তাপস গায়েনের কবিতা: রূপান্তর ১, ২

তাপস গায়েন | ৩ december ২০১৬ ৫:২৩ অপরাহ্ন

[১] রূপান্তর

এই পৃথিবীর পথে রয়ে গেল অসমাপ্ত আমার ক্রন্দন। ছিল যারা কবি, প্রকৃত উন্মাদ, হয়নি তাদের সাথে দেখা কোনদিন; এখন আছেন তাঁরা অন্তিম শয়ানে, অতল পাতালে কিংবা জলপাই বনে । একাকী সিংহের মতো সমুদ্র এখনও গর্জনশীল আর সেইসব নারী, যারা অপার রূপে অপরূপা, ঈশ্বরীর মতো সৃজনশীল, হেঁটে গেছেন নির্ভার যারা এই পৃথিবীর পথে, তাদের শরীরের ছায়া কখনো আমার দেহের সমাঙ্গ হয়ে উঠেনি। এইসব নারীদের আজ দেবী এথিনার মতো অলীক রূপকথা বলে মনে হয় । তবু এই পৃথিবীতে আমাদের বসবাস। নিজের সন্তানের মুখ আজ সবচে’ প্রিয় মনে হয়।

মেষ শাবকের মতো শান্ত দিন, দিগন্তে প্রতিফলিত রঙিন পাহাড়; পাশে প্রবাহিত স্রোতস্বিনী শিশুর অবয়বের মতো উজ্জ্বল। ভেবেছিলাম, পাতা ঝরে পড়ার রঙিন দিনগুলোতে বন্ধুদের সাথে হবে মদ্যপান আর আড্ডা অর্থহীন; কিন্তু সপ্রাণ নদীর মতো প্রতিটি জীবন এখন সুদূরে ধাবমান। মধ্য যৌবন পেরিয়ে সকলেই যেন ঝরে পড়ার কালে এসে স্থির। রাতভর বৃষ্টি এসে নিয়ে গেছে উজ্জ্বল পাহাড়। কে আর কুড়িয়ে নেবে এই অর্থহীন জীবনের দায়ভার!

হে সুবর্ণ বালিকা, যে তুমি ফুলের মতো মেধাবী, তোমার দুই আঙ্গুলের মাঝে পুড়ে আমি ক্রমাগত ছাই হয়ে উঠি! (সম্পূর্ণ…)

কচ্ছপ ও কৈ মাছ

মাসুদা ভাট্টি | ২ december ২০১৬ ১২:২১ অপরাহ্ন

Rubelলতার চোখেই পড়লো, অথচ সকলেই লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে এই নয়’তলা ফ্ল্যাটবাড়ির ছয় তলায় লিফট থামার অপেক্ষা করে। ঠিক লিফটের সামনেই একটি বিশাল এ্যাকুয়ারিয়াম রেখেছেন লতাদের সামনের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক। খুব সৌখিন মানুষ ভদ্রলোক, মাছ পোষেন, কচ্ছপ পোষেন, ছাদে শ’খানের ফুলের টবে লাগিয়েছেন নানা ধরনের ফুলের চারা, ফলও আছে কিছু, যেগুলো আজকাল ছাদেই ফলাচ্ছে নগরচাষীগণ।

এ্যাকুয়ারিয়ামটি যেদিন থেকে এখানে বসেছে সেদিন থেকেই লতা এটির দিকে তাকান, আশেপাশে কেউ না থাকলে এ্যাকুয়ারিয়ামের বাসিন্দাদের তিনি খাবার দেন। খাবারভর্তি কৌটোগুলো অবশ্য এর ওপরেই রাখা থাকে। দু’টো বড় বড় কৈ মাছ, দু’টো কচ্ছপ, বিঘতখানেক লম্বা একটি পাঙ্গাস মাছ এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। তবে কিছু দিন পর পর বাজার থেকে আনা যে কোনো তাজা মাছই এই স্থায়ী বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগ দেয়, পরদিন কিংবা তারপর দিন সেটা মরে গিয়ে ফুলেটুলে ঢোল হয়ে ওঠা অবধি নতুন মাছটিকে এই পুরোনো বাসিন্দারা নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুই তার জন্য যেন নির্ধারিত ছিল, হয় তরকারীর কড়াইয়ে কিংবা এখানে, এই ঢাউস এ্যাকুয়ারিয়ামে। কোথাওই হয়তো এই ক্ষুদ্র ও বেঁচে থাকা মাছেদের জায়গা হয় না। লতা ভাবেন। কিন্তু লতা আশ্চর্য হন অন্য কারণে, লক্ষ্য করে দেখেন যে, একটি কই মাছের লেজটা ক্রমশঃ ছোট হয়ে যাচ্ছে, একটুক্ষণ তাকিয়ে দেখেন যে, একটি কচ্ছপ সুযোগ পেলেই একটি কৈ মাছের লেজের দিকটায় কামড় বসাচ্ছে। কৈ মাছটা যেদিকে কচ্ছপটি থাকে সেদিকে যাচ্ছে না, কিন্তু কিছুক্ষণ পর কচ্ছপটি নিজেই এসে কৈ মাছের পেছন থেকে কামড় দেয়। লতা বুঝতে পারেন যে, কী ভাবে কৈ মাছটি তার লেজ হারাচ্ছে। এটা দু’একদিন আগের কথা। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখে লতা লিফট ধরে নীচে নামেন। কিন্তু নামতে নামতেই তার ভেতরটা কেমন করে ওঠে, নিজের জীবনের সঙ্গে কি তিনি মিল পান কিছু কৈ মাছটার? (সম্পূর্ণ…)

অন্য রকম কবিতা, সাহসী কবিতা

মোহাম্মদ রফিক | ১ december ২০১৬ ১২:০৩ পূর্বাহ্ন

Comboকবি রাজু আলাউদ্দিন দীর্ঘকাল লেখালেখির জগতের সঙ্গে সংযুক্ত। প্রথম থেকেই তিনি অত্যন্ত সচেতন কবিতাকর্মী। সংবেদনশীলও বটে। বলা উচিত, তিনি সংযত ও মেধাবী। তিনি লিখছেনও দীর্ঘ দিন ধরে।

শুনে অবাক হলাম, এটাই তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। পরে ভেবে নিলাম, নিতে বাধ্য হলাম যে, এটাই তো স্বাভাবিক। একজন সচেতন ও সংযত কবির পক্ষে এই তো স্বাভাবিক আচরণ। কাব্যিক আচরণ। প্রকৃত কবি প্রতীক্ষা করতে জানে বা শেখে। প্রতীক্ষার ফসলও সে ঘরে তুলতে সক্ষম হয়। এই কথার প্রমাণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই গ্রন্থের অন্তরবয়ানে।

ইতিমধ্যে কবি ঘুরেছেন পৃথিবীর নানাদেশ, আত্মস্থ করেছেন নানা ভাষা, অন্তরমথিত কথপোকথন এবং বিনিময় ঘটেছে বিভিন্ন ভাষাভাষী কবি ও কবিতার সঙ্গে। অবশেষে কবির প্রত্যাবর্তন ঘটেছে স্বদেশে, স্বভূমিতে, স্বভাষায়, কাব্যিক অর্থেই। তার রচনা জীবন পেয়েছে কাদা-মাটি-জল নদী-নালা, মাঠ-ঘাট ছুঁয়ে। এ হল, এক অর্থে, দেশজ বিশ্বজনীন কবিতা।

সুতরাং, স্বতঃসিদ্ধ যে, কবি রাজু আলাউদ্দিন অন্যদের মত লিখবেন না। লিখতে চাইলেও, সফল হবেন না। একেই বলে কবির নিয়তি। তার কবিতা, আপন নাড়ির টানে, হয়ে উঠেছে একক, স্বতন্ত্র, সাবলীল ও অনবদ্য। তবে তার কবিতা, বাংলা কবিতা, বাংলা ভাষারই কবিতা, একই স্রোতধারার অন্যএকটি খাঁত। ঋদ্ধ ও গতিময়। আমাদের মানুষের সম্পদ। (সম্পূর্ণ…)

অমৃত সমান : সালাহ্উদ্দীন আহমদের জীবনস্মৃতি

সনৎকুমার সাহা | ২৯ নভেম্বর ২০১৬ ৫:৩৭ অপরাহ্ন

border=0আমি ইতিহাস পড়িনি। সরাসরি তাঁর ছাত্র নই। কিন্তু নির্দ্বিধায় যাঁদের গুরু মেনেছি, তিনি তাঁদের একজন। অন্যজন আমার পাঠ্য বিষয়ের শিক্ষক প্রফেসর মুশাররফ হোসেন। কিন্তু প্রফেসর হোসেনের কাছেও তিনি শুধু অগ্রজ বন্ধুই ছিলেন না। ছিলেন অবিমিশ্র শ্রদ্ধার, অন্তহীন আস্থার, দৃঢ়চেতা, সদা প্রশান্ত এক মনীষী। মাঝে মাঝে মজা করে তাঁর ধৈর্যচ্যূতি ঘটাতে মুশাররফ হোসেন নানাভাবে তাঁকে উস্কে দেবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু হার মানতেন বারবার। মনে হয়, তিনিও এমনটিই চাইতেন। পরে বলতেন, এই একজন মানুষ। মানুষই, কিন্তু দেবতারও প্রণম্য। অবশ্য দেবতা বলতে তিনি বুঝতেন, বাস্তবে দ্বান্দ্বিক জটিলতার অসংখ্য টানা-পড়েনের ভেতর বিবেকশুদ্ধ আচরণ যাঁর কখনও বিচলিত হয় না, তাঁকে। এই মানুষটি প্রফেসর সালাহ্উদ্দীন আহমেদ। ঠিক দু বছর আগে ১৯ অক্টোবর, ২০১৪-য় তাঁর জীবনাবসান। বয়স নব্বই অতিক্রান্ত। দীর্ঘ জীবনই বলা যায়। কিন্তু কখনোই তা বাতিলের মিছিয়ে হারিয়ে যায় না। আক্ষেপ এখনও মাথা কোটে।

কথাগুলো নতুন কিছু নয়। তবু আর একবার বলি তাঁর জীবনস্মৃতি ফিরে দেখা পড়ার আবেগে। বইটির প্রকাশনা তাঁর মরণোত্তর। ২০১৫-র মহান একুশে বইমেলায়। শেষের দিনগুলোয় নিজে হাতে লেখেননি। একাকী হয়ে পড়া গার্হস্থ্য জীবনে সার্বক্ষণিক সেবক অমল কৃষ্ণ হাওলাদারের ছেলে আশিস কুমার শ্রুতিলিখন নেয়। কিছুদূর এগোলে শুনে শুনে কম্পিউটারে ধরে রাখতে শুরু করে। পরে স্যর দেখে দেন। এই ভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু শেষ হয় না। ১৮ অক্টোবর রাতে অন্যদিনের মতোই ঘুমোতে যান। ঘুমের ভেতরে অসুস্থ হয়ে পড়া। পরদিন সকালে অমল ও আশিস টের পায়। অতি কষ্টে শুধু বলতে পারেন তিনি একবার, ‘আমি মনে হয় আর নেই।’ তারপরে মহাপ্রস্থান। অসম্পূর্ণ তাঁর পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে নিয়ে ছাপার ব্যবস্থা করেন অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। প্রকাশনার দায়িত্ব নেয় ঢাকার অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স। একটা অদ্ভুত মিল, প্রকাশের আগে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পূর্বাপর দেখে দেন প্রফেসর সালাহ্উদ্দীন আহমেদই। তাঁর স্মৃতিকথাও পুরো হলো না। তবে বঙ্গবন্ধুর বইটিতে তাঁর ব্যক্তিত্ব যেমন তাঁর নিজস্বতা নিয়ে সর্বাত্মক ফুটে ওঠে, এটিতেও স্যারকে চিনে নিতে এতটুকু ভুল হয় না। না-বলা অংশ অনেকটাই আমাদের জানা। কারণ, তিনি তখন লোকমান্য একজন। সবাই তাঁকে চেনে। এখানে তাঁর হয়ে ওঠার অংশটিই আমাদের মুগ্ধ আকর্ষণ পুরোপুরি ধরে রাখে। এতটুকু তাল কাটে না। প্রসন্নতার মাধুর্য্যে আমরা আবিষ্ট হই। প্রাচীন শ্রুতি যেমন পবিত্র, এই শ্রুতিলিখনই আমার কাছে তেমন মনে হয়। পড়ে আমাদের আত্মশুদ্ধি ঘটে। (সম্পূর্ণ…)

রৌদ্রময় অনুপস্থিতি : বাংলা কবিতার আলোক

প্রদীপ কর | ২৭ নভেম্বর ২০১৬ ৭:০৭ অপরাহ্ন

Alok
ছবি: অমিতাভ দাসের ক্যামেরায় কবি আলোক সরকার

সামগ্রিক কোলাহলের ভিতরই হয়তো সৃজন সম্ভব এক নিভৃতলোক। সময় হয়তো সেই মৌলিক ধ্যানের মগ্নতায় মিশে থাকে পরম সাধনায়। নিভৃতির মৌলিক সাধনা। বাংলা কবিতার শরীরে মিশে আছে যে বিশেষ কতকগুলি সময়, পঞ্চাশের দশক সেরকমই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবর্ণ সময়। ভাঙা দেশে, ভাঙা মানুষের যন্ত্রণা পেরিয়ে এসে, অনেক না-পাওয়ার বেদনাকে অতিক্রম করে এক বিষন্ন স্বাধীনতার জন্ম। প্রাণের ভাষাকে অনন্তজীবন দেবার জন্য অকাতরে প্রাণত্যাগ… এইসব ভাঙাগড়ার মধ্যেই স্পষ্ট চিহ্নিত হয়ে উঠেছে বাংলা কবিতার পঞ্চাশকাল।

একটি তাৎপর্যপূর্ণ সময়ের মধ্যেই একদল কৃত্তিবাসী যখন ফুটপাথ বদল করতে করতে মধ্যরাতে শাসন করছে কলকাতা শহর, তখন, তার সমান্তরালে আরেক দল, বিশিষ্ট হয়ে উঠছেন ‘শতভিষা’ (১৯৫১) পত্রিকাকে অবলম্বন করে ভিন্নধারার কাব্য প্রয়াসে যার নেতৃত্বে ছিলেন কবি আলোক সরকার। ঐতিহাসিকভাবেই সত্য এই যে, এই দশকের প্রথম প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থটিও কবি আলোক সরকার রচিত উতল নির্জন। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সকলেই বুঝতে পারলেন বিশুদ্ধ কবিতার এক অন্য আলোক উদ্ভাসিত। যদিও, খুবই দুর্ভাগ্যজনকভাবে উল্লেখ করতে হয়, সম্মান, পুরস্কার ইত্যাদি সাহিত্যের সাধারণ মূল্যায়নগুলি তাকে নিয়ে হয়েছে অনেক ধীরে, অনেক পরে। ফলতঃ বাংলা কবিতায় অন্য আলোর উজ্জ্বল প্রভা সবার কাছে তেমন করে পৌঁছায়নি। ভাবি, এই-ই তো অনিত্য, যে, কোলাহল মুখরতায় মিশে থাকতে পারে হাজার হাজার মুখ কিন্তু ধ্যান তো একক। মগ্নতা তো সব সময়েই নিভৃতির। ‘হাজার ঝরাপাতার বুকে পায়ের চিহ্ন মর্মরিত আছে’ (আলোকিত সমন্বয়। নাম কবিতা) যিনি লিপিবদ্ধ করেন কিংবা বলেন:

অনেক দিন ফিরে আসার পরও
যারা পুরোনো ছবিকে নতুন নামে বলছে
তাদের ভিতরের আঁধার
কত গোপন হুহু করছে।

কেউ শুনতেই পাচ্ছে না এমন গোপন।
(আধার। সমাকৃতি ১৯৯৫) (সম্পূর্ণ…)

এক ফালি চাঁদ কিংবা এক টুকরো কেকের গল্প

মাহবুবুল হক শাকিল | ২৬ নভেম্বর ২০১৬ ৯:৫২ অপরাহ্ন

Shakil-storyমেয়েটা ঘুমিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। এখনো তার কপালে জলপট্টি। দুপুরে অনেক কষ্ট করে খাওয়াতে পেরেছে জাউভাত আর ডিমের ঝোল। কাল সকাল থেকেই মেয়েটার জ্বর। সন্ধ্যার পর থেকে শরীর গনগনে কাঠকয়লার আগুনের মতো গরম ছিল। সারা রাত সে মেয়ের শিয়রে। জ্বরের ঘোরে মেয়েটা কতই না আবোল-তাবোল বকেছে। সে শুধু তার জানা কয়েকটি সূরা বারবার পড়েছে আর মেয়ের বাবাকে কিছুক্ষণ পর পর অভিশাপ দিয়েছে। মেয়েটা জ্বরের ঘোরে কতকিছু খাওয়ার আবদার করেছে। একবার বলে পোলাও-কোরমা খাবে তো আবার বলে উঠে, মা, আইসক্রিম খাব। গতকাল দুপুরের রান্না করা ভাত আর ঘন মুসুরের ডাল ছিল ঘরে। মেয়ের মুখে দু লোকমা দেওয়ার পরেই সে বমি করে দেয়। তারপর শুধু চিনি গোলানো পানি। লেবুও ছিল না ঘরে, শরবত করে দেওয়ার মতো। ভোরের দিকে জ্বর কিছুটা কমার পর মা আর মেয়ে দুজনেই ঘুমায়। ঘুমের ভেতরে সে স্বপ্ন দেখে, সুখকর কিছু নয়, তার জীবনের প্রতিটি দিনের মতো সেইসব স্বপ্ন শুধুই দুঃস্বপ্নের গল্প নিয়ে আসে।
সকালে সে মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। মগবাজার রেললাইনের পাশে তাদের বস্তির কাছেই বাজার। সেই বাজারের একমাত্র ফার্মেসিতে ডাক্তার বসে। লোকটার মুখ, কুঁচকানো ভুরু আর ঠোঁটে অনবরত জ্বলতে থাকা সিগারেট দেখে মনে হয় সে সমস্ত জগত-সংসারের প্রতি কোনো কারণে ভীষণ বিরক্ত হয়ে আছে। প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়েই সে বাচ্চাটিকে দেখে। তারপর নাম আর বয়স জিজ্ঞেস করে প্রেসক্রিপশন লেখে।
এই ওষুধগুলা খাইতে থাকুক। তিন দিন পর আবার নিয়া আসবা। রক্ত পরীক্ষা করতে অইবো। তারপর বুঝা যাইবো ডেঙ্গু না টাইফয়েড।
তার বুকটা ধড়াস করে কেঁপে ওঠে। সে শুনেছে ডেঙ্গু হলে নাকি অনেক সময় মানুষ বাঁচে না। এক অজানা শংকায় হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সে। তার কান্নায় ডাক্তারের মুখের বিরক্তির পর্দা অনেকটা সরে যায়।
আরে! ভোদাইয়ের মতো কান্দো ক্যান? আমি কি কইছি নাকি যে ডেঙ্গু অইসে? রক্ত পরীক্ষা করলে কইতে পারুম। অহন ওষুধগুলা নিয়ম কইরা খাওয়াইয়া যাও আর ভালামন্দ খাওন দেও। দেইখ্যা তো মনে অয় শইলে রক্ত নাই। হের বাপে কৈ? (সম্পূর্ণ…)

গুড মর্নিং শ্রীমতি অং সান সুচি

আনিসুর রহমান | ২৫ নভেম্বর ২০১৬ ১১:২৬ পূর্বাহ্ন

Rohingaকার দুয়ারে কে বাঁচার আকুতি করে, একদল পশ্চিমে আছড়ে পড়ে,
বেহেস্তের টিকেট পাবার নসিব করে, আরেক দল জীবহত্যা মহাপাপ
মুখে জপ করে, দুই হাতে তারাই ট্রিগারে চাপ মারে, এক এক করে
মংডু গ্রামের মানুষগুলো মারা পড়ে| কেউ কেউ মরার দরিয়ার পরে
নাফ নদী পাড়ি দেবার চেষ্টা করে| কারো নূহের নৌকার কথা মনে পড়ে?
মানুষ কি পুরোপুরি ডিজিটাল হয় গেছে? টাল কিংবা মাতাল শব্দেরা
অভিধানে রয়ে গেছে? দুনিয়ার চোখ খুলে দেয়া, জয়নুলের আঁকা ছবিতে
কাক ও কুকুর নগরের পথে অনাহারে মরা মানুষেরে নিয়ে টানাটানি করে;
ছবিটি এখন কোথায়, কোন জাদুঘরে? ভয় করে মায়া ও মমতার মতো
ছবিটিও নিরুদ্দেশে পাচার হতে পারে? ইতিহাস পড়লে মনে পড়ে যায়রে,
একদিন মানুষ ছিলামরে; রোদবৃষ্টি মাথায় করে শত্রুর দাবড়ানো খাবার পরে
অপেক্ষা করে, ভিড় ঠেলে, একটা কম্বল পেয়েছিলাম, শরণার্থী শিবিরে! (সম্পূর্ণ…)

জ্যাক লন্ডনের দুষ্প্রাপ্য ছবি

রেশমী নন্দী | ২৪ নভেম্বর ২০১৬ ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন

London আলোকচিত্র: ১৯০৬ সালে জ্যাক লন্ডন সান ফ্রান্সিস্কো উপসাগরের তীরে ছবি তুলছেন।

বিখ্যাত সাহিত্যিক জ্যাক লন্ডনের অনেক লেখায় পাওয়া যায় তাঁর বিচিত্র জীবনের ছায়া। তবে আলোকচিত্রী হিসেবে তাঁর দক্ষতা খুব বেশি মানুষের দেখার সৌভাগ্য হয়নি। লেখালেখির মতো সমান দক্ষতায় জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে তিনি ধারণ করে রেখেছেন তাঁর তোলা অনবদ্য কিছু ছবিতে। তাঁর দুঃসাহসী জীবনাচারণ সেই সাথে সংবাদদাতা হিসেবে তাঁর কাজের পরিধি-সবমিলিয়ে বিশ শতকের গোড়ার দিককার জীবনের অসাধারণ প্রতিচ্ছবি এসব আলোকচিত্র।
The Call of the Wild-এর মতো উপন্যাসের জন্য তিনি বিখ্যাত, যার উপজীব্য তাঁরই দুঃসাহসী অভিযান, পর্বতারোহন কিংবা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি দেবার অভিজ্ঞতা। আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন পৌরুষদীপ্ত লেখকের আর্দশ । তিনি একাধারে ছিলেন একজন সমাজবিজ্ঞানী, ভবঘুরে, নাবিক, যুদ্ধ সংবাদদাতা এবং “ওয়েষ্টার পায়রেট”। তাঁর প্রপৌত্রী টারনেল এ্যাবোটের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্যদের ধরা ঝিনুক চুরি করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করেন নি। উনিশ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে এ ধরনের দস্যুবৃত্তি হতো সমানে। জ্যাক লন্ডনের ছোট গল্প “What Life Means to Me”তেও এর বর্ণনা পাওয়া যায়। পরে অবশ্য এসব ছেড়েছুড়ে দেন তিনি। (সম্পূর্ণ…)

মারুফ রায়হানের কবিতা: ২৩ নভেম্বর

মারুফ রায়হান | ২৪ নভেম্বর ২০১৬ ৯:০৬ পূর্বাহ্ন

Rubelকুণ্ঠায় কুঁকড়ে যাই ফিরে এলে পুনঃজন্মদিন
প্রয়োজন কিছু ছিল নাকি এমন জন্মের
বিড়ালিনী প্রসব করছে মাঝরাতে উপেক্ষিত যন্ত্রণায়
তার সব ছানা বেঁচে থাকবে কি, হবে নাতো জানা
একটা আশ্চর্য ফুল অগোচরে মেলছে পাপড়ি
ভোরের আগেই তার সুগন্ধ বিলীন হবে ঠিক
রাত্তিরের যোনির ভেতর সুর জন্ম নিয়ে সমাহিত কংক্রিট-জঙ্গলে
একটা সামান্য মানুষের জন্ম কী ফারাক বয়ে আনে!
আমার বন্ধুরা নিজ নিজ জন্মোৎসবে ধুমধাম মজে আছে
উঁচিয়ে পেয়ালা দূর থেকে আমিও বলছি বটে চিয়ার্স চিয়ার্স
যদিও ভেতরে ভারি কুঁকড়ে চলেছি বন্ধু সংকোচে লজ্জায়
ফেসবুক ভরে উঠছে ফুল আর কেকের ছবিতে
কী করে উপেক্ষা করি ভার্চুয়াল ভালোবাসা!
তবে মনে রাখি এইসব আকস্মিক ভোজবাজি
ভুলতে পারি না ভোজ হচ্ছে গহীন অরণ্যে বাজি পুড়ছে দূর দ্বীপে! (সম্পূর্ণ…)

নবুয়োসি আরাকি: কামোত্তেজক নয়, কামাশ্রয়ী ফটোগ্রাফি

মাজুল হাসান | ২২ নভেম্বর ২০১৬ ৬:৫৪ অপরাহ্ন

লেন্সের মতো বদলাচ্ছে অ্যাভিন্যুয়ের আকাশ
ভেতরে কাঠের কটেজে সাদাকালো সমীরণ
স্মৃতি ওকে আবেগচালিত ডাউনোসার বলো
সেই কবে বিলুপ্ত, তবু মগজে কুণ্ডলিত কাম
সাপ; সরীসৃপ; হিমরক্তের প্রেমিকের মতো

Araki-3আরাকি’র তোলা গায়িকা লেডি গাগার ছবি

নবুয়োসি আরাকি— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী জাপানী ফটোগ্রাফির ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। কামাশ্রয়ী, ঋজু, খনিশ্রমিকের মতো শরীরবৃত্তীয়। নারী একাকী এক তুষারাচ্ছাদিত মেরু। আর কে না জানে চোখ-ধাঁধানো শুভ্রতাই রহস্যময় গোলকধাঁধা। সবমিলিয়ে নবুয়োসি বহুলআলোচিত। বিতর্কিত। কিন্তু অবধারিত। পূর্বজ ফটোগ্রাফারদের ধারাবাহিকতা, জাপানী ঐতিহ্যবাহী সচিত্র যৌনফ্যান্টাসি সুঙ্গার উত্তরাধিকারসহ আরাকি বিশ্বফটোগ্রাফিতে যোগ করেছেন নিজস্ব টার্ম ‘পার্সোনাল ফটোগ্রাফি’ বা ‘ব্যক্তিগত স্থিরচিত্র’ ধারণা।
শিল্পীর বাইরে গোলাপ শুধুই গোলাপ। ব্যক্তির বাইরে সব শূন্য। লালের সাথে তাই সঙ্গম অবধারিত। ফায়ারপ্লেসে আগুন আর বৃক্ষ হত্যা। একাকার উদ্দেশ্য-বিধেয়। স্রষ্টা বললো— আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি। স্রষ্টা ও সৃষ্টি যুগপৎ যাত্রী কসমিক লংড্রাইভে। তুলোট কিংবা ইটকাঠের বিছানার উত্তাপ লেগে আছে বুনটে, ট্যাক্সিক্যাবে। জানালা দিয়ে শুধু শহরের বদলে-যাওয়া দেখা। ব্যালকনিতেই ধরা দেয় পরিবর্তন সবার আগে। প্রায় ৫ দশক ধরে যে-মানুষটি ব্যক্তিগত সেন্টিমেন্টাল জার্নি চালিয়ে যাচ্ছেন সেই নবুয়োসি আরাকির ছবির সামনে দাঁড়ালে ভেসে ওঠে এক সমান্তরাল বাস্তব। যিনি নিজেই বলেন, ইমেজ আর লাই। মিথ্যা মিথ্যা সব মিথ্যা, নকল। কিন্তু কবির কলমের মতো শিল্পীর তুলি কিংবা ক্যামেরা-ফ্ল্যাশেই গোলাপ সবচেয়ে আফিমরঙা, চিত্তহরী সুগন্ধী। (সম্পূর্ণ…)

মনির : ক্রম-পরিণতি ও বৈচিত্র্যের সফল শিল্প-ব্যক্তিত্ব

অলাত এহ্সান | ২০ নভেম্বর ২০১৬ ১০:৩৫ অপরাহ্ন

monir-2গভীর সংদেনশীলতার কারণেই সাহিত্যিক-শিল্পীরা সমাজে আশু পরিবর্বতন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আগেই আঁচ করতে পারেন। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে, বিশেষ করে ষাটের দশকের শিল্পী-সাহিত্যিকদের অন্বেষাই এ দেশের স্বাতন্ত্র ও প্রাণশক্তি চেনাতে মূখ্যভূমিকা রেখেছে। শিল্পীদের সেই অন্বেষাকে গভীরতর করার ক্ষেত্রে প্রধান কারিগর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। তার মধ্যদিয়েই দেশভাগোত্তর এদেশের শিল্পকলার সেই ধারা চর্চার সূচনা। পরবর্তীকালে তাদের উত্তরসূরি প্রতিভাবান শিল্পীদের হাতে বৈচিত্র্যে ও বৈভবে সমৃদ্ধ হয়েছে চিত্রকলার ধারা, গড়ে উঠেছে এর গৌরবময় ইতিহাস। মনিরুল ইসলাম এই প্রতিভাবান শিল্পীদের অন্যতম। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান, আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়ার শিষ্য তিনি। জয়নুলোত্তর শিল্পীদের মধ্যে তিনিই বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক পরিচিতদেরও একজন। কাজের নিজস্বতা, ধরন ও সমৃদ্ধিই তাকে এখানে উন্নীত করেছে।
পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধ থেকে শুরু করে ষাটের দশকের প্রথমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেন মনিরুল ইসলাম। ঠিই তখন থেকেই তার শিল্পীজীবন ধরলে আজ তা সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে তিনি দ্বিতীয় আবাস গড়েছেন স্পেন। সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করে শিল্পচর্চা করেছেন। হয়ে উঠেছেন মাদ্রিলেনঞ-বাঙালি। ছাপচিত্রের জন্য খ্যাতিমান এই শিল্পী এচিংয়ে এমন একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন, যা স্পেনে ‘মনির-স্কুল’ বলে পরিচিত।
অর্থাৎ এই সময়ে তার চিত্রকর্ম একই রকম থাকেনি। তা সম্ভবই না। কখনো থাকে না। বদলে গেছে, বিষয় বস্তু থেকে প্রকরণ, এমনকি আঁকার সরঞ্জাম-উপাদান, সবকিছুতে এই পরিবর্তন। প্রত্যাহিক জীবনের প্রায় সব কিছু থেকেই তিনি শিল্পের সন্ধান পান। এমনি একটা পোড়া রুটির বুক থেকেও। ১৯৬১ থেকে ২০১৬, এই দীর্ঘ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সব পেন্টিং ও দিক নিয়ে প্রকাশ হলো শিল্পবিষয়ক বই ‘মনির’। এর মধ্যদিয়ে তার আঁকা ছবির পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের একটা রেখাচিত্র পাওয়া যাবে। গতকাল শনিবার ঢাকা লিট ফেস্টের সমাপনী দিনে কসমিক টেন্ট-এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়। (সম্পূর্ণ…)

শব্দের জাদু– অনুবাদে ঠিক কতটা হারাই?

রেশমী নন্দী | ১৯ নভেম্বর ২০১৬ ১:১৩ অপরাহ্ন

TranslationDictionary of Untranslatables: A Philosophical Lexicon বইটি মূলত ফরাসী ভাষায় লিখিত। পরে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে তিন গুণী ভাষাবিদের সম্পাদনায় ইংরেজীতে প্রকাশিত হয় বইটি। প্রায় ডজনখানেক ভাষার দর্শন, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক ৪০০ শব্দের উপর নানা দিক থেকে আলোকপাত করে মূলের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বইটিতে। এই বই নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরেই “দি নিউইয়র্কার” -এ এ্যাডাম গুপনিক এই লেখাটি লেখেন। অনুবাদ করেছেন রেশমী নন্দী। বি. স.

ইতালীতে একবার একটা রেষ্টুরেন্টে পরিবার নিয়ে খেতে গিয়েছিলাম। ঊনিশ শতকের লেখকের ভঙ্গীতে বললে বলতে হয়, সামান্য একটা ভুলেই আমি পারিবারিকভাবে বোকা উপাধি পেয়েছিলাম। ইতালীয় দুটি শব্দের সূক্ষ্ণ পার্থক্য না বুঝে এর ব্যবহারই এ দূর্ঘটনার কারণ। ডেজার্টে স্ট্রবেরী অর্ডার দিতে খুব কায়দা করে উচ্চারণ করতে চেয়েছিলাম “fragoline”। পরে দেখলাম, আসলে যা বলেছি তা হলো “fagiolini” যার অর্থ হলো মটরশুটি। ফলে বাচ্চাদের জন্য পেস্ট্রি আর আইসক্রিমের সাথে বেশ সাড়ম্বরে আমার ডেজার্ট হিসেবে এসেছিল কফি আর মটরশুটি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আমার বাচ্চাদের যে হাসি শুরু হয়েছিল, সেটা এখনো মাঝে মাঝে নানা কারণে উসকে উঠে। একটা অক্ষর “r” সেদিন যে কারণে ইতালীয় ঐ রেষ্টুরেন্টে একটা পরিবারে একজনকে বোকা বলে চিনিয়ে দিল, তা হলো ভাষার নিজস্ব খামখেয়ালীপনা। যদিও কথা বলা এখন নিঃশ্বাস নেয়ার মতোই স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু সত্য হলো এই যে শব্দগুলো আসলে খুব অদ্ভুত, বিমূর্ত একধরনের প্রতীক- মিশরীয় চিত্রলিপির মতোই দুর্বোধ্য, মিশরীয় সমাধির মতোই যে কাউকে ঘোল খাইয়ে দিতে পারে। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com