শ্রদ্ধাঞ্জলি
অগ্রযাত্রিক কথাশিল্পী আবু রুশ্দের স্মৃতি
[কথাসাহিত্যিক আবু রুশ্দ্ ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখে গত হয়েছেন। ৯১ বছর বেঁচেছিলেন তিনি। তাঁর স্মরণে আর্টস-এর পাতায় আবদুল মান্নান সৈয়দের এই স্মৃতিকথাটুকু ছাপা হলো। ক্রমে তাঁর আত্মজীবনীর নির্বাচিত অংশ ও কয়েকটি গল্প মুদ্রিত হবে। - বি. স.]
আমাদের প্রথম-আধুনিক কথাশিল্পীদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গেই আমার দেখা হয়েছে, আলাপ-আলোচনা হয়েছেও কারো কারো সঙ্গে, কারো কারো স্নেহও অর্জন করেছি আমি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবু রুশ্দ্, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, শাহেদ আলী, আবু ইসহাক, মির্জা আ. মু. আবদুল হাই এ-রকম কয়েকজনকে বলতে পারি আমাদের আধুনিকতার অগ্রযাত্রিক। এই তালিকার প্রথম তিনজনকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই।
………
আবু রুশ্দ্ (২৫/১২/১৯১৯ - ২৪/২/২০১০)
………
আধুনিক বাঙালি-মুসলমান কথাশিল্পীদের দুজনের আমি সরাসরি ছাত্র—শওকত ওসমান আর আবু রুশ্দ্ সেই দুজন। ঢাকা কলেজে, আজ থেকে বছর পঞ্চাশ আগে, আমি ওঁদের ছাত্র ছিলাম। শওকত ওসমান ছিলেন বাংলার অধ্যাপক, আর আবু রুশ্দ্ ইংরেজির। ওঁরা পরস্পরের বন্ধুও ছিলেন—সেই কলকাতা থেকে। এঁদের মধ্যে শওকত ওসমানের সঙ্গে ছিল আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতা। আবু রুশ্দের সঙ্গে অমন ছিল না।
—————————————————————–
একবার বাংলা একাডেমীতে দেখি তাঁকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, পদ্মাতীরবর্তী মানুষেরা তো অধিকাংশই মুসলমান, মানিকের পদ্মানদীর মাঝি-তে মুসলমানদের সংখ্যা এত কম কেন? অবাকই হয়েছিলাম তাঁর প্রশ্নের ধরনে। তখনই বুঝেছিলাম তিনি স্বাধীন চিন্তক।… সাহিত্যজগতে আবু রুশ্দ্ কোনোদিনই উপেক্ষিত ছিলেন না, আবার খুব দাপটেও বিরাজ করেন নি। বরাবর একটি নৈর্ব্যক্তিক দূরত্বে অবস্থান করেছেন। গত বছর ২৫শে ডিসেম্বর তিনি ৯০-বছরে পড়েছিলেন। এ বিষয়ে দেশের সুধী সমাজ নীরব ছিলেন। এর মুখ্য কারণ, কোনো সাহিত্যিক রাজনৈতিক তাঁবুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল না।
—————————————————————-
ঢাকা কলেজে ছাত্র ছিলাম তাঁর। সুদর্শন, সুসজ্জিত, সুবাক্—এমন দেখেছি তাঁকে। ক্লাসে এসে খানিক পড়িয়ে বলতেন, ‘Jot down’—আমরা খাতা খুলে লিখতাম বা লেখার ভান করতাম। আমি যে তাঁর ছাত্র ছিলাম, তা তিনি সম্ভবত জানতেন না। যখন পাবলিস সার্ভিস কমিশনে আমি সরকারি কলেজের শিক্ষক হিশেবে ইন্টারভিউ দিতে গেছি—‘এক্সপার্ট’ হিশেবে এসেছিলেন তিনি। দীর্ঘক্ষণ রেখেছিলেন আমাকে। বঙ্কিমচন্দ্রের সেরা উপন্যাস কোনটি আমার বিবেচনায়, জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাঁর সমসাময়িক কবিদের বিশেষতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল সিলেট এম. সি. কলেজে। প্রবল অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেতে হয়েছিল ঢাকার বাইরে। সেই আমার প্রথমবার মুক্তযাত্রা। এবং প্রথমবার নিজের মতো বসবাস বৃথা যায় নি। আমার তখন পঁচিশ বছর বয়েস। সে-বছরই আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় সত্যের মতো বদমাশ। সরকারি অনুমোদন নিতে হয়েছিল। এবং অনুমোদনপত্র স্বাক্ষর করেছিলেন স্বয়ং আবু রুশ্দ মতিনউদ্দীন। পরের বছর বইটি বাজেয়াপ্ত হয়। কিন্তু, খানিকটা আশ্চর্যই লাগে ভাবতে, আমাকে কোনো কৈফিয়ৎ দিতে হয় নি বা তলবও করা হয় নি। এরকম কিছু যে হতে পারে, সে-বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞান ছিলাম—এখন মনে হয়। সত্যি কথা বলতে কী, আমার লেখার সঙ্গে আমার চাকরির কখনো টক্কর লাগে নি। ধাক্কা আমার চলেছে সবসময় নিজের সঙ্গে। একবার বাংলা একাডেমীতে দেখি তাঁকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, পদ্মাতীরবর্তী মানুষেরা তো অধিকাংশই মুসলমান, মানিকের পদ্মানদীর মাঝি-তে মুসলমানদের সংখ্যা এত কম কেন? অবাকই হয়েছিলাম তাঁর প্রশ্নের ধরনে। তখনই বুঝেছিলাম তিনি স্বাধীন চিন্তক। (সম্পূর্ণ…)









……..
…….





……..

……..