বুদ্ধদেব বসু: জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধার্ঘ্য

আবদুল মান্নান সৈয়দ | ২৮ নভেম্বর ২০০৮ ৬:৫০ অপরাহ্ন

buddhadev-bose.jpg
বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮ – ১৯৭৪)

…কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনে; কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের কিছু ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না, ‘বোঝানো’ যাবে না।
— ‘কবিতার দুর্বোধ্যতা’: বুদ্ধদেব বসু

কল্যাণীয়াসু,

গতকাল রাতে একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪)-র জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে সাক্ষাৎকার দিলাম। সাক্ষাৎকার নিল অনুজোপম
—————————————————————–
আধুনিক কবিতা প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা তুলনাহীন। সাধারণ বাঙালি লেখকদের মতো তিনি কেবল আত্মরচনায় তৃপ্ত ছিলেন না। অন্যদের কবিতায়ও অসম্ভব অভিনিবেশ দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বিচার তো করেছেনই, তাঁর সমসাময়িক কবিদেরও একত্রিত করেছেন।…এই যে সমকালীন কবিতার প্রতি সর্বব্যপ্ত আগ্রহ এ তো শুধু তাঁর সমকালীন সাহিত্যেই নয়, আগে পরেও বিরল। শুধুমাত্র এই আশ্চর্য গ্রহিষ্ণুতার কারণেই বুদ্ধদেব বসুকে সম্মান জানাতে বাধ্য হই আমরা।
—————————————————————-
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। দশ মিনিটের সাক্ষাৎকারে কী আর বলা যায়। কিন্তু জাহাঙ্গীরের প্রশ্নমালা আমার ভেতরে যে-জিজ্ঞাসা ও কৌতূহল জাগিয়ে দিয়েছে, সেটাই একটু বিশদ বলি তোমাকে।

প্রথম প্রশ্ন ছিল বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য কোথায়। এই একটি প্রশ্নের জবাবে যা বলা যায়, তারই মধ্যে বুদ্ধদেব বসুর সারসত্তা ছেঁকে তুলে নেওয়া যায়। — কবি হিশেবে বুদ্ধদেব বসুকে আমি জীবনানন্দ দাশের মতো তাঁর
rabi-buddha.jpg
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে সমর সেন, বুদ্ধদেব বসু, কন্যা মীনাক্ষী, প্রতিভা বসু, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

কালের মহত্তম কবি বলব না, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বিষ্ণু দে’র মতো অসাধারণও তিনি নন। তারপরেও বুদ্ধদেব বসুকে বাদ দিয়ে রবীন্দ্র নজরুলোত্তর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আলোচনা কি আমরা করতে পারি?

পারি না। কেন পারি না? এ জন্যে যে, রবীন্দ্র-নজরুলোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার তথা সাহিত্যের পৌরোহিত্য করেছিলেন তিনি। ঠিক এরকম নায়কত্ব বাংলা সাহিত্যে দিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ তাঁদের কালে। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্য এঁদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। বরং তাঁর সাহিত্য-সংবেদন-ও-গ্রহিষ্ণুতার সঙ্গে তুলনীয় আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের কবি-সমালোচক এজরা পাউন্ড অথবা আধুনিক ফরাসি সাহিত্যের কবি-সমালোচক গিওম আপোলিনেয়ার। (সম্পূর্ণ…)

জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি

বুদ্ধদেব বসু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

খোন্দকার আশরাফ হোসেন | ২৮ নভেম্বর ২০০৮ ৬:৩৫ অপরাহ্ন

bandhu-ajit-dotter-shonge-d.jpg……
বন্ধু অজিত দত্তের সঙ্গে ঢাকায়, ১৯২৪
…….
ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রথম দশকের ছাত্রদের একজন বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪)। ঊনিশ বছর বয়সে অর্থাৎ ১৯২৭ সালে ইংরেজি বিভাগের অনার্স প্রথমবর্ষে ভর্তি হন। চার বছর পর ১৯৩০-এ মাস্টার্স। শুধু সেই আদিকালের নয়, শোনা যায় এতাবৎকালের সেরা ছাত্রদের সেরা তিনি। এমন জনশ্রুতি আছে যে, তিনি ইংরেজি অনার্সে যে মোটনম্বর পেয়েছিলেন, তার রেকর্ড নাকি আজতক কেউ ভাঙতে পারেনি। আমি নিজে ইংরেজি বিভাগের সাথে ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে চার দশকের বেশি জড়িত আছি, কিন্ত ঐ কিংবদন্তীর সত্যতা চেষ্টা করেও, মহাফেজখানার অপ্রবেশ্যতাহেতু, যাচাই করতে পারিনি। তবে একথা ঠিক, বুদ্ধদেব বসুর তুল্য প্রতিভাবান কাউকে ইংরেজি বিভাগ আজ অব্দি সৃষ্টি করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সেরা ছাত্রের শিরোপাও তাঁর প্রাপ্য।
—————————————————————–
বুদ্ধদেবের মুগ্ধ স্মৃতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো সেকালের ছাত্রীদের সম্পর্কে বর্ণনা। “একমুঠো ছাত্রীও আছেন আমাদের সঙ্গে — আছেন, এবং অনেক বিষয়ে নেই। যেন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, পৃথক্কৃত ও সুরক্ষিত এক অতি সুকুমার উপবংশ, তাঁরা অবকাশের প্রতিটি মিনিট যাপন করেন তাঁদের পদায়িত বিশ্রাম-কক্ষে, অধ্যাপকদের নেতৃত্বে ছাড়া সেখান থেকে নিষ্ক্রান্ত হন না। প্রতি ঘণ্টার শুরুতে এবং শেষে করিডোরগুলি বিভিন্নমুখী মিছিলে ভরে যায়: মহিলাগুচ্ছকে পশ্চাদ্বর্তী করে চলেছেন এক-একজন অধ্যাপক, পুনশ্চ নির্বিঘ্নে পৌঁছিয়ে দিচ্ছেন তাঁদের কমনরুমের দোরগোড়া পর্যন্ত।…”
—————————————————————-
বুদ্ধদেব বসুর কৃতি সম্পর্কে ধারণা দেয়া এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। সেটি মোটামুটি সবারই আয়ত্ত। তবু সংক্ষেপে বলি, তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা, যুগস্রষ্টা কবি, নাট্যকার, বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদক, ঔপন্যাসিক ও প্রাজ্ঞ প্রবন্ধকার শুধু নন, তিনি রবীন্দ্রোত্তর যুগের বাঙালির মননচর্যা ও নন্দনভাবনার উজ্জ্বলতম প্রতিভু। তিনি ছিলেন সেইসব বৈশ্বকোষিক লেখকদের একজন, রবীন্দ্রনাথের পরে এদেশে যাঁরা বিরলপ্রজাতির পাখির মতো দুর্লভ। রবীন্দ্রনাথের রচনাসম্ভারের বিপুলতার সাথে যদিও তুলনা চলে না, তবু নেহাৎ কম নয় বুদ্ধদেব বসু-র সৃষ্টি। অবিরল ধারায় লিখেছেন তিনি, স্বতঃউৎসারে, গদ্যে-পদ্যে, বাংলায়-ইংরেজিতে; ব্যাখ্যা করেছেন নন্দনতত্ত্ব; লিখেছেন মহাভারতের নবতর ব্যাখ্যা; কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠা ক’রে তা লালন করেছেন; অসামান্য সব কাব্যনাট্যে বিধৃত করেছেন তাঁর জীবনভাবনা। তাঁর বোদলেয়ার-অনুবাদ অসম্ভব প্রভাবসম্পাতী হয়েছিল, এবং পঞ্চাশ-ষাটের দশকে এই বাংলাদেশের তরুণ কবিদেরও আঁখি হ’তে ঘুম কেড়ে নিয়েছিলো; তাঁর উপন্যাস তিথিডোর-এর পাঠকপ্রিয়তা ইদানীংকার সুনীল-সমরেশদেরও ঈর্ষার কারণ হতে পারে। (সম্পূর্ণ…)

জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি

বুদ্ধদেব বসু: সামগ্র্যের সন্ধানে

আহমাদ মাযহার | ২৮ নভেম্বর ২০০৮ ৫:১০ অপরাহ্ন

1937-buddha-dev.jpg
১৯৩৭-এর বুদ্ধদেব বসু

পরিণত বয়সের রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক, সেই সময়েও যে-কজন লেখক নিজেদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে তাঁর পেছন পেছন হেঁটে চলছিলেন বুদ্ধদেব বসু তাঁদের একজন। রবীন্দ্রনাথেরই মতো বুদ্ধদেব বসুর প্রতিভা ছিল বিপুল ও বিচিত্রগামী। রবীন্দ্রোত্তর কালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি তো তিনি ছিলেনই, ছিলেন আধুনিকতাবাদী কবিদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ও অভিভাবকপ্রতিম। কয়েক শতাব্দী ব্যবধানে রচিত প্রাচীন সংস্কৃত কাব্য মেঘদূত ও উনিশ শতকের ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার-এর ক্লেদজ কুসুম-এর সৃষ্টিশীল অনুবাদের মাধ্যমে দুই যুগের প্রাণকে এক আধারে করেছিলেন আধারিত। বাংলার কবিতাশরীরে করেছিলেন নতুন রক্ত সঞ্চালন। শিল্পমাধ্যম হিসাবে ছোটগল্পের সার্থকতা সূচিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের হাতে; পরবর্তী কালে সার্থকতার দিকে যে কয়জন কথাসাহিত্যিক এগিয়ে গেছেন দৃপ্ত পায়ে বুদ্ধদেব বসু তাঁদের অন্যতম। বাংলাভাষায় আধুনিক সাহিত্য সমালোচনার সত্যিকারের শুরু বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে; কিন্তু একে যে স্বল্প কয়জন লেখক যথেষ্ট উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছেন তাঁদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু যে বিশিষ্ট তা কাউকে বলে দিতে হয় না। নাটক রচনায়, বিশেষ করে কাব্য নাটকের সৃষ্টিতে পাওয়া গিয়েছিল প্রতিভার উচ্চতর পরিচয়; আরও বিশেষ করে বলা যায় পুরাণ আশ্রয়ী কাব্যনাটকের স্রষ্টা হিসাবে জীবনের শেষ পর্বে যেন জ্বলে উঠেছিলেন তিনি।মহাকাব্য kabita-potrika.jpg…….
কবিতা পত্রিকার প্রথম সংখ্যা
…….
মহাভারত-এর নিমগ্ন পাঠক হিসাবে রচনারত ছিলেন মহাভারতের কথা নামীয় অসাধারণ এক গ্রন্থের, যার প্রথম খণ্ড শেষ করতে পেরেছিলেন, দ্বিতীয় খণ্ড রয়ে গিয়েছিল অনিষ্পন্ন। স্মৃতিকথামূলক রচনায় তাঁর উল্লিখিত ঘটনাবলি কেবল ঘটনামাত্রই থাকে নি হয়ে উঠেছে সুন্দরের স্বাদু সন্দেশ। তিনি ছিলেন মনোলোভা শিশুসাহিত্যেরও অবিরল প্রয়াসী। বাংলা শিশুসাহিত্যে ঘনাদা-টেনিদা জাতীয় সরস চরিত্রের আদিপুরুষ কান্তিকুমার-এর স্রষ্টা হিসাবেও তাঁকে আমরা একবার স্মরণ করে নিতে পারি। বাংলাভাষায় হান্স আন্ডেরসেন ও অস্কার ওয়াইল্ডের রূপকথার মোহময় অনুবাদক। বাংলাভাষা যে পাশ্চাত্য সাহিত্যের এই ঐশ্বর্যকে তার নিজের মধ্যে যোগ্যতার সঙ্গে ধারণ করতে পারে উত্তরাধিকারীদের মনে এই আত্মবিশ্বাসও এনে দিয়েছেন তিনিই। উপর্যুক্ত কথার মধ্য দিয়ে অভিমুখ্যগুলোকে খানিকটা চিনিয়ে দেয়া গেলেও তাঁর প্রতিভার দ্যুতিকে শনাক্ত করা যায় না। (সম্পূর্ণ…)

স্বাধীনতার সাঁতারু অরুণ নন্দীর সঙ্গে

আশীষ চক্রবর্ত্তী | ২১ নভেম্বর ২০০৮ ১১:২২ পূর্বাহ্ন

—————————————————————–
কতবার যে শরীরের যন্ত্রণায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি, তবু থামিনি। আসলে ওই সাঁতারটাকে আমি বাংলাদেশের মান-মর্যাদার সাথে এক করে দেখেছিলাম। সে জন্যই ব্যক্তিগত কষ্টের চিন্তা আমলে নিয়ে মাঝপথে থামবার কথা ভাবতেই পারিনি। একটানা ৯০ ঘন্টা ৫ মিনিট সাঁতার কেটে তবেই থেমেছি। আগের রেকর্ড তখন ৩৩ মিনিট পেছনে। পরবর্তীতে বহু পত্র-পত্রিকায়, আলাপ-আলোচনায় আমার ওই সাঁতারকে ‘স্বাধীনতার সাঁতার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
—————————————————————-
arun-1.jpgগত ১৬ নভেম্বর চিরবিদায় নিয়েছেন সাঁতারু অরুণ নন্দী। শুধু সাঁতারু বললে অবশ্য কম বলা হয়, সদ্য প্রয়াত অরুণ নন্দী ছিলেন সাঁতারু মুক্তিযোদ্ধা। না, রণাঙ্গনে সশস্ত্র যুদ্ধ তিনি করেননি। একাত্তরে নেমেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লড়াইয়ে। কলকাতার এক সুইমিং পুলকেই বেছে নিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে। যুদ্ধে নেমে গড়েছিলেন দূরপাল্লার সাঁতারে নতুন বিশ্বরেকর্ড। নাতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকারসহ সরল, নিরহঙ্কার আর সাঁতার-অন্তপ্রাণ মানুষটিকে নিয়ে আশীষ চক্রবর্ত্তীর এ লেখা পাক্ষিক শৈলীতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯৬ সালে। অরুণ নন্দীর বাস তখন আরামবাগ অগ্রণী ব্যাংক মাঠের পাশের কলোনির এক ১০ ফুট বাই ১২ ফুট কক্ষে। গত ১২ বছরে বেড়ে বেড়ে বয়স হয়েছিল ৬৭, জীবনের শেষ কয়েকটা বছর কাটিয়েছেন সেই ১০ ফুট বাই ১২ ফুটের মতোই হকি স্টেডিয়ামের দোতলার এক ছোট্ট ঘরে। পরিবর্তন বলতে এটুকুই। নইলে স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের অবদান নিয়ে অহঙ্কার, দেশের সাঁতারকে এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন, সুইমিং ইনস্টিটিউট গড়তে না পারার হতাশা — চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার আগ পর্যন্ত অরুণ নন্দী এসব জায়গায় একটুও বদলাননি। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে প্রকাশিত (কিছুটা সংক্ষেপিত) এই লেখা সে কারণেই এখনো বড় বেশি প্রাসঙ্গিক।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: আশীষ চক্রবর্ত্তী

পরিচয়পর্বেই সবাইকে বেশ আপন করে নিতে পারেন। কিন্তু তারপরও কারো সাথেই তাঁর ফারাকটা ঘোচে না। ওটা আসলে ঘুচবারও নয়। অরুণ নন্দী দূরপাল্লার সাঁতারে একটা বিশ্বরেকর্ড গড়ে সাধারণের চেয়ে অনেক অ-নে-ক উঁচুতে আসন গেড়েছিলেন ১২ অক্টোবর ১৯৭১-এ। একাত্তর বাংলাদেশের বিজয়ের বছর — আমাদের স্বাধীনতার বছর। অরুণ নন্দীর সমস্ত সত্তা সবসময় তাই বুঁদ হয়ে থাকে একাত্তরে।
arun-2.jpg
বিশ্ব রেকর্ড গড়ার পর ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলের সম্বর্ধনায় বক্তৃতা করছেন অরুণ নন্দী।

স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে অরুণ নন্দী’কে আরো জানবার-জানাবার প্রবল ইচ্ছে ছিল। সেই ইচ্ছের কথা শুনে হাঃ হাঃ হাঃ হাসিতে ফেটে পড়লেন অরুণ নন্দী। পরক্ষণেই অট্টহাসির কারণ অন্বেষণের চেষ্টায় ছেদ টানলেন এই ‘ইয়ংম্যান’-এর পিঠ চাপড়ে দিয়ে। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাৎলে দিলেন তাঁর আবাসের ঠিকানা, বললেন, ‘কথা হবে সেখানেই’। (সম্পূর্ণ…)

ওয়েস্টার্ন জাঁরের প্রতিমা

তৈমুর রেজা | ২১ নভেম্বর ২০০৮ ১০:২৫ পূর্বাহ্ন

শোনা যায়, রামায়ণের তুলনায় প্রাচীন মহাকাব্য আর নাই; রামচন্দ্র বিষ্ণুর অবতার, কিন্তু এই ধর্মতাত্তি¡ক পরিচয়ে সাধারণের উচ্ছ্বাস নাই, নায়কোচিত রামত্বকেই তাদের ভক্তি। আমাদের অন্তঃপুরে এক মানসপ্রতিমার জন্য ক্রন্দন আছে; কৃষ্ণদ্বৈপায়নের আখ্যানে যুধিষ্ঠিরের প্রধান্য থাক, মানুষের চোখের তারায় কিন্তু জেগে থাকে অর্জুন; এই জনপদে সংস্কারের প্রতি অনুরাগ যাদের ধর্ম, তারা নায়কমুগ্ধ দর্শক। ঢাকার ছবিতে রামের উপদ্রুব সতত সঞ্চরমান, ঢালিউডে লঙ্কাকাণ্ডের যে মহড়া নিয়ত হয় তার নেতৃত্বে থাকেন রামচন্দ্রের একালের কোনো অবতার; এদেশে নায়কের গল্প কখনো পুরাতন হয় না।
—————————————————————–
ওয়েস্টার্ন জাঁরের প্রতিমাকে তাই আরো নিবিড়ভাবে বীক্ষণ করা দরকার। … ক্যামেরায় ঘনঘন লংশট আর ক্লোজ আপের মহড়া। বিশাল ল্যান্ডস্কেপের ভেতর তার প্রস্থান যেন এক অসীম বিচ্ছেদের ব্যঞ্জনা, এজমালি সমাজ ভেঙে গেছে, মানুষ মানুষ থেকে কতোদূরে চলে গেছে তার প্রতীকী আয়োজন। ক্লোজ আপ শটের বেলায় সর্বলোক বিচ্ছিন্ন একটি মুখের অভিব্যক্তি তার হাসি-কান্না-অনুভবের কথা জানায়, ছবির প্রতিটি অক্ষর জানিয়ে দেয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র একালের চরিত্র। … ওয়েস্টার্ন জাঁরের এই নিঃসঙ্গ নায়ক আজ পৃথিবীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের প্রতীক।
—————————————————————-

পশ্চিমে ‘ওয়েস্টার্ন জাঁর’ বলে ছবির একটি জাত রয়েছে; আঙ্গিকের বিচারে সেটি বাংলা ছবির স্বগোত্র নয়, কিন্তু ভাবের ক্ষেত্রে একটি ঐকতান আছে, দুই ধারাতেই নায়কের কীর্ত্তন পাওয়া যায়। নায়কের আখ্যান পশ্চিমে দূর্লভ নয়, তবে ওয়েস্টার্ন জাঁরের কাউবয় চরিত্রটি অনন্য; দীর্ঘ গাউন আর হ্যাটের আড়ালে অশ্বারোহী সেই ক্লান্তিহীন অভিযাত্রী সীমাহীন মরূভূমিজুড়ে ছুটে বেড়ায়। (সম্পূর্ণ…)

দুলছে লণ্ঠন

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ২০ নভেম্বর ২০০৮ ৯:৩২ পূর্বাহ্ন

১.

buriganga.jpg
এখন বুড়িগঙ্গা।

বইপত্তর খোঁজাখুঁজির পত্তন আমার সেই পঞ্চাশের দশকে — ১৯৫৭-৫৮ সালে সম্ভবত। পগোজ স্কুলের ছাত্র আমি বন্ধু শঙ্করপ্রসাদ সরকারের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে শাঁখারি বাজার সংলগ্ন স্কুল থেকে টিফিনের ছুটিতে বেরিয়ে ঝটিতি পৌঁছে যেতাম ডানহাতে জগন্নাথ কলেজ, কলেজিয়েট স্কুল রেখে রাস্তা পেরিয়ে বাঁয়ে গির্জা আর বাইবেল সোসাইটি ঘেঁষা ফুটপাতে। পথচারীর ভিড় তেমন অসহনীয় না হওয়ায় তখন ফেরিঅলারা ফুটপাতের আধাআধি দখল নিতে পারত স্বচ্ছন্দে। ‘যা নেবে তাই ছ’ আনা’ থেকে শুরু করে গামছা-লুঙি, গেঞ্জি, মেয়েদের চুলের রিবন-সেফটিপিন-কালো ক্লিপ, কাবুলি খাঁ সাহেবদের শিলাজিত-হালুয়ায়ে খাস্খাস্ ইত্যাদি রকমারি পশরার পাশাপাশি সহাবস্থান ছিল বইপত্র পত্রিকার — পুরনো ও নতুন, সস্তা এবং মূল্যবান মোটাসোটা বাঁধানো ভল্যুমের।

bahadur-shah-park.jpg……..
বাহাদুরশাহ পার্ক, সে আমলে ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক।
…….
সেখানে বইপোকা শঙ্করকে সঙ্গ দিতে গিয়ে আমিও সসঙ্কোচে দু’টো চটি বই, পত্রিকা নেড়েচেড়ে দেখতাম। শঙ্কর নিবিষ্ট মনে উবু হয়ে বসে রহস্য কাহিনি বাছাই করত। কখনো বা স্বপনকুমারের চার আনা, আট আনা, বারো আনা সিরিজের একটি বা দু’টি চটি কাহিনী কিনে পকেটে ভরত কোন কৌশলে। টিফিন পিরিয়ড শেষ হয়ে যেত লহমায়। ত্রস্তে আমরা কোনো কোনোদিন দৌড়ে ক্লাসে ফিরতাম। ওসব ‘গল্পের বই’ লুকিয়ে রাখতে হত। টিফিনের পর আরো তিনটে পিরিয়ড — ফিফ্‌থ, সিক্সথ, সেভেন্‌থ — তারপর ৪টে ১০ মিনিটে ছুটির ঘণ্টা বাজত। ফুসফুসে যেন এক দমকে অনেকটা বাতাস ঢুকে আসত, মনটা উড়ু উড়ু — কী হয়, কী হয়। স্কুলের গেইটে শঙ্কু আর আমি একটু দাঁড়াতাম। শঙ্করের ছোটভাই দীপঙ্কর, আমার ভাই রবুর অপেক্ষায়।

old-dhaka-6.jpg
পগোজ হাইস্কুল। উপমহাদেশের প্রাচীনতম স্কুলের একটি।

ওরা ভিড় ঠেলে বেরোতে পারত না — মায়েদেরও নিষেধ ছিল। ছুটির পর বইখাতা গুছিয়ে স্যুটকেইসে ভরে, সাবধানে চাইনিজ লক্ ক্লিক করে বন্ধ করে, — চাবি হারানোর আগ পর্যন্ত চাবি ঘুরিয়ে তালা লক্ করা হত — ধীরেসুস্থে বড়ভাই বা দাদার সঙ্গে বাড়ি ফিরব — এরকম কড়ার ওদের উচ্চারণ করতে হত মাঝে-মাঝেই।

স্কুলের সদরে দাঁড়িয়ে আছি, শঙ্কর উত্তেজনা চেপে আছে কষ্ট করে, কত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে কোমরে গোঁজা ডিটেকটিভ দীপক চ্যাটার্জি আর তার অ্যাসিস্ট্যান্ট রতনকুমারের হাড়ে ভেল্‌কি খেলানো বুদ্ধির প্রয়োগ আর নতুন নতুন রহস্য উদ্ধারের কাহিনী পড়তে পাবে, তারই অপেক্ষায়। (সম্পূর্ণ…)

আলেকসান্দর সলঝেনিৎসিন-এর শেষ আলাপ

সাগুফতা শারমীন তানিয়া | ১৩ নভেম্বর ২০০৮ ৩:১৭ অপরাহ্ন

evstafiev-solzhenitsyn.jpg
২০ বছরের নির্বাসন শেষে রাশিয়ার ভ্লাদিভস্তকে সলঝেনিৎসিন, ১৯৯৪।

আলেকসান্দর ইসায়েভিচ্ সলঝেনিৎসিন (ডিসেম্বর ১১, ১৯১৮- আগস্ট ৩, ২০০৮) ছিলেন রুশ ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং ইতিহাসবিদ। সারা বিশ্বকে তাঁর লেখার মাধ্যমে তিনি পরিচয় করিয়েছেন গুলাগ (সোভিয়েত ইউনিয়নের লেবার ক্যাম্প সিস্টেম) এর সাথে। সেজন্য যুগপৎভাবে তাঁর মিলেছে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার (১৯৭০) আর সোভিয়েতaleksandr_solzhenitsyn_gula.jpg
…….
সোভিয়েত লেবার ক্যাম্প (গুলাগ) থেকে মুক্তির সময়। নির্বাসনের আগে। ১৯৫৩।
…….
ইউনিয়ন থেকে নির্বাসন (১৯৭৪)। রাশিয়ায় তিনি ফিরেছিলেন ১৯৯৪ সালে। সেবছর তিনি সার্বিয়ান আকাদেমি অভ্ সায়েন্সেস এন্ড আর্টস-এর ভাষা ও সাহিত্য অনুষদের সদস্য নির্বাচিত হন। প্রথিতযশা সঞ্চালক এবং পিয়ানিস্ট ইগনাভ সলঝেনিৎসিনের বাবা তিনি।

দীর্ঘদিন ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে ভূগবার পর এবছর আলেকসান্দর সলঝেনিৎসিন মারা গেলেন তেশরা আগস্ট নিজগৃহে।

২৩ জুলাই ২০০৭-এ স্পিগেল (Der Spiegel)-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে নোবেল বিজয়ী রুশ লেখক আলেকসান্দর সলঝেনিৎসিন আলোচনা করেছেন রাশিয়ার উত্তাল ইতিহাস, পুতিনীয় গণতন্ত্র এবং জীবন-মৃত্যু বিষয়ে তাঁর ভাবনা নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ক্রিশ্চিয়ান নীফ এবং ম্যাথেইয়ার স্কেপ।

অনুবাদ: সাগুফতা শারমীন তানিয়া

স্পিগেল: আলেকসান্দর ইসায়েভিচ, আমরা যখন এসেছিলাম আপনাকে দেখেছি কাজ করছেন। মনে হলো এই অষ্টাশি বছর বয়েসেও আপনি কাজের তাড়না বোধ করেন। যদিও আপনার এই স্বাস্থ্য নিয়ে ঘরের ভেতরও হেঁটে বেড়াবার কথা নয়। কোথা থেকে এই উদ্যম পান আপনি?
president-vladimir-putin.jpg
নিজ বাড়িতে, অতিথি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে; ১২ জুন ২০০৭।

আলেকসান্দর সলঝেনিৎসিন: বরাবরই আমার ভেতরে এই প্রেষণাটুকু ছিল, জন্মাবধিই। আর আমি সবসময় কাজের কাছে নিজেকে সানন্দে উৎসর্গ করেছি। কাজের কাছে আর সংগ্রামের কাছে।
—————————————————————–
রাশিয়ার ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যকার এই দূরত্ব অসম্ভব বিপজ্জনক এবং রাষ্ট্রকে এই বিষয়ে এখুনি মনোযোগী হতে হবে। … পরিস্থিতি শোধনের একমাত্র ন্যায়সঙ্গত উপায় হচ্ছে বড় বাণিজ্যগুলির পেছনে তাড়া না করা … মধ্যম এবং ক্ষুদ্রশিল্পগুলিকে হাঁফ ছাড়বার সুযোগ করে দেয়া। … রাষ্ট্রীয় প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত রাজস্ব রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে ব্যয় করা, শিক্ষাখাতে ব্যয় করা, স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করা। এবং আমাদের শিখতে হবে কী করে চুরি-অর্থ আত্মসাৎ ছাড়া এই ব্যয় করা যায়।
—————————————————————-
স্পিগেল: এখানে এইটুকু জায়গাতেই চারখানা টেবিল। আপনার নতুন বই মাই অ্যামেরিকান ইয়ার্স যেটি এই শরতে জার্মানীতে প্রকাশিত হবে, তাতে আপনি স্মৃতিচারণ করেছেন যে আপনি জঙ্গলের ভেতর হেঁটে যেতে যেতেও নাকি লিখতেন।

সল্: আমি যখন গুলাগ্-এ ছিলাম, তখন কখনো কখনো পাথরের দেয়ালেও লিখেছি। ছোট ছোট চিরকুটের মতন কাগজে লিখতাম আমি, তারপর সেটা মুখস্ত করতাম, তারপর চিরকুটগুলো নষ্ট করে ফেলতাম। (সম্পূর্ণ…)

হরতাল বিষয়ে একটি সাবঅল্টার্ন গল্প কীভাবে লেখা হয়

সুমন রহমান | ১১ নভেম্বর ২০০৮ ৫:৪৩ অপরাহ্ন

‘দহ’ শহীদুল জহির-এর একটি গল্প। ১৯৮৫ সালে লেখা এই গল্পটিকে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কোথাও প্রকাশ করেন নি। তাঁর মৃত্যুর পর ২০০৮ সালে প্রথম আলো-র ঈদসংখ্যায় গল্পটি প্রথম মুদ্রিত হয়। আশির দশকের উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এই গল্পের বিষয়বস্তু হরতাল। কীভাবে একটা ইস্যুতে হরতাল ডাকা হয়, কীভাবে প্রস্তুতি নেয়া হয়, ভোরবেলা
—————————————————————–
শেষপর্যন্ত গল্পটি আর পুলিশের থাকল না। মরিয়মের হয়ে উঠল। সেই সাথে মরিয়মের মাধ্যমে মধ্যবিত্তের তথা মূলস্রোতের হয়ে উঠল। ফলে যে গল্পটি আদিতে ছিল সাবঅল্টার্ন প্রণোদনার, অন্তে সে হয়ে উঠল এলিটিস্ট। ‘দহ’ শেষমেশ আর পুলিশের হরতাল ডিউটির গল্প নয়, বরং মরিয়মের পেটে সন্তান আসা না-আসা কিংবা তার বাড়ি চলে যেতে চাওয়ার গল্প। ঠিক এই জায়গাটিতে এসে সাবঅল্টার্ন প্রণোদনা মূলধারার চিন্তার কাছে হেরে গেল।
—————————————————————-
null
১৯৮৬-র শহীদুল জহির

কীভাবে পিকেটিং হয়, কীভাবে রাস্তায় হরতাল না-মানা যানবাহন ভাঙচুর করা হয় এসবই হরতালের নৈমিত্তিক গল্প। কিন্তু শহীদুল জহির এই গল্পে হরতালকে দেখতে চেয়েছেন হরতাল-প্রতিহতকারী শক্তি পুলিশের চোখ দিয়ে। সেই গল্পে আমরা দেখি পুলিশের সেপাই আবুল বাসার, যে তার স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে ঢাকায় কায়ক্লেশে বসবাস করছে, তার জীবনে একটা হরতালের দিন কীভাবে আসে, কীভাবে পার হয়, কীভাবে সেই হরতাল তার পারিবারিক জীবনে প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে, ইত্যাদি।

হরতাল বিষয়ে একটি সাবঅল্টার্ন গল্প কীভাবে লেখা হয়? শহীদুল জহিরের ‘দহ’ গল্পটিকে ঘিরে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই বর্তমান নিবন্ধের লক্ষ্য। অন্বেষণের গোড়াতেই পরিষ্কার করে নেয়া যাক সাবঅল্টার্ন গল্প বলতে আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি। “সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ” নামক একটি ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে রণজিৎ গূহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, শহীদ আমিন, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, গৌতম ভদ্রসহ আরো অনেক তাত্ত্বিক প্রায় দুদশক ধরে ভারতীয় উপনিবেশিক ইতিহাসের ভিন্নতর একটি ভাষ্য নির্মাণ করে চলেছেন। এই তত্ত্বকাঠামোটি বিকশিত হয়েছে রণজিৎ গূহ-র ক্যাসিক এলিমেন্টারি আসপেক্টস অভ প্যাজান্ট ইনসার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া নামক গ্রন্থটি থেকে। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে রণজিৎ গূহ উপনিবেশ আমলের কৃষক বিদ্রোহের এক অন্যরকম চেহারা হাজির করেছেন। (সম্পূর্ণ…)

রাসলীলা প্রত্যক্ষণ

সাইমন জাকারিয়া | ৮ নভেম্বর ২০০৮ ১০:৫৪ পূর্বাহ্ন

[আগামী ১৩ নভেম্বর রাসপূর্ণিমা। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষ্ণ, চৈতন্য ও বৈষ্ণবভক্ত মানুষেরা এই পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে বিভিন্নভাবে রাসলীলা উদযাপন করে থাকেন। রাসলীলা উদযাপনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে এদেশের মণিপুরী জনগোষ্ঠীর। রাসপূর্ণিমাকে শরণে রেখে বৃহত্তর পাঠক-ভক্তদের উদ্দেশ্যে অত্র প্রবন্ধটি মুদ্রণ করা হলো।]

1.jpg
মৈতৈ মণিপুরি রাসলীলার নিপাপালয় পুঙবাদকগণ রাসধারীদের মুখোমুখি।

প্রথম কয়েক বছর মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার মাধবপুর গ্রামের জোড়মণ্ডপের মণিপুরি রাস উৎসবে যোগ দিয়ে হয়ে উঠেছিলাম মুগ্ধ আর বিস্মিত দর্শকমাত্র। তবে, সেই বিস্ময় আর মুগ্ধতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বঙ্গীয় লীলার আনন্দ অনুভব করা প্রথম দর্শনে সত্যি দুষ্কর হয়ে পড়ে। তাই
—————————————————————–
মণিপুরীদের রাসলীলার উৎসবের পোশাক-পরিচ্ছদে, নৃত্যে-গীতে এবং মঞ্চ-অলঙ্করণে যে রাজকীয় গাম্ভীর্য দৃষ্ট হয় তা আমাদের দেশের অন্য কোনো সাংস্কৃতিক পরিবেশনার কোথাও দেখা যায় না। … লোককথায় বলা হয়েছে, আধুনিককালে রাস প্রচলন করেন মণিপুরী রাজা ভাগ্যচন্দ্র আর রাজা ভাগ্যচন্দ্র নিজেও নাকি রাসের পোশাক পরে নেচেছিলেন। অতএব, রাসের জন্ম হয়েছে রাজদরবারে। কিন্তু তাকে গ্রহণ করে নিয়েছেন সাধারণ মণিপুরী জনগণ।
—————————————————————-
কেবলই মুগ্ধতা-বিস্ময়ে বারবার ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি পাশাপাশি অবস্থান নেওয়া তিন তিনটি মণ্ডপের রাসনৃত্য। প্রথমদিকে মণিপুরী পল্লীর তেমন 6.jpg…….
বিষ্ণুপ্রিয়া রাসলীলার নৃত্যভঙ্গিমা।
……..
কারো সাথে পরিচয়ও ছিল না, এক শুভাশিস সিনহা আর তাদের পরিবারের সদস্য এবং কয়েকজন প্রতিবেশী ভিন্ন। পরবর্তীতে অনেকের সাথে ভাব জমে ওঠে, শুভাশিসদের বাড়ি হয়ে ওঠে নিজের বাড়ি। আর মণিপুরীদের গ্রামগুলো যেন হয়ে যায় নিজের গ্রাম। সেই থেকে রাসের আসল রসাস্বাদন আমার পক্ষে একটুখানি সহজ হয়ে দেখা দেয়। বুঝতে পারি রাসলীলা আসলে মানুষের প্রতীকে পরম পুরুষের সঙ্গে প্রকৃতির চিরন্তন লীলা। অন্যদিকে রাসের নাটকীয় গুণসমূহও আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর এটা ঘটে কয়েক বছর ধরে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে রাসলীলা পর্যবেক্ষণ করার পর। পরবর্তীতে আরো দুই বছর আদমপুর গ্রামে মৈতৈ মণিপুরিদের রাস পর্যবেক্ষণ করে পুরো মণিপুরি জনগোষ্ঠীর রাসলীলার বৈচিত্র্য আরো স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করি। বর্তমান লেখায় বিষ্ণুপ্রিয়া রাসলীলা ও মৈতৈ রাসলীলার বর্ণনা আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হলো। (সম্পূর্ণ…)

সে রাতে উৎসব ছিল…

টোকন ঠাকুর | ৭ নভেম্বর ২০০৮ ১১:২৩ পূর্বাহ্ন

nullহতে পারে ১৯৯২ সালের দিকে, গত শতাব্দিতে আমি খুলনায় ছিলাম। রাজশাহী থেকে কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক ছোটগল্প ও গদ্যকাগজ প্রাকৃত প্রথম সংখ্যা বের করলেন। আগ্রহী বন্ধুদের কাছে বেচার জন্য হাসান স্যার ১০ কপি প্রাকৃত ডাকযোগে পাঠালেন আমার তখনকার ঝিনাইদহের ঠিকানায়। প্রাকৃততে হয়তো দুজন লেখককে পেলাম, তারা আমার কাছে নতুন। একজন তরুণী, আনন্দময়ী মজুমদার। পাবলো নেরুদার স্মৃতিকথা অনুবাদ করেছেন খণ্ডাংশ, সেই অনুবাদ ভালো লাগল। আরেকজন একটি গল্প লিখেছেন, তিনি শহীদুল জহির। গল্পের নাম ‘ডুমুর খেকো মানুষ’। গল্পটি পড়েই, তখন, সেই টকটকে বয়সেই টের পাই, আগে পড়িনি তিনি এমন ভঙ্গির লেখক। অসাধারণ।

ঢাকাবাসী জীবন শুরু হলো নব্বুইয়ের দশকের প্রথমভাগেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র নামধারী হয়ে। খুব বই পড়ার অভ্যাস আমার অনেক দিনের। শহীদুল জহিরের উপন্যাস সে রাতে পূর্ণিমা ছিল এবং গল্পগ্রন্থ ডুমুর খেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প পড়া শেষ। আরো নিবিড় করে তাঁর গল্পের চরিত্রদের সঙ্গে আমি পুরোনো ঢাকার দক্ষিণ মৈশুন্ডি, পদ্মনিধি লেন, কলতাবাজার, ভূতের গলি, নারিন্দা কিংবা সুহাসিনী, সুরধ্বনি, নলকার গ্রাম এলাকার কুয়াশায়, সবুজে ঢুকে পড়লাম। আগেই তো আমি তুমুল জড়িয়ে গেছি বাংলা কবিতায়, ছোটগল্পে, উপন্যাসে, নানান রচনায়। এবং পুরো নব্বুয়ের দশকে ঢাকার প্রায় বড় বড় সব কবি-সাহিত্যিককেই ঘরে, বাইরে, হাড়িতে, নাড়িতে, পথে, বেপথে, আনন্দ বেদনায়, ঘৃণায়, ভালোবাসায় কাছে থেকে দেখি, ভেতর থেকে কবিকে কিংবা লেখককে দেখার সুযোগ পেতে থাকি। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ থেকে মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, শওকত ওসমান পর্যন্ত — প্রায় সবার সঙ্গেই সাহিত্য নিয়ে চাষবাস করি। আহমদ ছফা ও হুমায়ুন আজাদকে তো প্রায় প্রতিটা দিনই কাছে গিয়ে পেয়েছি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। স্বাধীনতা উদ্যান (সোহরাওয়ার্দি পার্ক), মোল্লার দোকান চারুকলা, কিংবা নব্য প্রতিষ্ঠিত শাহবাগের আজিজ মার্কেটের ছফা ভাই ও হুমায়ুন আজাদ স্যার বা ফরহাদ ভাই (মজহার) কে পেয়েছি। সঙ্গ নিয়েছি। দিয়েছিও, দিনের পর দিন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রিয় হয়ে ওঠা কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরকে কেন বাস্তবে দেখা পাই না — এই প্রশ্ন নিজের মধ্যেই জাগে মাঝেমধ্যে। কিন্তু, ‘কোথায় পাবো তারে?’ (সম্পূর্ণ…)

আর. কে. নারায়ণ-এর গল্প

মাসে পঁয়তাল্লিশ টাকা

আনিকা শাহ | ৫ নভেম্বর ২০০৮ ৪:৫৯ অপরাহ্ন

rk_narayan-3.jpgভারতীয় ঔপন্যাসিক রসিপুরম কৃষ্ণসোয়ামি আয়ার নারায়ণস্বামী-এর জন্ম ১৯০৬ সালে মাদ্রাজে (বর্তমানে চেন্নাই)। নারায়ণ ইংরেজিতে লেখালেখি করেছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস Swami and Friends বেরিয়েছিল ১৯৩৫ সালে। ঔপন্যাসিক গ্রাহাম গ্রিন এটি প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। গ্রাহাম গ্রিনের পরামর্শে তিনি নাম সংক্ষিপ্ত করে আর. কে. নারায়ণও করেছিলেন। তাঁর উপন্যাস The Financial Expert মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে। আর. কে. নারায়ণের ১৫টি উপন্যাসের ১৪টিরই পটভূমি কাল্পনিক শহর মালগুডি। নিখুঁত সৌন্দর্যমণ্ডিত, বুদ্ধিদীপ্ত, জীবনঘনিষ্ঠ ও উপলব্ধিজাত তাঁর লেখার বর্ণনা প্রায়শই দক্ষিণ ভারতের গ্রামজীবন ছুঁয়ে যায়। ২০০১ সালে মারা যান আর. কে. নারায়ণ। আর. কে. নারায়ণকে আমেরিকান ঔপন্যাসিক উইলিয়াম ফকনারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। মানবিকতায় ঋদ্ধ তাঁর লেখালেখিতে প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ ও প্রাণশক্তি টের পাওয়া যায়।

cartoon-r-k.jpg
…….
(বড়ভাই) ইন্ডিয়ার জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট আর. কে. লক্ষণের কার্টুনে লেখক আর. কে. নারায়ণ
……
আর. কে. নারায়ণের প্রবাদপ্রতীম গ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও কিছু সমালোচনা হয়েছে। তিনি মারা যাওয়ার কিছুদিন পর ভারতেরদি হিন্দু পত্রিকায় লেখক ও সমালোচক শশি থারুর ‘Comedies of Suffering’ লেখায় এভাবে বলেছিলেন, “Narayan was a consummate teller of timeless tales, a meticulous recorder of the ironies of human life, an acute observer of the possibilities of the ordinary: India’s answer to Jane Austen… …But I felt that they also pointed to the banality of Narayan’s concerns, the narrowness of his vision, the predictability of his prose, and the shallowness of the pool of experience and vocabulary from which he drew.”

অনুবাদ: আনিকা শাহ

শান্তা আর ক্লাসে থাকতে পারছিল না। কাদার ছাঁচ বানানো, গান, ড্রিল, অক্ষর আর সংখ্যা পরিচয় সব ক্লাস শেষ করে ও রঙ্গিন কাগজ কাটছিল। ঘন্টা বাজার পর যতক্ষণ না টিচার বলেন, “এখন তোমরা বাড়ি যেতে পার” অথবা, “কাঁচি সরিয়ে রেখে অক্ষরগুলো তুলে নাও” ততক্ষণ পর্যন্ত ওকে কাগজ কাটতে হবে। শান্তা সময় জানার জন্য অস্থির হয়ে উঠছিল। ও ওর পাশে বসা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, “এখন কি পাঁচটা বাজে?”

“হয়তো”, সে উত্তর দিল।

“নাকি এখন ছয়টা বাজে?”

“মনে হয়না” ওর বন্ধু উত্তর দিল, “কারণ ছয়টার সময়ে রাত হয়ে যায়।”

“তোর কি মনে হয় এখন পাঁচটা বাজে?”

“হ্যা।”

“ওহ, আমাকে যেতে হবে। বাবা এতক্ষণে বাসায় এসে যাবে। বাবা বলেছিল আমাকে পাঁচটার মধ্যে তৈরি হয়ে থাকতে। বাবা আজকে সন্ধ্যায় আমাকে সিনেমায় নিয়ে যাবে। আমাকে বাসায় যেতেই হবে।”

কাঁচিটা ফেলে রেখে ও টিচারের কাছে দৌঁড় দিলো। “ম্যাডাম, আমাকে বাসায় যেতে হবে।”

“কেন, শান্তা বাঈ?” (সম্পূর্ণ…)

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে কিছু জানা কথা

তপন বাগচী | ১ নভেম্বর ২০০৮ ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন

অনুপ্রবেশের আগে
hiralal-sen.jpg……..
অবিভক্ত বাংলার প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭)
……..
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প, সংস্কৃতি, বিনোদন ও গণযোগাযোগের ক্ষেত্রে তার বৈশিষ্ট্য ও ভিত্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। সকলের জানা কথা, চলচ্চিত্র একই সঙ্গে আর্ট এবং ইন্ডাস্ট্রি। একই সঙ্গে মানবিক ও বাণিজ্যিক। তাই সাধারণের পক্ষে অপেক্ষাকৃত জটিল কিন্তু সবচেয়ে প্রভাবসঞ্চারী এই মাধ্যমটির প্রতি মানুষের ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল বিরাজমান।

alibaba.jpg……..
হীরালাল সেনের দীর্ঘতম ছবি আলীবাবা ও চল্লিশ চোর (১৯০৩)-এ নৃপেন্দ্র নাথ বসু ও কুসুম কুমারী
………
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দীর্ঘ গৌরবের পথপরিক্রমার বর্তমান অবস্থায় অশ্লীলতা ও ভাঁড়ামির অভিযোগ বহন করে চলছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আশির দশকের শুরু থেকে এই ধারা ক্রমশ প্রকট হয়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, রুচিমান দর্শক এখন প্রেক্ষাগৃহমুখী হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করছে না।

সারা দেশের প্রেক্ষাপটেই বলা যায় যে, অনেক প্রাচীন ও অভিজাত প্রেক্ষাগৃহ এখন বন্ধ হয়ে গেছে। কোনও কোনও মালিক প্রেক্ষাগৃহের কাঠামো পরিবর্তন করে এখন বহুতল বিপণীবিতান বানিয়ে ভিন্ন ব্যবসায় যুক্ত হতে চাইছেন। এরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার এবং সেই নিরিখে চলচ্চিত্রের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন দিকনির্দেশনা খুঁজে বের করার সময় এসেছে। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com