প্রবন্ধ

একুশের অপমান

আলম খোরশেদ | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৭:১৬ অপরাহ্ন

একুশ নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতার অন্ত নেই। ফেব্রুয়ারি আসতে না আসতেই দেশজুড়ে ব্যাঙ-এর ছাতার মত গজিয়ে ওঠা তথাকথিত ’ফ্যাশন হাউস’গুলোতে বাংলা বর্ণমালা উৎকীর্ণ পোশাক বিক্রির ধুম পড়ে যায়। আর সেইসব ফ্যাশনদুরস্ত ধরাচুড়ো গায়ে চাপিয়ে একুশের সাতসকালে আমরা দলবেঁধে, সংবৎসর চূড়ান্ত অবহেলার শিকার, জরাজীর্ণ শহীদ মিনারটিতে লাইন লাগিয়ে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ আর সুরে-বেসুরে দুই কলি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গেয়ে আমাদের বাংলাপ্রীতির পরাকাষ্ঠা দেখাই। অথচ বছরের বাকি তিনশ চৌষট্টি দিন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাভক্তির লেশমাত্র বহিঃপ্রকাশ দেখিনা।

আমরা শুদ্ধ করে, প্রমিত উচ্চারণে কথা বলার ব্যাপারে নিদারুণরকম উদাসীন। অথচ কথায় কথায় বিনা দরকারে ভুলে-ভরা ইংরেজি কপচাতে রীতিমত পারঙ্গম। বইপত্রে, রেডিও-টেলিভিশনে, মঞ্চে-মাইকে কোথাও বাংলা ভাষাটিকে শুদ্ধ ও সুন্দরভাবে উপস্থাপনের কোন প্রচেষ্টা নেই। অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-রেস্তোরাঁ সর্বত্র কারণে-অকারণে ইংরেজির ঢালাও ব্যবহারে আমাদের কোন লজ্জাবোধ হয় না। এমনকী পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানসমূহেও আমরা অবলীলায় বাংলা ভুলে বিজাতীয় বুলির কষ্টকর কসরতে ব্যস্ত থাকি অহর্নিশি। বিয়ের কার্ড ইংরেজিতে ছাপানো আর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে পাড়াপড়শির ঘুমের শ্রাদ্ধ করে তারস্বরে হিন্দি, ইংরেজি গান বাজানোটা যেন আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশই হয়ে উঠেছে ইদানিং। আমরা খেয়ে না খেয়ে আমাদের পুত্রকন্যাদের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়াতে যারপরনাই উৎসাহী। এই কর্মে আমাদের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এবং বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির তথাকথিত ধারকবাহকদেরও উৎসাহে কোন কমতি দেখি না। ভিনদেশি পোশাক-আশাক, খাদ্যাখাদ্য আর সংস্কৃতির বেনোজলে গা ভাসিয়ে দিয়ে পরম তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে বাধে না আমাদের বিবেকে। আমাদের চিত্রশিল্পীরাও বুঝি তাঁদের শিল্পকর্মের নামগুলো ইংরেজিতে রাখতে পারলেই বর্তে যান। নগরসংস্কৃতির নতুন অনুষঙ্গ এফ এম রেডিওর জকি-সম্প্রদায় আর ’টিভি প্রেজেন্টার’ প্রজাতির সদস্যরাও বিকৃত উচ্চারণের এক অদ্ভূতুড়ে খিচুড়ি-বাংলা বলার মহোৎসবে মত্ত, কল্পিত এক ‘স্মার্টনেস’ জাহিরের প্রাণান্ত প্রতিযোগিতায়। (সম্পূর্ণ…)

‘রাস্ট্র ভাষা গান’ ও একজন পল্লীকবি শামসুদ্দীন

আশেক ইব্রাহীম | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনও করিলিরে বাঙ্গালী
তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি।
১.
আমরা তাকে চিনি চারণ কবি শামসুদ্দীন নামে, তিনি নিজের নাম লিখতেন ‘সেখ সামছুদ্দীন’ গ্রাম: ফতেপুর, পোস্ট: বাগেরহাট, জেলা খুলনা (১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে প্রকাশিত গানের বই থেকে নেওয়া)। জন্ম আনুমানিক ১৩২১-২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫ খ্রি.) মৃত্যু ১৩ ই আশ্বিন ১৩৮১ বঙ্গাব্দ (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ খ্রি.)। ভাষা আন্দোলনের প্রথম গানের রচয়িতা হিসেবে খুব বেশীদিন হয়নি এই নামটি আমাদের আলোচনায় এসেছে। ‘রাস্ট্র ভাষা গান’ নামে পরিচিত অমর এই গানের রচয়িতা কবি শামসুদ্দীন একুশের প্রথম গানের রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিভিন্ন লেখার সূত্র ধরে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় বাগেরহাট এ, সি, লাহা টাউনক্লাবে সর্বদলীয় সমাবেশে কবি শামসুদ্দীন স্ব-কন্ঠে এই গান গেয়ে ভাষা আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন।

কবি শামসুদ্দীনের পরবর্তি প্রজন্ম, আবুবকর সিদ্দিক, মোহাম্মদ রফিক এবং ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহম্মেদ প্রমুখ পল্লীবাসি কবি সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁকে স্মরণ করেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে, স্মৃতিচারণায়, গল্পে। পৌঁছে দিয়েছেন বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত। কবি আবুবকর সিদ্দিকী সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লিখেছিলেন কবি শামসুদ্দীন এবং তাঁর গান নিয়ে। বাগেরহাটের ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহমদ লিখেছেন বাগেরহাটের ছোটকাগজ ‘চোখ’-এর ফেব্রুয়ারী ১৯৯০ সংখ্যায়। মোহাম্মদ রফিক তার গল্পগ্রন্থ ‘গল্পসংগ্রহ’ –এ গল্প লিখেছেন কবি শামসুদ্দীনকে নিয়ে। আড্ডায় আলোচনায় বাগেরহাটের প্রবীণ মানুষের কাছ থেকে শামসুদ্দীন সম্পর্কে শোনা যায়। কয়েকদিন আগে কবি মোহাম্মদ রফিক তার পৈত্রিক গ্রাম বৈটপুরে বেড়াতে আসেন, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এক প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “জানো, বাঙ্গালী শব্দটা আমি জীবনে প্রথম শুনেছিলাম শামসুদ্দীনের এই গানে”। বাগেরহাটে আরেক কিংবদন্তী প্রয়াত গনি সরদার, যিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারী রাত ১২ টার পর থেকে সারারাত একটা ভ্যানের সামনে লাউড স্পিকারে ‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনও করিলিরে বাঙ্গালী, তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’-এই গান গাইতে গাইতে কাঁদতেন আর ঘুরে বেড়াতেন শহরের অলিতে গলিতে। তার কন্ঠে প্রকাশিত হাহাকার আমাদের নিয়ে যেত ৫২ সালের রক্তাক্ত রাজপথে। সমস্ত শহর যেন বুকচাপা কান্নায়, শোকে নিমজ্জিত হয়ে থাকত সমস্ত দিন। শ্রদ্ধেয় গনি সরদারের কন্ঠেই এই গান আমি প্রথম শুনেছি, শামসুদ্দীনকে চিনেছি। এভাবেই শামসুদ্দীন লোকমুখে টিকে আছেন বছরের পর বছর ধরে।

‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙ্গালি’ গানের রচয়িতা এবং সুরকার সম্পর্কে তথ্য বিভ্রান্তি আগে থেকেই ছিল, সে সম্পর্কে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত কবি আবুবকর সিদ্দিক-এর লেখায় বিস্তারিত জানা যায়। পরবর্তিতে ২০০৯ সালে বাংলালিংক-এর একটি বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে আবারো এ প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে, কে এই গানের গীতিকার এবং সুরকার? আসলেই কি একুশের প্রথম গানের রচয়িতা এবং সুরকার বাগেরহাটের ফতেপুর গ্রামের দরিদ্র কবি শামসুদ্দীন নাকি অন্য কেউ? ঐ সময়ে কয়েকটি পত্রিকায় লেখালেখি হয়। অনেকে বাংলালিংক-এর বিজ্ঞাপনকে ইতিহাস বিকৃতির দায়ে দোষারোপ করেন। গীতিকার হিসেবে কবি শামসুদ্দীন এবং সুরকার হিসেবে অনেকে আলতাফ মাহমুদের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে বাগেরহাটের ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহম্মেদ, আবুবকর সিদ্দিক প্রমুখের লেখায় ২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সন্ধ্যায় বাগেরহাটে শামসুদ্দীনের স্ব-কন্ঠে এই গান গেয়েছিলেন এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। ক’দিন আগে এই লোককবি’র প্রকাশিত প্রথম গানের বই হাতে এসে পৌঁছানোর পর সে-সব বিভ্রান্তি কেটে গেছে। এখন আমরা নিশ্চিত বলতে পারি, ‘রাস্ট্র ভাষা গান’-এর গীতিকার এবং সুরকার কবি শামসুদ্দীন নিজেই। পরবর্তিতে গানের কথায় এবং সুরে কিছু পরিবর্তন করেছিলেন আলতাফ মাহমুদ। বর্তমানে যে গান শোনা যায়, সেটি আলতাফ মাহমুদ কর্তৃক ‘রাস্ট্র ভাষা গান’-এর পরিবর্তিত রূপ। (সম্পূর্ণ…)

মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করা মূর্খতারই নামান্তর

শাহনাজ মুন্নী | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ২:১৮ অপরাহ্ন

Babelঅনেক বছর আগে একবার পত্রিকায় পড়েছিলাম, কোন একটি প্রাচীন ক্ষয়িষ্ণু ভাষার কথা, যে ভাষায় কথা বলা মানুষ কমতে কমতে এমন হয়েছিল, যে শেষ পর্যন্ত ওই ভাষায় কথা বলেন বা ভাষাটি জানেন এমন একজন মাত্র মানুষ শুধু বেঁচেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ওই ভাষাটি পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যাবে। অর্থাৎ ব্যক্তিটির সাথে সাথে মারা যাবে তার প্রাচীন ভাষাটিও। শুধু কি ভাষা মরে যায় ? ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তো একটি জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা জীবনধারা ও সংস্কৃতিরও মৃত্যু ঘটে।

আমি হঠাৎ শিউরে উঠেছিলাম এই আশংকায় যে কোন দিন, কোন দূর্ভাগ্যময় দূর ভবিষ্যতে বাংলা ভাষাও কী তবে লুপ্ত হতে পারে? হারিয়ে যেতে পারে প্রচণ্ড প্রতাপশালী আধিপত্যবাদী কোন ভাষার দুর্দান্ত দাপটের কারণে?
যে ভাষায় প্রায় ২৫ কোটি লোক কথা বলে, সে ভাষা এত সহজে লুপ্ত হবে না, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে, আমাদের সামনে মানে বাংলাদেশের মানুষের সামনে ভাষা নিয়ে কথা বলতে গেলেই যখন অবধারিতভাবে মনে পড়ে যায় ১৯৫২। জ্বলজ্বল করে ২১ শে ফেব্রুয়ারি। মনে হয়, শহীদের বুকের তাজা রক্ত যেন মিশে আছে এই বাংলা ভাষার সাথে, বাংলা বর্ণমালার সাথে। ফলে বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা- এমন উচ্ছাসে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ভেসে যাই। কবি শামসুর রহমানও– ধারণা করি–সেই আবেগ থেকেই লিখেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ/ বারান্দায় লাগে জোৎস্নার চন্দন। বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে উদার গৈরিক মাঠে, খোলা পথে, উত্তাল নদীর বাঁকে বাঁকে, নদীও নর্তকী হয়।’
তবে এসব আবেগী ভাবনার বাইরে এসে কঠিন বাস্তবকেও তো উপেক্ষা করতে পারি না।
এটা তো অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে সারা বছর ধরে ভাষা নিয়ে প্রায় সর্বত্রই দেখা যায় এক ধরনের উদাসীনতা, দেখি বাংলা ব্যবহারে অসচেতনতা, দেখি নতুন প্রজন্ম বাংলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, দেখি বাংলা ভাষায় অনায়াসে অনুপ্রবেশ ঘটছে বিস্তর ইংরেজি ও বিদেশী শব্দের। (সম্পূর্ণ…)

বাংলা ভাষার শত্রু কারা?

চঞ্চল আশরাফ | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১১:৫৮ অপরাহ্ন

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুরায়।
নিজ দেশ ত্যাজি কেন বিদেশে ন যায়।।

সতেরো শতকে এই কবিতা রচিত হওয়া মানে, তার বেশ আগে থেকেই এ দেশে বাংলা ভাষার শত্রু ছিল। তখন বাংলা ছিল বিপুল গরিষ্ঠ নিপীড়িতের ভাষা। তাহলে এর শত্রু ছিল কারা? আমরা জানি, এই ভূখণ্ডকে বেশির ভাগ সময় শাসন করেছে বহিরাগতরা, তারা এখানকার ভাষার মিত্র হবে, এমন চিন্তা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই দেশে জন্ম নেয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এবং তাদের খুদকুড়ায় তুষ্ট লোকজন, যারা বাংলা ভাষাকে অচ্ছুৎ জ্ঞান করে এসেছে, তারাই বাংলা ভাষার বড় শত্রু। আব্দুল হাকিম যখন উদ্ধৃত কবিতাটি রচনা করেন, তখন ব্রাহ্মণদের দাপট, তারা বাংলার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল সংস্কৃতকে; এমন প্রচারও চালিয়েছিল যে, বাংলায় কথা বললে নরকে যেতে হবে।

বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে শাসক শ্রেণির সহিংস আচরণের সর্বশেষ নমুনা হলো ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ ছাত্রজনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ । তা ছিল বস্তুত বাংলা ভাষার ওপরই আক্রমণ। এতেই বোঝা যায়, বাংলা শাসকদের প্রতিপক্ষ হয়েই ছিল দীর্ঘকাল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও, জনমানুষের এই ভাষার শত্রু যে অপসৃত হয়েছে, এমন নয়। বরং নানা মাত্রায় নব্য শত্রুশ্রেণির উত্থান ও বিকাশ ঘটে চলেছে, বাংলা ভাষার জন্য তারা নিশ্চিতভাবেই বড় হুমকি। (সম্পূর্ণ…)

শওকত আলী: প্রাকৃতজনের প্রদোষকাল

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১২:৫০ অপরাহ্ন

border=0টিকাটুলীর ‘বিরতি ভিলা’র নীচের তলায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কুঠুরিতে বহুকাল আগে থাকতেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক ইলিয়াস জগন্নাথ কলেজে পড়াতে শুরু করেই ঘরটা ভাড়া নিয়েছিলেন। তখন চারপাশে খোলামেলা ছিলো, এখন আলো-হাওয়া নেই, বাইরের শব্দ পৌঁছায়না। বেল বাজিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কেউ দরজা খুলবেনা। তবে এখনো একজন থাকেন এখানে। তাঁর বিস্মৃত স্মৃতির গহ্বর থেকে যা কিছু উঠে আসে অধিকাংশই শৈশবের রায়গঞ্জ আর লেখার কথা। এর ভেতরও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে বন্ধু ইলিয়াসের স্মৃতি। বললেন, তাদের দুজনেরই চেতনা ও উপলব্ধির জায়গাটা এক। প্রকাশের ভাষাটা স্বতন্ত্র।
চারতলা ‘বিরতি ভিলা’র প্রায় পরিত্যক্ত এই ঘর এখন প্রদোষে প্রাকৃতজন-এর লেখক শওকত আলীর পৃথিবী। অপরিচ্ছন্ন ছোট একটি বারান্দা আর পা আটকে যাওয়া ঘরে গুমোট হাওয়া। জানালার সাথে নানা রকম প্লাস্টিকের ব্যাগে ওষুধপত্র, কাপড় দলা পাকানো। দেওয়ালে স্ত্রীর বিশাল ছবি কালো ফ্রেমে বাঁধানো, গাদাগাদি করে আছে বইসমেত দুটো বুকসেলফ। সেখানে গর্ডন চাইল্ডের হোয়াট হ্যাপেনড ইন হিস্ট্রি থেকে রোডি ডোয়েলের দ্য ডেড রিপাবলিক। রবীন্দ্র রচনাবলী ও ফয়জুল লতিফ চৌধুরী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের চিঠিপত্র বইগুলোতেও দু’স্তরের ধুলোর পরত। জানতে চাইলাম পড়েন কিনা? মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নিরাসক্তভাবে মনোযোগ সরিয়ে বন্ধ জানালায় চোখ রেখে কিছু দেখলেন। জানালেন, কিছুই আর পড়তে তেমন আগ্রহ পাননা। রাতে ঘুম হয়না, পড়তে চেষ্টা করলে চোখে কষ্ট হয়। তাকে এখন কেউ দেখতে আসেনা তবে এতে অভিযোগ নেই বললেন। জানতে না চাইলেও এই যে ‘অভিযোগ নেই’ বললেন, ওতেই টের পাওয়া গেলো অভিমানের উত্তাপ। এই ঘরে তিনি একাই থাকেন। ছেলেরা উপরের ভিন্ন ভিন্ন তলায়। চলাফেরার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক শওকত আলী, পায়ের পাতা দুটো ফুলে আছে। চোখের ওষুধ নিতে চেষ্টা করেন, হাত কেঁপে গড়িয়ে যায়। সাহায্য করতে চাইলে বাধা দিলেন। তখন মনে হলো, তিনি নিজেরই তৈরি চরিত্র শ্যামাঙ্গের মতো যেন জীবনের কাছে আহত ও প্রতারিত। (সম্পূর্ণ…)

কবিতার অনুবাদ : মুক্ততা ও মৌলিকতা

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১২:৩৩ অপরাহ্ন

অনুবাদ কি? মানব অনুভূতির ভাষিক রূপান্তরই প্রাথমিক অনুবাদ। অনুবাদের দ্বিতীয় প্রকারভেদ হচ্ছে স্ব-ভাষিক অনুবাদ, তৃতীয় প্রকারভেদ দ্বিভাষিক বা বহুভাষিক অনুবাদ এবং শেষোক্ত প্রকারভেদভাষা-বহির্ভূতভিন্ন-মাধ্যমে অনুবাদ। গদ্য, পদ্য, প্রবহমান বয়ান, সংলাপ বা অন্য যে কোনো প্রাকরণিক ভাষ্য প্রথমে স্ব-ভাষিক অনুবাদের মাধ্যমে অনুবাদকের উপলব্ধিতে একটি অর্থময়তা সৃষ্টি করে। এই স্তর পার না হলে দ্বিতীয় বা তৎপরবর্তী অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ উৎস ভাষার প্রথম টেক্সট বা ভাষ্য থেকে পরবর্তী সহজতর বা স্বচ্ছতর ভাষ্যে বিষয়টিকে উপলব্ধি করার এই পর্যায়টি অতি প্রাথমিক স্তরে মনোগতভাবেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। ভাষ্যের মূল ভাষাকে উৎস ভাষা (Source language or SL)এবং অনুবাদ্য ভাষাকে লক্ষ্য ভাষা (Target language or TL) বলা হয়।
এবারে প্রাথমিক বা অতি প্রাথমিক স্তরে মনোগতভাবেই রূপান্তর হওয়ার একটি উদাহরণ দিচ্ছি বাংলা ভাষা থেকে : ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’। এটি একটি কবিতার পঙক্তি। এর প্রাথমিক স্ব-ভাষিক অনুবাদ হচ্ছে ‘আমার ছেলেমেয়েরা যেন দুধ আর ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে’। স্বভাষিক গভীরতর ও ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ হচ্ছে ‘আমার পরবর্তী প্রজন্ম যেন অভাব অনটনের বাইরে সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারে।’ প্রথমটি শাদামাটা আক্ষরিক অনুবাদ, আর দ্বিতীয়টি বিবিধ অনুষঙ্গ বিবেচনায় রেখে তাৎপর্যময় অনুবাদ। এই দুই স্তরের অনুবাদ স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করার পরই অনুবাদক ভিন্নভাষিক বা ভাষা-বহির্ভূত ভিন্নমাধ্যমিক অনুবাদে ব্রতী হতে পারেন । তবে কাজটি যত সহজে বলা হলো, আসলে তত সহজ নয়। (সম্পূর্ণ…)

নগ্নপদ ইলিয়াড ও আসুয়েলার বিপ্লব

রাজু আলাউদ্দিন | ৩০ জানুয়ারি ২০১৭ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন

Azuelaনিকারাগুয়ার রুবেন দারিও, কিংবা পেরুর সেসার বাইয়েহোর নামটি স্মরণে রেখেই আমরা প্রায়শই বলতে শুনি যে লাতিন আমেরিকায় চিলেই হচ্ছে কবিতার সেই দেশ যা সৃষ্টির বৈচিত্র ও গভীরতা দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীকে অভিভূত করেছে। এমনটা বলার কারণও আমাদের অজানা নয়, কারণ চিলেতে প্রায় কাছাকাছি সময়ে বিসেন্তে উইদোব্রো, গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, পাবলো নেরুদা, পাবলো দে রোকা ও নিকানোর পাররার মতো বিশ্বমানের কবির আর্বিভাব। অন্যদিকে, কথাসাহিত্যের জন্য আর্হেন্তিনাকেই পরানো হয় প্রশংসার অতুল্য মুকুট; কেননা এস্তেবান এচেবেররিয়া থেকে শুরু করে মাসেদোনিও ফের্নান্দেস, হোর্হে লুইস বোর্হেস, আদোল্ফো বিয়ই কাসারেস, দানিয়েল মোইয়ানো, হুলিও কোর্তাসার ও মানুয়েল পুুইগ-এর মতো লেখকরা কেবল লাতিন আমেরিকার প্রেক্ষাপটেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটেই বিস্ময়কর উত্থান হিসেবে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে আছেন। কিন্তু লাতিন আমেরিকার একেবারে উত্তরে অবস্থিত মেহিকো সম্পর্কে এমন কিছু কখনোই বলতে শুনা যায় না। অথচ মেহিকো, কী কবিতায়, কী প্রবন্ধে, কী কথাসাহিত্যে-বলতে গেলে সাহিত্যের এই তিনটি শাখায়ই রয়েছে তার অনন্য অর্জন। কবিতায়, সেই ঔপনিবেশিক যুগের বিস্ময়কর প্রতিভা সর হুয়ানা ইনেস্ দে লা ক্রুস থেকে শুরু করে আমাদো নের্বো, রামোন লোপেস বেলার্দে, হাবিয়ের বিইয়াউররুতিয়া, হোসে গরোস্তিসা কিংবা লাতিন আমেরিকার প্রথম ঔপন্যাসিক হোসে হোয়াকিন ফের্নান্দেস দে লিসার্দি, তিনিও মেহিকানো। প্রবন্ধে দার্শনিক ও ভাবুক হোসে বাসকন্সেলোস, এদমুন্দো ওগোরমান, আলফোনসো রেইয়েস, অক্তাবিও পাস। অর্থাৎ তিনটি ক্ষেত্রেই মেহিকোর রয়েছে অসামান্য অর্জন। আর কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে আমরা যদি সময়ক্রমের ধারাবাহিকতায় দেখতে চাই তাহলে লক্ষ্য করবো লিসার্দি দিয়ে গোটা লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের যে শুরু, তার পরে ধীরে ধীরে এসে যুক্ত হচ্ছেন বিস্ময়কর সব ঔপন্যাসিক, যেমন হুয়ান রুলফো, আগুস্তিন ইয়ানঞেস, হুয়ান গার্সিয়া পন্সে, হোসে এমিলিও পাচেকো, ফের্নান্দো দেল পাসো কিংবা কার্লোস ফুয়েন্তেস। কিন্তু এদের সবার আগে উচ্চারণ করতে হবে মারিয়ানো আসুয়েলার নাম, যিনি কেবল মেহিকোরই নয়, গোটা লাতিন আমেরিকার প্রেক্ষাপটেই প্রথম সত্যিকারের এক উল্লম্ফন ঘটিয়েছিলেন কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে। (সম্পূর্ণ…)

কবিতার নুন ও গুণ

শান্তনু কায়সার | ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ ৬:৫৩ অপরাহ্ন

kamal chowdhuryজগতে নুনের মূল্য শোধ দিতে বহু দেনা বাকি
কবিতাংশ ৫ : রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল

১৯৫৭-র ২৮ জানুয়ারি কামাল চৌধুরীর জন্ম। আর তাঁর কবিতাসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে। অর্ধশতকের যে জীবন তিনি যাপন করেছেন তার একটি কাব্যিক প্রকাশ তাঁর এই সংকলনগ্রন্থ। এতে সংকলিত হয়েছে মোট আটটি কাব্যগ্রন্থের প্রায় সব অথবা নির্বাচিত কবিতা। প্রসঙ্গ-কথা’য় কবি বলেছেন, ‘সংগ্রহের বিশালত্বের প্রশ্রয় পেয়ে আমার অনেক অপছন্দের কবিতাও ঢুকে গেছে এ সংকলনে।’ কবিতাসমগ্র’য় অন্তর্ভুক্ত কাব্যগ্রন্থগুলো হচ্ছে মিছিলের সমান বয়সী, টানাপোড়েনের দিন, এই পথ এই কোলাহল, এসেছি নিজের ভোরে, এই মেঘ বিদ্যুত ভরা, ধূলি ও সাগর দৃশ্য, রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল এবং হে মাটি পৃথিবীপুত্র। কবির জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত লেখা কবিতাগুলো এই সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ তিরিশ বছরের কাব্যচর্চার সাক্ষ্য এই সংকলন।
কিন্তু আমরা যারা তাকে কাব্যক্ষেত্রে আবির্ভূত হতে দেখেছি তাদের কাছে এখনো তিনি মিছিলের সমান বয়সীরই কবি। এ বছরই অর্থাৎ ১৯৮১-র ফেব্রুয়ারিতে দ্রাবিড় প্রকাশ করেছিল বেশ কিছু কবিতাগ্রন্থ। মুহম্মদ নুরুল হুদার আমরা তামাটে জাতি, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম, কামাল চৌধুরীর মিছিলের সমান বয়সী এবং আমার রাখালের আত্মচরিত। তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত একটি কবিতায় বলেছেন ‘একটি বয়স থাকে, ভালোবাসার জন্য ভেতরে ভেতরে মানুষ বিপ্লবী হয়ে ওঠে’ রুদ্র সেই বয়সে প্রয়াত হয়ে মানুষকে ভালোবাসার বয়সে থেকে গেছেন।
রুদ্রর দ্রোহ এতোটাই জীবন্ত ছিল যে তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে এর অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেও তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কামাল তাঁর এই সংকলনের দুটি কাব্যগন্থের দুটি কবিতায় রুদ্রকে স্মরণ করেছেন– (সম্পূর্ণ…)

কামাল চৌধুরী : সত্তরের মেধাবী কবি

ফরিদ আহমদ দুলাল | ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ ৫:৪৫ অপরাহ্ন

f2764352সত্তর দশকের দীর্ঘ কবি তালিকায় অসংখ্য বর্ণিল নাম থেকে মাত্র কজনের নাম বেছে নিতে চাইলেও একটি নাম বিবেচনায় থেকেই যায়; যাঁর সাথে সৌজন্যের অতিরিক্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক ততটা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেনি। হয়ে ওঠেনি কারণ, একদিকে একজন অন্তর্গত স্বভাবের সাহিত্যকর্মী অন্যদিকে নির্লিপ্ত পরিমিত স্বভাব-সংহত একজন কবি। একদিকে একজন ব্যর্থ মানুষের উদ্বেগ-সংকুল প্রাত্যহিক জীবন, অন্যদিকে মেধাবী সৌভাগ্যের প্রবহমান সাফল্য। যাঁকে নিয়ে আলোচনা তিনি সত্তর দশকের অন্যতম মেধাবী কবি। সত্তর দশকের প্রিয় কবির তালিকা যতবার প্রণয়ন করতে চেয়েছি ততবার ঐ একটি নাম সামনে এগিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে; করমর্দন করে বলেছে– ‘এখানে এই অসংখ্য সুদীপ্ত মানুষের ভিড়ে আমি কি তোমার নজরে আসিনি?’ আমি বিস্মিত হয়ে বারবারই ভেবেছি এই নামটি কেন সামনে এগিয়ে যায় বারবার! বিভিন্ন সংকলন ও আলোচনায় সত্তর দশকের উল্লেখযোগ্য কবি হিসেবে স্বীকৃত তাঁদের তালিকা কিছুতেই পঞ্চাশোর্ধ নয়। কোনো ঘাটাঘাটি ছাড়াই যদি সত্তর দশকের অন্যতম কবিদের একটা তালিকা কেবল স্মৃতি থেকে উচ্চারণ করতে চাই, তাহলে বলতে পারি আবিদ আজাদ, আবিদ আনোয়ার, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, রবীন্দ্র গোপ, নাসির আহমেদ, ময়ূখ চৌধুরী, তুষার দাশ, আবুল মোমেন, নিতাই রায়, বিমল গুহ, শামসুল ফয়েজ, আশরাফ মীর, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কামাল চৌধুরী, মাহমুদ কামাল, জরিনা আখতার, নাসরীন নঈম, মাহবুব হাসান, মুজিবুল হক কবীর, জাফরুল আহসান, ফারুক মাহমুদ, আবু করিম, আতাহার খান, শিহাব সরকার, আবু হাসান শাহরিয়ার, সোহরাব পাশা, সোহরাব হাসান, জাহিদ হায়দার ইত্যাদি নামের তালিকা। স্মৃতি ঘেটে আরো কিছু নাম নিশ্চয়ই উদ্ধার করা যাবে। এসব নামের পাশে অবশ্যই নিজের নামটিকেও বাদ দিতে চাই না। যদিও সে অর্থে আমি ততটা পরিচিত নই সবার কাছে। এই যে নিমিষে মনে করা নিজের দশকের নামের তালিকাটি, তাও তো একেবারে ছোট নয়। কিন্তু যদি আমাকে সত্তর দশক থেকে দশজন কবিকে বেছে নিতে বলা হয়, কিছুতেই আমি সেই বিশেষ নামটি বাদ দিতে পারি না। আমি লক্ষ করেছি একই বিষয়ে যখনই ষাট-সত্তর-আশির দশকের কবি বন্ধুদের সাথে মত বিনিময় করেছি, প্রত্যেকেই সেই বিশেষ নামটি অনিবার্য বলেই উল্লেখ করেছেন। এতোসব সঙ্গত কারণে ক্রমশ আমি তাঁর বিষয়ে মনোযোগী হয়েছি। অভিনিবেশন দিয়ে পড়তে চেষ্টা করেছি তাঁর কবিতার অন্তর্গত সৌন্দর্য। নির্বাচিত কবিতাসহ তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা আমার জানা মতে নয়টি। সত্তর দশকের কবিতার একটি সংকলন তিনি সম্পাদনাও করেছেন। তার সংকলনে তিনি আমাকে বিবেচনা করেননি, তবুও আমি কখনো তাঁর নাম বাতিল করতে পারি না। এ আমার ঔদার্য নয় বরং এ তাঁর অর্জন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে– মিছিলের সমান বয়সী, টানাপোড়েনের দিন, এই পথ এই কোলাহল, এসেছি নিজের ভোরে, এই মেঘ বিদ্যুত ভরা, নির্বাচিত কবিতা, ধূলি ও সাগর দৃশ্য, রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল এবং হে মাটি পৃথিবীপুত্র। কবিতার জন্য তিনি ইতোমধ্যে রুদ্র পদক এবং কবিতালাপ সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আমি বিশ্বাস করি তাঁর নাম আলাদা করে উচ্চারণ না করলেও যে কোনো সচেতন পাঠক বুঝে গেছেন সত্তর দশকের এই অনিবার্য কবির নাম কামাল চৌধুরী। (সম্পূর্ণ…)

কামাল চৌধুরীর কবিতা: লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখে কারা এই পথের ওপর

মণিকা চক্রবর্তী | ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ ৮:৫৭ পূর্বাহ্ন

kamal chowdhury
সমাপ্ত সর্পিল পথ দিগন্তের পর্বতশিখরে
তার পরে অপার নীলিমা
কী হবে উদ্দেশ্য খুঁজে উর্ধ্বশ্বাস নক্ষত্রনিকরে?
এখানেই পৃথিবীর সীমা।

[উপসংহার: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]

কবি কামাল চৌধুরীর ভ্রমণ কাহিনি কবিতার বইটি হাতে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপরোক্ত লাইনগুলো মনে পড়ল। বিচিত্র লক্ষ্যে, ভিন্ন ভিন্ন দিকে ও ভবিতব্যে ছুটে যাওয়া মানুষ খুঁজে ফেরে জীবনের মানে। কামাল চৌধুরীর ভ্রমণ কাহিনি সিরিজের কবিতাগুলি পড়তে পড়তে তার অন্তর্গত যাত্রা ও উপলব্ধির মাঝে আমিও পাঠক হিসেবে চমকে দাঁড়িয়ে পড়ি। কবিতার শব্দগুলো আমার বোধের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে যেন:

পড়শি রাতের শব্দ,কার নামে এই পাতাঝরা
বনপথে অভিভূত কারা আজ শব্দ অনুগামী
শীত না শোক না জন্ম―এই নিশি কার জন্য লেখা
লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখে কারা এই পথের ওপর?

[০১নম্বর কবিতা]
এক পাতাঝরা শীতের রাতে কবিতাটি রহস্যে আবৃত। সত্যিই কী শীত, না শোক, না জন্ম? কৌতূহল বেড়ে যায়। আবার পড়তে থাকি। আপাত সরল কবিতাটির মধ্যে দেখা পাই এক রহস্যনির্ভরতা। শীতের নির্জনতা আর শোকের বিষাদের মধ্যে টের পাই কোনো এক আকস্মিকের উপস্থিতি: ‘লন্ঠন জ্বালিয়ে রাখে কারা এই পথের ওপর?’ শীত-শোক-জন্ম যেন এক সমান্তরাল রেখা, তাতে মিশে যায় প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম। ‘বিস্ময় বালক লতাগুল্ম পার হয়ে হারাবে কি যাদুর কোটরে?’ বাক্যটি পড়ার পর আমি যেন সত্যি সত্যিই সেই বালকটিকে দেখতে পেলাম যে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার জীবনকে। তীব্র পাতাঝরার কালে, তীব্র শীতের ভিতর যে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার নিজকে। শীতে শেকড় ছিঁড়ে যাবার ভয় যত তীব্র, তার চেয়েও তীব্র হয়ে উঠছে এক অস্তিত্বের সংকট। ভয়, হতাশা, আশঙ্কা পেরিয়ে শব্দের পর্দায় ভেসে উঠেছে নিরন্তর খোঁজার সংগ্রাম। আইডেনটিটি হারিয়ে আমরা আইডেনটিটিকেই খুঁজি। এখানেও তাই, ‘মহিমার বীজ নিজের প্রশ্রয়ে তারা পুনর্বার জন্ম নেবে শীতে।’ (সম্পূর্ণ…)

আমাদের বইমেলা ও কিছু প্রশ্ন

আনিসুর রহমান | ২৫ জানুয়ারি ২০১৭ ৫:৫৮ অপরাহ্ন

Shishu+Prohor-book+fair-05022016-17প্রতিবছর নিয়মিতভাবে একুশে গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হবার বয়স তিন দশকের উপরে। প্রতিবছরই এই বইমেলা ঘিরে একই ধরণের গৎবাঁধা অনুষ্ঠানমালা। নেই তেমন কোন সংযোজন, নেই কোনো পরিমার্জন। শুধু আমরা সংখ্যায় বাড়িয়েছি স্টলের সংখ্যা, বইয়ের সংখ্যা, গায়ে গতরে মেলা বেড়ে বেড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে ভালো। আর ভেতরের চিত্র প্রকাশকরা নিজ নিজ স্টল সাজিয়ে বসবেন-পাঠক আর ক্রেতারা আসবেন, বই কিনবেন জনপ্রিয় লেখকরা স্টলে বসে বিরামহীন অটোগ্রাফ দিয়ে যাবেন। আর অজনপ্রিয় লেখকরা চেয়ে চেয়ে দেখবেন।
আর নজরুল মঞ্চে রিলিফের ভিড়ের মতো জনস্রোত ঠেলে কেউ একটু নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন। এইতো আমাদের বইমেলার মোটা দাগের চিত্র। আমি যত বছর ধরে ঢাকা শহরকে চিনি ঠিক একই সময় যাবৎ আমি আমাদের অমর একুশে বই মেলাকেও জানি। এই জানার দুই দশকের অধিককাল সময় ধরে কয়েকটি প্রশ্ন নানাভাবে ঘুরে ফিরে আসে। কিন্তু প্রশ্নগুলো নিয়ে খোলামেলা কোনো আলোচনা বা কার্যকর বিতর্ক আমি কোথাও লক্ষ করিনি। প্রশ্নগুলো যদি লিখি তাহলে মোটামুটি এমন দাঁড়ায়:
১। বই তেমন বিক্রি হয় না কেন? (প্রকাশকরা লেখকদেরকে এরকমই বলে থাকেন বলেই এই প্রশ্নটা এলো।)
২। বিক্রি না হলেও প্রকাশকরা বই বের করেন কেন? তারপর প্রকাশনা ব্যবসার টিকে থাকেন কিভাবে? (সম্পূর্ণ…)

সাহস ও সৃষ্টির অদম্য লেখক হুমায়ুন আজাদ

মিলটন রহমান | ২১ জানুয়ারি ২০১৭ ১:০৬ অপরাহ্ন

humayun_azadহুমায়ুন আজাদ: বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়। এই উপাধীটি আমরাই প্রথম দিয়েছিলাম। আমি এবং কাজল রশীদ শাহীন ২০০১ সালের শেষ দিকে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার করেছিলাম তাঁর। সে বছর ২৫ নভেম্বর দৈনিক আজকের কাগজের ‘তারকা কাগজ’-এ হুমায়ুন আজাদ-এর পুরো প্রচ্ছদবিস্তারি ছবি দিয়ে বেশ গুরুত্বের সাথেই ছাপা হয়েছিলো সেটি। তবে ছাপা হওয়ার আগে শিরোনাম নিয়ে কথা বলি হুমায়ুন আজাদ-এর সাথে। তিনি ‘হুমায়ুন আজাদ: বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়’ এই শিরোনামটি পছন্দ করে বলেন, হুম, দিতে পারো উপাধীটি, আমার জন্য যথার্থ’। আমাদের নেয়া সাক্ষাৎকারটি তিনি ধর্মানুভূতির উপকথা ও অন্যান্য গ্রন্থে নির্বাচিত সাক্ষাৎকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

ধীমান এবং ঋষিতুল্য এই ব্যক্তিত্বের প্রতি আমার আগ্রহ সবসময় বেশিই ছিলো। এক সময় তাঁর খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগও হয়েছে। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে কেন তাঁকে ‘বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়’ বলেছি। কারণ তিনি বাংলাসাহিত্যের অনেকগুলো ক্ষেত্র আলোকিত করেছেন। ভরিয়ে তুলেছেন মৌলিক কাজের জোছনায়। তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী, সমালোচক, প্রাবন্ধিক, কিশোরসাহিত্যিক, অনুবাদক, গবেষক এবং একজন দক্ষ শিক্ষক। তার নিজের লেখক চরিত্রে যুক্ত ছিলো প্রথাবিরোধিতা। হুমায়ূন আজাদ রাষ্ট্র এবং সমাজের অনেক প্রথা ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি কেন তা চাইতেন, সে ব্যাখাও তাঁর বিভিন্ন লেখা এবং সাক্ষাতকারে উদ্বৃত হয়েছে। একটি রাষ্ট্র তাঁর কাছে সর্বময় ক্ষমতা বা বিশ্বাসের জায়গা ছিলো না। বরং রাষ্ট্রের চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন একজন কবি, বিজ্ঞানী কিংবা দার্শনিককে। তাঁর মতে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রথম শ্রেণির মানুষের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু কবিতা, দর্শন এবং বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের জন্য প্রথম শ্রেণির মানুষ প্রয়োজন হয়। চলুন দেখা যাক এর পেছনে তিনি কি যুক্তি উপস্থাপন করেছেন, ‘মনে করা যাক যদি শেক্সপীয়র মন্ত্রী হতেন, রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্রপতি হতেন বা মনে করা যাক আইনস্টাইন বিজ্ঞানচর্চা ছেড়ে রাজনীতি করতেন, তাহলে কি সভ্যতার জন্য তা মঙ্গলজনক হতো? তা নয়। যিনি সৃষ্টিশীল হবেন, স্রষ্টা হবেন, বৈজ্ঞানিক দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ বা সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী হবেন, তাঁর প্রবণতাই ভিন্ন। তিনি সভ্যতা সৃষ্টি করেন। রাজনীতিবিদরা তা করে না( সাক্ষাৎকার-হুমায়ুন আজাদ:বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়।’ (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা | পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com