সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ৪)

সমুদ্রে হুমায়ুন আজাদ
১৯৯২ সালের খুব সম্ভবত মধ্য জানুয়ারির কোনও এক সকালে কলাভবনের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীতকালীন কবিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এর আয়োজক ছিলেন আবীর বাঙালী। তিনি তখন বাংলা বিভাগের স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় পর্বের ছাত্র। করতেন ছাত্রদল, কিন্তু হুমায়ুন আজাদের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। সাপ্তাহিক পূর্বাভাস-এ খালেদা জিয়া সম্পর্কে গরিব গ্রহের রূপসী প্রধানমন্ত্রী নামে প্রকাশিত কলামটি তাঁকে আবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এটি ১৯৯১ সালের ঘটনা। তখন ছাত্রদলের ক্যাডাররা হুমায়ুন আজাদের হাত কেটে ফেলবে ব’লে হুমকি দিলে তিনি সম্ভবত প্রথমবারের মতো সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। আবীর বাঙালী দলবল নিয়ে তাঁকে বাসা থেকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসতেন এবং বাসায় পৌঁছে দিতেন বলে শুনেছি। যা-ই হোক, ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হুমায়ুন আজাদ। বেশ উঁচু করে বানানো মঞ্চে তিনি কেডস খুলে উঠে বসেন। তাঁর পরনে নীল-শাদা-লাল কম্বিনেশনে হরাইজন্টাল স্ট্রাইপের সোয়েটার আর জিন্সের প্যান্ট। অনুষ্ঠানটি ছিল এলোমেলো; সভাপতির বক্তব্যের পরও কবিতা পাঠ চলেছিল দীর্ঘক্ষণ। মনে পড়ে, হুমায়ুন আজাদ বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানে আমি আসতে চাই নি। মাইক এখন দালালি আর গালাগালির যন্ত্র; এই যন্ত্রের সামনে আমি দাঁড়াতে যন্ত্রণা বোধ করি। আবীর বাঙালী আমার ছাত্র, তার প্রবল পীড়নে আমাকে এখানে আসতে হয়েছে। আমি মনে করি, কবিদের মাইক আর মঞ্চ বর্জন করা উচিত। কারণ, এই দু’টি জিনিস কবিতার ক্ষতি করেছে সবচেয়ে বেশি। মাইক আর মঞ্চের কাছে কবিরা এখন অসহায়; এ-দু’টি জিনিসই নির্ধারণ করছে কবিতা কীভাবে লিখতে হবে।’
ওই অনুষ্ঠানে জেনিস মাহমুন তাঁর ‘ওম কবিতাম্মৃত’ কবিতাটি পড়েন। সত্যি বলতে কী, কবিতাটি উপস্থিত প্রায় সবাইকে প্রথমত চমকে দেয়, দ্বিতীয়ত মুহ্যমান করে। পরদিন হুমায়ুন আজাদ আমাকে বলেন, ‘কবিতাটি লেখা হয়েছে মঞ্চের জন্যে। কিন্তু মঞ্চের কবিতা এত ভালো হয় না। কবিকে একদিন আমার কাছে নিয়ে এসো।’ আন্ওয়ার আহমদের বাসায় এবং বাংলা একাডেমীর তরুণ লেখক প্রকল্পে রিসোর্স পার্সন হিসেবে জেনিসের কবিতাটির প্রশংসা করেন তিনি। ১৯৯২ সালে, একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে বাংলা একাডেমীর মঞ্চে জেনিস কবিতাটি দ্বিতীয়বারের মতো পড়েন। সেখানেও শ্রোতারা আচ্ছন্ন হয়ে যান কিছুক্ষণের জন্য। কবিতা পড়া শেষ হলে নরেন বিশ্বাস ও সৈয়দ শামসুল হক তাঁকে খুঁজতে থাকেন; সেই বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছনোর আগেই তিনি মঞ্চের পেছন দিয়ে সেদিনের জনস্রোতে মিশে যান। বলতে পারি, সেই সময়ের এবং এখনকার শ্রেষ্ঠ একটি কবিতা ‘ওম কবিতাম্মৃত’। (সম্পূর্ণ…)


…….
…….


…….
…….

…….
