বহুবাচনিক দ্রষ্টা নারীগণের বাচ্য হয়ে ওঠা

এস এম রেজাউল করিম | ৩১ জানুয়ারি ২০১০ ৯:২৮ পূর্বাহ্ন

desire_a.jpg…….
ডিজায়ার, ক্যানভাসে মিশ্র মাধ্যম, ১৫৩ x ১২২ সে. মি., ২০০৯
……..
আঁকিয়ে’র সাথে অন্ধের সম্পর্ক কেমন? অন্ধগণ নাজিয়া আন্দালীব প্রিমা’র আঁকা ছবি দ্যাখে না, তিনি তাই অন্ধদের বহিষ্কার করেছেন তাঁর ক্যানভাস থেকে, প্রিমা’র ছবির সকল নারী চোখওয়ালা, আবার অপলক; অন্ধগণ অপলক থাকতে পারে, পলক ফেলতেও পারে, ঘটনা হিসাবে অ/পলকের জন্য চোখ/দৃষ্টি থাকা আবশ্যিক না। চোখ থাকা মানেই দৃষ্টি থাকা নয়; কিন্তু দৃষ্টি থাকা মানে দৃশ্যের প্রতি সংবেদন থাকা, অন্ধের এই সংবেদন নাই। প্রিমা’র ক্যানভাসের চোখগুলা সংবেদনশীল, মানে দৃষ্টিসম্পন্ন, মানে নারী বলতে প্রিমা সংবেদনশীল দৃষ্টিসম্পন্ন নারী বোঝেন। প্রীমা’র নারীগণ দেখছেন, প্রতিক্রিয়া আছে তাদের, প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান তাদের চোখে, শরীরে। প্রিমা’র প্রকল্প জটিল, তিনি প্রতিক্রিয়া আঁকেন নারীর শরীরে। পেইন্টিংয়ের ইতিহাসে নারীর উপস্থিতি অগুণতি, তবে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই নারী দ্রষ্টব্য, দেখবার; সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণও নারীকে দেখবার মতো হয়ে উঠবার নির্দেশনা দেয়। বিপরীতে প্রিমা’র নারীগণ প্রধানতঃ দ্রষ্টা। নারীর দ্রষ্টারূপ অভ্যস্ততার ব্যত্যয়, প্রিমা’র নারীগণ চোখ নামায় না, দেখতে থাকে, নারীর দেখতে থাকবার ঘটনা অস্বস্তির। নারীর চোখ নামিয়ে নেওয়াই সমাজের বিধি, ফলতঃ দেখতে থাকাই দ্রোহ।
—————————————————————–
বেশি বেশি বোরখা বিক্রি উন্নয়ন ডিসকোর্সের জন্য তাই আনন্দসংবাদ, বোরখা একটা পোশাক হিসাবে লাইফস্টাইলের অংশ করতে পারা উন্নয়ন প্রকল্পের অন্য অংশ। উন্নয়নবাদের শক্তিমত্তা টের পাওয়া যায় শিল্পীর (প্রীমা’র) মস্তিস্কে বোরখার অবস্থিতি থেকে, নারীর বিবিধতা নির্মাণে স্মারক হিসাবে বোরখা ব্যবহার করবার মাধ্যমে প্রীমা তাঁকে উন্নয়ন ডিসকোর্সের দেয়া দায়িত্ব সম্পাদন করেন, দর্শকের মনোজগতে বোরখা স্থাপন করবার মধ্য দিয়ে।
—————————————————————-
prof_preema.jpg…….
নাজিয়া আন্দালীব প্রিমা (জন্ম. ১৯৭৪)
…….
কিন্তু প্রীমা’র নারীভাবনা দ্রোহী ভাবব কি?; প্রিমা’র ভাবনার একটা বড় অংশে নারী শুধু দ্যাখেই না, উপরন্তু নিজেকে দেখাতে অস্বীকার করে, নিজেকে দেখানো যেইখানে অধিপতি রীতি অবগুন্ঠন সেইখানে আত্মরক্ষার উপায়, অবগুন্ঠন আবার নিষেধের বেড়া হতে পারে, প্রিমা’র নারীগণের পর্দাসকল সেই নারীগণের স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া নাকি তাদের জন্য অনতিক্রম্য সাংস্কৃতিক সীমানা নাকি স্রেফ আরেকটা পোশাক? এই প্রশ্ন করবার জন্য অন্ততঃ একটা অনুমান করতে হয় যে, এর একবাচনিক উত্তর আছে। উত্তর একটা হওয়া সম্ভব, আবার একটা হবার সম্ভাব্যতা একাধিক হবার সম্ভাবনা নাকচ করে না। কিন্তু একেশ্বরবাদ ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক একবাদ যৌথভাবে (অথবা পরিণতির দিক থেকে উভয়ে হয়তো অভিন্ন) একবাচনিক উত্তর পেতে চায়, একটা উত্তর দেবার জন্য চাপ দিতে থাকে। (সম্পূর্ণ…)

সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ৯)

চঞ্চল আশরাফ | ২৭ জানুয়ারি ২০১০ ৩:৫০ অপরাহ্ন

hazad11b.jpg
সন্তানদের সঙ্গে সমুদ্রে, ১৯৯৬

hazad11c.jpg
থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে, জন্মদিনে; ২০০৪

কিস্তি:

(কিস্তি ৮-এর পরে)

শাহরিয়ার ভাই কেন ওইরকম আচরণ করেছিলেন, আমি বলবো না যে এটা আমার বোধগম্য নয়। একটি হাস্যকর সত্যও এর কারণ হিসেবে জড়িয়ে গিয়েছিল। সেটা এখন বলতে চাই না। তো, নতুনধারার উদ্বোধনী সংখ্যার জন্যে লেখা চাইতে ও সংগ্রহ করতে গিয়ে মমতাজউদদীন আহমদ, বদরুদ্দীন উমর প্রমুখের সূত্রে বেদনাদায়ক ও মজার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। সে-সব উল্লেখের জায়গাও এটি নয়। বরং এখন মনে হয় যে, হুমায়ুন আজাদের লেখা চেয়ে সে-রকম অভিজ্ঞতা হতে পারত। কেননা, তাঁর সঙ্গে আমার বাক-বিতণ্ডা আর সব সাহিত্যিকদের তুলনায় বেশিই ঘটেছিল। লেখা চেয়ে তাঁকে আমি তিন বার ফোন করি। প্রথম বার তিনি বাসায় ছিলেন না। দ্বিতীয়বার ফোনে তাঁকে পাই এবং তিনি বলেন যে তাঁর শরীর ভালো নেই এবং সপ্তাখানেক পরে আবার ফোন করতে বলেন। সেটা করি এবং তিনি বলেন যে তাঁর মন ভালো নেই। কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘কিছুই ভালো লাগে না আমার, আমি কিছুতেই আশার কিছু দেখছি না চঞ্চল। সব পতনের দিকে, অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে।’ এই যে লিখছি কথাটা, আমার শরীর কেঁপে উঠছে; বেদনায় ভরে উঠছে মন। যেমন শিউরে উঠেছিলাম তখন; বলেছিলাম, ‘এই অনুভবটা, ঠিক এই অনুভূতিটা নিয়ে নতুনধারার জন্যে একবার বসুন। আমি নিশ্চিত, সেটা হবে উদ্বোধনী সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো।’

‘স্তুতি করছো, না-কি সত্যি বলছো?’

‘স্তুতি করার প্রতিভা আমার নাই স্যার। এমনিতেই আপনার গদ্য আমার এবং অনেকের প্রিয়। আপনার লেখায় কপটতা একেবারেই নাই। তা ছাড়া যে-কথাগুলো আপনি বললেন, তার সঙ্গে, আপনার ভাষায়, গভীরব্যাপক সত্য ও বাস্তবতা জড়িয়ে আছে। আসলে আমি চাইছি এই সত্য, সময়ের এই মর্মান্তিক সত্য লেখাটায় আসুক। সেটা আপনার হাতে যতটা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠবে, আর কারও পক্ষে সে-রকম সম্ভব কি-না আমার জানা নেই।’

‘হুম।’ (সম্পূর্ণ…)

বোর্হেসের প্রতি চিঠি

সুজান সন্টাগ

| ২৬ জানুয়ারি ২০১০ ১:৩১ অপরাহ্ন

borges2.jpg
হোর্হে লুইস বোর্হেস (২৪/৮/১৮৯৯ – ১৪/৬/১৯৮৬)

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান খান

[১৯৯৬ সালে এ চিঠি মার্কিন সাহিত্য সমালোচক এবং ঔপন্যাসিক সুজান সন্টাগ লিখেছিলেন প্রায় এক যুগ আগে প্রয়াত লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসকে উদ্দেশ্য করে। চিঠিটি সন্টাগের বই Where the Stress Falls-এ সংকলিত হয়েছে। অনুবাদক লেখাটি অনুবাদ করেছেন ক্লাউদিয়া মার্তিনেসের স্প্যানিশ অনুবাদ থেকে।—বি. স.]

borges_care21.jpg

১৩ জুন ১৯৯৬ নিউ ইয়র্ক

প্রিয় বোর্হেস,

যদিও আপনার সাহিত্য সব সময়ই চিরন্তরের অন্তর্ভুক্ত তবুও আপনাকে একটা চিঠি লেখা মনে হয় না খুব একটা বিস্ময়কর হবে। (বোর্হেস, দশ বছর হয়ে গেছে!) যদি কোনো সমসাময়িক সাহিত্যিককে অমরতার অভিমুখী মনে হয়, সে হচ্ছেন আপনি। যদিও আপনি ছিলেন আপনার সময় এবং সংস্কৃতির এক বিশাল সৃষ্টি, তারপরও আপনি জানতেন কীভাবে আপনার সময় এবং সংস্কৃতিকে অতিক্রম করতে হয় আর এর ফলাফল ছিলো জাদুকরী। আপনার মনোযোগের ব্যাপ্তি এবং উদারতাই হচ্ছে এর বিশেষ কারণ। লেখকদের মধ্যে আপনি ছিলেন অপেক্ষাকৃত কম স্বকেন্দ্রিক এবং স্বচ্ছ, একই ভাবে সবচেয়ে শৈল্পিক। আত্মার প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতাও এর এক বিশেষ কারণ। আমাদের মধ্যে আপনি বেশ দীর্ঘ সময় বেঁচে ছিলেন। ধ্বংসের এবং উদাসীনতার চর্চাকে আপনি এমন এক পূর্ণতায় নিয়ে গেছেন যা আপনাকে অন্য যুগের মানসিক পরিব্রাজকে রূপান্তরিত করেছে। আপনার কালচেতনা ছিলো অন্যদের চেয়ে আলাদা; অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে সাধারণ ধারণাগুলো আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হয়েছিলো। আপনি বলতে ভালোবাসতেন এই কথা যে প্রতিটি মুহূর্তের মধ্যে অতীত ও ভবিষ্যৎ হাজির রয়েছে। (সম্পূর্ণ…)

কবীর চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ

বেবী মওদুদ | ২৩ জানুয়ারি ২০১০ ১০:২৭ অপরাহ্ন

kc1.jpg
কবীর চৌধুরী (জন্ম. ৯/২/১৯২৩); ছবি: ফিরোজ আহমেদ, অক্টোবর ২০০৯

[কবীর চৌধুরীর এই সাক্ষাৎকারটি ভিডিওতে গ্রহণ করা হলেও কিছু সম্পাদনা করা হয়েছে। ২১ ও ২২শে অক্টোবর ২০০৯ দুই দফায় সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকারের ভিডিও মোট তিনটি অংশে পরিবেশিত হলো। বি. স.]

ভিডিও ১

বেবী মওদুদ: প্রিয় পাঠক আমরা আজ এসেছি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, শিল্প বোদ্ধা ও অনুবাদক হিসাবে যিনি আমাদের কাছে সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর কাছে। একজন বড় মাপের মানুষ হয়ে ওঠার পেছনে যে কতখানি পরিশ্রম দরকার, অভিজ্ঞতা ও চর্চা, সাধনা দরকার আমরা সেটা কবীর চৌধুরীর মধ্যে দেখেছি। বয়স হয়েছে তাঁর প্রায় ৮৮ বছর। ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯২৩ সালে তার জন্ম হয়। এখনও এই বয়সে তিনি প্রতিদিন লেখার টেবিলে বসেন এবং বড় ধরনের কাজ করেন অনুবাদের এবং অন্যান্য লেখার। সামনের বই মেলায় তার বোধহয় ১২/১৩টি বই ছাপা হবে। সে বইগুলোর কাজও করছেন। আমরা আজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর পক্ষ থেকে তার বাসায় এসেছি। তার মুখ থেকে শুনবো তার কথা। তার জীবনের কথা শুনবো, তার শিক্ষা জীবনের কথা, শুনবো তার শৈশব-কৈশোরের কথা।

কবীর ভাই, আপনি কেমন আছেন? আপনার সময় কাটে কীভাবে?

কবীর চৌধুরী: লেখা পড়াতে আমার সময় খুব দ্রুত কাটে এবং আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে ১৮ ঘণ্টা দিন হলে ভাল হতো। আমি সকালে সাড়ে পাঁচটার দিকে উঠে পড়ি। মুখহাত ধুয়ে তারপর ছয়টার মধ্যে লিখতে বসি এবং সারাদিনে অন্তুত ৭/৮ ঘণ্টা লেখার কাজ করি। কিছু পড়ার কাজ করি। কাজেই সময় কাটা নিয়ে অনেকেরই বৃদ্ধ বয়সে যে অভিযোগ থাকে, সময় কাটে না, আমার সেটা নাই।

বেবী মওদুদ: আপনি তো বিভিন্ন সভায় যাচ্ছেন।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, সভায় যাচ্ছি। গতকাল একটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ সভায় গিয়েছিলাম। বাংলার বাইরে থেকে ‘প্রতীচি’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রমথনাথ বিশীর মেয়ে এটা বের করেন। সেই পত্রিকার পাঁচ বছর পূর্তি উপলকে একটা সভা ছিল। সেই সভাতে ছিলাম, তার পরে সেখান থেকে উঠে বাংলা একাডেমিতে আর একটা সভা ছিল, সেখানে গিয়েছি।

বেবী মওদুদ: এখনও তো বই পড়েন। এর মধ্যে পছন্দসই কী কী বই পড়লেন?

কবীর চৌধুরী: আমি নিয়মিত এখনও পড়ি। একটা বই এখন পড়ছি, খুবই চমৎকার লাগছে। বইটির নাম ‘দি হোয়াইট টাইগার’। খুব কৌতূহলোদ্দীপক ব্যঙ্গাত্মক। তবে তার মধ্যে ভারতের দারিদ্র্যের চিত্রও খুব বাস্তবসম্মত ভাবে উঠে এসেছে। আরও পড়ছি তুরস্কের নোবেল বিজয়ী লেখক ওরহান পামুকের ‘স্নো’। অসামান্য একটি উপন্যাস। সেটা পড়া প্রায় শেষ করেছি এবং ঐ একই লেখকের একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ আছে, নাম ‘আদার কালার্স’। আমি ‘আদার কালার্স’ এর বেশ কিছু লেখা বাংলায় অনুবাদ করেছি। সেটাও সামনের বই মেলায় আসবে। আর ‘স্নো’র বাংলা অনুবাদ ‘তুষার’ এখনও শেষ হয়নি, প্রায় ৪৫০ পৃষ্ঠার বই। এখনও ৪০ পৃষ্ঠার মত বাকি আছে। তাও হয়ে যাবে এবং সেটাও এই বই মেলায় আসবে। এই এখন আমার প্রধান কাজ এবং তার পাশাপাশি প্রবন্ধ লেখা তো হচ্ছেই। যেমন বঙ্গবন্ধুর হত্যার মাস সামনেই ১৫ই আগস্ট। তার উপরে লেখার জন্য অনুরোধ আসছে, লিখছি।

বেবী মওদুদ: আপনার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি নিশ্চয়ই মনে আছে কিছু কিছু। অনেকগুলো ভাইবোন ছিলেন আপনারা। (সম্পূর্ণ…)

কিস্তি ৫

ছফামৃত

নূরুল আনোয়ার | ১২ জানুয়ারি ২০১০ ১০:৩৮ অপরাহ্ন

শুরুর কিস্তি

(কিস্তি ৪-এর পর)

sofa_other3.jpg……
মেরি ড্যানহাম ও রওনক জাহানের সঙ্গে, ১৯৯৭
…….
ডক্টর মফিজ চৌধুরীর কথায় ফিরে আসি। ডক্টর চৌধুরীর সঙ্গে কাকার সম্পর্ক ছিল বাপ-বেটার মত। তিনি চৌধুরী সাহেবকে বাবা বলে ডাকতেন। ডক্টর চৌধুরী ইন্দিরা রোডে থাকতেন। তাঁর বাসভবনের নাম ছিল ‘শেরিফা নীড়’। ছফা কাকার মুখে শুনেছিলাম, শেরিফা নীড়ে ডক্টর মফিজ চৌধুরীর সঙ্গে অনেকদিন ছিলেন। গ্রাম থেকে আমার বাবা এসেও ওই বাড়িতে থেকে গেছেন। পরে পরে চৌধুরী সাহেব কচুক্ষেতের বাসায় থাকতেন। ছফা কাকার সঙ্গে আমারও দুয়েকবার ওখানে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে। তখন আমি কাকার সঙ্গে মিরপুরের শেয়াল বাড়িতে তাঁর কেনা ফ্ল্যাটে থাকতাম। এখন ওই জায়গার নাম রূপনগর। চৌধুরী সাহেবের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছফা কাকার সঙ্গে ভাল সম্পর্ক ছিল। কিন্তু শেষের দিকে ছফা কাকা চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে যেতেন না। তবে ফোনালাপটা বহাল ছিল। শুনেছি চৌধুরী সাহেবের মেয়েরা তাঁকেও ঘর থেকে বের হতে দিতেন না। চৌধুরী সাহেব মারা যাবার কদিন আগে থেকে ছফা কাকা খুবই বিমর্ষ ছিলেন। তাঁর মধ্যে আমি একটা ছটফটানি ভাব লক্ষ্য করেছিলাম। তাঁকে বলেছিলাম, আপনার কি একবার দেখা করে আসা উচিত নয়?
—————————————————————–
“প্রথমে আগরতলা, তারপর কোলকাতা। আমি কোথাও বিশেষ সুবিধে করতে পারলাম না। আওয়ামী লীগের কর্তাব্যক্তিরা তাদের দলের লোক ছাড়া অন্য কাউকে ফ্রন্টে যেতে দিচ্ছিল না। আমি মুখ আলগা স্বভাবের লোক। কখন কী বলে ফেলি তার কোন স্থিরতা ছিল না। আমাকে নিয়ে বন্ধু-বান্ধবেরা মুশকিলে পড়ে গেলেন। ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা প্রবাসী বাঙালিদের ভেতর থেকে পাকিস্তানি গুপ্তচরদের খুঁজে খুঁজে বের করতে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছিল। এককথায় যদি কারও ওপর তাদের নেকনজর পড়ে আমরা ধরে নিতাম, তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। এখন কথা হচ্ছে লাশটা পাওয়া যাবে কি না। আমি যেভাবে চলাফেরা করতাম এবং বেপরোয়া কথাবার্তা বলতাম, অনায়াসে আমাকে পাকিস্তানি স্পাই হিসেবে চিহ্নিত করা যেত। সেই সময়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কাজী নজরুল ইসলামের বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সে যাত্রায় জানে বেঁচে গেলাম।”
—————————————————————-
তাঁর মুখ থেকে আপনাআপনি একটা শিস বেরিয়ে এল। ওই সময় তাঁর একটা অভ্যাস হয়েছিল কোনো কাজে তিনি অপারগ হলে শিস দিয়ে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেন, তারপর চুপ মেরে যেতেন। তখন তাঁর সঙ্গে দ্বিতীয় কথা বলার সাহস করা যেত না। আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, আমি চৌধুরী সাহেবের বাসায় যাই তাঁর মেয়েরা তা চায় না। তাদের ধারণা, চৌধুরী সাহেব সুযোগ পেলে তাঁর সহায়-সম্পত্তি সব আমার নামে লিখে দেবেন। তাছাড়া তারা তাঁকে অনেকদিন ধরে ঘর থেকে বের হতে দেন না।

চৌধুরী সাহেব মারা যাবার পর তাঁর নামে একটা ছাত্র-বৃত্তি চালু করেছিলেন ছফা কাকা। সাংবাদিক নাজিম উদ্দীন মোস্তানের এক বন্ধু ছিলেন, নাম আবদুল কাদির। তাঁর একটা কম্পিউটার সেন্টার ছিল। কম্পিউটার জগত নামে একটা পত্রিকাও তিনি বা’র করতেন। মোস্তান সাহেবের মাধ্যমে তাঁকে ধরে ‘ডক্টর মফিজ চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ নামে একটা কম্পিউটার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। যারা জিতত তাদের মধ্যে কম্পিউটার বিতরণ করা হত। এই প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েক বছর চালু ছিল। কাদির সাহেব মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোগটিও থেমে যায়। পুরনো ঢাকার ওদিকে ডক্টর মফিজ চৌধুরীর নামে একটা স্কুল খোলার চিন্তাও তাঁর মাথায় এসেছিল। ভাল চিন্তা তো তিনি করতেন, কিন্তু অর্থ এবং ব্যস্ততার কারণে তাঁর অনেক উদ্যোগ আলোর মুখ দেখতে পেত না। (সম্পূর্ণ…)

শততম জন্মদিনে শুভেচ্ছা

বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

| ১০ জানুয়ারি ২০১০ ৩:০৮ পূর্বাহ্ন

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে পরিচালিত ১৯৩০ সালের ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ’-র কনিষ্ঠতম যোদ্ধাদের একজন বিনোদবিহারী চৌধুরী। ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযান ও জালালাবাদ যুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশগ্রহণ করে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে অংশ নেওয়ার অপরাধে প্রায় ১২ বছর জেল খেটেছেন। জেলখানায় বসেই তিনি স্নাতক হন। কারাজীবনে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। তারই জের ধরে কংগ্রেসের রাজনীতিতে নাম লেখান এবং ১৯৪৮ সালে পূর্ব-পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সুবাদে তাঁর সুযোগ ঘটে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করার। পরবর্তীকালে ঊনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে নানান সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ও শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে আজ পর্যন্ত যুক্ত আছেন সক্রিয়ভাবে। ১৯১০ সালে জন্ম নেওয়া এ বিপ্লবীর শততম জন্মদিন পালিত হচ্ছে আজ ১০ই জানুয়ারি ২০১০ তারিখে। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মাসিক বিশদ সংবাদ-পত্রিকার জন্য আলম খোরশেদ ও এহসানুল কবিরের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি এ-উপলক্ষে এখানে পুনঃপ্রকাশিত হল।

binodbihari1.jpg
বিনোদবিহারী চৌধুরী; ছবি: এহসানুল কবির

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলম খোরশেদএহসানুল কবির

আলম খোরশেদ: আপনার সম্পর্কে তো সবাই কমবেশি জানে। আপনি একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আমাদের পত্রিকার পাঠকদেরকে আপনার সঙ্গে আরও অন্তরঙ্গভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। খুব বেশি প্রশ্ন করব না, আপনার কাছ থেকে সবিস্তারে আপনার জীবনের কাহিনী শুনব। শৈশবের কথা দিয়েই শুরু করুন।

বিনোদবিহারী চৌধুরী: আমার জন্ম ১৯১১ সালের ১০ই জানুয়ারি বোয়ালখালী থানার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে। আমার বাবা স্বর্গীয় কামিনীকুমার চৌধুরী আর মা বামা দেবী। বাবা ছিলেন কমিটি পাশ উকিল। কমিটি পাশ বোঝেন তো? তখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে একটা পরীক্ষা দিয়ে মুন্সেফ কোর্টের উকিল হওয়া যেত। উনি ফটিকছড়ি মুন্সেফ কোর্টের উকিল ছিলেন। ছয় বছর বয়সে আমি আমার বাবার কাছে চলে যাই। ওখানে রাঙামাটি প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। প্রত্যেক ক্লাশেই ফার্স্ট হতাম। ক্লাস ফোর পাশ করার পর বাবা বললেন, ‘এই স্কুলে ইংরেজিটা তোর ভালো শেখা হয় নাই, তোকে আরো ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব। স্বভাবতই আমাকে ক্লাস ফাইভে বা কমপক্ষে ফোরে ভর্তি করানো উচিত ছিল। কিন্তু তিনি আমাকে ফটিকছড়ি করোনেশান এইচ ই স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ওখানে ক্লাস এইটে পড়ার সময় শিক্ষকেরা বললেন, ‘তুই শহরে গিয়ে কোনো একটা ভালো স্কুলে পড়। তুই স্কলারশিপ পাবি, ভালো রেজাল্ট করবি।’ আমি বাবাকে কথাটা বললাম। বাবা বললেন আমাকে শহরে রেখে পড়ানোর মতো আর্থিক সঙ্গতি তাঁর নেই, তেমন কোনো আত্মীয়-স্বজনও নেই যার কাছে রেখে আমাকে পড়াতে পারেন। তিনি একটা কঠিন শর্ত দিলেন। বললেন, ‘তোকে শহরে রেখে পড়াতে পারি এক শর্তে। ফার্স্ট তো তুই হবিই, কিন্তু সেকেন্ড বয়ের চেয়ে একশ নম্বর বেশি পেয়ে ফার্স্ট হতে হবে।’ আমি বললাম, ‘সেটা তো সম্ভব না। তবে, আমি কথা দিতে পারি আমি ফার্স্ট হব আর সব বিষয়ে আশির ওপরে নম্বর পাব।’ আমি তা-ই পেলাম। শহরে নয়, বাবা আমাকে বোয়ালখালী থানার পি সি সেন সারোয়াতলী স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেটা তখনকার দিনের খুব নামকরা স্কুল। প্রত্যেক বছর সেখান থেকে বেশ কিছু ছেলে স্কলারশিপ পেত। হেড মাস্টার ছিলেন যতীন্দ্রমোহন দস্তিদার। সমস্ত চিটাগাঙে তিনজন সেরা হেডমাস্টারের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। (সম্পূর্ণ…)

শিল্পী নাসিমুল খবিরের নিরিখ ও নির্মাণ

আলফ্রেড খোকন | ৩ জানুয়ারি ২০১০ ৯:২৫ পূর্বাহ্ন

budiganga.jpg
বুড়িগঙ্গা

ভাস্কর নাসিমূল খবির রচিত শ্রীমতী বোরাক ও সহোদরাবৃন্দ নামের কয়েকটি রচনার প্রদর্শনী চলছিল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ-এর গ্যালারী অব ফাইন আর্টস-এ। ২৫ ডিসেম্বর এই প্রদর্শনী শুরু হলে আমরা বন্ধুরা মিলে যখন সন্ধ্যার আলো-ছায়ামগ্ন গ্যালারীর প্রবেশপথ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন মনে একধরনের কৌতূহল ভিড় করছিল, কারণ নাসিমূল খবিরের একক কোনো রচনার প্রদর্শনী এর আগে চোখে পড়েনি।

garments-girl.jpg…..
গার্মেন্টস কন্যা
…….
চারুকলার ভাষায় নাসিমূলের কাজকে ভাস্কর্য শিরোনামে পরিচয় করিয়ে দেয়া আছে, অর্থাৎ শ্রীমতী বোরাক ও সহোদরাবৃন্দ একটি ভাস্কর্য প্রদর্শনী। সেই অর্থেই নাসিমূল খবির একজন ভাস্কর। যেখানে ভাস্কর নিজেই বলেছেন, ‘‘এই প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য আমার নিকট অতীত ও সাম্প্রতিককালের পরস্পর সম্পর্কিত ভাস্কর্য ধারণা বা ধারণাজাত পরীক্ষা নিরীক্ষার খসড়া প্রকাশ।”

শুধু তাই নয়, ভাস্কর তার কাজ নিয়ে প্রদর্শনীপত্রে নিজেই যা বলার তা অনেকটা বলে দিয়েছেন। সে বিষয়ে বললে একই বিষয়ে দ্বিতীয়বার বলা হবে। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com