বিতর্ক

জাফর ইকবাল, জিয়া হায়দার রহমান ও মৃত্যু সমাচার

সাগুফতা শারমীন তানিয়া | ২৫ december ২০১৪ ১০:৫৬ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ মৃত আর বাংলাদেশ মৃতদের দেশ এই দুইয়ের ভিতরে সামান্য কিন্তু দুর্লঙ্ঘ্য ফারাক আছে। বাংলাদেশকে মৃত বলা একটি ঢালাও প্রতিবেদন, আর বাংলাদেশ মৃতদের দেশ এই বলার ভিতরে সত্যদর্শীর অভিমান। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বিতর্ক করার সময় ডক্টর মুহম্মদ জাফর ইকবালের জীবন এবং কথার উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা আশাব্যঞ্জকভাবে ইতিবাচকভাবে বিতর্ক শেষ করতাম, ওঁর নাম ওঁর ভূমিকা ওঁর দেশে ফিরে আসা এইসবই বাংলাদেশের জন্যে একটি গৌরবের চিহ্ন বলে আমরা বিশ্বাস করতাম, এখনো করি। কিন্তু এবারে তাঁর একটি লেখা পড়ে এবং লেখাটির পিছনের ‘আর্মচেয়ার ফিলসফি’ দেখে আমার মনে হয়েছে আমি কিছু বলতে চাই।

আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশের যে কোনো অবিচার-অনাচার নিয়ে কথা বলতে গেলেই যাঁরা হৈহৈ করে ওঠেন, যেকোনো অন্যায়ের জাতীয়ভাবে প্রতিবাদ করতে গেলেই যাঁরা ‘দেশের সুনাম গেল’ বলে বিবৃতি দেন, বিদেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ডোবানো গেল– এইসব বলেন তাঁদের বলবার ভঙ্গির সাথে মুহম্মদ জাফর ইকবালের এই লেখাটির আশ্চর্য্য মিল। (সম্পূর্ণ…)

হে ফেস্টিভেল নিয়ে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামত

রাশেদ শাওন | ১৬ নভেম্বর ২০১৩ ৯:২০ অপরাহ্ন

সম্প্রতি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে যে হে ফেস্টিভ্যাল হয়ে গেলো (১৪-১৬ নভেম্বর) তা গতবারের চেয়েও তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে আমাদের কয়েকজন বিশিষ্ট সৃষ্টিশীল ব্যক্তির মতামত প্রদান করা হলো। (সম্পূর্ণ…)

রবি ঠাকুর, রাহাজানি এবং রবীন্দ্র পূজারীবৃন্দ

| ৮ সেপ্টেম্বর ২০১১ ৭:২৯ অপরাহ্ন

ফরিদ আহমেদঅভিজিৎ রায়

tagore-smiling.jpg ………
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১)
………

কোনো এক বিচিত্র কারণে আমাদের দেশে প্রায় সব খ্যাতিমানদের একটা সময় পরে মাথায় তোলা শুরু করি আমরা। মানুষ থেকে ক্রমে ক্রমে প্রথমে মহামানব, পরে দেবতা বানিয়ে ফেলি তাঁদের। হয়তো নিজেরা অক্ষম বলে, দুর্বল বলে যে হীনম্মন্যতায় আমরা ভুগি, সেই হীনম্মন্যতা লুকোনোর জন্যই দেবতার প্রয়োজন হয়ে পড়ে আমাদের। একটা সময় পর্যন্ত হয়তো কেউ এটা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। কিন্তু আজকের এই যুগে এসে এটাকে আর মেনে নেওয়া যায় না। সময়ের প্রয়োজনেই আজকে দরকার হয়ে পড়েছে দেবোত্তর দেয়ালকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে আসল মানুষগুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা। শুধু ভাল ভাল দিক নয়, তাঁদের কোনো অন্ধকার দিক থাকলেও সেটাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। এই কাজটা করা হবে কোনো প্রতিহিংসা থেকে নয়, তাঁদেরকে অবমাননা করা বা অপমান করার মানসিকতা থেকে নয়। বরং সত্যকে কঠিন এবং নির্মমভাবে তুলে ধরাটাই হবে মূল উদ্দেশ্য। রবি ঠাকুরের ভাষাতেই, সত্য যে কঠিন, সেই কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।

আবর্জনাকে রবীন্দ্রনাথ প্রশংসা করলেও আবর্জনাই থাকে।– হুমায়ুন আজাদ


বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য স্রষ্টা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর মত এরকম দুহাত উজাড় করে বাংলা সাহিত্যকে এত রত্নভাণ্ডার আর কেউ উপহার দিতে পারে নি। ঊনিশ শতকের এক দরিদ্র সাহিত্যের অধিকারী বাংলাকে তিনি প্রায় একক প্রচেষ্টাতেই জাতে তুলেছেন, সমৃদ্ধকর করে তুলেছেন। বিশ্বসভায় বাংলা সাহিত্যকে সগৌরবে উচ্চ আসনে বসিয়েছেন। নিরন্তর সৃষ্টি করেছেন তিনি। তাঁর মত এরকম ঐকান্তিক একাগ্রতায় সারা জীবনব্যাপী শুধুমাত্র সাহিত্য সৃষ্টি আর কোনো সাহিত্যিকের দ্বারা সম্ভবপর হয় নি। না এই অঞ্চলে, না সারা বিশ্বে। সচ্ছল পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে জীবিকা নিয়ে তাঁকে তেমন করে ভাবতে হয় নি কখনো। ফলে, আমৃত্যু তিনি সার্বক্ষণিক সাহিত্য সৃষ্টির জন্য অফুরান সময় পেয়েছেন। আর সেই সুযোগকে পূর্ণভাবে তিনি কাজে লাগিয়েছেন তাঁর অবিরাম আগ্রহ, নিরলস প্রচেষ্টা এবং ক্লান্তিহীন লেখালেখির মাধ্যমে। সেই কৈশোর বয়স থেকে যে তরী তিনি ভাসিয়েছেন সাহিত্যের স্রোতস্বিনীতে, তার সফল সমাপন ঘটেছে মরণ সাগরের তীরে এসে।
—————————————————————-
আমাকে ডেকে সস্নেহে পাশে বসালেন, কুশল প্রশ্ন করলেন। তারপর বললেন, “দেখো, বিশ্বপরিচয় লিখতে লিখতে দেখলুম এর ভাষাটা আমারই হয়ে গেছে, তাই এর মধ্যে তোমাকে কোথাও স্থান দিতে পারলুম না।” একটু থেকে বললেন, “অবশ্য তুমি শুরু না করলে আমি সমাধা করতে পারতুম না, তা ছাড়া বিজ্ঞানের অনভ্যস্ত পথে চলতে শেষপর্যন্ত এই অধ্যবসায়ীর সাহসে কুলাতো না। তুমি ক্ষুণ্ণ হয়ো না।”
—————————————————————-
দুঃখজনক হলেও এটা সত্যি যে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এত বছর পরেও রবীন্দ্র মূল্যায়ন সঠিকভাবে হয় নি। একদল যেমন ভক্তিরসে ভরপুর হয়ে তাঁকে পুজো করে ছাড়ছে, অন্য দল তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদগার বর্ষণ করে চলেছে, মূলতঃ সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এই দুয়ের মাঝামাঝি থেকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নির্মোহ এবং নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা নেই বললেই চলে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই সমস্যাটা আজকের নয়। তিনি জীবিত থাকা অবস্থা থেকেই এটা চলে আসছে। (সম্পূর্ণ…)

বঙ্কিমচন্দ্র–রবীন্দ্রনাথ ধর্মতর্ক

| ৪ মে ২০১১ ১২:৩৪ অপরাহ্ন

[বঙ্কিমচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথ–উভয়েরই ধর্মীয় তৎপরতা ছিল তৎকালীন কোলকাতায়। হিন্দু ধর্ম নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের কতগুলো প্রস্তাব ছিল এবং সেগুলো তিনি পত্রিকায় (নবজীবন এবং প্রচার) প্রবন্ধ লিখে এবং বই প্রকাশ করে প্রচার করতেন। আর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্ম। ব্রাহ্ম ধর্মের মুখপত্র তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র একজন সম্পাদক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এছাড়া তিনি ‘ভারতী’ সম্পাদনা করেছেন।

n3061570391_2088.jpg……….
বঙ্কিমচন্দ্র, ১৮৩৮–১৮৯৪

………

এই চারটি পত্রিকায় উভয়ে নিজ নিজ ধর্মমতের পক্ষে লিখেছেন।বঙ্কিমচন্দ্রের জবানিতে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন যার লক্ষ্য ছিল বঙ্কিমচন্দ্র, পরে এটি বাংলা ১২৯১ সালের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘একটি পুরাতন কথা’  শিরোনামে। এর জবাবে বঙ্কিমচন্দ্র ‘প্রচার’ ১২৯১ অগ্রহায়ণ সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ লেখেন ‘আদি ব্রাহ্ম সমাজ ও নব হিন্দু সম্প্রদায়’ নামে। রবীন্দ্রনাথ জবাব দেন ‘ভারতী’র পরবর্তী সংখ্যায় (পৌষ, ১২৯১) ‘কৈফিয়ত’ লিখে। বঙ্কিমচন্দ্র আর জবাব দেননি। ‘আদি ব্রাহ্ম সমাজ ও নব হিন্দু সম্প্রদায়’-এ আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন এ নিয়ে আর লিখবেন না। ফলে কোন প্রকাশিত উত্তর নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে এই প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন।

robindonath1.jpg………
রবীন্দ্রনাথ, ১৮৬১–১৯৪১
……….

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ বঙ্কিমচন্দ্র অধ্যায়ে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন:

“এই বিরোধের অবসানে বঙ্কিমবাবু আমাকে যে একখানি পত্র লিখিয়াছিলেন আমার দুর্ভাগ্যক্রমে তাহা হারাইয়া গিয়াছে— যদি থাকিত তবে পাঠকেরা দেখিতে পাইতেন, বঙ্কিমবাবু কেমন সম্পূর্ণ ক্ষমার সহিত এই বিরোধের কাঁটাটুকু উৎপাটন করিয়া ফেলিয়াছিলেন।”–রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র/জীবনস্মৃতি

ভারতী এবং প্রচারে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই লিখিত তর্ক আর্টস-এ পুনঃপ্রকাশ করা হলো।–বি.স.]

—————————————————-

১. বঙ্কিমচন্দ্র বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ

একটি পুরাতন কথা

অনেকেই বলেন, বাঙালিরা ভাবের লোক, কাজের লোক নহে। এইজন্য তাঁহারা বাঙালিদিগকে পরামর্শ দেন practical হও। ইংরাজি শব্দটাই ব্যবহার করিলাম। কারণ, ওই কথাটাই চলিত। শব্দটা শুনিলেই সকলে বলিবেন, ‘হাঁ হাঁ, বটে, এই কথাটাই বলা হইয়া থাকে বটে।’ আমি তাহার বাংলা অনুবাদ করিতে গিয়া অনর্থক দায়িক হইতে যাইব কেন? যাহা হউক তাহাদের যদি জিজ্ঞাসা করি, practicalহওয়া কাহাকে বলে, তাঁহারা উত্তর দেন– ভাবিয়া চিন্তিয়া ফলাফল বিবেচনা করিয়া কাজ করা, সাবধান হইয়া চলা, মোটা মোটা উন্নত ভাবের প্রতি বেশি আস্থা না রাখা, অর্থাৎ ভাবগুলিকে ছাঁটিয়া ছুঁটিয়া কার্যক্ষেত্রের উপযোগী করিয়া লওয়া। খাঁটি সোনায় যেমন ভালো মজবুত গহনা গড়ানো যায় না, তাহাতে মিশাল দিতে হয়, তেমনি খাঁটি ভাব লইয়া সংসারের কাজ চলে না, তাহাতে খাদ মিশাইতে হয়। যাহারা বলে সত্য কথা বলিতেই হইবে, তাহারা sentimental তরলোক, কেতাব পড়িয়া তাহারা বিগড়াইয়া গিয়াছে, আর যাহারা আবশ্যকমতো দুই-একটা মিথ্যা কথা বলে ও সেই সামান্য উপায়ে সহজে কার্যসাধন করিয়া লয় তাহারা Practical লোক।
(সম্পূর্ণ…)

চিন্তার সংকট: সাহিত্যের স্বাধীনতা: মানুষের মুক্তি

প্রসঙ্গ হাসান আজিজুল হকের কার্তেসীয় পদ্ধতি এবং সাহিত্যে আত্মঘাতী বোমাবাজির প্রবণতা

সেলিম রেজা নিউটন | ২ december ২০১০ ৮:১৬ অপরাহ্ন

hassan_aziz.jpg
হাসান আজিজুল হক।
ছবি: মোস্তাফিজ মামুন

……….

[হাসান আজিজুল হকের “সাহিত্য সমালোচনা কীভাবে সম্ভব” দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রতি শুক্রবার ক’রে প্রকাশিত ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে দুই কিস্তিতে মুদ্রিত হয়েছিল ২০০৭ সালের ২৯শে জুন ও ৬ই জুলাই তারিখে। সেটিকে উসিলা করে সেলিম রেজা নিউটন এই লেখাটি লিখেছেন। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে, সালেহ মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ সম্পাদিত, খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘ছোটকাগজ’ কাকতাড়ুয়া’-এ। বাংলা সাহিত্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ নিয়ে চিন্তা ও দার্শনিক তর্কমূলক নিবন্ধটি আর্টস-এ পুনঃপ্রকাশিত হলো।–বি.স.]

প্রথম কাণ্ড: সাহিত্য লইয়া কী করিব?

কত না মিথ্যা জিনিসে আমি বিশ্বাস করতাম, আর সেসবের ওপর দাঁড়ানো আমার বিশ্বাসগুলোর কাঠামো কত না সংশয়াকীর্ণ ছিল তা ভেবে কয় বছর আগে আমি চমকে গিয়েছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে স্থিতিশীল ও টিকে থাকার মতো কোনো কিছু যদি আমি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে আমার দরকার-জীবনে স্রেফ একবারের জন্য-প্রত্যেকটা জিনিস সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া এবং একেবারে গোড়া থেকে আবার শুরু করা।

রেনে দেকার্ত ১৬৩৯, অনুবাদ বর্তমান প্রাবন্ধিকের

হাসান আজিজুল হক, দেখতে পাচ্ছি, বোমাবাজ হয়ে উঠছেন। আত্মঘাতী বোমাবাজ: বোমা যেহেতু আত্মাকেই আঘাত করে–বস্তুর আর প্রাণীর আত্মাকে–এবং নিজের আত্মাকে হত-বিকৃত না-করে যেহেতু কারও প্রতিই বোমাপ্রবণ হওয়া যায় না।

ভিক্ষুকের ডাকাডাকিতে টের পাই শুক্রবার হয়েছে, আজ সাহিত্য। পাতা খুলে দেখি প্রথম আলোর ‘সাহিত্য সাময়িকী’ মারফত বোমা এসে হাজির: সাহিত্যের সমালোচনা কীভাবে সম্ভব[১] (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-খ; বর্তমান প্রবন্ধ-পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য) এবং তার প্রথম বাক্যটা হচ্ছে, সাহিত্যের সমালোচনা কি আদৌ সম্ভব?। বোমা নয় তো কী? বোমাবাজ যে হয়ে উঠেছেন হাসান, সেটা টের পাওয়া গিয়েছিল এ বছরের ৭ই জানুয়ারি, বাংলাদেশের বৃহত্তম সাহিত্য-সমালোচক-প্রতিষ্ঠান প্রথম আলোর দেওয়া পুরস্কার নিতে যখন তিনি ঢাকা শেরাটন হোটেলের বলরুমে ঢুকেছিলেন।

আমাদের দেশে অবশেষে তৃণমূল পর্যায় অতিক্রম করে যে সাহিত্য এখন শেরাটনে, তাতে ‘এখনো আঁস্তাকুড়মুখী’ (মলয় ভৌমিক, ২০০৮: ৫) এই লেখকের কোনো হতাশা বা উল্লাস বা অন্য কোনো অনুভূতি বা মন্তব্য সম্পর্কে পুরস্কার-দাতাদের পত্রিকার সচিত্র প্রতিবেদনে কিছুই জানা যায় না (নিজস্ব প্রতিবেদক, ২০০৭)। “সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, চাষী-মজুরের জীবনযাত্রার সঙ্গে …সুপরিচিত”, “সিরিয়াস আপোষহীন লেখক” হাসান যে এখন জীবনের শেষ পর্যায়ে টপক্লাস বড়লোকদের জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হচ্ছেন সে বিষয়ে হয়ত কখনো তিনি লিখবেন–সে আশা করতে অবশ্য দোষ নেই (“কেন হাসান আজিজুল হক”, সম্পাদকীয় রচনা, রবিন ঘোষ, বিজ্ঞাপনপর্ব, ১৯৮৮: ৮)। তো, ঐ অনুষ্ঠানেই, ‘সৃজনশীল শাখা’য় ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই: ১৪১২’-র পুরস্কারে হাতেনাতে ভূষিত হওয়ার মুহূর্তে দেওয়া অভিভাষণে, কর্পোরেট-পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট সাহিত্যের ভরা মজলিশে প্রথম বোমাটা মেরেছিলেন হাসান:

… আজকাল এটাই মনে হয় যে লেখা অবশ্যই ছেড়ে দেওয়া উচিত; আর সাহিত্য নিয়ে কী করব? এমন একটা দেশে-সমাজে, কিংবা আমি বলব, এমন একটা পৃথিবীতে আমরা বাস করছি, যেখানে কেবল জান্তব বেঁচে থাকা এবং সেই জান্তব বেঁচে থাকাকে অতিশয় উন্নত করার বাইরে মানুষের জীবন যাপনের মধ্যে আর কিছু নেই। … কতদিন আগে বঙ্কিমচন্দ্র বলে গেছেন, এ জীবন লইয়া কী করিব? আজকে আমি এই প্রশ্নটা আপনাদের সামনে তুলব। বলুন আপনারা, সাহিত্য নিয়ে আপনারা কী করবেন? সংগীত নিয়ে আপনারা কী করবেন? চিত্রকলা নিয়ে আপনারা কী করবেন? আমরা যদি নিজেদের বিবেকের কাছে সৎ থাকি, তাহলে প্রশ্নের জবাব আমাদের কারও কাছেই নেই। (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭-ক; মোটা হরফ বর্তমান লেখকের) [বর্তমান লেখায় হাসানের এক নম্বর উদ্ধৃতি]

(সম্পূর্ণ…)

বিতর্ক

লেখার ভাষা :: মুখের ভাষা

| ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ৯:৪০ পূর্বাহ্ন

অনলাইন বৈঠকে যে কেউ অংশগ্রহণ করতে পারবেন। শুধু বাংলা ভাষায় লেখা প্রতিক্রিয়াই গ্রহণ করা হবে। যারা ইউনিকোডে অভ্যস্ত নন তারা মন্তব্যের ফাঁকা ঘর-এ বিজয় পদ্ধতিতে লিখে পেস্ট করবেন। অথবা arts@bdnews24.com-এ ই-মেইলের মারফতে লেখা পাঠাবেন। কাগজে লিখে স্ক্যান করে লেখা পাঠানো যাবে।

এখানে মন্তব্যগুলি নিচ থেকে উপরের দিকে সাজানো হয়েছে। অর্থাৎ নতুন প্রতিক্রিয়া উপরে থাকবে।
kamol-copy.jpg
ছবি. কমলকুমার মজুমদার

‍‍অনলাইন বৈঠক ১ শুরু হয়েছে ২৬/১০/২০০৭ তারিখে। এর বিষয়:

লেখার ভাষা বা সাহিত্যের ভাষায় মুখের ভাষা বা কথ্য ভাষার মিশ্রণ রচনার শিল্পগুণ নষ্ট করে।

এ পর্যন্ত লিখেছেন:

১. শোহেইল মতাহির চৌধুরী
২. ফকির ইলিয়াস
৩. সাঈদ জুবেরী
৪. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক (১)
৫. অবনি অনার্য
৬. চয়ন খায়রুল হাবিব
৭. আইরিন সুলতানা
৮. আদনান সৈয়দ
৯. আদনান সৈয়দ
১০. তাহমিদাল
১১. জগলুল হায়দার
১২. সারওয়ার রেজা
১৩. ফারিহান মাহমুদ
১৪. সারওয়ার চৌধুরী

●●●

১৪. সারওয়ার চৌধুরী

বেশি না, পঞ্চাশ বছর আগের মুখের ভাষা ও লেখার ভাষায় বিস্তর ব্যবধান পাওয়া যাবে পৃথিবীর যে-কোনো প্রতিষ্ঠিত ভাষায়। শব্দ প্রয়োগে, উচ্চারণে, অন্য ভাষার শব্দের মিশ্রণে বানানো শব্দ, সরাসরি অন্য ভাষার শব্দ ব্যবহার ইত্যাদি কারণে ‘শিক্ষিত’ বা ‘অশিক্ষিত’ মানুষের মুখের ভাষা ও লেখার ভাষায় পরিবর্তনটা আসে।

পঞ্চাশ বছর আগের আরবী ফারসি ইংরেজী উর্দূ হিন্দি মুখের ভাষা ও লেখার ভাষা আর এখনকার মুখের ভাষা ও লেখার ভাষায় রদবদলের ব্যাপারটা চোখে পড়ার মতো। ব্যাকরণের মানটাকে মেনেই এই বদলটা আসছে লেখার ভাষাতে। মুখের ভাষায় ব্যাকরণের আইন সকল সময় না-মানা সত্ত্বেও বোধ-সংবেদ-অনুভূতি বিনিময় হয়ে আসছে। অভিজ্ঞতায় পাইলাম কিছু ভাষার মধ্যে পরস্পর খুব সখ্য; ভারতের কেরালা রাজ্যের ‘মালায়ালাম’ ভাষার সাথে তামিলনাড়ু রাজ্যের ‘তামিল’ ও শ্রীলংকার ‘তামিল’ ভাষার লেখার অক্ষরে পার্থক্য আছে কিন্তু শব্দার্থে যথেষ্ট মিল। মালায়ালীরা তামিল বোঝে, তামিলরা মালায়ালী বোঝে। আবার ওই তামিল ও মালায়ালাম ভাষার সাথে ভারতের কর্নাটক রাজ্যের ‘কানাড়ি’ ভাষারও মিল আছে। কানাড়িভাষী মালায়ালাম ও তামিল বোঝে। উচ্চারণে হেরফের আছে। ওদিকে সংস্কৃত হ’তে অদলবদল হ’য়ে আগত অনেক শব্দ হিন্দিতে, তামিলে, মালায়ালামে, কানাড়িতে, এবং বাংলাতে আছে। শুধু উচ্চারণে ও লেখায় ব্যবধান বিদ্যমান। ইউরোপেও লাগোয়া দেশগুলোর পরস্পরের ভাষার সাথে মিল আছে। অস্ট্রীয়রা জার্মান ভাষা বোঝে ইত্যাদি।

আবার দেখুন, পঞ্চাশ বছর আগের সিলেটের, চট্টগ্রামের, কুমিল্লার, নোয়াখালি ইত্যাদি জেলা ভিত্তিক আঞ্চলিক ভাষা আর বর্তমানের আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে ব্যবধান পাওয়া যাবে ‘শিক্ষিত’ ‘অশিক্ষিত’ নির্বিশেষে। কেউ বলতে পারেন আগের চাইতে এখন পরিশীল আঞ্চলিক ভাষাগুলো। আর লেখক-কবিরা তো শব্দ তৈরি করতেই আছেন। প্রবাসীদের মুখে মুখে ভাষার ভেতরে নতুন নতুন শব্দ ঢুকে যাচ্ছে। সিলেটে ও চট্টগ্রামে দেখেছি আরব প্রবাসী পরিবারগুলোতে ‘ইয়াল্লা খালাস’ খুব ব্যবহার হয়। এবং তা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ইয়াল্লা খালাস’ মানে ‘ঠিক আছে, হয়েছে বা থাক’। (সম্পূর্ণ…)

কবিসভা বিতর্ক ২০০৫
কসমিক থেকে লোকায়ত, ‘ছক’ ও অন্যান্য

| ৪ জুন ২০০৯ ১২:২৫ পূর্বাহ্ন

——————————————————
wb_p.jpg২০০৪ সালের ১২ নভেম্বর তারিখে ইয়াহু গ্রুপ কবিসভা থেকে ই মেইল মারফত এর সদস্যদের কাছে বাংলা কবিতা সঞ্চালন উদযোগ-কিস্তি ৩ (ওয়ার্ড, পিডিএফ) সঞ্চালিত হয়। ৫৭ জন কবির কবিতা এই সঞ্চালনে সংকলিত হয়েছিল। পরে এক এক সপ্তাহে এক এক জনের কবিতার উপর পাঠকের আলোচনা ও মন্তব্য আহবান করা হতো কবিসভায়। তেমনই এক পর্বে মাসুদ খানের কবিতা সমালোচনার জন্য উপস্থাপিত হলে দীর্ঘ আলোচনা পাল্টা আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন মাহবুব মোর্শেদ, নূরুননবী শান্ত, মানস চৌধুরী, মজনু শাহ্, সুমন রহমান, ব্রাত্য রাইসু, শাহাদাতুর রহমান সোহেল, রাদ আহমেদ, অপূর্ব কুমার রায়, মিজান মল্লিক ও রাশিদা সুলতানা। চিত্তাকর্ষক সে আলোচনা কবিসভার সৌজন্যে আর্টস-পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো।

কবি মাসুদ খানের পঞ্চাশ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে যে সাক্ষাৎকারটি আর্টস-এ পত্রস্থ হয়েছে তার সঙ্গে এ বিতর্ক মিলিয়ে পাঠ করা যেতে পারে। শুরুতে মাসুদ খানের পাঁচটি কবিতা (ছক, প্রত্যাখ্যান, সংকট, হিমযুগ, শৈবালিনী)। পরে কালানুক্রমিক ৩০টি আলোচনা। বি. স.
——————————————————

মাসুদ খান-এর পাঁচটি কবিতা

ছক

দশটি পথ এসে যেখানটায় কাটাকাটি হয়ে চলে গেছে দশ দিগন্তের দিকে, সেইখানটায় গিয়ে বসে থাকেন আমার মা। পথের ধারে বসে মা আমার মানুষ দ্যাখেন, মানুষের আসা-যাওয়া দ্যাখেন। কোনো পথ দিয়ে আসে হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা। কোনো পথ দিয়ে আসে গ্রহণ-লাগা, ক্ষয়ে-যাওয়া, নিভু-নিভু সব বনি আদমের দল। আবার মেঘ ও মিথুন রাশির ছায়ায় তুমুলভাবে বাঁচতে থাকা মানব-মানবীদের যাতায়াত কোনো কোনো পথে।

একদিন আসা-যাওয়ার পথের ধারে মা কুড়িয়ে পেলেন আমার ভাইকে (আমি তখনো আসিনি আমার এই মায়ের কাছে)। কিন্তু কিছুকাল পর আমার সেই ভাই হঠাৎ গেল হারিয়ে। তারপর থেকে মা আমার ওই পথমোহনায় বসে তীব্র পুত্রশোকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদেন।

একবার, গোধূলিরঙের লম্বা-লম্বা চুলদাড়িঅলা এক বুড়ো পথিক ক্ষণিকের জন্যে থামালেন তার পথচলা। মা-র কাছে সব শুনে বললেন, ‘কোথাও তো কিছু হারায় না মা এই মহাবিশ্বে! যাও খুঁজে দ্যাখো।’ তারপর থেকে মা আমার উড়ে উড়ে বিশ্বসংসার তোলপাড় করে খুঁজে ফিরেছেন তার সন্তানকে। শেষে সপ্ত-আকাশের পরপারে আমাকে কুড়িয়ে পেয়ে, এবং তার সন্তানকেই পেয়েছেন মনে করে, উড়িয়ে নিয়ে এলেন এই মর্ত্যের ধুলায়। আমি তখন সাত আসমানের ওপারে অনন্ত নক্ষত্রকুঞ্জের ঝাড়জঙ্গলের ধারে সোনালি খড়ের গাদায় বসে অনাথ শিশুর মতো কাঁদছিলাম একা একা, মাকে হারিয়ে। (সম্পূর্ণ…)


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com