রোজনামচা

এক মৃত মুক্তিযোদ্ধার দিনপঞ্জির পাতা থেকে…

অদিতি ফাল্গুনী | ১৬ december ২০১১ ১০:১৬ পূর্বাহ্ন


মুক্তিবাহিনী ট্রেনিং, ১৯৭১; ছবি. উইকিপিডিয়া

গল্পের লোভে মাঝে মাঝেই আমি এদিক ওদিক ঘুরি। নানা মানুষের সাথে মেশার চেষ্টা করি। মূলতঃ এই গল্প খোঁজার লোভ থেকেই ঢাকার মোহাম্মদপুর কলেজ গেট সংলগ্ন ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’-এ গত বছর দশেক ধরে আমার ঘোরাঘুরি। কখনো টানা ঘোরা, আবার কখনো লম্বা সময়ের বিরতিতে যাওয়া। শুধু বিশ্রামাগার নয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের বারান্দা বা করিডোরেও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা হয়েছে প্রচুর। ২০০০ সালে ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’-এ হুইল চেয়ার বন্দি বীরপ্রতীক মোদাস্বার হোসেন মধুর সাথে আমার পরিচয়। কথায় কথায় দেখলাম স্কুল-কলেজের সার্টিফিকেটের হিসেবে এই ‘স্বল্পশিক্ষিত’ মানুষটির স্বচ্ছ রাজনৈতিক চিন্তার বিন্যাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি একদিকে যেমন রয়েছে তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা, তেমনি রয়েছে ক্ষোভ। কিম্বা, বঙ্গবন্ধুর চেয়েও ‘মুজিব বাহিনী’র কেষ্ট-বিষ্টুদের প্রতিই এই ক্ষোভটা যেন বেশি। মধু, যিনি একাত্তরের যুদ্ধে প্রাক-পঁচিশেই সারাজীবনের মতো চলৎশক্তি হারিয়েছেন, তিনি একদিন আমার হাতে তুলে দিলেন একটি সাদা কাগজের সেলাই করা খাতায় বেশ কিছু পাতা লেখা। মধুর চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধের পরবর্তী কয়েক বছরের ইতিহাস।
—————————————————————–
“হঠাৎ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বলে উঠলেন, ‘এ্যাটেনশন প্লিজ!’ সকলের দৃষ্টি ও কান চলে যায় রাষ্ট্রপতির দিকে। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আপনারা মন দিয়ে শুনুন। আমি শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করব। কমিটিতে পুঁজির দরকার।… প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান সর্বপ্রথম যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটিতে তাঁর এক মাসের বেতন দান করেন।… ক্ষোভে-দুঃখে তখন শুধু পাশে বসা বন্ধু নূরুল আমিনের হাতটা চেপে ধরে শরীরের রাগ মেটালাম। রাজাকারের প্রথম সাহায্যে গঠিত হল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটি।” / মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীক
—————————————————————-
ফটোকপি করলাম। প্রচুর বানান ভুল। কাঁচা হাতের অক্ষর। তবু, মুক্তিযুদ্ধের অনেক না-বলা কথা আছে তাঁর এই লেখায়। তারপর… তারপর মধ্যবিত্ত জীবনের দৌড়, কর্মব্যস্ততা ও মধুকে আমার ভুলে যাওয়া! মধুর ঐ লেখা আমার কাছে ফাইলবন্দিই হয়ে রইলো। প্রায় বছর দশেক পরে গত বছরের শুরুতে আবার যখন ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগ বিশ্রামাগার’-এ গেলাম, মধুর সহযোদ্ধারা জানালেন মধু মারা গেছেন (এর ভেতর আরো দু/তিন বার গেছিলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে, সেই সময়গুলোয় প্রতিবারই গিয়ে শুনেছি যে মধু ক’দিনের জন্য দেশের বাড়ি গেছেন)। মধুর স্ত্রী ছিল জানতাম। তার ছেলে-মেয়ে ক’জন জিজ্ঞাসা করতে গেলে অপর এক হুইল-চেয়ারবন্দি সহযোদ্ধা খুব নির্বিকার ভাবে জানালেন, ‘বিয়া তো করিছিল শেষের দিকি দেশের বাড়ির ঘর দেখা-শুনা করতি আর নিজির কিছু সেবা-যত্নির জন্যি। মাঝে মাঝে দেশের বাড়ি গেলি পর সেবা করার লোক লাগে না? ছেলে-মেয়ে হবি কীভাবে? যুদ্ধে ওর পায়ের মতো পেনিসও উড়ি গিছিল!’ চমকে উঠলাম। মধুর এই কয়েক পাতার অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সাথে মরিয়া হয়ে দেখা করা কিছু তরুণ মুক্তিযোদ্ধার ভেতর জনৈক তরুণের হঠাৎই নিজের হাতে ট্রাউজার ও অন্তর্বাস খুলে হারিয়ে যাওয়া পৌরুষের জন্য হাহাকার করার বেদনার কথা লেখা আছে। বঙ্গবন্ধু তখন দু’হাতে চোখ চাপা দিয়েছিলেন। মধুর হাতে লেখা দিনপঞ্জির পাতায় আবার চোখ বুলাই। হ্যাঁ, যুদ্ধে যে ‘পুরুষত্ব’ হারিয়েছেন সেকথা তিনি নিজেও লিখেছেন। (সম্পূর্ণ…)

মোহামেদ চউক্‌রির ডায়েরি

তানজিয়েরে জঁ জনে (কিস্তি ৪)

হোসেন মোফাজ্জল | ৩ জানুয়ারি ২০০৯ ৪:৫০ অপরাহ্ন

কিস্তি ১কিস্তি ২কিস্তি ৩

genet_book2.jpg ফরাসি ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিস্ট জঁ জনের মরক্কো বাসের সময় সেদেশের লেখক মোহামেদ চউক্‌রির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। জঁ জনে ইন তানজিয়ের (Jean Genet in Tanger, ১৯৯৩) বইটি ডায়েরির আকারে লিখিত চউক্‌রির সে সব দিনের স্মৃতিকথা। এখানে চউক্‌রি জনেকে দেখেছেন অনেক কাছ থেকে।

৮০ পৃষ্ঠার বইটি মোট ৪ কিস্তিতে প্রকাশিত হলো। এটি লেখার শেষ কিস্তি। পল ফ্রেডরিক বৌলস্-এর ইংরেজি থেকে লেখাটি অনুবাদ করা হয়েছে। বি. স.

কিস্তি ৪

অনুবাদ: হোসেন মোফাজ্জল

(গত কিস্তির পর)
paul-bowles4.jpg
১৯৬১ সালে মরক্কোতে পল বৌলস্‌।

২২/১০/৬৯
লাপাসেদের সাথে দেখা করি। জনে তার দুপুরের সিয়েস্তা দিতে চলে গেছে। আমরা মারিয়ার রেস্টুরেন্টে আসি। লাপাসেদ আমাকে বলেন: আমার কাছে মনে হচ্ছে জনে ফুরিয়ে গেছেন। কোথায় অ্যাডভাঞ্চেরার জনে, কোথায় বারসেলোনা, তিউনিশিয়া আর গ্রীসের জনে?

আমারও মনে হয় লাপাসেদ সঠিক। জনে তার অতীতের যৎসামান্যই বলেছে। যখনই আমি তাকে তার কোনো বই নিয়ে কথা তুলেছি, তিনি উত্তর দিয়েছেন: তাই, আমি তো ওটা বছর খানিক আগে লিখেছিলাম। এক দুপুর বেলায় আমি তাকে জিজ্ঞেস করি: আজ আপনাকে তেমন ভাল দেখাচ্ছে না। তিনি আমার দিকে মরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে বলেন: তুমি ঠিকই ধরেছো। আজ আমি খুবই বিষণ্ন।

পরে ফ্রান্স বারে বসে জনে আমাকে ফিসফিস করে জানতে যায় ওয়াকরিম, যে আমাদের সাথেই টেবিলে বসে ছিল তাকে উদ্দেশ্য করে, সে আমার কাছে কোনো প্রাপ্তি আশা করে কি?

আমি প্রশ্নটা ওয়াকরিমের কাছেই উত্থাপন করি।

না, মঁসিয়ে জনে, সে বলে। তারপর সে আরবিতে চালিয়ে যায়। আমরা বন্ধুমানুষ। কিন্তু আপনি হয়তো আমাকে অন্যভাবে সাহায্য করতে পারেন। এমন কিছু যার প্রতি আমার আগ্রহ আছে।

portraits-of-famous-people.jpg
পিটার অরলোভস্কি, উইলিয়াম বারোজ, অ্যালেন গিনসবার্গ, অ্যালান আনসেন, গ্রেগরি করসো, পল বৌলস, আয়ান সামারভিল। ১৯৬১ তে বিখ্যাত সব লেখক জড়ো হয়েছিলেন তানজিয়েরে।

জনে তাকে বলে তোমাকে আমি যে কোনো উপায়ে সাহায্য করতে তৈরি আছি।

আমি যা চাই, ওয়াকরিম বলে, তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কারুর কাছে লেখা একটা পত্র যে কি না আমাকে সেখানকার কোনো নাচের স্কুলে ঢুকিয়ে দিতে পারবে। (সম্পূর্ণ…)

মোহামেদ চউক্‌রির ডায়েরি

তানজিয়েরে জঁ জনে (কিস্তি ৩)

হোসেন মোফাজ্জল | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ১১:৪৯ অপরাহ্ন

কিস্তি ১কিস্তি ২

genet_brown.jpg
অ্যালান ব্রাউনের আঁকা জঁ জনে

কিস্তি ৩

অনুবাদ: হোসেন মোফাজ্জল

(গত কিস্তির পর)

১৭/১০/৬৯

দ্য প্লেগ (Le Peste) সঙ্গে ছিল, পড়ার প্রায় শেষের দিকে। ক্যাফে প্যারিসের চত্বরে যেয়ে আমরা বসি।

তুমি দেখি এখনও প্লেগ পড়ছো? জনে জানতে চান।

এক্কেবারে শেষের দিকে চলে এসেছি।

আর আমার ব্যালকনি (Balcon) ওটা কি পড়েছো?

না এখনও হয়ে উঠেনি।

না ক্যান?

মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করছি, যাতে আমি আরেকটা কপি কিনতে পারি।

কীসের জন্যে?

কারণ আমার কপিটাতে কিছু লেখা হয়েছে, মানে আপনি আমার জন্যে বইটাতে সই করে দিয়েছেন।

এর সাথে তার সম্পর্ক কী?

আমি তাকে বলি দেখেন আমি তো ক্যাফেতেই পড়ি, আমার ভয় হয় এমন কিছু হয়তো ঘটেও যেতে পারে যদি বইটা আমার সঙ্গে রাখি! আমি বলি আসলে বইটা আমি একটা স্যূভেনির হিসেবে রেখেছি।

তিনি আমার কাছে এসে দ্য প্লেগ বইটা কেঁড়ে নিয়ে তার প্রথম পাতাটা ছিঁড়ে ফেলেন।

এমনটা আমার বইটাতে যেয়ে করো। যে পাতাটাতে উৎকীর্ণ লেখা অছে সেই পাতাটা এইভাবে ছিঁড়ে ফেলো। নাটকটা পড়ো এবং পরে পাতাটা লাগিয়ে নিয়ো। এটা নিশ্চিত সিগনেচার হারানোর ভয়ে শেলফে বই ফেলে রাখার থেকে বইটা পড়া মেলা ভাল। (সম্পূর্ণ…)

মোহামেদ চউক্‌রির ডায়েরি

তানজিয়েরে জঁ জনে (কিস্তি ২)

হোসেন মোফাজ্জল | ৯ আগস্ট ২০০৮ ৬:২৬ অপরাহ্ন

কিস্তি ১

central-mosque.jpg
তানজিয়েরের কেন্দ্রীয় মসজিদের মিনার

কিস্তি ২

অনুবাদ: হোসেন মোফাজ্জল

(গত কিস্তির পর)

২৯/০৯/৬৯ – পি. এম

হোটেলে ঢোকার মুখে জনেকে পেয়ে যাই। যেতে যেতে তাঁকে বলি, জানেন গেল বছর এরা আমাকে এখানে ঢুকতে দেয়নি। এমন কি এখানে উঠেছিল এমন এক ইংরেজ বন্ধুর নিমন্ত্রণের কথা বলাতেও না।

jg-mc.jpg
জঁ জনে ও মোহামেদ চউক্‌রি

কেন? জানতে চান জনে।

হয়তো আমি তেমন ভাল কাপড়চোপরে ছিলাম না।

আমিও তাই ভেবেছিলাম। এর বদলে তুমি কি অন্য কোথাও যেতে চাও?

না, বরং বলতে পারেন আমার ভালো লাগবে, আপনার সাথে আমি এমন এক জায়গায় এসেছি যেখানে আমাকে এরা এক সময় ঢুকতে বাঁধা দিয়েছিল। (সম্পূর্ণ…)

মোহামেদ চউক্‌রির ডায়েরি

তানজিয়েরে জঁ জনে

হোসেন মোফাজ্জল | ৭ জুলাই ২০০৮ ১:২৬ পূর্বাহ্ন

t06.jpg
মেইন স্কয়ার, তানজিয়ের, মরক্কো

genet_book.jpg ফরাসি ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিস্ট জঁ জনের মরক্কো বাসের সময় সেদেশের লেখক মোহামেদ চউক্‌রির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। জঁ জনে ইন তানজিয়ের (Jean Genet in Tanger, ১৯৯৩) বইটি ডায়েরির আকারে লিখিত চউক্‌রির সে সব দিনের স্মৃতিকথা। এখানে চউক্‌রি জনেকে দেখেছেন অনেক কাছ থেকে।

৮০ পৃষ্ঠার বইটি কয়েক কিস্তিতে আর্টস-এ প্রকাশিত হবে। অনুবাদকের ভূমিকার পরে ডায়েরির প্রারম্ভিকা হিসাবে ফ্রান্সের লো মোঁদ পত্রিকার ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত চউক্‌রির পরিচিতিটুকু যুক্ত হলো। পল ফ্রেডরিক বৌলস্-এর ইংরেজি থেকে লেখাটি অনুবাদ করা হয়েছে। বি. স.

১.

অনুবাদকের ভূমিকা

ফরাসী সাহিত্যের প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং পরবর্তীতে পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিস্ট জঁ জনে ছিলেন ঘরপালানো ছন্নছাড়া কিশোর। পনের বছর বয়সে তাকে পেনাল কলোনিতে পাঠানো হয় দুরন্তপনার কারণে। জেলে বসে জনে লেখেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস দ্য মিরাকল অব দ্য jean-genet-alberto-giacomet.jpg……
আলবের্তো জিয়াকোমিত্তির ছবি: ব্যালকনিতে জঁ জনে
……..
রোজ। ফরাসী সামরিক বাহিনী থেকে তাকে বের করে দেয়া হয় সমকামিতার দোষে। পরে অনেক দিন ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর দিন কেটেছে ছেঁচড়া চুরি করে আর বেশ্যার দালালদের সাথে মিশে। এ অবস্থা নিয়ে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস দ্য থিফ্স জার্নাল। এরপর লেখেন আওয়ার লেডি অব ফ্লাওয়ার্স(সম্পূর্ণ…)

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭ (চতুর্থ কিস্তি)

সলিমুল্লাহ খান | ২১ জানুয়ারি ২০০৮ ১১:৩১ অপরাহ্ন

কিস্তি

(চতুর্থ কিস্তি)

rennell.jpg
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তর্জমা: সলিমুল্লাহ খান

(গত সংখ্যার পর)

৩রা হইতে ৮ই জুলাই পর্যন্ত বেশির ভাগ সময়ই বৃষ্টি হইল, পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব দিক হইতে ঝড়ো হাওয়া বহিল। বাহিরে যাইবার পথ বন্ধ হওয়ায় আমি নদীনালার মানচিত্র নকল করিতে আর গভর্নর সমীপে পাঠাইতে শুরু করিলাম আর ৭ তারিখ রাত্রি নাগাদ কাজ শেষ করিলাম [compleated them] আর পরদিন সকালবেলা যে দুইজন হরকরা দুইটি পত্র লইয়া আসিয়াছিল তাহাদিগের হাতে মানচিত্রগুলি পাঠাইলাম।

৫ তারিখে, পাটনামুখি একখানি ৪০০০ মণি নৌকা পাশ দিয়া চলিয়া গেল। ইহা মাত্র ৪ ৩/৪ হাত পানি কাটিল।

৮ তারিখে জরিপে হাত দিলাম। আজ ঘন ঘন কয়েক পশলা বৃষ্টি হইল। আমার আন্দাজ হয় ৬ হাত মতো পানি বাড়িয়াছে। আজ অপরাহ্ণে একটা উঁচা মন্দির (Pagoda) দেখিলাম, ইহা দক্ষিণ পূর্ব দিকে ২ কি ৩ মাইল দূরে হইবে। ইহা মথুরাপুর (Motrapur) গ্রামের অদূরে।

৯ তারিখ সকাল বেলা দক্ষিণ পশ্চিম দিক হইতে ঝড়ো হাওয়া ছিল। পূর্বাহ্নে একই দিক হইতে তাজা হাওয়া বহিতেছিল; অপরাহ্ণে বিরতিহীন বৃষ্টি। আজ অনুমান করি ৭ হাত পানি বাড়িয়াছে। নদীগুলি বড় আকাবাঁকা, দেশগ্রাম খোলামেলা আর চক্ষু জুড়ায়।

১০ তারিখ ঝড়ঝঞ্ঝাময় আর বৃষ্টি হইল। মথুরাপুরের মন্দির পার হইলাম। মন্দিরটি খালের পুবপাড়ে। এই মন্দিরের দুই মাইল ভাঁটিতে একটি বড় খাল বাঁদিকে মোড় লইল। এই খালটি এখন এই ঋতুতে বড় বড় নৌকা চলাচলের উপযোগী কিন্তু শুকনা মৌসুমে কোন কোন স্থান একদম শুকাইয়া যায়। (সম্পূর্ণ…)

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭

সলিমুল্লাহ খান | ২০ december ২০০৭ ১১:২২ অপরাহ্ন

কিস্তি

(তেসরা কিস্তি)

৩য় কিস্তির ভূমিকা

rennell………
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)
……….

জেমস রেনেল: আরোর আরো

মেজর জেমস রেনেল খ্রিস্টিয় ১৭৭৬ সালে সরকারি চাকুরি হইতে অবসর গ্রহণ করিলেন। ইহার শুদ্ধ কিছুদিন আগে ‘বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার’ নামক পল্টনে মেজর পদে তাঁহার উন্নতি হইয়াছিল। তখন কলিকাতায় পূর্ব ভারত কোম্পানি নিয়োজিত গভর্নর জেনারেল পদে ওয়ারেন হেস্টিংস আসীন। জেমস রেনেলের নামে মাসিক ৫০/= টাকা পেনসন মঞ্জুর করিয়াছিলেন তিনি। এই কথা আমরা পহিলা কিস্তিতেই উল্লেখ করিয়াছি। ইহার পর দেশের ছেলে দেশেই ফিরিয়া গেলেন। দেশে ফিরিবার পর জেমস রেনেল লন্ডনেই বসবাস শুরু করেন। তাঁহার বাকি জীবন খুব একটা হ্রস্ব ছিল এমন কথা বলিব না। এই নাতিহ্রস্ব জীবন তিনি নানানদেশের ভূগোলবিদ্যা আর সাহিত্য চর্চা করিয়া কাটাইয়াছিলেন।

তাঁহার বড় কীর্তি বাঙ্গালাদেশের ভূচিত্রাবলী যাহাতে হিন্দুস্তানের ঐদিককার রণাঙ্গন আর বাণিজ্যাঙ্গনের মানচিত্র সন্নিবেশিত হইয়াছে বা Bengal Altas, containing Maps of the Theatre of War and Commerce on that side of Hindoostan প্রকাশিত হয় ১৭৭৯ সালে। ১৭৮১ সালে ইহার একটি দোসরা সংস্করণও ছাপা হয়। একই বৎসরে তিনি বিলাতের—রাজসভা বা Royal Society নামেই সমধিক পরিচিত—বিজ্ঞানসাধকমণ্ডলীর সদস্য বা ফেলো নির্বাচিত হইলেন।

ইহার পর তিনি ভারতবর্ষের একপ্রস্ত মোটামুটি নির্ভরযোগ্য মানচিত্র তৈয়ারে মনোনিবেশ করিলেন। (সম্পূর্ণ…)

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭

সলিমুল্লাহ খান | ৬ december ২০০৭ ১১:৩৪ অপরাহ্ন

(দোসরা কিস্তি)


জেমস রেনেল বৃত্তান্ত : আরো

rennell………
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)
……….
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০) বিষয়ে আরো তথ্য চাহিয়া যাঁহারা লিখিতে বলিয়াছেন তাঁহাদের – বিশেষ বিধান রিবেরু মহাশয়ের – শুকরিয়া আদায় করিয়া তাঁহার কথা দ্বিতীয় কিস্তি লিখিতেছি। এই কিস্তির উৎসও প্রথম কিস্তির অনুরূপ। নতুন খবর ইহাতে তেমন বিশেষ নাই। (লা টুশ ১৯১০; উয়িকিপিডিয়া ২০০৭)

জেমস রেনেলের জন্ম ১৭৪২ সালের ৩রা ডিসেম্বর ধরিয়া লইলে ১৭৬৪ সালের গোড়ার দিকে তাঁহার বয়স হইতেছে সবে ২১ বছর কয়েক মাস। সেই বয়সেই তিনি বঙ্গদেশে আসিলেন। বঙ্গে তখন সবে ইংরেজাধিকার কায়েম হইয়াছে বটে, মোকাম হয় নাই পুরাদস্তুর – এই কথা আমরা পহিলা কিস্তিযোগেই উল্লেখ করিয়াছি। ততদিনে তাঁহার নৌ-বাহিনীর চাকুরিসহ জাগতিক বা হাতেকলমে অভিজ্ঞতা লাভ হইয়া গিয়াছে ৮ বছর। তাঁহার বাবা জন রেনেলও নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা আমরা আমলে লই নাই।

১৭৫৬ সালে তিনি প্রথম মহাব্রিটেনের রাজার নৌবাহিনীর ব্রিলিয়ান্ট (Brilliant) নামা জাহাজে নাবিকের (midshipman) চাকরি লইয়াছিলেন। সেই জাহাজেই তাঁহার পরিচয় হইয়াছিল সমান পদে চাকরিরত টোপাম নামা অন্য এক নাবিকের সঙ্গে। এই টোপাম সাহেবই বলিয়া কহিয়া কলিকাতার উইলিয়াম নামা দুর্গে শিক্ষানবিশ প্রকৌশলী বা এঞ্জিনিয়ার পদে তাঁহার চাকরি জুটাইয়া দিয়াছিলেন। (সম্পূর্ণ…)

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা ১৭৬৪-৬৭

সলিমুল্লাহ খান | ২২ নভেম্বর ২০০৭ ১১:৫০ অপরাহ্ন

james_rennel.jpg
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)

খ্রিষ্টিয় ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি বঙ্গদেশে ইংরেজ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যক্ষ ফল আজকের বাংলাদেশশুদ্ধ অখিল ভারতবর্ষের পরম দারিদ্র ও দুর্গতি। এই কথা মোটেও অতিশয় নয়। অখিল ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের অভিশাপ প্রায় দুই শত বৎসর বহন করিয়াও আমরা আজও
বুঝিতে পারিতেছি না এই উপনিবেশবাদ বা পরশাসন কী পরিমাণে আমাদের দেশের ক্ষতিসাধন করিয়াছিল।

আমাদিগের ইদানিন্তন শাসক ধনবান শ্রেণী ইহার কারণ জানিবার প্রয়াসও করে না। তাঁহারা পশ্চিমা সাম্রাজ্য শাসকদের সহিত গাঁটছড়া বাধিয়া এই দেশ চালাইতেছেন। ইংরেজ শাসনের পাপ এখন মার্কিন সাম্রাজ্যের তাপে চাপা পড়িতেছে।

দুইশত বর্ষব্যাপী ইংরেজি শাসনপাপের মধ্যে যে দুই চারিটি প্রায়শ্চিত্ত হইয়াছে মেজর জেমস রেনেলের রোজনামচা তাহাদের মধ্যে পড়ে বলিয়া বর্তমান লেখকের ধারণা। কথায় বলে শয়তানকেও তাঁহার প্রাপ্য দিতে হইবে। রেনেলের জরিপকর্ম বাবদ এই প্রাপ্য ইংরেজ ডাকাতদেরও দিতে হইবে।

জেমস রেনেল যে সময় বঙ্গদেশের নদনদী জরিপ কার্যে মন দেন তখন বাংলাদেশে ইংরেজি ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে কিন্তু ইংরেজ-দায়িত্ব প্রবর্তিত হয় নাই। দেশের অবস্থা তখন সম্পূর্ণ অরাজক। পূর্ব ভারত কোম্পানি খাজনা আদায় করিতেছে কিন্তু কোন শাসন ব্যবস্থাই প্রবর্তন করে নাই। কিছুদিন পর চালু হইবে দ্বৈত শাসন-ব্যবস্থা। এতদিন পর্যন্ত যাহা চলিতেছিল তাহা নামে নবাবের শাসন আর কাজে ইংরেজ কোম্পানির ক্ষমতা। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com