ভরযুবতী ও বেড়াল

সাগুফতা শারমীন তানিয়া | ২৮ december ২০০৮ ৪:১৩ অপরাহ্ন

চৈত্রমাসের দুপুর — সারা আকাশ কালো করে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। কারেন্ট চলে গিয়ে ঘটাং ঘটাং শব্দ করতে করতে মাথার ওপর পাখাটা বন্ধ হয়ে গেল। রঙ্গন চুপচাপ শুয়ে শুয়ে শোবার ঘরের ছাদ দেখছিল। পায়ের কাছে তুলতুলে বিড়ালছানা ঘুমাচ্ছে, রঙ্গন ওর নাম দিয়েছে ‘তুলোট’। অবশ্য ইদানীং মনে হচ্ছে ওর নাম হওয়া উচিত ছিল ‘উদরপরায়ণ’। ভরপেট খেয়েদেয়ে ভাতঘুম দিচ্ছে পড়ে পড়ে। রঙ্গন বসে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল। তার চুল প্রচুর — অনিঃশেষ সেই ভার দীর্ঘক্ষণ জট ছাড়াতে হয়। অসুখের পর চিরুনী ভরে ভরে চুল উঠছে ওর।

danay.jpg
অলঙ্করণ: সাগুফতা শারমীন তানিয়া

আয়নার রঙ্গনের মিশমিশে চুল, নজরুলের একটা পুরনো গানে ছিল না, ‘চাঁচড় কেশ’ — ঐ রকম, ঘন আর ঢেউ খেলানো। রঙ্গন তার জন্যে খুব মানানসই নাম। ফুলের গুচ্ছের মতো তার মুখ হাসি-হাসি। এমনকি যখন সে হাস্যমুখী নয়, তখনো তার দুইচোখে হাসির বাতি জ্বলতে থাকে।

বাইরে দুদ্দাড় বাতাস দিচ্ছে। বৃষ্টি একটু ধরে এসেছে। কার একটা লাল ব্লাউজ উড়ে এসেছে বারান্দায়।

পুরো একমাস জন্ডিস-এ ভুগলো রঙ্গন। এই একমাস সে বাড়িতেই ছিল। হল থেকে চলে এসেছে অসুখ শুরু হবার সাথে সাথে।

বাড়িতে থাকতে রঙ্গন ভালোবাসে। হলের সারি-সারি বাটির ডাল আর গিলা-কলিজার ঝোল, হলের বারোয়ারি অন্তর্বাস, বুয়াদের অবিরাম কলহ থেকে মুক্তি। শুধু তাই না — কেমন যেন একটা আন্তরিক স্বস্তির আবহাওয়া আছে ঘরে। গলার টোপাজ বসানো সরু চেনটা খুলে রেখে ভুলে গেলেও ক্ষতি নেই। মনে করে ঠিক সময়ে খেতে না বসলেও বরাদ্দের কমতি নেই।

যদিও এবারের বাড়িতে থাকাটায় আনন্দ ছিলনা। শুয়ে শুয়ে পৃথিবীর আহ্নিক গতি টের পাওয়া, বেলের শরবত-ডাবের পানি আর হলুদ-মরিচ ছাড়া স্টু। কাহাতক খাওয়া যায়! (সম্পূর্ণ…)

‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন’-এর ধারণাগত এবং অনুশীলনগত পাটাতন প্রসঙ্গে

ভাস্কর্য-ভাঙা পরবর্তী আন্দোলনপ্রবাহের সংকট ও আমাদের বিহ্বলতা

| ২৬ december ২০০৮ ৬:৩৬ অপরাহ্ন

লেখাটি নির্মাণাধীন বাউল ভাস্কর্য ভাঙা ও অপসারণের প্রতিবাদে ঢাকার চারুকলা অনুষদকে কেন্দ্র করে গঠিত ‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন’-এর মতবিনিময় সভায় প্রচারিত বক্তব্যের [‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন’: আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষিত] সমালোচনা হিসাবে যৌথভাবে লিখিত। উল্লেখ্য, সভাটি ঢাকার দৃক গ্যালারিতে ১২ ডিসেম্বর ২০০৮-এ অনুষ্ঠিত হয়। — বি. স.

স্বাধীন সেন, মানস চৌধুরীমাসউদ ইমরান

এই নাতিদীর্ঘ রচনাটিকে দেখা দরকার বিগত কয়েক মাস যাবৎ মহানগরের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির গতিপ্রকৃতির সঙ্গে সংমিশ্রণের প্রশ্নে আমাদের চলমান অস্বস্তির একটা প্রাথমিক দলিল হিসেবে। এই সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি-প্রণালীর মুখ্য অনুঘটক হিসেবে সাম্প্রতিক ভাস্কর্য-ভাঙা ও তৎপরবর্তী নাগরিক আন্দোলন এখানে স্মর্তব্য। রচনাটিতে একটি নথিকে কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত করা হয়েছে। সেটা করা হয়েছে নথিটির গুরুত্ব বিবেচনা করেই, এবং সূত্রানুযায়ী অপরাপর প্রসঙ্গ এখানে পর্যালোচিত হয়েছে। আলোচ্য নথিটি অধুনা সংগঠিত ‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন’-এর ঘোষণাপত্র হিসেবে ১২ই ডিসেম্বর ২০০৮-এ এই সংগঠনের মত বিনিময় সভায় — দৃক গ্যালারিতে — প্রচারিত। এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বিমানবন্দরে ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার পর গড়ে-ওঠা নাগরিক আন্দোলনের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নির্ণয়ের লক্ষ্যে। তবে উল্লেখ করা দরকার যে, মতবিনিময় সভার দিন ঘোষণাপত্র হিসাবে পাঠ ও প্রচার করা হলেও কয়েকজন সহকর্মী নথিটিকে প্রাথমিক-পর্যায়ের আর তাড়াহুড়ো-করে-তৈরি করা বলে চিহ্নিত করেছিলেন। পরবর্তী নথির জন্য আমাদের সাগ্রহ অপেক্ষা আছে। প্রাসঙ্গিকভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে ওই ভাস্কর্য ভাঙার (মতান্তরে অপসারণের) ঘটনার পর একাধিক মোর্চায়, এবং বিশেষভাবে চারুকলা চত্বরকে ঘিরে, নানান রকমের আন্দোলন সংঘটিত করবার প্রয়াস ঢাকা শহরের সাংস্কৃতিক প্রবাহের চিন্তকবর্গ নিয়ে চলছেন। পেশাগতভাবে হিসেব কষলেও এই বিষয়ে আমাদের অসম্পৃক্তি নৈর্লিপ্তিজনিত নয়।

5.jpg
‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন’ আয়োজিত মতবিনিময় সভা

বাংলা? কেন?
‘বাংলা’ পদটিকে প্রায়শই দাবি করা হয়ে আসছে জাতীয়তাবাদী চেতনার বহিস্থঃ একটা ধারণা হিসেবে যেখানে ভৌত পরিসরকে জাতীয়তা কিংবা ভাষাভাষিতার প্রশমনকারী হিসেবে প্রক্ষেপ করা হয়। এর অন্তঃসারশূন্যতা দেখার চেয়ে, ঐতিহাসিকভাবেই, ভণিতা হিসেবে একে দেখা কার্যকরী। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রচারিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণা ও চর্চা থেকেই তা অনুধাবন করা সম্ভব। ‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন’-এর নামে কেন্দ্রীয় গুরুত্বের জায়গায় ‘বাংলা’ পদটি হাজির, এবং আমাদের আশঙ্কা, এটি ব্যবহৃত হয়েছে পদটির ক্রমাগত-সরলীকৃত ঐতিহাসিক নির্মাণের উপর দাঁড়িয়ে এবং জাতীয়তাবাদের বিতর্কটিকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে। আমাদের এই অনুধাবনের প্রেক্ষিত হচ্ছে বাংলা সম্পর্কিত বলবান পাবলিক ডিসকোর্স যেখানে ‘হাজার বছরের বাংলা’র অতিকথন বাংলা পদটিকে উদ্ভাসিত করে।

এই বাংলা আধিপত্যশীল বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে আমরা ঠাহর করি। আধিপত্যশীল ইতিহাস চর্চায় এবং এর সরল পাবলিককৃত জবানে ‘হাজার বছরের’ ইতিহাসের কথা বলা হয়। হাজার বছর তো দূরের কথা, বাস্তবে আকবরের সুবা বাংলা আর আজকের ‘বাংলা’ স্থান হিসেবেই এক এলাকাকে নির্দেশ করে না। (সম্পূর্ণ…)

‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন’: আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষিত

| ২৬ december ২০০৮ ৬:০৪ অপরাহ্ন

অক্টোবরের ১৫ তারিখে কওমি মাদ্রাসার কয়েকশ ছাত্রের হুমকির মুখে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশ মুখ থেকে নির্মাণাধীন বাউল ভাস্কর্য সরিয়ে নেয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এর পরপরই নির্মাণাধীন বাউল ভাস্কর্য ভাঙা ও অপসারণের প্রতিবাদে ঢাকার চারুকলা অনুষদকে কেন্দ্র করে ‘‌সচেতন শিল্পী সমাজ’ নামে একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে। চারুশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী, নাট্যকর্মী, আলোকচিত্রী, চলচ্চিত্রকর্মী, সাহিত্যকর্মী ও স্থপতিসহ সংস্কৃতির বিবিধ শাখার কর্মী ও সরকারী-বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এই সংগঠনে যোগ দেয়। পরে ডিসেম্বরের ৫ তারিখে ‘সচেতন শিল্পী সমাজ’ চারুকলায় একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন’ নাম পরিগ্রহণ করে। নবগঠিত এই সংগঠন ডিসেম্বরের ১২ তারিখে ঢাকার দৃক গ্যালারিতে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সভায় আন্দোলনের পক্ষ থেকে ‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন: আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষিত” নামে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ ও প্রচার করা হয়। বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন-এর সৌজন্যে লেখাটি এখানে ছাপা হলো। বি. স.

4.jpg
ঢা.বি. চারুকলা অনুষদে সংবাদ সম্মেলন। এ সম্মেলনে ‘সচেতন শিল্পী সমাজ’ এর নাম বদলে ‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের জনগণের প্রাত্যহিক জীবনযাপনের মতো সাংস্কৃতিক অঙ্গনও কখনোই নিরুপদ্রব ছিল না। নানান গণবিরোধী শক্তির খবরদারি ডিঙিয়েই এখানে সংস্কৃতিকর্মীদের জনগণের কাছে হাজির হতে হয়। সম্প্রতি ধর্মের নামে সেখানে নানামুখী উৎপাত সৃষ্টি করার ঘটনাও আমরা লক্ষ্য করছি। শুধু তাই নয়, ভাস্কর্যের ওপর আঘাত আসছে, নাটক নিষিদ্ধ হচ্ছে, এমনকি নাট্যকারকে হত্যার ঘোষণাও আমদের দেখতে হয়েছে। আমরা এও খেয়াল করছি যে, জাতীয় জীবনের সংকটময় মুহূর্তেই ধর্মের নামে উগ্র ও অসহিষ্ণু কার্যকলাপ দিয়ে ক্রমশ জনগণের অধিকার ও মুক্ত সংস্কৃতি চর্চার পরিসরকে সঙ্কুচিত করার প্রতিক্রয়াশীল কর্মসূচিই আসলে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এবং সব সরকারের আমলেই এ ধরনের কর্মসূচি প্রকাশ্যে বা গোপনে রাষ্ট্রীয় মদদও পেয়ে আসছে। অথচ এসব বিষয়কে মোকাবেলা করবার মতো কার্যকর সাংস্কৃতিক আন্দোলন যথেষ্ঠ মাত্রায় নেই। সেকারণেই আমরা অন্য অন্য সংগঠন ও ধারার পাশাপাশি নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার জন্য ‘বাংলার সংস্কৃতি আন্দোলন’-এর মঞ্চ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি।

এর সূত্রপাত বিমানবন্দরের সামনে (লালন চত্বরে) ভাস্কর্য ভাঙ্গার প্রতিবাদে চারুশিল্পীদের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ থেকে। প্রতিবাদ ক্রমশই আন্দোলনের রূপ নিতে থাকে। ধর্মের দোহাই তুলে শিল্পচর্চা বন্ধের ওই ঔদ্ধত্যে বিভিন্ন স্তর ও বিভিন্ন মাধ্যমে চর্চারত প্রতিবাদমুখর শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের একটি বড় অংশ চারুশিল্পীদের সঙ্গে একাত্ম হন। ওই সম্মিলিত সংহতি থেকে অনেকটা স্বতস্ফূর্তভাবেই গড়ে ওঠে ‘সচেতন শিল্পী সমাজের’ ঐক্যমঞ্চ। এই মঞ্চ গোড়া থেকেই চারুকলা, সংগীত, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, নাটক, সাহিত্য, স্থাপত্যসহ সৃজনশীলতার সকল ক্ষেত্রে সক্রিয় ব্যক্তিবর্গের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছে, তাদের সাধ্যমতো সামিল করেছে প্রতিবাদের সারিতে। বিশেষত সংগীত শিল্পীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে চারুকলার বকুলতলায় লাগাতার প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই ইস্যুতে সব সংস্কৃতিকর্মীদের কাছাকাছি আসবার একত্রে বসবার ক্ষেত্র তৈরি হয়। শুধু অনুষ্ঠানের মঞ্চেই নয় সেই সংহতি রাজপথ পর্যন্ত প্রসারিত হয়। গোড়া থেকেই আমরা প্রতিবাদের নতুন ভাষা নির্মাণে সচেষ্ট ছিলাম। সে সময় সবার অংশগ্রহণে লাগাতার ২৩ দিন ধরে রাজপথে গানের মিছিল, পুতুল মিছিল, আলোর মিছিল, পতাকা মিছিল করেছে সচেতন শিল্পী সমাজ। গান, নাটক, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সংহতি জানিয়েছেন শত শত মানুষ। দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে এই লাগাতার প্রতিবাদের মিছিলে সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা এবং স্বতস্ফূর্ত জনতার অংশগ্রহণে দারুণ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। শিল্পচর্চার ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-ছাত্রীরা রাজপথে নেমে প্রতিবাদের মুষ্ঠি তোলে। সংস্কৃতির উপর আগ্রাসন রুখে দাঁড়ানোর শ্লোগান নিয়ে সকল অপশক্তিকে রুখে দাঁড়ানোর শপথ নেয়। (সম্পূর্ণ…)

ছয়টি কবিতা

গোলাম কিবরিয়া পিনু | ২১ december ২০০৮ ৩:৪৩ অপরাহ্ন

রাত দীর্ঘতর

যেভাবে রাত এসেছে সেভাবে দিন আসেনি
রাত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর —
হিমযুগ নিয়ে ঠাণ্ডা-কাতরতা
মল্লিকার বন ছুঁয়ে শুয়ে আছে অন্ধকার
আমি ঘরের ভেতর — জানালা বন্ধ দ্বার!

অমা নিয়ে অনুজীব স্তরে স্তরে
সবকিছু সংক্রমণে নিয়ে যাচ্ছে —
হিংস্রপ্রাণীরা আরো হিংস্র হওয়ার গন্ধ পাচ্ছে!

রাত যেন চুল এলিয়ে দিয়েছে
কালো-সখ্য নিয়ে
বিভাবরী আরো যৌবনের কাছে
নিশীথিনী আরো তারুণ্যের কাছে!

অনির্দিষ্টকাল নিয়ে বহুকাল হলো
রাত এসেছে — দিন আসেনি !
ছায়াবিতানের মধ্যে কৃষ্ণপক্ষ-অমাবস্যা
আর সূচীভেদ্য অন্ধকার !

ধনাত্মক

ঘোর অন্ধকার নিয়ে তার কাছে যাই
দেখি, কতটুকু রূপদক্ষ-আলো আছে?

আলোতৃষ্ণা ও বিচ্ছুরণের শক্তি নিয়ে
আমিও উঠতে চাই জেগে —
আমি কেন কোদালেমেঘের কণ্ঠলগ্ন?

অন্ধগলি থেকে ঘুরপথ
রূপবিন্যাসের দোলা পাই,
ছিটকিনি খুলি — ধনাত্মক হয়ে উঠি।

অন্তর্গৃহ আজ গৃহের ভেতর নেই
ময়ূখ হয়েছি আজ বিদ্যুৎপ্রভায়।
(সম্পূর্ণ…)

ভাষাবিজ্ঞানী ড. মনিরুজ্জামান-এর সাক্ষাৎকার

এহসানুল কবির | ১৪ december ২০০৮ ১:১৭ অপরাহ্ন

dr.jpg
ড. মনিরুজ্জামান (জন্ম. নারায়ণগঞ্জ ১৫/২/১৯৪০)

ভাষাবিজ্ঞানী ড. মনিরুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৬০ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি করেন ভারতের মাইশুর বিশ্ববিদ্যালয় হতে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সদ্যঅবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। কর্মজীবনের নানা সময়ে নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি এবং কলা অনুষদের ডিন ছিলেন। তিনি ‘লিঙ্গুইস্টিক সোসাইটি অভ ইন্ডিয়া’,‘ দ্রাবিড়িয়ান লিঙ্গুইস্টিক এসোসিয়েশান’, ‘ফিলোলজিক্যাল এসোসিয়েশান অভ গ্রেট ব্রিটেন’ সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সংস্থা ও সংঘের জীবনসদস্য। ভাষা, সাহিত্য ও ফোকলোর বিষয়ে এযাবৎ তাঁর ২৭টি বই এবং শতাধিক গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।একাধিক সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ভাষা, সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি নিয়ে তাঁর সাথে কথা বলেন এহসানুল কবির।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: এহসানুল কবির

এহসানুল কবির: আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠার কথা দিয়ে শুরু করি।

মনিরুজ্জামান: আমার জন্ম সম্পর্কে আমার দাদাকে নিয়ে একটা মিথ আছে। উনি খুব স্পিরিচুয়াল লোক ছিলেন। আমার মায়ের কোনো পুত্রসন্তান বাঁচত না। পরপর দুটো পুত্র মারা যাওয়াতে আমার দাদা নাকি আল্লাহ্র কাছে দোয়া করলেন, ‘আমাকে নিয়ে যাও, আমার ছেলেকে পুত্রসন্তান দাও।’ দাদা মারা যাওয়ার পর আমার বড় ভাই হলেন, উনি বাঁচলেন। এরপর আমি হলাম (১৯৪০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি)। আমার পরিবারের সবার বিশ্বাস, দাদার ঐ দোয়ার কারণেই আমার বড়ভাই আর আমি বেঁচে যাই। আমার বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার, দারোগা। তৎকালীন চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত ঝিনাইদহে কর্মরত ছিলেন। ওখানেই আমার জন্ম। প্রথমে নৈহাটি, পরে বরানগর, এরপর চব্বিশ পরগনার নামকরা স্কুল ডায়মন্ড হারবারে আমার পড়াশোনা। ৪৭-এর দেশভাগের সময় চলে আসি পৈত্রিক গ্রাম আদিয়াবাদে।
—————————————————————–
এটা [‘পূর্ববঙ্গের ভাষা’] একটা লিংগুইস্টিক ক্যায়োস ছাড়া আর কিছুই না। এর জন্মটাই একটা প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান থেকে। উনবিংশ শতকে মান বাংলা প্রণয়ন ও প্রচারের ক্ষেত্রে সাহিত্যকে ভিত্তি ও মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আর এখন যে-ভাষারীতি প্রচলনের কথা বলা হচ্ছে সেটা করা হচ্ছে বিনোদন-মাধ্যমকে ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে আদৌ মানসম্পন্ন সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব কিনা এ-বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। যা দেখতে পাচ্ছি তাতে অযোগ্যের হাতে পড়ে ক্রমাগত অবক্ষয়ের দিকেই এটা যাবে। আমার তো মনে হয় না এর সঙ্গে সত্যিকারের সাহিত্যিকেরা থাকবেন, শিক্ষকেরা থাকবেন। সাহিত্যিক আর শিক্ষকদেরকে বাদ দিলে একটা জাতির আর থাকে কী?
—————————————————————-
আদিয়াবাদ তখন ঢাকা জেলার অন্তর্গত, এখন নরসিংদি জেলায়। দেশে এসে গ্রামের স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হই। দেশে আসতে আমাদের খুব সমস্যায় পড়তে হয়। কারণ স্বরাজ আন্দোলনের কর্মীদেরকে — সরকারের ভাষায় ‘ডাকাত’ — সাহায্য করার কারণে আর শাহাদাৎ হোসেন, নজরুল ইসলাম এদের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে আমার বাবা পাকিস্তান সরকারের রোষাণলে পড়েন। আমার বড়ভাই এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। দাদা কেন মারা গেলেন, বাবার ওপর কেন এত টর্চার — এসব বলতে বলতেই তো উনি মারা গেলেন। আমার ছোটবোনের মৃত্যুটাও খুব করুণ। দেশে ফেরার পথে পানি খেতে চাইলে লোকজন তাকে ডাব এনে দেয়। সে তখন প্রেগন্যান্ট। পানিটা অল্প খাওয়ার পরেই বুঝতে পেরেছিল ওটাতে বিষ মিশানো। বেশি খায় নি, কিন্তু যেটুকু খেয়েছিল সেটা স্লো পয়জনিঙের কাজ করেছিল। বাচ্চাটা হওয়ার পরই সে মারা যায়। অসাধারণ সুন্দরী ছিল। কাননদেবীর সঙ্গে তার খুব ভালো যোগাযোগ ছিল। তার কারণেই কাননদেবী একবার আমাদের বাড়িতে আসেন, জহর গাঙ্গুলীকে নিয়ে। এসব কারণে বুঝতে পারি, আমাদের পরিবারটা তখন থেকেই এনলাইটেন্ড ছিল। এই যে বিভিন্ন সাহিত্যিকদের সঙ্গে বাবার সংযোগ, এটা তো কোনো পুলিশের দারোগার ক্ষেত্রে হওয়ার কথা না। বাবা খুব ভালো সাহিত্যবোদ্ধা ছিলেন। (সম্পূর্ণ…)

স্মৃতি, মিথ ও তরুণ ঘোষের চিত্রকলা

আশরাফুল শাওন | ১২ december ২০০৮ ১২:১৬ অপরাহ্ন

অনেকক্ষণ গল্প করার সময় হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, কী ব্যাপার আপনি চুপ করে আছেন কেন — মানে আপনি মনে করতে থাকবেন, ভাবতে থাকবেন। তরুণ ঘোষের কর্ম একভাবে বিক্রিয়া করে। তাকে একটা ভ্রমণের মধ্যে আবিষ্কার করা যায়। তরুণ ঘোষ বললেন, ‘আর্টিস্ট আসলে প্রতিটি মানুষ। কেউ শিল্পকে ধারণ করতে পারে কেউ পারে না। কেউ ক্রিয়া করতে পারে, কেউ পারে না।’

tarun-g2.jpg…..
তরুণ ঘোষ
……
তরুণ ঘোষ কোনো কাহিনী আঁকার চেষ্টা করেননি, এঁকেছেন অনুভূতি। প্রতিদিন খাদ্য বিপাকের মতো মানুষের মধ্যে ক্রিয়াশীল হাজার হাজার মিস্ট্রি। শৈশবের বয়ে চলা নদীটাই স্মৃতির প্রতীক। তার ভিতর ডুব দেয়ার অনুভূতিটাই একটা রিফ্লেকশন। তারপর ক্রমাগত সংঘর্ষ বাঁধছে ঘোরের মধ্যে। খেলা চলছে। মায়ার রংরূপ বেদনা তামাশার ভেতর আবিষ্কারের তাড়না। ১৯৭১-কে মেট্রিকের ছাত্র তরুণ যে ভঙ্গিতে প্রত্যক্ষ করেছেন — ‘এই মুহূর্তে একজন মারা যাচ্ছে একজন বেঁচে যাচ্ছে চারপাশ থেকে নানান খবর আসছে।’ মুক্তিযুদ্ধকে ফেলে আসা নানা বিষয়ের অনুভূতিতে এঁকেছেন। দৃষ্টির অস্থিরতা নামে সেই সিরিজের একটি কাজ ‘১৯৭১-১’।
1971-1.jpg
১৯৭১ – ১, কাগজে কলম, ২৫ সেমি x ১৩.৫ সেমি। ১৯৮২।

কাজটি করেছেন ১৯৮২ সালে ভারতের বরোদায় মাস্টার্স পড়বার সময়। সে সময় এই সিরিজের বড় বড় অনেক কাজ তিনি করেছেন। সিরিজ-৭১-এ প্রকাশভঙ্গির অস্থিরতা ফর্মের গতিশীল বিন্যাস চোখে পড়ে আর মুখগুলো নানান ভঙ্গিতে লেপ্টে থাকে। যেন ফিসফাস শোনা যায় আবার সিসিফাসের গড়িয়ে পড়া পাথরখণ্ড মনে হয়। ক্যানভাসে চোখ ঘুরতে থাকে। ওই বয়সে শিল্পীর মনে মাধ্যম ও বিষয় নিয়ে নানানভাবে শিল্পচর্চার যে ডিসকার্সন চলে তাতে মুক্তিযুদ্ধের অনুভূতি সোশিও পলিটিক্যাল একটি চেতনাকেই বহন করে। তরুণ ঘোষ বলেন, “জীবনেরও তো অনেক অনুভূতি আছে। সেগুলোও তো আঁকতে চাই। সেগুলো কীভাবে আঁকবো, সেগুলো আঁকার ভাষাটা কী হবে। ছোটবেলায় দেখা সেই লোকজ পুতুল, পাল পাড়ায় দেখা সেই রং আমাকে নাড়া দেয়। তাই ছোটবেলাকেই খোঁজা। দুয়ারের কাছে বাটিতে লাল, নীল, সবুজ রংগুলো থাকতো — আমাকে এখনো ভাবায়। (সম্পূর্ণ…)

কক্ মানে মোরগ: উদ্ভ্রান্ত মোরগজাতি ও তাহাদের বিহ্বল প্রতিপালকগণ

মানস চৌধুরী | ১১ december ২০০৮ ১:২০ অপরাহ্ন

[এই গল্পের সকল পাত্রপাত্রী অকল্পনীয়, ফলে সত্যিকার দুনিয়ার সঙ্গে নানাবিধ মিল পেয়ে যাওয়া আকস্মিক নয়।]

শালা হতে আমি শালায় চলি। আমি অতিথিশালা থেকে বেরিয়ে চিত্রশালার দিকে হাঁটি। খুবই কাছে বিধায়, হাঁটা ভিন্ন অপর কিছু না করলেও চলে। কিন্তু হাঁটতে শুরু করেই রিকশাগুলোতে আমি উত্তেজিত হই। এবং একটাতে চড়ে বসি। রিকশাওয়ালা জানতে চায় না যে কই যাব। ফলে আমার মনে পড়ে যে আমি বলি নাই। তাই বলি। বলি ২৭ নম্বর। তাকে বলা যেত যে আমি চিত্রশালায় যাব। কিন্তু নিরর্থকতার ভয়ে আমি বলি না।

চিত্রশালায় দু’জন থাকে উর্দিপরা। তারা বাইরের দরজার দিকে থাকে। এদের অফিসিয়াল দায়িত্ব নিরাপত্তা দেয়া। কিন্তু আসলে এরা সালাম দেয়। আমাকে সালাম দিতে তাদের কোনো সমস্যা হলো না। তবে এরাই যদি চিত্রশালায় না দাঁড়িয়ে পানশালা কিংবা ভিসাশালা কিংবা অন্য যেকোনো শালায় দাঁড়িয়ে থাকত, আমাকে সালাম না দিয়ে জিজ্ঞাসা করত কই যাব। এসব কারণে অনুপ্রবেশের জন্য চিত্রশালা ইদানীং আমার পছন্দ। অনুপ্রবেশ আরামদায়ক হওয়া বাঞ্ছনীয়। চিত্রশালা আসলেই ভাল জায়গা। সালাম পেলে আমি শুধাই কেমন আছেন। এটা নিয়ম করে আমি করি। কিন্তু এই নিয়ম জি৪ বাহিনীর লোকজন শেখে না বিধায় বিহ্বল হয়। আমি উত্তরের অপেক্ষা না করে অনুপ্রবিষ্ট হই।

অনুপ্রবিষ্ট হলে পরে আবার একজন উর্দিপরা থাকে। সে তখন কাচের দরজা খুলে দেয়। আমি আগে দু’দিন বলবার চেষ্টা করেছি যে কাচের দরজা আমি সঠিকভাবে খুলতে শিখেছি। কিন্তু সে-কথায় সে কান দেয় না। দরজায় হাত দেয় খালি। এই দরজা খোলার উর্দিদের নিয়ে আমি একটা হিসেব কষে দেখিয়েছিলাম লিপু আর সায়েমাকে। আমার সঙ্গে বিলাতি ইত্যাদি বা এটসেকট্রার দারোয়ানেরা মাখামাখি শুরু করলে লিপু ও সায়েমা নিকট থেকে দেখে, ও উদ্বিগ্ন হয়। এবং কৌতূহলী হয়। আমি উদ্বেগের নিবন্ধন করি না এবং কৌতূহলের করি। ওদেরকে বলি, এসবের সঙ্গে বিপ্লবের কোনো বালেরও সম্পর্ক নেই। তবে আমি জানি যে ওরা ১৫টা কফির বেতন পায়। আমি যে জানি সেটা ওরা টের পায়। তাতেই মাখামাখি হয়। তখন বিহ্বলভাবে লিপু এবং হতভম্বভাবে সায়েমা হিসাবটা পুনরায় কষে। বিড়বিড় করে। এককাপ কফি ১২০ টাকা দরে ১৫ কফির দামই হয় ওদের মাসোয়ারা বা কাছাকাছি কিছু। বিহ্বলতায় ও হতভম্বতায় তাদের উদ্বেগ লোপ পায়। আসলে কৌতূহলও। বরং ওরা আমাকে নিয়ে আরও কৌতূহলী হয়। যদিও মেলা বছর ধরে আমাকে চেনে ওরা। কিংবা কিছু একটা হয়, আমি বুঝি। (সম্পূর্ণ…)

কামলাঘাটা

অবনি অনার্য | ৯ december ২০০৮ ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

মেডিকেল পূর্বগেটের পুবপাশে, কিংবা রায়েরবাজার বস্তির পাশের খোলা মাঠে, অথবা তারাগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম-উত্তর বা উত্তর-পূর্ব পাশে রাস্তার ধারে জড়ো হয়ে আছে জনাদশেক বা পনেরো বা আঠারো নরনারী, যাদের বয়স বিশ-বাইশ-ছত্রিশ-ছাপ্পান্ন বা এইমতো, কিন্তু কার বয়েস কতো এইসব নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন বৃথা, কেননা কলাকুশলীরা নিজেরাই নিজেদের বয়েস সাধারণ গণিতের হিসেবে গণনা করতে পারে না, বড়জোর তাদের বয়স সম্পর্কে একটা অনুমান করা যেতে পারে তাদের মুখ থেকে শোনা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলী দিয়ে, তাও আবার পাল্টা-প্রশ্নের উত্তর সাপেক্ষে, এই যেমন ঘটনা তিনি নিজের চোখে দেখেছেন কি-না, নাকি তার বাবা কিংবা দাদা, বা দাদার বাবার অথবা হতে পারে মা কিংবা নানী বা নানীর মা’র মুখে শুনেছেন — এইসব বিচার করে। জয়নালের, কিংবা হতে পারে সে নুরুল বা কামরুল বা জলিল বা বদরুল, তার কিংবা তাদের, গায়ে আজ সবুজ রঙের শার্টটা নেই, আলকাতরা রঙের পলিস্টারের কোর্তাটাও নেই, এমনকি বুকপকেটঅলা নোংরারঙের পাঞ্জাবিটাও নয়। ছাইরঙা ফুলহাতা গেঞ্জি, যা এই ভয়ংকর শীতে সোয়েটারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারে তেমন বাধা নেই, ঝুলে আছে বদরুলের হাতের কব্জি পেরিয়ে খানিকটা। মুহূর্তের মধ্যেই হাত দিয়ে হয়তো তার কানের পাশটা, বগলের পেছনটা বা পিঠের মাঝবরাবর কিংবা রানের কুঁচকি চুলকানোর চেষ্টা করে, অথবা করে না। পায়ের পাশে বা সামনে পড়ে থাকা কোদাল আর বাঁশের ঝুড়িটা অনড় থাকে, অন্তত যতক্ষণ না জয়নালের পায়ের ঠেলায়, কিংবা মৃদু ধাক্কায় সেগুলোর অবস্থানের পরিবর্তন হয়। এতো ঘটনার মধ্য দিয়েও তবু কুয়াশা ঝরছে অনবরত, বা থেকে থেকে, এবং মাথার উন্মুক্ত চুলগুলো কুয়াশায় শাদারঙ ধারণ করলেও কামরুলের মনে পড়ে বগুড়ার কিংবা গাইবান্ধা বা পায়রাবন্দের কোল্ডস্টোরেজের স্মৃতি। শেষদিন মালিকের পক্ষ থেকে বকেয়া পরিশোধের ঘোষণা থাকলেও, এবং সেটা পাবার শতভাগ সম্ভাবনা থাকলেও, জলিলের মনটা বিষাদময় বা অন্য কোনো মনখারাপকরা-অনুভূতিময় হয়ে ওঠে। সকাল ৭টার সার্জারি ক্লাস বা সাড়ে সাতটার বনানীগামী বাস কিংবা সাতটা পয়ত্রিশে হাজিরাখাতায় সই করার লাইন ধরার জন্য তাদের পাশ দিয়ে যে আমি হেঁটে কিংবা রিকশায়, মাঝে মধ্যে টেম্পুতে চড়ে যাই, তাতে ঘটনার এইসব পরম্পরায় কিছুটা এদিক-সেদিক ঘটে, বটে — কিন্তু এতোসব ঘটনার কার্যকারণ নিয়ে তবুও সন্দেহ প্রকাশ করেন জাহাঙ্গীর মাসুদ বাদশা, কিংবা আবুল ফাতেহ হিমু, নাজমুল হক, শাহরিয়ার পারভেজ, এমনকি আফরোজ আল মামুনও। অথচ ডন কিংবা মিথুন, রুমানা কিংবা স্নিগ্ধা, এপি কিংবা দীনা (মানে বোরখাদীনা), অথবা এদের সকলেই কিন্তু এসব ঘটনার একটি কিংবা দুটি কিংবা কয়েকটির কিংবা অনেকগুলোর সাক্ষী। নুরুলের ঠ্যাং তবু ঠকঠকে কাঁপে, শীতে কিবা অন্য কারণে। (সম্পূর্ণ…)

গাদি

ইফফাত আরেফীন তন্বী | ৯ december ২০০৮ ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

বিকাশপর্ব
খেলার নাম জানতাম, গাদি … এর নিশ্চিত শ্রবণপ্রিয় কোনো নাম আছে। নামটা শুনেছিও, কিন্তু মনে করতে পারছি না। এই মনে না-করাটা প্রায়শই ঘটে। আর এই মনে-না-করতে-পারাটা অবধারিতভাবে কথক যে, তাকে সময়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়, ’বর্তমান’, ‘অতীত’, সাথে ’আনুমানিক ভবিষ্যৎ’ বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে একটা একটা ঘটনারূপে তৈরি করে, এবং কথক সেইসকল ঘটনাকে সত্যি বলে ধরে নেয়।

ঘটনা এক.
ছোট্টবেলা মল্লিকা নামে প্রতিবেশী বন্ধুটি স্বীয় দাসী মোমেনার পাঁচ টাকা চুরি করে মেরী বিস্কুট কিনে খেয়েছিল।

ঘটনা দুই.
সিঁড়িতে পড়ে থাকা কথকের ত্রিশ হাজার টাকা ফেরত দিয়ে যায় বুয়া।

ঘটনা তিন.
ঘটনা তিন অবধারিত ভাবে কোনো ’আনুমানিক ভবিষ্যৎ’-এর, কথক এই স্থানে আসার পরে যে ঘটনাটি ঘটে- যার নাম “স্মৃতিভ্রংশ”। স্মৃতিভ্রংশ?

১.
শুরুটা ছিল আসলে গাদি খেলা… ছোটবেলা যখন গাদি খেলতে যেত… কথক ‘দুধভাত’ হত, প্রায়শই ‘দুধভাত’ শব্দটি তার মুখে একটি করে চড় মারত — লজ্জা, অপমান, ঘৃণা সেই ছোট্টবেলাতেই ভর করেছিল তাকে। তবু প্রায় প্রতিদিন বিকালে দলভাগাভাগির সময় কারো সাথে জোড় বেঁধে নাম পাতিয়ে আসতা — দুইজন রাজার সামনে দাঁড়িয়ে বলতো — “রোদ নেবে না বৃষ্টি নেবে?” কোনো রাজাই বৃষ্টি চাইত না, রোদ চাইত শুধু।

১.
শিথানে রোদ্দুর নিয়ে ‘বার্ড অভ হেভেন’ হাঁটে। পার হয়ে যায় লালমাটি… পরনের ডেনিম জিন্সটা ঘষে-যাওয়া কালো। হঠাৎ মনে পড়ে যায় গ্যালারি চিত্রকে একটা ছবি বাঁধাতে দেওয়া, কেরোসিন কাঠের ফ্রেমটাকে কালো রঙে ঘষে দিতে বলেছে। হঠাৎ চিন্তায় পড়ে, ভিতরের বহুবর্ণা কি বাঁধা পড়বে এ-ঘষা-কালোয়… কী জানি!

তার ভাবতে ভালো লাগে এই বহুবর্ণা থেকে ঘটবে বিচ্ছুরণ। আলো আর আলো। সকল আলোর হর্ষশক্তিতে তার নৈর্ঋতে সৃজন হবে আলোকঘূর্ণি, তার ওপারেই তার কাক্সিক্ষত ভবিষ্যৎ অথবা না-পাওয়া অতীত, যেখানে বিস্মৃত তোতুল পাখির সকল পূর্বপ্রমের অভিজ্ঞান। কথক আসলে ‘বার্ড অভ হেভেন’-কে এছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com