পুনর্মুদ্রণ

স্তম্ভিত ইতিহাস : নজরুল

শঙ্খ ঘোষ | ২৫ মে ২০১৬ ২:৪৫ অপরাহ্ন

nazrul-7.jpgনিজেকে ‘স্বেচ্ছাচারী’ বলে ঘোষণা করেছিলেন আমাদের কোন্ কবি? বাংলা কবিতা পড়তে যাঁরা অভ্যস্ত, এ-প্রশ্নের উত্তর দিতে তাঁদের কোনো দ্বিধা হবার কথা নয়, তাঁরা নিশ্চয় সঙ্গে সঙ্গেই মনে করতে পারবেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নাম, তাঁর ‘আমি স্বেচ্ছাচারী’ লাইনটি, বা বিভিন্ন কবিসভায় প্রায় শারীরিক উৎক্ষেপের মধ্যে এই লাইনটি নিয়ে তাঁর নানা ভঙ্গিমার উচ্চারণ। ঠিকই, শব্দটির সঙ্গে শক্তির নাম জড়িয়ে আছে অনেকদিন; কিন্তু তবু বলা যায় তাঁরও আগে বাংলা কবিতার আরো একজন মানুষ ওই একই পরিচয়ে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন নিজেকে, নিজের বিষয়ে বলেছিলেন ‘স্বেচ্ছাচারী উচ্ছৃঙ্খল বাঁধনহারা’।
উদ্ধৃতিচিহ্নের অন্তর্গত ওই শব্দগুলি অবশ্য কোনো কবিতার শব্দ নয়, এ হলো বাঁধনহারা নামে নজরুলের উপন্যাস থেকে নেওয়া এক শব্দগুচ্ছ। সেই উপন্যাসে, কাউকে না বলে ঘর ছেলে সেনাদলে পালিয়ে গেছে যে নায়ক, সেই ‘নূরু’ একবার তার চিঠি শেষ করেছিল এই আত্মপরিচয় দিয়ে : ‘স্বেচ্ছাচারী–নুরুল হুদা’। এক-এক চিঠিতে তার আত্মপরিচয় এক-একরকম। কখনো সে লেখে ‘তোমার কাঠখোট্টা লডুয়ে দোস্ত’, কখনো ‘হতভাগা’ কখনো-বা নরপিশাচ’। কিন্তু ‘স্বেচ্ছাচারী’ কথাটার দিকে লেখকের অতিরিক্ত ঝোঁক টের পাওয়া যায় যখন নূরুল প্রতি স্নেহশীলা এক ব্রাহ্ম মহিলা তাঁর ‘পাগল পথিক’ ওই ‘ভাই’য়ের কথা বলতে গিয়ে তাঁরও চিঠিতে লেখেন : ‘স্নেচ্ছাচারী’ উচ্ছৃঙ্খল বাঁধনহারা সে–অতএব এখন রক্তের তেজে আর গরমে সে কত আরো অসম্ভব সৃষ্টিছাড়া কথাই বলবে।’
উপন্যাসেরই কথা যদি এসব, তাহলে কেন লিখছি নজরুল নিজেকে বলতে চেয়েছিলেন ‘স্বেচ্ছাচারী’? এ তো তাঁর নিজের কথা নয়, এ তো তাঁর তৈরি এক চরিত্রের কথা মাত্র। (সম্পূর্ণ…)

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য:“উনি ইসলামকে এ্যাটাক করে, মোহাম্মদকে এ্যাটাক করে … লিখেছিলেন”

| ২২ আগস্ট ২০১৫ ১:৫৩ পূর্বাহ্ন

[১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন শঙ্করলাল ভট্টাচার্য। তখন আমি আর ব্রাত্য রাইসু বনানীর কোনো এক রেস্তোরাঁয় বসে তার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেটি পরে বর্তমানে বিলুপ্ত সাপ্তাহিক ‘শৈলী’ পত্রিকার বর্ষ ৪ সংখ্যা ১৩, ১৬ আগস্ট ১৯৯৮, ১ ভাদ্র ১৪০৫-এ প্রকাশিত হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটিকে বিলুপ্তির গুহা থেকে উদ্ধার করে দিয়েছেন সাহিত্যিক অাহমাদ মাযহার। সাক্ষাৎকারটির সঙ্গে সেসময় যে ভূমিকা ব্যবহৃত হয়েছিল সেটি অপরিবর্তিত রেখেই এখানে তা পুনর্মুদ্রণ করা হলো। — বি. স.]
picture-003.jpg
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের লেখার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা রীতিমত ঈর্ষাবোধ করেন এই লেখকের অতুলনীয় গদ্য এবং তার বিষয়বস্তুর চমৎকারিত্বে। ‘ শৈলী’তে ইতিপূর্বে প্রকাশিত তিনটি নিবন্ধ পড়ে তাঁর এই গদ্যের সঙ্গে ‘শৈলী’র পাঠকসমাজ পরিচিত। তাঁর কিছু দার্শনিক গদ্য পড়ে আমি বেশ উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। পরে ব্যক্তিগত সাক্ষাতে জানতে পারলাম দর্শন তাঁর পাঠ্যতালিকায় বিরাট জায়গা জুড়ে আছে। বছর খানেক আগে যখন তিনি ঢাকায় গাজীভবন-এর আমন্ত্রণে আসেন তখন তাঁর সঙ্গে আমার এবং ব্রাত্য রাইসুর আলাপ করার সুযোগ হয়। কিন্তু ঐ হুল্লোড়ে কথা বলতে অসুবিধা হওয়ায় পরের দিন উনি আমাদেরকে সময় দেন আড্ডার জন্য। আড্ডায় আমাদের সঙ্গে কবি মঈন চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাৎকারটি ঐ আড্ডারই লিখিত রূপ। শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের উল্লেখযোগ্য দুটি বই হচ্ছে-‘রাগ অনুরাগ’ এবং ‘দার্শনিকের মৃত্যূ ও অন্যান্য নিবন্ধ’। এছাড়াও ‘কলকাতার কালচার’, ‘পরমা প্যারিস’ তাঁর উল্লেখযোগ্য বই।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: রাজু আলাউদ্দিনব্রাত্য রাইসু


রাজু আলাউদ্দিন:
আচ্ছা শঙ্করদা, আমাদের নেয়া বিভিন্ন লোকের ইন্টারভিউগুলো সবটা দিতে পারলাম না। কোন কোনটা অর্থেক পাওয়া যাচ্ছে। বাকিটা হাতের কাছে পেলাম না। এই যে পুরোটা পাওয়া যাচ্ছে না–এ রকম কোন ফিলসফি আছে কিনা?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: হ্যাঁ! টেক্সট-এর চেহারাই তো তাই। কোন টেক্সটই তো কমপ্লিটলি রিভিলিং নয়। কমপ্লিট টেক্সট কিন্তু কমপ্লিট নয়। কোন টেক্সটাই কমপ্লিট নয়। এই খোদ বইটা কিন্তু খোদ বই নয়। কাজেই আপনি মানে করা শুরু করলে কিন্তু শব্দের চেহারা ধরা পড়ে। আপনি জানেন যে বাখতিন বলতেন যে ওয়র্ডস আর দ্য মেটেরিয়েল বডিস অব মিনিং, মানে শব্দ হল উর্থের উপাদানগত বা বস্তুগত চেহারা… এটা তো সারাক্ষণই চেহারা বদলাতে পারে, কারণ বস্তুর ধর্মই হচ্ছে চেহারা বদলানো। কাজেই এই ওয়র্ডটাকে আপনি কিভাবে ব্যবহার করলেন, কী মনে করে ব্যবহার করলেন, ভুল ব্যবহার করলেন নাকি আদৌ অন্য কিছু ঢাকার জন্য ব্যবহার করলেন, কিংবা আদৌ ব্যবহার করতে পারলেন কিনা– এই সব মিলিয়ে এমন একটা জিনিস হয় যা অনেকটা হাওয়ার মত কিংবা রাগের মত। রাগের কতগুলো কাঠামো আছে, বাঁধা স্বরলিপি আছে। রবিশঙ্কর একটা রাগ বাজাচ্ছেন, ধরা যাক বাগেশ্রী, আবার আলি আকবর খাঁ বাজাচ্ছেন, বিসমিল্লাহ খাঁ বাজাচ্ছেন কিংবা ধরুন আমির খাঁ সাহেব গাইছেন, বা ফৈয়াজ খাঁ সাহেব গাইছেন আগেরকার দিনের করিম খাঁ সাহেব গাইছেন– একই রাগের চেহারা কিন্তু বদলে যাচ্ছে। বদলে যাওয়ার কারণ হচ্ছে ঐ একই স্বরলিপির বাঁধুনি থেকে কে কত রকম ধুন বা হাওয়া বের করছে। কত রকমের ধুন তৈরি হচ্ছে, হাওয়া তৈরি হচ্ছে। মানে করবো বলে মানে করা, সত্যি মানে বলে আলাদা কিছু নেই। আপনি আমাকে ভালো মানুষ মনে করেন বলে ভালো মানুষ, আপনি আমাকে খারাপ মনে করলে খারাপ হয়ে গেলাম। তার কারণ হচ্ছে মনে করাটা যখন এতখানি ইমপর্টেন্ট….. (সম্পূর্ণ…)

দিলীপ পালের লেখা: বাংলাদেশে সংষ্কৃতি-চর্চা, নববর্ষ ও মৌলবাদ

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস | ১৭ এপ্রিল ২০১৪ ২:৩৮ অপরাহ্ন

এদেশেরই মানুষ ছিলেন তিনি। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় শৈশব ও কৈশোর কাটিয়ে ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে আই-এ পাশ করেন। এরপর কিসে কি হলো তিনি পাড়ি জমালেন কোলকাতা। সেখান থেকে শান্তিনিকেতনে। বাবা মা ভাই বোন সবাই রয়ে গেলেন ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায়; কেবল দিলীপ পাল ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেই গিয়ে হাজির হলেন রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে–একা। সেখানে পড়লেন রসায়ণ। সেখানে স্নাতকোত্তর পাশ না করা পর্যন্ত চুটিয়ে যাপন করলেন ছাত্র জীবন। আবার, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিভিন্ন সভা সমাবেশ করে চাঁদা তুলে নানাভাবে সাহায্যও করলেন। (সম্পূর্ণ…)

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই “

সলিমুল্লাহ খান | ১২ december ২০১৩ ৮:২৭ অপরাহ্ন

মহাত্মা আহমদ ছফার এই সাক্ষাতকারটি প্রকাশিত হইয়াছিল বাংলা ১৩৯৯ সালের ২৩ শ্রাবণ তারিখে ‘বাংলাবাজার পত্রিকা’ নামক একটি দৈনিকে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করিয়াছিলেন যে দুই সাংবাদিক–রাজু আলাউদ্দিন ও জুলফিকার হায়দার–আমরা তাঁহাদের ঋণ স্বীকার করিয়া ইহা ছাপাইতেছি। ‘সর্বজন’ পত্রিকার জন্য ইহা সংগ্রহ করিয়াছেন সৈয়দ মনজুর মোরশেদ। (সম্পূর্ণ…)

আহমদ ছফা: সুবিধাবাদ ও হীনমন্যতার রাজনীতির বিরুদ্ধে ‘জনসমাজ’ গড়ার আহবান

সলিমুল্লাহ খান | ২ december ২০১৩ ৭:৫০ অপরাহ্ন

মহাত্মা আহমদ ছফা ১৯৯০ সালের দশকে দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায় কিছুদিন নিয়মিত নিবন্ধ লিখিতেন। তাহার কিছু কিছু এখনও পুস্তকাকারে প্রকাশ পায় নাই। নিচের নিবন্ধটি এই দলে পড়িবে।

আমাদের হাতেধরা এই নিবন্ধটির প্রথম প্রকাশ বাংলা ১৪০৩ সালের ৭ জ্যৈষ্ঠ অর্থাৎ ইংরেজি ১৯৯৬ সালের ২১ মে তারিখে। তখন দেশের শাসনভার ‘তত্ত্বাবধায়ক’ নামে অভিহিত একটি অন্তবর্তীকালীন সরকারের হাতে ন্যস্ত। ১৯৯৪ সালের পর হইতে দেশে বিরাজমান এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পটভূমিতে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হইয়াছিল। (সম্পূর্ণ…)

রশীদ করীম-এর প্রবন্ধ

সাহিত্যে সেন্টিমেন্টালিজম

| ২৮ নভেম্বর ২০১১ ৩:৫৬ অপরাহ্ন


লেখক যখন পাঠক, কিংবা অপর একজন লেখকের অভিমত প্রার্থী হন, তখন অভিমতের আনুকূল্যই প্রত্যাশা করেন—বিরূপ-মত নয়। অর্থাৎ উক্তি বলতে তাঁরা সদুক্তিই বোঝেন, কটূক্তির অবকাশ অস্বীকার করেন। তাই যখন সমালোচক লেখককে বাধিত করতে পারেন না, তখন লেখক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। লেখকের এই উষ্মা যদি বা স্বাভাবিক হয়, কিন্তু কদাপি শোভন বা সঙ্গত নয়।

কোন কোন লেখক সমালোচনা শুনে এতই বিচলিত হয়ে পড়েন যে, তৎক্ষণাৎ তাঁর শব্দযন্ত্র বিভিন্ন আর বিচিত্র সঙ্কীর্তন শুরু করে দেয়। সমালোচকের মস্তক উদ্দেশ করে ইষ্টক হয়তো নিক্ষিপ্ত হয় না, কিন্তু যেসব সপ্রেম আশীর্বচন ঝরে পড়ে, বলা বাহুল্য, তা শিরোধার্য করবার মতো বস্তু নয়।
—————————————————————–

আবুল হোসেন ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একই বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলেই কি না জানি না, তাঁদের মধ্যে একটি ব্যাপারে আশ্চর্য মিল দেখা যায়। উভয়েই সেন্টিমেন্টালিজমের রেলগাড়িতে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন, কিন্তু একটু পর প্রথম স্টেশনেই, রেলগাড়ির কামরা থেকে পা বাড়িয়ে, সাহিত্য বিচারের প্লাটফর্মের উপর নেমে এলেন।

—————————————————————–
ভরসার কথা কেবল এই যে বাক্যবাণে অস্থি বিধ্বস্ত বা চূর্ণ হয় না, বিশেষ করে, যে বাক্যের মর্মে যুক্তি নেই তা কখনই লক্ষ্যভেদ করতে পারে না। হাঁসের গায়ের পানির মতোই তা ঝেড়ে ফেলা সম্ভব।

কোন সাহিত্য সৃষ্টিকে সকলেই একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবেন, এমন কোন কথা নেই। দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন এমন কি বিপরীত হলেও, দুটির একটি ঠিক এবং অপরটি ঠিক নয়, যুক্তিশাস্ত্রের এ বিধান সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে গ্রাহ্য নয়। বস্তুত দুটি ভঙ্গিই সমান সত্য বা সমান অসত্য হতে পারে। কারণ সাহিত্য অতি বর্ণাঢ্য ও বহু ব্যঞ্জনাময় এক বস্তু।
—————————————————————–


কোমলতা, অন্তর্মুখিতা আর চিন্ময়তা যদি বাংলা সহিত্যের বৈশিষ্ট্য হয়; তাহলে সেই দিক দিয়ে ইংরাজি সাহিত্যও বাংলার দোসর। এবং অন্তত আমার মতে সে কারণে ইংরাজি বা বাংলা কোন সাহিত্যই দুষ্ট হয়নি, বরঞ্চ সমৃদ্ধ হয়েছে।

—————————————————————–
আবুল হোসেন ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একই বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলেই কি না জানি না, তাঁদের মধ্যে একটি ব্যাপারে আশ্চর্য মিল দেখা যায়। উভয়েই সেন্টিমেন্টালিজমের রেলগাড়িতে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন, কিন্তু একটু পর প্রথম স্টেশনেই, রেলগাড়ির কামরা থেকে পা বাড়িয়ে, সাহিত্য বিচারের প্লাটফর্মের উপর নেমে এলেন। সেন্টিমেন্টালিজম সম্বন্ধে এঁদের ধারণাও আমার কাছে শাস্ত্রসম্মত মনে হয় নি। তাই সেন্টিমেন্টালিজম-এর দৃষ্টান্ত হিসেবে তাঁরা যে সব উদ্ধৃতি উপস্থিত করেছেন সাহিত্য হিসাবে সেগুলোর উৎকর্ষে ইতর বিশেষ আছে বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো অন্তত সেন্টিমেন্টালিজম-এর নজির নয়। (সম্পূর্ণ…)

বেশরা ফকির লালন সাঁইকে নিয়ে ভদ্দরলোকদের সূক্ষ্ম প্রেমের মর্ম বোঝা ভার!!

আ-আল মামুন | ২ অক্টোবর ২০১১ ৪:৫১ অপরাহ্ন

Nations, like narratives, lose their origins in the myths of time and only fully realize their horizons in the mind’s eye. – Homi K. Bhaba []

গৌতম ঘোষের মনের মানুষ (২০১০) সিনেমা নিয়ে আলাপ তুলবার আগে এর শানে নুযুল একটু বিশদ করা প্রয়োজন। সিনেমাটি তৈরি হয়েছে কলকাতার যশবান কবি-ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মনের মানুষ উপন্যাস অবলম্বনে। উপন্যাসটির ভিতর ফ্ল্যাপে কাহিনী-সংক্ষেপ ছাপা হয়েছে এভাবে:

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘মনের মানুষ’-এর প্রধান চরিত্র লালন ফকির। কবিরাজ কৃষ্ণপ্রসন্ন সেনের ঘোড়া চুরি করে রাতে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগত লালুর। দুঃখিনী মা তাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েও সংসারী করতে পারেননি। রুজি-রোজগারে লালুর মন নেই, বরং গানের ব্যাপারে তার কিছু আগ্রহ আছে। বাউন্ডুলে স্বভাবের লালুর জীবনে বিপর্যয় এল হঠাৎ। কবিরাজ পরিবারের সঙ্গে বহরমপুরে গঙ্গাস্নানে গিয়েছিল সে। পথে আক্রান্ত হয় ভয়ঙ্কর বসন্ত রোগে। তাকে মৃত ভেবে জলে ভাসিয়ে দেয় সঙ্গীরা। মরেনি লালু। রাবেয়ার পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে সে একদিন ঘরেও ফেরে। কিন্তু মুসলিম-সংস্পর্শে তার যে জাত গেছে! তাকে মেনে নেয় না তার মা, বউ। অগত্যা সমাজ থেকে বিতাড়িত যুবকের নতুন জীবন শুরু হয় জঙ্গলে। নতুন নাম হয় লালন। অভিজ্ঞতা আর বেদনা লালনের অন্তরে জন্ম দেয় শত শত গান, যে গান বলে- ‘ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান/নারী লোকের কী হয় বিধান/বামন চিনি পৈতে প্রমাণ/বামনী চিনি কীসে রে…’। লালন বাঙালির প্রাণের ধন, পথে পথে যিনি আজীবন খুঁজেছেন ‘মানুষ-রতন’। [নজরটান আমার]

poster.jpg
মনের মানুষ সিনেমার পোস্টার

লেখকের বক্তব্যে সুনীল বলে দিয়েছেন: ‘‘এই উপন্যাসটি লালন ফকিরের প্রকৃত ঐতিহাসিক তথ্যভিত্তিক জীবনকাহিনি হিসেবে একেবারেই গণ্য করা যাবে না। কারণ তাঁর জীবনের ইতিহাস ও তথ্য খুব সামান্যই পাওয়া যায়।’’[] তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে লালনের নামে প্রচলিত নানা কাহিনীর মতো এটাও যে-কোনো একটা কাহিনী; এবং ঐতিহাসিক তথ্যর ‘সত্যতা’ কোন মানদণ্ডে নির্ধারিত হয় তার ফয়সালা আপাতত তুলে রাখতে পারি। যদিও, পরের বাক্যে তিনি একটা দোহাই পেরেছেন যে এর কারণ হলো: ‘‘লালনের জীবনের ইতিহাস ও তথ্য খুব সামান্যই পাওয়া যায়’’। আমরা যে কেউ একটু খোঁজ নিলেই জানতে পারবো, পুরো বাংলায় ‘গৌণধর্ম’গুলোর ভিতরে সাম্প্রতিক একশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও চর্চিত চরিত্র হলো ফকির লালন সাঁই। সুতরাং, চাইলে লালনের সাধকজীবনের ‘ঐতিহাসিক’ একটা কাহিনী লেখাও অসম্ভব হতো না। (সম্পূর্ণ…)

সুফিয়া কামালের স্মৃতিকথা

একালে আমাদের কাল

| ২০ জুন ২০১১ ১১:০০ অপরাহ্ন

7-web.jpg ………
একালে আমাদের কাল বইয়ের প্রচ্ছদ
………

[নিজের জীবনস্মৃতি নিয়ে সুফিয়া কামাল ‘একালে আমাদের কাল’ লেখেন। বই হিসেবে এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে, ‘জ্ঞান প্রকাশনী’ থেকে। ২০০২ সালে, সুফিয়া কামালের মৃত্যুর তিন বছর পরে এটি বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘সুফিয়া কামাল রচনাসংগ্রহ’-এ সংকলিত হয়।
সুফিয়া কামালের জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জন্ম ১৯১১ সালে, বঙ্গভঙ্গ রদ হবার বছরে। পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন ও সাহিত্যচর্চা বাদেও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছেন, কোলকাতায় দাঙ্গাপীড়িতের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেছেন, সদ্য জন্ম নেয়া পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন করেছেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন, প্রতিবাদ হিসেবে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জাহানারা ইমাম এবং সুফিয়া কামাল একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে গণআন্দোলন করেছেন।
সুফিয়া কামালের জীবনস্মৃতি তাই বাংলাদেশের ইতিহাসের কথা, নিছক কিছু ঐতিহাসিক তথ্য নয়, সাহিত্যিকের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির উন্মোচন। সুফিয়া কামালের একশতম জন্মদিনে তাঁর স্মৃতিকথা পুনঃপ্রকাশিত হলো।–বি.স.
]
————————–

একালে আমাদের কাল

কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গীতকার সিকান্‌দার আবু জাফর আমাকে অনুরোধ করেছেন সেকালের কথা কিছু কিছু লিখে যেতে। আমি যা লিখতে পারি লিখে যাব। কিন্তু সে লেখা যেন আত্মজীবনী বলে কেউ মনে না করেন। আত্মজীবনী মহাত্মা গান্ধীই সার্থকভাবে লিখেছেন। অন্য মানুষের তা অসাধ্য। আমি মাত্র সেকালে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, দেশীয় প্রচলিত বিধি-ব্যবস্থার যতটুকু জানতে পেরেছি তা-ই লিখে রাখবার চেষ্টা করব। জানিনা বর্তমানকালে সে লেখার মান কতটুকু হবে। (সম্পূর্ণ…)

জ্ঞানচৌতিশা: আনন্দ ও দুঃখ

মলয় রায়চৌধুরী | ১ এপ্রিল ২০১১ ১:০০ পূর্বাহ্ন

malay-rc.jpg
মলয় রায়চৌধুরী (জন্ম. ২৯/১০/১৯৩৯)

এক
জ্ঞানচৌতিশা শব্দটির উদ্ভাবক ষোলো শতকের ভাবুক মীর সৈয়দ সুলতান। হয়তো তিনি উদ্ভাবক নন, তাঁর সময়ে শব্দটির প্রচলন ছিল। তবে, তাঁর পুঁথিতে শব্দটি ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। শব্দটির চৌহদ্দিতে তিনি ফিলজফি, থটপ্রসেস, আইডিয়া, স্টেট অব মাইন্ড, প্রবলেম্যাটিক, ফেনমেনলজি, ইনটেলিজেন্স, এথিক্স, উইজডম, যুধিষ্ঠির-কথিত ধর্ম ইত্যাদির সমন্বয়ে গড়ে-ওঠা ব্যক্তি-মনের কথা বলেছেন। মীর সৈয়দ সুলতানের মতন প্রণম্য মানুষের সময়কে, ইংরেজদের নকল করে, কেন মধ্যযুগ বলা হয়েছিল, ওই
——————————————————
ইংরেজদের শিক্ষাজগত, যাকে ম্যাকলে বলেছিলেন খ্রিস্টধর্ম প্রচার ও প্রসার, মধ্যবিত্ত বাঙালি প্রতিস্বকে যেভাবে গড়তে লাগল, ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যে আমরা বাংলা কবিতায় পেলুম দুঃখ, কষ্ট, ব্যথা, বেদনা, যন্ত্রণার আধিক্য। উত্তরঔপনিবেশিক কালখণ্ডে দেশভাগে আগত উদবাস্তুদের রচনায় ব্যাপারটা এমন ছেয়ে গেল যে বাংলা সাহিত্য একেবার রিফিউজি সাহিত্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা থেকে মুক্তি ঘটায় হাংরি, শ্রুতি, নিমসাহিত্য, ধ্বংসকালীন আন্দোলনগুলো।
——————————————————
নকল করা ছাড়া, ব্যাখ্যা করা মুশকিল। বেশ কিছুকাল যাবৎ আমি আমার চিন্তা কী করে চিন্তা করে এই চিন্তার ভেতরে রয়েছি। মস্তিষ্কের এই প্রক্রিয়াটিকে জ্ঞানচৌতিশা অভিধাটি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। চৌতিশা শব্দটির তৎকালীন অর্থ সম্ভবত ছিল চিন্তার ছন্দ। ইংরেজরা যে ভাষাভাবনা আমাদের বিদ্যায়তনিক শিক্ষাজগতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, ছন্দ বলতেই আজকাল শব্দ ও বাক্যের কথা এসে পড়ে। মীর সৈয়দ সুলতানের কালখণ্ডে চিন্তার ছন্দ সম্ভব ছিল। আমাদের কালখণ্ডে চিন্তা যখন বিশৃঙ্খল দ্রুতিতে আক্রান্ত, আমার মনে হয় চিন্তার ছন্দ অসম্ভব। তবু আমি আমার আনন্দক্রিয়া আর দুঃখক্রিয়া নিয়ে চিন্তা করার চেষ্টা বজায় রেখেছি। কিছু একটা মনের মধ্যে ঘটলে সেটা নিয়ে ভেবে দেখার চেষ্টা করি।

দুই
anju_boby.jpg………
অঞ্জু ববি জর্জ (জন্ম. ১৯/৪/১৯৭৭)
………
কোট্টায়ামের চাঙ্গানাসেরি গ্রামের গৃহবধূ অঞ্জু ববি জর্জ প্যারির বিশ্ব চাম্পিয়নশিপে ৬.৭০ মিটার লাফিয়ে অ্যাথলেটিক্সে ভারতকে প্রথম পদক জেতালেন, তৃতীয় স্হান পেয়ে ব্রোঞ্জ মেডেল, যা মিলখা সিং আর পি টি উষাও পারেননি। খবরটা টিভিতে দেখে প্রচণ্ড আনন্দ হল। টিভি আমি একা দেখি, বালিশে ঠেসান দিয়ে, সেন্টার টেবিলের ওপর ঠ্যাং তুলে। হঠাৎ এরকম আনন্দ হল কেন? আমি তো অ্যাথলিট ছিলুম না। ফুটবল আর ক্রিকেট শেষ হয়ে গিয়েছিল স্কুল ছাড়ার সময়ে। শাদা জামা-ফুলপ্যান্ট করিয়ে দেবার মতন পারিবারিক স্ফূর্তি না থাকায়, কেবল ফালতু ক্রিকেট খেলতে হয়েছে স্কুলের সর্বজনীন ব্যাট হাতে, বিনা প্যাডে। ঘরেলু ক্রিকেটও খেলা হয়নি। রোগাপ্যাংলা ছিলুম বলে ফুটবলেও চোটজখম সয়ে বেশি সময় মাঠের কিনারে বসে থাকতে হয়েছে। খেলার বা খেলা সম্পর্কিত উৎসাহ বাবা-কাকা-জ্যাঠার কারোর ছিল না। তার মানে অঞ্জু ববি জর্জের পদকপ্রাপ্তিতে ৩০ আগস্ট ২০০৩ তারিখে আমার যে আনন্দ হয়েছিল, তার উৎস খেলাধুলা নয়। তাহলে কী? কেনই বা হল অমন আনন্দ? হঠাৎ? তা কি প্যাটরিয়টিজম?


ইউটিউবে অঞ্জু ববি জর্জ-এর দীর্ঘ লাফ, ২০০৩

কিন্তু অঞ্জু ববি জর্জের আগে যে-খবরটা দেখেছিলুম তা হল সংসদভবনে হামলার মূল পাণ্ডা গাজি বাবা নামক জৈশ-ই-মহম্মদের জনৈক জঙ্গির গুলি খেয়ে শ্রীনগরে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের হাতে মৃত্যু। সে খবর দেখে, যাক ল্যাটা চুকেছে, এরকম মনোভাব হয়েছিল। প্যাটরিয়টিজম তো গাজি বাবার নিকেশে চাগিয়ে ওঠার কথা । লোকটার আসল নাম গাজি বাবা নয়। যারা কাফের বা হিন্দুদের মারে তারা গাজি উপাধি পায়। জম্মু-কাশ্মীরে ট্যুরে যেতে হত অফিসের কাজে, তাই অভিজ্ঞতা থেকেও মনে হয়, যত তাড়াতাড়ি হয় ব্যাপারটা সেটল হোক। দাড়ির জন্যে আমাকে প্রায় সর্বত্র অফিসের দেয়া আইডেনটিটি কার্ড দেখাতে হত। আমি যে সত্যিই আমি তা প্রমাণ করার জন্যে। ওভাবে প্রমাণ দেবার জন্যে মনে হত তোমাদের তুলনায় আমি কম ভারতীয় নাকি? (সম্পূর্ণ…)

চিন্তার সংকট: সাহিত্যের স্বাধীনতা: মানুষের মুক্তি

প্রসঙ্গ হাসান আজিজুল হকের কার্তেসীয় পদ্ধতি এবং সাহিত্যে আত্মঘাতী বোমাবাজির প্রবণতা

সেলিম রেজা নিউটন | ২ december ২০১০ ৮:১৬ অপরাহ্ন

hassan_aziz.jpg
হাসান আজিজুল হক।
ছবি: মোস্তাফিজ মামুন

……….

[হাসান আজিজুল হকের “সাহিত্য সমালোচনা কীভাবে সম্ভব” দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রতি শুক্রবার ক’রে প্রকাশিত ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে দুই কিস্তিতে মুদ্রিত হয়েছিল ২০০৭ সালের ২৯শে জুন ও ৬ই জুলাই তারিখে। সেটিকে উসিলা করে সেলিম রেজা নিউটন এই লেখাটি লিখেছেন। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে, সালেহ মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ সম্পাদিত, খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘ছোটকাগজ’ কাকতাড়ুয়া’-এ। বাংলা সাহিত্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ নিয়ে চিন্তা ও দার্শনিক তর্কমূলক নিবন্ধটি আর্টস-এ পুনঃপ্রকাশিত হলো।–বি.স.]

প্রথম কাণ্ড: সাহিত্য লইয়া কী করিব?

কত না মিথ্যা জিনিসে আমি বিশ্বাস করতাম, আর সেসবের ওপর দাঁড়ানো আমার বিশ্বাসগুলোর কাঠামো কত না সংশয়াকীর্ণ ছিল তা ভেবে কয় বছর আগে আমি চমকে গিয়েছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে স্থিতিশীল ও টিকে থাকার মতো কোনো কিছু যদি আমি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে আমার দরকার-জীবনে স্রেফ একবারের জন্য-প্রত্যেকটা জিনিস সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া এবং একেবারে গোড়া থেকে আবার শুরু করা।

রেনে দেকার্ত ১৬৩৯, অনুবাদ বর্তমান প্রাবন্ধিকের

হাসান আজিজুল হক, দেখতে পাচ্ছি, বোমাবাজ হয়ে উঠছেন। আত্মঘাতী বোমাবাজ: বোমা যেহেতু আত্মাকেই আঘাত করে–বস্তুর আর প্রাণীর আত্মাকে–এবং নিজের আত্মাকে হত-বিকৃত না-করে যেহেতু কারও প্রতিই বোমাপ্রবণ হওয়া যায় না।

ভিক্ষুকের ডাকাডাকিতে টের পাই শুক্রবার হয়েছে, আজ সাহিত্য। পাতা খুলে দেখি প্রথম আলোর ‘সাহিত্য সাময়িকী’ মারফত বোমা এসে হাজির: সাহিত্যের সমালোচনা কীভাবে সম্ভব[১] (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; বর্তমান প্রবন্ধ-পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য) এবং তার প্রথম বাক্যটা হচ্ছে, সাহিত্যের সমালোচনা কি আদৌ সম্ভব?। বোমা নয় তো কী? বোমাবাজ যে হয়ে উঠেছেন হাসান, সেটা টের পাওয়া গিয়েছিল এ বছরের ৭ই জানুয়ারি, বাংলাদেশের বৃহত্তম সাহিত্য-সমালোচক-প্রতিষ্ঠান প্রথম আলোর দেওয়া পুরস্কার নিতে যখন তিনি ঢাকা শেরাটন হোটেলের বলরুমে ঢুকেছিলেন।

আমাদের দেশে অবশেষে তৃণমূল পর্যায় অতিক্রম করে যে সাহিত্য এখন শেরাটনে, তাতে ‘এখনো আঁস্তাকুড়মুখী’ (মলয় ভৌমিক, ২০০৮: ৫) এই লেখকের কোনো হতাশা বা উল্লাস বা অন্য কোনো অনুভূতি বা মন্তব্য সম্পর্কে পুরস্কার-দাতাদের পত্রিকার সচিত্র প্রতিবেদনে কিছুই জানা যায় না (নিজস্ব প্রতিবেদক, ২০০৭)। “সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, চাষী-মজুরের জীবনযাত্রার সঙ্গে …সুপরিচিত”, “সিরিয়াস আপোষহীন লেখক” হাসান যে এখন জীবনের শেষ পর্যায়ে টপক্লাস বড়লোকদের জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হচ্ছেন সে বিষয়ে হয়ত কখনো তিনি লিখবেন–সে আশা করতে অবশ্য দোষ নেই (“কেন হাসান আজিজুল হক”, সম্পাদকীয় রচনা, রবিন ঘোষ, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৯৮৮: ৮)। তো, ঐ অনুষ্ঠানেই, ‘সৃজনশীল শাখা’য় ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই: ১৪১২’-র পুরস্কারে হাতেনাতে ভূষিত হওয়ার মুহূর্তে দেওয়া অভিভাষণে, কর্পোরেট-পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট সাহিত্যের ভরা মজলিশে প্রথম বোমাটা মেরেছিলেন হাসান:

… আজকাল এটাই মনে হয় যে লেখা অবশ্যই ছেড়ে দেওয়া উচিত; আর সাহিত্য নিয়ে কী করব? এমন একটা দেশে-সমাজে, কিংবা আমি বলব, এমন একটা পৃথিবীতে আমরা বাস করছি, যেখানে কেবল জান্তব বেঁচে থাকা এবং সেই জান্তব বেঁচে থাকাকে অতিশয় উন্নত করার বাইরে মানুষের জীবন যাপনের মধ্যে আর কিছু নেই। … কতদিন আগে বঙ্কিমচন্দ্র বলে গেছেন, এ জীবন লইয়া কী করিব? আজকে আমি এই প্রশ্নটা আপনাদের সামনে তুলব। বলুন আপনারা, সাহিত্য নিয়ে আপনারা কী করবেন? সংগীত নিয়ে আপনারা কী করবেন? চিত্রকলা নিয়ে আপনারা কী করবেন? আমরা যদি নিজেদের বিবেকের কাছে সৎ থাকি, তাহলে প্রশ্নের জবাব আমাদের কারও কাছেই নেই। (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-ক; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের এক নম্বর উদ্ধৃতি]

(সম্পূর্ণ…)

প্রতিসন্দর্ভের স্মৃতি

মলয় রায়চৌধুরী | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১০ ৮:১০ অপরাহ্ন

malay-palamu_bihar_1963.gif[১৯৬১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হাংরি আন্দোলন শুরু করেন মলয় রায়চৌধুরী, তার বন্ধু দেবী রায়, বড় ভাই সমীর রায়চৌধুরী ও কবি শক্তি চট্টোপ্যাধ্যায়। পরবর্তীকালে উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার, সুবিমল বসাক, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, ফাল্গুনী রায়, ত্রিদিব মিত্র এবং তার বান্ধবী আলো মিত্র, সুভাষ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরীসহ আরো অনেকে। ১৯৬৪ সালের হাংরি বুলেটিনে মলয় রায় চৌধুরী’র ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা প্রকাশিত হয় এবং ‘হাংরি বুলেটিন ১৯৬৪’ প্রকাশের পরে পরে ভারতীয় আদালতে হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

১৯৬৪ সালের ২রা সেপ্টেম্বর হাংরি আন্দোলনকারীদের ১১ জনের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ড বিধির ১২০বি (রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ), ২৯২ (সাহিত্যে অশ্লীলতা ) ও ২৯৪ (তরুণদের বিপথগামী করা) ধারায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়; এর মধ্যে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ১৯৬৫ সালের মে মাসে অন্য সবাইকে রেহাই দিয়ে কেবল মলয় রায় চৌধুরী’র বিরুদ্ধে ২৯২ ধারায় চার্জশীট দেয়া হয়। গ্রেফতারি পরোয়ানার দরুন উৎপলকুমার বসু অধ্যাপকের চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। প্রদীপ চৌধুরী বিশ্বভারতী থেকে রাসটিকেট হন। সমীর রায়চৌধুরী সরকারি চাকরি থেকে সাসপেন্ড হন। সুবিমল বসাক ও দেবী রায়কে কলকাতা থেকে মফঃস্বলে বদলি করে দেয়া হয়।

গ্রেফতারের সময়ে মলয় রায় চৌধুরীকে হাতে হাতকড়া পরিয়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে দুই কিলোমিটার হাঁটিয়ে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৬৬ সালে ব্যাংকশাল কোর্ট মলয় রায় চৌধুরীকে দুশো টাকা জরিমানা, অনাদায়ে একমাসের কারাদন্ড দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে মলয় রায় চৌধুরী কলকাতা উচ্চ আদালতে আপিল করেন এবং ২৬ জুলাই ১৯৬৭ সালে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় নাকচ করে দেয়।

সেই সময়ে হাংরি আন্দোলন কী উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল এবং উপরোক্ত মামলায় ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির কী ভূমিকা ছিলো–এই পুরো বিষয় নিয়ে দিল্লি’র দিগঙ্গন পত্রিকায় লিখেছেন মলয় রায়চৌধুরী। ২০০৪ সালে দিগঙ্গন উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত মলয় রায়চৌধুরী’র ‘প্রতিসন্দর্ভের স্মৃতি’ নামে লেখাটি আর্টস-এ পুনঃপ্রকাশিত হলো। বি. স.]

————–

প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার

মলয় রায়চৌধুরী

ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কী কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ-আঙরাখার ভেতরে চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পার্ছিনা, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি যানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্থতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ? (সম্পূর্ণ…)

ইলিয়াসের গল্প, মেডিকেল তত্ত্ব ও টেকনোলজি সংক্রান্ত ভাষ্য

ফরহাদ মজহার | ২ সেপ্টেম্বর ২০১০ ৮:৪৮ অপরাহ্ন

elias_1.jpg……..
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১২/২/১৯৪৩ – ৪/১/১৯৯৭)
……..

১৯৪৩ সালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা থানার গোটিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মেছিলেন। তাঁর বাবার বাড়ি বগুড়া জেলায়। বাবা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (১৯৪৭-১৯৫৩) এবং মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী সেক্রেটারি ছিলেন। মা বেগম মরিয়ম ইলিয়াস। ইলিয়াসের ডাক নাম মঞ্জু। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন ১৯৬৪ সালে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে। এরপর তিনি মিউজিক কলেজের উপাধ্যক্ষ, প্রাইমারী শিক্ষা বোর্ডের উপ পরিচালক, ঢাকা কলেজের বাংলার প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ইলিয়াসের মৃত্যুর পরে ফরহাদ মজহারের এ লেখাটি বাংলাবাজার পত্রিকার ১৩ জানুয়ারি ১৯৯৭ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। প্রায় সাড়ে তের বছর পরে ফরহাদ মজহারের সৌজন্যে লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হলো। এ লেখায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি গল্প ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’কে ঘিরে লেখকের আলোচনা অগ্রসর হয়েছে। তিনি সে সময়ে আলোড়ন তোলা ইলিয়াসের ‘ছোটগল্প’ বিষয়ক জনপ্রিয় ধারণাকে এ লেখায় চ্যালেঞ্জ করেছেন। বি. স.

 
আম্মার ঘরে আমরা কী ফেলে এসেছি?

খুবই কম লিখেছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। আমাদের জন্য এটা ভাল নাকি মন্দ বলা মুশকিল। তবে তাঁর খুব লোকশান হয়েছে কি? এত কম লিখে বাংলাসাহিত্যে নিজের জন্যে একটি জায়গা করে নিতে পারা দারুণ একটা ব্যাপার। ঈর্ষা করার মত। তবুও আমাদের সেই দোনামোনা থাকে না যে আখতার সবাইকে একটু চীট করেছেন। প্রতারণা। বোধ হয় তিনি আরো লিখতে পারতেন, লিখেন নি। তিনি আর লিখবেন না এটা মস্ত বড় লোকশান। আমরা ঠকেছি।

ইলিয়াস সম্পর্কে এত দ্রুত কিছু লিখতে বাধ্য হবো, এটা আমি কক্ষণোই ভাবি নি। ইলিয়াস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে একবার তাঁর সব বইপত্র জোগাড় করে বসেছিলাম। তখনও ‘খোয়াবনামা’ হাতে আসে নি। পড়ে-টরে নিজেকে শুধালাম, আচ্ছা ইলিয়াস মশায়ের সবচেয়ে দারুণ গল্প কোনটি? তখন মাথা চুলকিয়ে থুতনি মুছে ঢের ভাবাভাবি করে মনে হোল, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’। এই সিদ্ধান্তে নিজেই নিজের কাছে খুব অবাক হয়ে গেলাম। এই গল্পটি ইলিয়াসের প্রথম দিককার রচনা। ষাট দশকের দিকে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, থাকি ঢাকা হলে, তখন আমি এই গল্পটি পড়েছি। সেই সময়েই গল্পটি আমার করোটির মধ্যে প্রবেশ করেছিল, এরপর আর বের হওয়ার দরোজা খুঁজে পায় নি। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com