প্রত্নতত্ত্ব

প্রাচীনতম সভ্যতা, চিরন্তন সম্প্রীতি এবং (প্রত্ন)সম্পদের জন্য ব্যাকুল কামনা!

স্বাধীন সেন | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ৫:৪৬ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্বের দাপুটে ধারণা ও অনুশীলনের জমিতে একটি অনুসন্ধানমূলক খনন

4.jpg
প্রত্ন-ঢিবি ও মন্দিরকে কেন্দ্র করে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা

প্রথম শ্রমিক : এই দালানের ভিতগুলান তো সীতার কোটের মতন বড়।

দ্বিতীয় শ্রমিক : আরে, সীতারকোটে তো সীতার বনবাস হইছিল। ওইহানে তো একটা হীরার বাইস পাওয়া গেছিল। পরে সরকারে নিয়া নেছে।

তৃতীয় শ্রমিক : তোরা তো জানস না যে সীতারকোট পুরাডা এক রাইতের মধ্যে বানাইন্যা হইছিল।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রমিক : হ, সবই আল্লাহর কুদরত।

[দিনাজপুরে নবাবগঞ্জের দোমাইলে এটি বৌদ্ধবিহার উন্মোচনকালীন সময়ে পাশ্ববর্তী ইটভাটার কয়েকজন শ্রমিকের মধ্যে সংঘটিত সংলাপ। সীতারকোট হচ্ছে একই থানায় অবস্থিত সীতাকোট বৌদ্ধ বিহার।]
—-

টকশোর সঞ্চালক : আচ্ছা, আপনাদের কী মনে হয়। বাংলাদেশের প্রত্নম্পদগুলো যে নষ্ট বা পাচার হয়ে যাচ্ছে তার কারণগুলো কী?
প্রথম বিশেষজ্ঞ : অনেকগুলো কারণই আছে। সরকারের উদাসীনতা, সঠিক ও যথাযথ আইনের অভাব, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত না নেয়া, ইত্যাদি।

দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞ : আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষ তাদের গৌরবময় ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন নন। আসলে, অতীতের সমৃদ্ধি, গৌরব আর স্বর্ণযুগ নিয়ে আমাদের নিরক্ষর ও অজ্ঞ সাধারণ মানুষের কোনো ভাবনা নাই।

তৃতীয় বিশেষজ্ঞ : দেখেন, আমরা এই দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, মুসলমান–সব ধর্মের প্রত্ননিদর্শন পাচ্ছি। এটা তো প্রমাণ করে যে আমাদের দেশে সব ধর্মের মানুষ সুদুর অতীত থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করছে। এই অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য সম্পর্কে মানুষ সচেতন নয়।

টকশোর সঞ্চালক : ঠিক বলেছেন, আগে ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে সবাইকে। যে-জাতি নিজের ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন নয় সেই জাতি সত্যিকার অর্থে জাতি হিসাবে বিবেচিত হতে পারে না। আসুন, আমরা সবাই আমাদের সমৃদ্ধ অতীত ও গৌরবময় ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি।

[উপরের সংলাপটি আংশিক কাল্পনিক হলেও বক্তব্যগুলো টিভি চ্যানেলগুলোর সাম্প্রতিক টকশোগুলোর কয়েকটি থেকে নেয়া হয়েছে]

●●●

বন্ধনীযুক্ত কোনো টিকা যদি নাও থাকত তারপরেও উপরে উল্লিখিত দুটি সংলাপ পাঠ করলে বেশিরভাগ মানুষই ধরে নেবেন যে প্রথম সংলাপটি ‘অজ্ঞ’, ‘অসচেতন’, ‘নিরক্ষর’ মানুষজনার আলাপচারিতা আর দ্বিতীয় সংলাপটি ‘শিক্ষিত’, ‘সচেতন’ ও বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী কয়েকজন মানুষের কথোপকথন। ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে উচ্চবর্গের এলিট নাগরিকদিগের মধ্যে যে-ধারণাগুলো প্রতিষ্ঠিত ও ধরে-নেয়া, সেগুলোর নিরিখে বিচার করলে সংলাপ দুটোর মধ্যে প্রত্যক্ষ ভাবে প্রকাশিত ও পরোক্ষভাবে দ্যোতিত বিভিন্ন ডিসকোর্স ক্রিয়াশীল হিসাবে শনাক্ত করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম দৃশ্যের সংলাপকারীগণ লোককাহিনী ও কিংবদন্তীর মাধ্যমে দুটি বৌদ্ধবিহারের নির্মাণ প্রক্রিয়াকে বয়ান করেছেন। তারা, অধিকন্তু, পরবর্তী ঘটনাবলীকেও (হীরার বাইস পাওয়ার ঘটনা) ওই লোককাহিনীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছেন এবং সর্বোপরি, অপার্থিব শক্তির কুদরত হিসাবে বৌদ্ধবিহার দুটোর সৃষ্টি-রহস্য ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। আধুনিক, সেক্যুলার ও যুক্তিবাদী আখ্যান অনুসারে বয়ান নির্মাণের এই পদ্ধতি মিথিকাল, এই বয়ান মিথ/অতিকথন। আধুনিকীকরণ প্রকল্প ও তার সঙ্গে বিজড়িত সেক্যুলারকরণের ক্ষমতার পরিসরে ‘মিথের’ (এবং বিপরীত অর্থবোধক হিসাবে সংজ্ঞায়িত সত্য/ফ্যাক্ট নির্ভর ইতিহাসের) ধারণায়নে যে বদল ঘটেছে তার প্রেক্ষিতে রূপান্তরিত ও পুনর্গঠিত এই মিথ তার নতুন সংজ্ঞায়ন মাফিক এখন নিদেনপক্ষে প্রতীকগত ও অন্তর্নিহিত কোড বিশ্লেষণের বিষয় হতে পারে; কিন্তু কখনো সত্য/ফ্যাক্ট হিসাবে পরিগণিত হতে পারে না। ফ্যাক্টের সঙ্গে তুলনায় এগুলো হলো কল্পকাহিনী/ফিকশন। অন্যদিকে, দ্বিতীয় দৃশ্য যেটি কিনা প্রচারিত ও রেপ্রিজেন্টেড হচ্ছে প্রচারমাধ্যমে, প্রশ্নাতীত ও স্বতঃসিদ্ধভাবেই সত্য ও বাস্তব হিসাবে বিবেচিত হবে। কেননা আলাপচারীতার বিষয় ও বক্তব্য এবং তার মধ্যে প্রচ্ছন্ন ধারণাগুলো সর্বজনস্বীকৃত, যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত হিসাবে চিহ্নিত ও সংজ্ঞায়িত হয়। বেশিরভাগ দর্শক-শ্রোতারই মনে হবে যে, আসলেই তো, বক্তারা ঠিক কথাই বলছেন। (সম্পূর্ণ…)

যে কারণে প্রত্নসম্পদ বিদেশ পাঠানোয় বিরোধিতা

শামসুজ্জামান খান | ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ১২:৩৭ অপরাহ্ন

11-2.jpgবাংলাদেশের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফ্রান্সের গিমে জাদুঘরে (Musée Guimet) প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর এবং সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনস্থ বগুড়ার মহাস্থানগড় সাইট মিউজিয়াম (Site Museum), পাহাড়পুর প্রত্নস্থান সাইট মিউজিয়াম, এবং কুমিল্লার ময়নামতি সাইট মিউজিয়াম থেকে ১৮৭টি মতান্তরে ১৮৯টি মতান্তরে ২১১টি পুরাকীর্তি পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ৩১ জুলাই ২০০৭-এ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সচিব এবিএম আবদুল হক চৌধুরী এবং গিমে জাদুঘরের পক্ষে ঢাকাস্থ ফরাসী রাষ্ট্রদূত জ্যাক আংগ্রি কস্টিলেস (Jacqes Angre Costilhes) চুক্তি স্বাক্ষর করেন। উভয় পক্ষে স্বাক্ষী হিসাবে স্বাক্ষর করেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিচালক ড. শফিকুল আলম ও গিমে জাদুঘরের কিউরেটর ভিনসেন্ট লেভর।
great_departure.jpg
সিদ্ধার্থ গৌতম-এর গৃহত্যাগের রিলিফ (১১ x ৩৭ সেমি.)। পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকার নিমোগ্রাম থেকে পাওয়া কুশান যুগের এই শিল্পকর্ম সহ ১০০টি প্রত্নসামগ্রী আলফ্রেড ফুশার (Alfred Foucher, ১৮৬৫-১৯৫২) ফ্রান্সে নিয়ে গিয়েছিলেন। গিমে কালেকশন নং. এম ৩৩৯৭।
……..
এই চুক্তি অনুযায়ী অনেকটা চুপিসারে প্রত্নসম্পদগুলো ফ্রান্সে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে প্রত্নতত্ত্ববিদ, জাদুঘর বিশেষজ্ঞ, চিত্র-ভাস্কর্য-স্থাপত্য শিল্পী এবং কলারসিকদের মধ্যে ক্ষোভ বিক্ষোভ প্রতিবাদ ও সমালোচনা দেখা দেয়। এমনকি রাজশাহী ও ঢাকায় কয়েকটি মামলা দায়ের করে প্রত্নসম্পদগুলো না পাঠানোর সিদ্ধান্ত চেয়ে আবেদন করা হয় এবং হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দেন। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com