১৯৫২

ভাষার বিকৃতি: হীনম্মন্যতায় ভোগা এক মানসিক ব্যাধি?

রাজু আলাউদ্দিন | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১১:১২ পূর্বাহ্ন

The corruption of man is followed by the corruption of language–Ralph Waldo Emerson

বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের গর্বের কোন শেষ নেই, আবার নিজের ভাষাকে অপমানেও আমাদের কোনো জুড়ি নেই। যে ভাষার জন্য আমরা শহীদ হয়েছি সেই ভাষাই যথেচ্ছ ব্যবহারের দায়িত্বহীনতার মাধ্যমে তার ঘাতক হয়ে উঠেছি। পুরো বিষয়টি জাতীয়তাবাদের দ্বৈতরূপ সম্পর্কে হোর্হে লুইস বোর্হেসের উক্তিরই সমধর্মী হয়ে উঠেছে: “যিনি শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত তিনি জল্লাদও হতে পারেন এবং তোর্কেমাদা(স্পেনে ইনকুইজিশনের যুগে অত্যাচারী যাজক–লেখক) খ্রিষ্টের অন্য রূপ ছাড়া আর কিছু নন।” আর এই জল্লাদের ভূমিকায় এখন জনগন ও রাষ্ট্র একই কাতারে সামিল হয়েছে।

একটি সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত অভিব্যক্তিপূর্ণ ভাষা গড়ে উঠতে হাজার হাজার বছর লাগে। আর একটি ভাষার গড়ে ওঠার পেছনে থাকে শত সহস্র মানুষের অবদান যারা শব্দ ও শব্দার্থের জন্ম দিয়ে ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। আর লেখকরা এসে এই শব্দ ও শব্দার্থের সীমা বাড়িয়ে দেন বা নতুন নতুন অর্থের ব্যঞ্জনায় দীপিত করে তোলেন ভাষাকে।

কিন্তু আমাদের অজ্ঞতা, অবহেলা, স্বেচ্ছাচার ও দায়িত্বহীনতার কারণে এই সম্মিলিত অর্জনকে আমরা বিকৃত করছি প্রতিনিয়ত।

অনেকেই বলেন ভাষা কোন স্থির বিষয় নয়, নদীর মতো পরিবর্তিত হতে বাধ্য। অবশ্যই তা পরিবর্তিত হবে, কিন্তু বিকৃত নয়। আমরা স্বেচ্ছাচার ও অবহেলার মাধ্যমে একে বিকৃতও করে তুলতে পারি, প্রবহবান নদীতে রাসায়নিক বর্জ ও জঞ্জাল ফেলে একে দুষিতও করতে পারি, যেভাবে বুড়িগঙ্গা নদীকে আমরা করেছি।
ভাষা স্থির কোন বিষয় নয় বলেই তা প্রতিনিয়ত বদলায়। আর বদলায় বলেই শব্দে ও অর্থে বৈচিত্র ও বিস্তার লাভ করে। কিন্তু ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে পরিবর্তন এক জিনিস আর দায়িত্বহীনতার কারণে বিকৃতি ঘটানো আরেক জিনিস। (সম্পূর্ণ…)

‘রাস্ট্র ভাষা গান’ ও একজন পল্লীকবি শামসুদ্দীন

আশেক ইব্রাহীম | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনও করিলিরে বাঙ্গালী
তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি।
১.
আমরা তাকে চিনি চারণ কবি শামসুদ্দীন নামে, তিনি নিজের নাম লিখতেন ‘সেখ সামছুদ্দীন’ গ্রাম: ফতেপুর, পোস্ট: বাগেরহাট, জেলা খুলনা (১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে প্রকাশিত গানের বই থেকে নেওয়া)। জন্ম আনুমানিক ১৩২১-২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫ খ্রি.) মৃত্যু ১৩ ই আশ্বিন ১৩৮১ বঙ্গাব্দ (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ খ্রি.)। ভাষা আন্দোলনের প্রথম গানের রচয়িতা হিসেবে খুব বেশীদিন হয়নি এই নামটি আমাদের আলোচনায় এসেছে। ‘রাস্ট্র ভাষা গান’ নামে পরিচিত অমর এই গানের রচয়িতা কবি শামসুদ্দীন একুশের প্রথম গানের রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিভিন্ন লেখার সূত্র ধরে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় বাগেরহাট এ, সি, লাহা টাউনক্লাবে সর্বদলীয় সমাবেশে কবি শামসুদ্দীন স্ব-কন্ঠে এই গান গেয়ে ভাষা আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন।

কবি শামসুদ্দীনের পরবর্তি প্রজন্ম, আবুবকর সিদ্দিক, মোহাম্মদ রফিক এবং ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহম্মেদ প্রমুখ পল্লীবাসি কবি সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁকে স্মরণ করেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে, স্মৃতিচারণায়, গল্পে। পৌঁছে দিয়েছেন বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত। কবি আবুবকর সিদ্দিকী সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লিখেছিলেন কবি শামসুদ্দীন এবং তাঁর গান নিয়ে। বাগেরহাটের ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহমদ লিখেছেন বাগেরহাটের ছোটকাগজ ‘চোখ’-এর ফেব্রুয়ারী ১৯৯০ সংখ্যায়। মোহাম্মদ রফিক তার গল্পগ্রন্থ ‘গল্পসংগ্রহ’ –এ গল্প লিখেছেন কবি শামসুদ্দীনকে নিয়ে। আড্ডায় আলোচনায় বাগেরহাটের প্রবীণ মানুষের কাছ থেকে শামসুদ্দীন সম্পর্কে শোনা যায়। কয়েকদিন আগে কবি মোহাম্মদ রফিক তার পৈত্রিক গ্রাম বৈটপুরে বেড়াতে আসেন, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এক প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “জানো, বাঙ্গালী শব্দটা আমি জীবনে প্রথম শুনেছিলাম শামসুদ্দীনের এই গানে”। বাগেরহাটে আরেক কিংবদন্তী প্রয়াত গনি সরদার, যিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারী রাত ১২ টার পর থেকে সারারাত একটা ভ্যানের সামনে লাউড স্পিকারে ‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনও করিলিরে বাঙ্গালী, তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’-এই গান গাইতে গাইতে কাঁদতেন আর ঘুরে বেড়াতেন শহরের অলিতে গলিতে। তার কন্ঠে প্রকাশিত হাহাকার আমাদের নিয়ে যেত ৫২ সালের রক্তাক্ত রাজপথে। সমস্ত শহর যেন বুকচাপা কান্নায়, শোকে নিমজ্জিত হয়ে থাকত সমস্ত দিন। শ্রদ্ধেয় গনি সরদারের কন্ঠেই এই গান আমি প্রথম শুনেছি, শামসুদ্দীনকে চিনেছি। এভাবেই শামসুদ্দীন লোকমুখে টিকে আছেন বছরের পর বছর ধরে।

‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙ্গালি’ গানের রচয়িতা এবং সুরকার সম্পর্কে তথ্য বিভ্রান্তি আগে থেকেই ছিল, সে সম্পর্কে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত কবি আবুবকর সিদ্দিক-এর লেখায় বিস্তারিত জানা যায়। পরবর্তিতে ২০০৯ সালে বাংলালিংক-এর একটি বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে আবারো এ প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে, কে এই গানের গীতিকার এবং সুরকার? আসলেই কি একুশের প্রথম গানের রচয়িতা এবং সুরকার বাগেরহাটের ফতেপুর গ্রামের দরিদ্র কবি শামসুদ্দীন নাকি অন্য কেউ? ঐ সময়ে কয়েকটি পত্রিকায় লেখালেখি হয়। অনেকে বাংলালিংক-এর বিজ্ঞাপনকে ইতিহাস বিকৃতির দায়ে দোষারোপ করেন। গীতিকার হিসেবে কবি শামসুদ্দীন এবং সুরকার হিসেবে অনেকে আলতাফ মাহমুদের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে বাগেরহাটের ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহম্মেদ, আবুবকর সিদ্দিক প্রমুখের লেখায় ২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সন্ধ্যায় বাগেরহাটে শামসুদ্দীনের স্ব-কন্ঠে এই গান গেয়েছিলেন এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। ক’দিন আগে এই লোককবি’র প্রকাশিত প্রথম গানের বই হাতে এসে পৌঁছানোর পর সে-সব বিভ্রান্তি কেটে গেছে। এখন আমরা নিশ্চিত বলতে পারি, ‘রাস্ট্র ভাষা গান’-এর গীতিকার এবং সুরকার কবি শামসুদ্দীন নিজেই। পরবর্তিতে গানের কথায় এবং সুরে কিছু পরিবর্তন করেছিলেন আলতাফ মাহমুদ। বর্তমানে যে গান শোনা যায়, সেটি আলতাফ মাহমুদ কর্তৃক ‘রাস্ট্র ভাষা গান’-এর পরিবর্তিত রূপ। (সম্পূর্ণ…)

মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করা মূর্খতারই নামান্তর

শাহনাজ মুন্নী | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ২:১৮ অপরাহ্ন

Babelঅনেক বছর আগে একবার পত্রিকায় পড়েছিলাম, কোন একটি প্রাচীন ক্ষয়িষ্ণু ভাষার কথা, যে ভাষায় কথা বলা মানুষ কমতে কমতে এমন হয়েছিল, যে শেষ পর্যন্ত ওই ভাষায় কথা বলেন বা ভাষাটি জানেন এমন একজন মাত্র মানুষ শুধু বেঁচেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ওই ভাষাটি পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যাবে। অর্থাৎ ব্যক্তিটির সাথে সাথে মারা যাবে তার প্রাচীন ভাষাটিও। শুধু কি ভাষা মরে যায় ? ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তো একটি জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা জীবনধারা ও সংস্কৃতিরও মৃত্যু ঘটে।

আমি হঠাৎ শিউরে উঠেছিলাম এই আশংকায় যে কোন দিন, কোন দূর্ভাগ্যময় দূর ভবিষ্যতে বাংলা ভাষাও কী তবে লুপ্ত হতে পারে? হারিয়ে যেতে পারে প্রচণ্ড প্রতাপশালী আধিপত্যবাদী কোন ভাষার দুর্দান্ত দাপটের কারণে?
যে ভাষায় প্রায় ২৫ কোটি লোক কথা বলে, সে ভাষা এত সহজে লুপ্ত হবে না, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে, আমাদের সামনে মানে বাংলাদেশের মানুষের সামনে ভাষা নিয়ে কথা বলতে গেলেই যখন অবধারিতভাবে মনে পড়ে যায় ১৯৫২। জ্বলজ্বল করে ২১ শে ফেব্রুয়ারি। মনে হয়, শহীদের বুকের তাজা রক্ত যেন মিশে আছে এই বাংলা ভাষার সাথে, বাংলা বর্ণমালার সাথে। ফলে বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা- এমন উচ্ছাসে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ভেসে যাই। কবি শামসুর রহমানও– ধারণা করি–সেই আবেগ থেকেই লিখেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ/ বারান্দায় লাগে জোৎস্নার চন্দন। বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে উদার গৈরিক মাঠে, খোলা পথে, উত্তাল নদীর বাঁকে বাঁকে, নদীও নর্তকী হয়।’
তবে এসব আবেগী ভাবনার বাইরে এসে কঠিন বাস্তবকেও তো উপেক্ষা করতে পারি না।
এটা তো অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে সারা বছর ধরে ভাষা নিয়ে প্রায় সর্বত্রই দেখা যায় এক ধরনের উদাসীনতা, দেখি বাংলা ব্যবহারে অসচেতনতা, দেখি নতুন প্রজন্ম বাংলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, দেখি বাংলা ভাষায় অনায়াসে অনুপ্রবেশ ঘটছে বিস্তর ইংরেজি ও বিদেশী শব্দের। (সম্পূর্ণ…)

বাংলা ভাষার শত্রু কারা?

চঞ্চল আশরাফ | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১১:৫৮ অপরাহ্ন

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুরায়।
নিজ দেশ ত্যাজি কেন বিদেশে ন যায়।।

সতেরো শতকে এই কবিতা রচিত হওয়া মানে, তার বেশ আগে থেকেই এ দেশে বাংলা ভাষার শত্রু ছিল। তখন বাংলা ছিল বিপুল গরিষ্ঠ নিপীড়িতের ভাষা। তাহলে এর শত্রু ছিল কারা? আমরা জানি, এই ভূখণ্ডকে বেশির ভাগ সময় শাসন করেছে বহিরাগতরা, তারা এখানকার ভাষার মিত্র হবে, এমন চিন্তা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই দেশে জন্ম নেয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এবং তাদের খুদকুড়ায় তুষ্ট লোকজন, যারা বাংলা ভাষাকে অচ্ছুৎ জ্ঞান করে এসেছে, তারাই বাংলা ভাষার বড় শত্রু। আব্দুল হাকিম যখন উদ্ধৃত কবিতাটি রচনা করেন, তখন ব্রাহ্মণদের দাপট, তারা বাংলার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল সংস্কৃতকে; এমন প্রচারও চালিয়েছিল যে, বাংলায় কথা বললে নরকে যেতে হবে।

বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে শাসক শ্রেণির সহিংস আচরণের সর্বশেষ নমুনা হলো ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ ছাত্রজনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ । তা ছিল বস্তুত বাংলা ভাষার ওপরই আক্রমণ। এতেই বোঝা যায়, বাংলা শাসকদের প্রতিপক্ষ হয়েই ছিল দীর্ঘকাল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও, জনমানুষের এই ভাষার শত্রু যে অপসৃত হয়েছে, এমন নয়। বরং নানা মাত্রায় নব্য শত্রুশ্রেণির উত্থান ও বিকাশ ঘটে চলেছে, বাংলা ভাষার জন্য তারা নিশ্চিতভাবেই বড় হুমকি। (সম্পূর্ণ…)

গ্রন্থমেলা ২০১৬ : নির্বাচিত বই

অলাত এহ্সান | ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ১১:৩৩ অপরাহ্ন

13_bookfair_29022016_08.jpgফাল্গুনে শুরু হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা। শেষ হয় বসন্তের যৌবনে পা রেখে। গত কয়েক বছরে মেলার পরিধি বেড়েছে। বেড়েছে মেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশের উৎসাহ। মাত্র একমাসে প্রতিবছর প্রায় চার হাজার বই প্রকাশ হচ্ছে। এর বিরাট অংশই তরুণ লেখকদের বই। বিপুল সংখ্যক বই প্রকাশের কারণে তার মান কতটুকু বজায় রাখা সম্ভব হয়, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। মেলা উপলক্ষেএ পর্যন্ত প্রকাশিত বইগুলোর একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা বইয়ের নাম, লেখক, প্রকাশক ও গায়ের মূল্য উল্লেখসহ আলাদা আলাদা বিভাগে উপস্থাপন করা হলো। তালিকাটি প্রস্তুত করেছেন গল্পলেখক অলাত এহসান। (সম্পূর্ণ…)

কারা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়

সোহেল হাসান গালিব | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ৭:১৮ অপরাহ্ন

বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীকে এখন আর একটি ‘সমগ্র’ রূপে বিবেচনার সুযোগ নেই। মুখ্যত দুই বাংলায়–বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায়–ভাষা দুই ভাগে, দুইটি ধারায় বিকাশের এক বিশেষ পর্যায়ে এসে উপস্থিত। এ দুটি ধারাকে চিহ্নিত করতে কেবল শব্দ ও বাক্যের সংগঠন বিচার করলেই চলবে না। শব্দ যে প্রতীক ধারণ করে, যে ইমেজের প্রতিফলন ঘটায়, যে ইতিহাসকে তুলে আনে, তার তাৎপর্যও খেয়াল করতে হবে।

প্রমথ চৌধুরী বলে গিয়েছেন, ‘বাংলা ভাষার অস্তিত্ব প্রকৃতিবাদ অভিধানের ভিতর নয়, বাঙালির মুখে।’ অর্থাৎ ভাষার প্রাণ-উৎস মরা মানুষের জাবেদাখাতা নয়, জ্যান্ত মানুষের মুখের জবান।

হিন্দি ভাষা নয় কেবল, প্রকৃত প্রস্তাবে ভারতের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য বহন করতে গিয়ে প্রাদেশিক ‘বাংলা’র একটা চেহারা দাঁড়িয়েছে পশ্চিম বাংলায়। পক্ষান্তরে, ‘উর্দু’–ভাবান্তরে ‘পাকিস্তানি ইসলাম’–মোকাবেলা করেই গড়ে উঠেছে স্বাধীন রাষ্ট্রের বাংলা ভাষা। ফলে খুব সহজেই দুইটি বাংলার দুই ভিন্ন উৎসারণ চিনে নেয়া সম্ভব। পশ্চিমের বাংলা ক্রমশ ঘোমটা পরছে অপরের আধিপত্য কবুল করে। স্বাধীন বাংলা জেগে উঠছে অন্যের আধিপত্য খারিজ করার মধ্য দিয়ে।

কিন্তু এই উৎসারণ, এই প্রবণতা এক বিশেষ কালপর্বের জন্য সত্য, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সদাই এমন ঘটেছে তা বলা যাবে না। পশ্চিমবঙ্গের ‘বাংলা’ প্রধানত তার আদলটা তৈরি করেছে বর্জনের সংস্কৃতি উদযাপন করতে করতে। ১৮৩৮ সালে ‘পারসীক অভিধান’ নামে যে সংকলনটি করেন জয়গোপাল তর্ক্কালঙ্কার, তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষায় যে সব বিদেশি (ফারসি) শব্দ ব্যবহৃত হয় তা চিহ্নিত করা। যাতে এসব শব্দ পরিহার করে শুদ্ধ বাংলা চর্চায় লেখকরা সচেতন হয়ে ওঠেন। এ অবস্থা জারি ছিল দীর্ঘদিন। প্রায় একশো বছর পর কাজী আবদুল ওদুদ নতুন একটি অভিধান সংকলনে এগিয়ে আসেন। তাঁর অভিধানের নাম ‘ব্যবহারিক শব্দকোষ’। অভিধানের ভূমিকায় তিনি লিখছেন : ‘বাংলা ভাষা তার বিচিত্রমূল সাধারণ ও অ-সাধারণ শব্দ ও শব্দ-সংশ্লেষ নিয়ে বর্তমানে যে বিশিষ্ট রূপ ধারণ করছে, ক্ষেত্রবিশেষে করতে যাচ্ছে, সে-সবের সঙ্গে প্রধানত শিক্ষার্থীদের যথাসম্ভব অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটানো ‘ব্যবহারিক শব্দকোষে’র উদ্দেশ্য।…
বাংলার মুসলমান-সমাজে প্রচলিত অথচ বাংলা অভিধানে সাধারণত অচলিত শব্দগুলোও সংকলন করতে চেষ্টা করা হয়েছে। মুসলমান-সমাজের চিত্র বাংলা সাহিত্যে ব্যাপকভাবে অঙ্কিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সবের প্রয়োজনীয়তা সহজেই বৃদ্ধি পাবে।’ (সম্পূর্ণ…)

গ্রন্থমেলা ২০১৬: নতুন মুখ নতুন বই

অলাত এহ্সান | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ১০:২৯ অপরাহ্ন

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এখন বইয়ের কাঁচা সৌরভে উদ্বেল। বাংলা একাডেমির ষাট বছর পদার্পনের এই বছরে বইমেলার পরিসর বেড়েছে আগের চেয়ে। ফাগুনের এই মেলা ঘিরে বইপ্রেমি মানুষের সমাগম। নতুন ও পুরাতন বইয়ের উৎসব। বইমেলা প্রতিবছর হাজার হাজার নতুন বই নিয়ে আসে। সেই সঙ্গে নতুন লেখকদেরও পরিচয় করিয়ে দেয় এই মেলা। এবারও মেলায় প্রথম বই বের করেছেন এমন লেখক কম নন। এদের অধিকাংশই তরুণ। বিষয় ভাবনা ও সাহিত্য সাধনায় কেউ কেউ যথেষ্ট পরিপক্ক। তার কারণ দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি ও একাগ্রতা। এবারের নতুন কেতন উড়িয়ে প্রথম বই প্রকাশ করেছেন এমন বই ও সাহিত্যিক নিয়ে লিখছেন অলাত এহ্সান।

গুলতেকিন খান : আজও, কেউ হাঁটে অবিরাম
border=0এবারের বই মেলায় গুলতেকিন খানের প্রথম বই প্রকাশ একটি বড় খবর। বাংলা গল্প-উপন্যাসের পাঠকদের কাছে তিনি অপরিচিত নন। বাঙালি মুসলমান লেখকদের মধ্যে স্বনামধন্য লেখক প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁয়ের নাতনী তিনি। তাকেও ছাপিয়ে তার আরেক পরিচয় তিনি প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমদের সাবেক স্ত্রী। কিন্তু তিনি নিজেও যে একজন সাহিত্যিক তা অনেকেরই জানা ছিল না। স্কুলবেলা থেকে ছড়া চর্চা ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশ তা প্রকাশ করলেও কবিতায় তার সৃষ্টিশীল হাতের পরিচয় ঘটেছে এই প্রথম। তাম্রলিপি থেকে প্রকাশ হয়েছে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ আজও, কেউ হাঁটে অবিরাম। প্রথম বইয়ের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বই প্রকাশের অনুভূতি খুবই ভাল।’ তিনি স্মরণ করেন, ‘সেই কিশোরী বয়স থেকেই ছড়া লিখতাম। ষষ্ঠ, সপ্তম শ্রেণিতে থাকাকালেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ প্রায় মুখস্থ হয়ে যায়। আসলে দাদার উৎসাহেই আরো পড়া হত। পত্রিকায় ছড়া প্রকাশ হওয়ার পর দাদাকে দেখালে আমার মাথায় হাত রেখে আর্শিবাদ করেন। তাঁর অনুপ্রেরণায়ই এগিয়ে যেতে থাকি। কিন্তু বিয়ের পর আর কবিতা চর্চা হয়ে ওঠেনি। কেউ আমাকে উৎসাহ দেয় নি। বিয়ের আগে দাদা ছিলেন, কিন্তু বিয়ের পরে কেউ না। দেখা যেত আমার সন্তানের বাবা রাত জেগে লিখছেন, আর আমি একা একা পড়ছি। তারপর প্রবাসে থাকায় তাতেও ছেদ পড়ে। বিদেশ থেকে ফিরে এসে স্কুল শিক্ষকতায় যোগ দেয়ার পর সহকর্মীদের মধ্যে আমার কবিতা লেখার সংক্রমণ ছড়াতে থাকে। শ্রদ্ধেয় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার উৎসাহ দেন লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার জন্য। তখন ফেসবুকে কবিতা লিখতাম। তারা ভীষণ উৎসাহ দিতেন। উৎসাহ দেন বই করার জন্য। কন্যা-পুত্ররা ধরে এবার বই মেলাতেই বই করার জন্য। মূলত ফেসবুকে লেখা সেই কবিতাগুলোর থেকে যাচাই বছাই করে এবার বই করলাম। বই প্রকাশ করে খুব ভাল লাগছে। এখন প্রিয় মানুষরা পড়তে পারবে। দাদাকে বইটা উৎসর্গ করতে পেরে ভাল লাগছে। তিনিই ছিলেন আমার সকল প্রেরণার উৎস। এখন পাঠকদের কাছ থেকে কেমন সারা পাই, তার ওপর নির্ভর করবে আমার আগামীতে বই করার ইচ্ছা। তবে লেখালিখি তো চলবেই।’ (সম্পূর্ণ…)

‘যখন ক্রীতদাস স্মৃতি ’৭১’: দহন ও দ্রোহের অনন্যোপায় প্রকাশ

অলাত এহ্সান | ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ১১:১৯ অপরাহ্ন

border=0বইটি পড়ে মনে হয়, লেখক নাজিম মাহমুদ এটি মোটেই লিখতে চান নি। কিন্তু সেই সময়ের অবস্থা এমনই ছিল যে, এটা লিখতে বাধ্য হয়েছেন। অনন্যোপায় হয়ে লিখেছেন। প্রচণ্ড অনীহা ও সন্দিগ্ধতার ভেতর দিয়ে লিখেছেন। একজন মানুষের দহন ও দ্রোহের গভীর থেকেই কেবল এই ধরনের স্মৃতি লেখা যায়। আমরা যতটা সহজভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ফ্রেম বন্ধী করি, ব্যাপারটা ঠিক ততটা সহজ কিছু ছিল না। এর এক-একটি মুহূর্ত এক-একটা বছর কিংবা যুগের যন্ত্রণা নিয়ে হাজির হয়েছে কারো জীবনে। হানাদারদের কবল থেকে বাঁচতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেড়ে একটু দূরের মীরগঞ্জে আশ্রয় নিয়েছেন লেখকের পরিবার, সেখানেও হানাদারদের উপস্থিতি। তখন বাঁচার তাগিদে গর্তে নেমেছিলেন সপরিবারে। হায়, সেটা বাঁচার জন্য ক্ষণিক আশ্রয় হলেও, ওটা মানুষের মল-মূত্রের ওই ভাগাড়ে এক মুহূর্ত একবছরের চেয়েও দীর্ঘ মনে হবে।

তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময়প্রবাহে অজস্র গলি, রন্ধ্র, চোরাস্রোত, চোরাবালির ফাঁদ আর মহাকালের গহ্বরের মতো অতিকায় ক্ষত ছিল। সেই ক্ষতগুলো, ফাঁকগুলো খুঁজে বের করা দরকার। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একটা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর কিভাবে অজস্র চোরাবালির ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে, তার ওপর দিয়ে কিভাবে শ্বাপদরা দাপিয়ে বেড়ায় নাজিম মাহমুদ আমাদের সেই দিকে নজর এনেছেন। এটা কেবল কোনো ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের আত্মকথা নয়, এটা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভেতরের শক্তিকে চিহ্নিত করে, মানুষের যন্ত্রণার অবয়ব তুলে ধরে। (সম্পূর্ণ…)

ভাষার জন্য ভালবাসা: শুধু একমাস?

সৌরভ সিকদার | ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এসেছে। এরই মধ্যে আমাদের ভাষা-আবেগে নতুন করে বান ডেকেছে। এই লেখাটা একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বাংলা ভাষার বিশ্বজয় কিংবা মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের আবেগের বন্যা নিয়ে নয়। এমন কী প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা যে ভাষাপ্রেমের জোয়ারে ভেসে ভেসে ভাসা-ভাসা কিছু স্বপ্ন তৈরি করি সেসব নিয়েও নয়। শুধু একজন বাংলা ভাষা-ভাষি সাধারণ মানুষের কিছু প্রশ্ন । কিছু প্রত্যাশা বলতে পারেন। এখন প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই ভাষা নিয়ে অনেক আলোচনা, নানামত, নানা বিশ্লেষণ, নানা বির্তক এমনকী ভাষার প্রাণ যেন যায় যায় দশা । আর অন্যদিকে বেসরকারি টিভি-বেতার চ্যানেলগুলো প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে ভাষার লড়াই থেকে শুরু করে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার আধিপত্য থেকে রক্ষা করে বাংলা ভাষার প্রাণভোমরা উদ্ধারের যেন লিপ্ত সবাই। কী আশ্চর্য! যারা ইংরেজি ভাষায় লেখা নাম ফলকের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন তৈরি করছেন, তাদের নিজেদের নামফলক বা প্রতীক চিহ্নের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন কি? চ্যানেল আই, এটিএন, জিটিভি, ইটিভি, এনটিভি, আরটিভি, (দু একটি ছাড়া) আর কত লিখবো। এই তো কয়েক দিন আগে বিভিন্ন পত্রিকায় টিভি চ্যানেলে অনেকেই যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার সঙ্গে আমি একমত- আমাদের চলচ্চিত্র ও টিভি ধারাবাহিকের নামগুলো দেখলে বোঝার উপায় নেই যে (মোস্ট ওয়ান্টেড, ব্যাচেলর, বাটার ফ্লাই, রেডিও চকলেট, মেট্টেলাইফ প্রভৃতি) এটি বাংলাদেশের না হলিউডের। এমনকি অনুষ্ঠানগুলোতেও এখন প্রতিযোগিতা করে বিদেশী টিভির অনুসরণে নামকরণ চলছে, কোন কোন চ্যানেলে কলাকুশলীদের নামগুলোও ইংরেজি অক্ষরে ফুটে ওঠে অথচ একই চ্যানেলে একটু আগেই দুঃখিনী বাংলা বর্ণমালা নিয়ে দারুণ একটা প্রতিবেদন প্রচার করেছে–সত্যি সেলুকাস বিচিত্র এই দেশ। (সম্পূর্ণ…)

নয়াউপনিবেশে ভাষা আন্দোলন

অনিন্দ্য রহমান | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ১:৪৪ পূর্বাহ্ন

untitled-1.gif

ক. ফিরিস্তি

বিলাতি সাময়িকী স্পেকটেটরের সংরক্ষণাগারে মিলল গ্রিফিথ্স সাহেবের নিবন্ধ – ‘পাকিস্তান টুডে’, মানে ‘আজিকার পাকিস্তান’। ‘আজিকার’ হল পূর্বাপর সন ১৯৫২। ঐ বছর ২৮শে মার্চ নাতিদীর্ঘ নিবন্ধখানা পত্রস্থ হয়। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় আমরা তার বঙ্গানুবাদ করেছি। এ-ভিন্ন কোনও ভাষান্তরের ঘটনা আমাদের অজানা। অনূদিত নিবন্ধখানা এই অর্থে দুর্লভ। ভাষা আন্দোলনের অসংখ্য দলিলের উপস্থিতিতে এই নিবন্ধ দলিল পদবাচ্য কিনা তা তর্কসাপেক্ষ।

‘ভাষা আন্দোলনে’র চরমতম ধাপ ২১শে ফেব্রুয়ারি এই নিবন্ধের একমাত্র প্রসঙ্গ নয়। তদুপরি এর তাৎপর্য কম নয়। বণিকের হাতে ইতিহাস পড়লে (হরহামেশাই পড়ে) তার কী ঘটে সেটার আরও একটিমাত্র নজির এই নিবন্ধ। একালে যখন এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম আর সাবঅলটার্ন দলের তলা-হইতে-দেখা-ইতিহাসের হালে পানি আছে, তখন গ্রিফিথ্স সাহেবের নিবন্ধ আলাদা মনোযোগের দাবি রাখে। তারও চেয়ে বড় বিষয়, নয়াসাম্রাজ্যবাদী যে ইতিহাসদর্শন এবং ১৯৮০’র দশক থেকে নয়াউদারবাদী চেতনা থেকে ইতিহাসের বোঝাপড়ার যে অভ্যাস আমাদের মজ্জার স্বাদ পেয়েছে, সে দর্শন ও অভ্যাসের একটি আদি নিদর্শন এই রচনা। (সম্পূর্ণ…)

ভাষা আন্দোলনের সময় নিয়ে রফিকুল ইসলামের সাক্ষাৎকার

শেষ কিস্তি

বেবী মওদুদ | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১১ ৪:২২ অপরাহ্ন

image_84_33606.jpg
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: ১৪৪ ধারার মধ্যে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে জমায়েত ছবি: রফিকুল ইসলাম

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: বেবী মওদুদ

প্রথম কিস্তির পরে

বেবী মওদুদ: মানে এইভাবে যে গুলি চালিয়ে ছাত্রদের হত্যা করবে এটা তো ভাবার বিষয় ছিল না।

রফিকুল ইসলাম: এটা কল্পনার অতীত ছিল এবং কোন রকম সতর্কীকরণ না, কিছু না। গুলিটা করছিল ওরা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের যে  মোড়টা, ওখান থেকে। তার কারণ হচ্ছে যে অপরাহ্ণে বাজেট অধিবেশন বসার কথা জগন্নাথ হল মিলনায়তনে। তখন ঐ যে এমএলএ-রা একজন একজন করে যাচ্ছিলেন ওদের ধরে নিয়ে এসে আমরা মেডিকেল কলেজের ভেতরে গুলিতে-লাঠিতে-টিয়ার গ্যাসে শত শত ছাত্র জনতা আহত এবং লাশ হয়ে পড়ে রয়েছে,  এগুলো আমরা ওদের দেখাচ্ছিলাম। ওরা আবার ওখানে গিয়ে মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, মনোরঞ্জন ধর, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন ওদের গিয়ে বললেন। নুরুল আমীন কিন্তু প্রথমে ছিল না ওখানে। পরে সে যখন আসে অ্যাসেম্বলীতে, সে কিন্তু স্বীকার করে নাই যে গুলি চলেছে। অদ্ভুত ব্যাপার—­­­জগন্নাথ হল থেকে কিন্তু দেখা যায় যেখানে গুলি চলেছে এবং ওরা বলেছে, আপনি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলুন, গিয়ে দেখুন ওখানে কি দৃশ্য-মানে এখানে একটা রণাঙ্গণ। কিন্তু নুরুল আমীন যেতে রাজি হয় নাই।

এইভাবে ২১ শে ফেব্রুয়ারি গেল। পরদিন ২২শে ফেব্রুয়ারি এলো। তবে ২১শে ফেব্রুয়ারি রাত্রেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে মাইক্রোফোন লাগিয়ে বক্তৃতা ও কর্মসূচী দিতে লাগলো জনতার উদ্দেশ্যে। মজাটা হচ্ছে, গুলি চলার পর পরই আমাদের নেতা যারা ছিল তারা আত্মগোপন করলেন। তখন ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বটা গ্রহণ করলো সলিমুল্লাহ হলের অ্যাথলেটিক ক্লাবের সব খেলোয়াড়রা। অ্যাথলেটিক ক্লাবের যে সেক্রেটারি ছিল তার নাম আসাদুল আমিন আসাদ। তিনি খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। ফিজিক্স অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস এমএসসি’র ছাত্র ছিলেন এবং টেনিস ব্লু পেয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে ঐ মুসলিম হল থেকে অ্যাথলেটিক ক্লাবে যারা সদস্য ছিল, তারা নেতৃত্ব দিল। ওদিকে ওরা আর এদিকে মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা। অর্থাৎ এই ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বটা প্রথম থেকেই ছাত্র সমাজের কাছে ছিল।
(সম্পূর্ণ…)

ভাষা আন্দোলনের সময় নিয়ে রফিকুল ইসলামের সাক্ষাৎকার

বেবী মওদুদ | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ ২:০৯ অপরাহ্ন

[শিক্ষাবিদ ভাষাসৈনিক ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ১৯৫২ সালে কাছ থেকে ভাষা আন্দোলন দেখেছেন। ভাষা আন্দোলনের ছবি তুলেছেন প্রচুর। এই সাক্ষাৎকারে তিনি সে সময়কার কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি দুটি পর্বে শেষ হবে। সাক্ষাৎকারের সঙ্গে পরে ভিডিও লিংক যোগ করা হবে।– বি. স.]


ছবি. মুস্তাফিজ মামুন ২০১০

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: বেবী মওদুদ

বেবী মওদুদ: স্যার কেমন আছেন?

রফিকুল ইসলাম: ভালো।

বেবী মওদুদ: আপনার তো দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা। ভাষা আন্দোলন দেখেছেন, গণ আন্দোলন দেখেছেন, তার পরে ছয়দফা আন্দোলন। আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ঢাকায় ছিলেন এবং বোধহয় আপনাকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জেলেও নিয়ে গেছে।

রফিকুল ইসলাম: হুমম, বন্দি ছিলাম।

বেবী মওদুদ: বন্দি ছিলেন। তো স্যার, আপনার কাছে আমরা আজ ভাষা আন্দোলনের কথা শুনবো যে আপনি ওই সময় কী দেখেছেন?

রফিকুল ইসলাম: আমি ১৯৪৩ সাল থেকে রমনায় ছিলাম। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই ছিলাম বলা যেতে পারে। সুতরাং তখন থেকে শুরু করে বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার জীবন কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এর মধ্যে যা ঘটেছে প্রায় সবই দেখেছি। ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারটা হলো ’৪৮ সালে যখন ভাষা আন্দোলন শুরু হয় তখন সে আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ফজলুল হক হল। তো ’৪৮ সালের ১১ই মার্চ তোমার রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হলো, সেটা আমি দেখেছি। এই রাষ্ট্রভাষা দিবসের একটু পটভূমিকা বলা দরকার। ’৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট পাকিস্তান হলো। ’৪৮সালের ফ্রেব্রুয়ারী মাসের শেষ দিকে করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে প্রধান মন্ত্রী লিয়াকত আলী খান একটা প্রস্তাব আনলেন যে পাকিস্তান গণপরিষদে ইংরেজি এবং উর্দু ভাষা ব্যবহার করা যাবে। তখন কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তিনি প্রস্তাব আনলেন যে এর সঙ্গে বাংলাও যুক্ত করা হোক। কিন্তু এই বাংলার প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যাত হলো। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com