প্রবন্ধ

‘সমুদ্রস্তন দ্বীপের মতো সে আছে ঘুমিয়ে’ : ডেরেক ওয়ালকটের প্রস্থান

কুমার চক্রবর্তী | ২৪ মার্চ ২০১৭ ১১:০৭ অপরাহ্ন

Walcott১.
শীতল কাচ ছায়াময় হয়ে ওঠে। এলিজাবেথ একবার লিখেছিল—
আমরা কাচকে আমাদের ব্যথার চিত্রকল্প বানিয়ে ফেলি।

২.
কাছে এসো ফিরে
আমার ভাষা।

ওয়ালকট, তাঁর নিজের ভাষায়, প্রথমত এক ক্যারিবীয় লেখক যিনি মানবগোষ্ঠীর একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে সবকিছু দেখেছেন আর বলেছেন, পরিপক্বতা হলো প্রত্যেক পূর্বসূরির বৈশিষ্ট্যের সাঙ্গীকরণ। তাঁর একীকরণের বিষয় ছিল ল্যাঙ্গুয়েজ কনটিনাম আর কালচারাল স্ট্রেটাম। ১৯৯২ সালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত, সেন্ট লুসিয়ার ক্যাস্টিসে ১৯৩০-এর ২৩ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী ডেরেক ওয়ালকট মনে করতেন যে, অধিকাংশ কৃষ্ণাঙ্গ লেখকই তাঁদের আত্মবিচ্ছিন্নতা দ্বারা নিজেদের পঙ্গু করে ফেলেন, কবি হিসেবে মানবতার বিভাজনে বিশ্বাস অনুচিত। তাঁর স্টার-আপেল কিংডম কাব্যের ‘দ্য স্কুনার ফ্লাইট’ কবিতায় এই চেতনার স্যাবাইন বলছে এমন কথা যা থেকে তাঁর প্রাতিস্বিকতার পরিচয় ধরা পড়ে:
আমি হলাম সোজাসাপটা একজন লাল নিগার যে সমুদ্রপ্রেমিক,
আমার রয়েছে ঠিকঠাক ঔপনিবেশিক শিক্ষা,
আমি একাধারে ডাচ, কৃষ্ণাঙ্গ এবং ইংরেজ
আর হয় আমি কেউ নই নতুবা
আমি এক জাতি।

তাঁর ভেতর ইউরোপীয় ইতিহাস, শিল্পসাহিত্য আর সেন্ট লুসিয়ার আফ্রিকানির্ভর সংস্কৃতির সার্থক মিলন ঘটেছে। তিনি ছিলেন না ইউরোপীয় গোছের, আবার সেন্ট লুসিয়ার কৃষ্ণাঙ্গদের মতো কালোও ছিলেন না, ছিলেন কিছুটা সাদাটে। ফলে বিভিন্ন ঐতিহ্য থেকে গ্রহণের ক্ষমতা তাঁকে দিয়েছে সময়ের এক অতলান্ত কৌলিনত্ব। তিনি বলেছিলেন: ‘আামি এক বিচ্ছিন্ন লেখক: আমার মধ্যে রয়েছে এমন-এক ঐতিহ্য যা একদিকে গ্রহণ করে যায়, আর আছে অন্য এক ঐতিহ্য যা অন্যদিকে বিস্তারিত হয়। একদিকে অনুকরণশীল, বর্ণনাত্মক ও নৃতাত্ত্বিক উপাদান অন্যদিকে তা আবার সাহিত্য ও ধ্রুপদি ঐতিহ্যে শক্তিশালী।’ (সম্পূর্ণ…)

ক্যারিবিয় হোমারের মহাপ্রয়াণ

কামরুল হাসান | ২৪ মার্চ ২০১৭ ৫:৩৫ অপরাহ্ন

D.W.অতিসম্প্রতি প্রয়াত হলেন ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের নোবেল বিজয়ী কবি ডেরেক ওয়ালকট। উল্লেখ্য যে তিনিই পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের প্রথম নোবেল বিজয়ী কবি নন, যদিও কবিতাবিশ্বে তিনিই বেশি আলোচিত। তাঁর আগে ১৯৬০ সালে সাঁ ঝ পের্স সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। ওয়ালকটের নোবেল প্রাপ্তি তার ৩২ বছর পরে, ১৯৯২ সালে। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেন্ট লুসিয়ায় ১৯৩০ সালে। প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা সেন্ট লুসিয়াতেই। তাঁর স্কুল শিক্ষিকা মা কবিতা ভালোবাসতেন, ঘরে উচ্চস্বরে কবিতা আবৃত্তি করতেন। শৈশবে শোনা সেসব কবিতা শিশু ও বালক ওয়ালকটের অবচেতনে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে। তবে তিনি হতে চেয়েছিলেন তার বাবার মতো চিত্রশিল্পী। চিত্রকলায় দীক্ষাও নিয়েছিলেন হ্যারল্ড সিমন্সের কাছে। কবিতা নয়, তার প্রাথমিক হাতেখড়ি চিত্র অাঁকায়। দুর্ভাগ্য বাবার মুখ তিনি দেখতে পাননি। মাত্র ৩১ বছর বয়সে তার বাবা যখন মারা যান, তখন ডেরেক ও তার জমজ ভাই রবার্ট মাতৃগর্ভে ছিলেন।

কিছুদিন ছবি আঁকার পরেই তিনি ইংরেজি ভাষার প্রেমে পড়ে যান, যা থেকে জন্ম নেয় সাহিত্যপ্রীতি। টি এস এলিয়ট ও এজরা পাউন্ডের কবিতাপাঠ তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে এবং সাহিত্যকেই ধ্যানজ্ঞান করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে মায়ের কাছ থেকে ২০০ ডলার সাহায্য নিয়ে তিনি দু’টি কাব্যগ্রন্থ্ নিজেই প্রকাশ করেন। বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে বই বিক্রি করে মায়ের কষ্টে অর্জিত অর্থ ফেরৎও দিয়েছিলেন। (সম্পূর্ণ…)

সাহিত্য মানুষকে পোকা হওয়া থেকে রক্ষা করতে চায়

রাজু আলাউদ্দিন | ১১ মার্চ ২০১৭ ১:০৪ পূর্বাহ্ন

‘জীবন, সমাজ ও সাহিত্য’–এই শিরোনামে আহমদ শরীফের একটি প্রবন্ধ পাঠ্য ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। প্রবন্ধটি ছাত্ররা বাধ্য হয়ে একসময় হয়তো পাস করার তাগিদে পড়তেন, কিন্তু এর সাথে জীবন ও সমাজের সম্পর্ক তাতে কতটা উপলব্ধি করতে পারতো তারা সে ব্যাপারে নিশ্চিত নই। শিরোনামের এই ভিন্ন অর্থের পরস্পর-বিচ্ছিন্ন তিনটি শব্দের মধ্যে কোন বাস্তব সম্পর্ক আছে কিনা, এ নিয়ে লেখক শিল্পী ছাড়া–অন্যদের ঘোরতর না হোক, অন্তত কিছুটা সন্দেহতো আছেই। আছে যে তার একটা উদাহরণ আমরা এখনকার সাধারণ ‘জীবন’ ও ‘সমাজ’ থেকে দেয়ার চেষ্টা করতে পারি।

সারা পৃথিবীতেই শিল্প ও সাহিত্যের কদর এতটাই কমে গেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানবিক শাখায়, বিশেষ করে সাহিত্য বিভাগের তুলনায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ব্যবসা বাণিজ্য শাখায় ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা অনেক বেশি। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেহারা এই অর্থে আরও করুণ। আমাদের এখানে সবচেয়ে ‘খারাপ’(!) ছাত্রছাত্রীরা সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হতে বাধ্য হন আজকের জীবনে সাফল্যদায়ী অন্য বিভাগে ভর্তি হতে না পেরে। বাবা-মায়েরা এমন সব বিষয়ে সন্তানদেরকে পড়তে এবং ভর্তি হতে উৎসাহ দেন যা তাদেরকে দ্রুত আর্থিক সাফল্য ও নিশ্চয়তা দেবে। সাহিত্য যে জীবনে এবং সমাজে প্রয়োজন সে সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা তো নেই-ই, এমনকি থাকলেও, যেহেতু সাহিত্যে পাস করে কোন মোটা অংকের চাকরী পাওয়া যাবে না, অতএব এই বিষয়ে তাদের আস্থাও নেই। সুতরাং সাহিত্য সম্পর্কে প্রায় লোক-দেখানো একটা শ্রদ্ধা থাকলেও জীবনে এর প্রবেশকে মোটামুটি রুদ্ধ করে রেখেছেন এই ভয়ে যে সাহিত্য জীবনকে কোন কিছু দিতে তো পারেই না, বরং জীবনকে নিঃস্ব করে দেয়। এ রকম বিশ্বাসের বহু মানুষ মিলে যে-সমাজটি আমাদের দেশে বিরাজ করছে তার চেহারা এবং মর্মটা আমরা আন্দাজ করে নিতে পারি সহজেই। যেহেতু সমাজ একটা বিমূর্ত জিনিস তাই অনুমান করা ছাড়া আর উপায় কি। তবে এই অনুমান বিমূর্ত হলেও অবাস্তব নয়।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, মহামান্য মুজতবা আলীর পর্যবেক্ষণ ও ভাষ্যে জানা যাচ্ছে, “First World War-এর আগ কোন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারকে ইউরোপের কোন ভদ্রলোকের ড্রইং রুমে ঢুকতে দেওয়া হতো না। বুঝলে, আমার নাতি-নাতনীদের মধ্যে যারা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে তাদেরকে আমার রুমে সাধারণতঃ ঢুকতে দেই না। কারণ ওরা তো অর্ধশিক্ষিত। ওদের সাথে আলাপ করার মতো কিছু নেই। ৫০ বছর বয়স হওয়ার আগে কোন ডাক্তার নিজেকে ভদ্রলোক বলে দাবি করতে পারে না। কারণ ডাক্তারী পাস করার পর ২০/২৫ বছর আমাদের মতো Humanities-এ পড়া লোকজনদের সাথে মেলামেশা না করলে তাঁরা ভদ্রলোক হতে পারে না। অবশ্য ভদ্রলোক হওয়া খুবই কষ্টকর ব্যাপার।” (সৈয়দ মুজতবা আলী: প্রসঙ্গ অপ্রসঙ্গ, গোলাম মোস্তাকীম, স্টুডেন্ট ওয়েজ, তৃতীয় প্রকাশ: বৈশাখ ১৪১৫ বঙ্গাব্দ, পৃ ৪০-৪১)
ইউরোপ নিজেই বস্তুগত বৈভব ও উন্মাদ মুনাফার লোভে রাতারাতি ডিগবাজি খেয়ে এখন সে Humanities-এর তোয়াক্কা করে না। ভদ্র হওয়া মানে মানবিক শাখার শিল্প, সাহিত্য, দর্শন ও ইতিহাসে নিজের মনকে আলোকদীপ্ত করে তোলা। তার এখন অার আলো দরকার নেই, তাই সে ভদ্রতার আভিজাত্য ত্যাগ করে এখন সে রাশি রাশি টাকা চায়। এই আকাঙ্ক্ষা এখন তার সংস্কৃতির সর্বস্তরে প্রতিফলিত।

পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করে সাহিত্য-সমালোচক ও দার্শনিক জর্জ স্টেইনারের একটা পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করে ঔপন্যাসিক মারিও বার্গাস যোসা তার এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে,The humanities now only attract mediocrities and the dregs of the university, while talented Young People flock to study the sciences. And the Proof of this is that the entrance requirements, for humanities departments in the best academic centers of England and United States have dropped to unseemly levels. (Mario Vargas Llosa, The language of passion, Picador. 2003, P-114). (সম্পূর্ণ…)

অনুবাদ সাহিত্য: বৈচিত্র্য ও বৈভব, আদর্শ ও বিতর্ক

আবদুস সেলিম | ৫ মার্চ ২০১৭ ৪:০১ অপরাহ্ন

translation-1১.অনুবাদ সাহিত্য
জ্যাক দেরিদা, ওয়াল্টার বেনজামিন-এর একটি বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেছিলেন, অনুবাদ কোনো গ্রন্থ বা মুদ্রিত পাঠ্যবস্তুর টিকে থাকা নিশ্চিত করে। ইংরেজিতে বক্তব্যটি এমন, ‘Translation, . . . ensures the survival of a text.’। তিনি এও বলেছেন অনুবাদ আসলে সাহিত্যকর্মের অন্যজীবন দেয়–এক নতুন মৌলিক অস্তিত্ব সৃষ্টি করে অপরাপর ভাষায়। প্রসঙ্গত এও বলা হয়েছে–বলেছেন জোসেফিন পামার–অনুবাদ ছাড়া কি আমরা পড়তে পারতাম খৃস্টপূর্ব সাত দশকের গ্রিক মহিলা কবি স্যাফোর কবিতা বা পাঁচ দশকের গ্রিক নাট্যকার ইস্কিলাসের নাটক?
অনুবাদকর্মের আলোচনায় সনাতনভাবে দুটি বিতর্কিত বিষয় উত্থাপিত হয়–আনুগত্য ও স্বাধীনতা (fidelity and license)। অর্থাৎ বিশ্বাসযোগ্য ভাষান্তরের স্বাধীনতা এবং তা করতে গিয়ে মূলের প্রতি অনুগত থাকা। মানতেই হবে, অনুগত থাকার অর্থ উৎস ভাষার অর্থটিকেই বিশ্বস্তরূপে অনুকরণ করা নয় আক্ষরিকভাবে। কারণ শব্দ বা word কখনই কোনো সাহিত্যকর্মের অন্তর্নিহিত অর্থকে চিহ্নিত করে না কারণ যেকোনো শব্দের দুটি অবস্থান রয়েছে–বিশেষ করে সাহিত্যকর্মে–একটি আভিধানিক এবং অন্যটি দ্যোতনিক বা গূঢ়ার্থিক। বিরোধ বাধে ঐ দ্যোতনিক বা গূঢ়ার্থিক শব্দের ভাষান্তর কালে। যদিও নীগিতভাবে অনুপযোগী (politically inappropriate) তবুও বর্তমান প্রসঙ্গে উপযোগী, আমি এই উদ্ধৃতিটি বিনয়ের সাথে উত্থাপন করতে চাই: Translation is like a woman: if she is faithful, she is not beautiful; if she is beautiful, she is not faithful. গূঢ়ার্থটি হলো, অনুবাদক কখনই একাধারে মূলের প্রতি অনুগত থেকে নান্দনিক অনুবাদকর্ম করতে পারে না। নান্দনিক বা সুন্দর হতে হলে স্বাধীনতা অপরিহার্য। (সম্পূর্ণ…)

ভাষার বিকৃতি: হীনম্মন্যতায় ভোগা এক মানসিক ব্যাধি?

রাজু আলাউদ্দিন | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১১:১২ পূর্বাহ্ন

The corruption of man is followed by the corruption of language–Ralph Waldo Emerson

বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের গর্বের কোন শেষ নেই, আবার নিজের ভাষাকে অপমানেও আমাদের কোনো জুড়ি নেই। যে ভাষার জন্য আমরা শহীদ হয়েছি সেই ভাষাই যথেচ্ছ ব্যবহারের দায়িত্বহীনতার মাধ্যমে তার ঘাতক হয়ে উঠেছি। পুরো বিষয়টি জাতীয়তাবাদের দ্বৈতরূপ সম্পর্কে হোর্হে লুইস বোর্হেসের উক্তিরই সমধর্মী হয়ে উঠেছে: “যিনি শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত তিনি জল্লাদও হতে পারেন এবং তোর্কেমাদা(স্পেনে ইনকুইজিশনের যুগে অত্যাচারী যাজক–লেখক) খ্রিষ্টের অন্য রূপ ছাড়া আর কিছু নন।” আর এই জল্লাদের ভূমিকায় এখন জনগন ও রাষ্ট্র একই কাতারে সামিল হয়েছে।

একটি সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত অভিব্যক্তিপূর্ণ ভাষা গড়ে উঠতে হাজার হাজার বছর লাগে। আর একটি ভাষার গড়ে ওঠার পেছনে থাকে শত সহস্র মানুষের অবদান যারা শব্দ ও শব্দার্থের জন্ম দিয়ে ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। আর লেখকরা এসে এই শব্দ ও শব্দার্থের সীমা বাড়িয়ে দেন বা নতুন নতুন অর্থের ব্যঞ্জনায় দীপিত করে তোলেন ভাষাকে।

কিন্তু আমাদের অজ্ঞতা, অবহেলা, স্বেচ্ছাচার ও দায়িত্বহীনতার কারণে এই সম্মিলিত অর্জনকে আমরা বিকৃত করছি প্রতিনিয়ত।

অনেকেই বলেন ভাষা কোন স্থির বিষয় নয়, নদীর মতো পরিবর্তিত হতে বাধ্য। অবশ্যই তা পরিবর্তিত হবে, কিন্তু বিকৃত নয়। আমরা স্বেচ্ছাচার ও অবহেলার মাধ্যমে একে বিকৃতও করে তুলতে পারি, প্রবহবান নদীতে রাসায়নিক বর্জ ও জঞ্জাল ফেলে একে দুষিতও করতে পারি, যেভাবে বুড়িগঙ্গা নদীকে আমরা করেছি।
ভাষা স্থির কোন বিষয় নয় বলেই তা প্রতিনিয়ত বদলায়। আর বদলায় বলেই শব্দে ও অর্থে বৈচিত্র ও বিস্তার লাভ করে। কিন্তু ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে পরিবর্তন এক জিনিস আর দায়িত্বহীনতার কারণে বিকৃতি ঘটানো আরেক জিনিস। (সম্পূর্ণ…)

বইমেলা ২০১৭: আলোকোজ্জ্বল একশ বইয়ের সন্ধানে…

আবদুর রাজ্জাক শিপন | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৭:২৮ অপরাহ্ন

BooksWhenever you read a good book, somewhere in the world a door opens to allow in more light. –Vera Nazarian

ভালো বই পৃথিবীর যে কোথাও আলোকোজ্জ্বল একটি দরজা খুলে দেয় । একুশের বইমেলা ২০১৭ তে, ফেব্রুয়ারির ২৫ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩ হাজারের অধিক ! ৩ হাজার বইয়ের সবগুলো নিশ্চয় ভালো বই নয় । ৩ হাজার বইয়ের ভেতর আছে আলোকোজ্জ্বল কিছু বই ! সে সংখ্যা কত হবে, ১০০ শ’ ? ২০০ শ’? ৩ হাজার বইয়ের গাদা থেকে আলোকোজ্জ্বল সেই বইগুলোর সন্ধান কীভাবে পাওয়া সম্ভব ? পত্রিকাতে বিজ্ঞাপন দেখে ? রিভিউ পড়ে ? পাঠকের মুখে শুনে ? সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকা দেখে ?

বিদ্যমান নিবন্ধে উত্তরগুলো খুঁজবো । তার আগে, শুদ্ধতম কবিখ্যাত রূপসী বাংলার জীবনানন্দ দাশের দিকে খানিক মুখ ফেরানো যাক । আমাদের এই লেখাতে প্রাসঙ্গিকভাবেই ভদ্রলোক এসে হাজির হয়েছেন । মৃত্যুর পূর্বে তাঁর রচিত ছোটগল্প ১০৮ টি । ২১টি উপন্যাস । জীবদ্দশাতে তিনি এই লেখাগুলোর একটিও ছাপার অক্ষরে আলোর মুখ দেখান নি । কবি হিসেবে ততোদিনে তিনি বেশ আলোচিত হচ্ছিলেন যদিও। পাঠক কী একটু অবাক হচ্ছেন ? বর্তমান সময়ের যশঃপ্রার্থী লেখকের সঙ্গে মিলিয়ে ? কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালক, প্রকাশকাল ১৯২৭ । দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পাণ্ডুলিপি, ১৯৩৬ । প্রথমটির সঙ্গে ব্যবধান ৯ বছর । ততোদিনে নিজের ভেতর নিজেকে কবি ঝালিয়েছেন, একটু একটু করে ঝালিয়ে নিয়েছেন । পরিপক্ক করেছেন নিজেকে । তারও ৬ বছর পর প্রকাশিত হয় তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বনলতা সেন’ ! বাংলা কবিতা পাঠকমাত্রই বনলতাসেনের কথা জানেন । (সম্পূর্ণ…)

ভাষা ব্যবহার ও মানসিক দাসত্বের খামখেয়ালি

অলভী সরকার | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ২:২৬ অপরাহ্ন

“কোনো ভাষারই চলে না শুধু নিজের শব্দে। দরকার পড়ে অন্য ভাষার শব্দ। কখনো ঋণ করতে হয় অন্য ভাষার শব্দ। কখনো অন্য ভাষার শব্দ জোর করে ঢুকে পড়ে ভাষায়। জোর যার তারই তো সাম্রাজ্য।”

ভিন্ন ভাষার শব্দ প্রসঙ্গে হুমায়ুন আজাদ তাঁর কতো নদী সরোবর বা বাংলা ভাষার জীবনী গ্রন্থে এভাবেই বলছেন।

এটা অবশ্যই বেদনাভারাক্রান্ত হওয়ার মতো বিষয় নয়। কারণ, পরিবর্তন, বিবর্তন- এ সবই ভাষার ধর্ম। আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখতে গেলে ভাষা, এমনকী ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে। ইতিহাসে এর নজিরও দুষ্প্রাপ্য নয়। কিন্তু, যদি কেউ তার প্রকৃত সম্পদের চেয়ে বেশি ঋণ করে, তবে নিঃসন্দেহে তার নাম হবে দেউলিয়া। ফলত, কোনোদিন, সুদের হিসেব মেলাতে না পারার দায়ে, নিলামে উঠতে পারে আসলটুকু।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ দিয়ে শুরু করা যাক।

দেশের প্রথম সারির একটি গণমাধ্যমে, কথোপকথন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন জনৈক তারকা। (সংগত কারণেই, নাম উহ্য রাখছি)। প্রতি চার শব্দের বাক্যে, অন্তত দুটি করে ইংরেজি শব্দ। “অন্তত” বলছি এই কারণে যে, অনুপাতটা প্রায়ই আরো বেশি হারেই ইংরেজির দিকে ঝুঁকছিল।

শুনতে শুনতে আমার খুব প্রিয় একটি চলচ্চিত্রের সংলাপ মনে পড়ে গেল, “… বাংলা বলতে হবে থেমে থেমে। যেন, তুমি ভালো করে বাংলাটা বলতেই জানো না…!”-একজন তরুণী, অপেক্ষাকৃত প্রাচীন যুগের এক চরিত্রকে হাল আমলের কায়দা-কানুন রপ্ত করানোর চেষ্টা করছেন। (সম্পূর্ণ…)

একুশের অপমান

আলম খোরশেদ | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৭:১৬ অপরাহ্ন

একুশ নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতার অন্ত নেই। ফেব্রুয়ারি আসতে না আসতেই দেশজুড়ে ব্যাঙ-এর ছাতার মত গজিয়ে ওঠা তথাকথিত ’ফ্যাশন হাউস’গুলোতে বাংলা বর্ণমালা উৎকীর্ণ পোশাক বিক্রির ধুম পড়ে যায়। আর সেইসব ফ্যাশনদুরস্ত ধরাচুড়ো গায়ে চাপিয়ে একুশের সাতসকালে আমরা দলবেঁধে, সংবৎসর চূড়ান্ত অবহেলার শিকার, জরাজীর্ণ শহীদ মিনারটিতে লাইন লাগিয়ে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ আর সুরে-বেসুরে দুই কলি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গেয়ে আমাদের বাংলাপ্রীতির পরাকাষ্ঠা দেখাই। অথচ বছরের বাকি তিনশ চৌষট্টি দিন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাভক্তির লেশমাত্র বহিঃপ্রকাশ দেখিনা।

আমরা শুদ্ধ করে, প্রমিত উচ্চারণে কথা বলার ব্যাপারে নিদারুণরকম উদাসীন। অথচ কথায় কথায় বিনা দরকারে ভুলে-ভরা ইংরেজি কপচাতে রীতিমত পারঙ্গম। বইপত্রে, রেডিও-টেলিভিশনে, মঞ্চে-মাইকে কোথাও বাংলা ভাষাটিকে শুদ্ধ ও সুন্দরভাবে উপস্থাপনের কোন প্রচেষ্টা নেই। অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-রেস্তোরাঁ সর্বত্র কারণে-অকারণে ইংরেজির ঢালাও ব্যবহারে আমাদের কোন লজ্জাবোধ হয় না। এমনকী পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানসমূহেও আমরা অবলীলায় বাংলা ভুলে বিজাতীয় বুলির কষ্টকর কসরতে ব্যস্ত থাকি অহর্নিশি। বিয়ের কার্ড ইংরেজিতে ছাপানো আর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে পাড়াপড়শির ঘুমের শ্রাদ্ধ করে তারস্বরে হিন্দি, ইংরেজি গান বাজানোটা যেন আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশই হয়ে উঠেছে ইদানিং। আমরা খেয়ে না খেয়ে আমাদের পুত্রকন্যাদের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়াতে যারপরনাই উৎসাহী। এই কর্মে আমাদের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এবং বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির তথাকথিত ধারকবাহকদেরও উৎসাহে কোন কমতি দেখি না। ভিনদেশি পোশাক-আশাক, খাদ্যাখাদ্য আর সংস্কৃতির বেনোজলে গা ভাসিয়ে দিয়ে পরম তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে বাধে না আমাদের বিবেকে। আমাদের চিত্রশিল্পীরাও বুঝি তাঁদের শিল্পকর্মের নামগুলো ইংরেজিতে রাখতে পারলেই বর্তে যান। নগরসংস্কৃতির নতুন অনুষঙ্গ এফ এম রেডিওর জকি-সম্প্রদায় আর ’টিভি প্রেজেন্টার’ প্রজাতির সদস্যরাও বিকৃত উচ্চারণের এক অদ্ভূতুড়ে খিচুড়ি-বাংলা বলার মহোৎসবে মত্ত, কল্পিত এক ‘স্মার্টনেস’ জাহিরের প্রাণান্ত প্রতিযোগিতায়। (সম্পূর্ণ…)

‘রাস্ট্র ভাষা গান’ ও একজন পল্লীকবি শামসুদ্দীন

আশেক ইব্রাহীম | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনও করিলিরে বাঙ্গালী
তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি।
১.
আমরা তাকে চিনি চারণ কবি শামসুদ্দীন নামে, তিনি নিজের নাম লিখতেন ‘সেখ সামছুদ্দীন’ গ্রাম: ফতেপুর, পোস্ট: বাগেরহাট, জেলা খুলনা (১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে প্রকাশিত গানের বই থেকে নেওয়া)। জন্ম আনুমানিক ১৩২১-২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫ খ্রি.) মৃত্যু ১৩ ই আশ্বিন ১৩৮১ বঙ্গাব্দ (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ খ্রি.)। ভাষা আন্দোলনের প্রথম গানের রচয়িতা হিসেবে খুব বেশীদিন হয়নি এই নামটি আমাদের আলোচনায় এসেছে। ‘রাস্ট্র ভাষা গান’ নামে পরিচিত অমর এই গানের রচয়িতা কবি শামসুদ্দীন একুশের প্রথম গানের রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিভিন্ন লেখার সূত্র ধরে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় বাগেরহাট এ, সি, লাহা টাউনক্লাবে সর্বদলীয় সমাবেশে কবি শামসুদ্দীন স্ব-কন্ঠে এই গান গেয়ে ভাষা আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন।

কবি শামসুদ্দীনের পরবর্তি প্রজন্ম, আবুবকর সিদ্দিক, মোহাম্মদ রফিক এবং ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহম্মেদ প্রমুখ পল্লীবাসি কবি সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁকে স্মরণ করেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে, স্মৃতিচারণায়, গল্পে। পৌঁছে দিয়েছেন বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত। কবি আবুবকর সিদ্দিকী সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লিখেছিলেন কবি শামসুদ্দীন এবং তাঁর গান নিয়ে। বাগেরহাটের ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহমদ লিখেছেন বাগেরহাটের ছোটকাগজ ‘চোখ’-এর ফেব্রুয়ারী ১৯৯০ সংখ্যায়। মোহাম্মদ রফিক তার গল্পগ্রন্থ ‘গল্পসংগ্রহ’ –এ গল্প লিখেছেন কবি শামসুদ্দীনকে নিয়ে। আড্ডায় আলোচনায় বাগেরহাটের প্রবীণ মানুষের কাছ থেকে শামসুদ্দীন সম্পর্কে শোনা যায়। কয়েকদিন আগে কবি মোহাম্মদ রফিক তার পৈত্রিক গ্রাম বৈটপুরে বেড়াতে আসেন, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এক প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “জানো, বাঙ্গালী শব্দটা আমি জীবনে প্রথম শুনেছিলাম শামসুদ্দীনের এই গানে”। বাগেরহাটে আরেক কিংবদন্তী প্রয়াত গনি সরদার, যিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারী রাত ১২ টার পর থেকে সারারাত একটা ভ্যানের সামনে লাউড স্পিকারে ‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনও করিলিরে বাঙ্গালী, তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’-এই গান গাইতে গাইতে কাঁদতেন আর ঘুরে বেড়াতেন শহরের অলিতে গলিতে। তার কন্ঠে প্রকাশিত হাহাকার আমাদের নিয়ে যেত ৫২ সালের রক্তাক্ত রাজপথে। সমস্ত শহর যেন বুকচাপা কান্নায়, শোকে নিমজ্জিত হয়ে থাকত সমস্ত দিন। শ্রদ্ধেয় গনি সরদারের কন্ঠেই এই গান আমি প্রথম শুনেছি, শামসুদ্দীনকে চিনেছি। এভাবেই শামসুদ্দীন লোকমুখে টিকে আছেন বছরের পর বছর ধরে।

‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙ্গালি’ গানের রচয়িতা এবং সুরকার সম্পর্কে তথ্য বিভ্রান্তি আগে থেকেই ছিল, সে সম্পর্কে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত কবি আবুবকর সিদ্দিক-এর লেখায় বিস্তারিত জানা যায়। পরবর্তিতে ২০০৯ সালে বাংলালিংক-এর একটি বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে আবারো এ প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে, কে এই গানের গীতিকার এবং সুরকার? আসলেই কি একুশের প্রথম গানের রচয়িতা এবং সুরকার বাগেরহাটের ফতেপুর গ্রামের দরিদ্র কবি শামসুদ্দীন নাকি অন্য কেউ? ঐ সময়ে কয়েকটি পত্রিকায় লেখালেখি হয়। অনেকে বাংলালিংক-এর বিজ্ঞাপনকে ইতিহাস বিকৃতির দায়ে দোষারোপ করেন। গীতিকার হিসেবে কবি শামসুদ্দীন এবং সুরকার হিসেবে অনেকে আলতাফ মাহমুদের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে বাগেরহাটের ভাষাসংগ্রামী মনসুর আহম্মেদ, আবুবকর সিদ্দিক প্রমুখের লেখায় ২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সন্ধ্যায় বাগেরহাটে শামসুদ্দীনের স্ব-কন্ঠে এই গান গেয়েছিলেন এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। ক’দিন আগে এই লোককবি’র প্রকাশিত প্রথম গানের বই হাতে এসে পৌঁছানোর পর সে-সব বিভ্রান্তি কেটে গেছে। এখন আমরা নিশ্চিত বলতে পারি, ‘রাস্ট্র ভাষা গান’-এর গীতিকার এবং সুরকার কবি শামসুদ্দীন নিজেই। পরবর্তিতে গানের কথায় এবং সুরে কিছু পরিবর্তন করেছিলেন আলতাফ মাহমুদ। বর্তমানে যে গান শোনা যায়, সেটি আলতাফ মাহমুদ কর্তৃক ‘রাস্ট্র ভাষা গান’-এর পরিবর্তিত রূপ। (সম্পূর্ণ…)

মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করা মূর্খতারই নামান্তর

শাহনাজ মুন্নী | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ২:১৮ অপরাহ্ন

Babelঅনেক বছর আগে একবার পত্রিকায় পড়েছিলাম, কোন একটি প্রাচীন ক্ষয়িষ্ণু ভাষার কথা, যে ভাষায় কথা বলা মানুষ কমতে কমতে এমন হয়েছিল, যে শেষ পর্যন্ত ওই ভাষায় কথা বলেন বা ভাষাটি জানেন এমন একজন মাত্র মানুষ শুধু বেঁচেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ওই ভাষাটি পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যাবে। অর্থাৎ ব্যক্তিটির সাথে সাথে মারা যাবে তার প্রাচীন ভাষাটিও। শুধু কি ভাষা মরে যায় ? ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তো একটি জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা জীবনধারা ও সংস্কৃতিরও মৃত্যু ঘটে।

আমি হঠাৎ শিউরে উঠেছিলাম এই আশংকায় যে কোন দিন, কোন দূর্ভাগ্যময় দূর ভবিষ্যতে বাংলা ভাষাও কী তবে লুপ্ত হতে পারে? হারিয়ে যেতে পারে প্রচণ্ড প্রতাপশালী আধিপত্যবাদী কোন ভাষার দুর্দান্ত দাপটের কারণে?
যে ভাষায় প্রায় ২৫ কোটি লোক কথা বলে, সে ভাষা এত সহজে লুপ্ত হবে না, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে, আমাদের সামনে মানে বাংলাদেশের মানুষের সামনে ভাষা নিয়ে কথা বলতে গেলেই যখন অবধারিতভাবে মনে পড়ে যায় ১৯৫২। জ্বলজ্বল করে ২১ শে ফেব্রুয়ারি। মনে হয়, শহীদের বুকের তাজা রক্ত যেন মিশে আছে এই বাংলা ভাষার সাথে, বাংলা বর্ণমালার সাথে। ফলে বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা- এমন উচ্ছাসে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ভেসে যাই। কবি শামসুর রহমানও– ধারণা করি–সেই আবেগ থেকেই লিখেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ/ বারান্দায় লাগে জোৎস্নার চন্দন। বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে উদার গৈরিক মাঠে, খোলা পথে, উত্তাল নদীর বাঁকে বাঁকে, নদীও নর্তকী হয়।’
তবে এসব আবেগী ভাবনার বাইরে এসে কঠিন বাস্তবকেও তো উপেক্ষা করতে পারি না।
এটা তো অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে সারা বছর ধরে ভাষা নিয়ে প্রায় সর্বত্রই দেখা যায় এক ধরনের উদাসীনতা, দেখি বাংলা ব্যবহারে অসচেতনতা, দেখি নতুন প্রজন্ম বাংলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, দেখি বাংলা ভাষায় অনায়াসে অনুপ্রবেশ ঘটছে বিস্তর ইংরেজি ও বিদেশী শব্দের। (সম্পূর্ণ…)

বাংলা ভাষার শত্রু কারা?

চঞ্চল আশরাফ | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১১:৫৮ অপরাহ্ন

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুরায়।
নিজ দেশ ত্যাজি কেন বিদেশে ন যায়।।

সতেরো শতকে এই কবিতা রচিত হওয়া মানে, তার বেশ আগে থেকেই এ দেশে বাংলা ভাষার শত্রু ছিল। তখন বাংলা ছিল বিপুল গরিষ্ঠ নিপীড়িতের ভাষা। তাহলে এর শত্রু ছিল কারা? আমরা জানি, এই ভূখণ্ডকে বেশির ভাগ সময় শাসন করেছে বহিরাগতরা, তারা এখানকার ভাষার মিত্র হবে, এমন চিন্তা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই দেশে জন্ম নেয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এবং তাদের খুদকুড়ায় তুষ্ট লোকজন, যারা বাংলা ভাষাকে অচ্ছুৎ জ্ঞান করে এসেছে, তারাই বাংলা ভাষার বড় শত্রু। আব্দুল হাকিম যখন উদ্ধৃত কবিতাটি রচনা করেন, তখন ব্রাহ্মণদের দাপট, তারা বাংলার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল সংস্কৃতকে; এমন প্রচারও চালিয়েছিল যে, বাংলায় কথা বললে নরকে যেতে হবে।

বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে শাসক শ্রেণির সহিংস আচরণের সর্বশেষ নমুনা হলো ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ ছাত্রজনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ । তা ছিল বস্তুত বাংলা ভাষার ওপরই আক্রমণ। এতেই বোঝা যায়, বাংলা শাসকদের প্রতিপক্ষ হয়েই ছিল দীর্ঘকাল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও, জনমানুষের এই ভাষার শত্রু যে অপসৃত হয়েছে, এমন নয়। বরং নানা মাত্রায় নব্য শত্রুশ্রেণির উত্থান ও বিকাশ ঘটে চলেছে, বাংলা ভাষার জন্য তারা নিশ্চিতভাবেই বড় হুমকি। (সম্পূর্ণ…)

শওকত আলী: প্রাকৃতজনের প্রদোষকাল

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১২:৫০ অপরাহ্ন

border=0টিকাটুলীর ‘বিরতি ভিলা’র নীচের তলায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কুঠুরিতে বহুকাল আগে থাকতেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক ইলিয়াস জগন্নাথ কলেজে পড়াতে শুরু করেই ঘরটা ভাড়া নিয়েছিলেন। তখন চারপাশে খোলামেলা ছিলো, এখন আলো-হাওয়া নেই, বাইরের শব্দ পৌঁছায়না। বেল বাজিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কেউ দরজা খুলবেনা। তবে এখনো একজন থাকেন এখানে। তাঁর বিস্মৃত স্মৃতির গহ্বর থেকে যা কিছু উঠে আসে অধিকাংশই শৈশবের রায়গঞ্জ আর লেখার কথা। এর ভেতরও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে বন্ধু ইলিয়াসের স্মৃতি। বললেন, তাদের দুজনেরই চেতনা ও উপলব্ধির জায়গাটা এক। প্রকাশের ভাষাটা স্বতন্ত্র।
চারতলা ‘বিরতি ভিলা’র প্রায় পরিত্যক্ত এই ঘর এখন প্রদোষে প্রাকৃতজন-এর লেখক শওকত আলীর পৃথিবী। অপরিচ্ছন্ন ছোট একটি বারান্দা আর পা আটকে যাওয়া ঘরে গুমোট হাওয়া। জানালার সাথে নানা রকম প্লাস্টিকের ব্যাগে ওষুধপত্র, কাপড় দলা পাকানো। দেওয়ালে স্ত্রীর বিশাল ছবি কালো ফ্রেমে বাঁধানো, গাদাগাদি করে আছে বইসমেত দুটো বুকসেলফ। সেখানে গর্ডন চাইল্ডের হোয়াট হ্যাপেনড ইন হিস্ট্রি থেকে রোডি ডোয়েলের দ্য ডেড রিপাবলিক। রবীন্দ্র রচনাবলী ও ফয়জুল লতিফ চৌধুরী সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের চিঠিপত্র বইগুলোতেও দু’স্তরের ধুলোর পরত। জানতে চাইলাম পড়েন কিনা? মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নিরাসক্তভাবে মনোযোগ সরিয়ে বন্ধ জানালায় চোখ রেখে কিছু দেখলেন। জানালেন, কিছুই আর পড়তে তেমন আগ্রহ পাননা। রাতে ঘুম হয়না, পড়তে চেষ্টা করলে চোখে কষ্ট হয়। তাকে এখন কেউ দেখতে আসেনা তবে এতে অভিযোগ নেই বললেন। জানতে না চাইলেও এই যে ‘অভিযোগ নেই’ বললেন, ওতেই টের পাওয়া গেলো অভিমানের উত্তাপ। এই ঘরে তিনি একাই থাকেন। ছেলেরা উপরের ভিন্ন ভিন্ন তলায়। চলাফেরার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক শওকত আলী, পায়ের পাতা দুটো ফুলে আছে। চোখের ওষুধ নিতে চেষ্টা করেন, হাত কেঁপে গড়িয়ে যায়। সাহায্য করতে চাইলে বাধা দিলেন। তখন মনে হলো, তিনি নিজেরই তৈরি চরিত্র শ্যামাঙ্গের মতো যেন জীবনের কাছে আহত ও প্রতারিত। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com