দর্শন

আঁতোয়ান দ্য স্যাঁতেকসুপেরি’র বন্দীকে লেখা চিঠি

আনন্দময়ী মজুমদার | ১৩ জানুয়ারি ২০১৬ ৮:১৫ অপরাহ্ন

আঁতোয়ান দ্য স্যাঁতেকসুপেরি (১৯০০–১৯৪৪) একজন ফরাসি কথাসাহিত্যিক, কবি, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব ও পথিকৃৎ বৈমানিক। ফ্রান্সের কয়েকটি সেরা সাহিত্য পুরস্কার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বই ‘ল্য প্যতি প্র্যাঁস’ (‘দ্য লিটল প্রিন্স’), ‘তের দেজোম’ (‘উইন্ড, স্যান্ড অ্যান্ড স্টারস’) ও ‘ভোল দ্য নুই’ (‘নাইট ফ্লাইট’)।

দুঃসাহসী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ছিলেন তিনি; ১৯৩৫ সালে প্যারিস থেকে সায়গনের উড়াল-রেকর্ড ভাঙতে চেষ্টা করেন। কিন্তু লিবিয়ার মরুভূমিতে তাঁর বিমান-দুর্ঘটনা হয়। তিনি ও তাঁর সহ-বৈমানিক মরুভূমিতে পথ হারিয়ে তিনদিন ঘুরে বেড়ানোর পর তাঁদের উদ্ধার করা হয়। ১৯৩৮ সালে আরেকটি বিমান দুর্ঘটনা হয় তাঁর – এইবার নিউ ইয়র্ক থেকে আর্জেন্টিনার তিয়েরা দেল ফুয়েগোতে যাবার সময়ে, গুরুতর আহত হন তিনি। দীর্ঘদিন নিউ ইয়র্কে অচেতন ছিলেন। ৩১ জুলাই ১৯৪৪, ভূমধ্যসাগরের উপর প্যারিস থেকে করসিকা অভিমুখে এক দুঃসাহসী বিমানযাত্রার সময়ে তিনি নিখোঁজ হন – সম্ভবত বিমান-দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। এরপরের বই ‘তের দেজোম’। এটি তাঁকে আকাদেমি ফ্রঁসেজ-এর ‘গ্রঁ প্রি দ্য রমাঁ’ (উপন্যাসের জন্যে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার) ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড এনে দেয়।

একসুপেরির ‘ছোট্ট রাজপুত্র’ বইটি আড়াইশোর বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এটি সর্বকালে সর্ববহুল বিক্রীত বইয়ের শীর্ষতালিকায় স্থান পেয়েছে। ফ্রান্সে তিনি মরণোত্তর জাতীয় বীরের মর্যাদা পেয়েছেন। নানা ভাষায় তাঁর বইয়ের অনুবাদ তাঁকে আন্তর্জাতিক ভাবে সুপরিচিত করেছে। ফ্রান্সে ও তার বাইরে পাওয়া তার প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি সম্মাননা বিবিধ, বিচিত্র ও বিপুল। ১৯৬০ সালে তাঁর দার্শনিক আত্মস্মৃতি ‘তের দেজোম’-এর নামে (আক্ষরিক অনুবাদে ‘মানুষের ভুবন’) একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নাম রাখা হয়েছে। অন্তত তিনটি মহাদেশে তার নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার দার্শনিক প্রবন্ধ ‘বন্দীকে লেখা চিঠ ‘ এই প্রথম বাংলাভাষায় অনূদিত হলো আনন্দময়ী মজুমদারের তর্জমায়। (সম্পূর্ণ…)

বহু বর্ণ ভালোবাসার এই পাঠ

সারওয়ার চৌধুরী | ২৯ অক্টোবর ২০১৩ ৬:২৩ অপরাহ্ন

ঈ.
সহস্র প্রকার Law বা নিয়ম জগতমণ্ডলের বহুমাত্রিক অর্থময়তার ভাঁজে ভাঁজে। তার মাঝে Law of the heart বিস্ময়কর ফোকাস দিয়ে আসছে মানবজাতিকে। এই ল ফ্রাংক-স্টারলিং-য়ের বায়োলজিক্যাল ম্যাকানিজম বিষয়ক নয়। এই ল-এর বিকিরণ সোজা কথায় ভালোবাসা। জীবনের আদি অন্তে বহু বর্ণ ভালোবাসা গ্রন্থিত হবার কারণ এই ল । কেউ জানে না- Deepness of passion-এর দ্যুতি দেখা দিলে মানুষের যুক্তিজ্ঞান কোথায় কোন বনে গিয়ে লুকায়। (সম্পূর্ণ…)

ডেনিস ডাটনের বক্তৃতা

সৌন্দর্য ও ডারউইনের থিওরি

লুনা রুশদী | ২৯ জানুয়ারি ২০১১ ১:৫৩ পূর্বাহ্ন

dennis_dutton.jpg
…………
ডেনিস ডাটন (৯.২.১৯৪৪ – ২৮.১২.২০১০)
…………

[গত এক শতাব্দী ধরে শিল্প সমালোচকেরা বলে এসেছেন সামাজিক পরিবেশ শিল্পের রুচি গড়ে তোলে। ডাটন ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, শিল্প বিষয়ক রুচি, সেটা যে কোন শিল্প মাধ্যমই হোক না কেন, গঠিত হয়েছে বিবর্তনের মাধ্যমে, ডারউইনের থিওরি দিয়ে যার ব্যাখ্যা করা যায়। সৌন্দর্যের প্রতি আমাদের ভালোবাসা সহজাত। নান্দনিক অনেক ভালোলাগা সংস্কৃতি নির্ভর হয় না। যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে ডাটন দেখিয়েছেন ভাববাচক বা বিমূর্ত কোনো তত্ত্ব নয়, বরং বিবর্তন বিষয়ক উপলব্ধিই শিল্প সমালোচনার ভিত্তি। তাঁর মতে সৌন্দর্য, যে কোনো রকম আনন্দ ও দক্ষতা শিল্পমূল্যের অর্ন্তগত।—বি.স.]

অনুবাদ: লুনা রুশদী

আজ আমার প্রিয় একটা বিষয় নিয়ে কথা বলবো। নন্দনতত্ত্ব আমার পেশা। দার্শনিক, বৌদ্ধিক ও মনস্তাত্ত্বিক আঙ্গিক থেকে আমি সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতাকে বুঝতে চেষ্টা করি। এ বিষয়ে যুক্তিগতভাবে কী বলা যায়? বিষয়টা জটিল। তার একটা কারণ হলো এর পরিধি, ভেবে দেখেন, কত বিচিত্র কিছুকে আমরা সুন্দর বলি—একটা শিশুর মুখ, বার্লিওজের ‘হ্যারল্ড এন ইতালি’, উইজার্ড অফ ওজ-এর মতো সিনেমা, চেখভের নাটক, ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাকৃতিক দৃশ্য, হকুসাইয়ের আঁকা ‘মাউন্ট ফুজি’, ওর্য়াল্ড কাপ ফুটবলে একটা দারুণ গোল, ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’, জেন অস্টেনের উপন্যাস অথবা পর্দায় ফ্রেড এস্টেয়ারের নাচ। এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছে মানুষ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শিল্প ও অন্যান্য মানবিক দক্ষতা। তালিকাভুক্ত সমস্ত কিছুর সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করা সহজ কাজ হবে না।

dd_4.jpg……
ডেনিস ডাটনের বই: দি আর্ট ইনস্টিংক্ট–বিউটি, প্লেজার অ্যান্ড হিউম্যান ইভ্যুলুশন
…….
তবে আমি, আমার জানা মতে আজ সৌন্দর্য বিষয়ক সবচেয়ে শক্তিশালী থিওরির সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পারি। এবং এ থিওরি কোন দার্শনিক বা পোস্টমডার্ন শিল্পের নামকরা কোন সমালোচকের কাছ থেকে আসেনি, এসেছে এক জাহাজীর কাছ থেকে, যিনি কেঁচো আর কবুতর পালতেন। এতক্ষণে নিশ্চয়ই আপনারা বুঝে গেছেন যে আমি চার্লস ডারউইনের কথা বলছি।

‘সৌন্দর্য’ কী? অনেকেই মনে করেন তাঁরা এই প্রশ্নের উত্তর জানেন। যেমন, ‘সৌন্দর্য থাকে যে দেখে তার দৃষ্টিতে’ অথবা ‘যা কিছুই আমাদের ব্যক্তিগতভাবে নাড়া দেয়, তাই সুন্দর।’ অথবা কেউ কেউ, বিশেষ করে বুদ্ধিজীবীরা বলে থাকেন ‘সৌন্দর্য থাকে যে দেখে তার সংস্কৃতি-নিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিতে।’ (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ১২)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ৬:২১ অপরাহ্ন

—————————————————————-
বশ মানা শরীরগুলো
—————————————————————–

কিস্তি: ১০১১

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

work-table-2.jpg
কাজের টেবিলে মিশেল ফুকো, ছবি:মার্টিন ফ্রাঙ্ক

খণ্ড ৩ : শৃঙ্খলা

প্রথম অধ্যায়: বশ মানা শরীরগুলো (Docile Bodies)
(পৃষ্ঠা ১৩৫-১৪৫)

(গত সংখ্যার পর)

আসুন, সপ্তদশ শতকের শুরুতে সৈন্যের যে আদর্শ মূর্তি কল্পনা করা হতো, সেই আদর্শ মূর্তিটির কথা আমরা ফিরে আর একবার ভাবি তো! গোড়ার কথা বলতে হলে, একজন আদর্শ সৈন্য হলেন তিনিই যাকে বহু দূর থেকে দেখেও চমৎকার চেনা যেত। আদর্শ সৈন্যকে চেনার কিছু সহজ লক্ষণ বা চিহ্ন ছিল। একদিকে তাঁর শক্তিমত্তা এবং সাহসের সাধারণ চিহ্ন তো ছিলই, সেই সাথে ছিল তাঁর গৌরবের কিছু লক্ষণ। তাঁর দেহসৌষ্ঠবই তাঁর শৌর্যবীর্য প্রকাশের মাধ্যম। একথা সত্য যে যুদ্ধবিদ্যা একজন সৈনিককে শিখতে হয় অল্প অল্প করে। সাধারণতঃ প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রেই এই শেখার প্রক্রিয়াটা চলে। তবু
—————————————————————–
বহুদিন ধরেই ‘পুঙ্খানুপুঙ্খতা’ ধর্মতত্ত্ব এবং তপশ্চর্যার একটি প্রণালী হয়ে দাঁড়িয়েছে। … যেহেতু ঈশ্বরের দৃষ্টিতে কোনো অসীমতাই একটি ক্ষুদ্র অনুষঙ্গের চেয়ে বড় নয় এবং কোনোকিছুই এত ক্ষুদ্র নয় যা ঈশ্বরের একটি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা হতে তৈরি হয়নি। পুঙ্খানুপুঙ্খতার প্রতাপের এই প্রবল ঐতিহ্যে, খ্রিষ্টীয় শিক্ষা, যাজকিয় অথবা সামরিক স্কুলশিক্ষার যাবতীয় সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়, যাবতীয় ‘প্রশিক্ষণ’ তাদের জায়গা ঠিকঠাকমতো খুঁজে পেয়েছে।
—————————————————————-
japan-trip.jpg
জাপানে ফুকো

মার্চপাস্ট করার মতো শারীরিক নড়াচড়া কিম্বা গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা তুলে রাখার মতো মনোভাব প্রায়শঃই একজন সৈন্যের সামাজিক সম্মানের শারীরিক অলঙ্করণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘সৈনিকের পেশার সাথে খাপ খায় এমন বিভিন্ন চিহ্নের ভেতর সজীব কিন্তু সতর্ক ভঙ্গিমা, উঁচু মাথা, টানটান পাকস্থলী, চওড়া কাঁধ, দীর্ঘ বাহু, শক্ত দেহকাঠামো, কৃশকায় উদর, পুরু উরু, পাতলা পা এবং শুকনো পায়ের পাতা উল্লেখযোগ্য। এমন দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী পুরুষটি ক্ষিপ্র এবং বলিষ্ঠ না হয়ে যায় না।’ সৈনিক যখন বর্শাধারী হবেন তখন ‘সৈনিককে মার্চপাস্টের সময় এমনভাবে পা ফেলতে হবে যেন প্রতিটি পদক্ষেপে যথাসম্ভব মহিমা ও ভাবগাম্ভীর্য ফুটে ওঠে। কেননা, বর্শা হলো একটি সম্মানজনক অস্ত্র যা কেবলমাত্র ভাবগাম্ভীর্য ও সাহসের সাথেই শুধু বাহিত হতে পারে।’ (মন্টগোমারি, ৬ এবং ৭)। আঠারো শতকের শেষ নাগাদ ‘সৈন্য’ হয়ে দাঁড়ালো এমন এক ভাবমূর্তি যা এমনকি ছিরিছাঁদহীন এক তাল কাদা থেকেও বানানো যায়। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ১১)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৬ জুলাই ২০০৮ ৪:৪৪ অপরাহ্ন

gloucesterjail.jpg
ব্রিটেনের গ্লুচেস্টার সংশোধনাগার

—————————————————————-
শাস্তির কোমল পন্থা
—————————————————————–

কিস্তি: ১০

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

২য় অধ্যায়: শাস্তির কোমল পন্থা (The gentle way in punishment)
(পৃষ্ঠা ১২৩-১৩১)

(গত সংখ্যার পর)

সংশোধনাগারের এই ব্যবস্থা শুধুই যে গার্হস্থ্য অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষায় জরুরি জটিল স্বার্থগুলোর পুনর্বিন্যাস করবে তাই নয়। বরং সংশোধনাগার নৈতিক বিষয়ের অনুজ্ঞাও নির্ধারণ করবে। সংশোধনাগারের সেল বা ক্ষুদে কুঠুরি যেন খ্রিষ্টীয় সন্ন্যাসীদের মঠের আদলে গড়া যা আগে শুধু ক্যাথলিক দেশগুলোতেই দেখা যেত। ক্যাথলিক মঠের আদলে গড়া সংশোধনাগারের wal-st-j.jpg
ফিলাডেলফিয়ায় ওয়ালনাট সড়কের জেলখানা

এই সেলগুলোই প্রটেস্ট্যান্ট সমাজে সেই যন্ত্রের রূপ ধারণ করে, যার মাধ্যমে কেউ গার্হস্থ্য অর্থনীতি এবং ধর্মীয় বিবেকবোধ দু’টোরই পুনর্গঠন করতে পারে। একদিকে অপরাধ ও আর একদিকে ন্যায়পরতা ও পুণ্যের পথে ফিরে আসা — জেলখানা যেন এই ‘দুই ভুবনের মধ্যবর্তী স্থান’টুকু গঠন করে। দুই ভুবনের মধ্যবর্তী এই স্থানটুকুই যেন ব্যক্তিগত রূপান্তরের জায়গা যা রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেবে তার অতীতের সেই বশমানা প্রজাকে যে প্রজা পরবর্তী সময়ে আইন অমান্যকারী বিদ্রোহীতে রূপান্তরিত হয়েছিল। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ১০)

অদিতি ফাল্গুনী | ২০ জুন ২০০৮ ৩:১১ অপরাহ্ন

—————————————————————-
শাস্তির কোমল পন্থা
—————————————————————–
paris-prison.jpg
প্যারিস জেলখানা, ১৯৭১ সালে তোলা ছবি

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

২য় অধ্যায়: শাস্তির কোমল পন্থা (The gentle way in punishment)
(পৃষ্ঠা ১১৩-১২২)

(গত সংখ্যার পর)

পুরনো শাস্তি ব্যবস্থার উত্তরসূরী হিসেবে নয়া শাস্তি ব্যবস্থায় একমাত্র যে অপরাধের জন্য অপরাধীকে কঠিনতম নির্যাতন করা হতো তা হলো রাজহত্যা। এই অপরাধে অপরাধী হলে হতভাগ্য ব্যক্তির চোখ উপড়ে ফেলা হতো। তাকে পাবলিক স্কোয়ারে বাতাসশূন্য একটি লোহার খাঁচায় বন্দি করা হতো। রাখা হতো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। কোমরে একটি লোহার বেড়ির মাধ্যমে তাকে সেই খাঁচার ইস্পাত পাতের সাথে শক্ত ভাবে আটকে রাখা হতো। দিনের শেষে খেতে দেওয়া হতো শুধুই রুটি আর পানি। ‘এভাবে ভিন্ন ভিন্ন মৌসুমের আবহাওয়ার যাবতীয় কষ্ট যেন অপরাধী ভোগ করতে পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হতো। শীতের দিনে তার মাথা ঢেকে যাবে তুষারে। আবার গরমে সে ঝলসে যাবে সূর্যের তাপে। এমন কঠিন নির্যাতনের মাধ্যমেই কেবল মানুষ বুঝবে যে রাজহত্যার অপরাধে দণ্ডিত খলনায়কের কী কঠোর শাস্তিই না হওয়া উচিত। স্বর্গীয় যে বিধান লঙ্ঘন করে সে রাজহত্যা করেছে, তার অপরাধে সে আর কখনো স্বর্গে যেতে পারবে না। রাজহত্যা এমন এক অপরাধ যে এর মাধ্যমে শুধু স্বর্গ নয়, অপরাধী কলঙ্কিত করে পৃথিবীর পবিত্রতাকেও। কাজেই, পৃথিবীতেও সে খুব বেশিদিন বেঁচে থাকতে পারে না। তাই তার শাস্তি যেন যন্ত্রণাময় জীবন শুধু নয়, যন্ত্রণাময় মৃত্যুরও দ্যোতক হয়ে ওঠে।’ (ভার্মেইল, ১৪৮-৯)। অপরাধীকে শাস্তি প্রদানকারী শহরের মাথায় ঝুলবে মাকড়সার মত দেখতে এই লোহার খাঁচা যেখানে অপরাধী নয়া আইনের অধীনে পিতৃহত্যাতুল্য অপরাধ অর্থাৎ রাজহত্যার জন্য ফাঁসিতে লটকাবে।

দেখতে দেখতে ছবির মতো অজস্র শাস্তিতে ভরপুর এক নয়া গুদামঘরই যেন গড়ে উঠল এসময়। ‘একই ধরনের শাস্তি বারবার দিও না,’ মেবলি বলেন। মেবলির সময় নাগাদ অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সামান্য হেরফেরের সমধর্মী শাস্তি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরো যথাযথভাবে বলতে গেলে: এসময়কার আইনবিদরা অপরাধীকে জেলখানায় বন্দি করাকে খুব বড় শাস্তি হিসেবে মনে করতেন না। অপরাধীকে যথার্থ শিক্ষাদানের জন্য জেলখানায় নির্বাসনকে আইনবিদরা কখনোই সুনির্দিষ্ট এবং প্রত্যক্ষ শাস্তির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করেন নি। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৯)

অদিতি ফাল্গুনী | ১২ মে ২০০৮ ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

china.jpg
চীনে ১৯০০ সালে কয়েদীকে কোমল শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।

—————————————————————–
শাস্তির কোমল পন্থা
—————————————————————–

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

২য় অধ্যায়: শাস্তির কোমল পন্থা (The gentle way in punishment)
(পৃষ্ঠা ১০৪-১১৩)

(গত সংখ্যার পর)

দণ্ডপ্রদানের শিল্প, সেক্ষেত্রে, প্রতিনিধিত্বের সমগ্র কৃৎকৌশলের উপর নির্ভর করতে বাধ্য। এই কাজটি শুধুমাত্র তখনি সফল হতে পারে যদি এটি একটি সাধারণ কৃৎকৗশলের অংশবিশেষ মাত্র গঠন করে। ‘শরীরের অভিকর্ষবেগের মতো, একটি গুপ্ত শক্তি আমাদের কল্যাণের পথে সবেগে চালিত করে। এই আবেগ বাধাপ্রাপ্ত হয় শুধুমাত্র বিরুদ্ধ আইনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা দ্বারা। মানুষের সব ধরনের বিচিত্র কাজকর্মই এই অন্তর্গত প্রবণতার প্রভাব।’ একটি অপরাধের যথোপযুক্ত শাস্তি হলো অপরাধীর জন্য এমন কোনো যন্ত্রণা তৈরি করা যার ভয়ে অপরাধটি করার জন্য আর কোনো আকর্ষণ অপরাধী খুঁজে পাবে না। এ যেন বিভিন্ন সঙ্ঘাতমুখী শক্তিগুলোর এক শিল্প। অনুষঙ্গ দ্বারা যুক্ত চিত্ররূপসমূহের শিল্প, সময়কে অস্বীকার করা স্থির সংযোগগুলোর চাপপ্রয়োগ। এ যেন বিরুদ্ধ মূল্যবোধগুলোর যুগ্মতার প্রতিনিধিত্বকে প্রতিষ্ঠা করা। বিরুদ্ধ শক্তিগুলোর ভেতর পরিমাণগত পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিবন্ধকতা-চিহ্নের জটিলতা প্রতিষ্ঠা করা যা শক্তির আন্দোলনকে ক্ষমতা সম্পর্কের অধীনস্থ করে। ‘নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডের ধারণাকে দুর্বল মানুষের হৃদয়ে সদা উপস্থিত থাকতে দাও। যেন এই নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডের ভয় তাকে অপরাধ করা হতে বিরত রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে’ (বেক্কারিয়া ১১৯)। এই প্রতিবন্ধকতা-চিহ্নগুলো নিঃসন্দেহে গড়ে তুলবে শাস্তির নয়া অস্ত্রাগার। ঠিক যেমন পুরনো মৃত্যুদণ্ডগুলো একধরনের প্রতিশোধমূলক চিহ্নের ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছিল। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৮)

অদিতি ফাল্গুনী | ২১ মার্চ ২০০৮ ১:৫১ অপরাহ্ন

—————————————————————–
সাধারণীকৃত শাস্তি
—————————————————————–
কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

১ম অধ্যায়: সাধারণীকৃত শাস্তি

(গত সংখ্যার পর)

অপরাধের পুনরাবৃত্তি এড়াতে যথার্থ ভাবে শাস্তি প্রদান করতে হবে। উদাহরণের কৃৎকৌশলে এভাবেই পালাবদল আসে। যে শাস্তি অপরাধীর জন্য প্রকাশ্যে নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুমোদন করে, সেখানে শাস্তির দৃষ্টান্তই যেন অপরাধের যোগ্য জবাব। শাস্তির এই দৃষ্টান্তমূলকতার ছিল এক foucaultbuffalo1971.jpg……
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)
…….
ধরনের যমজ প্রকাশভঙ্গি। একইসাথে তা যেন অপরাধ এবং অপরাধের দণ্ডদাতা সার্বভৌম সম্রাটকে তার নিষ্ঠুর চেহারাটি দেখাচ্ছে। যদিও দণ্ডদাতা সম্রাট নিজেই শাস্তিপ্রদান ক্ষমতার মালিক। যেহেতু অপরাধের শাস্তি এক ধরনের হিসাব করে দেওয়া হয় যে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ও প্রকরণের শাস্তিতে একটি নির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া যেতে পারে, শাস্তির দৃষ্টান্ত অবশ্যই উল্লেখ করবে যে ঠিক কোন ধরনের অপরাধের প্রেক্ষিতে এমন শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবে শাস্তি প্রদান ক্ষমতার ব্যবহার হতে হবে সম্ভাব্য সবচেয়ে গোপনীয় পন্থায় এবং সবচেয়ে বেশি পরিমিতি বোধের সাথে। আদর্শগত ভাবেও, শাস্তির দৃষ্টান্তমূলকতার উচিত অপরাধ এবং অপরাধের দণ্ডদাতা সম্রাট, এই উভয়েরই পুনরাবির্ভাবকে ঠেকানো। শাস্তির উদাহরণ কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয় যা নিজেকে প্রকাশ করে। বরং উদাহরণ প্রতিবন্ধকতার চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। দণ্ডমূলক চিহ্নগুলোর এই কৃৎকৌশলের মাধ্যমে দণ্ডমূলক কাজের সাময়িক ক্ষেত্রটি পুরোপুরি উল্টে যাবার একটি প্রবণতা দেখা দেয়। আইনী সংস্কারকরা ভেবেছিলেন যে তারা শাস্তিপ্রদান ক্ষমতাকে একটি মিতব্যয়ী এবং দক্ষ যন্ত্রোপকরণ প্রদান করেছেন যা সমগ্র সমাজদেহের মাধ্যমে সাধারণ্যে প্রবাহিত হবে। এই যন্ত্রোপকরণ সমাজদেহের যাবতীয় আচরণকে বিধিবদ্ধ করতে সক্ষম হবে। এবং এই বিধিবদ্ধকরণের ফলাফল হিসেবেই বেআইনী কার্যক্রমের এলোমেলো পরিসরকে হ্রাস করতে সক্ষম হবে। যে প্রতীকী-কৌশলের (semio technique) সাহায্যে দণ্ডপ্রদান ক্ষমতাকে বলবান করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেই প্রতীকী কৌশল মোটামুটি পাঁচ/ছ’টি প্রধান নিয়মের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত:

ন্যূনতম পরিমানের নিয়ম : এই মতানুযায়ী, একটি অপরাধ মূলতঃ সঙ্ঘটিত হয়ে থাকে কিছু সুযোগ-সুবিধার জন্য। অপরাধ সঙ্ঘটনের চিন্তা করার সময় কারো মনে যদি অপরাধের ফলে পাওয়া যেতে পারে এমন কিছু সুযোগ সুবিধার চেয়ে অসুবিধার চিন্তাটি বড় হয়ে দাঁড়াতো, তাহলে কিন্তু অপরাধটি কখনোই সঙ্ঘটিত হতো না। ‘শাস্তিকে সেই মাত্রার হতে হবে, যাতে করে শাস্তির ফলে অপরাধী যে কষ্ট পাবে, সেই কষ্টের মাত্রা অপরাধ করার পর সে যে আরাম বা সুবিধা পেয়েছে, তার থেকে বেশি হয়।’ (বেক্কারিয়া, ৮৯)। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৭)

অদিতি ফাল্গুনী | ৪ মার্চ ২০০৮ ৫:২৮ অপরাহ্ন

paiকিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

১ম অধ্যায়: সাধারণীকৃত শাস্তি

(গত সংখ্যার পর)
a-gathering1.jpg
Jean-Honoré Fragonard-এর ‘A Gathering at Woods’ Edge’ (১৭৬০-৮০)

zz-1700-02.jpg
চিত্রকলায় আঠারো শতকের ফরাসি ক্যাথলিক নারীরা খেতের মধ্যে পড়ে থাকা শস্য কুড়াচ্ছে

সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রতিটি অংশই এই প্রয়োজনীয় বেআইনী কার্যক্রমের কিছু নির্দিষ্ট প্রকরণ নিজের ভেতরে ধারণ করতো। ফলে, বেআইনী কার্যক্রম একধরনের স্ববিরোধিতার আবর্তে পড়ে যায়। নিম্নস্তরের বেআইনী কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবেই শণাক্ত করা হতো। অর্থাৎ, অপরাধ থেকে তাকে নৈতিক ভাবে না হোক, বিচারগত ভাবে পৃথক করাটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াত। আর্থিক অনিয়ম হতে শুল্ক সংক্রান্ত অনিয়ম, চোরাচালান, লুণ্ঠন, সরকারের শুল্ক প্রতিনিধিদের সাথে সশস্ত্র লড়াই হতে শুরু করে পরবর্তী সময়ে খোদ সৈন্যদের সাথে লড়াই ও শেষমেশ বিদ্রোহ…এসব কিছুতেই ছিল একটি ধারাবাহিকতা। আর, এভাবেই অপরাধ ও বেআইনী কার্যক্রমের মাঝে সীমারেখা টানা কঠিন হয়ে পড়ে। ধরা যাক ভবঘুরেপনার কথা। অধ্যাদেশ অনুযায়ী ভবঘুরেপনার জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারিত থাকলেও এই অধ্যাদেশ কখনোই বাস্তবায়িত হতো না। এই ভবঘুরেপনার সাথেই লুণ্ঠন, শোচনীয় চুরি এবং এমনকি খুন করার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়াটা বেকারদের জন্য ছিল এক ধরনের কর্মসংস্থান। যেসব কর্মী তাদের মালিককে কিছুটা অমীমাংসিত অবস্থায় রেখেই কাজ ছেড়েছে বা যে গৃহভৃত্যদের মালিকের কাছ হতে পালানোর কিছু যৌক্তিক কারণ ছিল, মন্দ ব্যবহার পাওয়া শিক্ষানবিশী কর্মী, পলাতক সৈন্য বা জোর করে সশস্ত্র বাহিনীতে ভর্তি করার কাজে নিয়োজিত দলগুলোর হাত এড়াতে চাওয়া ব্যক্তিদের সবার জন্যই ভবঘুরেপনা ছিল এক ধরনের কর্ম সংস্থান। সুতরাং, অপরাধ এক ব্যাপকতর অর্থে বেআইনী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গণ্য হতো। আর, সাধারণ মানুষ কিšত্ত লঘু স্তরের বেআইনী কার্যক্রমকে তাদের বেঁচে থাকার শর্ত হিসেবে দেখতো। অন্যদিকে গুরুতর বেআইনী কার্যক্রমকে দেখা হতো অপরাধ বিস্তারের পেছনে এক চিরস্থায়ী কারণ হিসেবে। এভাবেই জনতার ভেতর বেআইনী কার্যক্রম বিষয়ে ছিল দ্ব্যর্থকতা বোধ। অপরাধী–ধরা যাক যে একজন চোরাচালানকারী বা একজন চাষী যে তার প্রভুর খাজনা আদায়ের হাত হতে পালিয়েছে, তার প্রতি জনতার সহানুভূতির জোয়ার বয়ে যেত। তার সন্ত্রাসী কাজকে দেখা হতো অভিজাত শ্রেণীর সাথে নিম্নবর্গের পুরণো লড়াই হতে সরাসরি উদ্ভুত কার্যক্রম হিসেবে। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৬)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ২ : শাস্তি

১ম অধ্যায়: সাধারণীকৃত শাস্তি

‘শাস্তিকে নিয়ন্ত্রিত এবং অপরাধের সাথে সমানুপাতিক হতে দাও, শুধুমাত্র খুনের আসামীদেরই মৃত্যুদণ্ড পেতে দাও এবং মানবতাবিরোধী নির্যাতনগুলো লুপ্ত হতে দাও।’ এভাবেই, ১৭৮৯ সালের ফরাসী আদালত কর্তৃপক্ষের কাছে প্রদত্ত নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত আবেদনপত্রগুলোর সাধারণ অবস্থানটির সারসংক্ষেপ করে (সেলিগম্যান এবং দেসজাহদা, ১৩-২০)। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সংখ্যা ব্যাপকতর হারে বেড়ে যায়।আইনের দার্শনিক এবং তাত্ত্বিকদের ভেতর, foucault.jpg
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

আইনজীবী এবং সাংসদদের ভেতর, জনপ্রিয় আবেদনপত্র এবং সংসদের আইনপ্রণেতাদের ভেতর মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। এক নতুন ধরনের শাস্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। সার্বভৌম সম্রাট এবং অভিযুক্তের মধ্যকার শারীরিক দ্বন্দ্ব সমাপ্ত হতে হবে; রাজার প্রতিশোধস্পৃহা এবং জনতার মনে সঞ্চিত ক্রোধের ভেতরকার এই হাতাহাতি যুদ্ধ শেষ হতে হবে। হত্যাদণ্ড পাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং জল্লাদের ভেতরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে এই হাতাহাতি যুদ্ধ শেষ হতে হবে। খুব দ্রুতই প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুষ্ঠান মানুষের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠলো। ক্ষমতার দিক থেকে দেখলে, যেখানেই ক্ষমতা প্রতারণা করেছে স্বৈরাচার, ক্ষমতার অতিরেক, প্রতিশোধস্পৃহা এবং ‘শাস্তি প্রদানে পাওয়া নিষ্ঠুর আনন্দ’ (পিশন দ্যু ভিলেন্যোভ, ৬৪১)-র সাথে, সেখানেই বিপ্লব ঘটেছে। অথচ, হতাশায় ডুবে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর সম্পর্কে আশা করা হতো যে সে ‘তাকে (ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে) পরিত্যাগকারী স্বর্গ এবং বিচারকদের জন্য আশীর্বাদ করবে।’ (ব্যুশেহ দ্য’অর্গিস, ১৭৮১,১২৫)। এটা ছিল রীতিমতো লজ্জাজনক। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান একদিক থেকে বিপজ্জনকও ছিল। যেহেতু এই দণ্ড প্রদান অনুষ্ঠান সম্রাটের সন্ত্রাস এবং সাধারণ জনতার সন্ত্রাসের ভেতরে সংঘাত সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করে দিত। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের মাধ্যমে নিষ্ঠুরতায় অপরাধীর সমকক্ষ হবার মহড়ায় সম্রাট যেন দেখতে পেতেন না যে তিনি নিজেই একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের দিকে যে চ্যালেঞ্জ যে কেউ একদিন গ্রহণ করতে পারে। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৫)

অদিতি ফাল্গুনী | ২৪ জানুয়ারি ২০০৮ ১১:১৫ অপরাহ্ন

কিস্তি:


শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম

মিশেল ফুকো

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ১ : নির্যাতন

দ্বিতীয় অধ্যায়: বধ্যমঞ্চের জমকালো প্রদর্শনী

(গত সংখ্যার পর)

এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে প্রকাশ্য নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অস্তিত্ব শাস্তির অভ্যন্তরীন প্রতিষ্ঠানের বদলে অন্য কিছুর সাথে জড়িত ছিল। রুশ্চে (Rusche) এবং কির্শহেইমার (Kirchheimer) এই বিষয়টিকে যথার্থই এমন এক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রভাব হিসেবে দেখেন যাতে শ্রম ক্ষমতা এবং মানব শরীরের না আছে কোন উপযোগ না কোন বাণিজ্য মূল্য।foucault-shiri.jpg……
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)
……..
শিল্পায়ন অর্থনীতিই তাদের উপর এই উৎপাদন ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে। উপরন্তু, প্রকাশ্য নির্যাতনে মানব শরীরের প্রতি সাধিত ‘অবমাননা’ মৃত্যুর প্রতি সাধারণ ভাবে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পর্কযুক্ত। এবং এমন এক দৃষ্টিভঙ্গিতে কেউ যে শুধু যথার্থ খ্রিষ্টিয় মূল্যবোধই শণাক্ত করবেন তা’ নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আরো রয়েছে জৈবিক অবস্থান: অসুস্থতা ও ক্ষুধার ধ্বংস, মন্বন্তরের কালিক যত সংহার, পরিতাপযোগ্য শিশুমৃত্যুর হার, জৈব-আর্থনীতিক ভারসাম্যের অনিশ্চয়তা প্রভৃতি। এসকল উপাদান মৃত্যুকে আরো পরিচিত করেছে। সৃষ্টি করেছে এমন সব আনুষ্ঠানিকতার যা মৃত্যুকে অন্তর্ভুক্ত ও গ্রহণযোগ্য করা এবং মৃত্যুর আগ্রাসনকে চিরকালীন অর্থ প্রদানের প্রয়াস চালায়। কিন্তু, কেন প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রথা এত দীর্ঘ সময় ধরে চালু ছিল, তা’ বিশ্লেষণ করতে হলে ঐতিহাসিক সঙ্কটমুহূর্তগুলো লক্ষ্য করা প্রয়োজন। একথা ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে ১৭৬০ সালের অধ্যাদেশ কোন কোন ক্ষেত্রে পুরনো আইনগ্রন্থগুলোর কঠোরতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। অথচ, এই অধ্যাদেশই ফরাসী বিপ্লবের সময় অবধি অপরাধ বিচারকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। পুসোর্ট, কমিশনারদের ভেতর যার দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন নথিপত্র প্রস্তুত করা, মূলতঃ রাজার ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করতেন। পুরনো আইনগ্রন্থের কঠোরতা বাড়ানোর জন্য তিনিই দায়ী ছিলেন, যদিও লামোইগনের মতো ম্যাজিস্ট্রেটরা এই কঠোরতা বাড়ানোর বিরোধী ছিলেন। ধ্রুপদী যুগে সম্রাট-বিরোধী বিক্ষোভের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, গৃহযুদ্ধের সময় বিক্ষোভ কমে আসা, সংসদ ভেঙে দিয়ে রাজার ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা ইত্যাদি সব কারণ মিলেই এত কঠোর একটি দণ্ড আইনের দীর্ঘকাল টিঁকে থাকার কারণ। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৪)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৩ জানুয়ারি ২০০৮ ২:৪৭ অপরাহ্ন

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ১ : নির্যাতন

দ্বিতীয় অধ্যায়: বধ্যমঞ্চের জমকালো প্রদর্শনী

প্রকৃতপক্ষে অপরাধীর শরীরে নির্যাতনের মাধ্যমে যে তদন্ত হতো, তাই শাস্তির প্রয়োগবিন্দু গঠন করতো। গঠন করতো জোর করে সত্য আদায়ের সঠিক স্থান। যেহেতু পূর্বানুমান ছিল তদন্তের একটি অবিভাজ্য উপকরণ এবং অপরাধের অংশ বিশেষ, সেহেতু মামলার তদন্তকালীন নির্যাতনে অপরাধীকে যে নিয়ন্ত্রিত মাত্রার ব্যথা দেওয়া হতো, তা’ ছিল একই সাথে শাস্তি প্রয়োগ এবং তদন্তের একটি মাধ্যম।

এখন, বেশ কৌতূহলোদ্দীপকভাবেই, অপরাধীর শরীরের মাধ্যমে শাস্তি ও তদন্ত–এই দুই আনুষ্ঠানিকতার সংমিশ্রণ অব্যাহত থাকতো। সাক্ষ্য জোরদার হলে মামলার সাজা প্রদান করা হতো।
inquisition.jpg………
স্প্যানিশ ইনকুইজিশন
……….
দণ্ডের প্রকৃত প্রয়োগ সম্ভবপর হতো এভাবেই। এবং, প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অনুষ্ঠানে অভিযুক্তের দেহ আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গণ্য হতো। অপরাধী ব্যক্তির কাজ ছিল প্রকাশ্যে নিজের নিন্দা বয়ে বেড়ানো। তার কাজ ছিল স্বকৃত অপরাধের সত্য প্রকাশ্যে বহন করা। জনতার প্রকাশ্য মিছিলে প্রদর্শিত তার শরীর মামলার আলো-আঁধারিতে ঢাকা প্রক্রিয়াকে জনতার কাছে সহজবোধ্য করে তোলার সহায় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ব্যবহৃত হতো তার উপর প্রণীত শাস্তিদণ্ডকে সবার কাছে স্পষ্ট করে তুলবার কাজেও। আঠারো শতকে শাস্তির প্রকাশ্য প্রয়োগের মাধ্যমে সত্যের এই প্রত্যক্ষ ও চমক লাগানো প্রকাশের কিছু দিক ছিল।

১. এর মাধ্যমে অপরাধী ব্যক্তি নিজেই নিজের নিন্দার বার্তাবাহক হতো। এক অর্থে বলতে গেলে তাকে আত্ম-নিন্দা ঘোষণা করার কাজ দেওয়া হতো যার মাধ্যমে স্বকৃত অপরাধের সত্যতাকে প্রত্যয়ন করা হতো। রাস্তায় জনতার মিছিলের ভেতর দিয়ে যাবার সময়, তার (অভিযুক্তের) পিঠে, বুকে বা মাথায় বেঁধে দেওয়া ব্যানার যা তাকে দেওয়া দণ্ডাজ্ঞা মনে করিয়ে দিতো। বিভিন্ন রাস্তার সংযোগস্থলে থামার সময় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ঘোষিত দণ্ড পাঠ করা হতো, গির্জার দরজায় এ্যামেণ্ডে অনারেবল সম্পন্ন হতো, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি চারপাশের ভাবগম্ভীর পরিবেশের ভেতর নিজের অপরাধ স্বীকার করতো। ‘নগ্নপদ, একটি শার্ট পরনে, হাতে একটি মশাল, হাঁটু গেঁড়ে বসে অপরাধীকে বলতে হতো, ঘোষণা করতে হতো যে মন্দভাবে, ভয়ঙ্করভাবে, প্রতারকের মতো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ সে করেছে।’ (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com