শ্রদ্ধাঞ্জলি

শান্তনু কায়সার : তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টি

পিয়াস মজিদ | ১৩ এপ্রিল ২০১৭ ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন

photoশান্তনু কায়সারকে (১৯৫০-২০১৭) দেখেছি আমার বেড়ে ওঠার শহর কুমিল্লায়। লেখক নাম ‘শান্তনু কায়সারে’র আড়ালে তাঁর প্রকৃত নাম ‘আবদুর রাজ্জাক’; এ তথ্য জেনেছি যখন তখন ভাবতাম তিনি বুঝি কন্যাকুমারী উপন্যাসের লেখক আবদুর রাজ্জাক। পরে আমার ভুল ভাঙে; জেনেছি তিনি মূলত প্রাবন্ধিক-গবেষক। তবে তাঁর প্রথম দিকের গ্রন্থতালিকায় পাওয়া যাবে কবিতাগ্রন্থ রাখালের আত্মচরিত (১৯৮২) এবং গল্পগ্রন্থ শ্রীনাথ পণ্ডিতের প্রাণপাখি (১৯৮৭)। তাঁর কবিতাগ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছিলেন অকালপ্রয়াত কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পরে যখন প্রাবন্ধিক-গবেষক হিসেবে শান্তনু কায়সারের চূড়ান্ত সিদ্ধি তখনও কিন্তু তিনি কি এক অন্তর্তাগিদে লিখে গেছেন কবিতাগ্রন্থ শুভ সুবর্ণ জয়ন্তী (২০০২), গল্পগ্রন্থ ফুল হাসে পাখি ডাকে (২০০১), অর্ধশতাব্দী, উপন্যাস- ঐ নূতনের কেতন উড়ে, উপন্যাসিকা সংকলন ত্রয়ী। শকুন শিরোনামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাসও কুমিল্লার কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল যা গ্রন্থরূপ পায়নি।
কুমিল্লা শহরে প্রায়শই মন্টুর দোকান নামে পত্রিকাবিপণিতে তাঁকে দেখা যেত একগাদা পত্রিকা কিনে সহ প্রাতঃভ্রমণকারীদের সাথে রাজনীতি থেকে সাহিত্য, সাহিত্য থেকে সংসার ইত্যাদি নানা বিষয়ে আড্ডা দিতে দিতে সময় পার করতে। জীবন চলার বাঁকে বাঁকে দেখা হওয়া, কথা হওয়া প্রতিটি মানুষই তাঁর কাছে ভীষণ মূল্যবান ছিলেন। তাই আমরা দেখি পত্রিকার দোকানদার মন্টু মারা গেলে যেমন তিনি তাঁকে স্মরণ করে লিখেছেন তেমনি তাঁর সুদীর্ঘদিনের সুহৃদ সমীর মজুমদারের পিতা ভুবনেশ্বর মজুমদারের প্রয়াণেও শোকার্ত কলম ধরেছেন। যে মানুষটি লিখেছেন দুই খন্ডে বঙ্কিমচন্দ্র (১৯৮২ ও ৮৪), মীর মশাররফ হোসেনকে নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ তৃতীয় মীর (১৯৯৪) এবং অদ্বৈত মল্লবর্মনকে নিয়ে দুই বাংলায় পথিকৃৎপ্রতিম বেশ কয়েকটি গ্রন্থ, তাঁকে আমরা কুমিল্লা শহরে হেঁটো পথিকের মতো মাঠে-ঘাটে সক্রিয় দেখেছি। (সম্পূর্ণ…)

শওকত আলী: প্রাকৃতজনের প্রদোষকাল

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১২:৫০ অপরাহ্ন

border=0টিকাটুলীর ‘বিরতি ভিলা’র নীচের তলায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কুঠুরিতে বহুকাল আগে থাকতেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক ইলিয়াস জগন্নাথ কলেজে পড়াতে শুরু করেই ঘরটা ভাড়া নিয়েছিলেন। তখন চারপাশে খোলামেলা ছিলো, এখন আলো-হাওয়া নেই, বাইরের শব্দ পৌঁছায়না। বেল বাজিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কেউ দরজা খুলবেনা। তবে এখনো একজন থাকেন এখানে। তাঁর বিস্মৃত স্মৃতির গহ্বর থেকে যা কিছু উঠে আসে অধিকাংশই শৈশবের রায়গঞ্জ আর লেখার কথা। এর ভেতরও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে বন্ধু ইলিয়াসের স্মৃতি। বললেন, তাদের দুজনেরই চেতনা ও উপলব্ধির জায়গাটা এক। প্রকাশের ভাষাটা স্বতন্ত্র।
চারতলা ‘বিরতি ভিলা’র প্রায় পরিত্যক্ত এই ঘর এখন প্রদোষে প্রাকৃতজন-এর লেখক শওকত আলীর পৃথিবী। অপরিচ্ছন্ন ছোট একটি বারান্দা আর পা আটকে যাওয়া ঘরে গুমোট হাওয়া। জানালার সাথে নানা রকম প্লাস্টিকের ব্যাগে ওষুধপত্র, কাপড় দলা পাকানো। দেওয়ালে স্ত্রীর বিশাল ছবি কালো ফ্রেমে বাঁধানো, গাদাগাদি করে আছে বইসমেত দুটো বুকসেলফ। সেখানে গর্ডন চাইল্ডের হোয়াট হ্যাপেনড ইন হিস্ট্রি থেকে রোডি ডোয়েলের দ্য ডেড রিপাবলিক। রবীন্দ্র রচনাবলী ও ফয়জুল লতিফ চৌধুরী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের চিঠিপত্র বইগুলোতেও দু’স্তরের ধুলোর পরত। জানতে চাইলাম পড়েন কিনা? মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নিরাসক্তভাবে মনোযোগ সরিয়ে বন্ধ জানালায় চোখ রেখে কিছু দেখলেন। জানালেন, কিছুই আর পড়তে তেমন আগ্রহ পাননা। রাতে ঘুম হয়না, পড়তে চেষ্টা করলে চোখে কষ্ট হয়। তাকে এখন কেউ দেখতে আসেনা তবে এতে অভিযোগ নেই বললেন। জানতে না চাইলেও এই যে ‘অভিযোগ নেই’ বললেন, ওতেই টের পাওয়া গেলো অভিমানের উত্তাপ। এই ঘরে তিনি একাই থাকেন। ছেলেরা উপরের ভিন্ন ভিন্ন তলায়। চলাফেরার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক শওকত আলী, পায়ের পাতা দুটো ফুলে আছে। চোখের ওষুধ নিতে চেষ্টা করেন, হাত কেঁপে গড়িয়ে যায়। সাহায্য করতে চাইলে বাধা দিলেন। তখন মনে হলো, তিনি নিজেরই তৈরি চরিত্র শ্যামাঙ্গের মতো যেন জীবনের কাছে আহত ও প্রতারিত। (সম্পূর্ণ…)

শঙ্খ ঘোষের জন্মবার্ষিকী : ‘কাল থেকে রোজই আমার জন্মদিন’

মুহিত হাসান | ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ২:৪০ অপরাহ্ন

Shonkhoআলোকচিত্র: রাজু আলাউদ্দিন

আজ বাংলা ভাষার প্রধানতম কবি ও গদ্যকার শঙ্খ ঘোষের ছিয়াশিতম জন্মদিন। ১৯৩২ সালের পাঁচই ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশের চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। এই শুভদিন উপলক্ষ্যে তাঁর গুণগ্রাহী ও স্নেহধন্য তিন লেখক—কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, প্রাবন্ধিক-অর্থনীতিবিদ সনৎকুমার সাহা ও কবি-গদ্যকার মোহাম্মদ রফিকের তিনটি সংক্ষিপ্ত তাৎক্ষণিক শ্রদ্ধালেখ মুদ্রিত হলো। তাদের তাৎক্ষণিক শুভেচ্ছাবার্তাগুলোর শ্রুতিলিখন করেছেন তরুণ লেখক মুহিত হাসান। বি. স.

হাসান আজিজুল হক
border=0

তিনি শতবর্ষী হোন

শঙ্খ ঘোষ, আমাদের সকলের প্রিয় শঙ্খদা, ছিয়াশিতে পা দিলেন, এই খবরটি নির্দিষ্টভাবে জানার পর— শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সর্বোপরি তাঁর প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করার মতোন যথোপযুক্ত ভাষা আমার আয়ত্তে নেই। এই সময়ের বাঙালি কবিদের মধ্যে তাঁকেই আমি শ্রেষ্ঠতার আসন অনেক আগেই দিয়ে বসে আছি। আমি মানুষ শঙ্খদা ও কবি শঙ্খ ঘোষকে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে আবার আমার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানাতে চাই।

শঙ্খদার প্রতিভা, তুলনাহীন তো বটেই, আমি বলবো, তিনি উচ্চতার যে শিখরে পৌঁছেছেন, তাতে তাঁকে দুর্নিরিক্ষ্য বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু, তিনি নেমে আসেন সকলের সঙ্গে, বিপদে-আপদে। প্রতিভার এরকম নিরহংকার প্রকাশ আর আমি দেখিনি। কবি হিসেবে যেমন তিনি আজ আমাদের সকলের কাছে এসে পড়েছেন তেমনিই এক এক সময় মনে হয় তিনি অতি দূরের নক্ষত্র। তাঁর আলো এসে পৌঁছুচ্ছে আমাদের কাছে প্রতি মুহূর্তে, প্রতিক্ষণে। (সম্পূর্ণ…)

আহারে, চলে গেলো মন খারাপের গাড়ি

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল | ৭ december ২০১৬ ৭:৪৪ অপরাহ্ন

ক.
আমি ভালোবেসে তাকে শাকিল না বলে, শালিক পাখি বলতাম। সে বলতো, ‘আপনি তো রবীন্দ্রনাথের প্রবাস-পাখি। দুলাল ভাই, দেশে ফিরে আসুন। আপনাকে আমাদের দরকার!’

বলতাম, কানাডায় না এলে কি খুনি নূরকে নিয়ে বই লিখতে পারতাম?

তখন জবাবে সে বলতো, তা ঠিক। আর আপনি জাতির পিতাকে নিয়ে একের পর এক যে কাজ করে যাচ্ছেন, আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ!
মাহবুবুল হক শাকিল, তোমার কাছেও আমরা কৃতজ্ঞ! তুমি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার রূপকার ভ্যাঙ্গুভারের বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম এবং কবি শহীদ কাদরী মারা যাবার পর যে ভূমিকা নিয়েছ, তা কোনো দিন ভুলবার নয়।

Dulalরফিক ভাই চলে যাবার পর তোমার কাছে যে সহযোগিতা পেয়েছি তা আজ আবারও মনে পড়ছে। তুমি প্রধানমন্ত্রীর শোকবাণী, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করেছ। এবং তারচেয়েও বেশি শহীদ ভাইয়ের মৃত্যুর পর তুমি যে কত বার কাঁদতে কাঁদতে ফোন করে অস্থির করেছো। বলেছো- দুলাল ভাই, যে ভাবেই হোক শহীদ কাদরীকে দেশের মাটিতে ঘুমানোর ব্যবস্থা করেন। তুমি সারারাত জেগে ঢাকা-টরন্টো-নিউ ইয়র্ক ক্রমাগত ফোনের পর ফোন করে যাচ্ছিলে! এবং ৩৩ বছর বিদেশে থাকার একজন কবিকে দেশে নিয়ে যে সন্মান এবং মর্যাদা দিয়েছো, তা ভাবলে গর্বে বুক ভরে যায়। (সম্পূর্ণ…)

রৌদ্রময় অনুপস্থিতি : বাংলা কবিতার আলোক

প্রদীপ কর | ২৭ নভেম্বর ২০১৬ ৭:০৭ অপরাহ্ন

Alok
ছবি: অমিতাভ দাসের ক্যামেরায় কবি আলোক সরকার

সামগ্রিক কোলাহলের ভিতরই হয়তো সৃজন সম্ভব এক নিভৃতলোক। সময় হয়তো সেই মৌলিক ধ্যানের মগ্নতায় মিশে থাকে পরম সাধনায়। নিভৃতির মৌলিক সাধনা। বাংলা কবিতার শরীরে মিশে আছে যে বিশেষ কতকগুলি সময়, পঞ্চাশের দশক সেরকমই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবর্ণ সময়। ভাঙা দেশে, ভাঙা মানুষের যন্ত্রণা পেরিয়ে এসে, অনেক না-পাওয়ার বেদনাকে অতিক্রম করে এক বিষন্ন স্বাধীনতার জন্ম। প্রাণের ভাষাকে অনন্তজীবন দেবার জন্য অকাতরে প্রাণত্যাগ… এইসব ভাঙাগড়ার মধ্যেই স্পষ্ট চিহ্নিত হয়ে উঠেছে বাংলা কবিতার পঞ্চাশকাল।

একটি তাৎপর্যপূর্ণ সময়ের মধ্যেই একদল কৃত্তিবাসী যখন ফুটপাথ বদল করতে করতে মধ্যরাতে শাসন করছে কলকাতা শহর, তখন, তার সমান্তরালে আরেক দল, বিশিষ্ট হয়ে উঠছেন ‘শতভিষা’ (১৯৫১) পত্রিকাকে অবলম্বন করে ভিন্নধারার কাব্য প্রয়াসে যার নেতৃত্বে ছিলেন কবি আলোক সরকার। ঐতিহাসিকভাবেই সত্য এই যে, এই দশকের প্রথম প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থটিও কবি আলোক সরকার রচিত উতল নির্জন। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সকলেই বুঝতে পারলেন বিশুদ্ধ কবিতার এক অন্য আলোক উদ্ভাসিত। যদিও, খুবই দুর্ভাগ্যজনকভাবে উল্লেখ করতে হয়, সম্মান, পুরস্কার ইত্যাদি সাহিত্যের সাধারণ মূল্যায়নগুলি তাকে নিয়ে হয়েছে অনেক ধীরে, অনেক পরে। ফলতঃ বাংলা কবিতায় অন্য আলোর উজ্জ্বল প্রভা সবার কাছে তেমন করে পৌঁছায়নি। ভাবি, এই-ই তো অনিত্য, যে, কোলাহল মুখরতায় মিশে থাকতে পারে হাজার হাজার মুখ কিন্তু ধ্যান তো একক। মগ্নতা তো সব সময়েই নিভৃতির। ‘হাজার ঝরাপাতার বুকে পায়ের চিহ্ন মর্মরিত আছে’ (আলোকিত সমন্বয়। নাম কবিতা) যিনি লিপিবদ্ধ করেন কিংবা বলেন:

অনেক দিন ফিরে আসার পরও
যারা পুরোনো ছবিকে নতুন নামে বলছে
তাদের ভিতরের আঁধার
কত গোপন হুহু করছে।

কেউ শুনতেই পাচ্ছে না এমন গোপন।
(আধার। সমাকৃতি ১৯৯৫) (সম্পূর্ণ…)

ফাদার দ্যতিয়েন : বাংলা গদ্যের শক্তিমান লেখক

শামসুজ্জামান খান | ২ নভেম্বর ২০১৬ ৩:৫৬ অপরাহ্ন

father-1
আলোকচিত্র: মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক, একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪ এর উদ্বোধনী দিনের ছবি।
বেশ ক বছর আগে ঢাকা ঘুরে গিয়েছিলেন সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরা শ্মশ্রুমন্ডিত এক বিদেশি সাহেব। হ্যাঁ, একটু কৌতুকের সঙ্গে তিনি নিজেকে ‘সাহেব’ও বলতেন মাঝে মধ্যে। সাধারণ পোশাক-আশাক এবং চলনবলনে তাঁকে কিন্তু এক সৌম্যকান্ত বাঙালি বৃদ্ধের মতোই মনে হত আমাদের। আসলে তিনি একজন বিদেশি মিশনারি– নাম ফাদার দ্যতিয়েন। মা-বাবা নাম রেখেছিলেন পল দ্যতিয়েন। পল দ্যতিয়েন জন্মেছিলেন বেলজিয়ামের রশ্ফয় নামের একটি জায়গায় ১৯২৪-এর ৩০ ডিসেম্বর। বাবার নাম ফ্যানি এবং মা এলিজাবেথ।
বাংলাভাষী অঞ্চলে ফাদার দ্যতিয়েন বাংলার বিদ্ব্যৎ সমাজে এক পরিচিত নাম। তাঁর মাতৃভাষা ফরাসি হলেও বাংলা ভাষায় তাঁর ব্যুৎপত্তি রীতিমত ঈর্ষণীয়। উইলিয়াম কেরীর পুত্র ফেলিক্স কেরী বহু বছর আগে বলেছিলেন, বাংলা তার দ্বিতীয় মাতৃভাষা। একথাটি খুব জোরের সাথে বলতে পারতেন ফাদার দ্যতিয়েনও। ১৯৭১-এ পুস্তকাকারে প্রকাশিত তাঁর বাংলা রচনা ডায়েরির ছেঁড়া পাতা এবং ১৯৭৩-এ প্রকাশিত রোজনামচা তাঁকে বাংলা ভাষার এক শক্তিমান লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসে বসে তাঁর সঙ্গে আমাদের কথা হয় ১৯৯০-এর জুলাই মাসের ২৬ তারিখে। কথা ছিলো, সকাল দশটায় আসবেন। সোয়া নয়টায় তিনি হাজির হলেন, হেসে বললেন, “বাঙালি সময় না-সাহেবি সময় তো নয়ই– ‘অদ্ভুত’ সময়ে এলাম। পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে এসে গেলাম।” ‘এসে গেলাম’ কথাটি আবার উচ্চারণ করে হাসলেন এবং কৌতুকমিশ্রিত স্বরে বললেন : ‘এসে গেলাম’ আপনারা বাঙালিরা বলেন, এটি আপনাদের নিজস্ব বলবার ধরন। ‘এসে গেলাম’ মানে: ‘এসে পৌঁছলাম’, ‘এসে আবার চলে গেলাম নয়।’ কোন বিদেশি এটা না জেনে অনুবাদ করলে কেমন হবে বলুন তো। (সম্পূর্ণ…)

শহীদ কাদরী: সে এক অদ্ভুত মানুষ যে শনাক্ত হতে চায় না

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত | ৩১ অক্টোবর ২০১৬ ১১:০০ অপরাহ্ন

Shahidএই মুহূর্তে, এই দুঃসংবাদ, যদিও প্রত্যাশিত–তবু আমি ভীষণ ক্ষেপে আছি, এটা একেবারেই স্বতসিদ্ধ। যেহেতু প্রায় দেড় দশক দুই দশক ধরে এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম। এবং ভেবেছিলাম যে, একদিন এই চূড়ান্ত দুঃসংবাদ পাবো, এর জন্য তৈরিও ছিলাম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, আসলে আমরা তৈরি থাকলেও, আমরা যারা নশ্বর মানুষ, তাদের পক্ষে এ রকম ঘটনা সহ্য করে নেওয়ার মতো কোনো রকম সামর্থ নেই।
যখনই এই খবর ফারুকের মধ্য দিয়ে পেলাম, ফারুক আমার ভাই স্বরূপ, আমি তখনই ফারুককে বললাম যে ফারুক, শক্তির বিয়োগ সংবাদ পেয়ে আমি একটা সনেট পাঠিয়েছিলাম, আজকে যদি তোমাকে একটা শোকগাথা পাঠাই, আমার মনে হলো আমি পারি, আমি শোকগাথা লিখতে পারবো, কিন্তু সেটা খুব আলঙ্কারিক হবে। এখন আমি যেটা বলতে চাই দু’চারটি কথা যে এই মুহূর্তে আমাদের শহীদ কাদরীর প্রতিভার মূল্যাঙ্কন করার সামর্থ আমার নেই। কিন্তু এইটুকু আমার মনে হয়, আমার ভীষণভাবে মনে হয়, গত কয়েক বছর ধরে যতদিন তাকে দেখিনি, সেই সময় অন্য একটা সান্নিধ্য গড়ে উঠেছিল, কি লিখছে কি না লিখছে। তো এখন ওর সবশেষ যেই বইটা যেটা প্রবাসে লেখা–আমার চুম্বনগুলি পৌঁছে দাও–সেটা আমার হাতে আসেনি। কে যেন টুইট করে জানিয়ে দিয়েছিল যে এই বইটা ২০০৯ সালে বেরিয়ে গেছে।
এবং আমি ভাবছিলাম যে, এলিয়ট এক জায়গায় যেমন বলেছিলেন যে, প্রত্যেক কবি, প্রত্যেক মানুষ থেকে বয়সে বিলম্বিত, অনেক বড়। প্রত্যেক কবির ক্ষেত্রে এই কথাটা বলা যায় যে, তাদের এই মৃত্যু আমাদের বিবেকের সংবিতের পক্ষে খুব প্রয়োজনীয় একটা ঘটনা।
মঁতেইগ যিনি পারসোনাল এসেস-এর প্রবক্তা ছিলেন তিনি বলেছিলেন, দার্শনিকতা করার মানে হচ্ছে, মৃত্যুকে কিভাবে আয়ত্ত করা যায় সেটা শিখে নেওয়া। এখানে একটা ঘরোয়া সেমিনারের মতো চলছিল।
বুঝতে পারলাম, নশ্বরতার একটা কবিতার মন্ত্র আছে যা কবিতাকে সঞ্চালিত করতে পারে।
আপাতত বলাই বাহুল্য যে, আমি এমন কোনো কথা বলব না যে-কথা কোনো বইয়ের, কোনো শোকলিপির উপক্রমনিকা হতে পারে। আমি সেটা বলবো না। (সম্পূর্ণ…)

মোহাম্মদ রফিকের কবিতা: যেহেতু সে ধুলো মাখে, ধুলোর চেয়েও অগণন

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ২৩ অক্টোবর ২০১৬ ১:৩৯ অপরাহ্ন


কবিকে রেহাই দেবে কে?

মাগো, তবে কাদের বাড়ির খুদে
ভরে উঠল ভাঙাথালা
কান্নায়, চিৎকারে

মাগো, তবে কাদের ঘরের ত্যানা
আমাকে জড়িয়ে নিল
রক্তহিম সরোবরে

মাগো, তবে কাদের গ্যাঁজালো পান্তা—
পেটের ভিতরে ঢুঁড়ছে
বেদম হাত পা

মাগো, মা কাদের সোহাগে ঘেন্নায়
ভিড়মি খেতে খেতে যেন
ফুল ফুটছে তারা ডাকছে

শরীরের কন্দরে কন্দরে ক্ষত ফাটছে
যেন মসলা পিষে পিষে কেউ
মাগো, ধুয়ে ফেলছে পাটা।

(মাগো, মা; মোহাম্মদ রফিক)

Mohammad Rafique-3এইভাবে একজন কবি জাগিয়া উঠেন ভাঙনের মুখোমুখি। দেশকাল, গোত্রজাতপাতহীন এই দেশে যখন কবিরা চিৎকার করিয়া বলিতে থাকেন ‘আমাদের কোন দেশ নাই’ তখন মোহাম্মদ রফিক দেখাইয়া দেন, না, কবিতা আসমান হইতে নাজিল হয় না, অন্যভাষা বা দেশ হইতে ধার করিয়া বদলানো শব্দাবলীতে কিংবা আইডিয়াতে হইয়া ওঠে না, কবির কাব্যবোধ অবশেষে কিংবা সবশেষে পানি পায় নিজভূমেই— দেশজ পৈঠায়। (সম্পূর্ণ…)

লালন ও আরশি নগরের পরশি

সেজান মাহমুদ | ২০ অক্টোবর ২০১৬ ২:৩৬ অপরাহ্ন

Lalon ১৭ অক্টোবর ছিল বাংলার এক ক্ষণজন্মা কবি ও দার্শনিক লালন সাঁই-এ মৃত্যুদিন। লালনের জন্মকাল নিয়ে অনেক তর্ক, বিতর্ক হয়েছে, তাঁর জীবৎকাল নিয়েও প্রচুর বাদ-বিসম্বাদ থাকলেও মোটামুটিভাবে ধরে নেওয়া হয় যে তিনি জন্মেছিলেন ১৭৭৪ সালে, আর ১১৬ বছরের সুদীর্ঘ জীবনশেষে মৃত্যুবরণ করেন ১৮৯০ সালে। লালনের ভাব ও দর্শনের প্রভাব নিয়ে বোধকরি কেউ দ্বিমত করবেন না যে এক অনন্য, উদার, বিনীত দর্শন নিয়ে বাংলা গানকে বিশ্বজনীন আবেদন দিয়েছেন লানন। তাঁর দৈন্য গান যেমন জীবের তুচ্ছতা, দীনতা, অজ্ঞতা প্রকাশ বা আত্নসমালোচনার মধ্য দিয়ে এক মহাপরাক্রমশালী সত্ত্বার কাছে আত্নসমর্পনের পথ বাতলে দেয়, তেমনি সেই পরম অধরা কে বিমূর্ত রূপ থেকে মূর্ত করে আনে মানুষের মধ্যে, মানুষের কল্যাণে। লালনের ভাবদর্শনের প্রভাব যে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল বাউল কবিকুলের ওপরে পড়েছে তা গবেষণা করে বের করার প্রয়োজন পড়ে না। যেখানে লালনের এই যুগান্তকারী দর্শনের বিশ্বজনীন মূল্যায়ন ও বিস্তার প্রয়োজন সেখানে কুশিক্ষিত মোল্লারা লালনচর্চা কেন্দ্র (লালন একাডেমী), বা আখড়াগুলোকে ধোঁকাবাজ, বেশরিয়তি, বেদাতি আখ্যা দিয়ে “বাউল ধ্বংস ফতোয়া” পুস্তিকা রচনা করে বিলিবন্টন করেছে। বিশিষ্ট বাউল গবেষক ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী জানান ১৯৮৪ সালে লালন একাডেমীর সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ফজলুল হক মিয়া লালনের মৃত্যুবার্ষিকীতে মাজার প্রাঙ্গণে ইসলামী সভা ও বেশরিয়তি পথ থেকে ফিরে আসতে বাউলদের জন্যে তওবা করার অনুষ্ঠান আয়োজন করে (সূত্রঃ লালনকে কে বাঁচাবে, মফিদুল হক)। এই ক্ষুদ্র পরিসরের লেখায় লালনের দর্শনের একটি দিককে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে আলোচনা করার প্রয়াস নেবো। এক্ষেত্রে ফরাসি তত্ত্বজ্ঞান আমার তুলনার মানদণ্ড। এই মানদণ্ড কেন তা নিয়ে সামান্য একটু ভণিতা করে নিই। (সম্পূর্ণ…)

হক ভাই, আপনি আমার বিশ বছর বাঁচিয়ে দিয়ে গেলেন

আনিসুর রহমান | ১২ অক্টোবর ২০১৬ ১১:০৮ পূর্বাহ্ন

Syed+Shamsul+Haq_26092016_0001গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষাবধি থেকে নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যে সময়ে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বিদ্যালয় ও কলেজ জীবনের সময়কাল–এর কোনো পর্যায়েই সৈয়দ শামসুল হকের সাথে তো দূরের কথা তার নামটির সাথেই আমার পরিচয় ঘটেনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বুট ও জলপাই রঙের পোশাকের দাপটের সাথে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্দরে ও বাহিরে যেভাবে সাম্প্রদায়িকীকরণ চলছিল, তার ফল হিসেবে আমাদের সৈয়দ শামসুল হকের মতো কবিরা লেখকরা পাঠ্যপুস্তক থেকে নির্বাসিত হন।
আমার বাবা প্রান্তিক চাষী এবং আমাদের গ্রামটি একেবারে অজপাড়াগা দিগরবাইদ যা মধুপুর থানা সদর থেকে সাড়ে তিন মাইল ভেতরে। যেখান থেকে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা অথবা পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কোন বইয়ের সাথে পরিচয় হবার সুযোগ আমার ছিল না। মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালীন দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতায় সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা প্রথম পড়েছি, আমার আজও সে কথা মনে পড়ে। ঐ বয়সে কবিতা আর কি বুঝি!
তারপর ১৯৯৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর কয়েকজন বন্ধুবান্ধর মিলে মধুপুর সাহিত্য পরিষদ গঠন করি এবং সাহিত্য পরিষদ থেকে অজনিকা নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করি। অজনিকা’র সম্পাদকের দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হলে মধুপুরের কবি শামীম পারভেজের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। তিনি তখন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের ছাত্রাবাসে থাকেন। অজনিকা সাময়িকীটি ধারদেনা করে ময়মনসিংহের এক অফসেট ছাপাখানা থেকে ছাপিয়েছিলাম। তখন শামীম ভাইয়ের সাথে আমার বেশ সখ্য গড়ে উঠেছিল। শামীম ভাই সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে আমাকে কিছুটা ধারণা দিয়েছিলেন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন শামীম ভাই ‘চন্দ্রাবতীর কয়েকজন সন্তান’ নামে কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর বছর খানিক পূর্বে অকাল প্রয়াত হয়েছেন। সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে তার একটি কথা আজও মনে পড়ে, সৈয়দ শামসুল হক সাহিত্যের বহুবিধ শাখায় বিচরণ করলেও তিনি নিজেকে কবি হিসেবে দেখতেই পছন্দ করেন। (সম্পূর্ণ…)

উপনিষদের ফার্সী অনুবাদ সিরর-ই-আকবর এবং শাহযাদা দারাশুকোহ

আনিসুর রহমান স্বপন | ১০ অক্টোবর ২০১৬ ৭:৩০ অপরাহ্ন

upanishad-comboরেডিও তেহরানের বাংলা অনুষ্ঠানে এবং সাজমানে তাবলীগাতে ইসলামীর (আইপিও) বাংলা বিভাগে দীর্ঘ দশ বছর (১৯৮৬-৯৬) কাজ করার সুবাদে ফার্সী ভাষা ও সাহিত্য এবং পারস্য-দর্শনের সাথে পরিচয়ের সুযোগ ঘটে। ঢেঁকি যেহেতু স্বর্গে গেলেও ধান ভানে সেহেতু ইরান-ইরাক এবং ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের প্রচন্ড চাপ ও বিপদের মাঝেও অব্যাহত রাখতে হয় শেকড়ের-সন্ধান। মধ্য-তেহরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য-দাপ্তরিক এলাকা মায়দুনে ভালী আসরের (ওয়ালী আছর স্কয়ার) ‘কেতাব ফুরুশীয়ে হাশেমীতে’ (হাশেমী বুক শপ) অগায়ে হাশেমী ও তার ভাই অগায়ে আলী (জনাব হাশেমী ও জনাব আলী) নামে দুই সহোদর মালিক আমাকে সন্ধান দিলেন দারাশুকোহর করা উপনিষদের ফার্সী অনুবাদ।
ভারত-সম্রাট শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্রের এ অনুবাদ সুদূর তেহরানে বসে পেয়ে কিঞ্চিৎ বেশী মূল্যেই সংগহ করতে হলো। লাল টুকটুকে রেক্সিনে সুন্দর বাঁধাই করা প্রচ্ছদের উপর সোনালী হরফে গ্রন্থ, গ্রন্থকার, অনুবাদক ও সম্পাদকের নামসহ সংস্কৃত লেখা ‘উপনিষদ’ শব্দ যুক্ত খন্ড দুটি।

এর মধ্যে প্রথম খন্ডে ৬৯৬ পৃষ্ঠা। শুরুতে ১০ পৃষ্ঠার টাইটেল, প্রিন্টার্স লাইন ও মুখবন্ধের পর আছে ৩৪৪ পৃষ্ঠ।
তেহরান সংস্করণের সম্পাদক ডঃ তারা চাঁদ ও ডঃ সাইয়েদ মহম্মদ রেজা জালালী নায়েনীর ভূমিকা।
এ ভূমিকার মধ্যে ও গ্রন্থের দু’খন্ডের বিভিন্ন অংশে দারাশুকোহ’র জীবন ও কর্ম সংশ্লিষ্ট চিত্র, পান্ডুলিপির ছবি এবং ভারতীয় রাষ্ট্র নেতাদের কাছে এ সংস্করণ হন্তান্তরের আলোকচিত্র রয়েছে। নতুন পৃষ্ঠা নং দিয়ে এরপর ৩৪২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ফার্সীতে সিরর-ই-আকবর নামে দারাশুকোহ’র করা উপনিষদের অনুবাদ। পৃষ্ঠা সংখ্যার ক্রমন্বয় রক্ষা করে শুরু করা দ্বিতীয় খন্ডের ৪৯০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পাঁচশ মুদ্রিত পৃষ্ঠায় এ অনুবাদ সুদীর্ঘায়িত হয়েছে।
প্রয়াত ডঃ তারা চাঁদ ভারতবর্ষের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী লেখক, গবেষক, অধ্যাপক। নেহেরুর মন্ত্রীসভায় মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষা মন্ত্রীত্বের সময় তিনি এ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে রাজ্য সভার সদস্য এবং ইরানে ভারতীয় দূতাবাসেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডঃ জালালী নায়েনীর সহযোগিতায় দীর্ঘ ৪ বছর ফার্সী-সংস্কৃত পাঠ-পর্যালোচনা করে তিনি দারাশুকোহর অনূদিত উপনিষদ সম্পাদনা করেন। এরপর ডঃ নায়েনী আরো ৪ বছর ধরে ফার্সীভাষী পাঠকদের জন্যে এতে ব্যবহৃত ‘সংস্কৃত’ শব্দের অর্থ ও ভাষ্য রচনা করেন।
অবশেষে দীর্ঘ ৮ বছর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে ফার্সী ১৩৪০ (ইংরেজী ১৯৬২) সালে তেহরান থেকে এ গ্রন্থের প্রথম আধুনিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
১৯৬৩ সালের মার্চে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নয়াদিললীতে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপললী রাধাকৃষ্ণনন এবং প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহেরুর কাছে এ গ্রন্থের কপি হস্তান্তর করেন সম্পাদকদ্বয়।
এভাবে তিনশতাধিক বছর পর ভারতেরই এক যুবরাজের সাধনার ফসল হাতে তুলে নেন তাদের উত্তরসূরীরা। (সম্পূর্ণ…)

প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য: কয়েকটি টীকা ও টিপ্পনী

একরাম আলি | ৩ অক্টোবর ২০১৬ ৬:১২ অপরাহ্ন

produmnoকোনো ন্যাশনাল ডেইলিতে এমন খবর ছাপা হয়নি: PRADYUMNA BHATTACHARYA IS NO MORE। কোনো বাংলা কাগজের পক্ষেও জ্ঞান-সীমান্তের এতটা দূরবর্তী অঞ্চলে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব।
ওই যে শুয়ে আছেন সকালবেলা, সিমেন্টের মেঝের উপর অতিসাধারণ শয্যায়, শিয়রে মাটির প্রদীপ, মুখের চারদিকে মশা উড়লেও বন্ধ চোখে গভীর প্রশান্তি, গুটিকয়েক মানুষের শোকচ্ছায়ায় এক মহিলা মৃদুকণ্ঠে একমনে গেয়ে চলেছেন রবীন্দ্রনাথের গান, ওই মানুষটি জীবিত অবস্থায় ছিলেন একান্তভাবেই নির্জনতাবাসী। বলা ভালো, নিজের জন্যে একটা গুহাই বানিয়েছিলেন আদিম কালের গ্রানাইট পাথর দিয়ে। ‘আদিম’ শব্দটি ব্যবহারের বিশেষ উদ্দেশ্য এই যে, তাঁর চর্চার বিষয়ে তিনি সব সময় পৌঁছতে চাইতেন উৎসে, আকরে। নতুন চিন্তায় পৌঁছতে এটাই ছিল তাঁর পথ।
প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য (জন্ম ২০ নভেম্বর ১৯৩২, মৃত্যু ২ অক্টোবর ২০১৬)। বাবা স্বনামধন্য নদী-বিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্য ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্য বাস্তুকার। মা আলোকময়ীকে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছে রাঁচির পাগলা গারদে।
বিপর্যস্ত জীবন। মাত্র চারটি গ্রন্থের এই জনককে নিয়ে তবু অনুরাগীমহলে আগ্রহের আর শ্রদ্ধার সীমা ছিল না। বেশ কয়েকটি গল্প ঘুরেছে তাঁর অতলস্পর্শী অনুসন্ধিৎসা নিয়ে, কোনো রচনার আগে নিজের প্রস্তুতি নিয়ে। সেগুলোর সত্যতা কতটা, জানি না। দরকারও নেই জানার। তবে সে-সব গল্পের গিঁট খুললে যে-সুগন্ধটুকু বেরিয়ে আসে তাতে এটুকু বোঝা যায়, তিনি ছিলেন বাংলাভাষায় জ্ঞানচর্চার এক বিরল মানুষ। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com