সরল রেখা

শামীমা বিনতে রহমান | ৩০ মার্চ ২০০৯ ৬:২৯ অপরাহ্ন

আইসক্রিমটা খাওয়ার পর মনে হলো, মাথায় ছোট ছোট দুইটা চ্যাপ্টা পা দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আটকে থাকা এক ঝাঁক চড়ুই ঠাস করে উড়া শুরু করলো। তিরু সামনে তাকালো। সামনে মোজাইকের ফ্লোরের ওপর একটা আলোর রম্বস। জানালা কাম ভেন্টিলেটর দিয়ে ঢুকে পড়া এই রম্বসাকৃতির সুরুজ বাতির বিকিরণটা তিরুর অনেক ভাল্লাগে। এই সময়টায়, মানে যখন সে সারাদিন বাসায় থাকে, সেই দিনের দুপুর সাড়ে তিনটার রোদ—তাকে আপ্লুত করে ফেলে। সে মাঝে-মধ্যে ডিভাইডার আর ফতুয়া খুলে সেই রম্বসের মধ্যে শুয়ে থাকে। আড় কাত হয়ে আর দেখতে আরো ভাল্লাগে তার বুকের পার ঘেঁষে, ক্রমশ নিচের দিকের শরীর, শরীরের কার্ভ লাইনে আলোর খেলা, একেবারে ছোট ছোট লোম জুড়ে আলোর বয়ে চলা। যেন করাতের খাঁজের ওপর দিয়া হেঁটে চলা একটা যুবক।

কোথায় প্রথম দেখা হয়েছিল মিতির সাথে? ইয়াপ! মনে পড়ছে। ডিপার্টমেন্টের পিকনিক প্রোগ্রামে মিতি ছিলো কার যেন গেস্ট। ওটা মনে নাই। কিন্তু বাস থেকে নেমে কুমিল্লা বার্ড এর প্রত্নতাত্ত্বিক অলিতে গলিতে ঘোরার সময় সে ফস করে একটা সিগারেট ধরায়। ওর ধরানোর মধ্যে একটা দারুণ ছেলে-ছেলে ব্যাপার ছিল, মানে মেয়েরা এরকম করে না সাধারণতঃ। কিন্তু ছেলেরা সাধারণতঃ যা করে, ও সেটা সেরকম সাধারণতঃ না কিন্তু অভিনবত্ব ফলায়ে করছে। তো মিতিকে ভাল্লাগবে না তো কারে ভাল্লাগবে? তিরু আবার রম্বস-শরীরের দিকে তাকালো। আজকে তার বাসায় থাকবার কথা না, কারণ আজকে তার রাশান কালচারাল সেন্টারে রবী বাবুর রাজা দেখতে যাবার কথা ছিল, সেখানে তওফিকের আসার কথা। নাটক শুরু হবার আগের দুই ঘণ্টা আড্ডা, কিছু চড়ুই চুমু হবার বিস্তর সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই তার কেমন কেমন, ভাল্লাগেনা-ভাল্লাগেনা-ভাল্লাগেনা ফিলিং হইতেছিল। সে মোবাইল ফোন বন্ধ করে শুয়ে আছে। বাসায় এখন কেউ নাই। আজকে কারোই ডে অফ না। অফিসটা তিরুর দমবন্ধ লাগে। একদমই এনজয় করে না। এত ডিসিপ্লিন, এত মন খারাপ করা ডিপ্লোম্যাসি সহ্য করতে হয়! হাসি না আসলেও হাসতে হবে। বসদের ভালগার ম্যানারে, অধিক বোল্ডনেস দেখানো নারী সহকর্মীর পাশে দাঁড়ায়া তার মতো মেনে নেয়া হাসির সহযাত্রী হতে হয়। এসব কিছুই ভাল্লাগেনা মানতে তিরুর।

তিরুর আসলে কী ভাল্লাগে? এইটা খুব জটিল খুঁজে বের করা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভাল্লাগেনা শব্দটা শুনতে হয় তার রুমমেট আর বন্ধুদের। পল্লব বলছিল, তুই ভয়ানক নৈরাজ্যবাদী। তুই এনার্কিস্টদের মতো ভয়ানক এক্সট্রিমিস্ট মাঝে-মইদ্যে। স্ট্যাবলিশমেন্টের সাথে এডজাস্ট করা কিন্তু কোয়ালিটি। প্রফেশনে ভালো করতে চাইলে, এইটা তোমারে এডাপ্ট করতেই হবে। না চাইলে অন্য কথা। (সম্পূর্ণ…)

বেযোগাযোগ: কী ফারাক বন্ধু কিংবা প্রতিবন্ধুতে?

মানস চৌধুরী | ২৯ মার্চ ২০০৯ ১২:৪১ পূর্বাহ্ন

প্রথম উপলব্ধি দ্বিতীয় মৃত্যুর পর!
বিপুল যখন মারা যায় তখন আমি পাঁচের কাছাকাছি। বড়দের কাছে শুনেছি ও গোদ রোগে মারা গেছিল। কেউ একজন মরে গেলে তার বা আশপাশের মানুষের কী হয় সে বিষয়ে বাস্তবে কোনোরকম ভাবনা গড়ে ওঠেনি।
—————————————————————–
অসতর্ক থাকলেই মনে হতে পারে বার্ধক্য নৈঃসঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। তা তো নয়। নিরন্তর সঙ্গপিপাসু মানুষ সঙ্গপিপাসার ভাষা হাতড়াতে থাকেন। আর পান না। আবার ভাষা যখন পান, তখন ভাষা বিনিময়ের কোথাও কোনো সুড়ঙ্গ থাকে না। তারপর কেবল খাবারের একটা পোঁটলা হাতে ‘গৃহে’ ফেরেন মানুষ। ‘গৃহ’—যেখানে মানুষে ঘুমায়, যেখানে ঘুম থেকে উঠে সকালের আলো দেখে। এই সংজ্ঞাতেই কেবল সকলের গৃহ থাকে, এমন একটা পরিসর যেখানে মানুষ ‘ফিরতে’ পারেন।
—————————————————————-
মানুষজনের থমথমে মুখ দেখেছি। তাছাড়া পরে বিপুলকে আর দেখতে পাইনি কখনো। শোক বলে যে অনুভূতিমালার কথা বলা হয়ে থাকে সেই অনুভূতির কিছুমাত্র আমার ছিল বলে মনে করতে পারি না। বরং ছিল বিহ্বলতা। সেই বিহ্বলতার খানিকটা নিশ্চয় পরের দিনগুলোতে বিপুলকে আর দেখতে না পাবার কারণে, কিন্তু আমি প্রায় নিশ্চিত সেটা এই কারণেও যে একটা সঠিক অনুভূতির জন্য হাতড়াচ্ছিলাম। হাতড়ানিকে বিহ্বলতা ছাড়া আর কী নামে ডাকা যায়! গভীরভাবে ভাবতে বসলে আমার এমনকি, ইদানীং, এও মনে হয় যে অন্যের মৃত্যুর পর কী কী ধরনের বহিঃপ্রকাশ থাকতে হয় সেটার একটা শক্তপোক্ত বিধিমালা আছে চারপাশে। হতে পারে বিপুলের মারা-যাওয়ার অভিজ্ঞতা, আনকোরা বলে, কোনো বিধিনিষেধ শিখে না-উঠবার বিহ্বলতায় পড়েছে। হতে পারে।

কিন্তু যখন কায়েদুরের ছোটবোন তিনদিনের জ্বরেই মারা গেল তখন এই বিচ্ছেদের অর্থ মালুম করতে আমার বেশি কসরৎ করতে হয়নি। (সম্পূর্ণ…)

মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র

আহমাদ মাযহার | ২৭ মার্চ ২০০৯ ১২:৪৭ অপরাহ্ন

উনিশ শো একাত্তর সালে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ যে বাঙালির সমগ্র জনজীবনে গভীর ছাপ রেখে যাবে সে-কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। সঙ্গত কারণেই বাঙালির জাতীয় জীবনে সৃষ্টিশীলতার আবেগমাত্রই মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার অভিঘাতে হয়েছে প্রবল ভাবে উজ্জীবিত। সৃষ্টিশীল
—————————————————————–
সামগ্রিক ভাবে মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলোর দিতে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে, ছবিগুলো নির্মিত হয়েছিল প্রধানত মধ্যবিত্ত জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ গ্রামে বাস করলেও এবং মুক্তিযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষার কারণ ও প্রেরণার সূত্র থাকলেও তার যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে নেই।
—————————————————————-
শিল্পমাধ্যম হিসাবে চলচ্চিত্রের ওপরও এর প্রতিক্রিয়া নিশ্চয়ই প্রত্যাশিত। সুতরাং স্বাধীনতার অব্যবহিত উত্তর কালে বাংলাদেশে নির্মিত চলচ্চিত্রে যে মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব পড়বে এই আশা ছিল খুবই স্বাভাবিক। বিধ্বস্ত দেশের বিঘ্নিত অর্থনীতির কারণে স্বাধীনতার অব্যবহিত উত্তরকালে অর্থ বিনিয়োগ ছিল দুরূহ। কারণ বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত না আসবার নানা বাস্তব প্রতিকূলতা ছিল প্রবল। তা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে স্বল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। (সম্পূর্ণ…)

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি: ছত্রপুর, ময়মনসিংহ

শামসুজ্জামান খান | ২৬ মার্চ ২০০৯ ১:৪৭ পূর্বাহ্ন

bangladesh-mukti-bahini.jpg
বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী

১৯৭১-এর পঁচিশে মার্চের বিকেল বেলায় আমরা জমায়েত হয়েছিলাম ময়মনসিংহস্থ পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ দিকের লাগোয়া ছত্রপুর গ্রামে। উদ্যোগটি ছিলো ‘ময়মনসিংহ বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম শিবির’-এর। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মর্মানুযায়ী গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে সহজ সরল ভাষায় আমাদের মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বিষয়টা তুলে ধরার জন্যই ছিলো ওই আয়োজন।

সারা পূর্ব বাংলা তখন উদ্বেগ, উত্তেজনা আর গণবিপ্লবের প্রচণ্ড আলোড়নে কাঁপছে। মানুষ জানতে চায়, কী করতে হবে সেটা বুঝে নিতে চায়। তাই একদিক থেকে প্রবল আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসা, আর অন্য দিক থেকে কার্যকর যোগাযোগের জন্য গণমুখী ভাষার জোগান, জানা বোঝার একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। ওই সভায় আমাদের বন্ধু বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী যতীন সরকার, যিনি এখন অধ্যাপক ও সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিমান, দেহাতি ভাষার সঙ্গে আবেগের বারুদ মিশিয়ে বলেছিলেন:

“‘মারশিয়াল-ল’ মানে হইলো শিয়াল কুকুরের মত মানুষ মারণের আইন। ওই যে বলছে ‘মারশিয়াল-ল’ ওই কথা দিয়া মিলিটারির বড় সাবরা সিপাইগো বুঝাইছে: যখন তারার অর্ডারে মানুষ মারতো, তখন মনে করবো মানুষ মারতাছে না, শিয়াল — আমরার ভাষায়, ‘হিয়াল’ মারতাছে। ভাইসব, বঙ্গবন্ধুর কথা মতো, যার যা আছে তাই লইয়া রুইখ্যা খাড়াইলে
পাকিস্তানি মিলিটারির আমরারে ওই বায় হিয়াল কুত্তার লাহান মারতারতো না।”

আমাদের মিটিং যখন শেষ হয়েছে ঢাকায় তখন শিয়াল-কুকুরের মতোই মানুষ মারার সব আয়োজন সম্পন্ন করছে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী। এবং গভীর রাতে শুরু হয়েছে ইতিহাসের সেই নিষ্ঠুরতম অভিযান। ২৬ শে মার্চ ছিলো সাপ্তাহিক ছুটির দিন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক এলাকার আমরা তখন যে যার মতো ঘরে বসে আয়েস করছি বা কোনো কাজ। কেউ কেউ বাজার করতে গেছেন শহরে। আগের রাতে ঢাকায় কী ঘটে গেছে তার কিছুই জানি না তখনো। এমনি সময় খবর এলো উপাচার্য কাজী ফজলুর রহিম তক্ষুনি সকল শিক্ষক, কর্মচারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথিশালার সামনে সমবেত হতে অনুরোধ জানিয়েছেন। (সম্পূর্ণ…)

সংযোজন

রৌরববাস, ২৫ মার্চ ১৯৭১

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ২৫ মার্চ ২০০৯ ১:১০ অপরাহ্ন

wali-2.jpg২৫ মার্চ, ১৯৭১। সকাল। গত ক’দিনে বাসায় যাওয়া হয়নি। কাপড়চোপড় মলিন হয়েছে বেশ। পকেটের রেস্ত তলানিতে। বাড়ি যাওয়ার তাগিদ আসছে ভেতর থেকেই। প্রাণ বাঁচানোর গরজে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙলাম। নিচে সবুজ লন, তিনদিকে ছাত্রাবাসের ঘরগুলো কেমন পরিত্যক্ত, বিরান মনে হয়। বেশ ক’টি ডিপার্টমেন্টের এম.এ ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তড়িঘড়ি অনেকেই সুটকেস-বিছানা গুটিয়ে গ্রামের বাড়িতে পাড়ি দিয়েছে। আমি যাইনি। আমাদের পরিবার ঢাকাবাসী। ঢাকার বাইরে যাওয়া মানেই কোথাও বেড়াতে যাওয়া।

wali-6.jpgপ্রাতঃকৃত্য সেরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকলাম। নাশতা দিতে বলে একা টেবিলে বসলাম। অন্য সময় হলে সকালের নাশতা পেতে সলিমাবাদের মতো লাইন দিতে হত। আজ সবশুদ্ধ মোটে ১০-১২ জনের গুঞ্জন সেখানে। হৈচৈ, চিৎকার কিচ্ছুটি নেই। কেমন সুনসান চারদিক। মন খারাপ হয়।

চা-খাবার খেয়ে হলের স্ট্যান্ড থেকে সাইকেল বের করে ধীরেসুস্থে চেপে বসি। কলাভবনের পেছনের লাল ইঁটের পথ পেরিয়ে ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির সামনে দাঁড়ালাম। নাঃ, সোজা শরীফ মিয়ায় যাবো। সাইকেল রাখলাম লাগোয়া পাবলিক লাইব্রেরির ফাঁকা একতলার স্ট্যান্ডে । (সম্পূর্ণ…)

এডওয়ার্ড সাঈদের সাথে সংলাপ / তারিক আলী

হোসেন মোফাজ্জল | ২৪ মার্চ ২০০৯ ১১:০৯ পূর্বাহ্ন

es_1.jpg
এডওয়ার্ড সাঈদ (জন্ম. জেরুসালেম ১/১১/১৯৩৫, মৃত্যু. নিউ ইয়র্ক সিটি ২৫/৯/২০০৩)

[এডওয়ার্ড সাঈদ (Edward Said) ছিলেন এ জমানার অন্যতম একজন সেলিব্রেটেড এবং প্রভাববিস্তারকারী পাবলিক বুদ্ধিজীবী। ২০ টির বেশি বই তিনি লিখেছেন যার বেশির ভাগই প্রায় ৩৬ ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে Orientalism(1979), Culture and Imperialism (1993) এবং Freud and the Non–European (2003) ইত্যাদি। তিনি ১৯৬৩ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরে সেখানে ইংরেজী এবং তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক হন ১৯৯২ সালে। প্যালেস্টাইন আন্দোলনের মুখপাত্র এবং সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেন। তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার যার মধ্যে রয়েছে ২০টি সম্মানসূচক ডক্টরেট।

tariq-ali2.jpg……..
তারিক আলী (জন্ম. লাহোর ২১/১০/১৯৪৩)
…….
তারিক আলী (Tariq Ali) লেখক, সমালোচক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। বিশ্ব ইতিহাস এবং রাজনীতি বিষয়ে তিনি ডজনখানেক বই লিখেছেন, পাশাপাশি মঞ্চ এবং চলচ্চিত্রের জন্য স্ক্রীপ্টও তৈরি করেছেন। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস Shadows of the Pomegranate Tree (Islam Quarter) কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, যা ১৯৯৪ সালে স্পেনে প্রকাশিত বিদেশী ভাষায় রচিত সবচে’ উল্লেখ্যযোগ্য বই হিসেবে Archbishop San Clementedel Instituto Rosalia de Castro পুরস্কার লাভ করে। তাঁর চতুর্থ উপন্যাস A sultan in Palermo প্রকাশিত হয় ভার্সো থেকে ২০০৫ সালে।

এডওয়ার্ড সাঈদের সাথে এই সংলাপটি ১৯৯৪ সালের জুন মাসের দিকে সাঈদের ন্যূইয়র্কের রিভারসাইড ড্রাইভ অ্যাপার্টমেন্টে ধারণ করা হয়। যা পরে A Conversation with Edward Said নামে বানদুং ফিল্ম প্রোডাকশনের পে ব্রিটেনের চ্যানেল ফোর টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। পরে ইউকে প্রকাশক Seagull books থেকে ২০০৬ সালে Conversations with Edward Said – Tariq Ali বইটি ছাপানো হয়। বর্তমান অনুবাদটি সেখান থেকে নেওয়া।

লেখাটি অনুবাদের আগে তারিক আলীর অনুমতি নেয়া হয়েছে গত বছরের মাঝামাঝিতে। কয়েকটি পর্বে লেখাটি শেষ করার ইচ্ছে রইল। – অনুবাদক]

অনুবাদ: হোসেন মোফাজ্জল

তারিক আলী: এডওয়ার্ড, আপনি যে অসুস্থ এটা পহেলা টের পেলেন কবে?

এডওয়ার্ড সাঈদ: একানব্বই-এর শুরুর দিকে। একটা রুটিন চেকআপ করাতে যেয়ে ধরা পড়ে আমার এধরনের লিউকেমিয়া রয়েছে।

সে সময় ডাক্তার কী বলেছিলেন?

edward-said-and-sister-1940.jpg…….
এডওয়ার্ড ও তার বোন, ১৯৪০ সালে, মিশরে।
……..
স্বাভাবিক ভাবেই তারা চেষ্টা করেন কোনো পাত্তা না দেবার, এবং বলেন আরে এটা কিছু না একটা ক্রনিক অবস্থা মাত্র, নামটা যত না ভারি মনে হচ্ছে ততটা সিরিয়াস হবার মতো তেমন কিছুই না। অবশ্য আমি বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম, তারপর আমি ছয় মাস ধরে মেলা ডাক্তারের কাছে ধর্না দেই। অসংখ্য টেস্ট করাই, কমবেশি করে হলেও ডায়গোনোসিসটা নিশ্চিত হতে চাই। হয় কী, সেই সময়টাতে আমি এসব নিয়েই বাঁচতে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। শেষমেশ যেয়ে একটা বেশ ভাল ডাক্তারের দেখা মেলে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটা, কারণ এটা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী একটা রোগ। যার আসলে কোনো প্রকারের সত্যিকারের নিরাময় নেই, অনেকটা ডায়েবেটিসের মত। আমার ডাক্তারটা ছিলেন চমৎকার। আমার কোনো চিকিৎসার দরকার পড়ে নি, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ছাড়া কোনো কেমোথেরাপির দরকার পড়ে নি। প্রায় বছর দু’ কি আড়াই ধরে এ রোগে থাকার পরে আমার কেমোর দরকার পড়ে।

কেমোথেরাপী দিলে অবস্থা কী দাঁড়ায়?

সাধারণত লোকজন যেমন বাজে মনে করে আসলে তেমনটা কিছু না, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুর্বল করে ফেলে। আমি খুবই কান্ত হয়ে পড়তাম। মাঝে মাঝে বমি বমি লাগত এটুকু বাদে আমি আমার সিডিউলের একটা তারিখও বাতিল করি নি এবং আমি আমার সিডিউলের তারিখ ঠিকমতই রেখেছি। অবশ্য এখন মনে হচ্ছে সব কমিয়ে আনতে হবে কারণ কেমোর কামড় ধরতে শুরু করেছে। (সম্পূর্ণ…)

রৌরব (কিস্তি ৭)

লীসা গাজী | ২১ মার্চ ২০০৯ ৪:২৮ অপরাহ্ন

কিস্তি ১কিস্তি ২কিস্তি ৩কিস্তি ৪কিস্তি ৫কিস্তি ৬

(কিস্তি ৬-এর পর)
leesa-7.jpg

এতো দুড়দাড় করে ওঠার পরও বিউটির উপস্থিতি ফরিদা টের পেলেন না। তিনি তখন কায়মনবাক্যে কাক তাড়াতে ব্যস্ত। এক সময় কাকটা ক্লান্ত হয়ে পাশের বাড়ির ছাদে গিয়ে বসলো কিন্তু ডাক থামালো না। এমন হঠাৎ রণে ভঙ্গ দেয়ায় ফরিদা বোকার মতো দাঁড়িয়ে পড়লেন, টের পেলেন ব্লাউজের ভিতরটা ভিজে চুপচুপা হয় গেছে। ছাদের রেলিং ধরে কিছুক্ষণ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলেন। বুকের ধড়ফড়ানি সহ্যের মধ্যে আসলে ধীরে ছাদ থেকে বেরিয়ে গেলেন। যদিও তার এক দৌড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করছিলো, তবুও দরজা ভিড়ালেন, চাবি লাগালেন তারপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন। কাকে দেখাবার জন্য যে তিনি নিজেকে শান্ত সমাহিত করবার চেষ্টা করলেন কে জানে। হয়তো নিজেকে দেখাবার জন্যই — মানসিক জোর এখনও বহাল আছে, এত সকালে তিনি মাথা নোয়াবেন না, এই তথ্য নিজেকে জানানো জরুরি ছিলো ।
—————————————————————–
মুখলেস সাহেব বিউটির কিছু ব্যবহার করলে চামড়ার নিচ পযন্ত চিড়বিড় করতে থাকে তার। অথচ চমৎকার অভিনয়ের কারণে বাড়ির কেউ ব্যাপারটা ধরতে পারে না। এই যেমন পেস্ট্রি যখন আনা হয়, তখন বিউটি তার ভাগের থেকে প্রায় অর্ধেকটা মুখলেস সাহেবকে দিয়ে দেয়। কিছুতেই লাভলিকে দিতে দেয় না।… এই চরিত্র বহির্ভূত আদরে লাভলির মন ভিজে যায়। মুখে শুধু বড় বড় কথা, ভিতরটা আদতে নরমই — শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় ও। আর তখন বিউটি ভাবছে, ‘খা বুড়া, খায়া মর। পারলে আস্তো একটা কেক মুখে ঠুইসা দিতাম।’
—————————————————————-
ঘরে ঢুকে ফরিদার চোটপাট দ্বিগুণ বেড়ে গেলো। ছোট মেয়ের ঘর থেকে টিভির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, সোজা সেখানেই গেলেন।

সিনেমার বদল হয়েছে। বিউটি আধশোয়া হয়ে এখন ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ দেখার ভাণ করছে। যদিও এই সিনেমা তার অন্তত দশবার দেখা আছে। ফরিদাকে ঘরে ঢুকতে দেখে বিউটি হাসবে, নাকি পাত্তা না দিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকবে মনস্থির করতে পারলো না। শেষ পর্যন্ত মায়ের দিকে তাকালো।

— উঠ্, সিনেমা বন্ধ কর।

— কেন?

— কাজ নাই, কাম নাই শুধু সিনেমা! ফাজিলের বাচ্চা ফাজিল।

— কী কাজ করবো?

— কুনো কাজ না থাকলে হাঁটাহাঁটি কর। শুইয়া থাকতে থাকতে মাজা ব্যথা করে না?

— না করে না।

তর্ক করার কোনো ইচ্ছা এই মুহূর্তে বিউটির ছিল না, বাড়িতে এত লোক থাকতে ফরিদা যখন তার উপরেই চড়াও হলেন তখন আবার শিরায় শিরায় রাগ অনুভব করলো সে।

— সামনে থিকা সরেন, আপনের জন্য সিনেমা দেখতে পারতেছি না।

এবার ফরিদা একাই কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলেন বিউটির দিকে, বিউটি ভ্রূক্ষেপ করলো না। কী একটা সংলাপে জোরে শব্দ করে হাসলো। ফরিদা যথারীতি স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। (সম্পূর্ণ…)

গুরুর চণ্ডাল ভাব অথবা অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক

সলিমুল্লাহ খান | ১৪ মার্চ ২০০৯ ১০:৫০ অপরাহ্ন

এই যুগের বাঙ্গালা ভাষায় গুরু ও শিষ্যের সম্বন্ধ লইয়া পড়িবার মতন বহি বিশেষ লেখা হয় না। ইহাই নিয়ম। মহাত্মা আহমদ ছফা বিরচিত যদ্যপি আমার গুরু এই নিয়মের অতিক্রম।

joddopi.jpg…….
যদ্যপি আমার গুরু / আহমদ ছফা / প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স, (প্রথম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮;) তৃতীয় সংস্করণ মে ২০০০ /
১১০ পৃষ্ঠা / ৮০ টাকা / প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী

……..
পত্রিকার পাতায় প্রথম প্রকাশের সময় ইহার শিরোনাম আরো চওড়া হইয়াছিল। নাম ছিল ‘যদ্যপি আমার গুরু প্রফেসর রাজ্জাক’। আহমদ ছফা শেষ পর্যন্ত কাটিয়া নাম ছোট করিয়াছেন বলিয়া ধন্যবাদ পাইতেছেন। যদিও এই বই অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের এক জাতীয় শিষ্য আহমদ ছফা লিখিত তবু ইহা গুরু-শিষ্য বিসম্বাদের অধিক হয় নাই। ইহাতে যে গুরুচিত্র পাইতেছি তাহাতে বলিতে গুরুতর লাভই হইয়াছে।
—————————————————————–
শুদ্ধ খাদ্য আর পাঠ্যই নহে, মানুষ চিনিবার আরেক পন্থা আছে। কে কাহার লগে চলাফেরা করেন তাহাও দেখিতে হইবে। রাজ্জাক সাহেবের বন্ধু ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন, শিল্পী জয়নুল আবেদীন। বন্ধু তাঁহার আরো হইয়াছিল। দাবাড়ু নিয়াজ মোর্শেদও তাঁহার শিষ্য অথবা বন্ধু। এগুলি ভালো বন্ধু। কিন্তু প্রদীপের নিচেও অন্ধকার থাকে। রাজ্জাক সাহেবের বন্ধু নানা প্রকারের। তাঁহার সকল বন্ধু আহমদ ছফার পছন্দের হয় নাই। ছফা স্পষ্টাক্ষরে লিখিয়াছেন: মতলববাজ মানুষরাই বেশির ভাগ সময় রাজ্জাক সাহেবকে ঘিরিয়া থাকিতেন।
—————————————————————-
অধ্যাপক রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বনিয়াছিলেন ১৯৩৬ সালে। ১৯৯৯ সালে পরলোক যাইবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি নগরী ঢাকাতেই থাকিতেন। তাঁহার সম্পর্কে আহমদ ছফা যাহা যাহা লিখিয়াছেন তাহা তাহা এই অধ্যাপক মহোদয়ের জীবনের শেষ কিছু কম ৩০ বছর ব্যাপিয়া—১৯৭০ হইতে ১৯৯৮ সালের মধ্যে—ঘটিয়াছে। এইখানে শেষ জীবনের আবদুর রাজ্জাককে পাওয়া গেলেও যাইতে পারে—এহেন সম্ভাবনা আছে।

আহমদ ছফা সাক্ষ্য দিতেছেন তিনি দীর্ঘ আটাইশ ঊনত্রিশ বছর ধরিয়া অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্য পাইয়াছেন। তথাপি রাজ্জাক সাহেব একদিনের জন্যও তাঁহার নিকট পুরাতন হইয়া যান নাই। প্রতিবারই তাঁহার ব্যক্তিত্ব এবং জানাশোনার পরিধি ছাত্রের নিকট নতুন নতুন চমকের মতন মনে হইয়াছে। ইহাই আসল কথা। আহমদ ছফা জানাইতেছেন: প্রথম দিন তাঁহার সঙ্গে কথা বলিয়া যেভাবে বিস্মিত হইয়াছিলাম, এখনো—মানে বাংলা ১৪০৪ সনে (ইংরেজি ১৯৯৮)—একই ধরনের বিস্ময় তিনি আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করিতেছেন।

বিস্ময় আসে কোথা হইতে? নবীনত্ব হইতে। ফরাসি চলচ্চিত্রকর রোবের ব্রেসোঁ (Robert Bresson) বলিতেন নবীনত্বই আসল। ইহা আদিসত্তাও নহে, সর্বশেষাবস্থাও নহে। আহমদ ছফা গুরু মারা নবীন বিশেষ শিষ্য। ইহাতে সন্দেহ নাই।


১৯৭০ সালের কথা।

কেহ কিংবা কাঁহারা জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার যশোপ্রার্থী তরুণ আহমদ ছফাকে বলিয়াছিলেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের তত্ত্ব অবধান করিয়া উপাধি গ্রন্থ লিখিতে। বাংলা একাডেমী হইতে বৃত্তি পাইয়া তিনিও সরেনজর গবেষণা করিবার মানস করিলেন অধ্যাপক রাজ্জাকের অধীনে। রাজ্জাক সাহেব বলিলেন গবেষণা করিবেন ভালো কথা। কিন্তু আমার অধীনে করিতে পারিবেন না। কারণ থিসিস যাঁহাদের অধীনে করা যায় তাঁহাদের প্রয়োজন বিশেষ যোগ্যতার—তাঁহাদিগকে প্রফেসর বা রিডার (এখনকার দেশীয় ভাষায় অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর) হইতে হয়। রাজ্জাক সাহেব বলিলেন, ‘আমি ত মোটে লেকচারার।’ (ছফা ২০০৭: ১৭) (সম্পূর্ণ…)

কবিতাত্রয়ী

টোকন ঠাকুর | ১৩ মার্চ ২০০৯ ১২:৩৫ অপরাহ্ন

খাদ্যখাবার

দিঘিতে হাঁস শামুকদানা খোঁজে
শরীর ভাসে… নাখমুখঠোঁট জলে
দিঘিতে হাঁস ঝিনুকদানা খোঁজে…

মৃগয়াকে ব্যাঘ্র… বনস্থলে
প্রয়োজনীয় খাদ্য মনে করে

তোমার বুকে কী খুঁজেছি কাল
শামুক? ঝিনুক? মাতৃশিশুকাল?
তোমার বুকে কী পেয়েছি কাল–
পুরো শৈশব, হুলো বাল্যকাল?

মৃগয়াকে ব্যাঘ্র… বনস্থলে
নিজের জন্য খাদ্য কনফার্ম করে

কাল কি ছিল অতিরিক্তকাল?
তোমার বুকের তিলটি ছিল তাল… !
এমন কি তিল কৃষ্ণ নহে, লাল?
কালকে আকাশপাতাল ছিল কাল… !

কালকে আমি বনস্থলে ছিলাম
প্রমাণ ছিল, ব্যাঘ্র আমার নাম
তোমার বুকের মাংশ ছিল, কাঁচা
তাই খেয়েই তো আজ পর্যন্ত বাঁচা–
কাল পর্যন্ত বাঁচতে যদি চাই
ব্যাঘ্র আমি, কাঁচামাংশই চাই

বকের চোখে পুঁটির ছবি আঁকা
পুঁটির চোখেও কেঁচো আঁকা ছিল
তোমাকে খেয়ে আমার বেঁচে থাকা
না খেয়ে কারও বেঁচে থাকা ছিল?

২৩/২/২০০৯

তরুণ কবি

যদি… মাত্র… তবে
হবে কি হবে না হবে?
নদী মাত্রই জল
উতলা ধরণী তল…
নারী মাত্রই, ঠারে-
ভাব, আকারে-বাকারে
ইথারে চিরকালের কথা
ঘুরিছে নিয়মমাফিক, প্রথা

প্রেম?

প্রথার মধ্যেই পড়ে
ধাক্কা তুমুল ঝড়ের…
ঝড় মাত্রই থামে
আকাশ দূরে নামে–
মাঠকে আড়াআড়ি
তরুণ কবির বাড়ি… (তার)
ফেরার টাইম কই?
ছাপা হচ্ছে বই…

ছাপা হচ্ছে জ্বালা
অগ্নি-কর্মশালা
ছাপা হচ্ছে দুঃখ
(আত্মপ্রকাশ মুখ্য)
ছাপা হচ্ছে দ্রোহ
অনন্ত নীল গ্রহ
নীল গ্রহেই থাকে
তরুণ কবি যাকে
নিজের ছবি আঁকে
যার ভেতরে আঁকে
তার ভেতরে আঁকে
শরীর মনের বাঁকে
শরীর হয়েই থাকে
মন যে শরীর আঁকে…

আঁকা লেখার ছবি
খা খা একার ছবি
দগ্ধ দেখার ছবি
মুগ্ধ থাকার ছবি
দুক্কুরেও ভৈরবি… (হায়)

তিন রাস্তার মোড়ে
ঘুর্ণি হাওয়া ওড়ে
নেশাও আসে নেশার
মহাজাগতিক পেশা–
দাঁড়িয়ে থাকে দাহে
রুক্ষ তরুণ কবি
বৃক্ষ তরুণ কবি
সূর্য তরুণ কবি
দগ্ধ তরুণ কবি

কী চায় তরুণ কবি?

৬/৩/২০০৯

বসন্তরজনীতে বসিয়া রচিত কবিতা

নিষ্প্রয়োজনে
আমি
ছোট নাম লেখাতে গেছি
কবির খাতায়

নিজ প্রয়োজনে
আমি
নক্ষত্রের দেনা
নিয়েছি মাথায়

বিষ-প্রয়োজনে
আমি
সাপ ও বেদেনী
চেয়েছি দুটোয়

দুহাতে দুধের ছানা, বেপরোয়া মুঠোয় মুঠোয়
সম্পূর্ণ ফুটেও নারী, ক্লাসিক্যালি অস্ফূট…

So, আজ আমাকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো–
আমি কি কবি ছিলাম? সাপুড়ে ছিলাম? নাকি ছিলাম যা, তাই?

শিস্ প্রয়োজনে
আমি
হাওয়া ধাক্কা দিচ্ছি
বসন্ত-জঙ্গলে গাছদেবতার
শুকনো পাতায়

কে আমি? বিখ্যাত কেউ? কী ছিলাম? গুরু কেউ? লঘু ঢেউ?
ঝরনার বাথরুমে শাওয়ার ছিলাম?
সুহাসিনীর ড্রেসিং টেবিলে আয়না ছিলাম?
গুপ্তকথা হচ্ছে, আদতে সেই রাক্ষসদের ছেলে, মানুষের ছদ্মবেশে থাকি
যোগ্যতা, নিজের মুখে জোসনারাত অনুবাদ করতে পারি, এর বাইরে
আমি যা ছিলাম, তাই…
ছিলাম যা, তাই…

৫/৩/২০০৯

রৌরব (কিস্তি ৬)

লীসা গাজী | ১৩ মার্চ ২০০৯ ১২:০৯ অপরাহ্ন

কিস্তি ১কিস্তি ২কিস্তি ৩কিস্তি ৪কিস্তি ৫

(কিস্তি ৫-এর পর)
rourob_6.jpg

আপার একা বের হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে আম্মাকে দিয়ে ভালো কিছু আদায় করা যাবে, ভাবলো বিউটি আর হাসলো। কিন্তু কী আদায় করা যায় এই নিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তিত হলো আর ভিসিআর কেনার ঘটনা মনে পড়ে গেলো। যেদিন বিউটি ফরিদার কাছে ভিসিআর কিনে দেয়ার কথা বলেছিলো সেদিন তিনি যাকে বলে আকাশ থেকে পড়েছিলেন।
—————————————————————–
সে অবাক হয়ে দেখলো তার মা, মিসেস ফরিদা খানম মাথা খারাপের মতো ছোটাছুটি করছেন, সমানে দু’হাত ছুঁড়ছেন শূন্যে। একটা কাক তার সেই দু’হাত অনুসরণ করে উড়ে বেড়াচ্ছে। একবার মনে হলো ঠোকর দিবে বা! কাকটা ফরিদার মাথার খুব কাছে নেমে আসছে আবার হুস খেয়ে গজ খানিক উপরে উঠে যাচ্ছে। মায়ের এই মূর্তি দেখে বিউটি ভীষণ রকম চমকালো, তাদের সমগ্র জীবনের অস্বাভাবিকত্ব চোখের সামনে নিয়ন সাইনের মতো জ্বলতে লাগলো। কষ্ট হলো বিউটির; ফরিদার জন্য কষ্ট হলো, লাভলির জন্য আর নিজের জন্য।
—————————————————————–
বিকাল সাড়ে চারটা কি পাঁচটা বাজে, চা দেয়ার সময় হয়েছে। সেই সময় গম্ভীর মুখে বিউটি ফরিদার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো।

— আম্মা, ঘরে আসবো?

— কেন, কী দরকার?

— আসবো, না কি আসবো না?

— এইসব কী ঢং, আয়।

বিউটি ফরিদার ঘরে প্রবেশ করলো। কোনো রকম ধানাই-পানাইয়ের ধার দিয়েও গেলো না। সরাসরি ফরিদাকে বললো, “আম্মা, আমাকে একটা ভিসিআর কিনা দেন।”

— কী কিনা দিবো?

— ভিসিআর।

ফরিদা দুপুরের খাবারের পর একটু জিরান। ঠিক ঘুমিয়ে পড়েন না, কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকেন। সেইদিন সেই পর্ব তার তখনও চলছিলো। মেয়ে ঘরে ঢোকার পরেও আলস্য পুরোপুরি কাটে নাই, তাই ঠাহর করতে পারেন না মেয়ে কী বলছে।

— কয়েকদিন পরে পরীক্ষা না?

— হ্যাঁ, পরীক্ষার পরেই কিনা দেন।

— জিনিসটা কী?

— সিনেমা দেখার মেশিন। ঘরে বইসা সিনেমা দেখা যায়। বেশি দাম না। আমি টেলিভিশনে এ্যাড দেখছি।

ফরিদা মেয়ের আহ্লাদে হাসবেন না কাঁদবেন ভেবে পেলেন না। স্পর্ধা দেখে তিনি রীতিমতো স্তম্ভিত হলেন।

— দুই দিন পরে পরীক্ষা সেইদিকে খেয়াল নাই, ঘরে বইসা সিনেমা দেখবে? থাপড়াইয়া সবগুলা দাঁত ফালায় দিমু। তোর বুকের পাটা তো কম না। আমারে ঘুম থিকা তুইলা সিনেমা দেখার মেশিন চাস!

— সিঙ্গার থিকা কিনতে পারেন। সিঙ্গার থিকা কিনলে একটা ইস্তারি ফ্রি!

— তুই এক্ষণ এই ঘর থিকা বার হ। শয়তানের বাচ্চা শয়তান — দুপুর বেলা ফাইজলামি করতে আসছে।

— ফ্রি ইস্তারি আর এক সপ্তাহ দিবে।

— আমি হাবিজাবি জিনিস কিনা দিবো না।

— কেন দিবেন না? আপনের ন্যায্য-অন্যায্য সব কথা আমরা শুনি। সারাদিন বাসায় বইসা থাইকা আমরা করবোটা কী? বাসার ভিতরে আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দেন। (সম্পূর্ণ…)

সিঙ্গাপুরের কবি সিরিল অঙ-এর সাথে একটি অসম্পূর্ণ আলাপ

সুমন রহমান | ১০ মার্চ ২০০৯ ৬:৩৫ অপরাহ্ন

cyrilwong_red.jpg
সিরিল অঙ (Cyril Wong), জন্ম ২৭/৬/১৯৭৭

সিরিল অঙ-এর কবিতা আমি প্রথম পড়ি সিঙ্গাপুরের তরুণ কবিদের একটা কবিতা সংকলনে। পড়ে বেশ ভালো লেগে যায়। তারপর নেটে ওর ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে গিয়ে দেখি বেশ বিখ্যাত কবি ইনি। জন্ম ১৯৭৭ সালে, এর মধ্যেই পাঁচটা কবিতার বই বেরিয়ে গেছে, গল্পও লিখেছেন বেশ কিছু।

সিরিল অঙ-এর লেখালেখি Atlanta Review, Santa Clara Review, Slope, Cider Press Review, Fulcrum 3, Di- Verse-City, Three Candles, Southern Ocean Review, Verse Libre Quarterly, Poetry Billboard প্রভৃতি কাগজে ছাপা হয়েছে। ২০০২ সালে One-Track Vision কবিতার জন্য থিয়েটার অ্যাওয়ার্ডসহ বেশি কিছু পুরষ্কার পান এই কবি। সিরিল বর্তমানে Quarterly Literary Review Singapore-এর সহকারী সম্পাদক।

এখানকার সবচেয়ে মূল্যবান সাহিত্য পুরষ্কার পেয়ে যাওয়ার সুবাদে বেশ সেলিব্রিটি গোছের একটা ভাবমূর্তি ওর। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত ইন্টারভ্যূ হচ্ছে, ওর কবিতা নিয়ে গীতিনাট্য হয়েছে, ফিল্ম হয়েছে। ভাবলাম, ওর সাথে দেখা হয়ে গেলে তো বেশ হয়, এখানকার সাহিত্য নিয়ে জানা যাবে অনেক কিছু। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইংরেজি বিভাগের সমকালীন কবিতা কোর্সে ওর কবিতা পাঠ্য। আর মজার বিষয় হল, একই বিভাগে বর্তমানে স্নাতকোত্তর পড়াশুনা করছে এই কবি।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সুমন রহমান

ইমেইল করাতে জবাব আসল তড়িৎ গতিতে। দেখা করার ব্যাপারে এই কবিরও যথেষ্ট আগ্রহ। ইমেইল থেকে ফোন, ফোনে দিনক্ষণ ঠিক করে (২০০৮-এর জানুয়ারির এক দিন) আমরা বসলাম একটা কফিশপে। সিরিল আমার জন্য ওর সদ্য প্রকাশিত দুটি কবিতার বই এনেছিল। তাতে মনে মনে ঠিক করলাম, কফিশপের দামি ক্যাপোচিনো কফির বিল এই গরিবের পকেট থেকেই পরিশোধ করতে হবে। কফি খেতে খেতে কথা হল অনেক।

● ● ●

আড্ডার শুরু

সুমন রহমান: খুব ভালো লাগল তুমি এসেছো। আশা করি মজার একটা আড্ডা দেবো আমরা।

সিরিল অঙ: সন্দেহ নেই। আর আমি আসলে খুব এক্সাইটেড।

সু.র.: কী বিষয়ে?

সি.অ.: প্রধানত তোমার সাথে দেখা হওয়া নিয়ে। এই প্রথম আমাদের নিজেদের ভাষাগুলোর বাইরে অন্য ভাষায় কবিতা লেখে এমন কারো সাথে কথা বলছি।

book_cw1.jpg……
সিরিল অঙ-এর বই Tilting Our Plates to Catch the Light
……..
সু.র.: দুটা ধান্দার কথা আগেভাগেই বলে রাখি, আশা করি তাতেও আমাদের দিলখোশ আড্ডার মজা নষ্ট হবে না। এক, তোমার কবিতাকে ঘিরে আমরা এখানকার শিল্পসাহিত্য নিয়ে আলাপ করবো, অর্থাৎ আমি শুনব তোমার কাছ থেকে। আর দুই, এইসব ইনফর্মাল কথাবার্তাকে একটা আলাপচারিতা হিসেবে আমি সাজাব, বাংলাভাষী পাঠকের জন্য।

সি.অ.: শুধু বাংলাভাষী পাঠকের জন্য?

সু.র.: আমার দৌড় আপাতত এ পর্যন্তই।

সি.অ: (হাসি) ঠিক আছে, দেখা যাক আমার দৌড় কতদূর?

সু.র.: তোমার কবিতা পড়ে আমি আনন্দ পেয়েছি। একটা মাদকী সারল্য আছে তোমার।

সি.অ: আমার কবিতা পড়েছ কোথায় তুমি?

সু.র.: এখানেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে।

সি.অ: আচ্ছা… জিজ্ঞেস করলাম এজন্য যে, আমার লেখা তোমাদের ডেইলি স্টার নামে একটা পত্রিকা আছে সেখানেও ছাপা হয়েছে।

সু.র.: তাই নাকি?

সি.অ.: হ্যাঁ। তবে সে বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয় নি। আমি পরে গুগল সার্চ দিতে গিয়ে দেখেছি।

সু.র.: অদ্ভুত বিষয়!
—————————————————————–
এখানকার সাহিত্যের ইতিহাসে বিকল্প খুব বেশি নাই বেছে নেয়ার। খুব একরৈখিকভাবে বেড়ে ওঠেছে এটা। ১৯৬৫ থেকে যদি হিসাব কর, এডউইন থামবো হচ্ছে সিঙ্গাপুরিয়ান সাহিত্যের গডফাদার। কিন্তু তার সাহিত্য মূলত প্রশস্তিগাথা। সরকারী পদক্ষেপের সমর্থনে প্রশস্তিগাথা রচনা করেছেন তিনি সারাজীবন। আর এটা দিয়েই স্বাধীন সিঙ্গাপুরের সাহিত্য শুরু হয়েছে।
● ● ●
ভেতরে ভেতরে আমরা পরস্পরের ভাষা বিষয়ে দিনকে দিন উদাসীন হয়ে যাচ্ছি। তিরিশ বছর আগেও চীনাদের অনেকেই মালে বা তামিল ভাষা জানত। এখন তুমি একশ-তে একজনও খুঁজে পাবে না। চীনাদের দৃষ্টি এখন হয় পশ্চিমে, না হয় চীন মেইনল্যান্ডে। মালে-রা জীবনচর্চায় বড় বেশি মুসলমান হয়ে পড়েছে। সৌদি আরব তাদের তীর্থ এবং সেদিকেই তাদের কেবলা। তামিলদেরও একই হাল। ফলে আমাদের ডাইভারসিটি আছে সত্য, কিন্তু ইউনিটি নাই।

—————————————————————-
সি. অ.: যাক বাদ দাও। আমি অভিযোগ করছি না। তথ্য আকারে জানালাম মাত্র।

সু.র.: ঠিক আছে। বলছিলাম, তোমার লেখায় বেশ মাদকী সারল্য আছে। এ ধরনের লেখা আমার পছন্দ খুব। তোমাকে প্রথমে পড়লে মনে হয় তুমি যেন নিকোলাস গ্যিয়েন বা নিকানোর পাররা ঘরানার কবি।

সি.অ: আমার মনে হয় আমি অ্যান সেক্সটন দিয়ে বেশি প্রভাবিত। নিকোলাস গ্যিয়েন আর কী যেন নাম বললে?

সু.র.: নিকানোর পাররা।

সি. অ: পড়া হয় নাই। (সম্পূর্ণ…)

রৌরব (কিস্তি ৫)

লীসা গাজী | ১ মার্চ ২০০৯ ৯:৫৯ পূর্বাহ্ন

কিস্তি ১কিস্তি ২কিস্তি ৩কিস্তি ৪

(কিস্তি ৪-এর পর)
rourob.jpg

বিয়ের পরে স্বামীর ঘর করতে যখন একটা ছোট্ট মফস্বল শহর ছেড়ে ফরিদা ঢাকায় এলেন তখন তার খুশির অন্ত ছিলো না। এমন না যে তিনি বিয়ে পাগলা মেয়ে ছিলেন, বা দশ বছর বয়স থেকেই পুতুল খেলার নামে নিজের
—————————————————————–
পেচাইতাছিস কেন, সমস্যা কুথায়?

– উনার বিয়া করার ক্ষমতা নাই।

… আম্মার কপালের দুশ্চিন্তা চোখে নেমে এলো। … মেয়ের চোখের দৃষ্টি এবার নিজেই সচেতনভাবে এড়িয়ে গেলেন। ধরে আসা গলা খাকারি দিয়ে পরিষ্কার করলেন।

– এই কথা কাক-পক্ষীও যেন টের না পায়। বড় বেটির কাম হইলো হজম করা, হজম কর — কপালে যা ছিলো হইছে। মানুষে যেন না হাসে — সেই সুযুগ কাউরে দিবি না। স্বামীর অপমান নিজের অপমান। এখন ঐ বাড়িই তোর সংসার, এই লোকই তোর স্বামী — যেমনই হোক।

আম্মার বলা প্রতিটা শব্দ হাতুড়ির বাড়ির মতো ফরিদার মগজে ঘা মারছিলো। অবশ্য তিনি জানতেন এই বিয়ে তাকে মেনে নিতে হবে, এখন নিজের সম্মান রক্ষার দায়িত্ব তার নিজের।

—————————————————————-
সংসারের ছবি আঁকতেন, ব্যাপারটা মোটেও তা না। তবে সব সময়ই নিজের জিনিসের প্রতি তার অন্ধ টান, একরোখা মনোযোগ সব কিছুকে ছাড়িয়ে যেতো। আমার বাড়ি, আমার ভাইবোন, আমার ঘর, — এই ‘আমার’ বোধটা তার ভিতরে ছিলো বাড়াবাড়ি রকম সজাগ; স্বামী বা সংসারের চেয়ে নিজের আর কী হতে পারে। সুতরাং যেদিন তিনি স্বামীর সংসারে পা দিলেন সেদিনই ‘আমার স্বামী’ বা ‘আমার সংসার’ অবলীলায় ‘আমার বাপের বাড়ি’ বা ‘আমার ভাই-বোন’-এর চেয়ে আপন হয়ে উঠলো। স্বামী-সংসারের কাছে আর সব কিছুই হয়ে গেলো ফেলনা। আরেকটা ব্যাপারে ফরিদার একাগ্রতা লক্ষ্য করার মতো ছিলো — তিনি যাই করবেন, তাতে যেন কোনো খুঁত না থাকে। লাভলি-বিউটির বিয়ের জন্য অনেক প্রস্তাবই এসেছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাণে ধরে কোনো পাত্রের সাথে বিয়ে দিতে পারলেন না ঐ এক কারণে। প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো খুঁত বেরিয়ে এলো, একেবারে নিখুঁত পাত্র পাওয়া গেলো না। যার তার হাতে তুলে দিয়ে মেয়েগুলোকে পানিতে ফেলবেন নাকি! এই ভাবনাই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ালো। যদিও মনটা তার আজকাল কিঞ্চিৎ টলে যাচ্ছে। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com