গল্প

অতঃপর, তিনি এলেন ছুটির নিমন্ত্রণে

অলভী সরকার | ৩১ জুলাই ২০১৭ ১২:৩১ অপরাহ্ন

Shilpaguru Safiuddin ahmedবেশ ভোরে আমার ঘুম ভেঙে গেল।

ঘর থেকে বেরিয়ে, লম্বা করিডোর ধরে এগোই, একেবারে শেষ মাথায় গ্রিল দেয়া বারান্দা। এখান থেকে তাকালে হলের মূল দরজা দেখা যায়। গার্ড মামা গেইট খোলেন নি এখনো। অত তাড়াও নেই, দরজা খোলার। গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকেই বাড়ি গিয়েছে। আমরা অল্প কজন থেকে গিয়েছি হলে। ছুটি শেষ হলেই মাস্টার্স পরীক্ষা।

সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। কেমন শীতের মতো ঠাণ্ডা। গাছের নরম পাতাগুলো ঝকঝক করছে। কামিনী, মধুমঞ্জরী, হাসনাহেনা- চারপাশে বিচিত্র সুঘ্রাণ। দক্ষিণদিকের এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে বামে তাকালে পাশাপাশি দুটি নিমগাছ। পাঁচ বছর আগে, যখন হলে প্রথম সিট পাই, তখনও বর্ষাকাল। হল-সুপারকে বলে দুটো দেশি নিমের চারা বুনেছিলাম। ওঁরা অবশ্য বেশ খুশিই হয়েছিলেন। বসতির পুব দিকে নিম গাছ থাকা খুব ভাল এমন কথাও জানলাম সেদিন।
বিশ্বাস-অবিশ্বাস বা অভিজ্ঞতানির্ভর জ্ঞান- এত কিছু ভেবে অবশ্য কিছু করিনি আমি। নেহাত, ইচ্ছে হয়েছিল তাই। এখন গাছ দুটো তিনতলার চেয়েও উঁচু। আমার হাতে লাগানো গাছ, আমার চেয়ে বড় হয়ে গেল!
এমন হয় অবশ্য।
গাছেরও হয়; এমনকী মানুষেরও…

এইসব কল্পনাবিলাসের সময় এখন নেই। (সম্পূর্ণ…)

ফারুক মঈনউদ্দিনের গল্প: শারীরবৃত্তীয়

ফারুক মঈনউদ্দীন | ২৪ জুলাই ২০১৭ ৭:২২ পূর্বাহ্ন

Shakil-story
গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের মতো লম্বা টানা ভাড়া ঘরগুলোর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালো ময়লা জলের নালাটা লাফ দিয়ে পার হওয়ার মুহূর্তে চারপাশের ছাড়া ছাড়া টিম টিম করে জ্বলতে থাকা হলদেটে আলোর বাতিগুলো নিভে যায়। আলকাতরার মতো কালো কাদায় পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নেয় রাজিয়া। কিছুক্ষণ আগে মাগরেবের আজান পড়ে গেছে, এ সময়টাতে চারপাশের সবকিছু কেমন যেন অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কেবল আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে পতঙ্গের ডাক করাতের মতো শব্দ করে আধো অন্ধকারের ভেতর গেঁথে যেতে থাকে। দিনের আলো নিভে যাওয়ার পর পচা পানির নালা এবং ময়লার ডাঁই থেকে নিশাচর দুর্গন্ধ চোরের মতো চুপি চুপি বাতাসের সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে ময়লা ভেজা কাপড়ের মতো ভারি হয়ে ঝুলে থাকে যেন। বিভিন্ন ফ্যাক্টরি থেকে উগড়ে দেওয়া মেয়েদের ক্লান্ত অবসন্ন মিছিল থেকে কিছু কিছু অংশ খসে পড়তে পড়তে এ দিকটায় পৌছে মিছিলটা মরা নদীর মতো মিলিয়ে যায়। রাজিয়াদের সঙ্গে একই বস্তিতে থাকা কয়েকটা মেয়ে স্যান্ডেল ঘষটাতে ঘষটাতে ওকে ছাড়িয়ে চলে গেলে চলার গতি বাড়িয়ে দেয় ও। একটা কুনো ব্যাঙ এ সময় ওর পায়ের পাতায় পেচ্ছাব করে দিয়ে লাফিয়ে সরে যায়। এসব উপেক্ষা করে দ্রুত ঘরে ফেরার তাগিদ অনুভব করলেও পা দুটো আর চলতে চায় না যেন। (সম্পূর্ণ…)

কোঁচ ও একটি নিপুণ শেষ-শিকার

সেজান মাহমুদ | ১৭ জুলাই ২০১৭ ৮:৩৬ পূর্বাহ্ন

হুড়াসাগর নদীর শুকনা, মরা-ঢোঁড়া-সাপের-মতন চেহারাখানা দেখলে নইমুদ্দির ছোটবেলায়-দেখা নাজির চাচার বুড়া বয়সের জিনিসপত্তরের কথা মনে পড়ে। কেন মনে পড়ে তা বুঝে উঠতে পারে না নইমুদ্দি। নাজির চাচা বেহুদার মতো লুঙ্গি কাছা মেরে ন্যাটা দিয়ে বসে থাকতেন আর কখন যে বেখায়ালে জিনিসপত্তর বের হতো তা হুশ করতেন না। ফাজিল পোলাপান গলা খাঁকারি দিয়ে জানান দিতো ‘চাচা, লুঙ্গি সামলায়া বইসেন।’ আর তখন পাছার ধুলা ময়লা ঝেড়ে নাজির চাচা লাফিয়ে উঠতেন, ভাবখানা যেন পোলাপানের বলাটা মহা দোষ হয়ে গেছে। বুড়া বয়সের ঝুলে-পড়া জিনিসপত্তর যেমন কোন কামের না, হুড়া সাগরের দশাও অনেকটা সেইরকম; কোন বান আসে না নদিতে, কোন কামের না। শুকনা চরগুলো মানুষজন যে যার ক্ষমতা দিয়ে দখল করে নিয়েছে। এখন নানান ফসলের চাষবাস আর গরু চড়ানো। কেউ কেউ আরেক ধাপ সরেস; এরা নদীর জমির মধ্যেই বাড়িঘর বানিয়ে সংসার পেতে বসেছে। কিন্তু ছোটবেলায় দেখা হুড়াসাগরের উথালি পাথালি রূপ মন থেকে সরাতে পারে না নইমুদ্দি।
Sezan

নইমুদ্দি এতোটুকু চিন্তা একসঙ্গে করতে পেরে খুব আমোদিত হয়। ফুরফুরে মন নিয়ে হাটখোলার দিকে এগিয়ে যায়। আজ হাটবার। আশেপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে মানুষ আসা শুরু হয়েছে। হাটখোলার লাগোয়া মাঠের মধ্যে ঘাসের ওপরে পাটের ব্যাপারীরা চৌকশ গলায় সহজ-সরল কৃষকের কাছে থেকে পাট কিনতে নানান ফন্দিফিকিরের কাহিনি বলতে থাকে-
–‘কয়দিন হইলো মহাজনেরা পাটকল বন্ধ-থাকায় নদিতে আটকা পইড়া আছে জানো? দাম দিমু কি নিজের প্যাটে নাত্তি মাইরা?” (সম্পূর্ণ…)

মনিকা চক্রবর্তীর গল্প: ইদিপাস

মণিকা চক্রবর্তী | ৭ জুলাই ২০১৭ ৯:০৭ অপরাহ্ন

মাছ ধরার বঁড়শিতে কয়েকটা কেঁচো গেঁথে নিয়ে বাড়ির পাশের ডোবাটায় পা বাড়াতেই সদরুল বুঝে নেয় আম্মুর সাথে নানুর আবার ঝগড়া বেঁধেছে। কয়দিন পরপরই ঝগড়া বাঁধে। টাকা-পয়সা নিয়ে ঝগড়া। আম্মু শহর থেকে প্রতি সপ্তাহেই গ্রামে আসে। সদরুলের দেখাশোনার জন্য নানুর হাতে টাকা দিয়ে যায়। নানু কোনদিনই ঠিকঠাক টাকার হিসাব দিতে পারে না। এই নিয়ে প্রায় সময়ই ঝগড়া হয়। আম্মু বলতে থাকে,‘তোমার লোভ বেশি। কত করে কইলাম সদরুলরে স্কুলে ভর্তি করাও ! করাও নাই কেন? ওর পরনের কাপড় সবগুলা ছিঁড়া। নতুন জামাপ্যান্ট কিনার টাকা দিলাম। কই? আমার সব টাকা তুমি তোমার সংসারে লাগাইলা কেন?’
নানুও বলতে থাকে,‘আমার জমিই আছে একটুকরা। গত বছর থেইকা জমিডার লাইগা মামলা চালাই যাইতাছি। টাকাডা এর লাইগ্যাই খরছ হইয়া গেছে।’
বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে সদরুল শোনে তার আম্মু কাঁদতে কাঁদতে বলছে,‘এই যাবৎ গতর দিয়া যা কামাই করছি সব তুমি শেষ কইরা ফালাইলা। তোমার লোভ এত বেশি! একবারও ভাবলা না আমার কথা! আমার সদরুলের কথা! তারে আমি আমার কাছে রাখতে পারি না বইলা তুমি সুযোগ নিতাছ! দুইন্যায় সবাই সুযোগ নেয়। সদরুলের বাপে নিছে, বেবাক মাইনষে নিছে। এহন তুমিও নিতাছ!’
সদরুল এসব শুনতে শুনতে ডোবার দিকেই এগুতে থাকে। সেখানে অপেক্ষা করে আছে তারই সমবয়সি কয়েকটি ছেলে। বয়স আট দশের মতো। কড়া রোদ উঠেছে । জঙ্গলের উপর পড়ে আছে রোদের ফালি। সে ভাবছে ডোবার উপরে ভেসে থাকা শ্যাওলাগুলোর কথা। তার নীচে অনেক ছোট বড় মাছেরা খেলা করে। কিন্তু তার কানের ভিতর আম্মুর কান্না । আর লোভ শব্দটা কেবলই কানে বাজছে। আম্মু যে লোভ লোভ করতেছে, লোভ করা কী খারাপ! তারও অনেক লোভ আছে! আপাততঃ সে একটা বড় মাছ ধরার লোভ করছে। পাশের বাড়ির মইনুল সেদিন দেড় কেজি ওজনের একটা রুইমাছ ধরেছিল। কী সুন্দর মাছটা! অনেকক্ষণ বড়শি ফেলে রাখার পর কটাশ করে ধরেছিল। পাড়ে উঠানোর পর লেজের কী ঝাপটানি! রোদ পড়ছিল মাছটার পিঠে। ঝগড়ার সংলাপ কানে নিতে নিতেই সদরুল পৌঁছে যায় ডোবার কাছাকাছি। অদৃশ্য লোভের টানে। আহা! সেও যদি মইনুলের মতো একটা বড় মাছ মারতে পারত,তাহলে আজকের এই ঝগড়া থেমে যেত। নানু মাছটাকে সুন্দর করে ভাজত। কতদিন মাছ ভাজা দিয়া মরিচ ডইল্যা ভাত খায় না। ভাবতে ভাবতে তার জিভে জল আসে। অভাবের মধ্যেই থেকেছে ছোটবেলা থেকে। ভাল খাবার মোটেই জুটেনি। আজ যদি জুটে যায় একটা বড় রুই বা কাৎলা! একটা অসম্ভব উদ্বেগ নিয়ে সে পৌঁছে যায় ডোবার ধারে। (সম্পূর্ণ…)

জেমস জয়েসের গল্প: ঈভলিন

শাকিলা পারভীন বীথি | ২৫ জুন ২০১৭ ১:০৬ অপরাহ্ন

James-Joyceজেমস জয়েস ( ১৮৮২-১৯৪১ ) একজন আইরিশ উপন্যাসিক, গল্পকার এবং কবি। তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্যিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তার বিখ্যাত গ্রন্থ Ulysses( (১৯২২)’, A Portrait of an Artist as a Young Man ( ১৯১৬ ), Dubliners ( ১৯১৪ ) । ‘ঈভলিন’ ছোটগল্পটি Dubliners গল্পগ্রন্থের একটি গল্প যেখানে ডাবলিন শহর ও শহরবাসীদের জীবন যাত্রা ফুটে উঠেছে। লেখক বিশ্বাস করতেন ডাবলিনের আছে এক চিরায়ত বৈশ্বিক হৃদয়। ইংরেজি থেকে গল্পটি অনুবাদ করেছেন শাকিলা পারভীন বীথি। বি.স.

জানালায় বসে গলির কোলে আছড়ে পড়া সন্ধ্যা দেখছিল সে। জানালার পর্দায় এলিয়ে পড়েছে তাঁর মাথা, তার নাকে ধুলিময় স্যাঁতস্যাঁতে পর্দার গন্ধ । তখন ক্লান্ত সে ।

লোকজন ঘরে ফিরছে । গলির শেষ মাথার বাড়িটার লোকটাও ফিরে এলো । তার জানালার পাশের কংক্রিটের পথ ধরে লোকটা খট খট আওয়াজ তুলে যেতে যেতে এবার পা মেলে ধরল কয়লা বিছানো পথে । লোকটার পায়ের জুতার মচমচ শব্দ শুনতে পেল সে ।শব্দটির শেষ গন্তব্য গলির মাথার শেষ লাল বাড়িটায় । ওখানে এককালে বাড়ি ছিল না । একসময় বেলফাস্ট থেকে এলো এক ধনীর দুলাল, মাঠটি কিনে নিয়ে বাড়ি বানাল । —- না, তাদের বাদামি কুঁড়েঘরের মত বাড়ি নয় । লোকটা গড়ল ঝকঝকে ইটের – গড়া চকচকে ছাদের বাড়ি । গলির কত বাচ্চারা যে ওখানে খেলত ; ডিভাইন পরিবারের , ওয়াটার পরিবারের বাচ্চারা, খোঁড়া পা নিয়ে খেলতে আসতো ছোট্ট কেঁউ, আর খেলত সে ও তার ভাই -বোনেরা । তাদের বাবা প্রায়ই হাতে বেতের লাঠিটা নিয়ে তাদের খুঁজতে সেই মাঠে চলে যেত । যেহেতু ছোট্ট কেঁউ সাধারণত বসেই থাকতো, ওদের বাবাকে দেখা মাত্র সে সতর্ক করে দিত ।এত কিছুর পরেও তখন তারা সুখীই ছিল । বাবাকে এতটা খারাপ মনে হতো না ।তাছাড়া তার মা তখন জীবিত ছিল । এরপর কত কত দিন চলে গেল ; সে ও তার ভাই –বোনেরা বেড়ে উঠল ; তার মা মারা গেল । টীজি ড্যানও মারা গেল , ওয়াটার্স পরিবার চলে গেল ইংল্যান্ডে । সবকিছুই বদলে যায় । সেও এখন প্রহর গুনছে প্রস্থানের ; অন্যদের মতোই উদ্যত হয়েছে সে পিছে ফেলে যেতে তার আপন বাড়ি–ঘর । (সম্পূর্ণ…)

মরিবার হলো তার সাধ

সাব্বির জাদিদ | ৮ জুন ২০১৭ ১১:৩১ পূর্বাহ্ন

anisurবকুল গাছের নিচ দিয়ে পথ। সবুজ ঘন ঘাসের ভেতর লম্বা হয়ে শুয়ে আছে মেটে রঙের চিকন রেখা। হঠাৎ দেখলে চুলের সিঁথির কথা মনে পড়ে যায়। আব্দুল করিম সিঁথি মাড়িয়ে ফজরের নামাজ পড়তে যাচ্ছে। আবছা আলো আবছা আঁধারের মিশেল চারপাশে। কোথাও মোরগ ডাকছে। আব্দুল করিমের মাথায় পাঁচকুল্লি টুপি। হঠাৎ কী ভেবে সে টুপিটা খোলে। দুই হাতে টুপির দুই প্রান্ত ধরে মুখের সামনে এনে জোরসে ফু দেয়। বাতাস পেয়ে টুপির পেট ফুলে উঠলে সে নতুন উদ্যমে টুপিটা মাথায় বসায়। টুপিটা ঠিকঠাক মাথায় সেট করতে গিয়ে তার ঘাড় উঁচু হয় আর তখন তার চোখ আটকে যায় বকুল গাছের ডালে। হাফপ্যান্টপরা এক ছেলে ঝুলে আছে ডালে।

ছুটিপুরে কয়টা ছেলে হাফপ্যান্ট পরা? পরে অনেকেই। তবে এই মুহূর্তে মনে পড়ে যায় কায়েসের কথা। কারণ, গত সপ্তায় কায়েস একটা ফুলপ্যান্টের জন্য বায়না ধরেছিল বাপের কাছে। বাপ মসলেম উদ্দিন ফুলপ্যান্ট কিনে দিতে পারেনি। কিংবা বলা যায়, কিনে দেয়নি। কারণ হিসেবে অনুমান করা যায় অভাব। কায়েস অবশ্য এইসব অভাব টভাবের ব্যাপারগুলো বোঝে না। বোঝার কথাও না। নিতান্তই সে এক বালক এখন। ছুটিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাশ ফোরে পড়ে। এতটাই অবোধ সে, হিসি করার পর প্রায় সময় তার প্যান্টের জানালায় খিল তুলতে ভুলে যায়। তার বাবার কোন জমিজিরেত নেই। গ্রামে ধনী আর গরিব বোঝার মাপকাঠি জমি। যার জমি বেশি, সে বেশি ধনী। যার জমি কম, সে কম ধনী। যার কিছু নেই সে গরিব। কায়েসের বাবার যেহেতু জমি নেই তাই সে গরিব। কায়েস গরিব বাবার একমাত্র ছেলে। এরপর আর কোনো ভাইবোন তার হবে কি না জানা নেই। আপাতত মসলেম উদ্দিনের সংসারে কায়েস একাই এক ছেলে। (সম্পূর্ণ…)

জেগে উঠবো কোন অন্ধকারে

প্রকাশ বিশ্বাস | ৬ জুন ২০১৭ ২:২২ অপরাহ্ন

Shilpaguru Safiuddin ahmedবসন্ত বাউরির বাতাসে কোন লেবুফুলের গন্ধ ভেসে আসে। ভেসে আসে আমের বোল আর কাঁঠাল মুচির সুবাস ।সবুজ নরম এই ঘাসের বন, আর বহু প্রাচীন, বুড়িয়ে যাওয়া ছাল বাকলের বৃকোদর আম,কড়ই, শিমূল, নারকেল বৃক্ষের সারি। পলাশ আর পারিজাত গাছও চেখে পড়লো। এর পাশে কাজল পড়া অতি শান্ত ধীর স্রোতস্বিনী। এ নদীর পাড়ে ভূট্টা, গম আর যবের ক্ষেতনীচ থেকে উপরে উঠে গেছে।
আমি কেন এখানে এই পরিপাটি করে সাজানো ঘাস আর লতা গাছের বাগানে পড়ে আছি? আমায় এখোনে নিয়ে এল কে? শেষ বিকেলের নরম রোদ। এই রোদে গাছপালার ছায়া পড়েছে তীর্যক আর লম্বা হয়ে।
জায়গাটি কোথায় আর কেনই বা আমি এখানে আমি জানি না। আর কে আমাকে কেন কিভাবে নিয়ে এসেছে তাও জানি না।
কিন্তু এ জায়গা যেন অমরাবতী অথবা ইডেন গার্ডেন।
একি একটি কাঠবেড়ালি আমার পাতলুনের পকেটে মুখ ঢুকিয়ে দিচ্ছে কেন? মনে পড়ছে যে আমার পকেটে রয়েছে চিনাবাদামামের ঠোঙ্গা। স্মৃতির আবছা অস্পষ্ট আলোছায়ায় মনে পড়ছে আমাকে যে ঘোড়ার গাড়িতে করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে সেখানে এক সহযাত্রী আমাকে জল খাবারের জন্য এ ঠোঙ্গা উপহার দিয়েছিল।
মিহি বাতাসে ঘুঘুর ডাকে করুণ মূচ্ছর্ণা, হঠাৎ নারকেল গাছের শীর্ষদেশের পাতার আন্দোলনে চোখ আটকে গেল। সাদা ওড়না জাতীয় কাপড়ে মোড়ানো একটি আবছায় মূর্তি । ভালো করে দেখার পর মনে হলো ওটা আমার মনের ভুল। (সম্পূর্ণ…)

রুখসানা কাজলের গল্প : খোঁজ

রুখসানা কাজল | ২ জুন ২০১৭ ১১:২৮ অপরাহ্ন

Samarjit Roy Chowdhuryসার সার লোহার খাট। তাতে বসতেই “কেউউওও…উক” করে সমস্বরে মুচড়ে উঠল খাটগুলো। প্রজাপতিরমত তিনটে মেয়ে একে অপরের সাথে লেপ্টে বসে দেখে, ছয় সাতটা গ্রাম্য সরল মুখ ওদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। প্রত্যেকের নাকেই একাধিক নাকফুল। প্রত্যেকেই কানে পরেছে অধিক প্রচলিত ডিজাইনের গ্রাম্য কারিগরের বানানো সোনার কানপাশা। কারো কারো মাথায় আধা ঘোমটা। কেউ কেউ আবার ওদের দেখে বয়সের ভারে ঝুলে পড়া বুকে একটুখানি শাড়ি টানতে গিয়ে থেমে যায়, তারারা দেহি আমরার নাতনি গো লাহান ! আইছগো বুনেরা, বোওহান তুমরারা।
একজন নীলফুল শাড়িপরা মহিলা সাইনির ঝাকড়া হলুদ কালো চুলে হাত দিয়ে অবাক হয়,হায় হায় ও ছেড়ি তোমরার চুল দেখতারি পাক ধরছুইন !সাইনি বিব্রত হাসিতে মাথা সরিয়ে নিতে চায়। চুলে কাউকে হাত ছোঁয়াতে দেয় না ও। হস্টেল খরচের টাকা দিয়ে চুলে হলুদ রঙ করেছে। কালো চুলে ঝিলিক দিচ্ছেগোছা গোছা হলুদ ডোরা দাগ। বন্ধুমহলে এমনকি ওর থিসিস পেপারের শিক্ষক পর্যন্ত ঈগল চোখে ঝাড়া দুই মিনিট তাকিয়ে থেকে রঙ্গনকে জিগ্যেস করেছিলেন, ওর মাথামুথো ঠিক আছে তো রে ? রঙ্গন মাথা নাড়তেই ম্যাম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। শখের দাম লাখ টাকা। মানুষ যদি জন্তুর চেহারা চায় তো অন্য মানুষের কি! ল্যাপটপের চার্জার সুইচ করে সাইনির দিকে না তাকিয়ে ম্যাম বলেছিলেন, বাহ তোকে বেশ লাগছে ! মনে হচ্ছে একটা বাচ্চা জেব্রা আমার ক্লাশ করতে এসেছে !আয় বোস। (সম্পূর্ণ…)

কানা ফকিরের বেটা, গোরস্তানের দারোয়ান, বেটার মা…

আফসান চৌধুরী | ১৪ মে ২০১৭ ৮:৪৫ অপরাহ্ন

Fakir
কানা ফকির: ফকিরের পোলাটা বড় একটা কালো গাড়ির ধাক্কায় মাথা থ্যাতলাইয়া মইরা গেল। কেউ কাছে পৌছানোর আগেই গাড়ি হাওয়া। পোলাটার কিচ্ছু আস্ত আছিল না। বস্তার মধ্যে ঢোকায় ঢোকায় পোলাটার হাত,পা, মাথা ভইরা দিল। ফকিরেও কইল সরকারি গোরস্তানে যাইতে। সঙ্গে গেছিল মজনু। হের কাম আছিল না। হের ধান্দা রাতে।

গোরস্তানের দারোয়ান: গুলশান লেকের মধ্যে ময়লা ফালাইয়া সরকার এক্ষাণ গোরস্তান বানাইছে ফুটপাতের মানুষের লাইগা। মইরা গেছে যাগ দেশে যাওনের পয়সা নাই। কবরস্তানের পাশে ছোট একটা চঙ্গের দোকান। এতে পুরান কাফন, আগড়বাতি, জিলাপি পাওয়া যায়। মাটিতে ছোট ছোট গর্ত করা। এর মধ্যে মাইনসে মূর্দা গাইরা দেয়, পয়সা দিতে হয় না। রাতে কুত্তা আইয়া চিল্লা-বিল্লা করে। কানা ফকির পোলাটারে বস্তাসহই ভইরা দিল গর্তে। কেমল লাগতাছে দোস্ত। ভালোই তে কাম করলি, সাব্বাস। এইটা কইয়া মজনু তার পিঠে থাপ্পর দেয়। দারোয়ানটা ৫০০ টাকা লয়, কয় রশিদ দিতে পারুম না। ৫০ টাকার জিলাপি কিনা দুইজনে চইলা আসে। (সম্পূর্ণ…)

ইশরাত তানিয়ার গল্প: মৈত্রী এক্সপ্রেস

ইশরাত তানিয়া | ৩ মে ২০১৭ ৮:০০ পূর্বাহ্ন

Isratকিছু ট্রেন আছে। জীবনে কখনও ধোঁয়া উড়িয়ে এমন ট্রেন এলে, চোখ মুছতে হয়। গন্তব্য মোহাম্মদপুর থেকে কৃষ্ণপুর ভায়া নিঝুমপুর। নিঝুমপুরের গল্পবলা গাঁওবুড়ো উঠে পড়েছিল সে ট্রেনে। মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলে তুমি। হাতে লাল-নীল বেলুন। দুপাশে মাসকলাইয়ের ক্ষেতে সামান্য হাওয়া এলেই শিহরণ। সেদিন আর মটরশুঁটি গাছের তলে শুয়ে চিকন পাতার ফাঁকে আকাশ দেখতে ইচ্ছে করে না। শুধু বিকেলের দিগন্তে অপসৃয়মাণ ট্রেন জানিয়ে দিয়েছিল কত সহজ চলে যাওয়া।

অনাড়ম্বর অথচ গম্ভীর। একটু কেশে ধীরে ধীরে ট্রেন একপা দুপা ফেলে এগিয়ে যায়। এই ক্রমশ অস্তিত্ব মুছে যাওয়া, ছোট্ট দুটি হাতে কি করে থামাবে তুমি? কি বিশাল লোহার শরীর! তুমি তো আটকাতে পারোনি ওই সূর্য ডুবে যাওয়াও। তাই এত অ-সুখের হিম ঝরে সন্ধ্যের ঘাটে। আর অসুখ এলেই তোমার মনে পড়ে এক ওষুধের নাম।

হুইটম্যান পড়ছিল হিমিকা, বলল- “অল দিজ সেপারেশান্স এন্ড গ্যাপস শ্যাল বি টেকেন আপ এন্ড হুকড এন্ড লিঙ্কড টুগেদার।”

“সুরভী আছে গাড়িতে। কল কেটে দিচ্ছি। প্লিজ।” টেক্সট পাঠিয়ে ফোনটা চিবুকে চেপে সুরভীর দিকে তাকিয়ে হাসলে তুমি। (সম্পূর্ণ…)

একজন ভাত ব্যবসায়ীর সাথে ঘটে যাওয়া কিছু খণ্ড দৃশ্য

আশরাফ জুয়েল | ২৩ এপ্রিল ২০১৭ ৬:০৩ অপরাহ্ন

“ঐ চুতমারানির পোলা, কি অয়ছে? আমি কি তর বাপের লগে শুইতে গেচি? ভাগ খানকির পোলা, রাস্তা মাপ। এই সক্কাল রাইতে ভজর ভজর চোদাইতে আইচে, ফাল পাড়বি তো গুয়ার ভিত্রে…”-

(এই ধরণের উপভাষা দিয়ে যখন একটা গল্প আরম্ভ হয় তখন সেই গল্পের গতিবিধি, এমন কি এর অন্তিম পরিণতি কি তা অনুমান করা কিছুটা সহজ হয়ে যায়। গল্পের এমন একটা অবস্থায় পাঠকের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে তিনি কোন ধরণের সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাবেন- এক্ষেত্রে পাঠকের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তসমূহ জেনে নেবার চেষ্টা করা যেতে পারে-

ক। অশ্লীল শব্দ ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে গল্প পাঠে বিরত থাকা।
খ।
গ।
ঘ। শত অনিচ্ছা স্বত্বেও গল্পটার সাথে খানিকটা এগিয়ে যাওয়া।

একজন লেখক সব সময় আশাবাদী মানুষ, তাই ‘ঘ’-কে পাঠকের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত ধরে নিয়ে সম্মানিত পাঠক এবং গল্পটির সাথে এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। )

Monirul Islamশাহবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে টি এস সি-এর দিকে তাকালে প্রথমে কি কি চোখে আসে? বামে তাকালে ফুল মার্কেট, ডানে যাদুঘরের গেট। আরেকটু এগোলে ডানে পাবলিক লাইব্রেরী, বামে শাহবাগ থানা, আর খানিকটা এগোলে বামে ময়লা ফেলার ভাগাড় ডানে চারুকলা, দৃষ্টিকে আরও খানিকটা দূরে ছুঁড়ে মারলে বামে ছবির হাট, ডানে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সামাধিস্থল। কি অদ্ভুত? ফুল মার্কেট, যাদুঘর, পাবলিক লাইব্রেরী, থানা, চারুকলা, ময়লা ফেলার জায়গা, ছবির হাট, নজরুল ইসলামের সামাধিস্থল! কারো সঙ্গে কারুরই কোন সামঞ্জস্য নেই তবু এরা নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে, মানিয়ে নেয়া শিখেছে, শিখে নিতে হয়েছে। এই গল্পের প্লট টি এস সিমুখী নয়। বরং আজিজ’কে পেছন করে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকলে যা যা চোখে পড়বে- তাদের পাশ কাটিয়ে আরও খানিকটা এগিয়ে মৎস্য ভবনের দিকে। শিশু পার্কের বিপরীতে ঢাকা ক্লাব! এক পা দুই পা করে আরও খানিক এগিয়ে গেলে দেখা যায়- হ্যাঁ এই জায়গাটাতে রমনা পার্ক-সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, পরস্পরকে চুমু দেয়ার ভঙ্গিতে ঠোঁট বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু চুমু দেয়া হচ্ছে না। ঠোঁটের মাঝ বরাবর পিচ ঢালা ঢাকার নৃশংস রাজপথ। এই- এই জায়গাটা হচ্ছে এই গল্পের প্লট। সোহরাওয়ার্দীর দিকে মুখ হা করে দাঁড়িয়ে থাকা ফুটপাত, মানে রমনা’র গা ঘেঁষে আছে যে ফুটপাত তাঁকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে একটা খুপরি। খুপরিটাকে কেন্দ্র করে একটা সংসার ঘুরপাক খায়। সদস্য- সখিনা সঙ্গে পাঁচ ছয় জন বাচ্চা, একটা লালা, লালার বাচ্চারা, আর অসংখ্য খদ্দের, ভাতের খদ্দের। (সম্পূর্ণ…)

কদম মোবারকের কাছে এক দুপুর

কাজল শাহনেওয়াজ | ২১ এপ্রিল ২০১৭ ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন

Rashid Chowdhuryনারায়নগঞ্জের নানাভাইয়া নবীগঞ্জে নিয়ে গেলেন পাথরে খোদানো নবীজির চরণ মোবারক কদমবুছি করাইতে। মাসুম কাবুলি নামের এক আফগান যোদ্ধা এটা কিনেছিলেন আরব ব্যবসায়িদের কাছ থেকে। এই ভদ্রলোক ঈশা খা’র সাথে মিলে আকবর বাদশাহর ফৌজের সাথে যুদ্ধ করে বাংলার একাংশকে কিছুদিন স্বাধীন রেখেছিলেন। শেষ রক্ষা করতে পারেন নাই যদিও।

নবীগঞ্জ ছিল পাটের শহর। গুদামের। বৃটিশ কম্পানির কলোনিয়াল ছাপ এর অলিতে গলিতে। পূরানা আমলের চিকন চিকন রাস্তা। উইলসন রোডে নানার বাবার বাড়ি।

‘মাম তুমি বুঝতে পারছো না, এইটা ট্রায়াঙ্গুলার না, সার্কুলার। সম্পর্ক এরকমই হয়।’ প্রিণন ওর মাকে বলছে।

‘আচ্ছা এখানে কলাগাছিয়া কই?’
নানাভাই অবাক হন, ‘কলাগাইচ্ছা? তুমি এই নাম জানলা কেমনে ভাইয়া?।
‘এইখানে ধলেশ্বরির সাথে শীতলক্ষ্যা মিলেছে না? তারপর মেঘনার সাথে?’

প্রিণন হাতের ট্যাবে মাথা ঝুকাইয়া থাকে।
ওর চোখ গুগল ম্যাপে। কিন্তু নানাভাই ভাবছে এত কিছুর ভিত্রে এই বালক নদী খুজছে ক্যান?

নারায়নগঞ্জ থেকে নবীগনঞ্জ বড় জোর ৩০০ গজ নদীর এপাড় ওপাড়। কিন্তু কোন ব্রীজ নাই। খেয়া নৌকায় হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করে। সড়ক ব্যবস্থার নিদারুণ হাস্যকর প্রহসন। পাটের জমানায় কলকাতার ব্যাংক থেকে মাস পয়লা বেতনের টাকা নিয়া সি-প্লেন নামতো, আর নবীগঞ্জের ইংরেজ ক্যাসিয়ারই সেই টাকা রিসিভ করতো। নারায়নগঞ্জ তখন কেবল স্টিমার ঘাট আর রেল স্টেশন! ঢাকা-নারায়নগঞ্জ-গোয়ালন্দ-কলকাতা। শহর বলতে নবীগঞ্জ। পাটগুদাম, চিকন রাস্তা, গ্যাসের স্ট্রিট লাইট আর কদম রসুল। পাট শ্রমিকদের দরগা। রসুলের পায়ের ছাপের পাথর টুকরা! কদম রসুল। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com