sofa_janmabarshiki2.png
সর্বজনীন ছফাভাই: খণ্ডচিত্র কতিপয়

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ৩০ জুন ২০১০ ৭:১৭ অপরাহ্ন
সৎসাহসকে অনেকে জ্যাঠামী এবং হঠকারিতা বলে মনে করে থাকেন, কিন্তু আমি মনে করি সৎসাহস হলো অনেক দূরবর্তী সম্ভাবনা যথাযথভাবে দেখতে পারার ক্ষমতা…
আহমদ ছফা

sofa_bangla-academy2.jpg……
বাংলা একাডেমীতে বক্তৃতা করছেন আহমদ ছফা

সর্বকালেই কিছু মানুষ জন্মেছেন, যারা মাটো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতো কেবল উদর আর উপস্থের প্রয়োজন মেটাতে জান লড়িয়ে দেননি; কিছু একটা করার ব্রত নিয়ে, কোনো অসাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়াই তাদের জীবনধারণ ও যাপনের মন্ত্র হয়ে প্রজন্ম পরম্পরায় মানুষকে উজ্জীবিত করে চলেছে। আমি বলছি না, আহমদ ছফা ক্ষণজন্মা মনীষী ছিলেন একজনা। তবে আহমদ ছফার আয়ুষ্কাল দীর্ঘতর হলে হয়তো তার আরো কিছু সত্যদর্শন, নবতর কর্মপ্রয়াস ও অর্জনের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটত।

ছেষট্টি সালে সতেরো বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়ে মাস কয়েক সায়েন্স আর আর্টস ফ্যাকাল্টির মাঝে তাঁতের মাকুর মতো আসা-যাওয়া, আড্ডার পর কলা অনুষদের ইংরেজি বিভাগে ঠাঁই পেয়ে থিতু হয়েছি কেবল। ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির সদস্যপদের প্রমাণস্বরূপ একটি কার্ডও আমার ঝোলার সম্পদবৃদ্ধি করেছে। সকালে বাড়ি থেকে সাইকেল চেপে নীলক্ষেত আসি, ফিরি পাঠাগার এলাকায় বাতি নেভার পর। ক্লাস, সংক্ষিপ্ত কিস্তিতে আড্ডা, বিকেলে জিমে ব্যায়াম বাদ দিলে বাকি সময় কাটে দু’টি পাশাপাশি অবস্থিত পাঠাগারে—ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি আর পাবলিক লাইব্রেরি। সেই পাবলিক লাইব্রেরি অনেকদিন হল, স্থানান্তরিত হয়ে শাহবাগ মোড়ের কাছে জায়গা পেয়েছে পাকাপাকি।
sofa_sultan.jpg
শিল্পী সুলতান ও কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে

বয়স বাড়লে মানুষের কাজকর্মে নানা পরিবর্তন ঘটে। আমার বয়স যত বাড়ছে, ততই ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ গাওয়া যাকে বলে—ওই প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে চলে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবারে চেষ্টা করি একটু ফোকাস্‌ড হতে—আহমদ ছফার সঙ্গে আমার প্রথম কথাবার্তা, জানাচেনা ওই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পাঠাগারে। কাঙালকে নাকি শাকের ক্ষেতের সুলুক-সন্ধান জানানো ঠিক নয়—কথায় বলে। কেন সেটা উচিত কর্ম হবে না—সে বিষয়ে অবশ্য আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে—লোকজ ব্যাখ্যা যাই হোক। সেকথা এখন তোলা থাক। তো, ওই পাঠাগারের পুস্তক তালিকা নেড়েঘেঁটে আমার অবস্থা তখন অফুরন্ত শাকের ক্ষেতের সন্ধান পেলে কাঙালের যেমন মনে হতে পারে, তেমনই। কোনটা রেখে কী পড়ি—বেসামাল অবস্থা। (সম্পূর্ণ…)

sofa_janmabarshiki2.png
আমাদের ছফা ভাই ও ‘সম্প্রীতি সুর’

ফরিদা আখতার | ৩০ জুন ২০১০ ৭:০৫ অপরাহ্ন

ছফা ভাই আমাদের ছেড়ে গেছেন বেশ কয়েক বছর হয়ে গেলো। তাঁর না থাকাটা আমাদের জন্য কত ক্ষতি সে কথা বারে বারে মনে হয়। মনে হয় ছফা ভাই থাকলে দেশের এই ধরনের পরিস্থিতিতে কী বলতেন। এখন তিনি নেই। এটাই সত্য। বাংলা মোটর দিয়ে যাবার সময় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সাইনবোর্ড দেখে মনে হয় ছফা ভাইকে একটু দেখে যাই।
sofa_mazhar2.jpg
পহেলা বৈশাখে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিল্পী সুলতান পাঠশালার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছফা ও ফরহাদ মজহার। ছবি. নুরুল আনোয়ার, ১৯৯৮

ছফা ভাইয়ের সাথে আমার কোনো কাজের সম্পর্ক ছিল না। আমি কোনো লেখক বা কবি নই। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহ থাকলেও উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান নেই। তাঁর বাসায় যাওয়া হতো কবি ফরহাদ মজহারের সাথেই। তাঁরা দুজনেই লেখক, কবি-সাহিত্যিক—সবই। আমি খুব উপভোগ করতাম তাঁদের আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক। ছফা ভাইয়ের বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই কোনো রকমে একটু কুশল বিনিময় করেই শুরু হয়ে যেতো কথা। কথা তো নয়, হাসতে হাসতে কিংবা একটু রাগ-রাগ ভাব নিয়ে (নির্ভর করতো কী বিষয় সেদিন প্রাধান্য পাচ্ছে) শুরু হয়ে যেতো কথা বলা। কখনো মনে হতো এক্ষুনি বুঝি ঝগড়া লেগে যাবে। না তা হতো না। অনেক সময় রাজনৈতিক আলোচনা তুঙ্গে উঠলে ছফা ভাইয়ের ভাষা পালটে যেতো। তখন আমার দিকে তাকিয়ে একটু সংযত হয়ে বলতেন, “ফরিদা ছিল বলে… নইলে…।” তারপর হাসি। ঢাকা শহরে এখন এভাবে যাবার কোনো জায়গা আর নাই, যেখানে গিয়ে আনন্দ এবং একই সাথে সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনার করার সুযোগ পাবো। আমি নীরবে কতগুলো বিষয় শিখেছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম কীভাবে আসে, রাজনৈতিক দলের কথাবার্তা কীভাবে মূল্যায়ন করতে হয়, দেশের সার্বিক অবস্থার পর্যালোচনা ইত্যাদি। আবার ছোটখাট কাজও কত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তা ছফা ভাই যখন উবিনীগের কাজ নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন তখন একদিকে আমরা সংকোচ বোধ করতাম, অন্যদিকে আসলেই উৎসাহ পেতাম। (সম্পূর্ণ…)

sofa_janmabarshiki2.png
আমার ছফা আবিষ্কার

আহমাদ মাযহার | ৩০ জুন ২০১০ ৬:২২ অপরাহ্ন

sofa_mazhar.jpg[আজ ৩০ জুন লেখক আহমদ ছফার ৬৭ তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৪৩ সালের এই দিনে তিনি চট্টগ্রাম জেলার গাছবাড়িয়ায় জন্মলাভ করেছিলেন। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি সাহিত্যের নানা শাখায় ছফা লেখালেখি করেছেন। বুদ্ধিজীবী হিসেবে দেশ ও সমাজের নানা সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেন তিনি। তাঁর স্পষ্ট অভিমত ও ছফাসুলভ ভঙ্গির কারণে লেখকজীবনের শুরুর দিকেই কিংবদন্তী হয়ে উঠেছিলেন। ২০০১ সালে অকালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তাঁর জন্মদিনে আর্টস-এর পাতায় কিছু লেখা প্রকাশিত হলো। – বি. স.]


আহমদ ছফার নামের সঙ্গে আমার পরিচয় কৈশোরেই। মনে হয় সত্তরের দশকের প্রথম দিকে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই চিত্তরঞ্জন সাহা কলকাতায় শুরু করেছিলেন ‘মুক্তধারা’র প্রকাশনা কার্যক্রম। সেই একাত্তরেই আহমদ ছফার জাগ্রত বাংলাদেশ প্রকাশ করেছিল ‘মুক্তধারা’। স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন উদ্দীপনায় চিত্তরঞ্জন সাহা ‘মুক্তধারা’ নামে সৃষ্টিশীল-মননশীল বইয়ের প্রকাশনা ব্যবসা শুরু করেছিলেন আরও জোরেশোরে। ‘মুক্তধারা’ প্রকাশিত বইয়ের খবর যেন আগ্রহীরা জানতে পারে সেজন্যে নিউজপ্রিন্টে ছাপিয়ে প্রচুর ক্যাটালগ বিলি করা হতো। বিভিন্ন সময় ‘মুক্তধারা’র সেই ক্যাটালগ আমার হাতে এসেছিল। স্পষ্ট মনে পড়ে তালিকায় জাগ্রত বাংলাদেশ নামটা দেখেছিলাম। সম্ভবত সত্তরের দশকেই, সাপ্তাহিক বিচিত্রায় বা অন্য কোথায় যেন দেখেছিলাম তাঁর আর একটা বইয়ের নাম, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৭৩)। নামটার মধ্যে একটা গভীর কিছুর ব্যঞ্জনা তখনই অনুভব করেছিলাম। তবে ঐ বয়সে এও বুঝেছিলাম সেই বই পড়ে আমার পক্ষে কিছু বোঝা সম্ভব হবে না। পরে যখন পড়লাম তখন অনুভব করলাম কী অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বই এটি।

sofa_razzak.jpg……
গুরু আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে
…….
আশির দশকের প্রথম দিকে, সম্ভবত ১৯৮০ সালেই ইত্তেফাক-এ বা কোনও একটা দৈনিক পত্রিকায় দেখেছিলাম আহমদ ছফা সংক্রান্ত একটি সংবাদ। সংবাদটির শিরোনাম ছিল ‘আহমদ ছফা পুরস্কৃত’। বিস্তারিত পড়ে জেনেছিলাম ইতিহাস সমিতি তাঁর সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস (১৯৮০) বইয়ের জন্য পুরস্কার দিয়েছে। তাঁর জাগ্রত বাংলাদেশ বইয়ের নাম তো ‘মুক্তধারা’র লিফলেট-এর সূত্রে আগেই জানতাম; এই খবর পড়ে বুঝলাম তিনি খুব পণ্ডিত লোক। কিন্তু তাঁকে সামনাসামনি দেখি আরও কিছুদিন পরে, বাংলা একাডেমীতে। সামনাসামনি দেখে, তাঁর কথা শুনে, বিশেষ করে কথা বলার ভঙ্গি দেখে, উচ্চারণ শুনে মনে তেমন একটা সমীহ জাগল না। কথাবার্তা শুনে মনে হল বেশ ঝামেলা সৃষ্টিকারী মানুষ। কী বলেছিলেন তা আজ আর মনে নেই। তবে তিনি যা বলেছিলেন তাকে পুরো উড়িয়েও দিতে পারছিলাম না তা মনে আছে। সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়া আগ বাড়িয়ে মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে আমার সংকোচ হয়। মনে হয় সংকোচবশতই তাঁকে সামনাসামনি কয়েকবার দেখলেও নিজে যেচে পরিচিত হই নি। (সম্পূর্ণ…)

নর্ডিক বসন্তে

রাশিদা সুলতানা | ৩০ জুন ২০১০ ৫:০৫ অপরাহ্ন

rashida_sweden1.jpg
জাহাজ থেকে দেখা স্টকহোম

২০০৮ সাল-এর এপ্রিলের ১৮ তারিখে দারফুরের আল ফাশিরের বাসা থেকে যখন বের হই সেদিন ছিল প্রবল ধূলিঝড়। ঝড়ে বিশ গজ দূরের কোনোকিছু দেখা যায় না। অফিস থেকে গাড়িতে বাসায় নেমে বাসা থেকে আমার স্যুটকেস বের করার সময়টুকুতে ধুলায় মাখামাখি আমি। সুইডেন যাচ্ছিলাম একটা কোর্সে অংশ নিতে। দারফুরের আল ফাশির থেকে খার্তুম। খার্তুম থেকে স্টকহোম। আল ফাশির এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখি আমারই মতো সবাই ধূলিময়। বিদেশীরা বলে এল ফাসের।



আল ফাশির এয়ারপোর্টকে আমার পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম বিমানবন্দরগুলির একটা মনে হয়। চেহারা বাংলাদেশের মফস্বলের ট্রেনের ওয়েটিং রুমের মতো বা তার চেয়েও করুণ। ছালবাকল-ওঠা দেয়াল। মাথার উপর ঘটাং ঘটাং ফ্যান। এয়ারপোর্টে নামতেই বহু পরিচিত সহকর্মীর মুখ দেখা গেল। অনেকে ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছে। আমার পাশে বসেছে মিশরীয় কন্টিনজেন্ট কমান্ডার আসের। সেও যাচ্ছে ছুটিতে। তার কাছে বেশ কিছু ডলার নিয়ে আসে মিশরীয় তরুণ এক অফিসার। আসের পরিচয় করিয়ে দেয়, আমার নতুন হাউসমেট, ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ। মোহাম্মদ হাতের ডলারগুলো আসেরকে দিতে দিতে আমাকে বলে, “হোম সার্ভিস ডেলিভারি দেই।” আমি হেসে বলি, “মিশরীয় যাদের সাথেই পরিচয় হয় তাদের অধিকাংশেরই নাম হয় আহমেদ বা মোহাম্মদ।”

মোহাম্মদ হেসে জবাব দেয়, “মিশরে শতকরা সত্তর ভাগ লোকের নাম মোহাম্মদ আর ত্রিশ ভাগ লোকের নাম আহমেদ। তবে আমি হচ্ছি মোহাম্মদ দি বেস্ট ইন ঈজিপ্ট। অবশ্য ঠিক তা-ও না। আমার দাদা ছিলেন মোহাম্মদ দি বেস্ট ইন ঈজিপ্ট।” (সম্পূর্ণ…)

গোলাপের নাম

উম্‌বের্তো একো

জি এইচ হাবীব | ৩০ জুন ২০১০ ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন

eco-and-library.jpg
উম্‌বের্তো একো

অনুবাদ: জি এইচ হাবীব

লিংক: কিস্তি ১

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৪
———————————————————————————

(কিস্তি ৩-এর পরে)

‘সত্যি, কুকুরই বটে, উইলিয়াম। পাগলা কুকুর। তুমি জানো, বোনাগ্রেতিয়ার সঙ্গেও বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলাম আমি?’

‘কিন্তু বোনাগ্রেতিয়া তো আমাদের পক্ষে!’

‘এখন তা-ই; তার সঙ্গে আমার দীর্ঘক্ষণ কথা হওয়ার পর। তারপরে সে কনভিন্সড্ হয় এবং Ad conditorem canonum[৬৭]-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। পোপ তখন তাকে এক বছরের জন্যে কয়েদ ক’রে রাখে।’

‘আমি শুনেছি, এখন তিনি কিউরিয়াতে আমার এক বন্ধু ওকামের উইলিয়াম-এর খুব ঘনিষ্ঠ।’

‘খুব সামান্যই চিনি আমি তাঁকে। পছন্দ করি না লোকটাকে। আকুলতাহীন এক মানুষ। মস্তিষ্কসর্বস্ব এক লোক, হৃদয়ের বালাই নেই।’

‘তবে মাথাটা কিন্তু চমৎকার।’

‘হবে হয়ত, কিন্তু সেটাই তাকে নরকে নিয়ে যাবে।’

‘তাহলে ফের তাঁর সঙ্গে দেখা হবে আমার, আর তখন আমরা লজিক নিয়ে তর্ক জুড়ে দেবো।’

‘থামো, উইলিয়াম,’ গভীর স্নেহমাখা একটা হাসি হেসে উবার্তিনো বললেন। ‘তুমি তোমার দার্শনিকদের চাইতে ভালো। কেবল যদি জিনিসটা চাইতে তুমি…’

‘কী চাইতাম?’

‘শেষ যেবার দেখা হয়েছিল তোমার সঙ্গে আমার, আম্ব্রিয়ায়—মনে আছে তোমার?—আমি তখন সবেমাত্র অসুখ থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছি সেই দুর্দান্ত নারীর বদান্যতায়—মন্টিফাল্কো-র ক্লেয়ার[৬৮]…’ বিড়বিড় করে বললেন তিনি, উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখটা। ‘ক্লেয়ার… স্বভাবতই পথভ্রষ্ট নারী-প্রকৃতি যখন পবিত্রতার মাধ্যমে সুমহান হয়ে ওঠে, তখন তা মহত্তম গুণাবলীর বাহন হতে পারে। (সম্পূর্ণ…)

তাদেউজ রজেভিচ-এর কয়েকটি কবিতা

মাসুদুজ্জামান | ২৯ জুন ২০১০ ৮:২৯ অপরাহ্ন

বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের সবচেয়ে প্রভাবশালী পোলিশ কবি তাদেউজ রজেভিচ (জন্ম ১৯২১)। প্রতীক, উপমা, শব্দব্যবহারের অভূতপূর্ব কলাপ্রকৌশলে পোলান্ডের কবিতার তথাকথিত লিরিকময়তাকে একেবারে বদলে দিয়েছেন তিনি। খুবই শক্তিশালী, অন্তর্ভেদী তার দৃষ্টি আর উপস্থাপনা। তিনি বলেছেন, “কবিতার তথাকথিত ছন্দোস্পন্দের বিষয়টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের বন্দিশিবির সৃষ্টির মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে গেছে।” যুদ্ধের বীভৎসতা, নির্যাতন আর যুদ্ধপরবর্তী সময়ের সংকট ও অপ্রাপ্তিকে তিনি তার কবিতার বিষয় করে তুলেছেন। রজেভিচকে মনে করা হয় যুদ্ধোত্তর পোলিশ কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। তবে শুধু কবি নন, তিনি পোলিশ ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার, সমালোচক ও ছোটগল্পের রচয়িতা।

tadeusz-r2.jpg
তাদেউজ রজেভিচ (Tadeusz Rozewicz; জন্ম. রাদোমস্কো, পোল্যান্ড ৯/১০/১৯২১)

পশ্চিমের অনেক সমালোচক প্রশ্ন তুলেছিলেন, ফ্যাসিবাদী রূঢ় বাস্তবতা আর নির্মমতার পর কী ভালো কবিতা রচনা করা সম্ভব? বিশেষ করে রাজনীতি যেখানে প্রধান ও প্রখর হয়ে ওঠে? রজেভিচ পোলিশ কবিতার ইতিহাসে ‘চতুর্থ সাহিত্য ঘরানা’র সৃষ্টি করে দেখিয়ে দিয়েছেন, রাজনীতি ও নির্মমতার ভেতর থেকেও নিয়ন্ত্রিত শৈলী, পরিমিত শব্দ ব্যবহার, অন্তর্গত অনুভবকে অবলম্বন করে ভালো কবিতা লেখা সম্ভব। কাব্যজীবনের প্রাথমিক পর্বে এই ধরনের কবিতা রচনার মধ্য দিয়েই পোলিশ সাহিত্যভুবনে তার আবির্ভাব ঘটে উদ্বেগ (১৯৪৭) ও লাল দস্তানা (১৯৪৮) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

জীবনের প্রথম দিকে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন রজেভিচ। গেস্টাপো বাহিনী তার বড়ো ভাইকে খুন করে, এই ভাইয়ের স্মৃতি তিনি কখনও ভুলতে পারেননি; নিজেও মৃত্যুর প্রান্ত থেকে ফিরে এসেছিলেন। কবিতায়, গল্পে, এমনকি নানা ধরনের গদ্যে সেই নির্মমতার কথা ঘুরে-ফিরে এসেছে। ফলে সমকালসম্পৃক্ত, আপাত অগভীর কবিতা রচনা করাই ছিল তার জন্যে স্বাভাবিক, কিন্তু তিনি প্রচলিত পথে না হেঁটে রচনা করতে থাকেন অন্তর্গত সংবেদনশীল কবিতা। তারই মাধ্যমে অস্তিত্বের জন্যেই বেঁচে থাকা—পোলিশ কবিতার ধারায় সংযুক্ত হলো এই নতুন সংবেদ। শূন্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম হয়ে উঠলো তার কবিতার মর্মবস্তু। পরবর্তী সময়পর্বে রচিত রাজপুত্রের সঙ্গে কথপোকথন (১৯৬০), অনামা কণ্ঠস্বর (১৯৬১), একটি মুখ (১৯৬৪) তৃতীয় মুখ (১৯৬৮) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে এই বিষয়টিই প্রধান হয়ে উঠেছে।

রজেভিচের সময়ে আভাঁগার্দধর্মী কবিতার ধারাটি পোলান্ডে বেশ শক্তিশালী ছিল। এই ধরনের কবিতায় সরাসরি উপমা, বাক্প্রতিমা, শব্দের ব্যবহার ঘটতো। রজেভিচ সেই পথে না হেঁটে রচনা করেছেন মানব অস্তিত্বের স্মারক হয়ে উঠতে পারে এমন সব কবিতা, যা তার কথায় হয়ে উঠেছে জন্মের কার্যকারণ আর মৃত্যুর কার্যকারণে পরম্পরিত জীবনবেদ। কবিতায় এই জীবনের কথা সবটা বলা সম্ভব নয় ভেবে এই সময় তিনি গড়ে তোলেন ‘মুক্তমঞ্চ’, লিখে ফেলেন বেশ কিছু নাটক—কার্ডে লিপিবদ্ধ নির্ঘণ্ট (১৯৬৮), উপবিষ্ট অপেক্ষমান বৃদ্ধা (১৯৬৯), সেই চারজনকে নিয়ে (১৯৭২) ইত্যাদি।

সমালোচকদের মতে তার কানটি প্রখর, অর্থাৎ তার শ্রবণদক্ষতা ও তজ্জনিত প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ার মতো। সমকালের নন্দনরীতি সম্পর্কে তিনি যেমন ছিলেন সচেতন, তেমনি সৃষ্টিশীলতার কোন নতুন রাস্তায় তাকে হাঁটতে হবে, সেটাও তিনি বেশ ভালোই জানতেন। নারীবাদ ও উত্তর-আধুনিকতার দ্বারা স্পৃষ্ট হয়ে এভাবেই তিনি রচনা করেন কাব্যগ্রন্থ শ্বেতবিবাহ (১৯৭৫)।

রজেভিচ এখন আর আগের মতো সৃষ্টিশলিতায় সক্রিয় নেই, তবে তিনি লিখে চলেছেন তার কবিজীবননির্ভর আত্মজীবনী। কবিতা ও জীবন যে একাকার হয়ে থাকে, সেটাই হচ্ছে এই আত্মজীবনীর মূল বিষয়। রজেভিচ এমন এক কবি যিনি কবিতার সংজ্ঞাকে অগ্রাহ্য আর প্রবলভাবে প্রতিরোধ করেছেন। কবিতার যত ধরনের তথাকথিত ফাঁদ আছে, তার সবগুলো তিনি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। তাকে তাই বলা হয় নৈঃশব্দ্যের কবি, সংবেদনার কবি। অনেকে তাকে ‘প্রায়-মিস্টিক’ কবি বলেও আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ধ্রুপদী আভাঁগার্দ কবি হিসেবেও পরিচিত, উত্তর-আধুনিক কবির শিরোপাও জুটেছে তার।

যেভাবেই আখ্যায়িত করা হোক না কেন, রজেভিচের স্বর ও কাব্যশৈলী সরল কিন্তু স্নায়ুক্ষয়ী, সন্ত্রাস আর শূন্যতাকে তিনি ধরতে পারেন সহজেই। তিনি বলেছেন, আমার লক্ষ্য “পদ্য লেখা নয় ঘটনার বিবরণ দেয়া।” কিন্তু দেখা গেছে এই ঘটনার বিবরণই হয়ে উঠেছে এক-একটি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অভূতপূর্ব কবিতা। তার শেষের দিকের লেখায় মানবজীবনের দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ, হতাশা, আনন্দ, বেদনার ছবি বেশ স্পষ্ট। কবিতায় নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী আরেক পোলিশ কবি চেশোয়াভ মিউশ তাকে এসব কারণে চিহ্নিত করেছেন নৈরাজ্যের কবি বলে, “রজেভিচ হচ্ছেন নৈরাজ্যের কবি যিনি নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতাকে বিন্যস্ত করে কবিতা লিখতে ভালোবাসেন।”

এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৪। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়েছে। এখানে অনূদিত কবিতাগুলোর উৎস বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং জে. ডি. ম্যাকক্লাচির সম্পাদিত দ্য ভিনটেজ বুক অফ কনটেমপোর‌্যারি ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি (১৯৯৬)।

অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান

 

কবি কে

তিনিই কবি যিনি কবিতা লেখেন
আবার তিনিও কবি যিনি পদ্যটদ্য লেখেন না।

তিনিই আসলে কবি যিনি পায়ের বেড়ি খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেন
আবার তিনিও কবি যিনি এই শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে ভালোবাসেন

কবিকে আসলে বিশ্বাসী হতে হয়
তিনিও কবি যার কোনো কিছুতে বিশ্বাস নেই

কবি আসলে এমন মানুষ যাকে মিথ্যে কথা বলতে হয়
আবার তিনিও কবি যাকে বলা হয়েছে অনেক মিথ্যে কথা

তিনিই হলেন কবি যিনি টাল খেয়ে ভেঙে পড়েন
আবার তিনিও কবি যিনি উদ্ধত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ান

কবি তিনিই যাকে সবকিছু ছেড়েছুড়ে ফেলে দিতে হয়
আবার তিনিও কবি যিনি কোনো কিছুই ছেড়ে চলে যান না। (সম্পূর্ণ…)

জীবনের পাতায় পাতায় (১)

বেবী মওদুদ | ২৩ জুন ২০১০ ২:২৩ অপরাহ্ন

——————————–
স্মৃতিকথা ধারাবাহিক
——————————–

এক.
baby-maudud25.jpgসোমবার ২৩ জুন ১৯৪৮ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাসের থিয়েটার রোডে একটি তিন তলা
……..
বেবী মওদুদ
……..
বাড়ির ফ্ল্যাটে আমার জন্ম হয়। বাংলা ৯ আষাঢ় প্রায় বেলা একটা হবে। আমার মায়ের কাছে শুনেছি, সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, যাকে বলে মুষলধারে। তার শরীরটা সকাল থেকেই খারাপ লাগছিল বলে দাইকে খবর দেয়া হয়েছিল। আমার মায়ের যখন প্রসব ব্যথা ওঠে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এক তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন কবি সুফিয়া কামাল। তাঁকে খবর দেয়া হলে তিনি কাছে বসেন এবং দোয়া দরুদ পড়ে ফু দেন। তারপরই আমার জন্ম হয় এবং আমাকে প্রথম কোলে নিয়ে স্নেহচুম্বন করে আশীর্বাদ করেন। মা তাকে বলেছিলেন, বুবু দোয়া করবেন যেন আমার মেয়ে আপনার মত ভালো মানুষ হয়। আমার মা যখন কথাগুলো আমাকে বলছিলেন, তখন তার মুখখানা আনন্দে উজ্বল হতে দেখেছিলাম। বড় হয়ে যখন সুফিয়া কামালের স্নেহের পাত্রী হলাম, তখন তাঁকে মায়ের কথাগুলো বলেছি। তিনি হেসে বললেন, তোর মার দেখি সব মনে আছে।

am-pic.jpg……
বাবা আবদুল মওদুদ
…….
আমার বাবা তাঁর চেয়ে বয়সে তিন বছর বড় ছিলেন। বাবাকে তিনি ভাই ডাকতেন। বাবা তাকে বুবু বলে ডাকতেন। সেই সুবাদে আমি তাকে ফুপু ডাকতাম। তিনি আমার বাবার বড় বোনকে দেখেছেন, সেকথা আমাকে একদিন বলেছিলেন। কলকাতার এই বাড়িতে আরও অনেক কবি সাহিত্যিক, শিল্পী আসতেন। তাদের একটা ভালো আড্ডাস্থান ছিল। আমার বড় ভাইয়ের কাছে শুনেছি, শিল্পী জয়নুল আবেদীন ও শিল্পী কামরুল হাসান ট্রাম বা বাসের টিকেটের উল্টোপিঠে ছবি এঁকে দিতেন। কবি জসীমউদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন আহমেদ, কবি আহসান হাবীবও আসতেন এই বাড়িতে। পরবর্তীতে আমি বড় হয়ে তাদের মুখ থেকেও এসব কথা শুনেছি। সওগাত-সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন এবং তার কন্যা বেগম-সম্পাদিকা নূরজাহান বেগমের যাতায়াত ছিল এ বাড়িতে।

আমার বাবার পূর্বপুরুষরা বর্ধমানে বসবাস করতেন। খঙকোষ থানার ওয়ারী গ্রামে আমার দাদার বাড়ি। এখনও সেই গ্রামে আমাদের আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। আমার দাদা মাহফুজুল হক গ্রামের মসজিদের ইমাম ছিলেন। প্রচুর কৃষিজমি ছিল। একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার হিসেবে তারা জীবনযাপন করতেন। তিনি আরবী, ফার্সী ও বাংলা জানতেন। আমার বাবাও তাঁর কাছে ভালো আরবী ও ফার্সী শেখেন। আমার বাবা ছোটবেলায় পিতৃমাতৃহীন হলেও লেখাপড়ায় আগ্রহী ও মেধাবী ছিলেন। সংস্কৃতি শেখেন স্কুলে এবং ইংরেজীও লেখাপড়ার মাধ্যম হওয়ায় বেশ ভালো জানতেন। সাহিত্যের বই পড়ার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। ছাত্রজীবনে লেখার চর্চাও শুরু করেন। (সম্পূর্ণ…)

লেখক সংবাদ

প্রমা সঞ্চিতা অত্রি | ২২ জুন ২০১০ ১:১৩ অপরাহ্ন



জাফর আলমমামুন হুসাইনআফরোজা সোমা

জাফর আলম

jafar-alam.jpg……
ছবি. নাসিরুল ইসলাম
…….
মীর্জা গালিবের আত্মকথা দস্তানভু বাংলায় অনুবাদ করছেন জাফর আলম। বললেন, সিপাহি বিদ্রোহের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী ছিলেন মীর্জা গালিব। তিনি তাঁর আত্মজীবনী দস্তানভু লিখে গেছেন ফারসিতে। এক সময় দিল্লীর ‘উর্দু ব্যুরো’ এই সাহিত্যকর্মটি উর্দুতে অনুবাদের ভার নিয়েছিল। সেখান থেকে তিনি বইটি সংগ্রহ করেছেন। জাফর আলম বললেন, তাঁর জানামতে এখনও কেউ বইটি অনুবাদ করেন নি বা করার উদ্যোগ নেন নি।

সিপাহি বিদ্রোহের সময়কার অভিজ্ঞতা ছাড়াও বইটিতে উঠে এসেছে মীর্জা গালিবের ব্যক্তিজীবনের অনেক অব্যক্ত কথা। ১৮৫৭-’৫৮ সাল পর্যন্ত সিপাহী বিদ্রোহ চলাকালে রাজধানী দিল্লীতে যে আন্দোলন হয় সে সময় ইংরেজ বাহিনীর হাতে বন্দি হন মীর্জা গালিব। গালিবের আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে সেই সময়ের কথা। ইংরেজরা বন্দিদের নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করত। তাঁর চোখের সামনে ধরে নিয়ে মেরে ফেলেছে অসংখ্য মানুষ। ইংরেজরা যখন বিজয়ী হয় তখন তারা নির্বিচারে হত্যা করে স্থানীয় লোকজনদের। লুটপাট করে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ। সে সময় তারা দিল্লিতে প্রায় ৫ লক্ষ লোককে মেরে ফেলেছিল। দিল্লীর লোকজন সব বাড়িঘর ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল। দিল্লী শহর বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছিল। মীর্জা গালিব নিজেও বন্দি হন ইংরেজদের হাতে। তাঁকে বন্দিশালায় অকথ্য অত্যাচার করা হয়। দিনের পর দিন তাঁকে খেতে দেয়া হয়নি। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কীভাবে তিনি খাবার চুরি করেছিলেন, মদ চুরি করেছিলেন সে সব কাহিনীই উঠে এসেছে বইটিতে।

‘দস্তানভু’ শব্দের মানে পুষ্পস্তবক, জানালেন জাফর আলম। সেই সময় বিদ্রোহে হতাহত ও নিহত ভারতবাসীর লাশের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনপূর্বক বইটির নাম ‘দস্তানভু’। সিপাহী বিদ্রোহীদের স্মরণে ও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গালিব এই নামটি রাখেন। (সম্পূর্ণ…)

কবিতাগুচ্ছ

এস এম রেজাউল করিম | ২১ জুন ২০১০ ৭:৩৫ অপরাহ্ন

বোধের তলায় (ভারী বলে?) জমা দেহ নামীয় পঙ্ক খেদাইলো আলো

এ এক মিঠা, অর্বাচীন, বঙ্গীয়, অবৈষ্ণব, নীতি সম্মন্ধীয়
বাণিজ্য বায়ুঘটিত, ব্রাহ্ম আলোয় ভুবন ভরা,
সম্মুখে তুমিও ঘুরিতেছো প্রয়োজনাতিরিক্ত।
আমার আশ মিটে যাইতেছে,
তোমারে দেখতে দেখতে, তোমারে দেখার।
উপরন্তু, এতো পরিষ্কার দেখতেছি!
তোমারে ধরার আশটাও মিটে যাইতেছে নাকি!
আমার কেনো তোমারে ছুঁইতে ইচ্ছা করে না!
দেখিবারে এতো পরিতৃপ্তি, তোমার উরুগণে
সন্ধি করতে নারাজ থাকলেও আমার কেনো
কিছুই যায় আসে না?
কবিতার নামে আছে তার জবাব?

মার্চের শেষ সপ্তাহ
 

চরিতার্থতা

সমুদ্র বড়ো মনোহর বস্তু, বটগাছও কি কম মনোহর!
একটা শিকড়ে তার হয় না, কিছুদূর যাইয়া শিকড় নামাইয়া দেয়,
নতুন শিকড়ের প্রেরণা তার ডগায় ডগায়;
বটগাছের এই তথাগততা আমার ভালো লাগে।
সমুদ্রের তীরে গেলেও আমার ভালো লাগে,
সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়াইয়া দূরে তাকাই, তারপর কাছে আনতে থাকি দৃষ্টি,
কাছে আসতে আসতে পায়ের কাছে এসে পড়ে,
আর আমি টের পেয়ে যাই সমুদ্রের সীমানা।
এইভাবে সমুদ্র আর বটগাছ আমার চেনাজানা।
ভালোলাগা জিনিসগুলা কাছে চাই,
বারান্দায় টবে একটা বটগাছ লাগাইছি,
এই বটগাছটা বিশেষ, দেখভাল করতে হবে নিয়মিত; (সম্পূর্ণ…)

এল ডোর‌্যাডো সেরাফিনো!

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ২০ জুন ২০১০ ৫:২০ অপরাহ্ন

jajahghata.jpg
জাহাজঘাটা

অদিতির ঘুম ভাঙল সকালে। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়ল। জানলার কাচের ভেতর দিয়ে বাইরেটা দেখেই শরীর আর মনের শ্রান্তি এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। ঘন বৃক্ষশোভিত চারপাশ। উঁচু উঁচু গাছ। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। অরণ্যপ্রায় বৃক্ষরাজি গাঢ় সবুজ। কিচেনে ঢুকে দুধ গরম করল। টোস্ট, ডিমের ওমলেট আর পোচ, মাখন, মার্মালেড ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে ঋদ্ধর ঘরের দরজায় নক্ করল।

দরজা খুলে মাকে খাবারের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঋদ্ধ হাসল। ইউ আর ইমপসিব্ল, মা। বেড়াতে এসেও সাতসকালে আমার খাবার নিয়ে তোমার ব্যস্ততার শেষ নেই! টেইক আ ব্রেইক, মা। উই আর ভেকেইশ্যনিং! হয়েছে, হয়েছে, আমাকে আর ব্রেইক দিতে হবে না। আয়, আগে খেয়েনি’। তারপর বেরোব। তেমন-তেমন হলে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই—বলে অদিতি ছেলের হাতে দুধের গ্লাস ধরিয়ে দিল। পোচের হলুদ কুসুমে টোস্টের মুচমুচে কোণ ডুবিয়ে তুলে নিজেও কামড় বসাল।

gachchhata.jpg…….
মিলেনিয়ামজীবী রেড সিডার
……..
ক্যালগারি থেকে এই ভ্যাঙ্কুভার ওরা মা-ছেলেতে পালা করে গাড়ি চালিয়ে এসেছে। চাট্টিখানি পথ নয়। পোঁটলাপুঁটলি গুছিয়ে নিয়ে দু’দিনে ১২০০ কিলোমিটার পেরিয়ে এসে ফেরিতে ওঠা। ফেরিবোটের ব্যবস্থা অবশ্য খুবই ভাল ছিল। ভ্যাঙ্কুভার থেকে একেবারে ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় চলে স্ট্রেইট অব জর্জিয়া পার হয়ে এই সেরাফিনো পর্যন্ত আসে। আবার ফেরত যায়। ছয়তলা উঁচু একটা পুরোপুরি জাহাজের মতন ফেরি। একেবারে নিচের তলায় প্রায় শ’চারেক গাড়ি রাখার জায়গা। সবার ওপরে খোলা ডেক। ঋদ্ধ গাড়ি পার্ক করতে করতেই অদিতি বালিকার মত লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি টপকে ওপরে উঠে গিয়েছিল। পরপর তিনটে তলায় যাত্রীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসছে, কেউবা টিভি দেখছে, গিফট কর্ণারে ভিড় করছে কেউ। ওয়্যারলেস ইন্টারনেট কানেকশ্যন চাও? তাও রয়েছে। আরো রয়েছে বনেদি কফিশপ স্টারবাক আর রেস্তোরাঁ।

একটানা দু’দিন হাইওয়ের ড্রাইভিংয়ের পর ওই অগাধ কালচে-নীল জলের সমারোহ মাকে যেমন আরাম দিচ্ছিল, ছেলেকে তেমন নয়। ঋদ্ধ বারবার বলছিল, কখন যে এই সমুদ্রযাত্রা শেষ হবে, মা! অদিতি পুরো পথটুকু আরামসে খোলা ডেকে বসে কাটিয়ে দিল। ভরদুপুরেই আকাশে কালোমেঘের ঘনঘটা। দেড়ঘণ্টায় জর্জিয়া প্রণালী পার হয়ে উনায়িমোতে নামা হল। ছোট্ট শহর উনায়িমো থেকে ফের স্থলপথে যাত্রা শুরু। ওটাই ছিল ওদের জার্নির শেষ পর্যায়। দ্বীপের মাঝ বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে টানা দুর্গম পর্বতমালা। সেরাফিনো পৌঁছনোর পথ ওই পাহাড়ের ধার কেটে কেটে তৈরি করা। মোট আড়াইশ’ কিলোমিটার পথের এক-তৃতীয়াংশে ৬৫টি ভয়ঙ্কর জটিলা-কুটিলা বাঁক। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাবার শর্টকাট বিকল্প রাস্তার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে মনে পড়ে অদিতির—বিবাহোত্তর দিনগুলির স্বল্পস্থায়ী আনন্দ, স্বচ্ছতা ও লাগামছাড়া সুখের স্মৃতি। (সম্পূর্ণ…)

কিস্তি ৮

ছফামৃত

নূরুল আনোয়ার | ১৩ জুন ২০১০ ২:২৪ অপরাহ্ন

শুরুর কিস্তি
sofa_chhade.jpg
ঢাকার বাংলামোটরের চিলেকোঠায় আহমদ ছফা

(কিস্তি ৭-এর পর)

প্রসঙ্গ না পাল্টিয়ে উপায় নেই। পঁচানব্বই সালে ছফা কাকার গাভী বিত্তান্ত উপন্যাসটি সাপ্তাহিক রোববারে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। পরে সন্দেশ থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল।

এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে ফারজানার সঙ্গে ছফা কাকার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁদের পরিচিতিটা হয়েছিল কাজের সূত্রে। ফারজানা তখন ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’র কম্পিউটার সেন্টারে কর্মরত ছিলেন। পরিচিত হবার কিছুদিন পর তিনি বন্ধু-বান্ধবকে ঘোষণা দিয়ে বসেন, ফারজানাকে বিয়ে করবেন। ফারজানাও হয়ত রাজি ছিলেন। তখন ছফা কাকা ফারজানার পছন্দের জামা-কাপড় ছাড়া পরতেন না। নিরানব্বই সালের প্রথম দিকে ফারজানা বিয়ে করে আমেরিকাতে চলে যান। বিয়ের পরও তাঁরা দু’জন চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। ফারজানা কাকাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করতেন।
—————————————————————–
কখনো কখনো শিশুর মত হেসে হেসে গাছগুলোর সঙ্গে কথা বলতেন। বড় বড় গাছগুলো জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করতেন। সেটা এক দেখার মত ব্যাপার ছিল। তারপর সুশীল যখন একটা শালিক এনে দিল তখন ছফা কাকার আনন্দ আর দেখে কে! ‘বাবু পাখি’, ‘শালিক পাখি’, ‘পরান পাখি’, ‘হলুদিয়া পাখি’ কত নামে যে পাখিটিকে সম্বোধন করতেন তার কোন লেখাজোকা ছিল না।… একদিন দেখি ছফা কাকা লিখছেন আর লিখছেন। গাছপালা এবং তাঁর অনুগত পাখিগুলোর প্রতিও বিশেষ লক্ষ নেই। তিনি যখন লিখতেন মিটিমিটি হাসতেন। আজও দেখলাম তাঁর হাসি থামতে চাইছে না।
—————————————————————–
ফারজানাকে উপলক্ষ করে ছফা কাকা অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী উপন্যাসটি লিখেছিলেন। তখন ফারজানা ঢাকায় ছিলেন। এই উপন্যাসটিও সাপ্তাহিক রোববারে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। প্রথম এক কিস্তি অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী নামে ছাপা হয়েছিল। প্রথম কিস্তি ছাপার পর ছফা কাকা কয়েক মাস আর লেখেননি। পরে পুনরায় যখন লেখাটি তিনি শুরু করেন নামটি পাল্টে দিয়ে লেখেন ‘প্রাণ পূর্ণিমার চান’। কিন্তু ছিয়ানব্বই সালে যখন বই আকারে উপন্যাসটি মাওলা ব্রাদার্স থেকে বের হয় পুনরায় অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী নামটি ছাপা হয়। মাওলা ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আহমেদ মাহমুদুল হকের ‘প্রাণ পূর্ণিমার চান’ নামটি পছন্দ হয়নি বলে সাবেক নামে বইটিকে নামাঙ্কিত করা হয়। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছিল স্বয়ং ফারজানাকে এবং মলাটের ওপর তাঁর ছবির একটি জলছাপও ব্যবহার করা হয়েছিল। (সম্পূর্ণ…)

জাপানি কবিতা

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ | ১২ জুন ২০১০ ৫:৩৭ অপরাহ্ন

pine_trees.jpg
পাইন গাছ, হাসেগাওয়া তোহাকু, ১৫৯৩

সম্রাট্ গোতোবা (১১৮০-১২৩৯)

তানকা

যখন তাকাই, দূর
ধোঁয়াশে পাহাড়ি ঢাল,
মিনোসে নদী—
কেন ভাবি, হেমন্তেই
সন্ধ্যারা সুন্দর?
 

বাশো মাৎসুয়ো (১৬৪৪-১৬৯৪)

হাইকু


পুরাতন দিঘি
হঠাৎ একটা ব্যাঙের ঝাঁপ,
জলীয় আওয়াজ।


বসন্ত-বৃষ্টির
জল জমিয়ে সুন্দরী
মোগামি নদী।


আকাশে রাকা
নোতুন চাঁদ, মাটিতে ম্লান
শুভ্র যবের শিষ।


ফুজি-র সুবাতাস
একটা পাখায় ভ’রে দিই।
এ-ই, এদো-র স্মারক।

(এদো: তোকিয়োর প্রাচীন নাম)


ঘোড়ার পিঠে ঘুম,
দূর চাঁদ স্বপ্নের প্রলম্বন,
গরম চা-র ধোঁয়া।


বসন্ত পালায়।
পাখিদের কান্নায়, যত
মাছের চোখে জল।


কী যে সৌভাগ্য!
দক্ষিণের উপত্যকায়
সুগন্ধ তুষার! (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com