পঞ্চাশতম জন্মদিনে শুভেচ্ছা
মাসুদ খানের সঙ্গে আলাপ, ১৯৯৩

| ২৯ মে ২০০৯ ৫:০৫ অপরাহ্ন

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাজ্জাদ শরিফব্রাত্য রাইসু

centre-island-toronto.jpg
মাসুদ খান (জন্ম. জয়পুরহাট ২৯/৫/১৯৫৯), কানাডার টরন্টোর সেন্টার আইল্যান্ডে; ছবি: শরীফ উদ্দিন

[বাংলা ভাষার এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন মাসুদ খান। নিজের ও তাঁর অনুসারীদের জন্য মৃদু ও বুদ্ধিদীপ্ত একটি কবিতার ধারা নির্মাণ করে নিয়েছেন তিনি। বাংলা কবিতায় এখন কিছু শব্দ ও শব্দবন্ধের ব্যবহার একান্তই মাসুদ খানের পরিচয়ে পরিচিত হয়ে গেছে। আজ ছিল এই কবির পঞ্চাশতম জন্মদিন। সে উপলক্ষে মাসুদ খানের দেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি আর্টস-এ প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকারে, ভেতরে ভেতরে কবির আগে লেখা কিছু প্রাসঙ্গিক কবিতা উপস্থাপিত হলো। উল্লেখ্য এ পর্যন্ত তাঁর তিনটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে: পাখিতীর্থদিনে (নদী, ১৯৯৩); নদীকূলে করি বাস (একুশে, ২০০১); সরাইখানা ও হারানো মানুষ (একুশে, ২০০৬)। কবি মাসুদ খান বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে প্রবাস জীবন যাপন করছেন। সাক্ষাৎকারের শুরুতে থাকছে ব্রাত্য রাইসুর ভূমিকা—‘বগুড়ায় মাসুদ খান’। —বি. স.]

বগুড়ায় মাসুদ খান / ব্রাত্য রাইসু

বগুড়াদেশের কবি আন্ওয়ার আহমদ মইরা যাওয়ার আগে বহু দিন বগুড়ায় আস্তানাগাড়া কবি মাসুদ খানের পিছে লাইগা ছিলেন। সম্ভবত তরুণ কবিদের দখলদারিত্ব নিয়া ক্যাচাল। আন্ওয়ার আহমদের স্নেহভুক্ত তরুণ কবিরা তখন ধীরে মাসুদ খানের কূলে ভিড়তে শুরু করছেন। মাসুদ ভাই তাঁর বগুড়াদশায় বহু তরুণ কবিরে শিক্ষিত করার দায়িত্ব নিছিলেন। (এইটা এখনো তাঁর আছে আশা রাখি। হয়তো কানাডায় বইসা ইন্টারনেটে কোনো তরুণ কবিরে কবিতা কেমনে কেমনে ভালো লাগাইতে হয়, কার কার কবিতা

—————————————————————–
কবিতা লিখে—বা লিখতে গিয়ে—যে-আনন্দ আমি পাই ওটাই সর্বপ্রথম বিবেচ্য।… কবিতা লিখি—লিখে প্রকাশ করার চেয়ে নিজেই বারবার পড়ি—যে, এর ভিতরে কী লিখলাম! মাঝে মাঝে কোনো কোনো অংশ পড়ে আমার নিজেরই রোম শিহরিত হয়—লজ্জার কথা, তবুও হয়। নিজে নিজে পড়ি। পরিমার্জনা করি। পরিমার্জনাগুলি করতে ইচ্ছা করে। এখানে এরকম হলে আরেকটু ভাল্লাগতো…নিজে নিজেই। কাউকে টার্গেট করে…মনেই হয় না। অনেক সময়ই বাইরে প্রকাশ করতে ইচ্ছা করে না।

—————————————————————-
ভালো লাগতে হবে তার টিপস দিতেছেন তিনি, এমন ভাবতে মন চায়।)

বগুড়ায় তখনকার সাহিত্য কর্মকাণ্ডে তাঁর প্রভাব গুরুতর। অন্যদিকে জন্মভূমি বগুড়ায় আপন ক্ষমতা হারাইতে আছেন আন্ওয়ার আহমদ। যে কারণে মাসুদ ভাইয়ের উপরে নিরতিশয় ক্রুদ্ধ আছিলেন তিনি। পোষ্য লেখকগো দিয়া মাসুদ ভাইরে নিয়া অসম্মানজনক কথা লেখাইতেছেন তাঁর ছোট কাগজে। মাসুদ ভাই সেসবে কান না দিয়া সরকারি চাকুরির পাশাপাশি সবেগে সাহিত্য চর্চা করতেছেন। আমরা রাজধানী থিকা তার দাওয়াতে বগুড়ার মাটি পাড়াইতে যাই। (কবি আদিত্য কবির তো একবার আমগো লগে খালি পায়েই বগুড়ার মাটি মায় পাকা রাস্তা বাড়িঘর সব পাড়াইয়া দিয়া আসলো!) বগুড়ার সাহিত্য সম্প্রদায় আমাদেরকে ভালোবাসা সহই বরণ করতো। তো বিবিধি সাহিত্য উছিলায় আমাদের বগুড়াগমন ঘটতো। এই রকমই এক ভ্রমণে আমি আর সাজ্জাদ ভাই গিয়া পৌঁছাইলাম মাসুদ ভাইয়ের বৃন্দাবনপাড়ার সরকারি কলোনিতে। তিন তলায় উনি থাকতেন। যেদিন যাই সেদিনই রাত্রিবেলা নিছিলাম সাক্ষাৎকারটা। আগেই ঠিক কইরা রাখছিলাম যে এম. কে.-র লগে একটা আলাপ রেকর্ড করমু। ওনার প্রস্তুতি আছিল না। সাজ্জাদ ভাইরেও বলি নাই আগে। ওনার ড্রইংরুমে মেঝের মইধ্যে তিনজনে বইসা ছোট মাইক্রো রেকর্ডারে কথা বলতেছিলাম। অল্প আলোয়। কত আগে! (সম্পূর্ণ…)

সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ৭)

চঞ্চল আশরাফ | ২৯ মে ২০০৯ ৫:০৬ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

ha_young.jpg
ষাটের শেষদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হুমায়ুন আজাদ

বইমেলা প্রিয় ছিল তাঁর; বছরের এই সময়টায় তাঁকে বেশি উৎফুল্ল দেখা যেত; সপ্তাহের প্রতিদিনই তিনি আসতেন বিকালে, থাকতেন মেলা শেষ হওয়া অব্দি; শুক্রবার দুপুরেই চলে আসতেন; প্রায়ই দেখা যেত অনুরাগী ও উৎসাহী কয়েকজন তাঁর সঙ্গেই হাঁটছে, তিনি আগামী প্রকাশনীর স্টলে বসলে সেখানে তাৎক্ষণিক ও সাময়িক আড্ডা জমে উঠেছে তাঁকে নিয়ে। ১৯৯৬-৯৭-র দিকে দেখেছি তাঁর পাশে বসে আছেন আকিমুন রহমান (কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক; হুমায়ুন আজাদের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি করেছেন); দু’জনেই কলা খাচ্ছেন। কলা তিনি পছন্দ করতেন খুব, আন্ওয়ার ভাইয়ের বাসায় গিয়ে সামান্য কথাবার্তার পর বলতেন, ‘আন্ওয়ার সাহেব, কলা আছে? কলা খাবো।’

তো, একদিন বইমেলায়, সেটা ২০০১ সালে সম্ভবত, দৈনিক আজকের কাগজ-এর (২০০৭-এ বন্ধ হয়ে গেছে পত্রিকাটি) সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদ আগামী প্রকাশনীর স্টলে গিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েই সেলসম্যানকে বললেন. ‘হুমায়ুন আজাদের যত বই বেরিয়েছে, সব প্যাকেট করুন। প্রতিটা দশ কপি করে দেবেন।’ একটার পর একটা বই জড়ো করছেন সেলসম্যান, হুমায়ুন আজাদ সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে তারপর তাকালেন ক্রেতার দিকে; তারপর সন্ধ্যারঞ্জিত পশ্চিমাকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ততক্ষণে মেলার সব আলো জ্বলে উঠেছে। চশমায় সেই আকাশ আর আলো তত বিপুল ছিল না; কেননা, নিজের বই বিক্রির আনন্দ তাঁর মুখে যে আভা ও রেখা তৈরি করেছিল, তা-ই দর্শনীয় হয়ে উঠেছিল। তিনি একটা সিগারেট ধরিয়ে খুব আয়েশি ভঙ্গিতে ধোঁয়া ছাড়লেন। মনে হয়েছিল, ধূমপান তাঁর উদ্দেশ্য নয়; উদ্দেশ্য কাজী শাহেদ আহমেদের উপস্থিতি অগ্রাহ্য করা। সেটা হয়ত তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। নইলে এটা তিনি বলতে পারতেন না যে, ‘ধূমপান পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।’ হুমায়ুন আজাদ গম্ভীর চেহারা ও স্বরে বললেন, ‘বাঙালির জ্ঞানভাণ্ড উপচে পড়ছে দেখছি!’

এক বার মেলা থেকে তাঁকে বের হতে দেখে পিছু নিলাম। আণবিক শক্তি কমিশনের সামনের দোকান থেকে সিগারেট কেনার মুহূর্তে একটা ছেলে এসে তাঁকে সালাম দিল। ততক্ষণে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছি আমি। সে যে বাঙলা বিভাগের ছাত্র, তা মোটামুটি বুঝতে পারা গেল তখন, তিনি যখন বললেন, ‘সালাম পেলে আমি খুশি হতে পারি না। কারণ, আমার খালি মনে হয়, বাঙালিকে পাকিস্তান যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবেই আছে এখনও।’ ছেলেটি দু’হাত জোড় করে বিব্রত ও লাজুক চেহারায় সামান্য হাসল। আমি বললাম, ‘স্যার, মানুষ এই সংস্কৃতি কিন্তু গ্রহণ করেছে। সেটা পাকিস্তান চেয়েছিল বলে নয়, নিজেদের মুসলমান ভাবে বলে।’ (সম্পূর্ণ…)

নজরুল:
রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের পারস্পরিকতায়

আবদুল মান্নান সৈয়দ | ২৫ মে ২০০৯ ১:২৬ অপরাহ্ন

nazrul_family-2.jpg
প্রথম ছেলে বুলবুল কোলে নজরুল। নিচে বসে আছেন স্ত্রী প্রমীলা দেবী ও শাশুড়ি গিরিবালা দেবী। পেছনে বুলবুলের ধাত্রী।

সাকি,
কোথায় তোমার চিঠি? এদিকে তোমার বান্ধবীর চিঠির তোড়ে আমি তো প্রায় ভেসেই যাচ্ছি। রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লেখায় না-হারিয়ে ছাড়বে না মনে হচ্ছে। আমিও ছাড়বার পাত্র নই। তুমি জানো কিনা জানি না, রবীন্দ্রনাথ এন্ডরুজ সাহেবকে একবার সাহেব মহোদয় বিদেশ থেকে ফিরলে একতাড়া চিঠি তাঁর হাতে অর্পণ করেন। আমিও সেই আদর্শে তোমার উদ্দেশে এই চিঠি লেখা শুরু করলাম। রবীন্দ্রনাথের মতো অবসর নেই তো আমার—ফলে একগোছা পত্র রচনা করতে একটু সময় নেবে হয়তো। কিন্তু রবীন্দ্রাদর্শ ভুলছি না। বলতে পারো, এই চিঠি তার শুভসূচনা।

আজকে তোমার সঙ্গে নজরুল নিয়ে একটু গল্প করি।—নজরুলের সঙ্গে অগ্রজ শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ আর পরবর্তী শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দের সম্পর্কের দ্বন্দ্বসমাস। ওটা অনিবার্য। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের কালে আমি থাকলে নিশ্চিতভাবে তাঁদের সঙ্গে আমার ভালো-মন্দ সম্পর্কের একটা গাঁটছড়া পড়তই। আমার আকঙ্ক্ষক্ষা নীরবতা। কিন্তু আমার বিধিলিপি একেবারে উল্টোটা।

থাকগে, মূল প্রসঙ্গে আসি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) থেকে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯ – স্তব্ধতা ১৯৪২ – ১৯৭৬) আর জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বয়সে বছর চল্লিশের ছোট। রবীন্দ্রনাথের বড় ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নজরুল এবং জীবনানন্দের চেয়ে বছর দশেকের ছোট।

বিশের ও ত্রিশের দশকে এই তিন কবিই একসঙ্গে কাজ করেছেন। সেদিক থেকে বয়েসের দুস্তর ফারাকে কোনো আসে যায় না। একদিক থেকে তাঁরা তিনজনই সমসাময়িক। দূরবর্তিতাও একেবারে বিস্মৃত হয়ো না। রবীন্দ্রনাথের প্রথম কবিতাগ্রন্থ কবিকাহিনী বেরিয়েছিল ১৮৭৮ সালে; নজরুলের প্রথম কবিতাগ্রন্থ অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে; আর জীবনানন্দের প্রথম কবিতাগ্রন্থ ঝরা পালক ১৯২৭ সালে। (সম্পূর্ণ…)

স্টিভেন মিলহসার-এর গল্প

বহির্জাগতিক আক্রমণ

শিবব্রত বর্মন | ২৫ মে ২০০৯ ১:১০ অপরাহ্ন

stevenmillhauser-2.jpgআমেরিকান ঔপন্যাসিক স্টিভেন মিলহসারের (Steven Millhauser) জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩ আগস্ট। তাঁর গল্প বলার ঢঙে অ্যাডগার অ্যালান পো এবং হোর্হে লুইস বোর্হেসের ছায়া অনেকে খুঁজে পান। ভ্লাদিমির নবোকভের ছাপও বেশ দৃষ্টিগ্রাহ্য। মার্টিন ড্রেসলার উপন্যাসের জন্য ১৯৯৭ সালে তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পান। ‘আইজেনহেইম দ্য ইলিউশনিস্ট’ নামে তাঁর একটি ছোটগল্প অবলম্বনে জনপ্রিয় হলিউডি চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে, যেটির নাম দ্য ইলিউশনিস্ট। ‘বহির্জাগতিক আক্রমণ’ গল্পটি নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনের ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সংখ্যা থেকে নেওয়া। মূল গল্পটির নাম ‘The Invasion From Outer Space’।

মূল : স্টিভেন মিলহসার
অনুবাদ : শিবব্রত বর্মন

আমরা প্রস্তুত ছিলাম শুরু থেকে, আমরা জানতাম কী করতে হবে, কেননা কত শত বার কী এ ঘটনা দেখিনি আমরা?—শহরের অনুগত অধিবাসীরা ব্যস্ত তাদের প্রাত্যহিক কাজে, অকস্মাৎ থামিয়ে দেয়া টিভি প্রোগ্রাম, ভিড়ের সবার আকাশের দিকে উঠে যাওয়া দৃষ্টি, একটা ছোট্ট মেয়ের বাতাসে তাক করা আঙুল, সকলের হাঁ করা মুখ, কুকুরের ঘেউ ঘেউ, থেমে যাওয়া যানবাহন, ফুটপাথে পড়ে যেতে থাকা শপিং ব্যাগ, আর ওই যে, আকাশে, ক্রমশ আরো কাছে আসছে… এইসব; ফলে, ঘটনাটা যখন সত্যি সত্যি ঘটে গেল—কেননা এটা অনিবার্য ছিল, আমরা জানতাম এটা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র—তখন আমাদের কৌতূহল আর আতঙ্কের মধ্যেও একপ্রকার অবিচল স্থিরতা অনুভব করলাম আমরা, পরিচয়ের কারণে যেরকম অবিচলতা তৈরি হয়, সেরকম; আমরা জানতাম আমাদের কী করতে বলা হবে, এরকম পরিস্থিতিতে। খবরটা ছড়ালো সকাল দশটার পর। টিভি উপস্থাপক-উপস্থাপিকাদের ঠিক সেরকমই দেখাচ্ছিল, যেমনটা দেখানোর কথা, তাদের মুখে একটা উদ্বেল ভাব, পরিপাটি চুল, উদগ্রীব কাঁধ, তারা আমাদের সতর্কবার্তা শোনাচ্ছে, আবার একই সঙ্গে এই আশ্বাসও দিচ্ছে যে, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে, কেননা তাদেরকেও এর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, এক অর্থে তারা এর জন্য অপেক্ষাই করে ছিল, এই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য। আকাশে একটা কিছু যে দেখা গেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু কী দেখা গেছে, নিশ্চিত নয়। মহাকাশে কিছু একটা শনাক্ত করা গেছে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সেটা অত্যন্ত দ্রুত বেগে আমাদের আবহমণ্ডলের দিকে ধেয়ে আসছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পেন্টাগন। আমাদের বলা হয়েছে শান্ত থাকতে, ঘর থেকে বের না হতে আর পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে। আমরা কেউ কেউ সঙ্গে সঙ্গে দপ্তর থেকে ছুটি নিয়ে দ্রুত বাসায় পরিবারের পানে ছুটেছি, বাকিরা টিভি, রেডিও, কম্পিউটারের সামনে বসে থেকেছে, আমরা সবাই সেল ফোনে কথা বলছিলাম। আমাদের জানালা দিয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম অন্যেরা তাদের নিজ নিজ জানালাপথে উপরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। যেভাবে শিশুরা অন্ধকারে ঝড়বজ্রের আওয়াজ শুনতে থাকে, সারাটা সকাল আমরা সেরকম অনুপুঙ্খে খবর শুনলাম। বাইরে মহাকাশে যা-ই থাক না কেন, তা তখনও অজ্ঞাত, বিজ্ঞানীরা সেটার প্রকৃতি শনাক্ত করতে পারেননি, সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ তখনও ঘটেনি। আমাদের কর্তব্য শুধু রেডিও-টিভি খোলা রাখা, উৎকর্ণ বসে থাকা আর কী ঘটে তার জন্য অপেক্ষা করা। (সম্পূর্ণ…)

রুখসানার হাসব্যান্ড

মাহবুব মোর্শেদ | ২৪ মে ২০০৯ ১০:৪৮ অপরাহ্ন

রুখসানার হাসব্যান্ড একটা অপদার্থ, গুড ফর নাথিং। সারাদিন বইসা বইসা ঘোড়ার ঘাস কাটে। ঘোড়া হইলো দুনিয়ার এক আজীব প্রাণী। এই প্রাণী কাটা ঘাস খায় না, একেবারে জীবন্ত দণ্ডায়মান ঘাস নিজ মুখে খায়াই নাকি ঘোড়ার সুখ। রুখসানার হাসব্যান্ড কোন দুনিয়ার ঘোড়ার জন্য বইসা বইসা ঘাস
—————————————————————–
শায়লা, শ্রাবণী বা রাবেয়া বলে, আপা আপনি পেটের কথা পেটে যে কেমনে রাখেন বুঝি না। আমরা যেমনে শেয়ার করি তেমন করে শেয়ার করলেও তো হালকা লাগে। রুখসানা কিছু বলে না। যে যে যার যার মতো কইরা রুখসানার বিবাহিত জীবন সম্পর্কে ভেবে নেয়। কেউ ভাবে, হয়তো স্বামী-স্ত্রীর ভাইবোন সম্পর্কে পৌঁছানোর মতো অবস্থায় রুখসানা এখনও পৌঁছায় নাই। হয়তো, অন্যসব ক্ষেত্রের মতো রুখসানার অকর্মা স্বামী দাম্পত্য জীবনেও কোনো অবদান রাখতে পারতেছে না।
—————————————————————-
কাটে এই বুঝা বড় কঠিন। অন্য কেউ তো দূরের কথা স্বয়ং রুখসানা পারভীনও বুইঝা উঠতে পারে না তার অকর্মা স্বামী করেটা কী? মানে দিনটা সে কেমনে কাটায়। একদিন বিকাল পাঁচটায় অফিস থেকে ফিরে রুখসানা দেখে নতুন এক আবিষ্কারের নেশায় তাঁর হাসব্যান্ড একেবারে উত্তেজিত হয়ে আছে। অবস্থা দেখে রুখসানা জিগায়, সমস্যা কী? রুখসানার হাসব্যান্ড বলে আজকে একটা অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করলাম। বলেন শুনি, বলে রুখসানা তার স্বামীর দিকে না তাকায়া কাঁধের ব্যাগটা টেবিলের গুছিয়ে রাখতে থাকে। লোকটা অদ্ভুত, সারাদিন বাসায় বইসা থাকলেও কখনো নিদেনপক্ষে এই টেবিলটা গোছানোর কথাও তার মাথায় আসে না। হাসব্যান্ড নিজের মতো করে বলতে থাকে, তুমি ঘোড়া প্রাণীটা ভাল কইরা খেয়াল কইরা দেখছো নিকি কুনোদিন? রুখসানা বলে, প্রাণীটার জন্য দিনমান ঘাস তো কাটেন আপনে। আমি খেয়াল কইরা কী করবো? হাসব্যান্ড একটু লাজুক হাসে। কয়, দেখছো কি না সেইটা কও। রুখসানা কিছু কয় না। তোয়ালা নিয়া বাথরুমে চলে যায়। হাতমুখ ধুয়ে তোয়ালা দিয়া অনেক্ষণ ধরে মুখ মুছে বারান্দায় আবার তোয়ালেটা ঝুলায়ে সোজা রান্না ঘরে গিয়া চায়ের পানি চাপায়া আসে। পানি চাপায়া হাসব্যান্ডের সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে, নিজে থেকে এক কাপ চা-ও তো করে খান না? হাত ব্যথা করে? হাসব্যান্ড তখন ঘোড়া সম্পর্কে নতুন একটা আবিষ্কারের আনন্দে বিভোর। রুখসানার খোঁটা তার গায়ে লাগে না। আবিষ্কারের আনন্দে বিভোর না হইলেই যে তার গায়ে কথাটা গিয়া কাঁটার মতো বিঁধতো সেরকমও না ঘটনা। এমনিতেই রুখসানার কোনো কথা তার গায়ে লাগে না। (সম্পূর্ণ…)

রৌরব (কিস্তি ১০)

লীসা গাজী | ১৯ মে ২০০৯ ১২:০৯ পূর্বাহ্ন

কিস্তি ১কিস্তি ২কিস্তি ৩কিস্তি ৪কিস্তি ৫কিস্তি ৬কিস্তি ৭কিস্তি ৮কিস্তি ৯

(কিস্তি ৯-এর পর)

leesa-10-b.jpgফরিদা টের পেলেন গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আছে, ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছে। গলা পরিষ্কার করতে চেষ্টা করলেন একবার—দ্বিতীয়বার গলা খাকারি দেয়ার শব্দে মুখলেস সাহেব চোখ মেলে তাকালেন। ফরিদাকে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্কুলের ছাত্রের মতো প্রায় এ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়তে চেষ্টা করলেন। যেন না দাঁড়ালে কড়া হেড মিস্ট্রেস তাকে এক্ষুনি নিল-ডাউন করিয়ে রাখবে। কিন্তু শরীর তাকে সেই অনুমতি দিলো না। তাই কেমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন।

—চা খাইবা?

মুখলেস সাহেবের ঘুমের ঘোর তখনও কাটে নাই। চোখ কচলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
—————————————————————–
অন্ধকারেই ড্রেসিং টেবিলের প্রথম ড্রয়ার খুলে তার ভিতরের রাজ্যের জঞ্জালের নিচে ছুরিটা আপাতত লুকিয়ে রাখলো। এখন সবচেয়ে নিরাপদ কাজ নামাযে দাঁড়িয়ে যাওয়া। কে যেন কবে বলেছিলো অন্ধকারে নামায পড়া যায় না—কে আর বলবে ফরিদাই বলেছিলেন সম্ভবত, কথাটা মনে পড়তে দোটানায় পড়ে গেলো লাভলি। শেষমেশ আলো জ্বালিয়ে নামাযের জায়গায় দাঁড়ালো। যা হবার হবে, মেরে তো আর ফেলতে পারবে না। মেরে ফেললে অবশ্য এর চেয়ে ভালো ছিল।
—————————————————————-
—চা খাইবা না কি?

—হ্যাঁ খাবো। লাভলি আসছে?

আচমকা ঘুম ভাঙার জন্যই বোধহয় মুখলেস সাহেব তার যাবতীয় বোধ-বুদ্ধি খুইয়েছেন। নইলে জ্ঞানত তিনি কখনও উস্কানিমূলক প্রশ্ন করেন না। ফরিদা প্রশ্নের আশ্চর্যরকম শান্ত উত্তর দিলেন। নিজের শান্ত গলার আওয়াজ শুনে খুব সন্তুষ্ট হলেন—“ না, এখনও আসে নাই। আসবে সময় মতো।” (সম্পূর্ণ…)

সাংস্কৃতিক মানচিত্রে মিরপুর

মফিদুল হক | ৭ মে ২০০৯ ৫:৫৩ পূর্বাহ্ন

এক.
মুক্তির সঙ্গে জড়িত থাকে আনন্দ, অমারাত্রির অবসানে আলোয় স্নাত হওয়ায় তৃপ্তি কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের যে সমাপন বিজয়ে, সেখানে মুক্তির আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচ্ছেদের অপার বেদনা। যে কোনো জয়ের পেছনে তো রয়ে যায় অনেক ত্যাগ ও তিতিক্ষা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসানে
—————————————————————–
এক গভীর বেদনার অধ্যায় রচিত হয়েছিল মিরপুরে, ঢাকার যে উপকণ্ঠে অস্ত্রের পাহাড় গড়ে এক অর্থহীন ও নিষ্ঠুর লড়াই চালিয়েছিল পাকবহিনীর কতিপয় সদস্য মূলত তাদের অবাঙালি দোসরদের ওপর নির্ভর করে।… এই মরণদংশন প্রকাশ পেয়েছে বুদ্ধিজীবী হত্যায়, প্রকাশ পেয়েছে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মিরপুরে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা পাকাবাহিনীর দোসরদের নির্মমতায়, যাদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল জহির রায়হান, ডিএসপি লোদী, লেফটেন্যান্ট সেলিমসহ আরো অনেককে। অথচ মিরপুরের অবাঙালি প্রতিরোধের কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল না, আত্মসমর্পণ না করে তাদের কোনো উপায় ছিল না।
—————————————————————-
মানুষ যখন পেল মুক্তির আস্বাদ, সেই আনন্দ-মুহূর্তে তো বিপুল মূল্যদানের স্মৃতিও বড়ভাবে আবার জেগে ওঠে। যুদ্ধের সমাপ্তি-লগ্নে আবিষ্কৃত হয়েছিল mirpur-slaughter-ground.jpg……
১৯৭১ সালে মিরপর বধ্যভূমি
…….
কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে হাজারো মানুষকে হত্যা করার প্রায় এক ইণ্ডাস্ট্রিয়াল মেথড, মানুষের নিষ্ঠুরতা ও পাশবিকতার অতলস্পর্শী পতন। তবুও বিজয়ের আনন্দ ও মাহাত্ম্য তা কোনোভাবে খর্ব করতে পারে না, কেননা সেই বিজয় ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের, দানবের বিরুদ্ধে মানবের। কিন্তু বাংলাদেশের বিজয়ের সঙ্গে বেদনার যে মিশেল তার নিকট তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। একাত্তরের নয় মাস জুড়ে জাতিহত্যার যে যজ্ঞ পরিচালনা করেছিল পাকবাহিনী, সেটা তাদের কোনোভাবেই রক্ষা করতে পারে নি, বরং ঠেলে দিয়েছিল অমোঘ পরাজয়ের দিকে। (সম্পূর্ণ…)

শিবানি

ফরহাদ মজহার | ৫ মে ২০০৯ ১১:৪৪ অপরাহ্ন

শিবানি বন্দনা – ১

যখন কোনো আর্য নাই, অতএব অনার্য নাই। যখন কোনো আর্যের অধীন পরাধীনতা নাই, যখন মানুষ স্বাধীনতা শব্দ শেখে নি, স্বাধীনতার অর্থ জানে না, কারণ নিজের অধীন হয়ে থাকার কোনো অর্থ হয় না। যখন দেয়াল ছিল না, দেয়ালের লিখন ছিল না, যখন তুলি, তালপাতা, কালি কলম, বেদ, শাস্ত্র, ধর্মগ্রন্থ বিজ্ঞান বিদ্যা কিছুই ছিল না। যখন টেলিভিশান নাই কম্পিউটার নাই, বিজ্ঞাপন বিল বোর্ড কিছুই নাই—ইতিহাসের আগে বৃহৎ বাংলা যখন মেনকার কামে গিরিরাজের ঔরসে কেবলি খোয়াবে ও ঘামে হয়ে উঠছিল, শিবানি, আমি সেই অবিস্মরণীয় স্বপ্নের বন্দনা করি।

যখন কোথাও কোনো ভেদ নাই ভেদবুদ্ধি নাই কোথাও কোন দাগ চিহ্ন পার্থক্যরেখা নাই, জাত পাতের ভেদ নাই স্তর নাই শ্রেণী নাই, কিন্তু ভৃঙ্গরূপে জগতে আছেন শুধু অনাদির আদি সেই অদ্বিতীয় ‘পুরুষ’—আর ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকলেই যাঁর দাসী—সেই দাসসমাজে কেউ কোথাও আর্যেতর জ্ঞানে অপরকে ‘অনার্য’ বলে ডাকবার দুঃসাহস করে নি, শিবানি, আমি সেই অবিভাজ্য বর্তমানের বন্দনা করি।

ঠিক। আমি মাথা তুলেছি হিমালয়ে, পলিতে কাদায় তোমার লজ্জা হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছি সমতলে, কিন্তু বঙ্গোপসাগরে আমিই সেই নুনের ভাণ্ড—ধরে রেখেছি পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র; ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না হয়ে যে কুলকুণ্ডলিনী ধারা তোমার ভূগোলে মিলিত হয়েছে, শিবানি, আমি সেই ত্রিবেণীর বন্দনা করি।

যখন দেশ নাই কাল নাই পাত্র নাই, দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ কিছুই নাই, যখন পরিমাণ বা গুণ সকলি অবিকশিত, নিঃশব্দে সেই অপূর্ব বিন্দুর মধ্যে শব্দ হয়ে ছিলাম আমি শিবানি—আমিই সেই শুক্রবীজ, দেকার্তের বাবা, জ্যামিতির আদি: —কারণ-পদার্থ সেই বিন্দুর আমি বন্দনা করি।

যখন আমি বনবাসী, বনের মধ্যে বাঘ, ভল্লুক আর সিংহের বৃত্তের মধ্যে তৃণভোজী বুনো মোষ, হরিণ কিম্বা হনুমান, যখন খাদ্য ও খাদকের মধ্যে আমার বয়স বাড়ছে, কাটছে আমার দিন, যখন আমি সংগ্রহ করছি সবুজ ও মধুর চাক আর পরস্পরের শরীরে আমরা চাষ করে চলেছি বিশ্বনিখিল; কিম্বা যখন আমি সবে মাত্র শবর কিম্বা ব্যাধ, কাঁধে আমার ধনুক আর তীর—কুড়িয়ে শিকার করে খেয়ে দেয়ে কাটছে প্রকৃতির অক্ষরেখায় প্রাকৃতিক আমার দিন: যখন হয়ে উঠছিলাম কাঠের লাঙল, বোকা বদল আর কৃষকের হুট হাট, তারও আগে তারও বহু কোটি আলোকবর্ষ আগে আমি ছিলাম বাতাসের খুশি, নক্ষত্রের গতি আর বৃক্ষের ফটোসিনথেসিস। সূর্যের আগুন ধারণ করে যিনি সবুজ কিম্বা প্রকৃতি, শিবানি, আমি সেই আলোক সংশ্লেষণের বন্দনা করি। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com