জয়নুলের আদি জলচিত্র: একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রদর্শনী

সৈয়দ আজিজুল হক | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ৪:৩৪ অপরাহ্ন

ফেব্রুয়ারির ১৯ থেকে ২৮ পর্যন্ত শিল্পী জয়নুল আবেদিনের প্রথম পর্যায়ের ৫০টি ছবির একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ধানমণ্ডির গ্যালারি চিত্রক-এ। কিছু রেখাচিত্র ও অধিকাংশ জলরং-এ আঁকা ছবির বেশির ভাগই জয়নুলের ছাত্রজীবনে আঁকা। ময়মনসিংহের বহ্মপুত্র নদ, কলকাতা ও সাঁওতাল পরগণা দুমকার জনজীবন উঠে এসেছে এসব ছবিতে। কীভাবে সংগ্রাহক ছবি সংগ্রহ করেছেন তা থেকে শুরু করে এ সব ছবির নানান বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন লেখক। আগ্রহীদের জন্য প্রদর্শনীর ৫০টি ছবি আটর্স-এর স্লাইড শোতে সংরক্ষিত হলো।

zainul-page-grey.jpg
জয়নুল আবেদিন (১৯১৪ – ১৯৭৫)

জয়নুল আবেদিনের আদি জলরং চিত্রের এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রদর্শনী। দাউদ ফারহান নামের একজন জয়নুল-অনুরাগী দীর্ঘকাল যাবৎ সযত্নে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছেন জয়নুলের যেসব চিত্রকর্ম তাই নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে এ প্রদর্শনী। দ্বিতীয়ত, এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, অল্প কয়েকটি বাদ দিলে প্রদর্শনীর অধিকাংশ চিত্রই জয়নুল আবেদিনের ছাত্রজীবনে (১৯৩২-৩৮) আঁকা। এর বাইরে ১৯৩০, ১৯৩১, ১৯৩৯, ১৯৪০, ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের কিছু চিত্রও এতে আছে। সব মিলে ১৯৩০-৪৬ কালপর্বের মোট পঞ্চাশটি চিত্রকর্মের এ প্রদর্শনী শিল্পানুরাগী মহলের জন্য এক গভীর আনন্দদায়ক ঘটনা।

z40.jpg

কেননা ১৯৪৩এর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা বাদ দিলে এই কালপর্বের (১৯৩০-৪৬) অনেক চিত্রই এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে অনুদ্ঘাটিত। যেসব চিত্রের ছবি বইয়ে ছাপা অবস্থায় দেখা যায়, তার মধ্যে আছে : ‘শম্ভুগঞ্জ’ (কালিকলমের স্কেচ : ১৯৩৩), ‘হাঁস’ (জলরং : ১৯৩৩), ‘ফসল মাড়াই’ (জলরং : ১৯৩৪), ‘বনানী – দুমকা’ (জলরং : ১৯৩৪), ‘পল্লিদৃশ্য’ (জলরং : ১৯৩৪), ‘ঘোড়ার মুখ’ (পেনসিল-তেলরং : ১৯৩৪), ‘বাইসন – জু স্টাডি’ (জলরং : ১৯৩৫), ‘মজুর’ (পেনসিল-স্কেচ : ১৯৩৫) প্রভৃতি। এছাড়া ১৯৩৮এ ব্রহ্মপুত্র নদ সংক্রান্ত ছটি জলরং চিত্রের জন্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্ট কর্তৃক গোল্ড মেডেল প্রাপ্তির সংবাদ আমরা জানি। কিন্তু ওইসব চিত্র আমরা দেখতে পাই না। তবে ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে যে প্রদর্শনী ঢাকায় আয়োজিত হয়েছিল, তাতে জয়নুলের এ পর্বের প্রচুর চিত্রকর্মের সঙ্গে আমরা পরিচিত হতে পেরেছি। তবু একথা স্বীকার করতেই হবে, জয়নুলের ছাত্রজীবন ও কলকাতা পর্বের এক গুরুত্বপূর্ণ অজানা দিক এই প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে উদ্ঘাটিত হল। বিশেষত, আমরা এর আগ পর্যন্ত জয়নুলের চিত্রকর্মের আদি যে নিদর্শন পাই তা ১৯৩৩এ আঁকা। কিন্তু এই প্রদর্শনীতে ১৯৩০, ১৯৩১ ও ১৯৩২ সালের চিত্রও রয়েছে। অর্থাৎ কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগের চিত্রকর্মও আমরা এ প্রদর্শনীতে পাচ্ছি। সেজন্য এ প্রদর্শনীটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। (সম্পূর্ণ…)

হারুকি মুরাকামির গল্প

এপ্রিলের এক অপরূপ সকালে ১০০% নিখুঁত মেয়েটির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর

শিবব্রত বর্মন | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ৮:০০ অপরাহ্ন

হারুকি মুরাকামি জাপানি ভাষার জনপ্রিয় লেখক। জন্মেছেন ১৯৪৯ সালের ১২ জানুয়ারি কিয়োতোতে। বর্তমানে টোকিওতে থাকেন। ওপরের গল্পটি তার ‘দ্য এলিফেন্ট ভ্যানিশেস’ গল্পগ্রন্থ থেকে নেওয়া। বইটি জাপানি ভাষা থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন আলফ্রেড বার্নবম এবং জে রুবিন।

haruki.jpg
হারুকি মুরাকামি

মূল : হারুকি মুরাকামি
অনুবাদ : শিবব্রত বর্মন

এপ্রিলের এক অপরূপ সকালে, টোকিওর কেতাদুরস্ত হারাজুকু এলাকার সংকীর্ণ রাস্তায় আমি মুখোমুখি হেঁটে গেলাম আমার জন্য ১০০% নিখুঁত মেয়েটির সামনে দিয়ে।

সত্যি কথা বলতে কী, সে যে দেখতে খুব সুন্দর তা নয়। ভিড়ের মধ্যে তাকে আলাদা করা যাবে না। এমন বিশেষ চমকদার পোশাকও পরেনি সে। ঘুম ভেঙে এইমাত্র উঠে আসার কারণে অপরিপাটি পেছনের চুল। বয়সও খুব কম নয় — তিরিশের কাছাকাছি হবে। সেভাবে বললে, তাকে ‘মেয়ে’ই বলা চলে না। তবু পঞ্চাশ গজ দূর থেকেও আমি টের পেলাম: সে আমার জন্য ১০০% নিখুঁত মেয়ে। তাকে দেখামাত্র আমার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে থাকলো, মরুভূমির মতো শুকিয়ে গেল জিহ্বা।

আপনাদের হয়তো নিজ নিজ প্রিয় ধাঁচের মেয়ে আছে — কারো বা হয়তো, ধরা যাক, চিকন হাঁটুর মেয়ে পছন্দ, কারো বড় বড় চোখের, কারো বা কোমনীয় আঙুলের, অথবা আপনি হয়তো তেমন কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই কোনো মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। আমার নিজেরও কিছু বিশেষ পছন্দ-অপছন্দ আছে। মাঝে মাঝে রেস্টুরেন্টে পাশের টেবিলের কোনো মেয়ের দিকে আমার চোখ আটকে যায় শুধু তার নাকটা আমার ভালো লেগে গেছে বলে।
তবে কেউ জোর গলায় বলতে পারবে না, তার জীবনের ১০০% নিখুঁত মেয়েটি আগে থেকে ঠিক করে রাখা কোনো ধাঁচের। এই যে নাকের ব্যাপারে আমার এতো বাছবিচার, কিন্তু সেই ১০০% নিখুঁত মেয়েটির নাকের আকৃতি আমি মনেই করতে পারছি না — এমনকি তার নাক ছিল কিনা সেটাই আমার মনে নেই। শুধু এটুকু আমি নিশ্চিত মনে করতে পারি যে, সে তেমন একটা সুন্দর ছিল না। অদ্ভুত ব্যাপার।

‘গতকাল রাস্তায় যেতে যেতে ১০০% নিখুঁত মেয়ের দেখা পেয়েছি,’ কোনো এক লোককে বললাম আমি।

লোকটা বলল, ‘তাই নাকি? খুব সুন্দর দেখতে?’

‘না তেমন একটা নয়।’ (সম্পূর্ণ…)

একুশে ও বিশ্বমাতৃভাষা দিবস

রবিউল হুসাইন | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ৬:৫৭ পূর্বাহ্ন

shahid-minar-1963.jpg
১৯৬৩ সালে সমাপ্ত দ্বিতীয় শহীদ মিনার। সূত্র: উইকিপিডিয়া

বিশ্বসভার অন্যতম সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছে আমাদের বাংলা ভাষার গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৯৯ সালে এই অপূর্ব ঘটনাটি ঘটেছে। বিশ্বের ১৮৮টি দেশের ৬০০ কোটি মানুষ আজ ২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে। এই ঘটনাটি বাংলা ভাষার জন্য অভূতপূর্ব সম্মানের এবং বাঙালি জাতি তথা বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষদের জন্যে এটি একটি বিশাল ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো এই দিবসটি পালনের সূত্রপাত করায় বিশ্বের প্রায় চার থেকে ছয় হাজার মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনের কমিশন-২ এর অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই সঙ্গে সব দেশের মাতৃভাষার অধিকারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা ব্যবহার, সংরক্ষণ ও স্বীকৃতির পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
—————————————————————–
হাজার বছর বিদেশী শাসনের অধীনে থেকে থেকে আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি যে-সময়ে ভুলে যেতে বসেছিলাম, ঠিক সেই সময়ে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে এদেশের মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষের আত্মাহুতি ও আত্মোৎসর্গের ঘটনা আমাদের সর্ব উৎস-মূলে আঘাত হেনে আমাদের নিস্তেজিত চেতনাকে টলমলিয়ে দেয়। সেখানে থেকেই শুরু হয় স্বাধীনতার অঙ্কুরোদ্গম।

—————————————————————-
যদ্দুর জানা যায় গফরগাঁয়ে শহীদ দিবস উপলক্ষে একটি ছোট ম্যাগাজিন স্ফুলিঙ্গতে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে এই ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করার একটি প্রস্তাব সর্ব প্রথম করা হয়েছিল। ঘটনাটি খুব অবাক করে এই মর্মে যে এই অসামান্য প্রস্তাবটি রাজধানী ঢাকার কোনও কবি-সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, ভাষা-সৈনিক কারও দ্বারা প্রস্তাবিত হয়নি এবং কারও মনে ঘুণাক্ষরেও উদয় হয়নি, হয়েছে সুদূর মফঃস্বলের নিবেদিতপ্রাণ বাংলাভাষার একান্ত প্রেমিক কতিপয় সংস্কৃতিকর্মীর অসামান্য কল্পনা ও স্বপ্নে। আলেখ্যটি খুব প্রণিধানযোগ্য। রাজধানীকেন্দ্রিক সৃষ্টিশীল চিন্তা ও চিন্তকের শ্রেণীমূল্যই যে সবসময় শ্রেষ্ঠ বলে গৃহীত হবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই বরং যে কোনও মানুষই যে কোনও মানুষের সঙ্গে তুল্যমূল্যে এক ও অভিন্ন এবং সমগোত্রীয় — এই কথাই প্রমাণিত হয়। (সম্পূর্ণ…)

অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা

রাজু আলাউদ্দিন | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ৬:১৪ অপরাহ্ন

মোগল সম্রাট শাহজাহানের বড় ছেলে দারাশুকো সংস্কৃত এক পণ্ডিতের সাহায্য নিয়ে ১৬৫৭ সালে ফার্সী ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন উপনিষদের। এরও প্রায় দেড়শ’ বছর পর প্রাচ্যবিদ ফরাসী এক পরিব্রাজক আকেতিল দ্যু পেরোঁ (Anquetil Du peron) এই ফার্সী অনুবাদের ভিত্তিতে লাতিনে তা অনুবাদ করেন। ইউরোপে উপনিষদের ওটাই প্রথম অনুবাদ। দারাশুকো যদি এই অনুবাদ না করতেন তাহলে ইউরোপকে হয়তো আরো বহু বছর অপেক্ষা করতে হতো উপনিষদের আলোয় মানবজীবনের তাৎপর্য ও গভীরতা অবলোকনের।

দারাশুকোর এই ফার্সী অনুবাদের প্রভাব কতটা গভীর ছিলো পশ্চিমের মননশীল জগতে তা ছোট্ট একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। ১৮০১ ও ১৮০২ সালে (দুই খণ্ডে) আকেতিল কর্তৃক অনূদিত উপনিষদের একটি কপি পৌঁছেছিলো জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের হাতে। তাঁর বাকি জীবন কেটেছিলো এই ভারতীয় দর্শনের আত্মার উষ্ণতায়। জীবনের প্রশান্তি হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন উপনিষদের উক্তিসমূহ। শুধু শোপেনহাওয়ারই নন, উপনিষদের প্রভাব পড়েছিলো আরেক জার্মান দার্শনিক ফ্রেডারিখ নীটশের উপরেও। দার্শনিক গভীরতায় আচ্ছন্ন মার্কিন লেখক এমার্সনের লেখায়ও আমরা প্রাচ্যের এই মহৎ সৃষ্টির ছায়া দেখতে পাবো। এসবই সম্ভব হয়েছিলো অনুবাদের কারণে। এই মুহূর্তে আমাদের মনে পড়বে স্পেনের সেই আরব লেখক-অনুবাদকদের কথা যারা পশ্চিমের দার্শনিক ধারার সূত্র গ্রীক দর্শনকে সম্ভাব্য বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন আরবী ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে।

আজ গোটা মুসলিম বিশ্বে চিন্তা এবং মননশীলতার ক্ষেত্রে সীমাহীন দেউলিয়াত্ব দেখে এটা কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব যে আট থেকে পনের শতকের আগে পর্যন্ত স্পেনে মুসলিম বুদ্ধিজীবিরা জ্ঞানের প্রায় সব শাখাতেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পৃথিবীর যে কোনো জাতির তুলনায় দীর্ঘতম সময়। এই দীর্ঘ সময় জ্ঞানচর্চার ফলে আমরা তাঁদের কাছ থেকে চিকিৎসা জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে অসাধারণ সব মৌলিক চিন্তা ও আবিষ্কার যেমন পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের অমূল্য সব গ্রন্থের অনুবাদ। (সম্পূর্ণ…)

রৌরব (কিস্তি ৪)

লীসা গাজী | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ৫:৪২ অপরাহ্ন

কিস্তি ১কিস্তি ২কিস্তি ৩

(কিস্তি ৩-এর পর)

leesa-4.jpgকী ঘটতে পারে তা আগাম চিন্তা করে লাভলির চোখ মুখ রক্তিম হয়ে যাচ্ছে, মানে ওর ময়লা রঙের পক্ষে যতোটা রক্তিম হওয়া সম্ভব ততোটাই। এই চল্লিশ বছরেও ওর ময়লা রঙের কিচ্ছা শেষ হলো না। আম্মা কালকে রাত্রেই বললেন, ওর রঙটা ময়লা বইলা কি ওরে গাঙে ভাসায় দিতে হইবো নাকি! এইসব কথা সবই মুখলেস সাহেবের উদ্দেশ্যে বলা। তারপর গলা নিচু করে আরও এক দুই লাইন যোগ হয় — তোমার কী আসে-যায়, তুমি তো পার করতে পারলেই বাইচ্চা যাও। মেয়েদের জীবন যে কতো রঙের আমার জানা আছে; হাড়ে হাড়ে জানা আছে। যদিও মুখলেস সাহেব ভদ্রলোকের সাত চড়ে রা নাই অবস্থা। তবুও নীরবতা সম্মতির লক্ষণ না ধরে প্রতিবাদের লক্ষণ বলে ধরে নিলেন ফরিদা খানম। তাই মেয়েদের বিয়ে না দেয়ার পিছনে তার নানান যুক্তি তিনি দিনের মধ্যে বত্রিশবার আওড়ে যান। এই আনুষ্ঠানিক কৈফিয়ত জারি অবশ্য মাস খানেক হয় শুরু হয়েছে আর দিনকে দিন তা বাড়ছে। নইলে ফরিদা খানম দেবেন কাউকে কৈফিয়ত — এ কি কেউ স্বপ্নেও ভেবেছিলো? তাহলে কি সত্যিই তার শরীরের সাথে সাথে মনও নরম হয়ে আসছে? তার অবর্তমানে মেয়েদের ভয়াবহ পরিণতি কি তিনি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন?
—————————————————————–
লোকটার কথা শেষ হওয়ার আগেই ও পড়িমরি দৌড় লাগালো, পিছনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে যায় লাল মাফলার। পার্কের সাধারণ জীবনে ঘূর্ণির সৃষ্টি হলো। বলা নাই কওয়া নাই একজন মহিলা হঠাৎ দৌড় দিলো, কেন দিলো, কী কারণে দিলো — এইসব বৃত্তান্ত জানার আগ্রহ পার্কবাসীর চোখেমুখে প্রকট হয়ে ওঠে। এই প্রথম লাল মাফলারের বিরক্ত লাগে। ছিটগ্রস্ত মহিলা ব্যাপারটা খারাপ না, কিন্তু এরকম লাগামছাড়া ছিটগ্রস্ত হলে তো বিপদ! কোনো রকম আগাম ওয়ার্নিং ছাড়া দৌড় দেয়, ইয়ার্কি আর কি! একজন দাড়িওয়ালা টুপিপরা লোক গম্ভীর মুখে এগিয়ে এলো।

— ভাইজান, মহিলা পকেটমার নাকি? এখনও দৌড় দিলে ধরতে পারবেন।

—————————————————————-
আচমকা একটা গানের সুর লাভলির মাথায় চক্কর খেয়ে গেলো, আর সেই মুহূর্তে লাল মাফলার ওর সামনে এসে দাঁড়ালো। এ নির্ঘাৎ ভবিতব্য, আর কিছু না, নির্ঘাৎ তাই!

‘চলতে চলতে ইঁউহি কয়ি মিল গায়াথা, সারে রাহা চলতে চলতে…’

— পরামর্শ শেষ হলো আপনাদের? চলেন উঠি… সরি… মানে কী ঠিক করলেন… যাবেন আমার সাথে।

(– হ্যাঁ যাবো।)

— হ্যাঁ যাবো।

— বাসায় ফিরতে আপনার রাত হবে…।

— জানি।

লাভলি নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঝোলাটা কাঁধে নিলো আর তখুনি ও বাদামওয়ালাকে দেখে ফেললো। ওর বেঞ্চের ডান পাশের বিশাল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে আর ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ পড়তেই ঝটিতে উল্টামুখ হয়ে হাঁটা দিলো। এতক্ষণ বোধহয় ওখানেই দাঁড়িয়েছিলো। বেচারার ব্যবসা আজকে তাহলে আর বিশেষ জমে নাই। বাঙালি মরলোই পরের চরকায় তেল দিতে দিতে! (সম্পূর্ণ…)

অমর প্রেম অথবা আমার প্রেম

ইমরুল হাসান | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন

কথা ও কাহিনি

এইরম গাদলা দিনে বসে আবার মনে পড়লো লিবা’র কথা। আসলে এই কাহিনির কোন মাথা-মুণ্ডু নাই। আমি যত ভাবি আর বলতে চাই, ততই অবাক হই। কিভাবে এই কাহিনি বলা যাইতে পারে, যেখানে সমস্তু কিছুই অনির্দিষ্টতা, মনে করে নেয়া অথবা যেখানে অস্তিত্ব এতোটাই বিহ্বল যে চেতনা আর সাড়া দেয় না, সবকিছু এতোটাই স্পষ্ট এবং ধোঁয়াটেও একইসাথে… ভালোবাসার আসলেই কি কোন বর্নণা সম্ভব আর? এই দ্বিধা কাহিনিটার পরতে পরতে আর মাঝে মাঝে ভাবি এইখানে শুধু পরির্পাশ্বই আছে, কোন ঘটনা আর নাই। তারপরও অব্যক্ততার আরো আছে, কত যে কথা!

অথচ কথাগুলি কি আর বলতে পারে, যা বলতে চায় মন। অথবা যে দ্বৈততার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে সময়, শব্দ ও তার নিহিত অর্থগুলি তারা তো অসম্পূর্ণ, ব্যক্তির আড়াল খুঁজে। খুঁজে ভঙ্গিমার প্রশয়, যেন এই করে করেই পার পাওয়া গেলো!

কি বলতে বসেছি, আর বলছি কি! সবসময় এমনটাই ঘটে। কাহিনিটা আর বলা হয় না। বলার মতো কোন ঘটনাও হয়তো আসলে নাই। আসলে কোন কাহিনি-ই না, এইটা। কারণ আবার মনে হয় এইটা এখনো ঘটতেছে, প্রতিদিন। কথার ভিতরে জমা কাহিনি কি বাইর হয়া আসতে পারবে আর, অথবা ধরো এই যে কাহিনি, সে কি আর কথার ধার ধারে নাকি! ফাঁপা গহ্বর একটা, জীবনের – তারেই প্রেম বলে নাম দিছে লোকে?

বাইনোকুলার

বৃষ্টিতে ঝিরিঝিরি শব্দ। একদম সকাল থিকাই। দুপুরে একটু কমলো কি আবার বিকাল না হইতেই শুরু… এই অবস্থা গত তিন-চাইর দিন। বৃষ্টির উছিলা আর কত! আজকে তো যাওয়াই লাগে। কি উপায়? শিমা’র মাথায় বুদ্ধির অভাব নাই। কইলো, বৃষ্টির দিন সবকিছুই ঝাপসা, একটু দূরের জিনিসই দেখা যায় না, তার উপর সন্ধ্যার আগে যাওয়া যাইবো না, তাই দুইটা জিনিস লাগবো, একটা ছাতি আর একটা বাইনোকুলার… বাইনোকুলার? দুপুর বারোটার সময় বইসা বইসা এই প্ল্যান করতেছি।

বাইনোকুলারটা শিমার দুলাভাই আনছে, এখন ওর হেফাজতে আছে, বিকালবেলা ওইটারে কামে লাগাইতে হইবো… আমার মাথা আর তখন কোন কাজ করে না। ঠিক আছে, এইটাই প্ল্যান। ছাতিও আমি নিতে পারবো না। যেহেতু বাইনোকুলার নিবে শিমা, ছাতি নেওয়ার দায়িত্বও তাঁর। (সম্পূর্ণ…)

রৌরব (কিস্তি ৩)

লীসা গাজী | ৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ১১:২৬ পূর্বাহ্ন

কিস্তি ১কিস্তি ২

(কিস্তি ২-এর পর)

লাভলী লক্ষ্য করলো মেয়েটা পিছন দিকে তাকিয়ে মাথা হেলিয়ে আসছি বলেই দৌড় দিলো লাল মাফলারের দিকে।

( — একটা লোক ভালো মনে আপনের সঙ্গে কথা বলতে চায়, কথা বলেন। এত ভয় পাচ্ছেন কেন?)

— চিনি না জানি না, আন্দাজে কী কথা বলবো? ভয় পাবো না, যদি ছিনতাইকারী হয়?

( — জন্মে শুনছেন ছিনতাইকারী আলাপ পরিচয় করে ছিনতাই করতে আসছে? আর আপনে ঢাকার রাস্তায় কখনও বার হইছেন যে মানুষ চিনবেন? লোকটা হয়তো দুইটা রসের কথাও বলতে চাইতে পারে।)

—————————————————————–
– আমার মাথার ভিতরে একটা লোক আছে খুব যন্ত্রণা করে, তার সাথে মাঝে মধ্যে কথা বলি। আপনে কিছু মনে কইরেন না।

লাভলীর কথায় ছেলেটা লাজুক হাসলো, যেন মাথার ভিতরের লোকের ব্যাপারটা সে বুঝে ফেলেছে। কী একটু ভাবলো, তারপর সঙ্কোচ ঝেড়ে ফেলে বেঞ্চের যে কোনায় লাভলী বসেছে তার অন্য কোনায় জড়োসরো হয়ে বসলো। লাভলী আর ছেলেটার মাঝখানে নির্জন বেঞ্চ আর বাদামের ঠোঙ্গা পড়ে থাকে।

—————————————————————-

— লাল মাফলারের সাথে আমি রসের কথা বলতে যাবো কোন দুঃখে?

( — দুঃখ আপনের কম নাই আপুমনি, দুঃখ আছে। অবশ্য সে তর্কে গিয়া কোনো ফায়দা নাই। ঘটনা এখন যা ঘটবে চিন্তা করতেই মজা লাগতেছে।)

kisti-3-a.jpgমেয়েটা আবার দৌড়ে ফিরে এলো। দৌড়াদৌড়ির চোটে বেচারা হাঁপাচ্ছে। কথা বলতে গিয়ে দম হারিয়ে ফেলছে। শিউলি ফুলের মালা তিনটার বদলে এখন মাত্র একটা কব্জিতে ঝুলে আছে। বাকি দুইটার কী গতি হয়েছে কে জানে। মেয়েটা গেছে তো বেশিক্ষণ হয় নাই। মেয়েটা থুক করে এক দলা থুতু পায়ের কাছে ফেললো।

— আফা, হেই বেটা আপনের লগে কথা কইবো। ডাহুম? ওই দেখেন গাছের ছেমায়, এহন দেহা যায় পষ্ট।

( — আরে দেখেন না আপুমনি, পছন্দ হয় কি না?)

দেখলে কী দোষ, শুধু মাথাটা পিছনে ঘুরালেই লাল মাফলারকে দেখা যাবে। সন্ধ্যা না, রাত না, দুপুরের সময়, কী আর হবে। ওকে তো আর সবার সামনে গলায় ছুরি বসাতে পারবে না। যদি হঠাৎ ভয় লাগেই তাহলে ওই মাথা-মালিশ লোকটাকে ডাকা যাবে, যার মাথা মালিশ করা হচ্ছে তাকেও ডাকা যেতে পারে। ওরা দুইজন তো এখন মালিশ-টালিশ বাদ দিয়ে ঠায় তাকিয়ে আছে। কিছু একটা ব্যাপার ঘটছে বুঝতে পেরেছে বোধহয়। সুতরাং ইশারায় ডাকলেও কাজ হবে, পড়িমরি করে ছুটে আসবে। তাছাড়া আশেপাশেই জোড়ায় জোড়ায় অনেকেই বসে আছে, প্রেম করছে। বাদামওয়ালাও আছে নিশ্চয়ই, কাছে ধারে কোথাও। সাহস করে লাভলী এবার মাথাটা পিছনে ঘুরাতেই লাল মাফলারকে দেখে ফেললো। লাল মাফলার এখন আবার একটু এগিয়ে এসেছে, বেশ বোকা বোকা ভদ্র চেহারা। বয়সও মনে হচ্ছে ওর চাইতে অনেক কম। ওর চাইতে বয়স কম হওয়া অবশ্য কোনো বড় ব্যাপার না, অনেকেরই কম। আচ্ছা, এই লাল মাফলার ছেলেটা কেন ওর সাথে কথা বলতে চায়? লাল মাফলারকে এবার বেশ ভালো করে তাকিয়ে দেখলো লাভলী। ছেলেটার মধ্যে কেমন একটা গোবেচারা ভঙ্গি। লাভলী টের পেলো, ওর মন থেকে ভয় ভয় ভাবটা দূর হয়ে যাচ্ছে। লোকটা অপ্রস্তুত একটা হাসি দিয়ে আছে। গায়ে গলা বন্ধ খয়েরি রঙা সুয়েটার আর লাল মাফলার, কালো রঙের প্যান্ট, চুল ভালোই লম্বা — বাতাসের ঝাপটায় চোখে মুখে এসে পড়ছে। এই কারণে বয়স আরও কম লাগছে। কতো হবে বয়স — তিরিশ, বত্রিশ? নাকের নিচে সরু হালকা গোঁফ। লাল মাফলার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।

( — পছন্দ হইছে, পছন্দ হইছে।)

— তোমার মাথা। (সম্পূর্ণ…)

সাক্ষাৎকারে সরদার ফজলুল করিম

বিষয়: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক

মোহাম্মদ আলী | ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

razzak-1.jpg
আবদুর রাজ্জাক (জন্ম. নবাবগঞ্জ, ঢাকা ১৯১৪- মৃত্যু. ঢাকা ২৮/১১/১৯৯৯), ছবি. ব্রাত্য রাইসু ১৯৯৫

আবদুর রাজ্জাক প্রসঙ্গে এই সাক্ষাৎকারটি সরদার ফজলুল করিমের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের অংশ। যেটি নেওয়া হয়েছে প্রধানত শাহবাগ আজিজ মার্কেটের প্রকাশনা সংস্থা নন্দিতর কার্যালয়ে। সচরাচর সকাল এগারোটার দিকে সরদার স্যার সেখানে যান। মাসে একবার দুইবার।

sarder.jpg
…….
সরদার ফজলুল করিম (জন্ম. আটিপাড়া, বরিশাল, মে ১৯২৫), ছবি. নাসির আলী মামুন ১৯৯৯
…….
এভাবে চার পাঁচ বছর ধরে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মোহাম্মদ আলী। মাঝে মাঝে তার বাসায়ও গিয়েছেন। অন্য দুয়েক জায়গায়ও তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছে। মোহাম্মদ আলীর নেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে আবদুর রাজ্জাক ছাড়াও বিবিধ প্রসঙ্গ এসেছে। নিজেকে সক্রেটিসের নয় বরং প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের শিষ্য পরিচয় দিতে পছন্দ করেন সরদার ফজলুল করিম। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে আলাপচারিতার ভিত্তিতে অনেক বছর আগে সরদার তার বই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ/অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে আলাপচারিতা রচনা করেছেন। এ আলোচনায় সে বইয়ের প্রসঙ্গ এসে গিয়ে থাকবে। নন্দিত থেকে প্রকাশিতব্য গ্রন্থ সরদার ফজলুল করিম: জীবনজিজ্ঞাসা থেকে সাক্ষাৎকারের ‘আবদুর রাজ্জাক’ অংশটুকু এখানে প্রকাশিত হলো। বি. স.

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: মোহাম্মদ আলী

অনেকদিন ধরে মনে মনে ছিল, একদিন সরদার স্যারকে জিগ্যেশ করলাম, আচ্ছা, আপনি তো অধ্যাপক রাজ্জাকের ভাবশিষ্য ছিলেন। তাঁর জীবন-যাপন, চালচলন, আচার-ব্যবহার ও পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে কোথাও কিছু বলেন নি। এ বিষয়ে একটু বলুন না?

আবার তুমি প্রফেসর রাজ্জাকের কথা শুনবা? বলেই এক গাল হাসি দিলেন। তিনি অকৃতদার ছিলেন। খুব ভালো রান্না করতে পারতেন। পারতেন ভালো দাবা খেলতে। সব সময় পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। অন্যদের পড়ার জন্য নিজের লাইব্রেরি থেকে বই বের করে দিতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালো শিক্ষক সংগ্রহ করা ছিল তাঁর কাজের অন্যতম অংশ। আবার তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি পড়াতেন না। “রাজ্জাক স্যারের কল্লা চাই” বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিলও হয়েছে। আবার তিনি এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় অধ্যাপকও হয়েছিলেন।

sarder-mali.jpg
সরদার ফজলুল করিম ও মোহাম্মদ আলী, নন্দিত, শাহবাগ আজিজ মার্কেট, দোতলা

আমি স্যারকে বললাম, যতদূর জানি রাজ্জাক স্যারের মোট তিনটি সাক্ষাৎকার গৃহীত হয়েছে। যার একটি সাক্ষাৎকার আপনি নিয়েছেন এবং তার ভিত্তিতে একটি বইও লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ। অন্য দুটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হুমায়ুন আজাদ ও সেলিনা শিরীন সিকদার। তাঁর একমাত্র বক্তৃতা লিখিত আকারে প্রকাশিত হয়েছে, এখনো অপ্রকাশিত রয়েছে তাঁর অসম্পূর্ণ পিএইচডি থিসিস। তাছাড়া আহমদ ছফা তাঁকে নিয়ে একটি বই লিখেছেন, বইটির নাম যদ্যপি আমার গুরু। সলিমুল্লাহ খান তাঁর বক্তৃতা নিয়ে সমালোচনামূলক একটি বই লিখেছেন। এ ছাড়া তাঁকে মূল্যায়ন করার মতো তেমন কিছু হাতের কাছে পাওয়া যায় না। তিনি এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখে যান নি, যা দিয়ে তাঁকে মূল্যায়ন করা যায়? তাহলে আপনার কাছে রাজ্জাক স্যার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব?

তাহলে মজার একটা গল্প শোনো। (সম্পূর্ণ…)

যেভাবে কবিতা পাঠ আর আলোচনা ঠিক নয়

চঞ্চল আশরাফ | ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ১০:৪২ পূর্বাহ্ন

স্কুলের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যখন আমাদের কবিতা পড়ান, তখন তিনি প্রথমে সেটি শব্দ করে পড়ে শোনান, তারপর তা বোঝাতে গিয়ে বারবার ‘কবি বলেছেন’ কথাটি বলেন। পঙ্‌ক্তির পর পঙ্‌ক্তি তিনি ব্যাখ্যা করে, শেষে কবিতার মূল কথাটি জানিয়ে দেন বা সেই চেষ্টা করেন। এতেও তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; কবিতার কোন অংশটি গুরুত্বপূর্ণ, তিনি দেখিয়ে দেন এবং কোন প্রশ্ন ও কোন অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা পরীক্ষায় আসতে পারে, এলে উত্তরটি কেমন হবে — তা-ও বাতলে দেন। আমরাও বিনা প্রশ্নে তা গ্রহণ করি; কারণ, আমাদের তো পরীক্ষা দিতে হবে, সন্তুষ্ট করতে হবে শিক্ষককে। ফলে, আমাদের কবিতা বোঝা-না-বোঝা একান্তই পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং এই অবস্থা থেকে অধিকাংশ শিক্ষার্থী মুক্ত হতে পারে না বা তাদের উত্তরণ ঘটে না; সেই লক্ষ্য বা সচেতনতা তাদের থাকে না। যাদের থাকে না, কবিতা সম্পর্কে তাদের ধারণার পরিবর্তনও ঘটে না। তা না-ঘটুক, শ্রেণিকক্ষে শব্দ করে যা পড়ান শিক্ষক, তা ‘কবিতা’ কি-না, তা বুঝে ওঠার আগেই আমাদের সামনে তিনি এর ব্যাখ্যায়, শব্দার্থে, সারমর্মে মনোযোগী করে তোলেন। পাঠ্যপুস্তকের ওই রচনাটি ‘কবিতা’ কি-না, তা জানার অবশ্য উপায়ও তখন থাকে না। কারণ, শিক্ষকই তো পূর্বনির্ধারিতভাবে, বা, নিয়তির মতোই আমাদের সামনে একে ‘কবিতা’ জেনেই উপস্থিত হয়েছেন। অথবা, তিনি হয়ত ভাবেনও নি ওটা ‘কবিতা’ কি-না, হলে কী-কী শর্ত তাতে রয়েছে। না-ভাবার কারণ হল, পাঠ্যপুস্তক-প্রণেতারাই স্থিরনিশ্চিত করে দিয়েছেন — যা পড়ানো হবে তা-ই কবিতা; এতে কোনও প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
—————————————————————–
রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়াতে গিয়ে শিক্ষকদের বেশ ‘উহু-আহা’ করতে দেখেছি। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এর সঞ্চার ঘটলে এবং পাঠ-বিশ্লেষণের কোনও পদ্ধতি জানা না-থাকলে সেই ধ্বনি-প্রতিধ্বনির বিস্তার ঘটাই স্বাভাবিক। ফলে, কবিতার সমালোচনায় ‘লাইনটি চমৎকার’, ‘উপমাটি অতুলনীয়’, ‘কবিতাটি অসাধারণ’, ‘হয়ে ওঠে নি’, ‘ছুঁয়ে যায়’ ইত্যাদি উল্লেখের বিচিত্র গৎ তৈরি হয়েছে। বিশেষণ ব্যবহার তো রয়েছে বেশ আগে থেকেই।… বুঝতে পারি, বাংলা সাহিত্য-সমালোচনার একটা বড় অর্জন হল কবিদের জন্যে বিশেষণ আবিষ্কার করতে পারা; বুদ্ধদেব বসু এই পথ প্রথমে দেখান, শুদ্ধতম কবি সেটি চওড়া ও লম্বা করেছে।
—————————————————————-
‘কবি বলেছেন’ কথাটা স্কুল-কলেজ পার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের শ্রেণীকক্ষে পর্যন্ত আছড়ে পড়েছে। এটি শিক্ষকদের মুদ্রাদোষ হয়ে উঠল কেন? তারা কি জানেন না যে, কবিতার মধ্যেই কবির কথা বলা হয়ে আছে, ‘শ্রেণিকক্ষের কবিতা’য় অন্তত কবির কথা সম্পর্কে কারও দ্বিমত হওয়ার কথা নয়। আমরা এটা কখনও দেখি না, ‘কবিতা’টি সম্পর্কে শিক্ষক নিজের ধারণা ও ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছেন। তো, সবই যখন ‘কবি বলেন’ তখন আমরা অসহায় বোধ করি অথবা করি না; কারণ আমরা এই মর্মে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি — শ্রেণিকক্ষে কবিতার বক্তব্য নিয়ে শিক্ষকের কিছু বলার নেই, কবিই সব বলবেন; বছরের পর বছর একই কথা বলবেন; শিক্ষকের কাজ কেবল তার স্বরযন্ত্রটি ব্যবহার করা। কিন্তু কবিতা সম্পর্কে আগ্রহী পাঠক এক সময় জানতে বা বুঝতে পারে, শ্রেণিকক্ষে যে রচনা নিয়ে (সব) শিক্ষক একই কথা বলেন বছরের পর বছর, তা আসলে কবিতাই নয়। কারণ, সেটিই কবিতা, যার ব্যাখ্যা পরিবর্তনশীল এবং পাঠকভেদে ভিন্ন। পাঠ্যবইয়ে স্থান-পাওয়া ‘কবিতা’গুলো ব্যর্থ, কারণ, যে-ব্যাখ্যা নির্ধারণ করা হয় এগুলোর জন্যে, তার বাইরে যাওয়ার যোগ্যতা বা সামর্থ্য এরা বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছে। নিশ্চিতভাবেই, রচনাটি বরণ করেছে পদ্যত্ব — কেননা, তার ভাষার মৃত্যু ঘটেছে, বেঁচে আছে কেবল সাহিত্যের ইতিহাসের খুব ক্ষুদ্র ও নিরীহ ইউনিট হিসেবে; যদিও শ্রেণিকক্ষে এর দাপটের সীমা নেই। আমরা ধরে নিতে পারি, একসময় কবিতা হিসেবে এগুলোর প্রকাশ ঘটেছিল, হয়তো এগুলোর ছিল অনেকান্ত পাঠ ও ব্যাখ্যা; ভাষার গতিশীলতার সঙ্গে টিকে থাকতে না-পারায় আজ এই দশা হয়েছে: একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যায় এটি স্থির হয়ে গেছে, সারমর্ম বলে যা বোঝানো হয়, তাতেই থমকে আছে; এমন অবস্থা হয়েছে, ব্যাখ্যা বা সারমর্ম পড়লে কবিতাটি পড়ার আর দরকার হয় না; কবিতাটি একবার পড়লে প্রয়োজনই হয় না এর ব্যাখ্যা বা সারমর্ম খুঁজতে যাওয়ার, কেননা, সবই চূড়ান্ত হয়ে আছে ওই রচনায়, তাতে পাঠকের অংশগ্রহণের যে জায়গাটুকু শুরুতে ছিল, সময় তা কেড়ে নিয়েছে। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com