ইতিহাস

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঈদ উৎসব

শামসুজ্জামান খান | ৭ জুলাই ২০১৬ ৬:৪৮ অপরাহ্ন

ঢাকার সাবেক কালের সমন্বিত সাংস্কৃতিক জীবনের কিছু নতুন দিক এখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। ঢাকার নওয়াবরা উর্দুভাষী হিসাবে বাঈজিনাচ, মহরমের মিছিল, ঈদোৎসব, কাওয়ালি বা জয়বারী গানবাজনার সঙ্গে যেমন জড়িত ছিলেন তেমনি হিন্দুদের দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমি, ঝুলনযাত্রা ইত্যাদিতেও যোগ দিতেন। নওয়াব পরিবারের ডায়েরিতে ঢাকার সমাজ ও সংস্কৃতি (সম্পাদনা- অনুপম হায়াৎ) গ্রন্থ থেকে জানা যাচ্ছে নওয়াবরা বাংলা নববর্ষ, নবান্ন, গায়ে হলুদ, মেয়েদের ঘুড়ি উৎসব, পৌষ সংক্রান্তি এমনকি ষষ্ঠী প্রভৃতি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান করতেন এবং এসব উৎসবেও অংশ নিতেন।
১৯১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি তারিখের খাজা মওদুদের ডায়েরিতে লেখা আছে : “আজ সোমবার। পৌষ-সংক্রান্তির দিন। নওয়াবজাদী আমেনা বানু আজ আহসান মঞ্জিলে ঘুড়ি ওড়ানো উৎসবের আয়োজন করেন। এতে তিনি শুধু মহিলাদের দাওয়াত দেন। মহিলাদের এই আনন্দ উৎসবে সারা দিন রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া ও নাচগানের এন্তেজাম করা হয়। পরের বছর নওয়াববাড়ির গোলতালার পারে পুরুষদের ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা বা ‘হারিফি’ খেলা অনুষ্ঠিত হয়। খাজা হুমায়ুন কাদের এতে অংশ নেন। এতে বিপুল দর্শক সমাগম ঘটে।”
ঈদোৎসবে নওয়াবরা নানা আমোদ-ফূর্তির ব্যবস্থা করতেন : যেমন কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারের নাটক ঢাকার নওয়াব বাড়িতে প্রদর্শন, জাদু ও সার্কাস দেখানো, বায়োস্কোপ দেখা বা কোনো খেলাধুলার আয়োজন। পাটুয়াটুলির ক্রাউন থিয়েটার, জগন্নাথ কলেজ, ন্যাশনাল মেডিকেল ইত্যাদির মঞ্চে বায়োস্কোপ দেখার তথ্য যেমন আমরা পাই তেমনি পিকচার হাউস, এম্পায়ার থিয়েটার ইত্যাদিতে সিনেমা উপভোগের রূপছায়াময় বিবরণ পাওয়া যায় নওয়াব পরিবারের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে। নওয়াবেরা ঈদের এমন সব বিনোদনে অংশগ্রহণের জন্য পরিবারের ছেলেমেয়েদেরও সুযোগ করে দিতেন ।
ঈদ নিয়ে নওয়াব বাড়িতে দু’একবার বিবাদ-বিসম্বাদও বেধে যায়। ১৯২০ সালের ২৫ আগস্টের খাজা শামসুল হকের ডায়েরিতে লেখা হয়েছে– ‘বকরা ঈদ নিয়ে নওয়াব বাড়ির দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ হয়। এক পক্ষে খাজা মোঃ আজম ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করেন যে, আজ বকরা ঈদ হবে। অপর পক্ষে নওয়াব হাবীবুল্লাহ ঢোল পিটিয়ে দেন যে, আগামীকাল ঈদ হবে। শেষ পর্যন্ত ওই বছর ঢাকায় দুই দিন বকরা ঈদ হয়। ১৯২২ সালের ঈদ-উল-আযহার ব্যাপারেও একই ঘটনা ঘটে।’ (সম্পূর্ণ…)

শেখ মুজিবকে নিয়ে একাত্তরে বার্তাসংস্থার তিনটি সংবাদ

আন্দালিব রাশদী | ২০ december ২০১৫ ৮:০২ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অল্প কিছুদিন আগে আগে জার্মান পত্রিকা ডার স্পিগেল এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্স পাকিস্তানে কারাবন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারকার্য বিষয়ক তিনটি সংবাদ প্রকাশিত করে। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী, বিরোধীদল এবং বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ এই বিচারকার্য এবং রায়ে কিভাবে সাড়া দিয়েছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে এই প্রতিবেদনগুলোতে। কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক আন্দালিব রাশদীর অনুবাদে পাঠকদের জন্য তা এখানে উপস্থাপিত হলো। বি.স.

‘তাঁর অবশ্যই মৃত্যদন্ড হবে’ –ডার স্পিগেল

der-spigel.jpg

বন, ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি, ৩০ আগস্ট ১৯৭১। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবর রহমানের নিয়তি পশ্চিম-পাকিস্তানি সামরিক ট্রাইবুনাল গোপনে নির্ধারণ করে দিচ্ছে। বিচারক শফি এরই মধ্যে তা জেনে গেছেন: ‘অবশ্যই তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে।’

‘মহিষের যেমন সিং, বাঘের যেমন থাবা, মৌমাছির যেমন হুল, মিথ্যে তেমনি বাঙালির’ বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস অষ্টাদশ শতকে এই রায় দিয়েছিলেন।

[ডার স্পিগেলের প্রতিবেদক এই উদ্ধৃতিটি সম্ভবত তার স্মৃতি থেকে নিয়েছেন, এটি অসম্পূর্ণ, কথাটি ওয়ারেন হেস্টিংস-এর নয়, থোমাস বেবিংটন ম্যাকলের; ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর ও পরে ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন। ম্যাকলে (১৮০০-১৮৫৯) ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৮ পর্যন্ত ভারতে ছিলেন, বোর্ড অব কন্ট্রোলের সেক্রেটারি হিসেবে।]

বাংলার নতুন শাসক পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মিলিটারিরা তাদের পূর্বসুরী ব্রিটিশদের বর্ণগত পূর্বধারণা নিয়ে শাসন করেছে। ওয়ারেন হেস্টিংস এর ২০০ বছর পর বাঙ্গালির ‘মিথ্যে’র বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চালু করেছে। (সম্পূর্ণ…)

সিলেটের আদিকথা

আবুল মাল আবদুল মুহিত | ২৮ december ২০১৪ ৫:৫৬ অপরাহ্ন

মোগল সুবা বাংলায় বৃটিশ শাসনের সূচনা হয় ১৭৫৭ সালে যখন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা-সূর্য অস্তমিত হয়। ফার্সীই কিন্তু বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বকালের প্রথম আশি বছর ছিল এদেশের রাজভাষা। ১৮৩৭ সালে ইংরাজী হলো বৃটিশ-ভারতের রাষ্ট্রভাষা এবং ১৮৪৪ সালে নির্দেশ হলো যে, সরকারি কর্মকর্তাকে অবশ্যিই ইংরাজী জানতে হবে। সেই সময় মুসলমান এলিট গোষ্ঠি ফার্সী এবং ঊর্দুর প্রবক্তা হয়ে গেলেন। হিন্দু সম্প্রদায় কিন্তু সহজেই এই পরিবর্তন মেনে নিলেন এবং এতে সূচনা হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের পশ্চাৎপদতা এবং সম্ভবতঃ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ যার পূর্ণ সুযোগ নেয় বৃটিশ সামাজ্যবাদ। প্রথম পরিবর্তনের হাওয়া প্রবর্তন করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮৬১ সালের প্রথম মুসলমান স্নাতক হুগলীর খান বাহাদুর দেলোয়ার হোসেন আহমদ। বাংলার ভূখণ্ডে ক্রমে ক্রমে এই প্রগতিবাদী গোষ্ঠি ভারি হতে থাকলো। কুষ্টিয়ার মীর মোশাররফ হোসেন, ঢাকার কবি কায়কোবাদ, যশোরের মুন্সী মেহেরুল্লাহ, সিলেটের ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আহমদ, চব্বিশ পরগনার শেখ আবদুর রহিম, বরিশালের মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন, রাজশাহীর মির্জা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী, টাঙ্গাইলের নওশের আলী খান ইউসুফজাই, সিরাজগঞ্জের ইসলাম হোসেন সিরাজী, ধানবাড়ীর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী, সিলেটের শিক্ষাবিদ স্কুল পরিদর্শক আবদুল করিম, ফেনীর খান বাহাদুর আবদুল আজিজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবাব সৈয়দ শামসুল হুদা, খুলনার খান বাহাদুর এমদাদুল হক, লাকসামের নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরী, রংপুরের বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখ মুসলিম সমাজে পুনর্জাগরণের সূচনা করেন। (সম্পূর্ণ…)

বাংলায় ঈদ, বাঙালির ঈদ

শামসুজ্জামান খান | ৯ আগস্ট ২০১৩ ৬:০০ অপরাহ্ন

বাংলায় ঈদোৎসবের বিশদ ইতিহাস এখনো লেখা হয়নি। আমাদের এই ভূখণ্ডে কবে, কখন, কীভাবে ঈদোৎসবের উদ্ভব হয়েছে তার কালক্রমিক ঘটনাপঞ্জি কোনো ইতিহাসবেত্তা বা ইসলামের ইতিহাস গবেষক এখনো রচনা করেননি। তবে নানা ইতিহাস গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে বাংলাদেশে রোজাপালন এবং ঈদ-উল-ফিতর বা ঈদ-উল-আজহা উদযাপনের যে-খবর পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় ১২০৪ খৃস্টাব্দে বঙ্গদেশ মুসলিম অধিকারে এলেও এদেশে নামাজ, রোজা ও ঈদোৎসবের প্রচলন হয়েছে তার বেশকিছু আগে থেকেই। (সম্পূর্ণ…)

ঢাকায় আর্মেনীয়রা

অদিতি ফাল্গুনী | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১১ ৬:১৯ অপরাহ্ন

aud_armn03.jpg……..
মিখাইল হোফসেফ মার্টিরোসেন। লেখকের তোলা ছবি।
……
খুশবন্ত সিংয়ের দিল্লী উপন্যাসে লেখক দিল্লীকে তার সেই রক্ষিতার সাথে তুলনা করেছেন যাকে লেখক ঘৃণা করেন অথচ যার কাছে না যেয়ে পারেন না। না, বাবা…আমি খুশবন্ত সিং নই। আমার জীবনের দীর্ঘতম বছরগুলো যে শহরে আমি কাটিয়েছি… সেই শহরকে বরং পুরনো দিনের বাংলা সিনেমা দীপ জ্বেলে যাই-এর একটি জনপ্রিয় গানের কলির ভাষায় বলতে চাই, ‘এমন বন্ধু আর কে আছে? আমার মনের মতো মিস্টার/ কখনো বা ডার্লিং, কভু তুমি জননী/ কখনো বা স্নেহময়ী সিস্টার!’ সুবা বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর বা দেবী ঢাকেশ্বরী যে নগরীর রক্ষয়িত্রী …শাঁখারি, কুট্টি, শিয়া, সুন্নী, বাঙালী, তেলেগু, কাশ্মিরী, চৈনিক, ইসমাইলিয়া, মগ (বর্মী), ইস্পাহানী মায় আর্মেনীয় জনস্রোতের বিপুল মিশ্রণে তিলে তিলে গড়ে ওঠা আমাদের এই এলিয়ট কথিত ‘আনরিয়েল সিটি’ বা ‘অপ্রাকৃত নগরী।’ লালবাগ মসজিদ, হোসনী দালান, বড় ও ছোট কাটরা, রূপলাল হাউস, ঢাকেশ্বরী মন্দির, বলধা গার্ডেন, পোগজ স্কুল, বর্ধমান হাউস, চামেলী হাউস, নর্থব্রুক হল… ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!

aud_armn01.jpg
চার্চের সম্মুখভাগ। লেখকের তোলা ছবি।

আজ এই মধ্য বৈশাখের রাধাচূড়া-বাগানবিলাস-জারুল ও রক্তবর্ণ কৃষ্ণচূড়ার পুষ্পহারে শোভিতা নগরী যখন চারশ’ বছর পার হয়েও পা দিলো মনে হয় আরো একটি বছরে, পাঠক… চলুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর নাজিমুদ্দিন রোড পার হয়ে আর একটু এগোলেই আমরা পেয়ে যাব আর্মেনীটোলার আর্মেনীয় গীর্জা! পুরনো ঢাকার ছোট ছোট গলি আর নর্দমার পাশেই আর্মেনীটোলা ও বাবুবাজারের শতেক দেশী আতর বা বিদেশী সুগন্ধীর খুচরা দোকানগুলোর গন্ধে আচ্ছন্ন বাতাস নাকে শুঁকতে শুঁকতে আপনি দেখতে পাবেন বয়সিনীর মতো সামনের দেয়ালে কিছুটা জীর্ণতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর্মেনীয় গীর্জা। গীর্জা স্থাপনার সন ১৭৮১। গীর্জার প্রবেশ দরোজায় একটি বড় তালা। বাইরে থেকে লোহার শিকের ভেতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়ালে কলিং বেল অনেকক্ষণ ধরে টিপলে ঢাকার শেষ আর্মেনীয় মার্টিন মার্টিরোসেনের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধায়ক শঙ্কর বা গীর্জার প্রহরী হিনু দরোজা খুলে দেবে। ভেতরে ঢুকতেই সার সার কবর। কবরের একপাশে উপাসনাগৃহ। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ১২)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ৬:২১ অপরাহ্ন

—————————————————————-
বশ মানা শরীরগুলো
—————————————————————–

কিস্তি: ১০১১

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

work-table-2.jpg
কাজের টেবিলে মিশেল ফুকো, ছবি:মার্টিন ফ্রাঙ্ক

খণ্ড ৩ : শৃঙ্খলা

প্রথম অধ্যায়: বশ মানা শরীরগুলো (Docile Bodies)
(পৃষ্ঠা ১৩৫-১৪৫)

(গত সংখ্যার পর)

আসুন, সপ্তদশ শতকের শুরুতে সৈন্যের যে আদর্শ মূর্তি কল্পনা করা হতো, সেই আদর্শ মূর্তিটির কথা আমরা ফিরে আর একবার ভাবি তো! গোড়ার কথা বলতে হলে, একজন আদর্শ সৈন্য হলেন তিনিই যাকে বহু দূর থেকে দেখেও চমৎকার চেনা যেত। আদর্শ সৈন্যকে চেনার কিছু সহজ লক্ষণ বা চিহ্ন ছিল। একদিকে তাঁর শক্তিমত্তা এবং সাহসের সাধারণ চিহ্ন তো ছিলই, সেই সাথে ছিল তাঁর গৌরবের কিছু লক্ষণ। তাঁর দেহসৌষ্ঠবই তাঁর শৌর্যবীর্য প্রকাশের মাধ্যম। একথা সত্য যে যুদ্ধবিদ্যা একজন সৈনিককে শিখতে হয় অল্প অল্প করে। সাধারণতঃ প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রেই এই শেখার প্রক্রিয়াটা চলে। তবু
—————————————————————–
বহুদিন ধরেই ‘পুঙ্খানুপুঙ্খতা’ ধর্মতত্ত্ব এবং তপশ্চর্যার একটি প্রণালী হয়ে দাঁড়িয়েছে। … যেহেতু ঈশ্বরের দৃষ্টিতে কোনো অসীমতাই একটি ক্ষুদ্র অনুষঙ্গের চেয়ে বড় নয় এবং কোনোকিছুই এত ক্ষুদ্র নয় যা ঈশ্বরের একটি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা হতে তৈরি হয়নি। পুঙ্খানুপুঙ্খতার প্রতাপের এই প্রবল ঐতিহ্যে, খ্রিষ্টীয় শিক্ষা, যাজকিয় অথবা সামরিক স্কুলশিক্ষার যাবতীয় সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়, যাবতীয় ‘প্রশিক্ষণ’ তাদের জায়গা ঠিকঠাকমতো খুঁজে পেয়েছে।
—————————————————————-
japan-trip.jpg
জাপানে ফুকো

মার্চপাস্ট করার মতো শারীরিক নড়াচড়া কিম্বা গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা তুলে রাখার মতো মনোভাব প্রায়শঃই একজন সৈন্যের সামাজিক সম্মানের শারীরিক অলঙ্করণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘সৈনিকের পেশার সাথে খাপ খায় এমন বিভিন্ন চিহ্নের ভেতর সজীব কিন্তু সতর্ক ভঙ্গিমা, উঁচু মাথা, টানটান পাকস্থলী, চওড়া কাঁধ, দীর্ঘ বাহু, শক্ত দেহকাঠামো, কৃশকায় উদর, পুরু উরু, পাতলা পা এবং শুকনো পায়ের পাতা উল্লেখযোগ্য। এমন দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী পুরুষটি ক্ষিপ্র এবং বলিষ্ঠ না হয়ে যায় না।’ সৈনিক যখন বর্শাধারী হবেন তখন ‘সৈনিককে মার্চপাস্টের সময় এমনভাবে পা ফেলতে হবে যেন প্রতিটি পদক্ষেপে যথাসম্ভব মহিমা ও ভাবগাম্ভীর্য ফুটে ওঠে। কেননা, বর্শা হলো একটি সম্মানজনক অস্ত্র যা কেবলমাত্র ভাবগাম্ভীর্য ও সাহসের সাথেই শুধু বাহিত হতে পারে।’ (মন্টগোমারি, ৬ এবং ৭)। আঠারো শতকের শেষ নাগাদ ‘সৈন্য’ হয়ে দাঁড়ালো এমন এক ভাবমূর্তি যা এমনকি ছিরিছাঁদহীন এক তাল কাদা থেকেও বানানো যায়। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ১১)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৬ জুলাই ২০০৮ ৪:৪৪ অপরাহ্ন

gloucesterjail.jpg
ব্রিটেনের গ্লুচেস্টার সংশোধনাগার

—————————————————————-
শাস্তির কোমল পন্থা
—————————————————————–

কিস্তি: ১০

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

২য় অধ্যায়: শাস্তির কোমল পন্থা (The gentle way in punishment)
(পৃষ্ঠা ১২৩-১৩১)

(গত সংখ্যার পর)

সংশোধনাগারের এই ব্যবস্থা শুধুই যে গার্হস্থ্য অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষায় জরুরি জটিল স্বার্থগুলোর পুনর্বিন্যাস করবে তাই নয়। বরং সংশোধনাগার নৈতিক বিষয়ের অনুজ্ঞাও নির্ধারণ করবে। সংশোধনাগারের সেল বা ক্ষুদে কুঠুরি যেন খ্রিষ্টীয় সন্ন্যাসীদের মঠের আদলে গড়া যা আগে শুধু ক্যাথলিক দেশগুলোতেই দেখা যেত। ক্যাথলিক মঠের আদলে গড়া সংশোধনাগারের wal-st-j.jpg
ফিলাডেলফিয়ায় ওয়ালনাট সড়কের জেলখানা

এই সেলগুলোই প্রটেস্ট্যান্ট সমাজে সেই যন্ত্রের রূপ ধারণ করে, যার মাধ্যমে কেউ গার্হস্থ্য অর্থনীতি এবং ধর্মীয় বিবেকবোধ দু’টোরই পুনর্গঠন করতে পারে। একদিকে অপরাধ ও আর একদিকে ন্যায়পরতা ও পুণ্যের পথে ফিরে আসা — জেলখানা যেন এই ‘দুই ভুবনের মধ্যবর্তী স্থান’টুকু গঠন করে। দুই ভুবনের মধ্যবর্তী এই স্থানটুকুই যেন ব্যক্তিগত রূপান্তরের জায়গা যা রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেবে তার অতীতের সেই বশমানা প্রজাকে যে প্রজা পরবর্তী সময়ে আইন অমান্যকারী বিদ্রোহীতে রূপান্তরিত হয়েছিল। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ১০)

অদিতি ফাল্গুনী | ২০ জুন ২০০৮ ৩:১১ অপরাহ্ন

—————————————————————-
শাস্তির কোমল পন্থা
—————————————————————–
paris-prison.jpg
প্যারিস জেলখানা, ১৯৭১ সালে তোলা ছবি

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

২য় অধ্যায়: শাস্তির কোমল পন্থা (The gentle way in punishment)
(পৃষ্ঠা ১১৩-১২২)

(গত সংখ্যার পর)

পুরনো শাস্তি ব্যবস্থার উত্তরসূরী হিসেবে নয়া শাস্তি ব্যবস্থায় একমাত্র যে অপরাধের জন্য অপরাধীকে কঠিনতম নির্যাতন করা হতো তা হলো রাজহত্যা। এই অপরাধে অপরাধী হলে হতভাগ্য ব্যক্তির চোখ উপড়ে ফেলা হতো। তাকে পাবলিক স্কোয়ারে বাতাসশূন্য একটি লোহার খাঁচায় বন্দি করা হতো। রাখা হতো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। কোমরে একটি লোহার বেড়ির মাধ্যমে তাকে সেই খাঁচার ইস্পাত পাতের সাথে শক্ত ভাবে আটকে রাখা হতো। দিনের শেষে খেতে দেওয়া হতো শুধুই রুটি আর পানি। ‘এভাবে ভিন্ন ভিন্ন মৌসুমের আবহাওয়ার যাবতীয় কষ্ট যেন অপরাধী ভোগ করতে পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হতো। শীতের দিনে তার মাথা ঢেকে যাবে তুষারে। আবার গরমে সে ঝলসে যাবে সূর্যের তাপে। এমন কঠিন নির্যাতনের মাধ্যমেই কেবল মানুষ বুঝবে যে রাজহত্যার অপরাধে দণ্ডিত খলনায়কের কী কঠোর শাস্তিই না হওয়া উচিত। স্বর্গীয় যে বিধান লঙ্ঘন করে সে রাজহত্যা করেছে, তার অপরাধে সে আর কখনো স্বর্গে যেতে পারবে না। রাজহত্যা এমন এক অপরাধ যে এর মাধ্যমে শুধু স্বর্গ নয়, অপরাধী কলঙ্কিত করে পৃথিবীর পবিত্রতাকেও। কাজেই, পৃথিবীতেও সে খুব বেশিদিন বেঁচে থাকতে পারে না। তাই তার শাস্তি যেন যন্ত্রণাময় জীবন শুধু নয়, যন্ত্রণাময় মৃত্যুরও দ্যোতক হয়ে ওঠে।’ (ভার্মেইল, ১৪৮-৯)। অপরাধীকে শাস্তি প্রদানকারী শহরের মাথায় ঝুলবে মাকড়সার মত দেখতে এই লোহার খাঁচা যেখানে অপরাধী নয়া আইনের অধীনে পিতৃহত্যাতুল্য অপরাধ অর্থাৎ রাজহত্যার জন্য ফাঁসিতে লটকাবে।

দেখতে দেখতে ছবির মতো অজস্র শাস্তিতে ভরপুর এক নয়া গুদামঘরই যেন গড়ে উঠল এসময়। ‘একই ধরনের শাস্তি বারবার দিও না,’ মেবলি বলেন। মেবলির সময় নাগাদ অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সামান্য হেরফেরের সমধর্মী শাস্তি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরো যথাযথভাবে বলতে গেলে: এসময়কার আইনবিদরা অপরাধীকে জেলখানায় বন্দি করাকে খুব বড় শাস্তি হিসেবে মনে করতেন না। অপরাধীকে যথার্থ শিক্ষাদানের জন্য জেলখানায় নির্বাসনকে আইনবিদরা কখনোই সুনির্দিষ্ট এবং প্রত্যক্ষ শাস্তির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করেন নি। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৯)

অদিতি ফাল্গুনী | ১২ মে ২০০৮ ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

china.jpg
চীনে ১৯০০ সালে কয়েদীকে কোমল শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।

—————————————————————–
শাস্তির কোমল পন্থা
—————————————————————–

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

২য় অধ্যায়: শাস্তির কোমল পন্থা (The gentle way in punishment)
(পৃষ্ঠা ১০৪-১১৩)

(গত সংখ্যার পর)

দণ্ডপ্রদানের শিল্প, সেক্ষেত্রে, প্রতিনিধিত্বের সমগ্র কৃৎকৌশলের উপর নির্ভর করতে বাধ্য। এই কাজটি শুধুমাত্র তখনি সফল হতে পারে যদি এটি একটি সাধারণ কৃৎকৗশলের অংশবিশেষ মাত্র গঠন করে। ‘শরীরের অভিকর্ষবেগের মতো, একটি গুপ্ত শক্তি আমাদের কল্যাণের পথে সবেগে চালিত করে। এই আবেগ বাধাপ্রাপ্ত হয় শুধুমাত্র বিরুদ্ধ আইনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা দ্বারা। মানুষের সব ধরনের বিচিত্র কাজকর্মই এই অন্তর্গত প্রবণতার প্রভাব।’ একটি অপরাধের যথোপযুক্ত শাস্তি হলো অপরাধীর জন্য এমন কোনো যন্ত্রণা তৈরি করা যার ভয়ে অপরাধটি করার জন্য আর কোনো আকর্ষণ অপরাধী খুঁজে পাবে না। এ যেন বিভিন্ন সঙ্ঘাতমুখী শক্তিগুলোর এক শিল্প। অনুষঙ্গ দ্বারা যুক্ত চিত্ররূপসমূহের শিল্প, সময়কে অস্বীকার করা স্থির সংযোগগুলোর চাপপ্রয়োগ। এ যেন বিরুদ্ধ মূল্যবোধগুলোর যুগ্মতার প্রতিনিধিত্বকে প্রতিষ্ঠা করা। বিরুদ্ধ শক্তিগুলোর ভেতর পরিমাণগত পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিবন্ধকতা-চিহ্নের জটিলতা প্রতিষ্ঠা করা যা শক্তির আন্দোলনকে ক্ষমতা সম্পর্কের অধীনস্থ করে। ‘নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডের ধারণাকে দুর্বল মানুষের হৃদয়ে সদা উপস্থিত থাকতে দাও। যেন এই নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডের ভয় তাকে অপরাধ করা হতে বিরত রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে’ (বেক্কারিয়া ১১৯)। এই প্রতিবন্ধকতা-চিহ্নগুলো নিঃসন্দেহে গড়ে তুলবে শাস্তির নয়া অস্ত্রাগার। ঠিক যেমন পুরনো মৃত্যুদণ্ডগুলো একধরনের প্রতিশোধমূলক চিহ্নের ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছিল। (সম্পূর্ণ…)

মগের মুল্লুকে ফিরিঙ্গির বেসাতি

বাঙলায় হার্মাদি-মগাই জলদস্যুর ইতিকথা

নূরুল আলম আতিক | ১৪ এপ্রিল ২০০৮ ১০:১২ অপরাহ্ন

একটি অডিও-ভিস্যুয়াল প্রোজেক্শন

boat-kantaje-mandir1.jpg
দিনাজপুরের কান্তজী মন্দিরের পোড়ামাটির ফলকে পর্তুগীজ যুদ্ধজাহাজ

কৈফিয়ত
বিজ্ঞ পাঠক, প্রথমেই কবুল মানি, আমি ইতিহাসের ভাষ্যকার নই। নই কোনো লিপিকর, সাহিত্যিক। তবু কেন এই অডিও-ভিস্যুয়াল প্রজেক্শন, কেন এই প্রস্তাবনা?

মনে বড় সাধ সিনেমা করবো। সি-নে-মা। মা-আ; মামা সিনেমা করতে টাকা লাগে, কইলজার দম লাগে, আরো লাগে– কী নিয়া সিনেমা করবা তার সাথে নিজের এ্যাটাচমেন্ট, সর্বোপরি এই মানবজন্ম নিয়া নিজের একটা উপলব্ধি। কী কইতে চাও তুমি সিনামায়? যা মুখে বলতে পারো না, লেইখা ব্যক্ত করা যায় না? বাড়তি কী আছে তোমার ওই পর্দায়? বেপর্দা হইয়া বলি, এর কোনোটাই ঠিক ম্যানেজ করতে না পেরে আমি দিশাহারা। প্রায় বছর দেড়েক খাঁড়ার উপরে বেকার। আকার দেবার মতো কোনো কাজ নাই হাতে, তাই শুরু করি ইতিহাসের খৈ ভাজা। বলছি ২০০৩-২০০৪ সালের কথা।

ভাঁজটি খুলে দিলো আহমদ ছফার দু’টি বই–প্রথমটা সেই নব্বইতে পড়েছিলাম, বাঙালি মুসলমানের মন আর দ্বিতীয়টা সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস। ইতোমধ্যে নীহাররঞ্জন রায়ের আদিপর্বের বাঙালির ইতিহাস উল্টেপাল্টে দেখেছি, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কিশোর সংস্করণ ত খুবই সুখপাঠ্য লেগেছিলো কৈশোরে। আহমদ ছফা’র আবেগায়িত উচ্চারণ, আব্দুল করিমের খোঁজখবর এবং বিক্রমপুরের ঐতিহাসিক জয়নাল আবেদিনকে জানবার পর অনেক ঝামেলায় পড়ে যাই। আগুপিছু নানান কথা মনে আসে–ইতিহাস মূলত বিজয়ীর ইতিহাস। হ্যাঁ পাঠক, পুরান কথা। ইতিহাস নির্মাণের বিষয়। অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার মাধ্যমে ইতিহাস পাল্টে ফেলবারও বিষয়। আজকের দিনে ইতিহাস নাকি মানুষের ইতিহাস, কিন্তু এই অধমের মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়–ইতিহাস কি ঐতিহাসিকের নিজস্ব ব্যক্তিগত জ্ঞানগম্মির ইতিহাস নয়? তার মনোলোকের ইতিহাস নয়? খুঁজেপেতে পাওয়া বইপত্রগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে মনে হলো ইতিহাস পুনঃনির্মাণেরও। ৭১-এর কাছাকাছি সময়ে জন্ম নিয়ে, এ যাবতকাল বেড়ে উঠে কিংবা বেড়ে না উঠে, বর্তমানের ব্যাড়াছ্যাড়া অবস্থাটির সাথে একটি মোক্ষম শব্দবন্ধ যোগ হলো–‘মগের মুল্লুক’। আহা কী কথা–মগের মুল্লুক! অনুপ্রাসের কী যে মহিমা। আহা, কী বাঙ্ময় এই আমাদের বাংলা ভাষা!

‘এইটা কি মগের মুল্লুক নাকি?’ যার যা খুশি, যেনতেনভাবে করবে আর ক’রে খাবে? আর হায়, আমার কোনো কাজকম্ম থাকবে না! বেকার, আমি বেকার থাকি। হ্যাঁ, পাঠক, দেশে ভালো সিনেমার আন্দোলনকর্ম আর নিজের ব্যর্থ কর্মপ্রচেষ্টা নিয়ে দেড়যুগের যোগাযোগের সারবস্তুটি হল–‘এই মগের মুল্লুকে আমাকে দিয়ে কিছু হবার না।’ অনেক লম্বা লম্বা কথা কইছি, মাফ চাই। এদিকে যে আমি এতোকাল বসে বসে আবহমান বাঙালী কৃষকের (কালচার করা লোকেদের কথা, আর ওই নীহারবাবুর ইতিহাসের মারপ্যাঁচ এবং যূথবদ্ধ সমাজের স্বপ্নবাজদের কথামৃত) ঘামে ভেঁজা চাল খেয়ে এতকাল পার করলাম। তার দায় শোধ করতে হবে না? কাজকাম ত কিছুই নাই তাই বউয়ের কান্ধে বইসা বান্দা(দাস)দের শুলুকসন্ধান শুরু করি। মগবস্তুটি দেখে ছাড়বো–এই পণ ক’রে বছর দেড়েক বইপত্র খোঁজাখুজি করতে শুরু করি। কিন্তু হায়! এই জাতি তার কোনো কিছুই সংরক্ষণ করতে শিখে নাই, তদুপরি মগের সাথে জুড়েছে হার্মাদ। কৈশোরে পড়েছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জলদস্যু। পট্টগীজ হার্মাদ ‘সেবাস্টিয়াস গঞ্জালেস টিবাও’ আমার কৈশোরের হিরো। নসরত শাহ্ লিখেছিলেন ধানশালিকের দেশে একই রকমের একটি গল্প, পর্তুগীজ জলদস্যুদের নিয়ে।

prachin-arakaner-rajdhani-m.jpg
প্রাচীন আরাকানের রাজধানী ম্রোহং

বাঙলায় মগ আর পর্তুগীজ দস্যুদের কাণ্ডকারখানাই এই গ্রন্থনার মৌল বিষয়। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৮)

অদিতি ফাল্গুনী | ২১ মার্চ ২০০৮ ১:৫১ অপরাহ্ন

—————————————————————–
সাধারণীকৃত শাস্তি
—————————————————————–
কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

১ম অধ্যায়: সাধারণীকৃত শাস্তি

(গত সংখ্যার পর)

অপরাধের পুনরাবৃত্তি এড়াতে যথার্থ ভাবে শাস্তি প্রদান করতে হবে। উদাহরণের কৃৎকৌশলে এভাবেই পালাবদল আসে। যে শাস্তি অপরাধীর জন্য প্রকাশ্যে নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুমোদন করে, সেখানে শাস্তির দৃষ্টান্তই যেন অপরাধের যোগ্য জবাব। শাস্তির এই দৃষ্টান্তমূলকতার ছিল এক foucaultbuffalo1971.jpg……
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)
…….
ধরনের যমজ প্রকাশভঙ্গি। একইসাথে তা যেন অপরাধ এবং অপরাধের দণ্ডদাতা সার্বভৌম সম্রাটকে তার নিষ্ঠুর চেহারাটি দেখাচ্ছে। যদিও দণ্ডদাতা সম্রাট নিজেই শাস্তিপ্রদান ক্ষমতার মালিক। যেহেতু অপরাধের শাস্তি এক ধরনের হিসাব করে দেওয়া হয় যে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ও প্রকরণের শাস্তিতে একটি নির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া যেতে পারে, শাস্তির দৃষ্টান্ত অবশ্যই উল্লেখ করবে যে ঠিক কোন ধরনের অপরাধের প্রেক্ষিতে এমন শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবে শাস্তি প্রদান ক্ষমতার ব্যবহার হতে হবে সম্ভাব্য সবচেয়ে গোপনীয় পন্থায় এবং সবচেয়ে বেশি পরিমিতি বোধের সাথে। আদর্শগত ভাবেও, শাস্তির দৃষ্টান্তমূলকতার উচিত অপরাধ এবং অপরাধের দণ্ডদাতা সম্রাট, এই উভয়েরই পুনরাবির্ভাবকে ঠেকানো। শাস্তির উদাহরণ কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয় যা নিজেকে প্রকাশ করে। বরং উদাহরণ প্রতিবন্ধকতার চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। দণ্ডমূলক চিহ্নগুলোর এই কৃৎকৌশলের মাধ্যমে দণ্ডমূলক কাজের সাময়িক ক্ষেত্রটি পুরোপুরি উল্টে যাবার একটি প্রবণতা দেখা দেয়। আইনী সংস্কারকরা ভেবেছিলেন যে তারা শাস্তিপ্রদান ক্ষমতাকে একটি মিতব্যয়ী এবং দক্ষ যন্ত্রোপকরণ প্রদান করেছেন যা সমগ্র সমাজদেহের মাধ্যমে সাধারণ্যে প্রবাহিত হবে। এই যন্ত্রোপকরণ সমাজদেহের যাবতীয় আচরণকে বিধিবদ্ধ করতে সক্ষম হবে। এবং এই বিধিবদ্ধকরণের ফলাফল হিসেবেই বেআইনী কার্যক্রমের এলোমেলো পরিসরকে হ্রাস করতে সক্ষম হবে। যে প্রতীকী-কৌশলের (semio technique) সাহায্যে দণ্ডপ্রদান ক্ষমতাকে বলবান করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেই প্রতীকী কৌশল মোটামুটি পাঁচ/ছ’টি প্রধান নিয়মের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত:

ন্যূনতম পরিমানের নিয়ম : এই মতানুযায়ী, একটি অপরাধ মূলতঃ সঙ্ঘটিত হয়ে থাকে কিছু সুযোগ-সুবিধার জন্য। অপরাধ সঙ্ঘটনের চিন্তা করার সময় কারো মনে যদি অপরাধের ফলে পাওয়া যেতে পারে এমন কিছু সুযোগ সুবিধার চেয়ে অসুবিধার চিন্তাটি বড় হয়ে দাঁড়াতো, তাহলে কিন্তু অপরাধটি কখনোই সঙ্ঘটিত হতো না। ‘শাস্তিকে সেই মাত্রার হতে হবে, যাতে করে শাস্তির ফলে অপরাধী যে কষ্ট পাবে, সেই কষ্টের মাত্রা অপরাধ করার পর সে যে আরাম বা সুবিধা পেয়েছে, তার থেকে বেশি হয়।’ (বেক্কারিয়া, ৮৯)। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৭)

অদিতি ফাল্গুনী | ৪ মার্চ ২০০৮ ৫:২৮ অপরাহ্ন

paiকিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

১ম অধ্যায়: সাধারণীকৃত শাস্তি

(গত সংখ্যার পর)
a-gathering1.jpg
Jean-Honoré Fragonard-এর ‘A Gathering at Woods’ Edge’ (১৭৬০-৮০)

zz-1700-02.jpg
চিত্রকলায় আঠারো শতকের ফরাসি ক্যাথলিক নারীরা খেতের মধ্যে পড়ে থাকা শস্য কুড়াচ্ছে

সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রতিটি অংশই এই প্রয়োজনীয় বেআইনী কার্যক্রমের কিছু নির্দিষ্ট প্রকরণ নিজের ভেতরে ধারণ করতো। ফলে, বেআইনী কার্যক্রম একধরনের স্ববিরোধিতার আবর্তে পড়ে যায়। নিম্নস্তরের বেআইনী কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবেই শণাক্ত করা হতো। অর্থাৎ, অপরাধ থেকে তাকে নৈতিক ভাবে না হোক, বিচারগত ভাবে পৃথক করাটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াত। আর্থিক অনিয়ম হতে শুল্ক সংক্রান্ত অনিয়ম, চোরাচালান, লুণ্ঠন, সরকারের শুল্ক প্রতিনিধিদের সাথে সশস্ত্র লড়াই হতে শুরু করে পরবর্তী সময়ে খোদ সৈন্যদের সাথে লড়াই ও শেষমেশ বিদ্রোহ…এসব কিছুতেই ছিল একটি ধারাবাহিকতা। আর, এভাবেই অপরাধ ও বেআইনী কার্যক্রমের মাঝে সীমারেখা টানা কঠিন হয়ে পড়ে। ধরা যাক ভবঘুরেপনার কথা। অধ্যাদেশ অনুযায়ী ভবঘুরেপনার জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারিত থাকলেও এই অধ্যাদেশ কখনোই বাস্তবায়িত হতো না। এই ভবঘুরেপনার সাথেই লুণ্ঠন, শোচনীয় চুরি এবং এমনকি খুন করার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়াটা বেকারদের জন্য ছিল এক ধরনের কর্মসংস্থান। যেসব কর্মী তাদের মালিককে কিছুটা অমীমাংসিত অবস্থায় রেখেই কাজ ছেড়েছে বা যে গৃহভৃত্যদের মালিকের কাছ হতে পালানোর কিছু যৌক্তিক কারণ ছিল, মন্দ ব্যবহার পাওয়া শিক্ষানবিশী কর্মী, পলাতক সৈন্য বা জোর করে সশস্ত্র বাহিনীতে ভর্তি করার কাজে নিয়োজিত দলগুলোর হাত এড়াতে চাওয়া ব্যক্তিদের সবার জন্যই ভবঘুরেপনা ছিল এক ধরনের কর্ম সংস্থান। সুতরাং, অপরাধ এক ব্যাপকতর অর্থে বেআইনী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গণ্য হতো। আর, সাধারণ মানুষ কিšত্ত লঘু স্তরের বেআইনী কার্যক্রমকে তাদের বেঁচে থাকার শর্ত হিসেবে দেখতো। অন্যদিকে গুরুতর বেআইনী কার্যক্রমকে দেখা হতো অপরাধ বিস্তারের পেছনে এক চিরস্থায়ী কারণ হিসেবে। এভাবেই জনতার ভেতর বেআইনী কার্যক্রম বিষয়ে ছিল দ্ব্যর্থকতা বোধ। অপরাধী–ধরা যাক যে একজন চোরাচালানকারী বা একজন চাষী যে তার প্রভুর খাজনা আদায়ের হাত হতে পালিয়েছে, তার প্রতি জনতার সহানুভূতির জোয়ার বয়ে যেত। তার সন্ত্রাসী কাজকে দেখা হতো অভিজাত শ্রেণীর সাথে নিম্নবর্গের পুরণো লড়াই হতে সরাসরি উদ্ভুত কার্যক্রম হিসেবে। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com