গদ্য

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: বিদায় আব্বাস, বিদায় বনফয়

বিপাশা চক্রবর্তী | ৫ জুলাই ২০১৬ ৭:৪৮ অপরাহ্ন


বিদায় কবি রুপালী পর্দার

Abbasসমসাময়িক চলচ্চিত্রের ইতিহাস যদি আপনি লিখতে বসেন তাহলে চাইলেও কিছুতেই যার নামটি আপনি বাদ দিতে পারবেন না তিনি হলেন-আব্বাস কিয়ারোস্তামি। হলিউডের রুক্ষ সংস্করণের বিপরীতে চলচ্চিত্রে তিনি নিয়ে এসেছিলেন কাব্যময়তা। যা ছিল অত্যন্ত পরিশালীত ও স্ব-অর্জিত, একই সাথে আধুনিক অতিন্দ্রিয়তার প্রতিফলন। তাঁর চলচ্চিত্রেরর প্রতিটি অংশেই তাঁর নিজস্বতা ছিল। তিনি নিজেও ছিলেন কবি। তিনি এ যুগের চলচ্চিত্রের কবি। নিজের মাতৃভূমি ইরানকে তিনি উপস্থাপন করেছেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে। ইরানের সংস্কৃতি, ইতিহাস, সামাজিক জীবনধারাকে সারা পৃথিবীর কাছে পরিচিত করিয়েছেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এমনকি দেশটিতে ইসলামিক বিপ্লবের পরেও তিনি দেশ ত্যাগ করেননি। বরং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর কাব্যিক ঝঙ্কার অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্র মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নিবিড় অথচ সুক্ষ্ম বর্ণনা। বর্ণনা এমন রহস্যময় পরাবাস্তব আবহ সৃষ্টি করে যে আপনার মনে হবে যেন আপনি এই জগতে থেকেও নেই। কোথাও হারিয়ে গেছেন। এভাবেই একজন আব্বাস কিয়ারোস্তামী হয়ে ওঠেন রুপালী রূপকথাকার, কখনো কবি। আব্বাস ছিলেন বর্তমান পৃথিবীর একজন প্রধানতম ‘ওটার’। মানে হল যিনি একই সাথে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা, পরিচালনা, প্রযোজনা, শব্দ ও সুর সংযোজন, চিত্রগ্রহণ এবং সম্পাদনা করতে পারতেন। বলা যায় চলচ্চিত্র নির্মানে তিনি সর্বময় গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের প্রতিটি অংশে ছিল স্বকীয়তার ছাপ। নিজ গুনেই সুপ্রসিদ্ধ এই নির্মাতা হয়ে ওঠেন পৃথিবীর রুপালী জগতের কিংবদন্তী। জীবনের বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। ১৯৪০ সালে ইরানের তেহরান শহরের জন্ম নেন আব্বাস। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন। কর্মজীবনের শুরু গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে ইরানিয়ান টেলিভিশনের জন্য বেশকিছু বিজ্ঞাপন নির্মানের মাধ্যমে। ১৯৬৯ সালে –‘কানুন’ নামে একটি সংগঠনে যারা শিশু কিশোরদের মানবীয় বৃদ্ধিবিকাশ নিয়ে কাজ করে। এখানকার ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব নিয়ে প্রায় এক যুগ কাজ করার সময় শিশুদের নানান সমস্যা নিয়ে বেশ কটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন। পরবর্তীতে নিজেই স্বনির্ভর চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে আব্বাস বলেন, “শুরতে যা ছিল শুধুই চাকরী পরে তা ক্রমশ আমাকে একজন শিল্পী হয়ে উঠতে সাহায্য করে”। ১৯৯৭ সালে নির্মিত‘টেস্ট অফ চেরি’ চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্ব্বোচ্চ ‘পাম দোর’ পুরস্কার অর্জন করে। ১৯৭০ সাল থেকে নিয়মিত ভিন্ন ধারার ডকুমেন্টরি, স্বল্প ও পূর্ণ-দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন এই চলচ্চিত্রকার। আজ যে সারা পৃথিবীতে ইরানী চলচ্চিত্রের জয়জয়কার তা মূলত আব্বাসের বদৌলতে। কেননা, তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মানে তাঁর বৈশিষ্ট্য ও ভাবধারা সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন তাঁর উত্তরসূরি ইরানী চলচ্চিত্রকারদের মাঝে। তিনি নিজে প্রভাবিত ছিলেন সত্যজিৎ রায়, ভিত্তোরিও দে সিকা ও জাক তাতি’র কাজ দ্বারা। (সম্পূর্ণ…)

একটি কবিতার শূন্য-অসীম-গগন-বিহার : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পাবলো নেরুদা

ওমর শামস | ৭ december ২০১৫ ৯:৫৭ অপরাহ্ন

neruda-tagore.jpg

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর :

কে না পড়েছে, “তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা” ? না, সবাই পড়েনি। কিন্তু সবাই শুনেছে, গান হিশেবে শুনেছে; কবিতা হিশেবে পড়েনি। এখানে আমরা স্বরবিতান, ১০ রচনাটি1 পড়বো মূল বাংলায়, তারপর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইংরেজী অনুবাদে এবং তারপর স্পানীশ অনুবাদে এবং তারপর অন্যান্য অনুরণনে। প্রথমে মূল রচনাটির উপস্থাপন :

তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা,
মম শূন্যগগনবিহারী।
আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা–
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম অসীমগগনবিহারী॥

মম হৃদয়রক্তরাগে তব চরণ দিয়েছি রাঙিয়া,
অয়ি সন্ধ্যাস্বপনবিহারী।
তব অধর এঁকেছি সুধাবিষে মিশে মম সুখদুখ ভাঙিয়া–
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম বিজনজীবনবিহারী॥

মম মোহের স্বপন-অঞ্জন তব নয়নে দিয়েছি পরায়ে,
অয়ি মুগ্ধনয়নবিহারী
মম সঙ্গীত তব অঙ্গে অঙ্গে দিয়েছি জড়ায়ে জড়ায়ে–
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম জীবনমরণবিহারী॥

[ স্বরবিতান, ১০ ] (সম্পূর্ণ…)

কবি ও মুক্তিযোদ্ধা সাবদার সিদ্দিকি

পুলক হাসান | ২ december ২০১৫ ৯:০৯ অপরাহ্ন

যেখানেই পা রাখি
ভিন গ্রহে কিংবা ভিন গাঁয়ে দেখি
পায়ের নিচে টুকরো দুই জমি
হয়ে যায় আপন মাতৃভূমি

sabdar.jpgচির ভ্রামণিক কবি সাবদার সিদ্দিকি (১৯৫০-১৯৯৪) তাঁর চুয়াল্লিশ বছরের সংক্ষিপ্ত উদ্বাস্তু উন্মুল জীবনকে রঙিন বেলুনের মতো উড়িয়ে দিয়ে গত হয়েছেন আজ একুশ বছর। ১৯৯৪ সালে ঘুরতে ঘুরতে দিল্লি গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কোলকাতা হয়ে ঢাকায় ফেরার পথে সাতক্ষীরা সীমান্তে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই নাম না জানা এক গ্রামে সমাহিত হন। সাবদার সিদ্দিকি প্রকৃত একজন কবি ছিলেন। কিন্তু দেশের উল্লেখযোগ্য কাব্যসংকলনে তিনি উপেক্ষিত আজও পর্যন্ত। তাঁর প্রথম কবিতা ১৯৬৫ সালে সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত দেশাত্মবোধক কবিতা সংকলন ‘অনন্য স্বদেশ’-এ ছাপা হয়। সে-হিসেবে তিনি ষাটের দশকের কবি। আবার বয়স বিবেচনায় তাঁকে বেঁধে দেয়া যায় সত্তরেও। কিন্তু এই সময়ে একজন প্রথম দশকের কবির যেখানে গ্রন্থের ছড়াছড়ি সেখানে ‘পা’, ‘গুটি বসন্তের সংবাদ’, ‘সোনার হরিণ’ নামের কয়েকটি ক্ষুদে কবিতা সংকলন ছাড়া তাঁর শক্ত বাঁধাই ও পুরো মলাটের কোনো কবিতাগ্রন্থই নেই। যদিও এসব ক্ষুদ্র কবিতা সংকলনের মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন সাবদার সিদ্দিকি, হয়ে উঠেছিলেন সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার নতুন এক কণ্ঠস্বর। তাঁর পরিচয় হয়ে যায় তীব্রভাবে প্রথাবিরোধী এক নাগরিক কবি হিসেবে। প্রথাবিরোধী তো বটেই, সেই সঙ্গে তাঁর স্পষ্টবাদিতা এবং জীবনযাপন নিয়ে উঠতি তরুণ কবিকুলে ছিল বিশেষ কৌতুহল কিন্তু সমসাময়িক ও অগ্রজরা ছিলেন ততটাই উদাসীন। হয়তো বিরক্তও। ফলে মুত্যুর পর তাঁকে নিয়ে কোনো রকম হইচই হয়নি। না এপারে, না ওপারে। অথচ এপার ওপার দু’পারেই ভেসেছে তাঁর জীবন নৌকো। জন্ম পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণার বশিরহাটে। পিতা আইনজীবী, তাই পরিবারের বসবাস ছিল মহানগর কোলকাতাতে। সাবদার সিদ্দিকির শৈশব-কৈশোরও কেটেছে সেখানেই। ১৯৬৪ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় বাবা গোলাম মাওলা সিদ্দিকি পুরো পরিবার নিয়ে চলে আসেন সাতক্ষীরায় এবং ১৯৭১ সালে ফের চলে যান কোলকাতায়। সাবদার থেকে যান এখানেই এবং মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে আট নম্বর সেক্টরে কিছুদিন যুদ্ধও করেন। তারপর ঐসময়েই তিনিও চলে যান ওপারে। তাঁর মধ্যে যেমন ছিল সেই দাঙ্গার ক্ষত, তেমনি তারুণ্যের টগবগে দেশপ্রেমে নতুন একটি দেশের স্বপ্নও। পরে দেখলেন বিপরীত বাস্তবতা। কোলকাতার দাঙ্গা ও তৎপরবর্তী আন্দোলন সংগ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। সেসব উঠেও এসেছে তাঁর ‘কোলকাতা, আমি এক তরুণ মহাপুরুষ’ শিরোনামের আটাত্তর লাইনের দীর্ঘ কবিতায়। (সম্পূর্ণ…)

জাপানে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি

প্রবীর বিকাশ সরকার | ৭ নভেম্বর ২০১৫ ৯:০১ অপরাহ্ন

pic-1.jpg
য়োকোহামার সানকেইএন বাগানবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাঁদিক থেকে নোমুরা য়োওজোও, হারা তোমিতারোও, আরাই কাম্পো এবং অপূর্বকুমার চন্দ

১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষবারের মতো জাপানে আসেন। এটা তাঁর পঞ্চম ভ্রমণ। আমন্ত্রিত হয়ে কানাডা থেকে আমেরিকায় যান বক্তৃতা দেবার জন্য। কিন্তু তাঁর পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেন সহযাত্রী এবং ব্যক্তিগত সচিব অধ্যাপক অপূর্বকুমার চন্দ। যে কারণে তিনি আমেরিকায় প্রবেশ করতে পারেননি। অভিবাসন কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অপমানিত হয়ে ব্যথাভারাক্রান্ত মনে স্বদেশে ফেরার পথে জাপানে নেমে মানসিক ক্লান্তি ও বিষাদ দূর করবেন বলে স্থির করেন। জাহাজ থেকেই বার্তা পাঠান তাঁর ভক্ত ও দোভাষী মাদাম কোরা তোমিকে। সে-বার্তা গিয়ে পৌঁছায় জাপানে রাজনৈতিকভাবে আশ্রিত মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসুর কাছে।

গুরুদেব আসবেন তাঁর থাকার জন্য উপযুক্ত একটি আবাস খুঁজে বের করার দায়িত্ব বর্তালো তাঁর ওপর। কবিগুরুর বয়স তখন ৬৮ এবং অসুস্থ। তিনি বিশ্রাম গ্রহণ এবং লেখালেখি করতে পারেন এমন একটি বাসস্থান কোথায় আছে খুঁজতে লাগলেন।

খুঁজতে গিয়ে তাঁর হঠাৎ মনে হলো কাগজ আমদানীকারক শিল্পপতি ও আধ্যাত্মিক গবেষক ড.ওকুরা কুনিহিকোর নাম। গভীর জাতীয়তাবোধসম্পন্ন এশিয়াবাদী কুনিহিকো ছিলেন রাসবিহারীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনিই প্রথম জাপানে আধুনিক আধ্যাত্মিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওকুরা সেইশিন কেনকিউজো’ অর্থাৎ ‘ওকুরা স্পিরিচুয়াল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ স্থাপন করেন য়োকোহামা বন্দরনগরের ওকুরায়ামা শহরে। তাঁর সঙ্গেই গুরুদেবের মিলমিশ হবে ভালো বলে রাসবিহারী মনে করলেন এবং বাস্তবে তাই-ই হয়েছিল। রাসবিহারী দূরদৃষ্টিসমপন্ন ছিলেন তিনি ওকুরা কুনিহিকোর সঙ্গে গুরুদেবের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বলেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিধ্বস্তপ্রায় জাপানে রবীন্দ্রনাথের শততম জন্মবর্ষ ঘটা করে উদযাপনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছিলেন ১৯৫৭ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত তাঁর শেষজীবনের বন্ধু জাপানি মনীষী ড.ওকুরা কুনিহিকো। বহির্বিশ্বে এরকম বিরল ঘটনা আর দ্বিতীয়টি ঘটেছে বলে জানা নেই। (সম্পূর্ণ…)

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা: আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের প্রকাশনা শিল্পের মর্যাদা অর্জন

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল | ২৫ অক্টোবর ২০১৫ ৬:২৬ অপরাহ্ন

ass.jpgইউরোপে হেমন্তে গাছের পাতায় যখন তামা রং ধরে, প্রকৃতি জানান দেয় পাতাঝরা আর আসন্ন বিষণ্ন শীতের কথা; ঠিক তখনই আয়োজন হয় ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা। যে দেশে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনী বই পুড়িয়ে দিয়েছিলো, সেখানেই এখন বিশ্বের বৃহত্তম বইমেলা! সেই মেলায় যাবার জন্য সেবাস্তিয়ান উইলহেম আমাকে ৬৫তম আন্তর্জাতিক ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ২০০৪ সালের মেলায় অংশ নিয়ে এক বিশাল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। ইতোপূর্বে টোকিও আন্তর্জাতিক বইমেলা, হংকং আন্তর্জাতিক বইমেলা, কলকাতার বইমেলা দেখেছি। তবে এ কথা না বল্লেই নয়, আমাদের একুশের বইমেলাও গর্ব করার মতো বিষয়! প্রথমতঃ এই মেলার সাথে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য মেশানো, দ্বিতীয়তঃ মাসব্যাপী দীর্ঘ বইমেলা বিশ্বে আরো কোথাও নেই!

আমি মেলার দু’দিন আগে চলে যাই দুবাই। তারপর দুবাই থেকে আমার সাথে সঙ্গী হলেন অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম। আর মেলায় গিয়ে পেলাম অঙ্কুর প্রকাশনীর মেজবাহকে। আগে এভাবে আমাদের প্রকাশকেরা ব্যাক্তিগত উদ্যোগে বা মেলার আমন্ত্রণে অংশ নিতেন। এবার ব্যতিক্রম ঘটলো, আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ অংশ নেয়। প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন- সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও কবি কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী কবি মাহবুবুল হক শাকিল। সেই সাথে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সহ-সভাপতি মাজহারুল ইসলাম এবং নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান শায়ক। সমিতির সভাপতি ওসমান গনি যাবার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি যেতে পারেননি অসুস্থতার জন্য। অথচ গনি ভাই এবং প্রিয়ভাজন মাজহার বারবার মেলায় যাবার জন্য বলেছেন। অফিসের ছুটি সংক্রান্ত জটিলতার জন্য তা আর হলো না। (সম্পূর্ণ…)

শামসুর রাহমান: সমুদয় সম্পদের সম্রাট

কামরুল হাসান | ২৪ অক্টোবর ২০১৫ ১১:৪৮ অপরাহ্ন

samsur.jpgছবি: নাসির আলী মামুন
২৩শে অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের জন্মদিন। ১৯২৯ সালে তিনি পুরোনো ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট তিনি আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। যে মৃত্যুকে তিনি ভয় পেতেন সেই মৃত্যু তাকে কালো ডানায় মুড়ে এই রৌদ্রকরোজ্জ্বল পৃথিবী থেকে নিয়ে গেছে অনন্তদূরে– তাঁর প্রিয় লেখার টেবিল থেকে সহস্র আলোকবর্ষ দূরে– যে লেখার টেবিলে বসে তিনি তাঁর জাতির হৃদস্পন্দনকে ধরে রেখেছিলেন বহুকাল। একজন সৌন্দর্যপিপাসু, শুদ্ধবাদী হয়েও তিনি তাঁর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্তপ্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর একেকটি কবিতা আমাদের মুক্তিসংগ্রামের মহান দলিল। নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের গানের পরে যে সকল কবিতা মুক্তিসংগ্রামে আমাদের সবচেয়ে বেশি উদ্দীপ্ত করেছে সে সকল কবিতার ভেতর শামসুর রাহমানের কবিতাই সবচেয়ে শাণিত, সবচেয়ে প্রখর, সবচেয়ে জ্বলজ্বলে।

স্কুল মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তিনি কবিতা রচনায় হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু এরপর আর ফিরে তাকাননি, নিরন্তর লিখে গেছেন এবং কবিতাই লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ভাষায় এত কবিতা আর কেউ লেখেননি। কবিতার এক শক্তিশালী ফল্গুধারা তাঁর ভেতর সততই প্রবহমান ছিল। ‘ইচ্ছে’ কবিতায় তিনি ইচ্ছে িপ্রকাশ করেছিলেন জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত লিখতে ‘যদি বেঁচে যাই একমাস কাল/ লিখবো।/ যদি বেঁচে যাই একদিন আরো/ লিখবো।’ এবং আক্ষরিক অর্থেই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন। প্রথমদিকে যা ছিল ঘনিষ্ঠ কবি বন্ধুদের সাথে একধরণের প্রতিযোগিতা, পরে তা-ই হয়ে ওঠে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান, জীবনরীতি; তিনি ছাড়িয়ে যান তাঁর সমস্ত বিখ্যাত বন্ধুদের। জীবদ্দশাতেই এত বা এর চেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছিলেন কেবল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নজরুল ইসলাম। বিখ্যাত হতে গেলে প্রতিভার সাথে সৌভাগ্যের যে হিরন্ময় হাওয়া জুড়ন লাগে, তা এই কবির চেয়ে বেশি আর কারও ভাগ্যপালে লাগেনি। তিনি ছিলেন পরিশীলিত প্রতিভা ও যুগসন্ধিক্ষণের অপরিমেয় সৌভাগ্যের এক আশ্চর্য যুগলবন্দি। যুগের হৃৎস্পন্দনকে তিনি শিল্পের অনন্য সুষমায় ধরে রেখেছেন। (সম্পূর্ণ…)

কবিতার দেশ, প্রেম আর মোহাম্মদ রফিক

শুভাশিস সিনহা | ২৩ অক্টোবর ২০১৫ ৮:৪৭ পূর্বাহ্ন

mohammad-rofiq.jpg
ছবি: নাসির আলী মামুন
Painting is poetry that is seen rather than felt, and poetry is painting that is felt rather than seen.
–Leonardo da Vinci

অর্থাৎ কবিতা আর চিত্রকলার সম্পর্ক অনেকটা বরের ঘরের মাসী আর কনের ঘরের পিসী–এরকম।

চিত্রকলা বা সোজা কথায় আঁকা ছবির মধ্যেও কবিতা থাকে, কিন্তু সেটা অনুভবের চাইতে বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে কবিতার ভেতর থাকে সেই ছবি, যা দেখার চাইতে বেশি অনুভব করা যায়।

কথা এল অনুভবের। ওয়ার্ডওয়ার্থ বলেছিলেন, কবিতা শক্তিশালী অনুভূতির স্বতঃস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশ। এই অনুভরের কথাই ঘুরে ফিরে কবিতায় চলে আসে। এই অনুভূতিকে কেন্দ্রে রেখেই কবিতাকে আমরা বিচার বিবেচনা করি।
আজ গোটা দুনিয়ার নানান আর্থরাজনৈতিক সংঘাতের চাপে শিল্পের নানান আঙ্গিক যখন নিজেকে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে একটা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে নিজের রূপ বা চেহারাকে দেখার জন্য নানান তৎপরতায় লিপ্ত, তখন কবিতাও সেই পরিবর্তিত সৃজনপরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে নানান যাদু বা ম্যাজিক, ডিকশনাল চেঞ্জেস বা বয়ানগত রূপবদলের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই অবস্থায় কবির জন্য একটা মহা মোকাবেলার ব্যাপারই, সে কবিতার অন্তরের স্পন্দনকে একটা মিথিক্যাল সত্যতার জায়গা থেকে এখনো উপলব্ধি করা, যেখানে কবিতা এতসবকে ছাপিয়ে মানুষের অব্যক্ত হৃৎকথামালার গুঞ্জরণ বলে প্রতিভাত হয়।

কবিতার সেই অনুভবের গভীর বিশুদ্ধতার স্পর্শ মনে পড়ছে কবি মোহাম্মদ রফিকের কথা যিনি আজ পদার্পণ করলেন তিয়াত্তর বছর বয়সে। (সম্পূর্ণ…)

কেন শুদ্ধতম ?

ওমর শামস | ২২ অক্টোবর ২০১৫ ১:১১ অপরাহ্ন

jibon.jpg

১. ‘শুদ্ধতম’ কাকে বলে?

আমরা কি বুঝি? ‘শুদ্ধতম’ কবি, চিত্রী, সঙ্গীতশিল্পী – খুব মুশকিল তাকে সংজ্ঞায় চিহ্নিত করা। অন্নদাশঙ্কর জীবনানন্দকে কেন ‘শুদ্ধতম’ আখ্যা দিয়েছিলেন, আমার জানা নেই। একটা আন্দাজ করা যেতে পারে – যে শিল্পী আদ্যোপান্ত, সর্বক্ষণ, নিদ্রায়-জাগরণে শিল্পের আরাধনাতেই নিমগ্ন থাকেন তাঁকে অথবা যিনি জাগ্রত সত্তার থেকে নয়, অবচেতন থেকেই শিল্পকে গ্রহণ এবং নির্মাণ করেন -তিনিই শুদ্ধ এবং এক স্তরে গিয়ে কেউ শুদ্ধতম। এইরকম ঘোরে যাঁরা থাকেন তাঁরা শুদ্ধতার কাছে যেতে চাইছেন অথবা শুদ্ধতায় ডুবে আছেন। এই অর্থে ইউরিপিদিস, রুমী, দান্তে, লিওনার্দো, সেক্সপীয়র, নিউটন, গাউস, রীমান, রেমব্রাঁ, রামানুজন – এঁরা সবাই শুদ্ধতম। তবে, ‘শুদ্ধতা’-র বদলে যদি আরেকটু পার্থিব শব্দ, ‘মৌলিকতা’, বসাই, তবে প্রশ্নটি রূপান্তরিত হয়ে দাঁড়ায় – কেন মৌলিক ? এই প্রশ্নের যৌক্তিক ও সংগতিপূর্ণ উত্তর দেয়া সম্ভব। শিরোনাম যাই থাকুক, আমি এই প্রশ্নের – জীবনানন্দ কেন মৌলিক, না, ‘জীবনানন্দ কেন বাংলা কবিতায় মৌলিক’ – উত্তর দেবার চেষ্টা করবো। (সম্পূর্ণ…)

জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গম: অর্ধনারীশ্বর অথবা তৃতীয় প্রকৃতি

বিপাশা চক্রবর্তী | ২১ অক্টোবর ২০১৫ ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন

border=0গ্রীক পুরাণে কথিত আছে, কেরিয়াতে কোনো এক ছোট নদীতে বাস করত অতি সুন্দরী এক জলপরী । নাম সালমেসিস। সে প্রেমে পড়ে যায় হারমিস ও আফ্রোদিতির পুত্র, রুপবান যুবক হারমাফ্রোডিটাসের। প্রণয়কাতর সালমেসিস দেবতাদের কাছে প্রার্থনা শুরু করল । তার এই নিবিড় প্রেমকে চিরন্তন করতে করুণা ভিক্ষা করল । দেবতারা যেন হারমাফ্রোডিটাসের সঙ্গে তাকে চিরকালের জন্য মিলিত করে দেন । দেবতারা তার প্রার্থনা শুনলো – তারা তাদের দু’জনকে জুড়ে দিলো একই শরীরে। তারপর থেকে এই প্রাণীটি হয়ে গেল উভলিঙ্গ।

এদিকে উপনিষদ বলছে, সৃষ্টিকর্তার মনেও নাকি শান্তি ছিল না। সেই পুরাণ পুরুষ ভীষণ একা বোধ করছিলেন। কোন সুখ, আনন্দ ছিল না তাঁর । স বৈ নৈব রেমে, যস্মাদ একাকী ন রমেতে। আনন্দের জন্য শেষমেশ নিজেকে দু’ভাগে ভাগ করে ফেললেন নিজেকে- নারী-পুরুষ, অর্থাৎ জায়া-পতি। পরবর্তী শাস্ত্রকারদের মনে উপনিষদের এই বিমূর্ত কল্পনা নিশ্চয়ই এমনভাবে ক্রিয়া করেছিল যার জন্য তারা নির্দেশ দিয়েছিলেন, একটি পুরুষ বা একটি নারী আলাদাভাবে কখনোই সম্পূর্ণ নয়। একটি পুরুষ বা একটি নারী মানুষরূপে অর্ধেক মাত্র। এই কারণেই কি পুরাণ-পুরুষ নিজেকে দ্বিধা ছিন্ন করছিলো? ছিন্ন দুই ভাগের মধ্যে পরস্পরের মিলিত হবার, সম্পূর্ণ হবার টান ছিল কি? (সম্পূর্ণ…)

অকথিত বোর্হেস: একটি তারার তিমির

রাজু আলাউদ্দিন | ১৭ অক্টোবর ২০১৫ ৮:৫০ অপরাহ্ন

উৎসর্গ: ইমতিয়ার শামীম

border=0বোর্হেসের বন্ধু এবং অনুবাদক নরম্যান টমাস ডি জিওভান্নি সেই সৌভাগ্যবান অনুবাদকদের একজন যিনি সরাসরি মূল লেখকের সহায়তায় ১০টির মতো বই অনুবাদ করেছিলেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২–পাঁচ বছরব্যাপী তাঁদের এই যৌথকর্মের ফল ছিলো বোর্হেস-পাঠকদের জন্য অবিস্মরণীয়। নরম্যানের অনুবাদগুলোর মাধ্যমে পৃথিবীর নানা প্রান্তে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য বোর্হেস-অনুরাগী আর বোর্হেসের সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠেছে আলোচনা ও তর্কবিতর্কের বিষয়। কিন্তু নরম্যান ঐ অনুবাদকর্মের পর বহু বছর পর্যন্ত বোর্হেসের নতুন কোনো অনুবাদতো করেনইনি, এমন কি বোর্হেস সম্পর্কে ছিলেন পুরোপুরি নিশ্চুপ। কিন্তু নিশ্চুপ থাকলেও বোর্হেস সম্পর্কে নিস্ক্রিয় ছিলেন না। সেটা বোঝা গেল যখন ২০০৩ সালে স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নধর্মী The lesson of the master: on Borges and his Work গ্রন্থটি বের হলো। এই বইয়ে একটি মাত্র স্মৃতিচারণধর্মী যে লেখা রয়েছে সেটা ছিল আসলে ২০১৪ সালে প্রকাশিত তার George & Elsa: Jorge Luis Borges and his wife, the untold story নামক আইসবার্গের সামান্য চূড়া মাত্র। প্রায় ৪৫ বছরের গভীর তলদেশে অদৃশ্য অবস্থায় থাকা গোটা আইসবার্গটি নরম্যান আমাদের সামনে তুলে ধরলেন তাঁর এই নতুন বইটিতে। কিন্তু নরম্যান কেন এই বই লিখতে গেলেন আর কীই-বা আছে এই বইয়ে যা অন্য কারোর বইয়ে পাওয়া যাবে না? এই বইয়ের শেষ অধ্যায়ে (Looking back) লেখক নিজেই জানাচ্ছেন যে “বোর্হেস এবং তার সাহিত্যকর্ম নিয়ে পাঠাগার-পরিমাণ অসংখ্য বই লেখা হয়েছে” (A library of books has been written about Borges and his literary work.) বোর্হেসের জীবন, সাহিত্যকর্মসহ নানান বিষয় নিয়ে গবেষণা, সমালোচনা হয়েছে বিপুল পরিমাণে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানান জনের নেয়া অসংখ্য সাক্ষাৎকার। কিন্তু এসব গ্রন্থের একটির সঙ্গে অন্যটির চরিত্রগত বা দৃষ্টিভঙ্গীর সাযুজ্য রয়েছে অনেকটাই। কিন্তু বোর্হেস-বিষয়ক নরম্যানের বই দুটি বিপুল গ্রন্থের ভিড়ে সুউচ্চ মিনারের মতো দাঁড়িয়ে আছে মূলত পর্যবেক্ষণ, কখনো কখনো গ্রন্থিমোচন, আর প্রায়শই অন্যদের নজর-এড়িয়ে-যাওয়া, অথচ গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্যের উন্মোচনে। তার প্রথম বইটির সূত্রে এ বিষয়গুলোই পাঠকদের কাছে প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু দ্বিতীয়টি, যেহেতু এতে বোর্হেসের জীবনকাহিনীই উপজীব্য, তাই এখানে এসে ভীড় করেছে বোর্হেসের জীবনের সেই সব ঘটনাপুঞ্জ যা আগে অন্য কারোর লেখা জীবনীগ্রন্থে আসেনি। কেন অন্য জীবনী-লেখকরা এসব অজানা ঘটনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন? কারণ তারা নরম্যানের মতো কাজের সূত্রে বোর্হেসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েননি। ফলে এই গ্রন্থ কেবল হারিয়ে যাওয়া বোর্হেসকেই উদ্ধার করেনি, একই সাথে এটি ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে সেই আকরগ্রন্থ যার সাহায্যে বোর্হেসের পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখা সম্ভব হবে। (সম্পূর্ণ…)

নন-ফিকশনের দস্তয়ভস্কি সোয়েতলানা অ্যালেক্সিয়েভিচ

আন্দালিব রাশদী | ১৩ অক্টোবর ২০১৫ ১১:৪৯ অপরাহ্ন

svetlana1.jpgনোবেল সাহিত্য পুরস্কার কি সাহিত্য থেকে সরে এলো? নাকি সাহিত্যের সীমানায় ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা’-কেও অন্তর্ভুক্ত করা হলো?
নন-ফিকশন আগেও বেশ ক’বার নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে সেন্টার স্টেজে এসেছে, কিন্তু দীর্ঘ সময় মঞ্চ দখল করে রাখতে পারেনি।
তলস্তয়ের মতো সর্বকালের সেরা একজন কথা সাহিত্যিককে উপেক্ষার মধ্য দিয়ে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের যাত্রা শুরু ১৯০১ সালে। নিজ দেশ ফ্রান্সেও স্বল্প-পরিচিত সুলি প্রধোম প্রথম পুরস্কারটি নিলেন। তবুও ভালো তিনি তো কবি। সাহিত্যের মূলধারাতেই অবস্থান করছেন।
দ্বিতীয় বছরের পুরস্কারটি পেলেন একজন অ-সাহিত্যিক জার্মান ধ্রুপদ পন্ডিত, ঐতিহাসিক, আইন বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ (ক্রিশ্চিয়ান ম্যাথিয়াস) থিওডোর মোমসেন। তাঁর তিন খন্ডের বিখ্যাত গ্রন্থ এ হিস্ট্রি অব রোম। তাঁর হাতে রচিত হয়েছে ’রোমান ক্রিমিনাল ল’। বিশুদ্ধ সাহিত্য পাঠক সুইডিশ একাডেমির এই নির্বাচন ভালোভাবে নেয়নি। পান্ডিত্যের জন্য মোমসেনকে হাজারটা পুরস্কার দেওয়া হোক, কিন্তু নোবেল সাহিত্য পুরস্কার কেন?
৪৮ বছর পর পুনরাবৃত্তি ঘটলেও ১৯৫০-এর পুরস্কৃত ব্যক্তি বার্টান্ড রাসেলের মতো ব্যক্তিত্ব হওয়ায় সমালোচনা বেশি দূর এগোয়নি। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ১৯৫৩ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের একপেশে ইতিহাস লেখক উইনস্টন চার্চিল নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় সাহিত্যবিশ্ব অসন্তষ্ট হলো। অযোগ্য ও যুদ্ধবাজ অনেকেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। উইনস্টনও তাদের একজন হলে এমন কোনো ক্ষতি হতো না। কিন্তু নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় সুইডিশ একাডেমির ফোকাস এবং সাহিত্যের ফোকাস নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনাকে সাহিত্যের প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে বিদায় করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। ১৯৬৪-র নোবেল বিজয়ী এবং একইসঙ্গে প্রত্যাখ্যানকারী জ্যাঁ পল সার্ত্রেকে নিয়েও একই অভিযোগের সুযোগ ছিল-তিনি কি সাহিত্যের মূলধারায় ছিলেন? জবাব না, যদিও তার রচনায় ফিকশন ও নন ফিকশন দুটো ধারাই বর্তমান ছিল। কিন্তু তাঁর বিশ্বব্যক্তিত্ব এসব প্রশ্ন ম্লান করে দিয়েছে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক বেলারুশিয়ান সোয়েতলানা অ্যালেক্সিয়েভিচকে সাহিত্যের জন্য পুরস্কৃত করা সমীচীন হয়েছে কি না এ প্রশ্নটি সবার মুখে মুখে,এমনকি বেলারুশেও। ভ্লাদিমির পুতিনকে চপোটাঘাত করার জন্য সুইডিশ একাডেমি সোয়েতলানাকে বেছে নিয়েছে কিনা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোতে, পূর্ব ইউরোপিয় সোভিয়েত প্রভাবিত দেশগুলোতে এ প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে।
……………………………………………………….

ভূমিকা ও অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী

……………………………………………………….
নোবেল পুরস্কার চালুর ১১৫তম বর্ষে নোবেল কমিটি সাহিত্যকে নতুন করে সঙ্গায়িত করে সাহিত্যের মানচিত্র বদলে দিতে চাচ্ছে কি না তাও জিজ্ঞাস্য।
আবার বিষয়টি এমনও নয় যে এবারই প্রথম সোয়েতলানার নাম প্রস্তাবিত হয়েছে এবং তিনি পুরস্কার পেয়ে গেছেন। গত বৎসরও তিনি কেবল প্রস্তাবিতই হননি, ল্যাডব্রোকের বাজিতে প্রথম তিনজনের মধ্যেই তাঁর নাম ছিল। আর ২০১৫ তে তো তিনি বাজির শীর্ষে।
সোয়েতলানার সমর্থনে বলা হচ্ছে- তিনি হচ্ছেন নন-ফিকশনের দস্তয়ভস্কি! তিনি বৃহত্তর সোভিয়েত জনগোষ্ঠির মনঃস্তত্ব ও মনস্তাপের কারুকার। সুতরাং নোবেল তাঁর প্রাপ্য।
সোয়েতলানা আলেক্সান্দ্রাভনা অ্যালেক্সিয়েভিচ, জন্ম ১৯৪৮, ইউক্রেনের স্টেনিসলাফ শহরে। পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকেই বেছে নেন। তাঁর প্রথম বই দ্য আনওমেনলি ফ্রেস অব ওয়ার (১৯৮৫) মহাযুদ্ধে নারীর ভোগান্তির মৌখিক ইতিহাস, বিশ লক্ষ্যেরও বেশি বিক্রি হয়েছে। তাঁর খ্যাতি তুঙ্গে এনেছে ভয়েসেস ফ্রম চেরনোবিলঃ দ্য ওরাল হিস্ট্রি অব নিউক্লিয়ার ডিজাস্টার। আর একটি বিখ্যাত বই জিঙ্কি বয়েসঃ সোভিয়েত ভয়েসেস ফ্রম আফগানিস্তান ওয়ার

চেরনোবিল থেকে একটি অধ্যায়ের একাংশ অনূদিত হল। সমালোচকরা যা-ই বলুন, অনুবাদের সময় আমার মনে হয়েছে ফিকশনেরই ভাষান্তর করছি। (সম্পূর্ণ…)

ঈদ: ধর্মীয় ও জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসব

শামসুজ্জামান খান | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৯:৪৬ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে ঈদোৎসবের সাম্প্রতিক বিপুল বিস্তার ও গভীরতা আমাদের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের একটি নতুন চিত্রকে সামনে এনেছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়, ঘুষ-দুর্নীতির বিস্তার, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, সন্ত্রাসের সঙ্গে রাজনীতির সখ্য, অশান্তি ও আবিলতার সৃষ্টি করেছে, তার ভেতর দিয়েও সমাজ এগোচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে নিরন্তর এবং এই পরিবর্তনের ধারার উৎস খুঁজতে হলে আমাদের ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের বাংলার সামাজিক ইতিহাসের গ্রামীণ এবং সদ্য গড়ে ওঠা খুবই সীমিত আকারের নগরজীবনকে অবলোকন করতে হবে। তাতে হয়তো একটা সমন্বিত লোকজীবন (synthesized) খুঁজে পাওয়া যাবে, কিছু বিরোধাত্মক উপাদান সত্ত্বেও। ময়মনসিংহ গীতিকা বিষয়ে অথরিটি চেক পণ্ডিত দুশান জবাভিতেলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন (Richard Eaton) যে মন্তব্য করেছেন তার সারবত্তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ময়মনসিংহ গীতিকার-গবেষক দুশান (তার বিখ্যাত গ্রন্থ Folk Ballads from Mymensing and the problems of their Authenticity 1963) ময়মনসিংহ গীতিকা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন : আধুনিক-পূর্বকালের (Pre-modern) ময়মনসিংহের গীতিকাগুলো : Neither the Products of Hindu or Muslim culture but of a single Bengali Folk culture-এই সূত্র ধরে ঐতিহাসিক ইটন সাহেব আধুনিক-পূর্ব বাংলাদেশের লোকধর্মকেও শাস্ত্রীয় ধর্মের তুল্যমূল্য বিবেচনা করেছেন। সেভাবে দেখলে পূর্ব-বাংলার গ্রামাঞ্চলের প্রচলিত ইসলামও ছিল লৌকিক ইসলাম- যাতে স্থানীয় আচার-সংস্কার বিশ্বাসের ছোপ লেগেছিল বেশ ভালোভাবেই। এই সমন্বয়ধর্মিতার নানা উপাদান (various syncritistic elements) বাংলার ইসলামকে বিশিষ্ট করেছিল।
ঈদোৎসব শাস্ত্রীয় ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে দ্বাদশ শতকের বাংলায় ইসলাম এলেও চার-পাঁচশত বছর ধরে শাস্ত্রীয় ইসলামের অনুপুঙ্খ অনুসরণ যে হয়েছিল তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সেকালের বাংলায় ঈদোৎসবেও তেমন কোনো ঘটা লক্ষ করা যায় না। এর কারণ হয়তো দুটি : এক. গ্রাম-বাংলার মুসলমানরা ছিল দরিদ্র এবং দুই. মুসলমানের মধ্যে স্বতন্ত্র কমিউনিটির বোধ তখনো তেমন প্রবল হয়নি। ফলে ধর্মীয় উৎসবকে একটা সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর অবস্থাও তখনো সৃষ্টি হয়নি। আর এটা তো জানা কথাই যে সংহত সামাজিক ভিত্তি ছাড়া কোনো উৎসবই প্রতিষ্ঠা লাভ করে না। বৃহৎ বাংলায় ঈদোৎসব তাই সপ্তদশ, অষ্টাদশ এমনকি ঊনবিংশ শতকেও তেমন দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com