প্রবন্ধ

কবিতার অনুবাদ : মুক্ততা ও মৌলিকতা

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১২:৩৩ অপরাহ্ন

অনুবাদ কি? মানব অনুভূতির ভাষিক রূপান্তরই প্রাথমিক অনুবাদ। অনুবাদের দ্বিতীয় প্রকারভেদ হচ্ছে স্ব-ভাষিক অনুবাদ, তৃতীয় প্রকারভেদ দ্বিভাষিক বা বহুভাষিক অনুবাদ এবং শেষোক্ত প্রকারভেদভাষা-বহির্ভূতভিন্ন-মাধ্যমে অনুবাদ। গদ্য, পদ্য, প্রবহমান বয়ান, সংলাপ বা অন্য যে কোনো প্রাকরণিক ভাষ্য প্রথমে স্ব-ভাষিক অনুবাদের মাধ্যমে অনুবাদকের উপলব্ধিতে একটি অর্থময়তা সৃষ্টি করে। এই স্তর পার না হলে দ্বিতীয় বা তৎপরবর্তী অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ উৎস ভাষার প্রথম টেক্সট বা ভাষ্য থেকে পরবর্তী সহজতর বা স্বচ্ছতর ভাষ্যে বিষয়টিকে উপলব্ধি করার এই পর্যায়টি অতি প্রাথমিক স্তরে মনোগতভাবেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। ভাষ্যের মূল ভাষাকে উৎস ভাষা (Source language or SL)এবং অনুবাদ্য ভাষাকে লক্ষ্য ভাষা (Target language or TL) বলা হয়।
এবারে প্রাথমিক বা অতি প্রাথমিক স্তরে মনোগতভাবেই রূপান্তর হওয়ার একটি উদাহরণ দিচ্ছি বাংলা ভাষা থেকে : ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’। এটি একটি কবিতার পঙক্তি। এর প্রাথমিক স্ব-ভাষিক অনুবাদ হচ্ছে ‘আমার ছেলেমেয়েরা যেন দুধ আর ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে’। স্বভাষিক গভীরতর ও ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ হচ্ছে ‘আমার পরবর্তী প্রজন্ম যেন অভাব অনটনের বাইরে সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারে।’ প্রথমটি শাদামাটা আক্ষরিক অনুবাদ, আর দ্বিতীয়টি বিবিধ অনুষঙ্গ বিবেচনায় রেখে তাৎপর্যময় অনুবাদ। এই দুই স্তরের অনুবাদ স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করার পরই অনুবাদক ভিন্নভাষিক বা ভাষা-বহির্ভূত ভিন্নমাধ্যমিক অনুবাদে ব্রতী হতে পারেন । তবে কাজটি যত সহজে বলা হলো, আসলে তত সহজ নয়। (সম্পূর্ণ…)

নগ্নপদ ইলিয়াড ও আসুয়েলার বিপ্লব

রাজু আলাউদ্দিন | ৩০ জানুয়ারি ২০১৭ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন

Azuelaনিকারাগুয়ার রুবেন দারিও, কিংবা পেরুর সেসার বাইয়েহোর নামটি স্মরণে রেখেই আমরা প্রায়শই বলতে শুনি যে লাতিন আমেরিকায় চিলেই হচ্ছে কবিতার সেই দেশ যা সৃষ্টির বৈচিত্র ও গভীরতা দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীকে অভিভূত করেছে। এমনটা বলার কারণও আমাদের অজানা নয়, কারণ চিলেতে প্রায় কাছাকাছি সময়ে বিসেন্তে উইদোব্রো, গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, পাবলো নেরুদা, পাবলো দে রোকা ও নিকানোর পাররার মতো বিশ্বমানের কবির আর্বিভাব। অন্যদিকে, কথাসাহিত্যের জন্য আর্হেন্তিনাকেই পরানো হয় প্রশংসার অতুল্য মুকুট; কেননা এস্তেবান এচেবেররিয়া থেকে শুরু করে মাসেদোনিও ফের্নান্দেস, হোর্হে লুইস বোর্হেস, আদোল্ফো বিয়ই কাসারেস, দানিয়েল মোইয়ানো, হুলিও কোর্তাসার ও মানুয়েল পুুইগ-এর মতো লেখকরা কেবল লাতিন আমেরিকার প্রেক্ষাপটেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটেই বিস্ময়কর উত্থান হিসেবে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে আছেন। কিন্তু লাতিন আমেরিকার একেবারে উত্তরে অবস্থিত মেহিকো সম্পর্কে এমন কিছু কখনোই বলতে শুনা যায় না। অথচ মেহিকো, কী কবিতায়, কী প্রবন্ধে, কী কথাসাহিত্যে-বলতে গেলে সাহিত্যের এই তিনটি শাখায়ই রয়েছে তার অনন্য অর্জন। কবিতায়, সেই ঔপনিবেশিক যুগের বিস্ময়কর প্রতিভা সর হুয়ানা ইনেস্ দে লা ক্রুস থেকে শুরু করে আমাদো নের্বো, রামোন লোপেস বেলার্দে, হাবিয়ের বিইয়াউররুতিয়া, হোসে গরোস্তিসা কিংবা লাতিন আমেরিকার প্রথম ঔপন্যাসিক হোসে হোয়াকিন ফের্নান্দেস দে লিসার্দি, তিনিও মেহিকানো। প্রবন্ধে দার্শনিক ও ভাবুক হোসে বাসকন্সেলোস, এদমুন্দো ওগোরমান, আলফোনসো রেইয়েস, অক্তাবিও পাস। অর্থাৎ তিনটি ক্ষেত্রেই মেহিকোর রয়েছে অসামান্য অর্জন। আর কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে আমরা যদি সময়ক্রমের ধারাবাহিকতায় দেখতে চাই তাহলে লক্ষ্য করবো লিসার্দি দিয়ে গোটা লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের যে শুরু, তার পরে ধীরে ধীরে এসে যুক্ত হচ্ছেন বিস্ময়কর সব ঔপন্যাসিক, যেমন হুয়ান রুলফো, আগুস্তিন ইয়ানঞেস, হুয়ান গার্সিয়া পন্সে, হোসে এমিলিও পাচেকো, ফের্নান্দো দেল পাসো কিংবা কার্লোস ফুয়েন্তেস। কিন্তু এদের সবার আগে উচ্চারণ করতে হবে মারিয়ানো আসুয়েলার নাম, যিনি কেবল মেহিকোরই নয়, গোটা লাতিন আমেরিকার প্রেক্ষাপটেই প্রথম সত্যিকারের এক উল্লম্ফন ঘটিয়েছিলেন কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে। (সম্পূর্ণ…)

কবিতার নুন ও গুণ

শান্তনু কায়সার | ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ ৬:৫৩ অপরাহ্ন

kamal chowdhuryজগতে নুনের মূল্য শোধ দিতে বহু দেনা বাকি
কবিতাংশ ৫ : রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল

১৯৫৭-র ২৮ জানুয়ারি কামাল চৌধুরীর জন্ম। আর তাঁর কবিতাসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে। অর্ধশতকের যে জীবন তিনি যাপন করেছেন তার একটি কাব্যিক প্রকাশ তাঁর এই সংকলনগ্রন্থ। এতে সংকলিত হয়েছে মোট আটটি কাব্যগ্রন্থের প্রায় সব অথবা নির্বাচিত কবিতা। প্রসঙ্গ-কথা’য় কবি বলেছেন, ‘সংগ্রহের বিশালত্বের প্রশ্রয় পেয়ে আমার অনেক অপছন্দের কবিতাও ঢুকে গেছে এ সংকলনে।’ কবিতাসমগ্র’য় অন্তর্ভুক্ত কাব্যগ্রন্থগুলো হচ্ছে মিছিলের সমান বয়সী, টানাপোড়েনের দিন, এই পথ এই কোলাহল, এসেছি নিজের ভোরে, এই মেঘ বিদ্যুত ভরা, ধূলি ও সাগর দৃশ্য, রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল এবং হে মাটি পৃথিবীপুত্র। কবির জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত লেখা কবিতাগুলো এই সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ তিরিশ বছরের কাব্যচর্চার সাক্ষ্য এই সংকলন।
কিন্তু আমরা যারা তাকে কাব্যক্ষেত্রে আবির্ভূত হতে দেখেছি তাদের কাছে এখনো তিনি মিছিলের সমান বয়সীরই কবি। এ বছরই অর্থাৎ ১৯৮১-র ফেব্রুয়ারিতে দ্রাবিড় প্রকাশ করেছিল বেশ কিছু কবিতাগ্রন্থ। মুহম্মদ নুরুল হুদার আমরা তামাটে জাতি, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম, কামাল চৌধুরীর মিছিলের সমান বয়সী এবং আমার রাখালের আত্মচরিত। তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত একটি কবিতায় বলেছেন ‘একটি বয়স থাকে, ভালোবাসার জন্য ভেতরে ভেতরে মানুষ বিপ্লবী হয়ে ওঠে’ রুদ্র সেই বয়সে প্রয়াত হয়ে মানুষকে ভালোবাসার বয়সে থেকে গেছেন।
রুদ্রর দ্রোহ এতোটাই জীবন্ত ছিল যে তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে এর অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেও তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কামাল তাঁর এই সংকলনের দুটি কাব্যগন্থের দুটি কবিতায় রুদ্রকে স্মরণ করেছেন– (সম্পূর্ণ…)

কামাল চৌধুরী : সত্তরের মেধাবী কবি

ফরিদ আহমদ দুলাল | ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ ৫:৪৫ অপরাহ্ন

f2764352সত্তর দশকের দীর্ঘ কবি তালিকায় অসংখ্য বর্ণিল নাম থেকে মাত্র কজনের নাম বেছে নিতে চাইলেও একটি নাম বিবেচনায় থেকেই যায়; যাঁর সাথে সৌজন্যের অতিরিক্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক ততটা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেনি। হয়ে ওঠেনি কারণ, একদিকে একজন অন্তর্গত স্বভাবের সাহিত্যকর্মী অন্যদিকে নির্লিপ্ত পরিমিত স্বভাব-সংহত একজন কবি। একদিকে একজন ব্যর্থ মানুষের উদ্বেগ-সংকুল প্রাত্যহিক জীবন, অন্যদিকে মেধাবী সৌভাগ্যের প্রবহমান সাফল্য। যাঁকে নিয়ে আলোচনা তিনি সত্তর দশকের অন্যতম মেধাবী কবি। সত্তর দশকের প্রিয় কবির তালিকা যতবার প্রণয়ন করতে চেয়েছি ততবার ঐ একটি নাম সামনে এগিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে; করমর্দন করে বলেছে– ‘এখানে এই অসংখ্য সুদীপ্ত মানুষের ভিড়ে আমি কি তোমার নজরে আসিনি?’ আমি বিস্মিত হয়ে বারবারই ভেবেছি এই নামটি কেন সামনে এগিয়ে যায় বারবার! বিভিন্ন সংকলন ও আলোচনায় সত্তর দশকের উল্লেখযোগ্য কবি হিসেবে স্বীকৃত তাঁদের তালিকা কিছুতেই পঞ্চাশোর্ধ নয়। কোনো ঘাটাঘাটি ছাড়াই যদি সত্তর দশকের অন্যতম কবিদের একটা তালিকা কেবল স্মৃতি থেকে উচ্চারণ করতে চাই, তাহলে বলতে পারি আবিদ আজাদ, আবিদ আনোয়ার, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, রবীন্দ্র গোপ, নাসির আহমেদ, ময়ূখ চৌধুরী, তুষার দাশ, আবুল মোমেন, নিতাই রায়, বিমল গুহ, শামসুল ফয়েজ, আশরাফ মীর, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কামাল চৌধুরী, মাহমুদ কামাল, জরিনা আখতার, নাসরীন নঈম, মাহবুব হাসান, মুজিবুল হক কবীর, জাফরুল আহসান, ফারুক মাহমুদ, আবু করিম, আতাহার খান, শিহাব সরকার, আবু হাসান শাহরিয়ার, সোহরাব পাশা, সোহরাব হাসান, জাহিদ হায়দার ইত্যাদি নামের তালিকা। স্মৃতি ঘেটে আরো কিছু নাম নিশ্চয়ই উদ্ধার করা যাবে। এসব নামের পাশে অবশ্যই নিজের নামটিকেও বাদ দিতে চাই না। যদিও সে অর্থে আমি ততটা পরিচিত নই সবার কাছে। এই যে নিমিষে মনে করা নিজের দশকের নামের তালিকাটি, তাও তো একেবারে ছোট নয়। কিন্তু যদি আমাকে সত্তর দশক থেকে দশজন কবিকে বেছে নিতে বলা হয়, কিছুতেই আমি সেই বিশেষ নামটি বাদ দিতে পারি না। আমি লক্ষ করেছি একই বিষয়ে যখনই ষাট-সত্তর-আশির দশকের কবি বন্ধুদের সাথে মত বিনিময় করেছি, প্রত্যেকেই সেই বিশেষ নামটি অনিবার্য বলেই উল্লেখ করেছেন। এতোসব সঙ্গত কারণে ক্রমশ আমি তাঁর বিষয়ে মনোযোগী হয়েছি। অভিনিবেশন দিয়ে পড়তে চেষ্টা করেছি তাঁর কবিতার অন্তর্গত সৌন্দর্য। নির্বাচিত কবিতাসহ তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা আমার জানা মতে নয়টি। সত্তর দশকের কবিতার একটি সংকলন তিনি সম্পাদনাও করেছেন। তার সংকলনে তিনি আমাকে বিবেচনা করেননি, তবুও আমি কখনো তাঁর নাম বাতিল করতে পারি না। এ আমার ঔদার্য নয় বরং এ তাঁর অর্জন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে– মিছিলের সমান বয়সী, টানাপোড়েনের দিন, এই পথ এই কোলাহল, এসেছি নিজের ভোরে, এই মেঘ বিদ্যুত ভরা, নির্বাচিত কবিতা, ধূলি ও সাগর দৃশ্য, রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল এবং হে মাটি পৃথিবীপুত্র। কবিতার জন্য তিনি ইতোমধ্যে রুদ্র পদক এবং কবিতালাপ সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আমি বিশ্বাস করি তাঁর নাম আলাদা করে উচ্চারণ না করলেও যে কোনো সচেতন পাঠক বুঝে গেছেন সত্তর দশকের এই অনিবার্য কবির নাম কামাল চৌধুরী। (সম্পূর্ণ…)

কামাল চৌধুরীর কবিতা: লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখে কারা এই পথের ওপর

মণিকা চক্রবর্তী | ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ ৮:৫৭ পূর্বাহ্ন

kamal chowdhury
সমাপ্ত সর্পিল পথ দিগন্তের পর্বতশিখরে
তার পরে অপার নীলিমা
কী হবে উদ্দেশ্য খুঁজে উর্ধ্বশ্বাস নক্ষত্রনিকরে?
এখানেই পৃথিবীর সীমা।

[উপসংহার: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]

কবি কামাল চৌধুরীর ভ্রমণ কাহিনি কবিতার বইটি হাতে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপরোক্ত লাইনগুলো মনে পড়ল। বিচিত্র লক্ষ্যে, ভিন্ন ভিন্ন দিকে ও ভবিতব্যে ছুটে যাওয়া মানুষ খুঁজে ফেরে জীবনের মানে। কামাল চৌধুরীর ভ্রমণ কাহিনি সিরিজের কবিতাগুলি পড়তে পড়তে তার অন্তর্গত যাত্রা ও উপলব্ধির মাঝে আমিও পাঠক হিসেবে চমকে দাঁড়িয়ে পড়ি। কবিতার শব্দগুলো আমার বোধের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে যেন:

পড়শি রাতের শব্দ,কার নামে এই পাতাঝরা
বনপথে অভিভূত কারা আজ শব্দ অনুগামী
শীত না শোক না জন্ম―এই নিশি কার জন্য লেখা
লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখে কারা এই পথের ওপর?

[০১নম্বর কবিতা]
এক পাতাঝরা শীতের রাতে কবিতাটি রহস্যে আবৃত। সত্যিই কী শীত, না শোক, না জন্ম? কৌতূহল বেড়ে যায়। আবার পড়তে থাকি। আপাত সরল কবিতাটির মধ্যে দেখা পাই এক রহস্যনির্ভরতা। শীতের নির্জনতা আর শোকের বিষাদের মধ্যে টের পাই কোনো এক আকস্মিকের উপস্থিতি: ‘লন্ঠন জ্বালিয়ে রাখে কারা এই পথের ওপর?’ শীত-শোক-জন্ম যেন এক সমান্তরাল রেখা, তাতে মিশে যায় প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম। ‘বিস্ময় বালক লতাগুল্ম পার হয়ে হারাবে কি যাদুর কোটরে?’ বাক্যটি পড়ার পর আমি যেন সত্যি সত্যিই সেই বালকটিকে দেখতে পেলাম যে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার জীবনকে। তীব্র পাতাঝরার কালে, তীব্র শীতের ভিতর যে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার নিজকে। শীতে শেকড় ছিঁড়ে যাবার ভয় যত তীব্র, তার চেয়েও তীব্র হয়ে উঠছে এক অস্তিত্বের সংকট। ভয়, হতাশা, আশঙ্কা পেরিয়ে শব্দের পর্দায় ভেসে উঠেছে নিরন্তর খোঁজার সংগ্রাম। আইডেনটিটি হারিয়ে আমরা আইডেনটিটিকেই খুঁজি। এখানেও তাই, ‘মহিমার বীজ নিজের প্রশ্রয়ে তারা পুনর্বার জন্ম নেবে শীতে।’ (সম্পূর্ণ…)

আমাদের বইমেলা ও কিছু প্রশ্ন

আনিসুর রহমান | ২৫ জানুয়ারি ২০১৭ ৫:৫৮ অপরাহ্ন

Shishu+Prohor-book+fair-05022016-17প্রতিবছর নিয়মিতভাবে একুশে গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হবার বয়স তিন দশকের উপরে। প্রতিবছরই এই বইমেলা ঘিরে একই ধরণের গৎবাঁধা অনুষ্ঠানমালা। নেই তেমন কোন সংযোজন, নেই কোনো পরিমার্জন। শুধু আমরা সংখ্যায় বাড়িয়েছি স্টলের সংখ্যা, বইয়ের সংখ্যা, গায়ে গতরে মেলা বেড়ে বেড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে ভালো। আর ভেতরের চিত্র প্রকাশকরা নিজ নিজ স্টল সাজিয়ে বসবেন-পাঠক আর ক্রেতারা আসবেন, বই কিনবেন জনপ্রিয় লেখকরা স্টলে বসে বিরামহীন অটোগ্রাফ দিয়ে যাবেন। আর অজনপ্রিয় লেখকরা চেয়ে চেয়ে দেখবেন।
আর নজরুল মঞ্চে রিলিফের ভিড়ের মতো জনস্রোত ঠেলে কেউ একটু নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন। এইতো আমাদের বইমেলার মোটা দাগের চিত্র। আমি যত বছর ধরে ঢাকা শহরকে চিনি ঠিক একই সময় যাবৎ আমি আমাদের অমর একুশে বই মেলাকেও জানি। এই জানার দুই দশকের অধিককাল সময় ধরে কয়েকটি প্রশ্ন নানাভাবে ঘুরে ফিরে আসে। কিন্তু প্রশ্নগুলো নিয়ে খোলামেলা কোনো আলোচনা বা কার্যকর বিতর্ক আমি কোথাও লক্ষ করিনি। প্রশ্নগুলো যদি লিখি তাহলে মোটামুটি এমন দাঁড়ায়:
১। বই তেমন বিক্রি হয় না কেন? (প্রকাশকরা লেখকদেরকে এরকমই বলে থাকেন বলেই এই প্রশ্নটা এলো।)
২। বিক্রি না হলেও প্রকাশকরা বই বের করেন কেন? তারপর প্রকাশনা ব্যবসার টিকে থাকেন কিভাবে? (সম্পূর্ণ…)

সাহস ও সৃষ্টির অদম্য লেখক হুমায়ুন আজাদ

মিলটন রহমান | ২১ জানুয়ারি ২০১৭ ১:০৬ অপরাহ্ন

humayun_azadহুমায়ুন আজাদ: বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়। এই উপাধীটি আমরাই প্রথম দিয়েছিলাম। আমি এবং কাজল রশীদ শাহীন ২০০১ সালের শেষ দিকে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার করেছিলাম তাঁর। সে বছর ২৫ নভেম্বর দৈনিক আজকের কাগজের ‘তারকা কাগজ’-এ হুমায়ুন আজাদ-এর পুরো প্রচ্ছদবিস্তারি ছবি দিয়ে বেশ গুরুত্বের সাথেই ছাপা হয়েছিলো সেটি। তবে ছাপা হওয়ার আগে শিরোনাম নিয়ে কথা বলি হুমায়ুন আজাদ-এর সাথে। তিনি ‘হুমায়ুন আজাদ: বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়’ এই শিরোনামটি পছন্দ করে বলেন, হুম, দিতে পারো উপাধীটি, আমার জন্য যথার্থ’। আমাদের নেয়া সাক্ষাৎকারটি তিনি ধর্মানুভূতির উপকথা ও অন্যান্য গ্রন্থে নির্বাচিত সাক্ষাৎকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

ধীমান এবং ঋষিতুল্য এই ব্যক্তিত্বের প্রতি আমার আগ্রহ সবসময় বেশিই ছিলো। এক সময় তাঁর খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগও হয়েছে। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে কেন তাঁকে ‘বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়’ বলেছি। কারণ তিনি বাংলাসাহিত্যের অনেকগুলো ক্ষেত্র আলোকিত করেছেন। ভরিয়ে তুলেছেন মৌলিক কাজের জোছনায়। তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী, সমালোচক, প্রাবন্ধিক, কিশোরসাহিত্যিক, অনুবাদক, গবেষক এবং একজন দক্ষ শিক্ষক। তার নিজের লেখক চরিত্রে যুক্ত ছিলো প্রথাবিরোধিতা। হুমায়ূন আজাদ রাষ্ট্র এবং সমাজের অনেক প্রথা ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি কেন তা চাইতেন, সে ব্যাখাও তাঁর বিভিন্ন লেখা এবং সাক্ষাতকারে উদ্বৃত হয়েছে। একটি রাষ্ট্র তাঁর কাছে সর্বময় ক্ষমতা বা বিশ্বাসের জায়গা ছিলো না। বরং রাষ্ট্রের চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন একজন কবি, বিজ্ঞানী কিংবা দার্শনিককে। তাঁর মতে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রথম শ্রেণির মানুষের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু কবিতা, দর্শন এবং বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের জন্য প্রথম শ্রেণির মানুষ প্রয়োজন হয়। চলুন দেখা যাক এর পেছনে তিনি কি যুক্তি উপস্থাপন করেছেন, ‘মনে করা যাক যদি শেক্সপীয়র মন্ত্রী হতেন, রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্রপতি হতেন বা মনে করা যাক আইনস্টাইন বিজ্ঞানচর্চা ছেড়ে রাজনীতি করতেন, তাহলে কি সভ্যতার জন্য তা মঙ্গলজনক হতো? তা নয়। যিনি সৃষ্টিশীল হবেন, স্রষ্টা হবেন, বৈজ্ঞানিক দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ বা সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী হবেন, তাঁর প্রবণতাই ভিন্ন। তিনি সভ্যতা সৃষ্টি করেন। রাজনীতিবিদরা তা করে না( সাক্ষাৎকার-হুমায়ুন আজাদ:বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়।’ (সম্পূর্ণ…)

সৈয়দ হকের কথাসাহিত্য: নক্ষত্রের কারুকাজ

মণিকা চক্রবর্তী | ১৪ জানুয়ারি ২০১৭ ১০:৪২ অপরাহ্ন

Syed+Shamsul+Haq_26092016_0001‘আমাদের অনেক দুপুর ছিল কিন্তু আমরা পৌঁছতে পারিনি সন্ধ্যার কাছে।
আমাদের অনেক রাত ছিল কিন্তু আমরা পৌঁছতে পারিনি নক্ষত্রের কাছে।’
সৈয়দ শামসুল হক আমাদের কালের এক শ্রেষ্ঠ লেখক। সাহিত্যের সকল শাখায় তাঁর বিচরণ। তাঁকে চিনতে পারা,তাঁর খুব কাছে যাওয়ার পথটি খুবই কঠিন। তাঁকে যেটুকু জেনেছি তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে। তাঁর ব্যক্তিত্ব,বাচন মনোমুগ্ধকর। যতবার কাছ থেকে দেখেছি ততবারই আলোড়িত হয়েছি। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে সৈয়দ হকের বিচরণ নেই। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, গান,অনুবাদ সকল শাখাতেই তিনি দ্যুতিময়। স্বকীয় এক ভাষা নির্মানে তিনি সার্থক। নতুন নতুন ভাবনায় সমৃদ্ধ তাঁর লেখার আবেগ,আকুতি,জীবন যন্ত্রণা, দেশপ্রেম।
স্কুল জীবনে সংবাদ পত্রিকাটির সাথে আমার একটি আত্মিক সর্ম্পক গড়ে ওঠে। তার একটি অন্যতম কারণ ছিল তাঁর লেখা শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক কলাম ‘হৃৎকলমের টানে’। খুবই জনপ্রিয় ছিল এই কলামটি। এই কলামের নানা প্রসঙ্গ ঘিরে চিঠি লিখেছি কখনও মনে মনে,কখনও প্রকাশ্যে। সমাজজীবনের নানা সংকট অতি দক্ষতার সাথে খুব তীব্র আর তীক্ষ্ণভাবে প্রতিফলিত হত এই কলামটিতে। নতুন নতুন ভাবনায় ভিতরে ভিতরে চমকে উঠেছি এসব লেখা পড়ে। নিজের ভিতরে নানা রকম বোধের বিকাশ সেসময় টের পেতে থাকি। সংবাদ পত্রিকাকে ঘিরেই তার উপন্যাস ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ ধারাবাহিকভাবে পড়তে থাকি। তখন আমার বয়স অল্প। তাঁর লেখা আমাকে মুগ্ধতার ঘোরে ভরিয়ে রাখত। (সম্পূর্ণ…)

২০১৬-এর ব্যক্তিগত পাঠ-পরিক্রমা

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী | ১ জানুয়ারি ২০১৭ ৭:১১ অপরাহ্ন

প্রতি বছরই বেশ অনেক বই পড়া হলেও, একদম প্রথম পাতা থেকে শেষাবধি পড়া হয় খুব কমই। অনেক বই কেজো বই, শুধুমাত্র কাজের পাতাতেই তাদের পাঠ সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক বই রেফারেন্স বই, শুধু কয়েকটি পাতার জন্যই কেনা হয়। কখন কাজে লাগে কেউ জানে না। এদের মধ্যে কোনো কোনোটি দারুণ স্বাদের। একদম মনপ্রাণ কেড়ে নেয়ার মত। গত বছর ২০১৬তেও এমনই পাঠ-পরিক্রমা থেকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পাঠ-প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা যেতে পারে। যেহেতু আমি মূলত নন-ফিকশন পাঠক, কাজেই প্রবন্ধসাহিত্যেই মনোযোগ দিলাম।

border=0
‘এ বিউটিফুল কোয়েশ্চেন’, ফ্র্যাঙ্ক উইলচেক, ২০১৫।
অনেকদিন বাদে বিজ্ঞানের এতো ঢাউস একটা বই পড়ে শেষ করলাম। লেখক ফ্র্যাঙ্ক উইলচেক, নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। বইটা পড়ে মনে হলো, সত্যিই নোবেল-জয়ীদের ধাতই আলাদা। কনসেপ্ট এতো সুন্দর এবং ততোধিক সুন্দর করে বোঝাতে পারেন, কিম্বা ধরা যাক নতুন একটি প্রপঞ্চকে কিম্বা পুরনো প্রপঞ্চকেই এমনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, যে মাথা ঘুরে যায়। পদার্থবিজ্ঞান, কিছুটা গণিতেরও, এক অনবদ্য ভাষ্য রচিত হয়েছে এই বইটিতে। বইটিতে মূলত একটি প্রশ্ন করা হয়েছে – জগত কি সুন্দর আইডিয়া ধারণ করে কিনা, অথবা এই বিশ্বজগৎ একটি শিল্পকর্ম কিনা? তারপর পিথাগোরাস এবং প্লেটোর ধারণা থেকে সূত্র ধরে বাস্তবতার ব্যাখ্যা, গণিতের অর্থ, প্লেটোনিক সলিডের ওপর বিস্তারিত আলোচনা, প্রকৃতিতে প্লেটোনিক সলিডের প্রাপ্যতা, ব্যবহারিক প্রয়োগ, নিউটনের তিনটি আবিষ্কার – তাঁর অ্যানালিসিস ও সিন্থেসিস, রঙের ধারণার বিস্তার, গতিশীলতার সূত্রধরতা, বিদ্যুত-চুম্বকত্বের বিস্তার ও ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ (ইএম থিওরি), রঙের পারসেপশনে ইএম থিওরির প্রয়োগ, সিমেট্রির আইডিয়া, গাণিতিক তত্ত্বে সিমেট্রির প্রয়োগ এবং উচ্চতর কণাপদার্থবিজ্ঞানে সেই সিমেট্রির প্রভাব, কোয়ার্ক-গ্লুয়ন স্যুপের ব্যাখ্যায় কোয়ান্টাম ক্রোমোডায়নামিকস, কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিস্তার, কণার ওয়েভ-ফাংশনের বিস্তারে সিমেট্রির প্রয়োগ, তার ব্যাখ্যা, বাক্সবন্দী ইলেকট্রন আর টানাতারের কম্পনের অদ্ভুত মিল, এমি নয়থারের অবদান, সুপারসিমেট্রির ধারণা ইত্যাদি নিয়ে এক চরম দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে দিয়েছেন ফ্র্যাঙ্ক।রজার পেনরোজের “দ্য এম্পেররস নিউ মাইন্ড” গ্রন্থটির পর তুলনীয় এনসাইক্লোপিডিক গভীরতায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নিয়ে বিশাল ক্যানভাসে লেখা হয়েছে বিরল। তাই ফিজিক্স এবং ন্যাচারাল সায়েন্সে যারাই আগ্রহী এই বইটি তাদের গভীর তৃষ্ণা মেটাবে। বইটিতে আছে ৫৩টি কালার প্লেট এবং আরও ৪০টি সাদাকালো ছবি, এক সমৃদ্ধ টেকনিকাল গ্লসারি যেটা বইয়ের মূল সরল ভাষ্যের গাণিতিক এবং বৈজ্ঞানিক পূর্ণতা দেয়। (সম্পূর্ণ…)

গার্সিয়া মার্কেসের প্রবন্ধ: এন্থনি কুইনের বোকামি

রাজু আলাউদ্দিন | ৩০ december ২০১৬ ১:১৯ পূর্বাহ্ন

Comboঅগ্রন্থিত অবস্থায় গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের প্রচুর লেখা এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। এটি সেগুলোরই একটি। লেখাটির এখনও কোনও ইংরেজি অনুবাদ হয়নি। বাংলা ভাষাতেও সম্ভবত এই প্রথম অনূদিত হল। অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন লেখাটি উদ্ধার করেছেন মেক্সিকো থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘এল প্রোসেসো’র ১৯৮২ সালের ১৯ এপ্রিল সংখ্যাটি থেকে। স্প্যানিশ থেকে লেখাটির পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ এখানে হাজির করা হল। প্রবাদপ্রতিম উপন্যাস শতবর্ষের নিঃসঙ্গতার চলচ্চিত্রায়নের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল, মার্কেস এই লেখায় তারই বর্ণনা দিয়েছেন।

অভিনেতা এন্থনি কুইন স্পেনের এক পত্রিকায় জানালেন, “টেলিভিশনে ৫০ ঘন্টার এক সিরিয়ালের জন্য শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা হতে পারে একটি চমৎকার জিনিস। কিন্তু গাসিয়া মার্কেস তা বিক্রি করতে চান না।” আরও বললেন, “আমি এক মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, রাজি হননি, কারণ গার্সিয়া মার্কেস কমিউনিস্ট এবং তিনি এক মিলিয়ন ডলার নিয়েছেন–এটা কাউকে জানতে দিতে চান না। কারণ নৈশভোজের শেষে তিনি এসে আমাকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে বললেন, “আচ্ছা বলুন তো, প্রকাশ্যে এই টাকা-পয়সা প্রস্তাব করার ব্যাপারটা আপনার মাথায় এল কী করে? পরেরবার আমাকে আপনি কোনও রকম সাক্ষী-সাবুদ ছাড়া টাকার প্রস্তাব করুন।” (সম্পূর্ণ…)

পাণিহাটি-সোদপুরের রোকেয়ার কবর, রোকেয়া দিবস ও অন্যান্য

পূরবী বসু | ২৮ december ২০১৬ ১১:৪৬ অপরাহ্ন

Rokeyaযতই কেন না আমরা শ্রদ্ধায় অবনত এই মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার প্রতি, তাঁর জীবন ও বহুবিধ কর্ম সম্পর্কে বহু ভুল তথ্য আজো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সর্বত্র যার সংশোধন একান্ত জরুরী। জরুরী তাঁর জীবনের এবং সংগ্রামের কিছু কিছু অজানা তথ্য জানার প্রচেষ্টা। আমরা যেন বিশেষ মনোযোগ দিয়ে আবার ফিরে দেখি তাঁকে। নবতর পর্যায়ে যাচাই করি নারীর স্বাবলম্বিতার জন্যে তাঁর ভাবনা, অবদান; তাঁর পারিপার্শ্বকতা; দেখি তাঁর একান্ত নিরুপায় হয়ে বৃহত্তর স্বার্থে কখনো কখনো বাহ্যিক আচার-আচরণে সমঝোতা করার প্রয়াস।
এই সব প্রচেষ্টার সঙ্গে আমাদের আরেকটু বেশি সতর্ক হতে হবে তাঁর সঠিক মূল্যায়ণে এবং তাঁর বিষয়ে নির্ভুল তথ্য পরিবেশনে। নিচের প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে গবেষণা নিবন্ধে আজো প্রচুর ভুল তথ্য সংযোজিত রয়েছে বেগম রোকেয়ার বিষয়ে। পরিহাসের মতো শোনালেও সত্য, যে প্রতিবেদক এইসব তথ্যগত ভুলের কথা লিখেছেন তাঁর প্রতিবেদনের শিরোনামেই রয়েছে মস্ত বড় এক ভুল। “রোকেয়ার জীবনী” লিখতে তিনি “রোকেয়ার আত্মজীবনী” লিখে ফেলেছেন যা পড়ে মনে হতেই পারে যে নিজের জীবনের তথ্য-ই বুঝি সঠিক দেননি রোকেয়া। (রংপুর, নিজস্ব প্রতিবেদক,পাঠ্যপুস্তকে ভুলে ভরা রোকেয়ার আত্মজীবনী jagonews24.com ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬)।
কিন্তু কার্যত অবরোধপ্রথা নিয়ে তাঁর রচনা এবং অতি গোপনে ও একান্ত নিভৃতে বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিখতে গিয়ে তাঁর যে প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁর বর্ণনা কিংবা নিজের প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের বিদ্যালয় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল চালাতে গিয়ে যে বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত হতে হয়েছে তাঁকে সেসব কথা বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করলেও যতদূর জানি, বিশদভাবে আত্মজীবনী লিখে যাননি রোকেয়া। ফলে এখানে নিশ্চয় বেগম রোকেয়ার স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলালের বরাদ দিয়ে জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক রোকেয়ার জীবনী লিখতে গিয়ে খ্যাতিমান লেখকদের ভুল তথ্য পরিবেশনার প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন। মানে, ভুলে ভরা “রোকেয়ার জীবনী”র প্রসঙ্গ এনেছেন। “রোকেয়ার আত্মজীবনী” নয়। আমাদের দেশের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ও জনপ্রিয় লেখক/গবেষকগণ রোকেয়ার জীবনী লিখতে গিয়ে কতো ভুল তথ্য পরিবেশন করেছেন, এটাই ছিল বক্তব্য। এইসব গ্রন্থে রোকেয়ার বসতবাড়ির জমির পরিমান একশ গুণ হেরফেরে উল্লেখ করা থেকে শুরু করে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সন তারিখ সঠিকভাবে উদ্ধৃত হয়নি। সঠিক হয়নি কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নাম ও পারিবারিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে দেয়া তথ্য। রোকেয়ার ছোটবোন হোমায়রা খাতুনের স্বামী বলে নজরুল-গবেষক আমীর হোসেন চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হোমায়রার স্বামীর নাম তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী। আমীর হোসেন চৌধুরী হলেন হোমায়রা ও তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর পুত্র যিনি ১৯৬৪তে ঢাকায় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা বাঁধলে দাঙ্গা প্রতিরোধ মিছিল ও আনুষঙ্গিক কর্মকান্ডে যোগ দিতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। আমীর হোসেন চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁর জীবনীর ওপর বাংলা একডেমী থেকে একখানা গ্রন্থ প্রকাশিত হয় (আমিনুর রহমান সুলতান, দাঙ্গায় শহীদ আমির হোসেন চৌধুরী, বাংলা একাডেনি, জুন ২০১৩)। এক বছর আগে সেই বইখানি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক শামসুজ্জামান আমীন হোসেন চৌধুরীর আত্মত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন (শামসুজ্জামান, চৌষষ্টির নায়কের জীবনী, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫)। আমীর হোসেন চৌধুরী শৈশবে পিতাকে হারিয়ে মা হোমায়রা খাতুনসহ কলকাতায় চলে যান। আর এদিকে স্বামীর মৃত্যুর পর সৎ মেয়ে ও শ্বশুর বাড়ির অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের অসহযোগিতায় রোকেয়াও তাঁর শ্বশুরবাড়ি ভাগলপুরে নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের স্কুল তুলে দিয়ে কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্থাপনের কাজ শুরু করেন। কলকাতা আসার পর, অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে বেগম রোকেয়া, হোমায়রা খাতুন ও তাঁর পুত্র আমীর হোসেন চৌধুরী এক-ই বাড়িতে বাস করতেন। আমীর হোসেন চৌধুরী, যিনি সন্তান-বুভুক্ষু বেগম রোকেয়ার পুত্রবৎ ছিলেন, কলকাতা থেকেই বি এ পাশ করেন, কিন্তু দেশভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন। আর সেখানেই দাঙ্গা প্রতি্রোধ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ( শফি আহমেদ ও আমার যৌথ সম্পাদনায় বাংলাদেশের খবরের কাগজে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পরবর্তি দাঙ্গার প্রতিফলন নিয়ে যে বিশাল আকারের বই এখনো গেল না আঁধার প্রকাশ করি ফেব্রুয়ারী ১৯৯৩তে, সেটা আমীর হোসেন চৌধুরীকে উৎসর্গ করেছিলাম আমরা, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা থামাতে গিয়ে যিনি আত্মদান করেন।)। (সম্পূর্ণ…)

আমি জন্মগ্রহণ করিনি

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ২৭ december ২০১৬ ১২:৪৫ অপরাহ্ন

Hoqচিরজীবনে প্রবেশের পর প্রথমবারের মতো তাঁর জন্মদিন পালনের মুহূর্তে আমি যখন সৈয়দ শামসুল হকের কবিতাসমগ্র ১-এর পাতা উল্টাতে থাকি অনেকটা অন্যমনে, তখনি চোখ আটকে যায় বর্তমান রচনার শিরোনামটির প্রতি। এটি আসলে তাঁর রচিত জন্মদিন বিষয়ক অনেক কবিতার একটি। কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৯ তারিখে, বগুড়ায় বসে। অর্থাৎ তাঁর সেবারের জন্মদিনের ১৬ দিন পূর্বে। অন্যরকম অভিব্যক্তির এক প্রতিচিত্রী বা দ্বান্দ্বিক বা সাংঘর্ষিক ভাষ্য এটি। প্রায় পাঁচ পৃষ্ঠার এই কবিতাটিতে অসম দৈর্ঘের ১৪৫টি পঙক্তি ও ৯টি আন্ত:সম্পর্কিত স্তবক আছে। আমি প্রথমবার দ্রুত চোখ বুলাতে গিয়েই আটকে যাই, এবং বুঝতে পারি, খুব সহজে পাঠোদ্ধার করার মতো রচনা এটি নয়। নিজের জন্ম-সংক্রান্ত কিছু অকপট স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রান্তমুক্ত পদ্ধতিতে রচিত এই কাব্যবয়ানে তিনি তাঁর ব্যক্তিজন্মের প্রসঙ্গ টেনে স্বসমাজ ও পরিপার্শ্বকে এমন এক অন্তর্বয়িত আখ্যানে পরিণত করেছেন, যার দৃষ্টান্ত সমকালীন বাংলা কবিতায় আগে পেয়েছি মনে পড়ে না। প্রথম পঙক্তিতেই তিনি তিনবার উচ্চারণ করছেন শিরোনাম-বাক্যটি : “আমি জন্মগ্রহণ করিনি, আমি জন্মগ্রহণ করিনি, আমি জন্মগ্রহণ করিনি।” যেন কোনো পার্লামেন্টের মাননীয় মহা-সম্ভাষক একটি মীমাংসিত সিদ্ধান্তের সত্যোচ্চারণ করছেন নির্বিকার চিত্তে। (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা | পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com