বইয়ের আলোচনা

রবীন্দ্রনাথের কাছে ঈশ্বরের অর্থ অপরিহার্য রূপে ভালোবাসা

প্রদীপ কর | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৫:২৬ অপরাহ্ন

Kabirরবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি কবিতায় কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত, লিখেছিলেন; ‘তোমার পায়ের পাতা, সবখানে পাতা; কোনখানে রাখবো প্রনাম?’ বর্তমান সময়ে বাঙালির এরকম হতশ্রী দশা কেন? আসলে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ বাঙালি তথা সমগ্র মানবজাতিকে যেরকম নিবিড়ভাবে অনুভব করেছিলেন এবং তার সৃষ্টি-ঐশ্বর্যে মানবতাবাদকে যেরকম সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন, সেই দর্শন, মানবপ্রকৃতির প্রতি সেই আদর্শগত অনুধ্যান এখন অত্যধিক পরিমানে ক্ষয়প্রাপ্ত! ফলতঃ আমরা না বুঝেছি নিজেকে না নিজেদের সমাজকে; এই অজ্ঞতাবশতই আমরা চিনতে পারিনি বর্হিবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ! যে কারণে, নৈতিকতা বহির্ভূত আত্মকেন্দ্রিক ভোগবাদ-সর্বস্ব জগৎ আমাদের বিচ্ছিন্ন করেছে নিজস্ব শেকড় থেকে। আত্মবিস্মৃত হয়ে মিশে যাচ্ছি ঘনতমসায়। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র উপায় বাঙালি মানস বাঙালি মনীষাকে সঠিকভাবে চিনতে শেখা। রবীন্দ্রনাথ তেমনই এক উদ্ভাসিত আলোক, যার ভাস্বরতায় অবগাহন করলে অবশ্যই উজ্জ্বল হওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বাংলাসহ পৃথিবীর নানান ভাষায় নিয়মিতভাবেই ‘কাজ’ হয়ে চলেছে। সেই কাজের অধিকাংশই যদিও হিমঘরের শীতলতায় নিমজ্জিত। তাই অস্তিত্ব বিপন্ন হলে আশ্রয় নিতে হয় তেমন এক দুর্লভ সান্নিধ্যের যেখানে আমরা নিশ্চিন্ত রক্ষা পাই। তেমনই এক তরুছায়া হুমায়ুন কবির প্রণিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রন্থটি।
যদিও বিশিষ্ট প্রজ্ঞার অধিকারী হুমায়ুন কবির, গ্রন্থটি বাংলায় রচনা করেননি। ১৯৬১তে, রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে, যুক্তরাজ্যে স্কুল অব্ ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ যে বক্তৃতামালার আয়োজন করেছিল, তার উদ্বোধনী ভাষণ দিয়েছিলেন হুমায়ুন কবির। এই বইটি সেই ভাষণেরই সংকলন। ১৯৬২তে School of Oriental And African Studies, University of London থেকে প্রকাশিত হয় Rabindranath Tagore শিরোনামের এই দুষ্প্রাপ্য ইংরেজি গ্রন্থটি। বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক, গবেষক হায়াৎ মামুদ বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেছেন। শুধু অনুবাদ বললে প্রায় কিছুই তেমন বলা হয় না। অসাধারণ এই পুস্তকের প্রাঞ্জল অনুবাদের সঙ্গে সূত্র নির্দেশের মাধ্যমে, দুরূহ টীকা সংযোজনসহ গ্রন্থকার হুমায়ুন কবিরের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি এবং একটি প্রয়োজনীয় ভূমিকার মাধ্যমে গ্রন্থটিকে আরও বেশি মহার্ঘ করে তুলেছেন। এই পরিশ্রমসাধ্য কাজটি তিনি করেছেন কেননা, তার মনে হয়েছে: ‘বর্তমান বাঙালির মননশৈথিল্যের যুগে এই লেখা রবীন্দ্রনাথের অবদান বুঝতে সাহায্য করবে বাঙালিকেও’ তার এই ‘মননশৈথিল্যের যুগে’ শব্দবন্ধটির মুখোমুখি হলে বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়ি। (সম্পূর্ণ…)

মোহাম্মদ রফিকের ‘মানব পদাবলি’ জীবনবিলাসী হাওয়ার অবিনশ্বর গান

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৩:১৭ অপরাহ্ন

আজ কোনো কথা নয়
তোমাকে জড়িয়ে শুয়ে থাকি
চুপচাপ
মুখে-মুখ, ঠোঁটে-ঠোঁট, চুলে-নাক,
উথাল-পাথাল বুকে-বুক
নীরব, নিস্তল
আজ রাতে
তুমি দু-শো মাইল দূরে
হয়তো-বা কালের ওপারে
আপন শয্যায়
তাতে কী-বা এসে যায়
এই তো এই তো তুমি
নিশ্বাসে নিশ্বাস টের পাই
বেঁচে আছো, বেঁচে আছি!

(মানব পদাবলি ৪)

comboকেন সংশয়ের মতো এক বিস্ময়চিহ্ন রেখে শেষ এই কবিতা? কোন সময়ের কবিতা এটি? এই কবিতার মতোই কিন্তু এই কবিতাটিই নয় এমন বেঁচে থাকা জীবন ঘনিষ্ঠ ৮৩টি টুকরো পদকবিতা মিলে এই কবিতার বই, মানব পদাবলি। প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের বাতিঘর।
পড়ে আমি চমকে উঠেছি, শিহর লেগেছে ভেতরে আমার। এতো সহজ সুন্দর করে কিভাবে লিখলেন ৭৪ বছর বয়সের প্রায় ৪ দশকেরও বেশি সময় কাব্যভাষায়আড়ষ্টতার বদনাম বয়ে চলা ২৩ বছর বয়সের কবি মোহাম্মদ রফিক!আমাদের কবিতাটিমের ফ্রন্টলাইনের এক মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রফিক এবার ছক্কা মেরেছেন, জিতিয়েছেন বাংলা কবিতাকে। এই বইয়ে এক নতুন মোহাম্মদ রফিককে আবিস্কার করবে তার প্রস্তুত পাঠক।

হালের ফলার কষ্ট, দীর্ঘ সভ্যতার প্রান্ত ছুঁয়ে ধাপে ধাপে মোহাম্মদ রফিক গড়ে তুলেছেন এই কাব্যের শরীর, এর নড়নে আছে বেহাগে ঘুঙুরের লয় তাল, আছে ঝিঁঝির ক্রেংকার, ব্যাং-ব্যাঙাচির তীব্র নাদ। কবির প্রতিটি কবিতায় ধরা পড়েছে এদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা-বিদ্রোহ, ভালোবাসা-ঘৃণা, সর্বোপরি মানবজীবনের একান্ত অনুভূতিসমূহের প্রকাশ। আছে শুদ্ধ শুভ্র চিরায়ত প্রেম, নেই কোন যৌনগন্ধী শব্দমালা। (সম্পূর্ণ…)

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: ট্রাম্পের জামানায় অরওয়েলের পুনরুত্থান

মুহিত হাসান | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৮:৪৪ অপরাহ্ন

trump_orwell-620x412এই বছরের জানুয়ারি মাসে ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চেয়ারে অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বসতে চলেছিলেন, তখন গোটা দুনিয়ার মানুষই উদগ্রীব হয়ে নানান বিদঘুটে ও ভয়ানক কাণ্ডকারখানা ঘটবার শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। যথারীতি সেই শঙ্কা ভুল প্রমাণিত হয়নি। যেসব উদ্ভট অনুমান বা ভয়ানক গুজব বিতর্কিত ট্রাম্পকে ঘিরে বয়ে চলেছিল, সেসবের অনেকগুলোই তিনি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বাস্তবে পরিণত করেছেন।

তবে একটি অনুমান সম্ভবত কেউই করেননি, তা হলো ট্রাম্পের কারণে চৌষট্টি বছর পূর্বে প্রকাশিত ইংরেজ লেখক জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ বা নাইন্টিন এইট্টি ফোর উপন্যাসটির বিক্রি হঠাৎই হুড়মুড়িয়ে বৃদ্ধি পাবে। অরওয়েলের এই সুবিখ্যাত চিরায়ত ডিসটোপিয়ান উপন্যাসে একটি সর্বগ্রাসী স্বৈরাচারী দেশের আখ্যান বর্ণিত হয়েছিল, যেখানে কিনা সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় ‘বিগ ব্রাদার’-এর দ্বারা আর সর্বত্রই ঝুলছে সাবধানবাণী সম্বলিত পোস্টার ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ’। ফলত বাকস্বাধীনতা সেখানে বিসর্জিত ও আপত্তিকর এক বস্তু হিসেবে গণ্য হয়। উপন্যাসটিতে বর্ণিত ওই পরিস্থিতির সাথে ট্রাম্পের ‘স্বপ্নের’(!) কর্তৃত্বপরায়ণ, বৈষম্যবাদী ও নজরদারিময় মার্কিন মুলুকের যে খুব মিল রয়েছে, সে তো বলাই বাহুল্য। (সম্পূর্ণ…)

মোস্তফা কামালের অগ্নিকন্যা

হারুন রশীদ | ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১:৪৮ অপরাহ্ন

border=0একজন বড় লেখকের অভীষ্ট হচ্ছে দেশ-কাল ভূগোল সংশি­ষ্ট শিল্পরীতি। বিষয় ও আঙ্গিকতো বটেই, সময় ও কালকেও মাথায় রাখতে হয়। কথাশিল্পী মোস্তফা কামাল তাঁর অগ্নিকন্যা উপন্যাসে এই লক্ষ্যকে বিবেচনায় রেখেছেন বলে মনে হয়। উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে তিনি শুধু দেশভাগের মর্মন্তুদ ইতিহাসকে আশ্রয় করেননি বরং বিশাল ক্যানভাসে আন্দোলনমুখর উত্তাল সেই সময়ের ইতিহাসের নায়ক-খলনায়কদের তুলে ধরেছেন নির্মোহ দৃষ্টিকোন থেকে। একটি দেশ বা অঞ্চলের ইতিহাসের শিরদাঁড়ার ওপর দাঁড়িয়েই সেই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য রচিত হয়। দায়িত্বশীল লেখকের জন্য এ এক ঐতিহাসিক দায়ও বটে। অগ্নিকন্যায় সেই দায়ও যেন মেটালেন লেখক।
ভাাষা-রীতি ও কুশলী উপস্থাপনার গুণেও উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে চিত্তাকর্ষক। উপন্যাসটি শুরু হয়েছে নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে–‘মতিয়ার দুই হাতে দুটি পুতুল। সে ঘরের মেঝেতে বসে বসে গভীর মনোযোগে পুতুল দুটিকে সাজায়। পতুলের ছোট্ট চুল বেণী করে। ঠোঁটে পায়ে আলতা লাগায়। মনে মনে বলে বাহ! ভারী সুন্দর হয়েছে তো দেখতে। …হঠাৎ তার কানে শ্লোগানের ধ্বনি ভেসে আসে। একেবারে গগনবিদারি শে­াগান। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ মতিয়া দৌড়ে বারান্দায় যায়। বাইরের দিকে তাকিয়ে সে দেখে, বিশাল একটি মিছিল দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ।…সবার কণ্ঠে এক আওয়াজ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ (সম্পূর্ণ…)

২০১৬-এর ব্যক্তিগত পাঠ-পরিক্রমা

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী | ১ জানুয়ারি ২০১৭ ৭:১১ অপরাহ্ন

প্রতি বছরই বেশ অনেক বই পড়া হলেও, একদম প্রথম পাতা থেকে শেষাবধি পড়া হয় খুব কমই। অনেক বই কেজো বই, শুধুমাত্র কাজের পাতাতেই তাদের পাঠ সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক বই রেফারেন্স বই, শুধু কয়েকটি পাতার জন্যই কেনা হয়। কখন কাজে লাগে কেউ জানে না। এদের মধ্যে কোনো কোনোটি দারুণ স্বাদের। একদম মনপ্রাণ কেড়ে নেয়ার মত। গত বছর ২০১৬তেও এমনই পাঠ-পরিক্রমা থেকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পাঠ-প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা যেতে পারে। যেহেতু আমি মূলত নন-ফিকশন পাঠক, কাজেই প্রবন্ধসাহিত্যেই মনোযোগ দিলাম।

border=0
‘এ বিউটিফুল কোয়েশ্চেন’, ফ্র্যাঙ্ক উইলচেক, ২০১৫।
অনেকদিন বাদে বিজ্ঞানের এতো ঢাউস একটা বই পড়ে শেষ করলাম। লেখক ফ্র্যাঙ্ক উইলচেক, নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। বইটা পড়ে মনে হলো, সত্যিই নোবেল-জয়ীদের ধাতই আলাদা। কনসেপ্ট এতো সুন্দর এবং ততোধিক সুন্দর করে বোঝাতে পারেন, কিম্বা ধরা যাক নতুন একটি প্রপঞ্চকে কিম্বা পুরনো প্রপঞ্চকেই এমনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, যে মাথা ঘুরে যায়। পদার্থবিজ্ঞান, কিছুটা গণিতেরও, এক অনবদ্য ভাষ্য রচিত হয়েছে এই বইটিতে। বইটিতে মূলত একটি প্রশ্ন করা হয়েছে – জগত কি সুন্দর আইডিয়া ধারণ করে কিনা, অথবা এই বিশ্বজগৎ একটি শিল্পকর্ম কিনা? তারপর পিথাগোরাস এবং প্লেটোর ধারণা থেকে সূত্র ধরে বাস্তবতার ব্যাখ্যা, গণিতের অর্থ, প্লেটোনিক সলিডের ওপর বিস্তারিত আলোচনা, প্রকৃতিতে প্লেটোনিক সলিডের প্রাপ্যতা, ব্যবহারিক প্রয়োগ, নিউটনের তিনটি আবিষ্কার – তাঁর অ্যানালিসিস ও সিন্থেসিস, রঙের ধারণার বিস্তার, গতিশীলতার সূত্রধরতা, বিদ্যুত-চুম্বকত্বের বিস্তার ও ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ (ইএম থিওরি), রঙের পারসেপশনে ইএম থিওরির প্রয়োগ, সিমেট্রির আইডিয়া, গাণিতিক তত্ত্বে সিমেট্রির প্রয়োগ এবং উচ্চতর কণাপদার্থবিজ্ঞানে সেই সিমেট্রির প্রভাব, কোয়ার্ক-গ্লুয়ন স্যুপের ব্যাখ্যায় কোয়ান্টাম ক্রোমোডায়নামিকস, কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিস্তার, কণার ওয়েভ-ফাংশনের বিস্তারে সিমেট্রির প্রয়োগ, তার ব্যাখ্যা, বাক্সবন্দী ইলেকট্রন আর টানাতারের কম্পনের অদ্ভুত মিল, এমি নয়থারের অবদান, সুপারসিমেট্রির ধারণা ইত্যাদি নিয়ে এক চরম দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে দিয়েছেন ফ্র্যাঙ্ক।রজার পেনরোজের “দ্য এম্পেররস নিউ মাইন্ড” গ্রন্থটির পর তুলনীয় এনসাইক্লোপিডিক গভীরতায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নিয়ে বিশাল ক্যানভাসে লেখা হয়েছে বিরল। তাই ফিজিক্স এবং ন্যাচারাল সায়েন্সে যারাই আগ্রহী এই বইটি তাদের গভীর তৃষ্ণা মেটাবে। বইটিতে আছে ৫৩টি কালার প্লেট এবং আরও ৪০টি সাদাকালো ছবি, এক সমৃদ্ধ টেকনিকাল গ্লসারি যেটা বইয়ের মূল সরল ভাষ্যের গাণিতিক এবং বৈজ্ঞানিক পূর্ণতা দেয়। (সম্পূর্ণ…)

মিনার মনসুরের ‘নির্বাচিত কবিতা’: বাংলা কবিতা তাকে স্বাগত জানাবে

শামস আরেফিন | ৩০ december ২০১৬ ৯:০১ অপরাহ্ন

border=0কবিতার জগতে তিনযুগের দীর্ঘ ভ্রমণের পর প্রকাশিত হলো কবি মিনার মনসুর এর নির্বাচিত কবিতা বইটি। তার চেয়েও স্বস্তিকর সংবাদটি হলো কবিতার এ দুঃসময়ে প্রকাশের ছয়মাসের মধ্যে বইটির প্রথম মুদ্রণ শেষ হয়ে গেছে। এ পাঠকপ্রিয়তাও এ সময়ের নিভৃতচারী একজন কবির জন্যে কম গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার নয়। প্রত্যেক কবিরই থাকে স্বকীয় কাব্যভাষা। এ কাব্যভাষাই কবিকে অকবি থেকে আলাদা করে। আর তার একটা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় যে-কোনো কবির নির্বাচিত কবিতা বা শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলনে। এখানে এক মলাটে পাঠক বুঝে নিতে পারেন একজন কবি কীভাবে নিজেকে ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে স্বকীয় কাব্যভাষা নির্মাণ করেন। সমাজ সংস্কৃতি, জীবনবোধ, আত্মবিশ্বাস ও কাব্যদর্শন–কাব্যভাষা বিনির্মাণে রাখে প্রধানতম ভূমিকা। তার পর কবিতার শরীর নির্মাণে রূপক, উপমা, অলংকার, চিত্রকল্প, শব্দ ও শব্দ-সংস্থান ইত্যাদির উপর নির্ভর করে দাঁড়ায় কাব্যভাষা। সেই স্বকীয়তা অর্জনের গুণেই যেমন ত্রিশের কবিদের মাঝে জীবনানন্দ দাশ উজ্জ্বলতম হয়ে আছেন, তেমনি স্বকীয়তার তীব্র দ্যুতি না থাকার কারণেই অবশিষ্ট চতুর্থ পাণ্ডব তুলনামূলকভাবে অনেকটা নিষ্প্রভ। মিনার মনসুর-এর কবিতা শুধু বন্ধু রুদ্রনির্ভর রাজপথ শাসন করে না, তাঁর কবিতা আবিদ আজাদের অতি কোমল সুরের মোহনায় বিমূর্ত চেতনার সমুদ্রে আমাদের ভাসিয়ে দেয়। তিনি এই দুই-এর মাঝামাঝি সমান্তরাল রাস্তা। অলংকার ব্যবহারে সার্বজনীন হয়েও, নিজস্ব ভাষা সৃষ্টি করে তিনি গড়ে তুলেছেন স্বকীয় সত্তা। তাই একবাক্যে বলতে হয় মিনার মনসুরের কবিতা না প্রেম না দ্রোহ। বরং প্রেম ও দ্রোহের সমন্বয়ে দেশীয় ঐতিহ্যনির্ভর শুধু মাত্র বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল কবিতা, যার বাস্তব প্রতিবিম্ব পাই নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থে। (সম্পূর্ণ…)

অন্য রকম কবিতা, সাহসী কবিতা

মোহাম্মদ রফিক | ১ december ২০১৬ ১২:০৩ পূর্বাহ্ন

Comboকবি রাজু আলাউদ্দিন দীর্ঘকাল লেখালেখির জগতের সঙ্গে সংযুক্ত। প্রথম থেকেই তিনি অত্যন্ত সচেতন কবিতাকর্মী। সংবেদনশীলও বটে। বলা উচিত, তিনি সংযত ও মেধাবী। তিনি লিখছেনও দীর্ঘ দিন ধরে।

শুনে অবাক হলাম, এটাই তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। পরে ভেবে নিলাম, নিতে বাধ্য হলাম যে, এটাই তো স্বাভাবিক। একজন সচেতন ও সংযত কবির পক্ষে এই তো স্বাভাবিক আচরণ। কাব্যিক আচরণ। প্রকৃত কবি প্রতীক্ষা করতে জানে বা শেখে। প্রতীক্ষার ফসলও সে ঘরে তুলতে সক্ষম হয়। এই কথার প্রমাণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই গ্রন্থের অন্তরবয়ানে।

ইতিমধ্যে কবি ঘুরেছেন পৃথিবীর নানাদেশ, আত্মস্থ করেছেন নানা ভাষা, অন্তরমথিত কথপোকথন এবং বিনিময় ঘটেছে বিভিন্ন ভাষাভাষী কবি ও কবিতার সঙ্গে। অবশেষে কবির প্রত্যাবর্তন ঘটেছে স্বদেশে, স্বভূমিতে, স্বভাষায়, কাব্যিক অর্থেই। তার রচনা জীবন পেয়েছে কাদা-মাটি-জল নদী-নালা, মাঠ-ঘাট ছুঁয়ে। এ হল, এক অর্থে, দেশজ বিশ্বজনীন কবিতা।

সুতরাং, স্বতঃসিদ্ধ যে, কবি রাজু আলাউদ্দিন অন্যদের মত লিখবেন না। লিখতে চাইলেও, সফল হবেন না। একেই বলে কবির নিয়তি। তার কবিতা, আপন নাড়ির টানে, হয়ে উঠেছে একক, স্বতন্ত্র, সাবলীল ও অনবদ্য। তবে তার কবিতা, বাংলা কবিতা, বাংলা ভাষারই কবিতা, একই স্রোতধারার অন্যএকটি খাঁত। ঋদ্ধ ও গতিময়। আমাদের মানুষের সম্পদ। (সম্পূর্ণ…)

অমৃত সমান : সালাহ্উদ্দীন আহমদের জীবনস্মৃতি

সনৎকুমার সাহা | ২৯ নভেম্বর ২০১৬ ৫:৩৭ অপরাহ্ন

border=0আমি ইতিহাস পড়িনি। সরাসরি তাঁর ছাত্র নই। কিন্তু নির্দ্বিধায় যাঁদের গুরু মেনেছি, তিনি তাঁদের একজন। অন্যজন আমার পাঠ্য বিষয়ের শিক্ষক প্রফেসর মুশাররফ হোসেন। কিন্তু প্রফেসর হোসেনের কাছেও তিনি শুধু অগ্রজ বন্ধুই ছিলেন না। ছিলেন অবিমিশ্র শ্রদ্ধার, অন্তহীন আস্থার, দৃঢ়চেতা, সদা প্রশান্ত এক মনীষী। মাঝে মাঝে মজা করে তাঁর ধৈর্যচ্যূতি ঘটাতে মুশাররফ হোসেন নানাভাবে তাঁকে উস্কে দেবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু হার মানতেন বারবার। মনে হয়, তিনিও এমনটিই চাইতেন। পরে বলতেন, এই একজন মানুষ। মানুষই, কিন্তু দেবতারও প্রণম্য। অবশ্য দেবতা বলতে তিনি বুঝতেন, বাস্তবে দ্বান্দ্বিক জটিলতার অসংখ্য টানা-পড়েনের ভেতর বিবেকশুদ্ধ আচরণ যাঁর কখনও বিচলিত হয় না, তাঁকে। এই মানুষটি প্রফেসর সালাহ্উদ্দীন আহমেদ। ঠিক দু বছর আগে ১৯ অক্টোবর, ২০১৪-য় তাঁর জীবনাবসান। বয়স নব্বই অতিক্রান্ত। দীর্ঘ জীবনই বলা যায়। কিন্তু কখনোই তা বাতিলের মিছিয়ে হারিয়ে যায় না। আক্ষেপ এখনও মাথা কোটে।

কথাগুলো নতুন কিছু নয়। তবু আর একবার বলি তাঁর জীবনস্মৃতি ফিরে দেখা পড়ার আবেগে। বইটির প্রকাশনা তাঁর মরণোত্তর। ২০১৫-র মহান একুশে বইমেলায়। শেষের দিনগুলোয় নিজে হাতে লেখেননি। একাকী হয়ে পড়া গার্হস্থ্য জীবনে সার্বক্ষণিক সেবক অমল কৃষ্ণ হাওলাদারের ছেলে আশিস কুমার শ্রুতিলিখন নেয়। কিছুদূর এগোলে শুনে শুনে কম্পিউটারে ধরে রাখতে শুরু করে। পরে স্যর দেখে দেন। এই ভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু শেষ হয় না। ১৮ অক্টোবর রাতে অন্যদিনের মতোই ঘুমোতে যান। ঘুমের ভেতরে অসুস্থ হয়ে পড়া। পরদিন সকালে অমল ও আশিস টের পায়। অতি কষ্টে শুধু বলতে পারেন তিনি একবার, ‘আমি মনে হয় আর নেই।’ তারপরে মহাপ্রস্থান। অসম্পূর্ণ তাঁর পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে নিয়ে ছাপার ব্যবস্থা করেন অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। প্রকাশনার দায়িত্ব নেয় ঢাকার অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স। একটা অদ্ভুত মিল, প্রকাশের আগে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পূর্বাপর দেখে দেন প্রফেসর সালাহ্উদ্দীন আহমেদই। তাঁর স্মৃতিকথাও পুরো হলো না। তবে বঙ্গবন্ধুর বইটিতে তাঁর ব্যক্তিত্ব যেমন তাঁর নিজস্বতা নিয়ে সর্বাত্মক ফুটে ওঠে, এটিতেও স্যারকে চিনে নিতে এতটুকু ভুল হয় না। না-বলা অংশ অনেকটাই আমাদের জানা। কারণ, তিনি তখন লোকমান্য একজন। সবাই তাঁকে চেনে। এখানে তাঁর হয়ে ওঠার অংশটিই আমাদের মুগ্ধ আকর্ষণ পুরোপুরি ধরে রাখে। এতটুকু তাল কাটে না। প্রসন্নতার মাধুর্য্যে আমরা আবিষ্ট হই। প্রাচীন শ্রুতি যেমন পবিত্র, এই শ্রুতিলিখনই আমার কাছে তেমন মনে হয়। পড়ে আমাদের আত্মশুদ্ধি ঘটে। (সম্পূর্ণ…)

জ্যাক লন্ডনের দুষ্প্রাপ্য ছবি

রেশমী নন্দী | ২৪ নভেম্বর ২০১৬ ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন

London আলোকচিত্র: ১৯০৬ সালে জ্যাক লন্ডন সান ফ্রান্সিস্কো উপসাগরের তীরে ছবি তুলছেন।

বিখ্যাত সাহিত্যিক জ্যাক লন্ডনের অনেক লেখায় পাওয়া যায় তাঁর বিচিত্র জীবনের ছায়া। তবে আলোকচিত্রী হিসেবে তাঁর দক্ষতা খুব বেশি মানুষের দেখার সৌভাগ্য হয়নি। লেখালেখির মতো সমান দক্ষতায় জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে তিনি ধারণ করে রেখেছেন তাঁর তোলা অনবদ্য কিছু ছবিতে। তাঁর দুঃসাহসী জীবনাচারণ সেই সাথে সংবাদদাতা হিসেবে তাঁর কাজের পরিধি-সবমিলিয়ে বিশ শতকের গোড়ার দিককার জীবনের অসাধারণ প্রতিচ্ছবি এসব আলোকচিত্র।
The Call of the Wild-এর মতো উপন্যাসের জন্য তিনি বিখ্যাত, যার উপজীব্য তাঁরই দুঃসাহসী অভিযান, পর্বতারোহন কিংবা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি দেবার অভিজ্ঞতা। আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন পৌরুষদীপ্ত লেখকের আর্দশ । তিনি একাধারে ছিলেন একজন সমাজবিজ্ঞানী, ভবঘুরে, নাবিক, যুদ্ধ সংবাদদাতা এবং “ওয়েষ্টার পায়রেট”। তাঁর প্রপৌত্রী টারনেল এ্যাবোটের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্যদের ধরা ঝিনুক চুরি করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করেন নি। উনিশ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে এ ধরনের দস্যুবৃত্তি হতো সমানে। জ্যাক লন্ডনের ছোট গল্প “What Life Means to Me”তেও এর বর্ণনা পাওয়া যায়। পরে অবশ্য এসব ছেড়েছুড়ে দেন তিনি। (সম্পূর্ণ…)

মনির : ক্রম-পরিণতি ও বৈচিত্র্যের সফল শিল্প-ব্যক্তিত্ব

অলাত এহ্সান | ২০ নভেম্বর ২০১৬ ১০:৩৫ অপরাহ্ন

monir-2গভীর সংদেনশীলতার কারণেই সাহিত্যিক-শিল্পীরা সমাজে আশু পরিবর্বতন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আগেই আঁচ করতে পারেন। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে, বিশেষ করে ষাটের দশকের শিল্পী-সাহিত্যিকদের অন্বেষাই এ দেশের স্বাতন্ত্র ও প্রাণশক্তি চেনাতে মূখ্যভূমিকা রেখেছে। শিল্পীদের সেই অন্বেষাকে গভীরতর করার ক্ষেত্রে প্রধান কারিগর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। তার মধ্যদিয়েই দেশভাগোত্তর এদেশের শিল্পকলার সেই ধারা চর্চার সূচনা। পরবর্তীকালে তাদের উত্তরসূরি প্রতিভাবান শিল্পীদের হাতে বৈচিত্র্যে ও বৈভবে সমৃদ্ধ হয়েছে চিত্রকলার ধারা, গড়ে উঠেছে এর গৌরবময় ইতিহাস। মনিরুল ইসলাম এই প্রতিভাবান শিল্পীদের অন্যতম। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান, আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়ার শিষ্য তিনি। জয়নুলোত্তর শিল্পীদের মধ্যে তিনিই বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক পরিচিতদেরও একজন। কাজের নিজস্বতা, ধরন ও সমৃদ্ধিই তাকে এখানে উন্নীত করেছে।
পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধ থেকে শুরু করে ষাটের দশকের প্রথমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেন মনিরুল ইসলাম। ঠিই তখন থেকেই তার শিল্পীজীবন ধরলে আজ তা সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে তিনি দ্বিতীয় আবাস গড়েছেন স্পেন। সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করে শিল্পচর্চা করেছেন। হয়ে উঠেছেন মাদ্রিলেনঞ-বাঙালি। ছাপচিত্রের জন্য খ্যাতিমান এই শিল্পী এচিংয়ে এমন একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন, যা স্পেনে ‘মনির-স্কুল’ বলে পরিচিত।
অর্থাৎ এই সময়ে তার চিত্রকর্ম একই রকম থাকেনি। তা সম্ভবই না। কখনো থাকে না। বদলে গেছে, বিষয় বস্তু থেকে প্রকরণ, এমনকি আঁকার সরঞ্জাম-উপাদান, সবকিছুতে এই পরিবর্তন। প্রত্যাহিক জীবনের প্রায় সব কিছু থেকেই তিনি শিল্পের সন্ধান পান। এমনি একটা পোড়া রুটির বুক থেকেও। ১৯৬১ থেকে ২০১৬, এই দীর্ঘ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সব পেন্টিং ও দিক নিয়ে প্রকাশ হলো শিল্পবিষয়ক বই ‘মনির’। এর মধ্যদিয়ে তার আঁকা ছবির পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের একটা রেখাচিত্র পাওয়া যাবে। গতকাল শনিবার ঢাকা লিট ফেস্টের সমাপনী দিনে কসমিক টেন্ট-এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়। (সম্পূর্ণ…)

শব্দের জাদু– অনুবাদে ঠিক কতটা হারাই?

রেশমী নন্দী | ১৯ নভেম্বর ২০১৬ ১:১৩ অপরাহ্ন

TranslationDictionary of Untranslatables: A Philosophical Lexicon বইটি মূলত ফরাসী ভাষায় লিখিত। পরে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে তিন গুণী ভাষাবিদের সম্পাদনায় ইংরেজীতে প্রকাশিত হয় বইটি। প্রায় ডজনখানেক ভাষার দর্শন, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক ৪০০ শব্দের উপর নানা দিক থেকে আলোকপাত করে মূলের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বইটিতে। এই বই নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরেই “দি নিউইয়র্কার” -এ এ্যাডাম গুপনিক এই লেখাটি লেখেন। অনুবাদ করেছেন রেশমী নন্দী। বি. স.

ইতালীতে একবার একটা রেষ্টুরেন্টে পরিবার নিয়ে খেতে গিয়েছিলাম। ঊনিশ শতকের লেখকের ভঙ্গীতে বললে বলতে হয়, সামান্য একটা ভুলেই আমি পারিবারিকভাবে বোকা উপাধি পেয়েছিলাম। ইতালীয় দুটি শব্দের সূক্ষ্ণ পার্থক্য না বুঝে এর ব্যবহারই এ দূর্ঘটনার কারণ। ডেজার্টে স্ট্রবেরী অর্ডার দিতে খুব কায়দা করে উচ্চারণ করতে চেয়েছিলাম “fragoline”। পরে দেখলাম, আসলে যা বলেছি তা হলো “fagiolini” যার অর্থ হলো মটরশুটি। ফলে বাচ্চাদের জন্য পেস্ট্রি আর আইসক্রিমের সাথে বেশ সাড়ম্বরে আমার ডেজার্ট হিসেবে এসেছিল কফি আর মটরশুটি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আমার বাচ্চাদের যে হাসি শুরু হয়েছিল, সেটা এখনো মাঝে মাঝে নানা কারণে উসকে উঠে। একটা অক্ষর “r” সেদিন যে কারণে ইতালীয় ঐ রেষ্টুরেন্টে একটা পরিবারে একজনকে বোকা বলে চিনিয়ে দিল, তা হলো ভাষার নিজস্ব খামখেয়ালীপনা। যদিও কথা বলা এখন নিঃশ্বাস নেয়ার মতোই স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু সত্য হলো এই যে শব্দগুলো আসলে খুব অদ্ভুত, বিমূর্ত একধরনের প্রতীক- মিশরীয় চিত্রলিপির মতোই দুর্বোধ্য, মিশরীয় সমাধির মতোই যে কাউকে ঘোল খাইয়ে দিতে পারে। (সম্পূর্ণ…)

উপনিষদের ফার্সী অনুবাদ সিরর-ই-আকবর এবং শাহযাদা দারাশুকোহ

আনিসুর রহমান স্বপন | ১০ অক্টোবর ২০১৬ ৭:৩০ অপরাহ্ন

upanishad-comboরেডিও তেহরানের বাংলা অনুষ্ঠানে এবং সাজমানে তাবলীগাতে ইসলামীর (আইপিও) বাংলা বিভাগে দীর্ঘ দশ বছর (১৯৮৬-৯৬) কাজ করার সুবাদে ফার্সী ভাষা ও সাহিত্য এবং পারস্য-দর্শনের সাথে পরিচয়ের সুযোগ ঘটে। ঢেঁকি যেহেতু স্বর্গে গেলেও ধান ভানে সেহেতু ইরান-ইরাক এবং ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের প্রচন্ড চাপ ও বিপদের মাঝেও অব্যাহত রাখতে হয় শেকড়ের-সন্ধান। মধ্য-তেহরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য-দাপ্তরিক এলাকা মায়দুনে ভালী আসরের (ওয়ালী আছর স্কয়ার) ‘কেতাব ফুরুশীয়ে হাশেমীতে’ (হাশেমী বুক শপ) অগায়ে হাশেমী ও তার ভাই অগায়ে আলী (জনাব হাশেমী ও জনাব আলী) নামে দুই সহোদর মালিক আমাকে সন্ধান দিলেন দারাশুকোহর করা উপনিষদের ফার্সী অনুবাদ।
ভারত-সম্রাট শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্রের এ অনুবাদ সুদূর তেহরানে বসে পেয়ে কিঞ্চিৎ বেশী মূল্যেই সংগহ করতে হলো। লাল টুকটুকে রেক্সিনে সুন্দর বাঁধাই করা প্রচ্ছদের উপর সোনালী হরফে গ্রন্থ, গ্রন্থকার, অনুবাদক ও সম্পাদকের নামসহ সংস্কৃত লেখা ‘উপনিষদ’ শব্দ যুক্ত খন্ড দুটি।

এর মধ্যে প্রথম খন্ডে ৬৯৬ পৃষ্ঠা। শুরুতে ১০ পৃষ্ঠার টাইটেল, প্রিন্টার্স লাইন ও মুখবন্ধের পর আছে ৩৪৪ পৃষ্ঠ।
তেহরান সংস্করণের সম্পাদক ডঃ তারা চাঁদ ও ডঃ সাইয়েদ মহম্মদ রেজা জালালী নায়েনীর ভূমিকা।
এ ভূমিকার মধ্যে ও গ্রন্থের দু’খন্ডের বিভিন্ন অংশে দারাশুকোহ’র জীবন ও কর্ম সংশ্লিষ্ট চিত্র, পান্ডুলিপির ছবি এবং ভারতীয় রাষ্ট্র নেতাদের কাছে এ সংস্করণ হন্তান্তরের আলোকচিত্র রয়েছে। নতুন পৃষ্ঠা নং দিয়ে এরপর ৩৪২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ফার্সীতে সিরর-ই-আকবর নামে দারাশুকোহ’র করা উপনিষদের অনুবাদ। পৃষ্ঠা সংখ্যার ক্রমন্বয় রক্ষা করে শুরু করা দ্বিতীয় খন্ডের ৪৯০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পাঁচশ মুদ্রিত পৃষ্ঠায় এ অনুবাদ সুদীর্ঘায়িত হয়েছে।
প্রয়াত ডঃ তারা চাঁদ ভারতবর্ষের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী লেখক, গবেষক, অধ্যাপক। নেহেরুর মন্ত্রীসভায় মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষা মন্ত্রীত্বের সময় তিনি এ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে রাজ্য সভার সদস্য এবং ইরানে ভারতীয় দূতাবাসেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডঃ জালালী নায়েনীর সহযোগিতায় দীর্ঘ ৪ বছর ফার্সী-সংস্কৃত পাঠ-পর্যালোচনা করে তিনি দারাশুকোহর অনূদিত উপনিষদ সম্পাদনা করেন। এরপর ডঃ নায়েনী আরো ৪ বছর ধরে ফার্সীভাষী পাঠকদের জন্যে এতে ব্যবহৃত ‘সংস্কৃত’ শব্দের অর্থ ও ভাষ্য রচনা করেন।
অবশেষে দীর্ঘ ৮ বছর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে ফার্সী ১৩৪০ (ইংরেজী ১৯৬২) সালে তেহরান থেকে এ গ্রন্থের প্রথম আধুনিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
১৯৬৩ সালের মার্চে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নয়াদিললীতে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপললী রাধাকৃষ্ণনন এবং প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহেরুর কাছে এ গ্রন্থের কপি হস্তান্তর করেন সম্পাদকদ্বয়।
এভাবে তিনশতাধিক বছর পর ভারতেরই এক যুবরাজের সাধনার ফসল হাতে তুলে নেন তাদের উত্তরসূরীরা। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com