্রিকার জনহিতকর উদ্যোগ বিষয়ে আপনারা মধুর কেন্টিন অথবা শাহবাগ অথবা ভুরুঙ্গামারি থানা সদরে হোসেন আলির দোকানে চা খেতে খেতে আলাপ করে থাকবেন।
—————————————————————-
তখন হয়ত সময় সম্পর্কে আপনার অর্জিত জ্ঞান এই একরৈখিক আখ্যান উপভোগের ক্ষেত্রে একটা ছোট্ট চোরাকাঁটার মতো বাধা হয়ে দাঁড়াবে; আর ইতিহাসের চক্রাকার আবর্তন, দুর্ঘটনা ইত্যাকার নানা হাতছানির মোহনমায়ায় আটকা পড়ে আপনি দেখতে শিখবেন পঞ্চাশ বছর আগের এক শ্যাওলা-পড়া স্যাঁতস্যাঁতে পুকুরঘাট। সেখানে পানের বাটা পায়ের কাছে রেখে কোহিনুর বেগম তার নাতনির কচি হাতের উকুনবাছা উপভোগ করছে। আপনি কোহিনুর বেগমের ঈষৎ উৎসুক চোখজোড়াকে পশ্চিমপাশে মাটিতে সার বেঁধে রাখা বৈয়ামগুলোর পার্শ্বদেশ ঘেঁষে বিচরণ করতে দেখবেন। এসবই ঘটে যাবে আপনার চোখের সামনে; কারণ, গ্রন্থপাঠের অভিজ্ঞতাহেতু অতীত আর বর্তমানের আপাত-ব্যবধানটি ঘুচিয়ে নেবার একটা সহজাত ক্ষমতা আপনার জন্মেছে; আর এই সুযোগে পঞ্চাশ বছর সময়কে আপনার নিকট-অতীত বলেই ভ্রম হবে। যেভাবে আশি বছরের জীবন-কাটানো গম্ভীর বৃদ্ধা তার নানিবাড়ির ক্ষীর-ওঠা দুধ খাওয়ার স্মৃতি তালাশ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে—মন লয় কাইলকার কথা, এহনো জিব্বায় লাইগ্যা রইছে। আরেকটি কারণে আপনার কাছে দৃশ্যটি সুদূরের মনে না-ও হতে পারে। তখন বিকালের আলো আস্তে আস্তে মজে আসায় ঘরের পুবচালের টিন উঠানের মধ্যভাগ পর্যন্ত হালকা ছায়া ফেলেছে, আর পুকুরপাড়ের ঘন গাছের ঝোঁপ চারপাশটাকে ক্রমশ মলিন করে দিয়ে এই নানি-নাতনিকে হালকা ছায়ার মায়ায় ঢেকে দিচ্ছে। দৃশ্যটি গেলবার নড়াইল ভ্রমণের সময় ছবির শেখের বাহিরবাড়িতে বসে মনোযোগ দিয়ে অনুভব করায় আপনার কাছে আপ-টু-ডেট মনে হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আর হয়তবা জীবনানন্দে প্রবল ইমান থাকায় আপনি আপ্তবাক্যের মতো বলে উঠবেন—গ্রামবাংলার এইসব দৃশ্য নষ্ট হয়ে যাওয়া ঘড়ির কাঁটার মতো স্থির হয়ে আছে। (সম্পূর্ণ…)

নজরুলসঙ্গীতের নবজন্মে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা

বাবু রহমান | ২৭ আগস্ট ২০১০ ৮:৪২ অপরাহ্ন

nazrul-112.jpg
নজরুল ইসলাম (২৫/৫/১৮৯৯ – ২৯/৮/১৯৭৬)

ছন্দ ও নবরসের দিক থেকে বাংলা গানের ইতিহাসে সবচে শক্তিশালী, ঋদ্ধ ও ওজঃগুণসম্পন্ন গান কাজী নজরুল ইসলামের। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ-চল্লিশ দশকের এমন কোন শিল্পী নেই যিনি নজরুল সঙ্গীত গাননি। বাংলা গানে প্রাক-নজরুল গীতিকবি ও সুরকার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন ও অতুল প্রসাদ সেন। এঁরা প্রত্যেকেই এক এক জন সার্থক স্রষ্টা। প্রাগুক্ত চারজন স্রষ্টাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন নজরুল। নজরুল গুরু রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। শুধু গানের সংখ্যাধিক্যে নয়।সুরের বাঁধ ভাঙা জোয়ারে ডিস্ক, বেতার (১৯১৯), সবাক চলচ্চিত্র (১৯৩১), মঞ্চ নাটক, পত্র-পত্রিকাসহ গণমাধ্যমকে ভাসিয়ে সয়লাব করে দিয়েছিল তাঁর গান।

—————————————————————-
‘নবযুগ’ পত্রিকায় কবি তখন স্বাক্ষরযুক্ত সম্পাদকীয় লেখেন। এক সংখ্যায় লিখলেন ‘পাকিস্তান না ফাঁকিস্থান?’ আর যায় কোথায়, ভীমরুলের চাকে ঢিল ছোঁড়া ছাড়া আর কী? তরুণ এই পাকিস্তান আন্দোলনকারীরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন।… আক্রমণের পর ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি কবি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তার পিঠে সেই আঘাতের চিহ্ন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কবি বহন করছিলেন। বাংলাদেশে কবির ব্যক্তিগত সহকারী শফি চাকলাদার সেকথা অকপটে স্বীকার করেছেন। ছবি তুলে রেখেছেন, কিন্তু কাউকে দেননি।… লুম্বিনী হাসপাতালে শেকল দিয়ে বেঁধে, লোক-আড়ালে কবিকে নিঃশেষ করে দেয়া হলো।
—————————————————————-
নজরুলের শিষ্য হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন চিত্ত রায়, জগৎ ঘটক, সন্তোষ সেনগুপ্ত, দুর্গা সেন, কমল দাশগুপ্ত, রঞ্জিত রায়, গিরীণ চক্রবর্তীসহ আরও অনেকে। আর এঁদের সেই সৃষ্টিকে ধরে রেখেছিলেন সে সময়ের কণ্ঠশিল্পীবৃন্দ। বিশেষ করে কে. মলিক, আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, ভবানী দাস, কমলা ঝরিয়া, সত্য চৌধুরী, জগন্ময় মিত্র, বীণা চৌধুরী, কমল দাশগুপ্ত, নিতাই ঘটক, সুধীরা সেনগুপ্তা, কানন বালা, পদ্মরানী চ্যাটার্জী, বেচু দত্ত, আব্বাস উদ্দীন, দিলীপ রায়, বরোদা চরণ গুপ্ত, বিজনবালা ঘোষ দস্তিদার, মনোরঞ্জন সেন, উমাপদ ভট্টাচার্য, নীহারবালা, আব্দুল লতিফ, হরিমতী, আশ্চর্যময়ী দাসী, সরযুবালা, ধীরেন দাস, মৃণাল কান্তি ঘোষ, ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র, রথীন ঘোষ, রাধারানী দেবী, রত্নেশ্বর মুখার্জী ও সিদ্ধেশ্বর মুখার্জীসহ অনেকেই তাঁর গান গেয়ে ধন্য হয়েছেন। (সম্পূর্ণ…)

গ্যাংগারাইল

মোশাহিদা সুলতানা ঋতু | ২৫ আগস্ট ২০১০ ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন

gangarail_1.jpg
গ্যাংগারাইলের পাড়

খুলনা শহরের রয়েল হোটেলে রুটি, মাখন, আর ডিম দিয়ে সকালের নাস্তা শেষ করে কফি খাচ্ছি। মোবাইলে দেখি রিং বাজছে। ফোন করেছে দুলু–আমার গাইড। ফোন তুললে ওই পাশ থেকে দুলু বলল, আপা, আমি আসছি নিচে। দুলুকে অপেক্ষা করতে বলে আমি কফিতে শেষ চুমুক দিচ্ছি।

দুলুকে আমি কখনো দেখিনি। এর আগে আমার গাইড ছিল সালাম। সে চিটাগাংয়ে একটা চাকরি পেয়েছে, তাই তার এক প্রতিবেশীকে বলে দিয়েছে আমাকে নিয়ে যেন আজকে বের হয়। এদিকে কালকে আমি একজন সহকারী গবেষককেও পেয়েছি, যার গত পরশু অনার্সের শেষ ফাইনাল পরীক্ষা ছিল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সব মিলে আজকের সফরে আমার সঙ্গী দুইজন হলো। শেষ চুমুক দিতে দিতে সহকারী গবেষক শাওন ফোন করলো। শাওনের ফোনটা না তুলে আমি নিচে রিসেপশনে চলে গেলাম। রিসেপশনে এসে দেখি গাড়ির ড্রাইভারও এসে হাজির। আজকের ড্রাইভারের নাম সুমন। একটা সাদা রঙের টয়োটা গাড়ি নিয়ে এসেছে সে।

picture-190.jpg………
মধুখালী, চিংড়িঘেরের ধার দিয়ে
………
আমরা তিন জন ম্যাপ নিয়ে বসলাম রিসেপশনে। দুলুকে দেখালাম কোন কোন জায়গায় যেতে চাই আজকে। দুলু যখন শুনলো আমি আজকে কয়রা আর পাইকগাছায় যেতে চাই তখন সে বলল, ভালো হয় যদি আমরা প্রথমে কয়রা যাই। সেখান থেকে দুপুরের পর পাইকগাছা যাওয়া যেতে পারে।

দুলুকে একটু ভালো মত লক্ষ করলাম। সে একটা সাদা গেঞ্জি জিন্সের প্যান্টে গুজে পড়েছে, সাথে একটা কালো রঙের জাহাজের মত জুতা। আমার পায়ে লাল রঙের স্পঞ্জের স্যান্ডেলের দিকে তাকালাম। কাদা পারাতে হবে বলে আমি আগে থেকেই প্রস্তুত। শাওনকেও দেখলাম একটা স্যান্ডেল পরে এসেছে। কিন্তু বটিয়াঘাটা থেকে আসা আমাদের গাইড দুলু পরেছে জুতা। আমি দুলুকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার জুতা পরে অসুবিধা হবে না তো? (সম্পূর্ণ…)

রাশিদা সুলতানার পরালালনীল

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ | ২৪ আগস্ট ২০১০ ৮:১০ পূর্বাহ্ন

ছোটগল্প কী? তা কত প্রকার? কেন লেখা হয়? কেন পড়া হয়? একজন অলেখক-পাঠক কী পড়েন, পড়তে চান, ছোটগল্পে? কী পড়েন, পড়তে চান একজন লেখক-পাঠক? উপন্যাসের সঙ্গে ছোটগল্পের মিল এবং গরমিলগুলি
cover_poralalnil.jpg……..
পরালালনীল । রাশিদা সুলতানা । প্রচ্ছদ: । ধ্রুব এষ । মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ফোন: ৭১৭৫২২৭ । ফেব্রুয়ারি ২০০৯ । ৯৬ পৃষ্ঠা । ১২০ টাকা ।
……..
rashida-s-bf.jpg

কী কী? কবিতার সঙ্গে? প্রবন্ধের সঙ্গে?—ইত্যাকার নানা প্রশ্ন জাগে মনে। সমস্যা হ’ল, প্রশ্নগুলির উত্তর, বা উত্তরের প্রয়াসগুলো, ব্যক্তিসাপেক্ষ হ’তে প্রায় বাধ্য। এবং কাজেই ছোটগল্পের কোনো সর্বমান্য সংজ্ঞার্থের দিকে পৌঁছুতে পারা সুদূরপরাহত। কিন্তু তবু প্রশ্নগুলির উত্থাপনের, বারে-বারে উত্থাপনের, জরুরতটা থেকেই যায়।

উপন্যাস নিয়ে, কবিতা নিয়ে আলোচনা অনেক হয়েছে। তুলনায়, ছোটগল্প বেশ উপেক্ষিত। একে, এখন-অব্দি, উপন্যাসেরই একটা বাই-প্রডাক্ট ব’লে ধ’রে নেওয়া হচ্ছে মনে হয়।

উপস্থিত আমাদের সম্বল কিছু পাঠশালাপাঠ্য পশ্চিমী ধারণা—যথা, মোপাসাঁ, গোগল, চেখভ, ক্যাথার, রবীন্দ্রনাথ, মম; যথা, উপন্যাসের চেয়ে আকারে ঢের ছোটখাটো, প্রকারে আঁটোসাঁটো, সূচনা-ব্যাপ্তি-উপসংহারে নিবিড় নিয়মনিষ্ঠ, ঘটনার ঘনঘটা আর ব্যাপক চিন্তনের ভারমুক্ত একটা সুচিক্কণ রচনা; আর—রবিবাবুর বেদবাক্য: শেষ হ’য়ে হইল না শেষ। এ-ই, প্রায়, সবটুকু। এসব দিয়ে চ’লেও যাচ্ছিল ভালোই, অনেকদিন। কিন্তু এখন ন’ড়েচ’ড়ে বসতে হচ্ছে আবার। ছোটগল্প তার এইসকল তকমা পরতে চাইছে না আর। যেন। ব্রাত্য রাইসুর মতো লেখকদের গল্প পড়তে গিয়ে আমাদের আবার ভাবতে বসতে হচ্ছে—তাহলে ছোটগল্প কী জিনিস।
——————————————————–
ধান ভানতে শিবের গীত রাশিদা গা’ন না, আর ধান ভানেনও প্রায় কোনো কলাকৌশল ছাড়া, একেবারে ম্যাটার-অব-ফ্যাক্ট ভঙ্গিতে। তবে এই “সারল্য”-কে প্রকরণদক্ষতার অভাব হিসাবে পরিগণনারও অবকাশ থাকে, কেননা সারল্য তো দুই প্রকারের হ’তে পারে : অর্জিত, এবং অজ্ঞানপ্রসূত (বা অভিজ্ঞ ও অনভিজ্ঞ)। কিন্তু কোনো পাঠক কারো লেখায় এর দেখা পেলে তাকে কোন্‌টি ব’লে ধ’রে নেবেন?
——————————————————–
ছোটগল্পের সঙ্গে উপন্যাসের প্রধান যে-ভেদচিহ্নটি, মানে আকার, তা-ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, এবং এই চ্যালেঞ্জ খুব সদ্যস্তনও নয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘নষ্টনীড়’-কে গল্প, আর ‘দুই বোন’ আর ‘মালঞ্চ’-কে উপন্যাস বলেছেন। কেন? অমিয়ভূষণের ক্ষুদ্র রচনা ‘মধু সাধু খাঁ’ কেন উপন্যাস? কেন কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’? প্রসঙ্গতঃ, হাসান আজিজুল হকের ‘বৃত্তায়ন’-এর কথা পাড়া যাক। (পেঁচা প্রকাশনা থেকে) বইটার প্রথম সংস্করণের প্রকাশের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। হাসান স্যর এটিকে তখন গল্পই বলতেন, আমাদেরই পেড়াপিড়িতে এটাকে “উপন্যাস” হিসাবে গ্রন্থস্থ করতে নিমরাজি হয়েছিলেন তিনি। (সম্পূর্ণ…)

মইদুল ইসলামের শেষ তিন উপন্যাস

শিবব্রত বর্মন | ২০ আগস্ট ২০১০ ৬:১৪ পূর্বাহ্ন

ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র নান্দনিক-এর বর্ষা সংখ্যায় “শুয়োপোকার খোলসত্যাগ” শিরোনামে সমালোচক সালাউদ্দীন তাবরেজির একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। দীর্ঘ, তথ্যবহুল এ নিবন্ধে সমালোচক আমাদের সময়কার রহস্যময় লেখক মইদুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেছেন। সালাউদ্দীন তাবরেজির পাণ্ডিত্য প্রশ্নাতীত। তার গদ্য সুখপাঠ্য, যুক্তি ধারালো এবং অন্তর্দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। তার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত না হওয়ার অবকাশ কম। তবে নিবন্ধের শেষ দিককার কয়েকটি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমাকে দ্বিমত পোষণ করতে হচ্ছে। আমি সেই জায়গাগুলো তুলে ধরে আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।

মইদুল ইসলামের সাহিত্যকীর্তিকে তিনটি ধাপে ভাগ করেছেন সমালোচক: প্রারম্ভিক পর্ব, মধ্য পর্ব (যেটিকে অনেকে তার নিরীক্ষাকাল হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন) এবং চূড়ান্ত পর্ব। মইদুল ইসলামের শেষ তিনটি উপন্যাসকে চূড়ান্ত পর্বের অন্তর্ভূক্ত করেছেন সমালোচক এবং এগুলোকে তার সামগ্রিক লেখক জীবনের কালমিনেশন বা চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
————————————————————
আবুল খায়ের নিজে মনে করতেন, এ তিন উপন্যাস আসলে প্রণবেশ মাইতির লেখা। প্রণবেশ তার যন্ত্রটিকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন, যাতে তার নিজের লেখাগুলো মইদুল ইসলামের লেখা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। এ কাজ করার পেছনে প্রণবেশের কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, সেটার কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা আবুল খায়ের আমাকে দিতে পারেননি।
————————————————————
এটা অস্বীকার করার যো নেই যে, গত এক দশক ধরে এ রকম বিশ্লেষণ একপ্রকার সাহিত্যিক রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। যে কোনো মনোযোগী পাঠক এটা লক্ষ্য না করে পারবেন না, এসব সমালোচনা আসলে একই বক্তব্যের চর্বিত চর্বন। একটি লেখা থেকে আরেকটি লেখা আলাদা করা যায় না এবং এগুলো লেখক মইদুল ইসলাম বা তার সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে আমাদের নতুন কোনো তথ্য দেয় না। (সম্পূর্ণ…)

চারটি কবিতা

সিদ্ধার্থ হক | ১৯ আগস্ট ২০১০ ১০:২০ অপরাহ্ন

সমগ্র মৃদুতা নিয়ে

সমগ্র মৃদুতা নিয়ে যদি তুমি ভাবো এই পৃথিবীর কথা,
বহুদিন একটানা চুপ করে থেকে তাকে দেখো মনে মনে,
তবে জেনো, পরিপূর্ণ একা হয়ে মহাশূন্যে ছুটছে সে এখন।
কোনোদিন থামে নাই। ঢলে পড়ে যায়নি নিদ্রায়।
অনাস্তিক ছায়া পথে জীবনের ঘূর্ণমান জায়গীর বসিয়েছে।
বন্ধু নেই, সুনির্ণীত শত্রু নেই, আছে এক
আত্ম-জিজ্ঞাসার হুঁশ, মহাশূন্যে একা ছুটে চলা।
নিঃসঙ্গ কে আর তার মত

নিজেকে রক্ষণ করা জেনে নিতে হয় পৃথিবীকে।
আপন মনের জোরে তৈরি করে নিতে হয় আবহমণ্ডল,
রূপের কবিতা। স্বচ্ছ বৃষ্টিপাত ঢেলে সাজায় সে
অভ্যন্তরগুলি অবিরাম। দিগন্তের শান্ত বেড়া তোলে।
স্তরে স্তরে তৈরি করে গভীর আকাশ, মনোরম কারাগার;
হৃদয়ে আগ্নেয়গিরি জ্বেলে রাখে ভূপৃষ্টে সবুজ চায় বলে।

যদিওবা বহু বহু জাগতিক বেদনায় তুমি নত, নিম্নগামী—
লক্ষ করো, অনন্ত আশ্চর্য পথে, তবু তুমি তারই উৎসাহ;
পৃথিবীর যা যা আছে তোমারও তা আছে। লক্ষ করো
এই সত্য জেনে, যদিও মানুষ তবু ভয় চলে যায়, কষ্ট কমে—
স্পষ্টভাবে টের পাও মানুষের তৈরি করা
ক্ষণস্থায়ী সংজ্ঞা আর রাষ্ট্রের বাইরে, নির্দিষ্ট বুদ্ধির পথে
চলেছে পৃথিবী, ব্যতিক্রমী কবিতার ন্যায়,
পরিপূর্ণ ভুলহীন, সুস্থির ও রাগী। সময়কে নিয়ে কোনো
মাথাব্যথা নেই, কিন্তু বৃষ্টি নিয়ে আছে। সেইহেতু
বহু আগে লুপ্ত হওয়া জীবনের পূর্বাভাসগুলি, দ্যুতিগুলি—
অনায়াসে সঞ্চারিত হয়ে আছে তোমার ভিতরে। (সম্পূর্ণ…)

“বাংলা ভাষা বলে একটি বিশেষ ভাষা নেই, বাংলা বহু ভাষা।”
সলিমুল্লাহ খানের সঙ্গে আলাপ

শামস আল মমীন | ১৮ আগস্ট ২০১০ ১০:৪৬ অপরাহ্ন

salim-khan.jpg…….
সলিমুল্লাহ খান (জন্ম. ১৮ আগস্ট ১৯৫৮), ছবি. নাসির আলী মামুন
……

[জ্ঞান অর্জনের জন্য যাঁরা জাগতিক প্রাপ্তিকে তুচ্ছ ভেবে একরোখা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, বর্তমান সময়ে, সলিমুল্লাহ খান তাঁদের মধ্যে (তার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ফলাফলের মতই) প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার দাবি রাখেন নিঃসন্দেহে। তিনি আমেরিকাতে ছিলেন প্রায় চৌদ্দ বছর। এবং ইচ্ছা করলেই তিনি এখানে অনেকের মতো স্থায়ীভাবে থেকে যেতে পারতেন এবং প্রাচুর্যও কোনও না কোন ভাবে তাঁর কাছে ধরনা দিতো একথা নিশ্চিত বলতে পারি। কিন্তু, তিনি তা করেননি আর এখানেই অন্যদের থেকে তিনি আলাদা হয়ে যান। আর কিছু না হোক নিউইয়র্কে থাকাকালীন বই পড়ে তিনি তাঁর পড়াশুনা করার অতল পিপাসার কিছুটা হলেও মিটিয়েছেন বলেই আমার ধারণা। নিউইয়র্কে বাসা বদল করতে করতে শেষদিকে তিনি আমার প্রতিবেশী হয়ে ওঠেন। তিনি যেদিন পিএইচডি ডিগ্রীপ্রাপ্ত হন (এপ্রিল, ২০০০) সেদিনই আমাকে জানালেন আর মাত্র চারদিন পরই সুইডেন হয়ে দেশে ফিরছেন। তাঁর একটা ইন্টারভিউ নেওয়ার ইচ্ছা মনে মনে ছিল কিন্তু এমন তাড়াহুড়া করতে হবে তা কখনো ভাবিনি।

বলা দরকার, এই সাক্ষাৎকার যখন নেওয়া হয় তখন তিনি, এক আকাশের স্বপ্ন (কবিতা), আল্লাহর বাদশাহি (অনুবাদ কবিতা) এবং বাংলাদেশ: জাতীয় অবস্থার চালচিত্র—শুধুমাত্র এই তিনটি বইয়ের জনক ছিলেন। এবং আমাদের আলোচনাও, সঙ্গত কারণেই, এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এবং সেই থেকে সাক্ষাৎকারটি বাক্সবন্দি হয়ে আছে। আমি নিজে কখনো কোথাও ছাপানোর চেষ্টা করিনি। কারণ এটা এতদিন আমার কাছে আমাদের বন্ধুত্বের স্মৃতি হিসাবেই বিবেচ্য ছিল। কবিবন্ধু ব্রাত্য রাইসু এর আগে আমাকে দিয়ে কবি শহীদ কাদরীর একটা দীর্ঘ ইন্টারভিউ করিয়ে নিয়েছিলেন এবং প্রথম আলো পত্রিকায় ছেপেছিলেন। এবারও ব্রাত্য রাইসুর উৎসাহ এবং ইচ্ছায় পাঠকের সাথে বর্তমান সাক্ষাৎকারটির যোগাযোগ ঘটছে এ জন্য তাঁর সম্পাদনার উৎসুক মনকে অভিনন্দন জানাই। শামস আল মমীন। নিউইয়র্ক, ডিসেম্বর ১৪, ২০০৯।]

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: শামস আল মমীন

শামস আল মমীন: বহু বছর অপেক্ষার পর সম্প্রতি আপনার অনূদিত তৃতীয় বই আল্লাহর বাদশাহি বের হয়েছে। এদ্দিন পর বই প্রকাশের জন্য অনুবাদ বেছে নিলেন কেন?

সলিমুল্লাহ খান: আমি যখন প্রথম কবিতা লেখা শুরু করি তখনও আমি অনুবাদ করেছি কিন্তু প্রকাশের সুযোগ হয়নি। আমার প্রথম কবিতার বই এক আকাশের স্বপ্ন মৌলিক কবিতা দিয়ে ৬৪ পৃষ্ঠা হচ্ছিল না, পৃষ্ঠা পূরণের জন্য ৩/৪ টা অনুবাদ কবিতা বইতে দিয়েছিলাম।
—————————————————————-
আমি যদি গ্রিক ভাষা কিম্বা ইটালিয়ান ভাষা শিখতে পারি যেমন মধুসূদন শিখেছিলেন, তাহলে আমার উচিত ময়মনসিংহের ভাষা, বরিশালের ভাষা শেখা। কলকাতার ভাষা প্রতিষ্ঠিত ভাষা হয়ে গেছে বলে আর ময়মনসিংহের ভাষায় কোন মনযোগ দেওয়া যাবে না, প্রবণতা হিসাবে এটা হবে কবিদের জন্য ক্ষতিকর। কিছু কিছু আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে এমন প্রকাশভঙ্গি আছে যা তথাকথিত শুদ্ধ ভাষায় নেই।
—————————————————————-
শামস আল মমীন: অনুবাদের জন্য সবাই বেছে নেন বহু পরিচিত, বহু পঠিত কোন লেখককে। সে ক্ষেত্রে আপনি ডরোথি জুল্লের মতো বাংলাদেশে প্রায় অপরিচিত কবিকে বেছে নিলেন কেন?
allahar-badshahi.jpg…….
আল্লাহ্‌র বাদশাহি । সলিমুল্লাহ খান অনূদিত বাম গণতান্ত্রিক জার্মান কবি ডরোথি জুল্লের কবিতা । প্রচ্ছদ: ওবায়দুল্লাহ আল মামুনের ছবি অবলম্বনে সেলিম আহ্‌মেদ । প্রকাশক: সমাবেশ, শাহবাগ, ঢাকা । সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ । ৮০ পৃষ্ঠা । ৮৫ টাকা ।
……..
সলিমুল্লাহ খান: উত্তর খুব সোজা। আমি কবির নাম দেখে কবিতা পড়ি না। কবিতা পড়ার পর কবির নাম দেখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে তখন আমি কাজ করি, বইয়ের তাকে বই গোছানোই ছিল আমার কাজ। হঠাৎ দু’টা বই আমার চোখে পড়ে Revolutionary Passion এবং Of War and Love। গোটা কয়েক কবিতা পড়ে ভাল লাগলো। বই দু’টা বাসায় নিয়ে আসি। পড়ে খুবই ভাল লাগলো। ৮/১০ টা কবিতা অনুবাদও করে ফেলি। তখন মনে হলো, এঁর কবিতা যদি আরো জোগাড় করা যায় তাহলে তো একটা বই করা যায়। আমি কবির সাথে যোগাযোগ করি। দেখলাম, মানুষ হিসাবেও তিনি ভাল। এই হলো আল্লাহর বাদশাহি’র জন্মকথা। (সম্পূর্ণ…)

সেন্টমার্টিন: দইরগার চরত বেরাই টেরাই হনো মজা ন পাইবা…

নূরুল আনোয়ার | ১০ আগস্ট ২০১০ ৮:৪৫ অপরাহ্ন

nanwar_1.jpg
লেখক, স্ত্রী শিল্পী ও পুত্র আপন, পেছনে কেয়াবন

nanwar_2.jpg
আপন

সেন্টমার্টিন ভ্রমণের প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল দুই হাজার দুই সালের ডিসেম্বর মাসে। সঙ্গে ছিল আমার এক বন্ধু। নাম বাবু। আমরা বৃহত্তর চট্টগ্রামটা ঘুরে দেখব এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু সেন্টমার্টিন যাব সেই চিন্তাটা তখনও মাথায় আসেনি। যখন আমরা আমার বন্ধু রাফায়েলের ঘরে গিয়ে আতিথ্য গ্রহণ করলাম তিনি আমাদের মনকে উসকে দিলেন, কেন আমরা সেন্টমার্টিন যাই না। ওখানে কীভাবে যেতে হয় তিনি আমাদের পথ বাতলে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা আমাদের মনে ধরেছিল। তার কথামত আমরা পরের দিন ভোরে কক্সবাজারের লালদিঘীর পাড় থেকে একটা লোকাল মাইক্রোবাসে করে টেকনাফের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছিলাম। শীত তখনও জেঁকে বসেনি। কুয়াশা এবং হালকা ঠাণ্ডা মিলে পুরো প্রকৃতিটা আমাদের অনুকূলে ছিল। আমার ঠিক মনে আসছে না। মাইক্রোবাস খুব সম্ভব আমাদের কাছ থেকে মাথাপিছু ষাট টাকা করে নিয়েছিল। টাকাটা আমাদের কাছে মুখ্য ছিল না। নতুন একটা জায়গায় যাচ্ছি, যে কারণে আমাদের মনটা ভারি উৎফুল্ল ছিল।

মাইক্রোবাস সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ আমাদের টেকনাফে নিয়ে নামিয়ে দিয়েছিল। এই জায়গাটিতে আমাদের প্রথম পদার্পণ। তার আগে আমার ধারণা ছিল টেকনাফ একটা বড়সড়ো শহর, যেখানে বাংলাদেশী এবং বার্মার লোকজন গিজগিজ করে। ব্যাপারটা তা নয়। টেকনাফ আমাদের গ্রামের বাজারের চেয়ে খুব বেশি বড় নয়। সুতরাং আমি চমৎকৃত হলাম না। তা নিয়ে আমার মাথাব্যথাও ছিল না। আমরা সেন্টমার্টিন যাব এবং সেখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করব। জীবনে প্রথম একটা নতুন জায়গায় যাচ্ছি, আমরা খুশিতে গদগদ ছিলাম। (সম্পূর্ণ…)

‘পারস্যে’: মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা

অদিতি ফাল্গুনী | ৬ আগস্ট ২০১০ ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন

rabi_11-1.jpg

বোগদাদে ব্রিটিশদের আকাশফৌজ আছে। সেই ফৌজের খৃষ্টান ধর্মযাজক আমাকে খবর দিলেন, এখানকার কোন্ শেখদের গ্রামে তাঁরা প্রতিদিন বোমা বর্ষণ করছেন। সেখানে আবালবৃদ্ধবণিতা যারা মরছে তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উর্দ্ধলোক থেকে মার খাচ্ছে; এই সাম্রাজ্যনীতি ব্যক্তিবিশেষের সত্তাকে অস্পষ্ট করে দেয় বলেই তাদের মার এত সহজ। খৃস্ট এই-সব মানুষকেও পিতার সন্তান বলে স্বীকার করেছেন, কিন্তু খৃস্টান ধর্মযাজকের কাছে সেই পিতা এবং তাঁর সন্তান হয়েছে অবাস্তব, তাঁদের সাম্রাজ্যতত্ত্বের উড়ো জাহাজ থেকে চেনা গেল না তাদের, সেইজন্যে সাম্রাজ্য জুড়ে আজ মার পড়ছে সেই খৃস্টেরই বুকে। তা ছাড়া উড়ো জাহাজ থেকে এই-সব মরুচারীদের মারা যায় এত অত্যন্ত সহজে, ফিরে মার খাওয়ার আশঙ্কা এতই কম যে, মারের বাস্তবতা তাতেও ক্ষীণ হয়ে আসে। যাদের অতি নিরাপদে মারা সম্ভব মারওয়ালাদের কাছে তারা যথেষ্ট প্রতীয়মান নয়। এই কারণে, পাশ্চাত্য হননবিদ্যা যারা জানে না তাদের মানবসত্তা আজ পশ্চিমের অস্ত্রীদের কাছে ক্রমশই অত্যন্ত ঝাপসা হয়ে আসছে।’ (পারস্যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃষ্ঠা ৬২৯, একাদশ খণ্ড , বিশ্বভারতী কর্তৃক প্রকাশিত ১২৫ তম রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ, আষাঢ় ১৩৯৭, পুনর্মুদ্রণ পৌষ ১৪০২।)

তেতাল্লিশ পৃষ্ঠার ভ্রমণ কাহিনী ‘পারস্যে’ মূলতঃ রবীন্দ্রনাথের ইরান যাত্রার বিবরণ হলেও এই ভ্রমণ কাহিনীর শেষ কয়েক পাতায় ইরান সীমান্ত পার হয়ে ইরাক ঘুরে দেখার কথাও আছে। অন্য নানা ভ্রমণ আখ্যানের মতো ভ্রমণ কড়চার পাশাপাশি সমকালীন বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষণ, পূর্ব-পশ্চিম বা প্রাচ্য-পাশ্চাত্য নিয়ে ভাবনা, বেড়াতে যাওয়া দেশের ইতিহাস-শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়ক তথ্য পর্যালোচনা সহ নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু, সবচেয়ে যেটা বিস্ময়কর মনে হয়েছে তা’ হলো পশ্চিম এশিয়া তথা খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ ইরান-ইরাক-আরবে পশ্চিমা বৃটিশ-মার্কিনী শক্তিসমূহের লুব্ধ আগ্রাসী তৎপরতা কবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারে নি। মুখর হয়েছেন তিনি পশ্চিমের আগ্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে। (সম্পূর্ণ…)

গণশিক্ষায় কেসস্টাডি

‘হৈমন্তি’র অপুরুষ বনাম ‘সমাপ্তি’র পুরুষ

এস এম রেজাউল করিম | ৬ আগস্ট ২০১০ ১০:২৩ পূর্বাহ্ন

rabi_11-2.jpgএকাডেমি নাকি রবীন্দ্রনাথের ভালো লাগতো না, কিন্তু সেই রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের সকল একাডেমিতে খবরদারি করে যাইতেছেন এখন পর্যন্ত। রবীন্দ্রনাথের এই প্রতিশোধস্পৃহা আমার ভালো লাগে, একাডেমির জন্য এইটা মর্যাদাহানির কারণ হইতে পারতো; কিন্তু সেটা যাতে না হইতে পারে সেজন্যই সম্ভবতঃ একাডেমি তাঁরে অমানুষ (দেবতা) করে রেখেছে। ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণের ননী চুরি যেমন চুরি নয়, দেবতার ঐ অধিষ্ঠানও তেমন একাডেমির ইজ্জতে হামলা চালায় না। একাডেমি মারফতে জানা যায়, গুরুদেব ছোটগল্পের সংজ্ঞা দিয়েছেন যে, এই সাহিত্যিক পদার্থ শেষ হইয়াও শেষ হইবে না। গুরুদেব যতদিন মানব ছিলেন ততদিন কিছু মানবিক ভুল করেছেন, ‘সমাপ্তি’ গল্প এইরকম একটা ভুলের উদাহরণ। একটি মৃম্ময়খণ্ডের ‘নারী’ হবার গল্প এটি, ঠিক ‘নারী’ হবার নয়, বরং মৃম্ময়খণ্ড দিয়া ‘নারী’ গড়ার গল্প, ভাস্কর হইলেন একজন নর। পুরুষ হওয়া আবার নরের ক্যারিয়ার সাফল্য, একজন নর-অপূর্ব এই নারী গড়েন, ঠিকঠাক গড়বার মধ্য দিয়া তাঁর ক্যারিয়ার সাফল্য অর্জন করেন–মানে ‘পুরুষ’ হন। গল্পটি ‘নারী’ গড়ার মাধ্যমে একজন নরের পুরুষ হওয়ার আদ্যন্ত বৃত্তান্ত, ফলে ‘শেষ হইয়া ঠিক শেষ-ই হইয়া যায়’ গল্পটি। এই মানবিক ভুলের কারণে গল্পটি গুরুদেবের নিক্তিতে ‘গল্প’ হইলো না ঠিক, তবে পুরুষতান্ত্রিক নন্দনতত্ত্বের কারণে গণশিক্ষার বড়ো উপাদান/টেকস্ট/কেসস্টাডি হইয়া পড়লো।

নারী হওয়ার সকল শরীরী যোগ্যতা ছিলো মৃম্ময়খণ্ডটির কিন্তু সংস্কৃতি’র অভাব ছিলো প্রকট। তাঁর প্রধান প্রধান অযোগ্যতা এইগুলো: সে দ্যাখে-“…হরিণশিশুর মতো নির্ভীক কৌতূহলে দাঁড়াইয়া চাহিয়া চাহিয়া দেখিতে থাকে,অবশেষে আপন দলের বালকসঙ্গীদের নিকট ফিরিয়া গিয়া এই নবাগত প্রাণীর আচারব্যবহার সম্বন্ধে বিস্তর বাহুল্য বর্ণনা করে।” ; শুধু দ্যাখে তাই না, অপূর্ব যখন আছাড় খেয়ে পড়ে মৃম্ময়খণ্ডটি তখন “সুমিষ্ট উচ্চকণ্ঠে তরল হাস্যলহরী”-র মাধ্যমে জানান দেয় তাঁর দেখা; “গ্রামের যত ছেলেদের সহিতই ইহার খেলা; সমবয়সী মেয়েদের প্রতি অবজ্ঞার সীমা নাই। শিশুরাজ্যে এই মেয়েটি একটি ছোটোখাটো বর্গির উপদ্রব বলিলেই হয়।”, “ঠিক যেন বালকের মতো মুখের ভাব। মস্ত মস্ত দুটি কালো চক্ষুতে না আছে লজ্জা, না আছে ভয়, না আছে হাবভাবলীলার লেশমাত্র।”। (সম্পূর্ণ…)

হাক্‌শোবাজারে একশ’ তাইজ্জব!

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ১ আগস্ট ২০১০ ৬:০৭ অপরাহ্ন

deu-er-taray-sajjad.jpg
ঢেউয়ের তাড়ায় সাজ্জাদ

বাংলাদ্যাশত্ বাস করি য্যাতেনে হাক্‌শোবাজারে ন আইছে, দইজ্জাত্ ন নাম্‌ছে—হ্যাতেনেরে এই দ্যাশেথ্থন বার গরি দঅন ফড়িবো।

মন্তব্য শুনে আমি যুগপৎ চমকিত ও ঔৎসুক্যে উদগ্রীব। রুবি আর আমি একটি চমৎকার ইলেক্ট্রিক রিকশায় কেবল চেপেছি। চালককে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, সে আমাদের গন্তব্য হোটেলটি খুব ভালভাবে চেনে। বিদুৎচালিত ঝক্ঝকে রিকশায় চাপতে পেরেই আমার প্রথম চমক ও তুষ্টিলাভ ঘটেছে এইমাত্র। সেই আমেজ এই মেঘলা সকালে পুরোপুরি উপভোগের আগেই রিকশাচালকের ওই স্বতঃস্ফূর্ত ফতোয়া! আমরা মোটেই ওকে কোনরকমে প্রণোদিত করিনি।

jhau-gachh.jpgঅতএব হোটেল-মোটেল জোনের নতুন নতুন নির্মাণ আর পর্যটকের আনাগোনা লক্ষ্য করার মাঝেই আমি রিকশাচালককে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী? নাম বাহাদুর। ১৩-১৪ বছর আগে এখানেই জন্ম। বাবা নিখোঁজ, মা আর তিন ভাইবোনের সংসারেরও সেই চালক। আরো জানাল, ওরা ভাইবোনেরা বাংলাদেশি। বাবা-মা বার্মা থেকে এসেছিল। মনে-মনে চম্কে গিয়ে রুবির সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করি। একটুখানি সতর্কও হয়েছি ভেতরে ভেতরে। বাহাদুর ছেলে আমার তাৎক্ষণিক সব ঔৎসুক্য মিটিয়ে দিয়েছে। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com