ধর্ষিত বাংলাদেশ: মানবেতিহাসের কৃষ্ণতম অধ্যায়
আহমেদ মাখদুম

| ২২ december ২০০৯ ৬:২৩ অপরাহ্ন

অনুবাদ: মফিদুল হক

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নয় মাসব্যাপী গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়ে পরিসমাপ্ত হয় কাপুরুষতা ও অমানবিকতার চরম নৃশংস ও রোমহর্ষক, কলঙ্কময় ও ন্যাক্কারজনক, অসম্মান ও অপমানকর, মসীলিপ্ত ও কুখ্যাত অধ্যায়। এই দিন বর্বর, পাশবিক ও নৃশংস পাকিস্তান সেনাবাহিনী—উর্দি-পরিহিত ৯৬,০০০ পশু—আত্মসমর্পণ করে ভারতীয় বাহিনীর কাছে। এর পূর্ববর্তী নয় মাসের সন্ত্রাস, পীড়ন ও স্বৈরাচার মানবতার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে চিহ্নিত হবে সবচেয়ে কৃষ্ণ অধ্যায় হিসেবে।

এবং আমি আমার এই পাপী চোখে দেখেছি বঙ্গকন্যার ধর্ষণ, আমার আঙিনায় ঘটেছে অপাপবিদ্ধ বঙ্গসন্তানদের হত্যাযজ্ঞ, আর আমি বেঁচে আছি দুনিয়াবাসীকে বলতে যা আমি দেখেছি!
—————————————————————–
আমি যখন গোপন অবস্থান থেকে বের হয়ে আসি ততদিনে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। আমার বাঙালি বন্ধুরা আমাকে সাহায্য করে, আশ্রয় ও আহার যোগায়, যত্ন-আত্তি নেয় এবং ভালোবাসা, প্রীতি ও করুণায় সিক্ত করে। তাঁরা আমার সিঙ্গাপুর যাওয়ার বিমান-ভাড়ার ব্যবস্থা করে দেয়, যেখানে আমি নতুন জীবন শুরু করি, উন্মোচিত হয় জীবনের আরেক অধ্যায়, আমার মাতৃভূমি আমার পিতৃভূমি সিন্ধু থেকে বহু বহু যোজন দূরে। এরপর চল্লিশ বছর ধরে সিঙ্গাপুর হয়ে আছে আমার আবাস এবং বাঙালি বন্ধুরা আমার হৃদয়, মন ও আত্মায় গড়ে তুলেছে আরেক আবাস, যতদিন বেঁচে থাকি তা আমি লালন করে চলবো।
—————————————————————-
২০০৯ সালের ৭ নভেম্বর শনিবার আমি ছিলাম লন্ডনে, যোগ দিয়েছিলাম সেখানকার আইরিশ কালচারাল সেন্টার আয়োজিত অনুষ্ঠানে, যেখানে সমবেত হয়েছিল বিশ্বের নানা দেশের স্বৈরশাসন-পীড়িত, নির্যাতিত, অত্যাচারিত ও সন্ত্রস্ত মানবতার প্রতিনিধি। সিন্ধুর এক অধম সন্তান হিসেবে আমিও ছিলাম সেই সমাবেশে, সঙ্গে ছিল আমার বোন চিরসবুজ সংগ্রামী সুরাইয়া এবং সিন্ধি টুপি পরিহিত গর্বিত নিবেদিত ব্যক্তি শাহ আচার বুঝদার।

সেখানে হাজির ছিল প্যালেস্টাইনি, ইরাকি, তুরস্ক ও ইরাক থেকে আগত কুর্দি, মরক্কোর পোলিসারিও এবং বাংলাদেশের বাঙালি। তুরস্কের কুর্দিদের একটি দল তাঁদের ঐতিহ্যবাহী গীত ও বাদন দ্বারা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত, সচেষ্ট, আত্মোৎসর্গকৃত বিভিন্ন জাতির প্রতিনিধিরা তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছিল। আমারও সুযোগ হয়েছিল বর্বরতার শিকার আমার মাতৃভূমি ও পিতৃভূমি সিন্ধুর কথা বলবার, খোদাহীন, সাহসহীন, বোধহীন দেশ পাকিস্তানের শকুন, হায়েনা ও যুদ্ধবাজদের দ্বারা যে-ভূমি আজ লাঞ্ছিত। (সম্পূর্ণ…)

সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ৮)

চঞ্চল আশরাফ | ১৮ december ২০০৯ ১০:১১ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

(কিস্তি ৭-এর পরে)

ha_sr.jpg
শামসুর রাহমানের সঙ্গে হুমায়ুন আজাদ

বললাম, ‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কোনও লেখকের বানানে ভুল দেখলে তার লেখাটি তিনি সঙ্গে সঙ্গে আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দেন। সুনীল মনে করেন, যে-লোক নিজের ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞ, তার সেই ভাষায় সাহিত্য রচনার অধিকার নেই।’ হুমায়ুন আজাদ বললেন, ‘তার তো চিঠি লেখারই যোগ্যতা নেই। (আজ বা পাঁচ-ছ’বছর আগে এই আড্ডা হলে বলতাম, দুঃখিত স্যার, এখন কেউ চিঠি লেখে না কাউকে; মেসেজ পাঠায়, মেইল করে, ‘এবং’য়ের সমার্থক ‘আর’ লেখে একটি ইংরেজি বর্ণ দিয়ে) তবে সুনীলের মতো নিম্নমাঝারি লেখকের উদ্ধৃতি ব্যবহার না-করে কথাটা যদি তোমার মুখ থেকে শুনতাম, ভালো লাগতো।’ বললাম, ‘কথাটা তো আমার নয়।’ বললেন, ‘কথাটা অসাধারণ কিছু নয় যে, এর মালিকানা নিয়ে ভাবতে হবে।’ একদিন পশ্চিমবঙ্গের লেখক আবুল বাশার নিয়ে কথা উঠলে তিনি বললেন, ‘এর মতো অপরিচ্ছন্ন লেখক আমি আর দেখি নি; আচ্ছা, সাহিত্য করতে হলে কি এমন করে দাড়ি-গোঁফ রাখতে হবে? দাঁতে ময়লা থাকা, লেখার টেবিলের পাশে থুতু ফেলা কি জরুরি?’

হূমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে তিনি যে-রকম মন্তব্য করতেন, তেমনটি প্রায় সবার ব্যাপারেই করতেন। ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস নিয়ে তাঁর মধ্যে নমনীয়তা দেখেছি। সেটি হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে মিলনের তুলনা করতে গিয়েই—যেমন, মিলন চেষ্টা করে উপন্যাস লেখার; তাঁর কিছু নিরীক্ষাও আছে; কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের কোনও ধারণাই নেই উপন্যাস সম্পর্কে। এমন কথাবার্তার এক পর্যায়ে আমি হেসে হেসে বলেছিলাম, স্যার, আপনার মধ্যে অঞ্চলপ্রীতি আছে। মিলনের বাড়ি বিক্রমপুর বলে আপনি উনার পক্ষ নিয়েছেন! ভীষণ রেগে তিনি বললেন, ওটা তোমার মধ্যেই দেখছি। তোমার বাড়ি নোয়াখালি না? ব্রিটিশ আমল থেকেই তোমাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আছে। মিলনের বনমানুষটা পড়েছ? ওইরকম নিরীক্ষা তখন কেউ করেছে? লেকচার থিয়েটারের চেম্বারে চেয়ারে হেলান দিয়ে সামান্য বিরতি নিয়ে বললেন, তার নিরীক্ষায় ছেলেমানুষি অবশ্য আছে, কিন্তু একটা চেষ্টা তো; আর হুমায়ূন আহমেদ ওসব কী লেখে? বইমেলায় তার বই কিনতে কারা ভিড় করে? সব বালক-বালিকা আর গৃহিণী… (সম্পূর্ণ…)

স্মৃতি: ষোলই-ডিসেম্বর ঊনিশ শ’ একাত্তর

রবিউল হুসাইন | ১৬ december ২০০৯ ৯:০৬ পূর্বাহ্ন

কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন গত ৭ ডিসেম্বর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালের আইসিসি ইউনিটে চিকিৎসারত। ষোলো ডিসেম্বর নিয়ে তাঁর এ লেখাটি আজ বিজয়ের দিনে পুনঃউপস্থাপিত হলো। বি. স.

mukti_lady.jpg
যুদ্ধ জয়ের পরে ঢাকায় দুই মুক্তিযোদ্ধা, কাঁধে রাইফেল।

আমার বয়স তখন ২৮ বছর। ষোলই ডিসেম্বরে লালবাগে এক বন্ধুর বাড়িতে ভাড়া থাকা কালীন আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনাটি ঘটেছিলো। ছুটে বেরিয়ে এসেছিলাম। শুনেছিলাম পাকসেনারা সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে আত্মসমর্পণ করেছে। হাজার হাজার মানুষ ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। তখন শীতকাল। পথে অসংখ্য মানুষ। শহীদ মিনারের দিকে যাচ্ছি। মুখে জয় বাংলা আর বঙ্গবন্ধুর শ্লোগান। মাঝে মাঝে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জীপ কিংবা কনভয় রাস্তায় দেখা যাচ্ছে। তাদের দেখে পথচারীরা হাততালি দিয়ে উঠছে। কেউ ফুলের মালা ছুঁড়ে দিচ্ছে, কেউ কেউ গাড়ি থামিয়ে তাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে, কোলাকুলি করছে। আমার কাছে এক প্যাকেট সিগারেট ছিলো। হঠাৎ একটি গাড়িভর্তি ভারতীয় বাহিনী এলে সেটি ছুঁড়ে দিলাম তাদের দিকে। তারা হাসতে হাসতে লুফে নিলো। অন্য পথচারীরা দৌড়ে দৌড়ে ওদের অনুসরণ করতে করতে গাড়ির পিছন থেকে হাতে হাত মিলাতে গেল।
—————————————————————–
হঠাৎ এক মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু আমার পোশাকের দিকে তাকিয়ে বেশ কড়া সুরে বলে উঠলো, খুব আরামেই ছিলে। আমরা যুদ্ধ করে মরি আর তোমরা দেখা যাচ্ছে কোট-টাই পরে বেশ আরাম-আয়েশেই ছিলে। তারপর দুহাতে বুকে জড়িয়ে ধরে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো, ভাঙা গলায় আবার বলে উঠলো, আমরা সত্যিই কি স্বাধীনতা পেলাম আমরা কি সত্যিই স্বাধীন হলাম, না কি স্বপ্ন দেখছি।
—————————————————————-
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ঢাকায় ছিলাম। এতো ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যেতে পারিনি। সেই সময় আমি কঠিন যক্ষা বা ক্ষয়কাশে ভুগছি। এটি আমার সারা জীবনের আফসোস। এর বিকল্পে এখানে থেকেই যদ্দুর পারি মুক্তিযুদ্ধের সহায়তা করার কাজে লেগে পড়েছিলাম। বুয়েট অর্থাৎ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু-শিক্ষকের ফ্ল্যাটে ভাগাভাগি করে থাকতাম। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাও চলছিলো। স্বাধীনতার কিছু দিন আগে লালবাগের বাসা ভাড়া নিই। বুয়েটের সেই ফ্ল্যাট বাড়ির নিচতলা মুক্তিযুদ্ধের একটি গোপন ঘাঁটির মতো হয়ে পড়ে। বন্ধু মুক্তিযোদ্ধারা সেখানেই আশ্রয় নিতো। টয়লেটের ছাদে অস্ত্র জমা রাখা হতো। পরে সুবিধামতো সময়ে সেগুলো তারা নিয়ে যেতো পুরনো ঢাকার ভেতর দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে এদিক সেদিক। যাতায়াতের সুবিধায় জন্যে জায়গাটা মোক্ষম ছিলো। সাতই মার্চে মাঠে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সেই অবিস্মরণীয় ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সেই স্বাধীনতার ডাক শুনতে পারিনি। খুব অসুস্থ ছিলাম। (সম্পূর্ণ…)

নবোকভের ‘দ্য অরিজিনাল অব লরা’

শিবব্রত বর্মন | ১৩ december ২০০৯ ৩:৩৭ অপরাহ্ন

বছরের শেষ দিকে এসে ভ্লাদিমির নবোকভের ভক্তদের জন্য একটা সুসংবাদ।

নবোকভের অন্তিম এবং অসমাপ্ত উপন্যাস বেরিয়েছে। নাম, ‘দ্য অরিজিনাল অব লরা’। বৃটেনে বইটির প্রকাশক পেঙ্গুইন। আর যুক্তরাষ্ট্রে নফ (Knof)।

nabokov-and-vera-in-1965.jpg
নবোকভ ও স্ত্রী ভেরা

রুশ বংশোদ্ভূত এ ‘ইংরেজি’ লেখকের শেষ ইচ্ছা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হলে এ বই অবশ্য কখনও আলোর মুখ দেখতো না। ১৯৭৭ সালে মৃত্যুর আগে নবোকভ তার স্ত্রী ভেরাকে কঠিন অথচ প্রত্যাশিত একটা নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যে-উপন্যাস লেখায় তিনি হাত দিয়েছেন, জীবদ্দশায় সেটি শেষ করতে ব্যর্থ হলে পাণ্ডুলিপিটা যেন ধ্বংস করে ফেলা হয়। নবোকভ কঠিন পারফেকশনিস্ট। আধাআধি কিছুই রেখে যেতে রাজি
cover.jpg নন। ভেরা মারা যান ১৯৯১ সালে। পাণ্ডুলিপিটা পুড়িয়ে ফেলেননি তিনি। স্বামীর শেষ ইচ্ছা পূরণে তার এই অকারণ দীর্ঘ গড়িমসি এক রহস্য। ভেরার মৃত্যুর পর পাণ্ডুলিপিটি ধ্বংস করার দায় বর্তায় তাদের ছেলে দিমিত্রির ওপর। তিনিও বাবা এবং মায়ের অন্তিম নির্দেশ পালনে দ্বিধায় ভুগে গেছেন। অবশেষে তাঁরও বিদায়ের ক্ষণ ঘনিয়ে এলো। সত্তর বছর বয়সে এসে দিমিত্রি তার পিতার ইচ্ছা অমান্য করার সিদ্ধান্তে স্থিত হতে পেরেছেন। সুইস ব্যাংকের ভল্ট থেকে বের করে প্রকাশকের হাতে তিনি তুলে দিয়েছেন পিতার অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি। গত ১৫ নভেম্বর বেরিয়েছে ১৩৮ পৃষ্ঠার একটা হ্যান্ডসাম অথচ জটিল বই।

বইটি আলোর মুখ দেখা উচিৎ কিনা এ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ চলেছে বিভিন্ন গরিষ্ঠ লেখক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। লেখকের শেষ ইচ্ছা পূরণ জরুরি, নাকি পাঠকের প্রাপ্তি বড়—তর্কটা এ নিয়ে। দিমিত্রি অবশ্য বইয়ে ভূমিকায় কৈফিয়ত দিতে গিয়ে বলেছেন, তার মনে হয়েছে, ‘একটি প্রতিভাদীপ্ত, মৌলিক এবং আগাপাশতলা ভিন্নরকম উপন্যাস হয়ে ওঠার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এটির মধ্যে। নবোকভের বাকি সব কাজের চেয়ে এটি একেবারেই আলাদা।’ (সম্পূর্ণ…)

রোকেয়ার সময় আমাদের সময়

বেবী মওদুদ | ৯ december ২০০৯ ১১:২০ পূর্বাহ্ন

rokeya_swami.jpg
স্বামী সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে বেগম রোকেয়া, ছবি: মাজেদা সাবেরের সৌজন্যে

৯ ডিসেম্বর বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত মহিয়সী রোকেয়ার জন্মদিন। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরন করেন। এই দিনটি রোকেয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়ে থাকে।

আজ থেকে একশ বছর আগে রোকেয়ার সময় ছিল বাংলার নারী সমাজের জন্য অন্ধকার যুগ। যার অর্থ পশ্চাৎপদ অবস্থা, ধর্মান্ধতা, পর্দা প্রথা, গোঁড়ামী, কুসংস্কার, নির্যাতন, বৈষম্য, বঞ্চনা, শোষণের বেড়াজালে নারীকে শুধুমাত্র বন্দি করেই রাখা হয়নি মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা হতো। পাশবিক, ভয়াবহ ও অমানবিক সেই সময় একটা দুঃসময় ছাড়া আর কিছু নয়। রোকেয়া একশ বছর আগে পদ্মরাগ উপন্যাস লেখার সময় বলেছেন, ‘তোমাদের কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিতা করিয়া কার্য্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজেরাই নিজেদের অন্ন, বস্ত্র উপার্জন করুক।’ কত সত্য ও কঠিন কথা। সেদিন সেই দুঃসহ সময়ে তিনি এমন কথাটি দুঃসাহসের সাথে উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন।
—————————————————————–
“সবে মাত্র পাঁচ বৎসর বয়স হইতে আমাকে স্ত্রীলোকদের হইতেও পর্দা করিতে হইত। ছাই, কিছুই বুঝিতাম না যে, কেন কাহারও সম্মুখে যাইতে নাই; অথচ পর্দা করিতে হইত। পুরুষদের ত অন্তঃপুরে যাইতে নিষেধ, সুতরাং তাহাদের অত্যাচার আমাকে সহিতে হয় নাই। কিন্তু মেয়ে মানুষের অবাধ গতি—অথচ তাহাদের দেখিতে না দেখিতে লুকাইতে হইবে। পাড়ার স্ত্রীলোকেরা হঠাৎ বেড়াইতে আসিত; অমনি বাড়ীর কোন লোকচক্ষুর ইসারা করিত, আমি যেন প্রাণ-ভয়ে যত্র-তত্র কখনও রান্নাঘরে ঝাঁপের অন্তরালে, কখনও কোন চাকরানীর গোল করিয়া জড়াইয়া রাখা পাটির অভ্যন্তরে, কখনও তক্তপোষের নীচে লুকাইতাম।”
—————————————————————-
আজ একশ বছর পর যখন আমরা দেখি পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, ইউনিসেফ ও জাতিসঙ্ঘ যখন বলে, ‘কন্যাশিশুকে রক্ষা করতে হবে। কন্যাকে শিক্ষা দিতে হবে। নারীর আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অধিকার দিতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ণ নিশ্চিত করতে হবে। নারী নির্যাতন মানবাধিকার লঙ্ঘন। নারী-পুরুষের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ তখন নিশ্চয় আমরা আশ্বস্ত হই। আমরা রোকেয়ার সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারায় আকৃষ্ট না হয়ে পারি না। রোকেয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী বা সার্টিফিকেট ছিল না, তিনি ছিলেন স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত একজন আধুনিক ব্যক্তিত্ব, যার আলোকছ্টায় তার সময়কে বিদ্যুতের মত চমকিত করেছেন এবং আজ আমাদের সময়কেও আলোকিত করে রেখেছেন। রোকেয়ার চিন্তাধারার শক্তিমত্তা তার প্রতিভাকে বিকশিত হতে শুধু সাহায্য করেনি, নারীর স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে রোকেয়া মানস আমাদের আরও বেশি করে সাহস যোগায়। তার উপন্যাসে নায়িকার কণ্ঠে যখন উচ্চারিত হয়, “আমি আজীবন… নারীজাতির কল্যাণ সাধনের চেষ্টা করিব এবং অবরোধ-প্রথার মূলোচ্ছেদ করিব।” (পদ্মরাগ) তখন নিশ্চয় আমরা দাবি করতে পারি রোকেয়া আমাদের মনে ও মননে সর্বদাই ধ্রুবতারার মতো জ্বলবেন। আমাদের সামনে তিনি এক আলোকবর্তিকা। (সম্পূর্ণ…)

পদ্মার চরে, ঘুড়ি উৎসবে

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ৪ december ২০০৯ ১২:২৯ অপরাহ্ন

wali_1.jpg
চরে, পদ্মা রিসোর্টের ব্যালকনি। সামনে পদ্মা।

মার্চের শেষ। বিষ্যুৎবার বিকেল। সারাদিন খবর লেখার কাজ করে ক্লান্তিতে যখন ঘুম আসছে, তখন শুনি বিডিনিউজ ইন্টারন্যাশন্যালের তপু বুলবুলকে বলছে, তাহলে কাল আমাদের পদ্মায় যাওয়া হচ্ছে তো? আমি তো যাচ্ছি, বুলবুল আমার দিকে তাকাল, একটা দিন একটু নড়েচড়ে ঘুরে ফিরে আসিগে। ওয়ালি ভাই, যাবেন নাকি? তপুর আহবান এবার আমার দিকে ভেসে এল। দেখি রাশিদাকে বলে, যদি স্বাধীনতা দিবসের ছুটি আমি আগাম কাটিয়ে আসতে পারি। রাশিদা আমার প্রস্তাবে সানন্দ সম্মতি দিল। বাড়িতে ফোন করে রুবিকে বললাম। কাল যাচ্ছি পদ্মায় বেড়াতে আর কে যাবে, জেনে জানাও, তপুকে জানাতে হবে। মিনিট দশেকে আমাদের আটজনের একটা নতুন গ্রুপ দাঁড়িয়ে গেল।

তপু অফিস ছাড়ার আগে বলে গেল, রাতে ফোন করে সব বিশদ জানাবে। সন্ধে থেকে ওকে ছবির হাটে গানের আসরে পাওয়া যাবে। আমি অফিস থেকে সাড়ে চারটে নাগাদ বেরিয়ে ট্যাক্সি ধরে শেরাটনের আঙিনায় ইউনিসেফ অফিসে গেলাম। ওখানকার কাজ সেরে বেরিয়ে একবার ভাবলাম, ছবির হাটের দিকে যাই। কিন্তু এই রোদ্দুরে কি আড্ডা-গান জমবে এক্ষুনি? মনে হয় না। অতএব বাড়ি ফেরাই সমীচীন মনে হল।

padma_2.jpg
শিশুরা পদ্মার চরে আনন্দে দিশেহারা

রাতে ‘বার্বিকিউ কুয়াকাটা সৈকতে’ লিখতে লিখতে ফোন পেলাম। ওয়ালি ভাই, তপুর কণ্ঠ ভেসে এল বাউল গানের ফাঁকে ফাঁকে, আমাদের যাত্রারম্ভের সময়ে একটু রদবদল হয়েছে। ১০টার পরিবর্তে আমরা ছবির হাট থেকে ন’টায় রওনা হয়ে যাব। তাহলে লৌহজং পৌঁছে হাতে অনেক সময় পাওয়া যাবে। কেমন? ঠিকাছে, আমি বলি, আমার শ্যালিকা সোমাও এইমাত্র কনফার্ম করল, ওরা যাবে। অতএব, আমরা সেই আটজন ঠিক রইলাম। সুচিত্রা বলেছে, তপু আবার জানালো, ওয়ালি ভাই-ভাবি গেলে আমিও যাব। আমাকে ফেলে যেও না তপু। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com