ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকার কবিতা

ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপ

জুয়েল মাজহার | ৩০ মে ২০০৮ ৪:২৪ অপরাহ্ন

lor.jpg
ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের কবরে স্থাপত্য

মূল: ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকা

ভূমিকা ও অনুবাদ: জুয়েল মাজহার

ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপ
(Llanto Por Ignacio Sanchez Mejias)

১. জখম ও মৃত্যু
(La Cogida y la Muerte)

ঘড়িতে তখন বিকেল পাঁচটা।
কাঁটায় কাঁটায় বিকেল পাঁচটা।
এনেছে ছেলেটা শাদা এক থান
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
রয়েছে সাজানো লেবুর ঝুড়ি একখানা
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
বাকিটা মৃত্যু এবং কেবলই মৃত্যু সে।

বাতাস উড়িয়ে নিয়েছে উল কার্পাসের
যখন ঘড়িতে বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
আর অক্সাইড-গুঁড়ো-ছিটানো
উড়লো কাচ আর নিকেল
ঘড়িতে যখন বাজলো বিকেল পাঁচটা।
লড়াইয়ে এখন মেতেছে ঘুঘু ও চিতাবাঘে
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
গুঁতোগুঁতি করে ঊরুতে একটি একাকী শিঙ
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
আর উদারায় বাজলো তার
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
বিষের ঘণ্টা বাজলো আর উঠলো ধোঁয়া
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
কোনায় কোনায় জমাট নীরবতা
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
আর এলো ওই তুঙ্গ-হৃদয় একাকী ষাঁড়!
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
বরফ তখন অতিরিক্ত ঝরালো ঘাম
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা,
ষাঁড়-লড়াইয়ের বৃত্ত যখন আয়োডিনে ছয়লাপ
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
জখমের ’পর মৃত্যু তার পাড়লো ডিম
বিকেল পাঁচটায়।
বিকেল পাঁচটায়।
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা ।

চাকায় বসানো শবাধার এক শয্যা তার
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
কানে বাজে ওই বাঁশি ও হাড়ের অনুরণন
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
এখন তার কপাল ফুঁড়ে হাম্বা হাম্বা ডাকছে ষাঁড়
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
সারা ঘর করে যাতনায় ঝিলমিল
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
পচা-ক্ষত এক আসছে এখন দূর থেকে
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা। (সম্পূর্ণ…)

নগর পিতা বৃষ্টি নামান

অদিতি ফাল্গুনী | ২৭ মে ২০০৮ ২:০৭ অপরাহ্ন

ক.
কিছুদিন হয় সেই নগরে কোন বৃষ্টি হচ্ছিল না। কিছুদিন বলতে টানা এক মাস কোন বৃষ্টি নাই। চৈত্রের মধ্য হতে বৈশাখের মধ্যভাগ…নগরবাসী দেখে শুধু সকাল হতে তেতে ওঠা সূর্য, সকাল এগারোটা হতেই গনগনে গরম লু হাওয়ার আঁচ, হাওয়ার সাথে সাথে দুপুর নাগাদ পাক খেয়ে উড়তে থাকা ধূলার শুনশান বিভীষিকা আর তারও চেয়ে ভারি ও স্তব্ধ, নিরেট সন্ধ্যা আর রাত্রি! বলতে কী, গোটা দেশেই গরম পড়েছিল খুব। তবু, সমুদ্রের নিকটবর্তী দেশের দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্বাংশের শহর ও গ্রামগুলোয় যদি বা এর ভেতর দু/একটা সপ্তাহ এক/দু’দিন হলেও বৃষ্টি হয়েছে…দেশের উত্তরাঞ্চলের এই প্রধান শহরে গত একমাস ধরে বৃষ্টি দূরের কথা, প্রতিবছর গরমের সময়টা
—————————————————————–
আবুল কালাম টুকু হাসেন, ‘নাচতে নামলে ঘোমটা রাখা যায় না! এই বুর্জোয়া রাজনীতি যখন মেনেই নিয়েছি, ভোটের রাজনীতিতে যখন দাঁড়িয়েছি…তখন জনপ্রিয়তা অর্জন করতে হবে! আলিমুজ্জামান নামের চোরাকারবারীটা আমার অতীতের কমিউনিস্ট পরিচয়টা নিয়ে মানুষের কাছে আমাকে নাস্তিক প্রমাণ করতে চাইছে। আমি তার সেই ফাঁদে ধরা দেব কেন?’…‘ঠিক আছে…কিন্তু, বৃষ্টি যদি না নামে?’ ইরফান উত্তেজিত হয়ে সিগারেট ধরায়। …‘আবহাওয়া অফিসের পরিচালক তো বললেন যে বৃষ্টি নামবে!’
—————————————————————–
গরমের অনুষঙ্গ হিসেবেই যেমন অন্ততঃ তিন/চারদিন গুমোট গরমের পর হঠাৎই একদিন কালবৈশাখীর ঝড় ওঠে, বাতাস গরম হতে হতে একদিন নিজেই ঠাণ্ডা ও শিলীভূত হয়ে পড়ে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে এবং তারপর এক ফোঁটা, দু/ফোঁটা করে ধীরে ধীরে দেখা দেয় বৃষ্টি কী শিল পড়ে, আকাশ হতে ঝরে পড়া সেই তুষারকণা জিহ্বায় আস্বাদ করে শিশুরা…সেবার তা-ও হচ্ছিল না! রাস্তাঘাটে মানুষ গরমে হঠাৎই নুয়ে পড়ছিল অচৈতন্য। পশু-পাখিদেরও নিস্তার মিলল না সেবারের গরমে। শহরের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা দেশের একসময়ের সবচেয়ে বড় নদী আর বর্তমানে যে নদীতে জল একদমই নিস্তরঙ্গ পড়শি দেশের দেওয়া একটি প্রকাণ্ড বাঁধের কারণে…যে বাঁধ নিয়ে প্রতিবছর পড়শি দেশের কূটনীতিকদের সাথে এদেশের কূটনীতিকরা ঝাণ্ডা খাড়া করে বৈঠক করেন এবং শিশুরাও জলের কিউসেক জাতীয় পরিভাষা শিখে ফ্যালে…এবছর সেই বড় নদী হয়ে উঠেছিল নিতান্ত নালা…তার ওপর বিদ্যুৎ এই আসে কি যায়, ধানের চারাও মানুষের মতো বা মানুষ ধানের চারার মতো নুইয়ে পড়ছে বৃষ্টিহীন ঠা-ঠা- রোদে…তেমন একদিনে উত্তরের প্রধানতম নগরীর সদ্য নির্বাচিত নগর পিতা তার পারিষদদের সবাইকে নিয়ে তদানীন্তন নগর ভবনে চলমান খরা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আশু করণীয় বিষয়ক একটি বৈঠক ডাকেন। (সম্পূর্ণ…)

নজরুলের কবিতা: ভাবনা-বেদনা

আবদুল মান্নান সৈয়দ | ২৫ মে ২০০৮ ১১:১৭ পূর্বাহ্ন

nzc.jpg
কাজী নজরুল ইসলাম (২৫/৫/১৮৯৯–২৯/৮/১৯৭৬)

কাজী নজরুল ইসলামের (জন্ম ১৮৯৯-স্তব্ধতা ১৯৪২-মৃত্যু ১৯৭৬) নীরব হয়ে যাওয়ার দশ বছর পরে ১৯৫২ সালে পরবর্তী কবি-সমালোচক বুদ্ধদেব বসু ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক’ প্রবন্ধে লিখছেন, ‘কৈশোরকালে আমিও জেনেছি রবীন্দ্রনাথের সম্মোহন, যা থেকে বেরোবার ইচ্ছেটাকেও অন্যায় মনে হতো — যেন রাজদ্রোহের শামিল; আর সত্যেন্দ্রনাথের তন্দ্রাভরা নেশা, তাঁর বেলোয়ারি আওয়াজের জাদু — তাও আমি জেনেছি। আর এই নিয়েই বছরের পর বছর কেটে গেল বাংলা কবিতার; আর অন্য কিছু চাইলো না কেউ, অন্য কিছু সম্ভব বলেও ভাবতে পারলো না — যতদিন না ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নিশেন উড়িয়ে হৈ-হৈ করে নজরুল ইসলাম এসে পৌঁছলেন। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙলো।’ ‘নজরুলের দোষগুলি সুস্পষ্ট, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সমস্ত দোষ ছাপিয়ে ওঠে; সব সত্ত্বেও একথা সত্য যে রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা ভাষায় তিনিই প্রথম মৌলিক কবি।’ ‘নজরুল ইসলাম নিজে জানেননি যে, তিনি নতুন যুগ এগিয়ে আনছেন; তাঁর রচনায় সামাজিক রাজনৈতিক বিদ্রোহ আছে, কিন্তু সাহিত্যিক বিদ্রোহ নেই।’ (‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক’, বুদ্ধদেব বসু)

বুদ্ধদেব বসুর উক্তিসমূহ পরীক্ষা করে দেখতে চাই এখানে। বুদ্ধদেব বসু পরিষ্কার বলেছেন এবং স্বীকার করে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের পরে নজরুল ইসলামই প্রথম মৌলিক কবি। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রসঙ্গ তিনি তুলেছেন ওই প্রবন্ধে, কিন্তু তাঁকে আমল দেননি। সাহিত্যের পরম্পরার দিক থেকে একথা সত্য ও প্রয়োজ্য বলে আমরা মনে করি না। (সম্পূর্ণ…)

এনগুগি ওয়া থিওংগ্’ও-এর গল্প

‘ফেরা’

শহীদুল জহির | ২৪ মে ২০০৮ ৩:৩৭ অপরাহ্ন

[অনুবাদ কৃত গল্পটি প্রয়াত শহীদুল জহিরের ছোট ভাই সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হাবিবুল হকের সৌজন্যে পাওয়া। ফেলে যাওয়া লেখালেখির খোঁজ করতে গিয়ে জহিরের কম্পিউটারে এ অনুবাদটি তিনি আবিষ্কার করেন। বি .স.]

সে লম্বা পথ পাড়ি দিচ্ছিল। পা ফেলা মাত্র ধুলো লাফিয়ে উঠে তার পিছনে ছুটছিল, তারপর পুনরায় থিতিয়ে আসছিলো। তাসত্ত্বেও পাতলা পর্দার মত ধুলো বাতাসে ঝুলে ছিল এবং ধোয়ার মত নড়ছিল। ধুলো এবং পায়ের নিচের মাটির দিকে খেয়াল না করে সে তার হাঁটা অব্যাহত রাখে। তবে প্রতি পদক্ষেপে সে তার পায়ের তলার মাটির কাঠিন্য এবং আপাত বিদ্বেষের
—————————————————————–
মূল: এনগুগি ওয়া থিওংগ্’ও

অনুবাদ: শহীদুল জহির

—————————————————————–
বিষয়ে ক্রমাগত ভাবে সচেতন হয়। অবশ্য তার মানে এই নয় যে, সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাঁটে, বরং সে তার দৃষ্টি সামনের দিকে সোজা প্রসারিত করে রাখে যেন সহসাই সে এমন কোন বস্তু দেখতে পাবে যা তাকে বন্ধু বলে স্বাগত জানাবে এবং বলবে যে, সে বাড়ির কাছে এসে গেছে। কিন্তু রাস্তা শেষ হয় না।

সে দ্রুত এবং আলতো পায়ে হাঁটে, বাঁ হাতটা তার দেহের কোটের পাশে দোল খায়, যে কোটটা একদা সাদা ছিল, বর্তমানে ছিঁড়ে ক্ষয়ে গেছে। তার ডান হাত কনুইয়ের কাছে বাঁকা হয়ে ঈষৎ কুঁজো পিঠের ওপর রাখা একটি বোচকার দড়ির প্রান্ত ধরে রাখে। বোচকাটা একটি সুতি কাপড় দিয়ে ভালভাবে জড়ানো, বিবর্ণ হয়ে যাওয়া যে-কাপড়ে একদা ছাপানো লাল ফুল ছিল; বোচকাটা তার চলার ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একদিক থেকে অন্যদিকে দোল খায়। এই বোচকা বন্দি শিবিরে কাটানো তার বছরগুলোর তিক্ততা আর কষ্টের স্মৃতি বহন করে। বাড়ির পথে সে মাঝে মাঝে সূর্যের দিকে মুখ তুলে দেখে। কখনো কখনো সে দ্রুত বাঁকা চোখে নিচু ঝোপঝাড়ে পূর্ণ লম্বা চিলতে জমির দিকে তাকায়, এই জমি, জমির রুগ্ন দেখতে ফসল, ভুট্টা, শিম এবং মটরশুটিসহ অন্য সবকিছুর মতই লাগে — অবন্ধুসুলভ। (সম্পূর্ণ…)

শহীদুল জহিরের সাথে আর দেখা হল না

রাশিদা সুলতানা | ২৪ মে ২০০৮ ১২:০৬ অপরাহ্ন

sz1986.jpg
১৯৮৬ সালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে শহীদুল জহির (১১/১০/১৯৫৩ — ২৩/৩/২০০৮)

দেশে ছুটি কাটিয়ে খার্তুমে ফিরে ১৬ মার্চ তাঁকে ফোন করেছিলাম। সেই তাঁর সাথে শেষ কথা বলা। ‘স্যার এবার তো অপরাধবোধে ভুগতেছি। বিশ দিন pp-24.jpg ঢাকায় থাইকা আপনার সাথে দেখা কইরা আসতে পারলাম না।’ ওপাশে জবাব দেন, ‘এটা নিয়া তুমি মন খারাপ কইরো না। দারফুর থেকে যখন আবার আসবা তখন দেখা হবে।’ তাঁর সাথে পরিচয় খুব বেশি দিনের না। ২০০৬ এর নভেম্বর ডিসেম্বরের দিকে। অল্প সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন আপনজন।

শহীদুল জহিরের মৃত্যুসংবাদ যেদিন জেনেছি, ঢাকায় বাসায় ফোন করলে আমার চৌদ্দ বছর বয়সী বড় ছেলে বলে, ‘মা, শহীদুল জহির মারা গেছেন। ঢাকা ছাড়ার আগে স্যার, স্যার বলে যে গল্প করতেছিলা, উনিই তো শহীদুল জহির ছিল, তাই না? প্রথম আলোয় সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের একটা শ্রদ্ধাঞ্জলি পড়লাম উনাকে নিয়া…তোমার অনেক মন খারাপ মা?’ আমার মা ফোন ধরে বলেন, আমি জানি, অনেক কষ্ট পাইতেছিস, বিদেশে একা থাকিস। মন খারাপ কইরা থাকিস না, পত্রিকায় ছবি দেখলাম বেশ ইয়াং দেখতে লোকটা, এই বয়সে মরে গেল।’ (সম্পূর্ণ…)

চিত্রনাট্য: জীবনানন্দ দাশের ‘আমার এ ছোটো মেয়ে’

ফৌজিয়া খান | ২১ মে ২০০৮ ৫:৪৬ অপরাহ্ন

jibanananda_das.jpg
জীবনানন্দ দাশ (১৭/২/১৮৯৯–২২/১০/১৯৫৪)

ভূমিকা
জীবনানন্দ দাশের কবিতার সাথে আমার পরিচয় যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ১৯৯৩ সাল। বাংলা বিভাগে তৃতীয় সম্মানের পাঠ্যসূচীতে তিরিশের পাঁচ কবির কবিতার একটি অপশন্যাল কোর্স ছিল। কোর্সটি পড়াতেন প্রয়াত শিক্ষক ড. হুমায়ূন আজাদ। অপশন্যাল হলেও কোর্সটি নিয়েছিলাম। কারণ হুমায়ুন আজাদ পড়াতেন। তিনি নম্বর কম দিতেন বলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই কোর্সের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ ছিল না। আমরা বিশ/পঁচিশ জন হবো যারা ওই কোর্সটি নিয়েছিলাম। হুমায়ুন আজাদের অনেক কিছু আমরা অপছন্দ করলেও তাঁর পাঠদান পদ্ধতির খুব ভক্ত ছিলাম আমরা। তিনি যে নিপুণ দক্ষতার সাথে আমাদের ভাষাবিজ্ঞান পড়িয়েছেন — ঠিক একই দক্ষতায় তিরিশের কবিদের কবিতার কোর্সটি পড়িয়ে এই কবিদের সম্পর্কে আমাদের মধ্যে নিবিড় এক আগ্রহও তৈরি করেছিলেন। তাঁর শিক্ষকতার গুণেই বলা চলে জীবনানন্দীয় ভুবনের সাথে আমার অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটেছিল।

১৯৯৫ সাল। মাস্টার্স শেষ বর্ষের কোর্স ফাইন্যাল পরীক্ষা চলছে। এক মাস অন্তর একটি পরীক্ষা হতো। দুই মাসে দুটি কোর্সের পরীক্ষা দেবার পর ভারত সরকারের বৃত্তি পেয়ে সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে পুনায় চলে যাই চলচ্চিত্র পড়তে। দর্শক হিসেবে ফিল্ম দেখতাম অনেকদিন ধরেই — কিন্তু ফিল্ম পড়ার কোনো প্রস্তুতিই তখন ছিল না আমার। সুতরাং পুনায় প্রথম তিন মাস খুব কষ্টে কেটেছে। নিজেকে ফিল্ম পড়ার উপযোগী করে তোলার জন্য প্রতিদিন প্রাণান্ত চেষ্টা করতে হয়েছে। এই প্রাণপাত চেষ্টার সময় বাংলা সাহিত্য পড়ার অভিজ্ঞতা ভীষণভাবেই সহায়ক হয়েছিল। (সম্পূর্ণ…)

প্রতিষ্ঠানের ছায়ায় ছায়ায় মাজার

বিপন্ন মাজার সংস্কৃতি

সাইমন জাকারিয়া | ১৭ মে ২০০৮ ১:৩০ অপরাহ্ন

majar_hicort.jpg
হাইকোর্টের গম্বুজের সমান্তরালে শরফুদ্দিন শাহের মাজারে গম্বুজ প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। ছবি: কাজল হাজরা

mukit-pagla_shah-poran.jpg
সিলেটের শাহ পরাণ মাজার থেকে একটু দূরে দোতরা বাজিয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করছেন মুকিত পাগলা।

একটু নজর দিলেই বাংলাদেশের অধিকাংশ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পাশেই একটি না একটি মাজারের অবস্থান লক্ষ করা যায়। বঙ্গভবন থেকে শুরু করে হাইকোর্ট, মেডিকেল কলেজ, কেন্দ্রীয় কারাগার, এফডিসি, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, এমনকি বাংলা একাডেমী ও বাংলাদেশ পরামাণু শক্তি কমিশনের কোল ঘেঁষেই পীর-দরবেশদের মাজার দৃশ্যমান। কিন্তু কেন? পাশাপাশি আরো কয়েকটি প্রশ্ন আসতে পারে —
১.এই সব মাজার প্রতিষ্ঠার পিছনে তবে কি জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো স্বীকৃতি রয়েছে?
২.নাকি প্রতিষ্ঠানের পাশে পড়ে থাকা সরকারী জমিনের উপর মাজার প্রতিষ্ঠান এদেশের ভাববাদীদের জন্যে সহজতর উপায়?
৩.এদেশের আইন-আদালত থেকে শুরু করে প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা কেন্দ্র, এমনকি চলচ্চিত্রশিল্পের কারখানা পর্যন্ত কেন মাজার থেকে দূরে নয়?
—————————————————————–
বাংলাদেশের মাজারগুলোর অতীতের চিত্র এখন পুরোটাই বদলে গেছে। এদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিয়তী ইসলামপন্থী রাজনৈতিককর্মী ও নেতাদের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই সঙ্গে মারফতী মাজার সংস্কৃতি পড়েছে বিপন্নতার মুখে।
—————————————————————–
এই সকল মাজারে গত কয়েক বছরের বোমা হামলার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিবছর নিয়ম করে বাৎসরিক ঔরস যেমন ঘটা করে পালিত হত তেমনি সপ্তাহান্তে প্রতি বৃহস্পতিবারের গান-বাজনা-জটলা সবই হত। মাজারের আশেকানদের আনন্দের সেই সব আয়োজনের ইতি ঘটেছে সিলেটের শাহ জালাল মাজারের বোমা হামলার পর থেকে। এ বছরে সারাদেশের কিছু মাজারে ঘুরে দেখেছি এখন সব মাজারই তার পূর্বের আসল চরিত্র হারিয়েছে। (সম্পূর্ণ…)

পথে, প্রদেশে (পর্ব ১)

মাসুদ খান | ১৬ মে ২০০৮ ১১:১৮ পূর্বাহ্ন

বাংলা প্রাণের দেশ, বাংলা গানের দেশ, মায়া ও প্রেমের দেশ, বাংলা যেন এক জাদুবাস্তবের দেশ…

যে দেশে উজান বেয়ে চলে, প্রেমে, ভাটির ভাসান
স্রেফ ভালোবাসাবাসি দিয়ে যেইদেশে বহু মুশকিল আসান!
যে দেশে সুজন দেখে করলে প্রেম, মরলেও বাঁচাতে পারে তারে
সত্যি-সত্যিই, এবং বারে বারে!

অরূপ রূপের সেই দেশে উড়ে চলো মন
ঘুরে ঘুরে বেড়াই এ-মনপবনের জাদু-উড়াননৌকায়
দূর-দূরান্তের নানা জেলায় জেলায়…

অরূপ রূপের সেই দেশের ছোট্ট একটি জাদুবাস্তব শহর বগুড়া — যেখানে কেবলই মিলে-মিলে যায় রোদ ও কুয়াশা, মিলে-মিলে যেতে চায় স্বপ্ন ও বাস্তব। একাকার হতে চায় প্রাপ্তি আর বাসনা…সম্ভব-অসম্ভবের দোলাচলে টালমাটাল দাঁড়িয়ে থাকে বগুড়ার ল্যান্ডস্কেপ, এর পথঘাট, বাহন-বিপণী, আড়ত-ইমারত! এখানকার মানুষ ও কবিকুল হাঁটেন স্বপ্নসম্ভব পথে। ঘুরে বেড়ান কুয়াশাসম্ভব মাঠে ও প্রান্তরে! অবাক-করা এক শহর! বেশ কিছুকাল আমিও ছিলাম সেই স্বপ্নশহরে। এক অর্থে বগুড়া আমারও শহর…আসলে প্রত্যেকেরই থাকে একটি করে শহর, মনের মতো, স্বপ্নময় শহর — যেখানে উপশহরের আধো-আলো-আঁধারি-জড়ানো কোনো বিষাদমাখা বারান্দা থেকে দেখতে পাওয়া যায় শহরের কোনো নার্সিং হোমের শুশ্রুষাময় আলো…।

সেই স্বপ্নশহরে আমার, আমাদের যাপন ও উদ্যাপনের আলো-আঁধার দিয়ে রচিত এই সন্ধ্যাভাষ্য।

* * *

জিন্সের প্যান্ট। নীল টি-শার্ট। শার্টের পিছনে লেখা ‘অ্যান্ড মাইল্‌স টু গো বিফোর আই স্লিপ…অ্যান্ড মাইলস্ টু গো বিফোর আই স্লিপ…’। শার্টে কুয়াশা। নীলচে-নীলচে। প্যান্টে কুয়াশা। কাঁধ বেয়ে নেমে আসা লম্বা-লম্বা চুল। চুলেও কুয়াশা। এই হালকা-হালকা শীতের গোধূলিবেলায় ধীরপায়ে হেঁটে চলেছে ওই যে এক কিশোর কবি। নিরুদ্দেশ পথিকের মতো। নির্জন গোহাইল রোড ধরে হেঁটে যাচ্ছে দক্ষিণে। ঘুমিয়ে পড়বার আগ-পর্যন্ত কবিকে পেরুতে হবে মাইল-মাইল পথ। কবি বায়েজিদ মাহবুব। মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকি তার ওই মাথানিচু হেঁটে যাওয়া, অনেকদূর পর্যন্ত। একসময় আস্তে-আস্তে মিলিয়ে যান কবি আরো অধিক কুয়াশার ভেতর।

এক বিখ্যাত তরুণ, বজলুল করিম বাহার, কবি, চিরসবুজের চিরবসন্তের দেশ থেকে আসা অজর অক্ষর ঝলমলে বসন্তবাহার! রাগ মিয়া-কি-মল্লার, রাগ অনন্ত-ভাটিয়ার…পা-থেকে-মাথা-পর্যন্ত কবি, নখ-থেকে-লিঙ্গ-পর্যন্ত কবি — বিস্ময়কর এক তরুণ…মানুষের চোখেমুখে যে এত আলো ও বিজলিচমকানি থাকে, থাকতে পারে…মানুষ যে কখনো কখনো এতটা শিশু আর এতটা কবি হয়ে ওঠে, উঠতে পারে — আমরা দেখিনি কখনো… (সম্পূর্ণ…)

সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ২)

চঞ্চল আশরাফ | ১৬ মে ২০০৮ ৯:১০ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

azad_eskaton.jpg
আন্‌ওয়ার আহমদের বাসার হুমায়ুন আজাদ, পেছনে লেখক, সামনে সালাউদ্দীন আইয়ুব ও মঞ্জু

বেশ ক’বার আমি হুমায়ুন আজাদকে ফুলার রোড থেকে নিউ ইস্কাটনে ইসমাইল লেনের সেই ৩৩ নম্বর বাসায় নিয়ে গেছি। সময়টা খুব সংক্ষিপ্ত, ১৯৯২ সালের মার্চ থেকে ১৯৯৩-র জানুয়ারি পর্যন্ত। সন্ধ্যার সামান্য আগে আমরা রিকশায় উঠতাম, আন্ওয়ার আহমদের বাসায় পৌঁছনোর আগেই রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠত।

খুব আড্ডা হতো। সেই সব আড্ডায় তারাই আসতেন, হুমায়ুন আজাদের ওপর যাদের অসন্তোষ নেই; যাদের ওপর হুমায়ুন আজাদের অসন্তোষ নেই। ফলে, তাঁর আগমনের দিনগুলোয় আন্ওয়ার ভাই অস্থিরতা ও উত্তেজনার মধ্যে থাকতেন। মাথায় সাহিত্যিকদের একটা লিস্ট নিয়ে সম্ভবত তাঁর এই অস্থিরতা — হুমায়ুন আজাদের অপ্রিয় কোনও ব্যক্তি যেন এসে না পড়েন। বা, তাঁকে সহ্য করতে পারেন না — এমন কারও আগমন অন্তত সেদিন যেন না ঘটে। আর, ওই বাসায় অনেক লেখকেরই, নিয়মিত ও অনিয়মিত আগমন ঘটত। এক সন্ধ্যায় আল মাহমুদ এসে ‘আন্ওয়ার, আন্ওয়ার’ বলে গলিতে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে ডাকামাত্র তটস্থ হয়ে গৃহকর্তা গেটের দিকে ছুটে গেলেন এবং সেখান থেকেই তাঁকে বিদায় দিলেন। কারণ, বাসায় তখন হুমায়ুন আজাদ। মদ্যপানরত, আর হাতে মেলে-রাখা একটি বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে কথা বলছেন আমাদের সঙ্গে আর সিগারেট ফুঁকছেন। ‘আমি কি স্যারকে আজ নিয়ে আসব?’ ফোনে এ-জিজ্ঞাসার জবাবে আন্ওয়ার ভাই বলতেন, ‘না, আজকে আবদুল মান্নান সৈয়দ আসবে।’ (সম্পূর্ণ…)

আমার গ্রীষ্মকাল

কাজল শাহনেওয়াজ | ১৫ মে ২০০৮ ১০:২১ অপরাহ্ন

আমাকে আবার লাইনে দাঁড় করালে

আবার আমাকে হাজির করেছো তোমার সামনে
এক লাইনে দাঁড় করালাম অনেকগুলি আমাকে
অনেক দূর চলে গেছে সেই লম্বা লাইন

তাকিয়ে দেখি কারো বয়স বারো, হাফ প্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট পরেছে
কেউবা আঠারো, ভিড় করে আছে তার মুখে একা থাকার চরম নির্যাতন
কারো বা ছাব্বিশ — অস্থিরতা, যন্ত্রণার মুখোশ পরা
কেউ তিরিশ — ক্লান্ত, পথহারা, সোনালি মাথায় কালো চুল

তুমি কি ন্যায্যমূল্য? তুমি কি বিকল্প বাজার?
আমার সাধ্যের জোর যখন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে
তুমি এলে ত্রাতা হয়ে?

আমাকে আবার লাইনে দাঁড় করালে
আমাকে আবার টেনে নিলে তোমার সাশ্রয়ী দোকানে!
১৪/৫/৮

দুইটা চাঁদ

তোমাকে দেখবো কবে ও চাঁপা কাষ্ঠগোলাপ?
তোমার আমার মাঝখানে একটা যে ফাঁকা মাঠ
অনেকগুলি টাওয়ার
অনেকগুলি চাঁপা শাদা ফুল সবুজ পাতার

আমাকে টেনে নিয়ে গেলে একটা খোলা মাঠে
যেখান থেকে স্পষ্ট বিদ্যুৎচমক দেখা যায়
আমি দেখতে পাচ্ছি র‌্যাবের টহল হেলিকপ্টার
তুমি সেই দিগন্ত জোড়া মাঠে আমার সাথে বসে থাকলে
আমাদের সামনেই সমস্ত মহানগর
বৈশাখ মাসের সন্ধ্যায় লোড শেডিং-এ ডুবে গেল
দেখলাম আকাশ ভর্তি অর্ধেক আলোকিত চাঁদ
বাকি অর্ধেক অন্ধকার চাঁদকে নিয়ে হাওয়া খাচ্ছে

তা হলে দুইটা চাঁদ মিলেই একটা চাঁদ হয়!
বিশাল মাঠটাকে চলো দুইভাগ করে ফেলি
তুমি দাঁড়িয়ে থাকো একটায়
আমি শুয়ে থাকি অন্য মাঠে
ঐ দেখো আকাশ কেমন খালি? এটা শহরের আকাশ
আমাদের ছোট বেলার আকাশ ছিল কত তারাময়
অনেকগুলি টাওয়ার পার হয়ে তোমার কথা ভেসে এলো
অনেকগুলি দালান, রাস্তা, পার্ক, বস্তি পার হতে হতে
তারপরও তোমার কণ্ঠস্বর কেমন সুরভি ছড়াচ্ছে
মনে হয় এই তো তুমি আমার পাশের মাঠে, শুয়ে
আমি অর্ধেক চাঁদ দাঁড়িয়ে!
১৪/৫/৮

শোনাই তোমাকে আবার কাঁচা পদ্য

তোমার কণ্ঠস্বর অবিকল তোমার মতই নাকি?
নাকি কিছুটা আঞ্চলিক?
বনলতা সেনকেও দেখা যায় নাই
শেও কি ছিল না কিছু কাল্পনিক?

গতকাল তোমাকে কথার আঘাত দিয়েছি
বলেছি খুলে ধরো পুরোটা তোমাকে
আজ তুমি ব্যস্ত থাকবে, ভোটার আইডি কার্ড বানাতে

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে মন
মেতেছে সবাই খুব স্বপ্নে
আমি পড়ে গেছি তোমার কুহকে
টাওয়ার টাওয়ারে সংযোগ খুঁজি
তোমার চুল খুলি খুব যত্নে (সম্পূর্ণ…)

লালঘর

ইচক দুয়েন্দে | ১৫ মে ২০০৮ ১০:৪০ পূর্বাহ্ন

তিনটা বাজল। চিকচাক রুই-এর মনে হল জীবনে সে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট করে দেয়ালঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি শুনল।

স্কিক স্কিক স্কিক করে ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা বিরতিহীন মন্থর ঘুরছে। চিকচাক রুই-এর মনে পড়ল না যে কখনো সে এভাবে এক এক সেকেন্ড সময়কে যেতে দেখেছে।

এদিকে তার বুকটা উঠছে এবং নামছে। এরকম একটা ব্যাপার ঘটে সে জানত। কিন্তু এটাও সে লক্ষ করল জীবনে প্রথমবারের মতো। পাকস্থলীটা একটু বা বেশ ফুলে যাচ্ছে ও সঙ্কুচিত হচ্ছে। এটা যে ঘটে সেটা তার এক্কেবারেই জানা ছিল না। এটাও একটা লক্ষ করবার মতো ব্যাপার।
—————————————————————–
ছোট ভাইরা, তোমরা দুধের শিশু, তোমাদেরকে কেন ধরল, বুঝেছ। তোমরা জ্ঞান ফলাচ্ছিলে। বুঝলে আর কক্ষনো জ্ঞান ফলাবে না। কক্ষনো কোনো অফিসার দেখলে ইংরেজি বাতচিত দেবা না। ইংরেজি বলতে চাও ইংল্যান্ডে যাও, আমেরিকায় যাও। যাও ইন্ডিয়ায়, ওখানে মুচিরাও ইংরেজি বলে, কিন্তু মদ খাও এই দেশে আরাম করে। বত্রিশ বছর ধরে ড্রিংক করি। দেখা হলে জিজ্ঞেস করে। বলি, অভ্যাস। ছাড়ে দেয়। আমার সোনার দেশ।
—————————————————————–
আজ রাতে সে নিজের নরম বিছানায় নেই। মাথার তলে তার বালিশ নেই। থাকার প্রশ্নও নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে। রুই দাঁড়িয়ে আছে একটা বর্গাকৃতি ঘরে। ৯ ফুট X ৯ ফুট। উচ্চতা প্রায় ১২ ফুট। ইটে তৈরি, ঢালাই ছাদ, পলেস্তরা লাগানো চুনকাম করা দেয়াল ও ছাদ। ফ্যান ঝোলাবার আঙটাটা কাটা। ঘরটার এক কোণে একটা দরজা দিয়ে যাওয়া যায় একটি ছোট্ট ঘরে। ৩ ফুট X ৩ ফুট। প্রকৃতির ডাকে মানুষ সেখানে যেতে পারে। ঘুটঘুটে অন্ধকার সেটা, বাল্ব নেই। সামনে গরাদ। প্রায় ৩ ফুট চওড়া। এক পাল্লা দরজার মতো গরাদটা খোলা বা বন্ধ করা যায়। এটাই ঘরটিতে ঢুকবার বা বেরুবার একমাত্র পথ। এখন বাইরে থেকে তালা লাগানো। বাইরে একজন সান্ত্রি দণ্ডায়মান। চিকচাক রুই এই ঘরটিতে আটক।

যদিও ঘরটিতে সে একা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সে একাকী নয়। তার আরও দশজন সঙ্গী আছে। তারা সব্বাই শুয়ে আছে ঘরটার মেঝেতে। কতোটা স্থান সাশ্রয় করে মানুষ শুয়ে থাকতে পারে, এটা তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শীতকাল তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঘরটিতে কোনোই আসবাব নেই।

অলৌকিকভাবে একটা কম্বল জুটেছিল। নীল রঙের সেই কম্বলটা মাটিতে বেছানো। সেই কম্বলটা টায়টোয় আশ্রয় দিতে পেরেছিল দশজনকে। তাও খুব কসরত করে। এদিকে সরে ওদিকে সরে। এপাশ ফিরে ওপাশ ফিরে। কিছুটা ধাক্কা মেরে। কাত হয়ে। অবশেষে দশজন জায়গা পেয়েছিল। কিন্তু একজন বাড়তি থেকে গেল। সে বেচারা চিকচাক রুই দণ্ডায়মান।

সান্ত্রিরও বসবার কোনো ব্যবস্থা নেই।

এই আধ ঘণ্টা আগেও তারা টুকটাক কথা বলছিল। এখন নীরব। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৯)

অদিতি ফাল্গুনী | ১২ মে ২০০৮ ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

china.jpg
চীনে ১৯০০ সালে কয়েদীকে কোমল শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।

—————————————————————–
শাস্তির কোমল পন্থা
—————————————————————–

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

২য় অধ্যায়: শাস্তির কোমল পন্থা (The gentle way in punishment)
(পৃষ্ঠা ১০৪-১১৩)

(গত সংখ্যার পর)

দণ্ডপ্রদানের শিল্প, সেক্ষেত্রে, প্রতিনিধিত্বের সমগ্র কৃৎকৌশলের উপর নির্ভর করতে বাধ্য। এই কাজটি শুধুমাত্র তখনি সফল হতে পারে যদি এটি একটি সাধারণ কৃৎকৗশলের অংশবিশেষ মাত্র গঠন করে। ‘শরীরের অভিকর্ষবেগের মতো, একটি গুপ্ত শক্তি আমাদের কল্যাণের পথে সবেগে চালিত করে। এই আবেগ বাধাপ্রাপ্ত হয় শুধুমাত্র বিরুদ্ধ আইনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা দ্বারা। মানুষের সব ধরনের বিচিত্র কাজকর্মই এই অন্তর্গত প্রবণতার প্রভাব।’ একটি অপরাধের যথোপযুক্ত শাস্তি হলো অপরাধীর জন্য এমন কোনো যন্ত্রণা তৈরি করা যার ভয়ে অপরাধটি করার জন্য আর কোনো আকর্ষণ অপরাধী খুঁজে পাবে না। এ যেন বিভিন্ন সঙ্ঘাতমুখী শক্তিগুলোর এক শিল্প। অনুষঙ্গ দ্বারা যুক্ত চিত্ররূপসমূহের শিল্প, সময়কে অস্বীকার করা স্থির সংযোগগুলোর চাপপ্রয়োগ। এ যেন বিরুদ্ধ মূল্যবোধগুলোর যুগ্মতার প্রতিনিধিত্বকে প্রতিষ্ঠা করা। বিরুদ্ধ শক্তিগুলোর ভেতর পরিমাণগত পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিবন্ধকতা-চিহ্নের জটিলতা প্রতিষ্ঠা করা যা শক্তির আন্দোলনকে ক্ষমতা সম্পর্কের অধীনস্থ করে। ‘নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডের ধারণাকে দুর্বল মানুষের হৃদয়ে সদা উপস্থিত থাকতে দাও। যেন এই নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডের ভয় তাকে অপরাধ করা হতে বিরত রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে’ (বেক্কারিয়া ১১৯)। এই প্রতিবন্ধকতা-চিহ্নগুলো নিঃসন্দেহে গড়ে তুলবে শাস্তির নয়া অস্ত্রাগার। ঠিক যেমন পুরনো মৃত্যুদণ্ডগুলো একধরনের প্রতিশোধমূলক চিহ্নের ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছিল। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com