জীবনী

খণ্ডিত জীবন (কিস্তি ২)

ফয়েজ আহ্‌মদ | ১ আগস্ট ২০১১ ১১:০৫ অপরাহ্ন

কিস্তি ১

(দ্বিতীয় কিস্তির পরে)
বাড়ি থেকে পালাইয়া যাওয়া ছাড়া মোটামুটি রেগুলার স্কুলে যাইতাম। আমাদের ষোলঘর হাইস্কুল ছিলো ছয় মাইলের মধ্যে একমাত্র। যদিও সাবডিভিশন অনুযায়ী চিন্তা করলে তখনকার দিনে সবচেয়ে বেশি স্কুল ছিলো বিক্রমপুরেই। তার একটা প্রধান কারণ আমার কাছে মনে হইছে, ওখানে কোনো কোনো জায়গায় ছিলো হিন্দুরা মাইনরিটি, কোনো কোনো জায়গায় হিন্দুরা মেজরিটি। কিন্তু হিন্দুরা যারা নাকি ভালো অবস্থার লোক ছিলো অর্থনৈতিকভাবে, তারা দান-দক্ষিণা করতো। তার মধ্যে স্কুল-কলেজ করা একটা। আর কয়েকটা জমিদার ছিলো বিক্রমপুরের ভিতরে–এই জমিদাররা পিপলের কোনো কাজে আসে নাই।

ফয়েজ আহ্‌মদ
……………
বিডিনিউজ২৪.কম অফিসে ফয়েজ আহ্‌মদ
……………

যেমন শ্রীনগরের জমিদার, সে অ্যান্টি-পিপল ছিলো। সে স্কুল-কলেজ করার বিরুদ্ধে ছিলো, করতে দিতো না বরং। আমি যে স্কুলে পড়ছি তার নাম সংক্ষেপে ষোলঘর হাইস্কুল। এইটা এর আসল নাম না। গ্রামের নাম ষোলঘর, তাই লোকে বলে ষোলঘর হাইস্কুল। এটার নাম হচ্ছে একেএসকে হাইস্কুল। আগেই বলছিলাম একেএসকে হইল অক্ষয়কুমার ও শশীকুমারের আদ্যক্ষর। এঁরা ছিলো দুই বন্ধু, গরিব কায়স্থ। স্কুল করা-টরা ইত্যাদি পাবলিক কাজ করার ব্যাপারে উৎসাহী।

তারা নিজেদের জমানো টাকা দিয়া হাইস্কুল করলেন, শ্রীনগর থেকে অদূরে। শ্রীনগরের জমিদার বাড়ির কাছাকাছি তো করাই যাবে না। জমিদাররা কোনো স্কুলই করতে দেয় না। যে, ছোটলোকে লেখাপড়া শিখবে, এটা তারা চান না। সেই জন্য শ্রীনগরের বাইরে দেলভোগ বাজারের (দেলভোগ হচ্ছে আরেকটা বাজার, শ্রীনগরের জমিদারদের সাথে ঝগড়া কইরা এই বাজার করা হইছিলো।) হাফ মাইল দূরে ষোলঘর গ্রামের শেষ প্রান্তে ওই দুই বন্ধু জায়গা কিনে স্কুলটা করলেন। দেখা গেলো, শ্রীনগরের জমিদার—যার লক্ষ লক্ষ টাকা—তারা একটা প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত করে নাই। কিন্তু দুই বৃদ্ধ বন্ধু—যাদের জায়গা-জমি নাই-ই প্রায়, যা আছে তা বিক্রি কইরা স্কুল দিছেন। সেই জন্য স্কুলটার খুব সুনাম হইয়া গেলো।
(সম্পূর্ণ…)

খণ্ডিত জীবন

ফয়েজ আহ্‌মদ | ২৪ জুলাই ২০১১ ৮:০৮ অপরাহ্ন
[এখানে আমার জীবনের কোনো কোনো অংশ নিয়ে খণ্ডিতভাবে এখনকার চলতি ভাষায় আপনাদের জন্য বলছি। জীবন এখানে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে না। বিভিন্ন পর্ব বা অধ্যায় নিয়ে কোনো সচেতন বাছাই ছাড়াই বলা হচ্ছে। আমার এই ‘খণ্ডিত জীবন’ আপনাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হলে আমি উপকৃত হবো।
–ফয়েজ আহ্‌মদ
]
fa_1a.jpg
(bdnews24.com অফিসে অতিথি ফয়েজ আহ্‌মদ, ছবি. ব্রাত্য রাইসু ২০১০)

আমাদের বাড়িতে পড়াশুনার একটা মিনিমাম পরিবেশ ছিলো। বাবায় লেখাপড়া জানতো বইলা গ্রামে একমাত্র আমাদের বাড়ি যেইখানে লেখাপড়ার একটা পরিবেশ ছিল। অনেক সময় মাস্টার রাখা হইত বাড়িতে। আমরা—চাচাতো ভাই, আমার ভাই একসাথে পড়তাম। গ্রামে ধর্মশিক্ষার ব্যাপার ছিলো। গ্রামের লোকজন নানারকম কথাবার্তা বলতো। সেইজন্য আমাদের বাড়ি ধর্মীয় ব্যাপারে সজাগ ছিলো। বাবা আমাদের ছেপাড়া পড়ার জন্য হুজুর ঠিক কইরা দিয়েছিলেন। আমাদের গ্রামের শব্দ হচ্ছে ছেপাড়া। ছেপাড়া মানে অধ্যায়। ত্রিশটা টুকরা, যেমন ত্রিশ ছেপাড়ায় কোরান শরীফ হয়।

প্রাইমারি স্কুল ছিলো না আমাদের গ্রামে। মাদ্রাসা দিয়াই পড়ালেখা শুরু হইতো। স্কুলে যাওয়ার জন্য মাদ্রাসা একটা ধাপ। আমাদের গ্রামে যে মাদ্রাসা, ছোট মাদ্রাসা, সেই মাদ্রাসায় যিনি প্রধান ছিলেন—তাঁর নাম গণি মাওলানা। গণি মাওলানা সাহেবের অসাধারণ কণ্ঠস্বর ছিলো। এবং অবিশ্বাস্য সুন্দর আজান দিতে পারতেন তিনি।

একদিন বাবার সাথে গণি মাওলানার কথাবার্তা ঠিক হইলো যে আমি পরদিন থেকে মাদ্রাসায় যাবো। বাংলা, ইংরেজি, অংকে হাতেখড়ির আগে মাদ্রাসা দিয়া আমার পড়া শুরু হইলো। আমাদের বাড়ির নিয়ম এইটা। প্রধান নিয়ম হচ্ছে—আমরা কোরান শরীফ শেষ করবো। তারপর জেনারেল স্কুলের জন্য পাঠ্যপুস্তকে চইলা যাবো।

ভোর সাতটায় মাওলানা সাহেব আসতেন মাদ্রাসায়, পড়াইতে। আমরা ভাইবোনরা মাদ্রাসায় যাইতাম সকালে। মেয়েরা আসতো মাথায় ঘোমটা-টোমটা দিয়া। আমরা এক ঘণ্টা পড়তাম আমাদের বাংলায়–বাংলা হইলো বৈঠকখানা। এই বৈঠকখানায়ই ছিলো মাদ্রাসা। ভাই বোন মিইলা পড়তাম। চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই—যারা যারা গ্রামে ছিলো।

আমি কোরান শরীফ ত্রিশ ছেপাড়া শেষ করছি। একবার রিডিং দেওয়া। অর্থ বুঝতাম না কোনো। একটা অক্ষরও হয়তো আমরা অর্থ বুঝলাম না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইম্পর্ট্যান্ট দুই-একটা জায়গায় হয়তো তাঁরা ব্যাখ্যা দিতেন—এই জায়গাটায় এই আছে। মওলানা আমাদের নামাজও শিখাইছেন। বাড়িতে মাওলানাই নামাজ-টামাজ পড়াইতেন। কিন্তু বাবা আমাদের নামাজে নিয়ে যেতেন না। (সম্পূর্ণ…)

জীবনের পাতায় পাতায় (৪)

বেবী মওদুদ | ১৫ মার্চ ২০১১ ২:৪৯ অপরাহ্ন

শুরুর কিস্তি কিস্তি ২
——————————–
স্মৃতিকথা ধারাবাহিক
——————————–
কিস্তি ৩-এর পর

যশোর রেলওয়ে স্টেশন বৃটিশ আমলের তৈরি। বলা চলে স্থলপথে কলকাতা যাবার এটাই প্রধান দ্বার। দর্শনা হয়ে বনগাঁ, কৃষ্ণনগর ও নদীয়া হয়ে রেলগাড়িতে চড়ে কলকাতা শিয়ালদহ স্টেশনে যাওয় যেত। এবার রেলগাড়িতে উঠে আমরা বগুড়া এলাম। দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়। তবে জানালা খুলে গ্রামীণ দৃশ্য দেখতে দেখতে এবং ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এই ভ্রমণ আমাদের খুব ভালো লাগতো। তখন তো আমরা পাঁচ ভাই ও দুই বোন। আব্বা একটা বগিই রিজার্ভ করে নিতেন। আমার মা রান্না করা খাবার সঙ্গে নিলেও রেলের খাবারও যথেষ্ট ভালো ছিল। মনে আছে আমরা রাতে বগুড়া শহরে পৌঁছাই।

2_1.jpg
বগুড়ায় ১৯৫৪ সালের সাব-জজ কোয়ার্টার এখন জজ কোয়ার্টার

বগুড়ার সাত মাথার কাছেই সুত্রাপুর এলাকায় আমাদের বাসা ছিল। বিরাট বাউন্ডারির ভেতরে আমাদেরটা ছিল সাবজজ কোয়ার্টার। আরও তিনটা বাসা ছিল মুনসেফ সাহেবদের জন্য। আমাদের বাসার সামনে ছিল খোলা বড় মাঠ। গেটটা বন্ধ রাখা ও খোলার দায়িত্ব ছিল একজন চাপরাশির। একজন নাইট গার্ডও থাকতো রাতের বেলা। আর আমার আব্বার সঙ্গে অফিসে যাতায়াত করতো একজন চাপরাশি। কোর্ট কাছেই ছিল বলে আব্বা হেঁটে যাতায়াত করতেন। বাড়িতে কাজের লোকজনও ছিল। তখনও হ্যারিকেন বাতিই ছিল ভরসা। ভেতরে বিশাল উঠোন। একদিকে রান্নাঘর, অন্যদিকে সেই আমলের কাঁচা পায়খানা। (সম্পূর্ণ…)

জীবনের পাতায় পাতায় (৩)

বেবী মওদুদ | ১০ সেপ্টেম্বর ২০১০ ৭:৪৬ অপরাহ্ন

শুরুর কিস্তি
——————————–
স্মৃতিকথা ধারাবাহিক
——————————–
কিস্তি ২-এর পর

ভারত ভাগের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাও ভাগ হলো। পাকিস্তানের প্রদেশ হলো পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতের প্রদেশ। আমার বাবা পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গে এসে প্রথমে খুলনা জজ কোর্টের সিনিয়র মুন্সেফ হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেন । তখনও ভিসা পদ্ধতি না থাকায় কলকাতা ও গ্রামের বাড়িতে আমাদের যাতায়ত ভালো ছিল। বাড়িতে
bm-18.jpg……..
বেবী মওদুদ, রাওয়ালপিন্ডি, কলেজে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নকালীন
……..
শিক্ষক এসে বড় দু’ভাইকে লেখাপড়া করাতেন। আমার বয়স তখন একবছর হবে। কোন স্মৃতি আমার মনে নেই। তবে মায়ের কাছে শুনেছি আমার খুব জ্বর হতো। রোগা পাতলা ছিলাম। খুলনার আশেপাশের বাড়ির মেয়েরা মায়ের কাছে আসতো, গল্প করতো সেলাই শিখতো। একটা ভালো আড্ডা হতো। আমার মা পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছেন-এটা তাঁরা খুব সহানুভূতির সঙ্গে দেখতেন। কলকাতার কথা শুনতেন। আমার বাবাকে কোর্টের কাজে বেশি ব্যস্ত থাকতে হতো। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা, স্বাভাবিক ভাবেই সবাই একটু অন্য চোখে দেখতো তাঁকে এবং তার কাজকর্মকে। আমাদের চাল-চলনও সবাই পর্যবেক্ষণ করতো। আমাদের পরিচয় হয়ে ওঠে রিফিউজি।

খুলনায় তখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেকে এসে বসবাস করতো। তাদের কেউ কেউ আমাদের বাসায় এলে সবাই সুখ-দুঃখের গল্প করতো। এখানকার ভালো মন্দ নিয়ে কথাও বলতো। সবার ধারণা ছিল, পাকিস্তানে যখন এসেছি তখন আর জানের ভয় নেই। দাঙ্গা হলেও মুসলমান চিহ্নিত করে কেউ মারতে আসবে না। তবে বাপ-দাদার ভিটে মাটি ছেড়ে এভাবে নতুন মাটিতে আশ্রয় নেয়ায় মনে সর্বদা আশঙ্কা ছিল। আমার মায়ের পছন্দ ছিল এখানকার মাছ-সব্জি এবং কাজের লোক। পেট ভরে ভাত খেতে পেলে অল্প বেতনে কাজ করতে রাজী হয়ে যেত। ফলে আমাদের বাড়ির কাজের লোকরা পরিবারের লোক হয়ে যেত। আমাদের কোলে পিঠে করে মানুষ করতো। বাড়িতে বয়স্কা মহিলা কাজ করতেন, যাকে আমরা বুজি বলে ডাকতাম।

খুলনায় আমরা তিন ভাই-বোন ঘরে বসেই খেলতাম। মাত্র পাঁচ-ছয় মাস থাকার পর আমার বাবাকে টাঙ্গাইল কোর্টে বদলি করা হয়। লঞ্চ চড়ে ঢাকা হয়ে রেলগাড়িতে ময়মনসিংহ হয়ে টাঙ্গাইল পৌঁছাতে খুব কষ্ট হয়েছিল আমাদের। টাঙ্গাইলে এসে আমার বড় ভাই জাহাঙ্গীর বিন্দুবাসিনী হাই স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখানে তিনি পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলেন। এখানে আসার পর আমার বাবা খুব খুশি হন। টাঙ্গাইলের মানুষের সাংস্কৃতিক আগ্রহ ও জীবনধারা তার পছন্দ হয়েছিল। (সম্পূর্ণ…)

জীবনের পাতায় পাতায় (২)

বেবী মওদুদ | ১০ জুলাই ২০১০ ৭:২৪ অপরাহ্ন

কিস্তি ১
——————————–
স্মৃতিকথা ধারাবাহিক
——————————–
(কিস্তি ১-এর পর)

কলকাতায় আমার জন্মের পর মা আমাকে বেবী জনসন পাউডার মাখাতেন। সেটা দেখে আমার বড় ভাই আমাকে বেবী বলে ডাকতে শুরু করে। আমার ডাক নাম হয়ে যায় বেবী। তবে আকিকা দিয়ে বাবা আমার নাম রাখেন আফরোজা নাহার মাহফুজা খাতুন। এত বড় নাম আমার ভালো লাগতো না বলে বড় হয়ে লেখালেখি করতে এসে আমি নিজেই আমার নাম বেবী মওদুদ রাখি। পরে অবশ্য এজন্য অনেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে, সেকথা পরে বলবো।

bm-letter.jpg…….
লেখকের মাকে লেখা বাবার চিঠি, ১৯৪৩
…….
আমার বাবা ও চাচারা ধুতি পরতেন। কলকাতা ছেড়ে আসার পর তিনি সবসময় পাজামা-পাঞ্জাবী এবং ঘরে লুঙ্গি পরতেন। তখন অবশ্য বাঙালি মাত্রই ধুতি, লুঙ্গি, পাজামা পরতেন। সেখানে হিন্দু-মুসলমান বলে কোনো দ্বন্দ্ব ও চিহ্নিত-করণ ছিল না। এখন অবশ্য ধুতিপরা মানুষ দেখাই যায় না। আমার বাবার কাছে শুনেছি তিনি সাড়ে তিনটাকা দরে ধান বিক্রি করেছেন। আমার মায়ের বাজারের খাতা খুলে দেখলাম, তিনি দুই আনা দরে গরুর গোস্ত, পাঁচ আনায় চার সের চাল, এক আনায় মাছ কিনেছেন। চাল ও পিয়াজ-রসুন গ্রাম থেকে আসতো।

আমার মায়ের মৃত্যুর পর তার সঞ্চয়ে কোনো অর্থ, গহনা, দামি শাড়ি পাইনি। কিন্তু পেয়েছি তার কাছে বিবেচিত যে পরম সম্পদ, তাহলো মাকে লেখা বাবার কিছু চিঠি, বাজার ও ধোবার হিসাবের খাতা, রান্নার রেসিপি লেখা, সিঙ্গার সেলাই মেশিনটি। আর পেয়েছি কলকাতায় কেনা আমার পড়ার টেবিল। বাবার লেখা চিঠিপত্রের কিছু কথা এখানে তুলে দিলাম।

bm-17.jpg…….
বেবী মওদুদ, কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্রী, ১৯৬৪
……..
২৮.১১.১৯৩৯ সালে বিয়ের পাঁচ মাস পর আমার মাকে লেখা চিঠি। বাবা শ্রী রামপুরে বদলি হয়ে যান। চিঠির কথা: “তোমার কাছ থেকে নিরাপদে এসেছি ও ভালো আছি। রাঁধুনী এসেছে। সে দেখতে খালেকের মামার মতো। এ ছোকরাকে খালেক জানে কারণ খালুজী যখন মধুপুর যাবার যুক্তি করেছিলেন সে সময় তিনি এই ছোকরাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এর বাড়ি মাড় গাঁয়ে। তোমাদেরই দেশে। মাহিনা সাত টাকা নেবে। কেমন রাঁধে, কাজ করে পরে জানাবো।”

চিঠি-২
২৭.০৪.১৯৪৩ সালে কলকাতা থেকে লেখা। আমার মা তখন বড় ছেলে জাহাঙ্গীরকে নিয়ে বামুন্ডিতে থাকতেন। চিঠির কথা:

“তোমার শরীর কেমন থাকে লিখো। খোকা বাবু এখন কেমন আছে? তার পায়খানা কেমন হয়, তার খাওয়া দাওয়া কেমন? কি খেতে চায় সব জানাবে। তার খাওয়া সম্বন্ধে বিশেষ ধরা কাটা করবে, একটুও এদিক ওদিক না হয়। তার শরীর সারছে কিনা লিখো। তাকে এখনও ওষুধ খাওয়ান হচ্ছে কি? সব কথা খুলে লিখো। (সম্পূর্ণ…)

জীবনের পাতায় পাতায় (১)

বেবী মওদুদ | ২৩ জুন ২০১০ ২:২৩ অপরাহ্ন

——————————–
স্মৃতিকথা ধারাবাহিক
——————————–

এক.
baby-maudud25.jpgসোমবার ২৩ জুন ১৯৪৮ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাসের থিয়েটার রোডে একটি তিন তলা
……..
বেবী মওদুদ
……..
বাড়ির ফ্ল্যাটে আমার জন্ম হয়। বাংলা ৯ আষাঢ় প্রায় বেলা একটা হবে। আমার মায়ের কাছে শুনেছি, সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, যাকে বলে মুষলধারে। তার শরীরটা সকাল থেকেই খারাপ লাগছিল বলে দাইকে খবর দেয়া হয়েছিল। আমার মায়ের যখন প্রসব ব্যথা ওঠে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এক তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন কবি সুফিয়া কামাল। তাঁকে খবর দেয়া হলে তিনি কাছে বসেন এবং দোয়া দরুদ পড়ে ফু দেন। তারপরই আমার জন্ম হয় এবং আমাকে প্রথম কোলে নিয়ে স্নেহচুম্বন করে আশীর্বাদ করেন। মা তাকে বলেছিলেন, বুবু দোয়া করবেন যেন আমার মেয়ে আপনার মত ভালো মানুষ হয়। আমার মা যখন কথাগুলো আমাকে বলছিলেন, তখন তার মুখখানা আনন্দে উজ্বল হতে দেখেছিলাম। বড় হয়ে যখন সুফিয়া কামালের স্নেহের পাত্রী হলাম, তখন তাঁকে মায়ের কথাগুলো বলেছি। তিনি হেসে বললেন, তোর মার দেখি সব মনে আছে।

am-pic.jpg……
বাবা আবদুল মওদুদ
…….
আমার বাবা তাঁর চেয়ে বয়সে তিন বছর বড় ছিলেন। বাবাকে তিনি ভাই ডাকতেন। বাবা তাকে বুবু বলে ডাকতেন। সেই সুবাদে আমি তাকে ফুপু ডাকতাম। তিনি আমার বাবার বড় বোনকে দেখেছেন, সেকথা আমাকে একদিন বলেছিলেন। কলকাতার এই বাড়িতে আরও অনেক কবি সাহিত্যিক, শিল্পী আসতেন। তাদের একটা ভালো আড্ডাস্থান ছিল। আমার বড় ভাইয়ের কাছে শুনেছি, শিল্পী জয়নুল আবেদীন ও শিল্পী কামরুল হাসান ট্রাম বা বাসের টিকেটের উল্টোপিঠে ছবি এঁকে দিতেন। কবি জসীমউদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন আহমেদ, কবি আহসান হাবীবও আসতেন এই বাড়িতে। পরবর্তীতে আমি বড় হয়ে তাদের মুখ থেকেও এসব কথা শুনেছি। সওগাত-সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন এবং তার কন্যা বেগম-সম্পাদিকা নূরজাহান বেগমের যাতায়াত ছিল এ বাড়িতে।

আমার বাবার পূর্বপুরুষরা বর্ধমানে বসবাস করতেন। খঙকোষ থানার ওয়ারী গ্রামে আমার দাদার বাড়ি। এখনও সেই গ্রামে আমাদের আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। আমার দাদা মাহফুজুল হক গ্রামের মসজিদের ইমাম ছিলেন। প্রচুর কৃষিজমি ছিল। একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার হিসেবে তারা জীবনযাপন করতেন। তিনি আরবী, ফার্সী ও বাংলা জানতেন। আমার বাবাও তাঁর কাছে ভালো আরবী ও ফার্সী শেখেন। আমার বাবা ছোটবেলায় পিতৃমাতৃহীন হলেও লেখাপড়ায় আগ্রহী ও মেধাবী ছিলেন। সংস্কৃতি শেখেন স্কুলে এবং ইংরেজীও লেখাপড়ার মাধ্যম হওয়ায় বেশ ভালো জানতেন। সাহিত্যের বই পড়ার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। ছাত্রজীবনে লেখার চর্চাও শুরু করেন। (সম্পূর্ণ…)

বেগম রোকেয়ার রচনায় লোকজ জীবন অভিজ্ঞতা

গীতা দাস | ২৪ নভেম্বর ২০০৯ ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

brokeya.jpg

১.
বেগম রোকেয়ার সাথে আমার প্রথম পরিচয় প্রাইমারীতে পড়ার সময়। তাঁর জীবনী পাঠ্য ছিল। রাতের অন্ধকারে বড় ভাইয়ের কাছে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ার কাহিনী আমাকে রোমাঞ্চিত করেছিল, নিজের পাঠের প্রতিও আগ্রহী করেছিল নিশ্চয়ই এবং ‘স্ত্রী-শিক্ষার’ উন্নতির বিষয়টিই গুরুত্ব দিয়েছিলেন আমার শিক্ষকেরা—নারীর অধিকার নয়।

মাধ্যমিক অথবা উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে পড়েছি সুলতানার স্বপ্ন কাহিনীর অংশ বিশেষ ‘নারীস্থান’। এটি পড়ানোর সময়ও শিক্ষকরা নারীর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও কল্পকাহিনীকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন—নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ণকে নয়।

বাংলা সম্মান শ্রেণীতে পাঠ্য ছিল বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিণী। পর্দা প্রথার খণ্ড খণ্ড ঘটনা। শিক্ষকরা অবরোধবাসিনী পড়াতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবেই এর সামাজিক প্রেক্ষাপটের কথা বলেছেন; কিন্তু নারীবাদ পড়াননি। রোকেয়া ও তার সৃষ্টি বুঝতে ও বোঝাতে যা পড়ানো ছিল অবধারিত ও অপরিহার্য। (সম্পূর্ণ…)

কিস্তি ৪

ছফামৃত

নূরুল আনোয়ার | ৯ নভেম্বর ২০০৯ ১০:১৭ পূর্বাহ্ন

শুরুর কিস্তি

(কিস্তি ৩-এর পর)

sofa_4.jpg
আহমদ ছফা

সন্তোষবাবুর ঘটনার জের ধরে ওইদিন ছফা কাকার সঙ্গে আরেক ভদ্রলোকের পরিচয় হয়েছিল। ভদ্রলোক সন্তোষবাবুর পাশের ঘরে ছিলেন। তিনি ছফা কাকার সঙ্গে তর্কাতর্কি শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং ছফা কাকাকে সন্তোষবাবুর খপ্পর থেকে উদ্ধার করে নিজের ঘরে নিয়ে
—————————————————————–
“বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা ম্যানাস্ক্রিপ্ট নিয়ে তাঁকে [মফিজ চৌধুরী] খুঁজতে এলাম।… ম্যানাস্ক্রিপটা যখন দিলাম বললেন, আহমদ ছফা সাহেব কে?… উনি মনে করেছেন আহমদ ছফা সাহেবের ম্যানাস্ক্রিপটা আমি চুরি করে নিয়ে গেছি। তখন আমি দেখি যে সব বুর্জোয়ারা একই রকম! চলে আসছি, উনি গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, তুমি গাড়িতে ওঠ। গাড়িতে ওঠার পরে তাঁর ইন্দিরা রোডের বাড়ির সামনে নামতে গিয়ে দেখি পকেটে শ’য়ে শ’য়ে টাকা।… আমি ভাবলাম, আমি পরীক্ষা দেব টাকা নেই, আর এই লোক পকেটে এত টাকা নিয়ে যাচ্ছে। গাড়িটা যখন গেটের কাছে থেমেছে ম্যানাস্ক্রিপটা রেখে পকেট থেকে এক শ’ টাকা যতগুলো পেয়েছি নিয়ে বললাম যে ম্যানাস্ক্রিপ্ট জমা রইল আমি টাকাটা নিয়ে যাচ্ছি।… পরীক্ষা যখন পাশ করে গেলাম, ভাল রেজাল্ট করলাম প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে, তখন তাঁর কাছে টাকা দিতে গেলাম। বললেন যে এগুলো কর্জে হাসানা।”
—————————————————————-
বসিয়েছিলেন। তাঁর কাছ থেকে নানা কথা শুনতে হয়েছিল। বোধহয় ছফা কাকাকে ভদ্রলোকের মনে ধরেছিল। ছফা কাকাকে তিনি আর কখনও আসলে সোজা তাঁর কাছে চলে আসতে বলেছিলেন। তিনি সন্তোষবাবুকে ইঙ্গিত করে বললেন, ভদ্রলোক একটু পাগলা কিসিমের, কিন্তু মানুষটা ভাল। (সম্পূর্ণ…)

কিস্তি ২

ছফামৃত

নূরুল আনোয়ার | ২৮ আগস্ট ২০০৯ ২:০৭ পূর্বাহ্ন

শুরুর কিস্তি

(কিস্তি ১-এর পর)
sofa-23.jpg…….
আহমদ ছফা (জন্ম. চট্টগ্রাম ৩০/৬/১৯৪৩ – মৃত্যু. ঢাকা ২৮/৭/২০০১)
…….
আমাদের মূল বাড়িটা ছিল দোতলা। তাতে রেলিং বারান্দা ছিল, যদিও ওটা ছিল মাটির ঘর। বাড়িটির ওপরে ছিল টিনের ছাউনি। তার সামনে ছিল লম্বা কাছারি ঘর। কাছারি ঘরের একটা কক্ষে থাকতেন ছফা কাকা। শুনতে পাই, তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি এক সময় ভেঙে গেলে বেশ কয়েক বছর এ কাছারি ঘরটিকে স্কুল হিসেবে ব্যবহার করা হত। মূল বাড়িটা এখন আর নেই। ঊনিশ শ’ একান্নব্বই সালের ঘূর্ণিঝড়ে সেটি ভেঙে গিয়েছিল। পরে ঠিকঠাক করা হলেও ১৯৯৩ সালে বাড়িটি সম্পূর্ণভাবেই নষ্ট হয়ে যায়। যা হোক, মূল ঘর এবং কাছারি ঘরের মাঝখানে ছিল সুবিশাল উঠোন। আমরা ছোটকালে দেখেছি এই উঠোনের একপাশে নানা জাতের ফুলের গাছ। সাধারণত ওই এলাকায় কোনো মুসলিম পরিবার ফুলের গাছ লাগানো হত না। ফুলগাছ লাগাত হিন্দুরা। হয়ত পূজা-অর্চনার জন্য ফুলের দরকার ছিল বলে তারা ফুলগাছ লাগাত। মুসলমানদের পূজাও করতে হয় না, তাই ফুলেরও দরকার পড়ে না। কিন্তু ফুলগাছের জন্য আমাদের বাড়িটা ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এ সকল ফুলের গাছ কাকা হিন্দুপাড়া থেকে এনে লাগিয়েছিলেন। তিনি কারও কাছে গাছ চেয়ে না পেলে পরদিন মালিকের অগোচরে তা উঠিয়ে নিয়ে আসতেন। গাছ লাগানোর যে বাতিক সেটা তাঁর ছোটবেলা থেকে ছিল।

ফুলের পাশাপাশি তাঁর আরেকটা জিনিসের প্রতি আগ্রহ ছিল সেটি হল বই। কোনো বই পছন্দ হলে সেটি হাতে না পাওয়া পর্যন্ত নিস্তার ছিল না। একটা ঘটনা এরকম :

sofa-jonmo-bari.jpg…….
যে বাড়িতে আহমদ ছফা জন্মেছিলেন। আড়াই তলা এই মাটির বাড়িটি এখন আর নেই। ছবি: আহমদ ছফা ১৯৯১
……..
কাকা হিন্দুপাড়ার কালি মন্দিরে গিয়ে দেখতে পান রামায়ণ, মহাভারত। তাঁর ইচ্ছে তিনি বই দুটি এনে পড়বেন। কিন্তু মন্দিরের ঠাকুর মশায় তাঁকে বই দুটি দিতে রাজি নন। পরের দিন ছফা কাকা কোন ফাঁকে গিয়ে বই দুটি নিয়ে আসেন। ঠাকুর মশায় তাঁর বই না পেয়ে ধারণা করেছিলেন এটা ছফারই কাণ্ড। তিনি হন্তদন্ত হয়ে আমাদের বাড়িতে ছুটে এসেছিলেন। হিন্দুদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের একটা সুন্দর সম্পর্ক ছিল। ফলে আমার দাদা তাঁকে বসতে দিয়ে আপ্যায়ন করিয়েছিলেন। নানা কথা বলতে বলতে তিনি সবিশেষ জানতে পেরেছিলেন ছফা কাকা কালি মন্দির থেকে বই চুরি করেছেন। ছেলের এমন অপকর্মের কথা শুনে আমার দাদা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন। ইতোমধ্যে ঠাকুর মশায়ের আগমন টের পেয়ে ছফা কাকা আগেই সরে দাঁড়িয়েছেন। (সম্পূর্ণ…)

কিস্তি ১

ছফামৃত

নূরুল আনোয়ার | ২৮ জুলাই ২০০৯ ৬:৪২ পূর্বাহ্ন
লাইফ ইজ এ কম্প্রোমাইজ তত্ত্বে ছফার আস্থা নেই। আজকের বাংলাদেশে এমনি পষ্ট ও অপ্রিয়ভাষী আরো কয়েকজন ছফা যদি আমরা পেতাম, তাহলে শ্রেয়সের পথ স্পষ্ট হয়ে উঠত।
আহমদ শরীফ, ১৯৭২

04.jpg
আহমদ ছফা (জন্ম. চট্টগ্রাম ৩০/৬/১৯৪৩ – মৃত্যু. ঢাকা ২৮/৭/২০০১)

[২০০৯-এর জুলাই ২৮ তারিখে আহমদ ছফার মৃত্যুর আট বছর পূর্ণ হলো। জীবিত অবস্থায় আহমদ ছফাকে নিয়ে লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নানান বিতর্ক ছিল। মৃত্যুর পরে তিনি এক অর্থে সে সব বিতর্ক ছাপিয়ে গুরুতর হয়ে উঠছেন। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তাঁকে নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে ও হচ্ছে। প্রায় সকলেই তাঁকে কাছে থেকে দেখেছেন এবং অন্তরঙ্গ ভাবে লিখেছেন। একই ছফা নানারূপে আবির্ভূত হয়েছেন সেসব লেখালেখিতে। আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র নূরুল আনোয়ার তাঁর সঙ্গে ছিলেন ১৭ বছর। কাছ থেকে তিনি পিতৃব্য আহমদ ছফাকে যেভাবে দেখেছেন তা তুলে ধরেছেন ছফামৃত লেখাটিতে। আর্টস-এ আট থেকে দশ কিস্তিতে লেখাটি প্রকাশিত হবে। বি. স.]

কিস্তি ১
ছোটকাল থেকে আমি ছফা কাকাকে একজন অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে বাবা হয়ে শাসন করেছেন, গুরু হয়ে শিক্ষা দিয়েছেন এবং বন্ধু হয়ে আমাকে ভালবাসার গল্প শুনিয়েছেন। সুতরাং তিনি একাধারে আমার বাবা, আমার শিক্ষাগুরু এবং আমার বন্ধু। আজকের ছোটখাটো আমার যা অর্জন সবই ছফা কাকার বদৌলতে। তিনি পরিবারের একজন বলেই আমার প্রতি কর্তব্য করেছেন একথা আমি বলব না, খোঁজ নিলে দেখা যাবে পরিবারের ভেতরে বাইরে এ ধরনের দায়িত্ব তিনি আরও অনেকের নিয়ে থাকবেন। এসব কথা এ লেখার মুখ্য বিষয় নয়। তারপরেও ঘটনার প্রেক্ষিতে কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা হয়ত এসে যেতে পারে, যেগুলো না হলে লেখার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা আমার পক্ষে সম্ভব না-ও হতে পারে।

sofa_sultan.jpg……..
শিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে
……..
ছফা কাকার জন্ম চট্টগ্রাম জেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে ঊনিশ শ’ তেতাল্লিশ সালের ত্রিশে জুন। তাঁর মেট্রিকুলেশন সার্টিফিকেটে উল্লেখ পাওয়া যায় তাঁর জন্ম ঊনিশ শ’ বিয়াল্লিশ সালে। মেট্রিক পরীক্ষার সময়ে বয়স কম হওয়ার জন্য এক বছর কমিয়ে ঊশিশ শ’ বিয়াল্লিশ সাল দেখানো হয়েছিল বলে ছফা কাকা তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেছেন।

এক সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারে ছফা কাকার জন্ম। তাঁর বাবার নাম হেদায়েত আলি। মা আসিয়া খাতুন। তাঁর সাত আট পুরুষ আগে শ্রীমল্ল নামের একজনের পরিচয় পাওয়া যায়। তারই নামানুসারে পরিবারটি শ্রীমল্ল বংশ নামে পরিচিত। শ্রীমল্লের কী পেশা ছিল বলা মুশকিল। তবে তাঁর পরের বংশধরদের কারও কারও নামের পাশে সওদাগর খেতাবটির উল্লেখ আছে। অনুমান করা যায় তাঁদের কেউ কেউ হয়ত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। তাঁরা যা-ই করুন, তাঁদের আদি পেশা যে কৃষি ছিল তাতে কোনো ভুল নেই।
—————————————————————–
তাঁর পূর্ব-পুরুষ লাঙল ব্যবহার করে নিজেদের উন্নতির পথটি প্রশস্ত করেছিলেন। ঊনিশ শ’ চুরান্নব্বই সালে আমার বড় ভাইকে স্থানীয় বাজারে একটি বইয়ের দোকান দিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন ছফা কাকা। তিনি ওই দোকানটির নামকরণ করেছিলেন ‘লাঙল গ্রন্থালয়’।…আমি তাঁর পালকপুত্র সুশীলকে নিয়ে ফার্মগেটের দোকান থেকে একটি বড় আকারের সাইন বোর্ড লিখিয়ে এনেছিলাম এবং এটি ঢাকা থেকে বাসে করে চট্টগ্রামের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। গ্রামের লোক এ সাইন বোর্ডের মর্মার্থ বুঝতে না পারলেও একটা জিনিস ভালভাবে অনুমান করেছিল আহমদ ছফা এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছেন, তা নইলে দোকানের নাম ‘লাঙল গ্রন্থালয়’ হবে কেন?
—————————————————————-
ছফা কাকার এক পূর্ব-পুরুষ আল্লাহর সাধনা করতেন। তাঁর নাম ছিল আজিজ ফকির। তিনি চিরকুমার ছিলেন। ছফা কাকার বাড়ি থেকে তিন মাইল পুবে জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ে তিনি বাস করতেন। শোনা যায় তখন সেখানে বড় বড় বৃরে সমারোহ ছিল। বাঁশ, বেত ইত্যাদি সংগ্রহ করতে মানুষকে ওই পর্যন্ত গেলেই চলত। সেখানে বন্যপ্রাণীর উৎপাতও কম ছিল না। এখন সে জঙ্গলও নেই, বন্যপ্রাণীও নেই। মনুষ্যবসতি এতদূর প্রসারিত হয়েছে যে আগে যে ঘন বন ছিল সেটা অনুমান করা এক রকম দুষ্কর। তবে এখনও ছোট ছোট পাহাড়ের অস্তিত্ব বিদ্যমান। এই পাহাড়গুলো স্থানীয় ভাষায় টিলা নামে পরিচিত।

যুগ যুগ ধরে এ সাধক পুরুষটির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধের কমতি ছিল না। শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পাহাড়ে তাঁর একটা মাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই মাজারে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে নানা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। প্রতি বছর তাঁর নামে ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মাজারে ফকিরের ব্যবহৃত একটি পাটা এবং বাটনা রয়েছে যেগুলোকে মানুষ এখনও ভক্তিভরে স্পর্শ করে। এই সাধক পুরুষের নামে অনেক আজব গল্প প্রচলিত আছে। একটি ঘটনা এই রকম:

আজিজ ফকির বাঘ পুষতেন। তিনি বাঘের গলায় ডোলা ঝুলিয়ে পাশের বরুমতি নদীতে মাছ ধরতেন এবং সেই মাছ সাধক সাহেব বাঘকে নিয়ে খেতেন। একদিন বাঘ আজিজ ফকিরের মুখের কাছে মুখ এনে গন্ধ নিতে আরম্ভ করল। বাঘের এ কাণ্ড দেখে তিনি আহত হলেন। তিনি বললেন, এই যে বাঘ, আমি তোদের রেখে কোনোদিন কিছু খাইনি। আজ তোদের না জানিয়ে নদীতে ভেসে আসা একটা পেয়ারা খেয়েছিলাম, এতে যদি তোরা আমার দোষ ধরিস আমাকে খেয়ে ফেল? বাঘেরা কাল বিলম্ব না করে তাঁকে খেয়ে ফেলেছিল। (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা |

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com